দ্বিতীয় খণ্ড
পুরী-প্রতিষ্ঠা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
দেখহ প্রভুর রঙ্গ কত সংগোপন ।
রঙ্গভূমে প্রথমে হাজির কোন জন ॥ ১ ॥
বৃহৎ করম-কাণ্ডে চাই টাকা-কড়ি ।
তাই চুপে চুপে জুটে দুজন ভাণ্ডারী ॥ ২ ॥
শিরে ধরি তাঁহাদের যুগল চরণ ।
যা লইয়া কৈলা প্রভু খেলার পত্তন ॥ ৩ ॥
ভাগ্যবতী ভাগ্যবান ভাণ্ডারী প্রভুর ।
রানী রাসমণি তাঁর জামাতা মথুর ॥ ৪ ॥
কেমনে আসরে নামে কিবা সংযোটন ।
চির অন্ধ শুনে পায় সুন্দর নয়ন ॥ ৫ ॥
রানী রাসমণি জানবাজার বসতি ।
নানা গুণে বিভূষিতা দেশে দেশে খ্যাতি॥ ৬ ॥
অতুল সম্পত্তি বহু টাকা কড়ি ঘরে ।
কুবের আবদ্ধ যেন কোষাগার-দ্বারে ॥ ৭ ॥
তাঁহার ভাগ্যের কথা না যায় বাখানি ।
ধনবতী যেন তেন ভক্তিমতী রানী ॥ ৮ ॥
শ্যামায় পিরীতি বড় শ্যামা ধ্যান-জ্ঞান ।
বড়ই বাসনা মনে যাবে কাশীধাম ॥ ৯ ॥
পূজা দিতে বিশ্বেশ্বরে অন্নপূর্ণা মায়ে ।
যেন তেন ভাবে নয় বিশেষ করিয়ে ॥ ১০ ॥
সেহেতু স্বতন্ত্র করে ধনের সঞ্চয় ।
করিতে পারেন যেন মনোমত ব্যয় ॥ ১১ ॥
সময় দেখিয়া তবে কৈল আয়োজন ।
দাস-দাসী কর্মচারী যাহা প্রয়োজন ॥ ১২ ॥
একশত নৌকা প্রায় পরিপূর্ণাধার ।
ধন অর্থ নানাবিধ দ্রব্যের সম্ভার ॥ ১৩ ॥
একত্তরে নৌকা সব বাঁধাইল ঘাটে ।
যেখানে বসতি তাঁর তার সন্নিকটে ॥ ১৪ ॥
যেদিনে যাত্রিক দিন হয় নির্ধারিত ।
তার পূর্বরাত্রে দেখে স্বপন বিস্মিত ॥ ১৫ ॥
সম্মুখে আসিয়া তাঁর ইষ্টদেবী কন ।
কাশীধামে যাইবার নাহি প্রয়োজন ॥ ১৬ ॥
পছন্দ করিয়া ক্রয় করহ সত্বরে ।
মনোরম স্থান এক ভাগীরথী-তীরে ॥ ১৭ ॥
পুরী বিনির্মিয়া তথা অতি শীঘ্রগতি ।
স্থাপনা করহ মোর পাষাণ-মুরতি ॥ ১৮ ॥
নিত্য পূজা-ভোগ-রাগ-ব্যবস্থা সহিত ।
আদেশে আমার তুমি না হবে কুণ্ঠিত ॥ ১৯ ॥
প্রতিষ্ঠিত মুরতিতে হয়ে অধিষ্ঠান ।
লইব তোমার পূজা না হইবে আন ॥ ২০ ॥
বিভোরা বিস্ময়ানন্দে অন্তর বিহ্বল ।
জাগিয়া নয়নে ঢালে অবিরল জল ॥ ২১ ॥
ত্বরান্বিতে ডাকি তবে কর্মচারিগণে ।
আজ্ঞা দিল উপযুক্ত স্থান-অন্বেষণে ॥ ২২ ॥
এখানে সেখানে দেখি কৈল নির্ধারিত ।
যেখানে হইল পুরে পুরী বিনির্মিত ॥ ২৩ ॥
শহরের তিন ক্রোশ উত্তর অঞ্চলে ।
শিয়রেতে সুরধুনী হেসে হেসে চলে ॥ ২৪ ॥
শ্যামালয়-বিনির্মাণে বহু অর্থব্যয় ।
যত লাগে দেয় রানী কাতর না হয় ॥ ২৫ ॥
যদিচ জাতিতে তেহ মাহিষ্য-রমণী ।
উদার প্রকৃতি তাঁর রাজরানী যিনি ॥ ২৬ ॥
সুন্দর
মন্দির ছটি পুরীর ভিতরে ।
এক রাধাশ্যাম অন্য শ্যামা মার তরে ॥ ২৭ ॥
আর বার শিবলিঙ্গ পশ্চিমে স্থাপন ।
চাঁদনি দক্ষিণে তার অতি সুশোভন ॥ ২৮ ॥
কব কত ঘরবাড়ি যথাযোগ্য স্থানে ।
দুই নহবতখানা উত্তর-দক্ষিণে ॥ ২৯ ॥
গঙ্গাগর্ভে বাঁধা ঘাট পুকুর
বাগান ।
যেইমতে সাজে পুরী সেমতে সাজান ॥ ৩০ ॥
খাজাঞ্চী দেওয়ান মসী-বৃত্তি ভৃত্য কত ।
বদ্ধ দ্বারে দ্বারবান অসি নিষ্কাশিত ॥ ৩১ ॥
অষ্টনায়িকার মধ্যে রানী একজন ।
প্রভু-অবতারে এবে ধরায় জনম ॥ ৩২ ॥
শ্যামাপদে অতি মন তাঁয় রতি-মতি ।
শ্যামা নামে
মত্তপ্রায় এতই পিরীতি ॥ ৩৩ ॥
শ্যামা-নাম সদা জপ, রূপ ধ্যান করে ।
বিষয়েতে হাত,
শ্যামা মনের ভিতরে ॥ ৩৪ ॥
ঠিক আত্মবৎ সেবা হইবে শ্যামার ।
প্রবল বাসনা হৃদে
রানীর সঞ্চার ॥ ৩৫ ॥
গুপ্ত কথা ব্যক্ত করি কহে সর্বজনে ।
আনিবারে শাস্ত্রবিৎ
পণ্ডিত ব্রাহ্মণে ॥ ৩৬ ॥
শাস্ত্রের বিধানে মত বলবৎ কিবা ।
কেমনে হইতে পারে
অন্ন-ভোগ-সেবা ॥ ৩৭ ॥
পণ্ডিতবর্গের হইল বিধান বিহিত ।
শূদ্রের ঠাকুরে নাহি
অন্নভোগ রীত ॥ ৩৮ ॥
বিধানে বিষন্ন রানী বুক ফেটে যায় ।
মায়ে অন্ন দিব কেন বিধি
নাহি তায় ॥ ৩৯ ॥
বিধিতে ভক্তিতে কত প্রভেদ দেখ না ।
বিধি-শাস্ত্রে বিধি মাত্র
বিধি-বিড়ম্বনা ॥ ৪০ ॥
কৈবর্ত কুলজা রানী ছোট জাতি কয় ।
বিধিবৎ ভট্টাচার্য
ব্রাহ্মণনিচয় ॥ ৪১ ॥
এ দুয়ে প্রভেদ কত বচনে না সরে ।
থাক বিধিবিৎবর্গ বিধি ল'য়ে ঘরে ॥ ৪২ ॥
রানী না হইল বড় ভক্তি ঘটে যার ।
বলিহারি বিধি-দড়ি লোক দেশাচার ॥ ৪৩ ॥
ভক্তিবলে ভকতের বেডউল চাল ।
মহাব্যাধি বেদবিধি না পায় নাগাল ॥ ৪৪ ॥
হইলে অভক্ত দ্বিজ কি কহিব তাঁকে ।
নীচ জাতি উচ্চে স্থিতি ভক্তি যদি থাকে ॥ ৪৫ ॥
ভক্তির উচ্ছ্বাসে দেখ কি করম তাঁর ।
ধনরত্বে পরিপূর্ণ রানীর আগার ॥ ৪৬ ॥
অতুল সম্পত্তি উচ্চ ত্রিতল আলয় ।
মনোহরা দ্রব্যে ভরা বলিবার নয় ॥ ৪৭ ॥
কিছুই না লাগে ভাল ক্ষিপ্তপ্রায় বুলে ।
শাস্ত্রের বিধান বাণ এত হৃদি জ্বলে ॥ ৪৮ ॥
সদুপায় হেতু রানী ভৃত্যে আজ্ঞা করে ।
দেখহ যতেক টোল শহর ভিতরে ॥ ৪৯ ॥
স্থানান্তরে আছে যত অধ্যাপক জন ।
ভাষ-পত্রে সমাচার করহ প্রেরণ ॥ ৫০ ॥
যথা আজ্ঞা ভৃত্যগণ অগণন ছুটে ।
আনিতে বিধান গেল কিছু দিন কেটে ॥ ৫১ ॥
মনোমত বিধি কেহ দিতে নাাহি পারে ।
অবশেষে আসে রামকুমার-গোচরে ॥ ৫২ ॥
বড়ই শ্যামার ভক্ত শ্রীরামকুমার ।
বিধি-শাস্ত্র ভক্তি-শাস্ত্র বহু জানা তাঁর ॥ ৫৩ ॥
শ্যামা সানুকূল অতি শ্রীরামকুমারে ।
দেন দরশন তার ডাকিলে তাঁহারে ॥ ৫৪ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ যেমন তিনি তেন ভক্তিমস্ত ।
শ্যামা জিবে লিখে দেন জ্যোতিষের মন্ত্র ॥ ৫৫ ॥
সেই হেতু সিদ্ধবাক্ শ্রীরামকুমার ।
যে কোন কারণে বাক্য নহে টলিবার ॥ ৫৬ ॥
বিধান দিলেন তিনি বিধি-শাস্ত্র দেখি ।
দিলে পরে পুরীখানি দানপত্র লিখি ॥ ৫৭ ॥
কোন সৎবংশোদ্ভব ব্রাহ্মণের নামে ।
অন্নভোগ রীতি তবে শাস্ত্রের-বিধানে ॥ ৫৮ ॥
শুনি বিধি-অন্বেষক আনন্দ বিধান ।
রানীর নিকটে শীঘ্র করিল পয়ান ॥ ৫৯ ॥
আপনার মন্ত্রদাতা গুরুদেবে ডাকি ।
দিলা রানী তাঁর নামে দানপত্র লিখি ॥ ৬০ ॥
অন্নভোগ হেতু ব্রতী হবে যে ব্রাহ্মণ ।
করিতে বলিল রানী তার অন্বেষণ ॥ ৬১ ॥
যত
লবে মাহিয়ানা তত দিব তাঁর ।
তদুপরি মনোমত পাইবে বিদায় ॥ ৬২ ॥
রানীর বিদায় বড়
ছোটখাট নয় ।
ক্ষুদ্র যেটি তবু পাঁচশত টাকা ব্যয় ॥ ৬৩ ॥
দেশীয় ব্রাহ্মণ কেহ
স্বীকার না করে ।
কহে কেবা দিবে অন্ন কৈবর্ত-ঠাকুরে ॥ ৬৪ ॥
শাস্ত্রে বিধি আছে
তবু নাহি করে মত ।
শাস্ত্র চেয়ে দেশাচার এত বলবৎ ॥ ৬৫ ॥
চাল-কলা-লোভী যত কলির ব্রাহ্মণ ।
সকল করিতে পারে কড়ির কারণ ॥ ৬৬ ॥
শুক্র-মেদে জন্মে কন্যা বালিকা কুমারী ।
কসায়ের মত দেয় ল'য়ে টাকা-কড়ি ॥ ৬৭ ॥
ব্রাহ্মণ বর্ণের গুরু আছিল আখ্যান ।
কন্যার বিক্রয়ে এবে পাঁঠিবেচা নাম ॥ ৬৮ ॥
ছিটাফোঁটা কাটা গার গোসাঁই ব্রাহ্মণে ।
প্রণব সহিত মন্ত্র দেন বেশ্যাগণে ॥ ৬৯ ॥
এমন ব্রাহ্মণ যাঁর অর্থগত প্রাণ ।
তাঁহারাও নাহি দেন এ-কথায় কান ॥ ৭০ ॥
বিষম প্রভুর খেলা ভেঙ্গে দিব পরে ।
কোথায় নির্ঝর কোথা জল দেখ ঝরে ॥ ৭১ ॥
বিষম মরম খেদে রাসমণি বলে ।
হে মা শ্যামা দিলে
জন্ম হেন নীচ কুলে ॥ ৭২ ॥
আমার সম্পর্ক আছে এই সে কারণ ।
অন্ন-ভোগ দিতে নাহি
মিলিল ব্রাহ্মণ ॥ ৭৩ ॥
ভক্তিমতী রাসমণি বুঝিয়া উপায় ।
রামকুমারের কাছে বলিয়া পাঠায় ॥ ৭৪ ॥
আপুনি দিলেন বিধি তবু কি কারণ ।
পূজক পাচক কার্যে না মিলে ব্রাহ্মণ ॥ ৭৫ ॥
শাস্ত্র-বিধিমতে যদি আছে হেন রীতি ।
দয়া করি আপনারে হতে হবে ব্রতী ॥ ৭৬ ॥
শ্যামাপদে রত মন শ্রীরামকুমার ।
শ্যামার হবে না সেবা শুনি সমাচার ॥ ৭৭ ॥
স্বীকার করিলা কর্ম লইবেন হাতে ।
লৌকিক আচারে দোষ শুদ্ধ শাস্ত্রমতে ॥ ৭৮ ॥
এত বলি কি করিলা শুন অতঃপর ।
বলেছি গ্রামের নাম কোথায় শিয়ড় ॥ ৭৯ ॥
যেখানে হৃদুর বাড়ি প্রভুর ভাগিনে ।
কামারপুকুর হতে কিঞ্চিৎ পশ্চিমে ॥ ৮০ ॥
সেখানের ব্রাহ্মণ শহরে ছিল যত ।
সবাকারে পুরীতে করিলা নিয়োজিত ॥ ৮১ ॥
সৎকুল সমুদ্ভব সেবাত ব্রাহ্মণ ।
সেখানে রানীর ছিল বড় অনাটন ॥ ৮২ ॥
প্রয়োজন মত পেয়ে অতি আহলাদিত ।
ঠাকুর-প্রতিষ্ঠা-দিন কৈল নিরূপিত ॥ ৮৩ ॥
স্নানযাত্রা সেইদিন আষাঢ় মাহায় ।
বারশত উনষট্টি সাল গণনায় ॥ ৮৪ ॥
পুরী-প্রতিষ্ঠার দিন যত কাছে আসে ।
চারিদিকে নরনারী মহানন্দে ভাসে ॥ ৮৫ ॥
মহতী হইবে ঘটা দেখিবার আশ ।
ঘটা-পরিসীমা কথা না হয় প্রকাশ ॥ ৮৬ ॥
দৈর্ঘ্যে প্রস্থে পুরীখানি মহা পরিসর ।
আধলক্ষ লোক ধরে ইহার ভিতর ॥ ৮৭ ॥
সুন্দর শোভিত এই পুরীর সমান ।
কোন স্থলে গঙ্গাকূলে নাই বিদ্যমান ॥ ৮৮ ॥
মন-প্রাণ কোথা যায় পুরী-দরশনে ।
বলিতে নারিনু ভাব রয়ে গেল মনে ॥ ৮৯ ॥
দিব্যভাব-পরিপূর্ণ শান্তিময় স্থল ।
আজন্ম সন্তপ্ত চিত দেখিলে শীতল ॥ ৯০ ॥
আসিতে লাগিল কত শত শাস্ত্রবিৎ ।
ছাত্রসহ নিমন্ত্রিত টোলের পণ্ডিত ॥ ৯১ ॥
মহাভাগ্যবতী রানী ভুবন-মাঝার ।
শুভক্ষণে সমাগত শ্রীরামকুমার ॥ ৯২ ॥
সহোদর গদাধর আইলা সংহতি ।
ভুবন-পাবন ত্রাতা অখিলের পতি ॥ ৯৩ ॥
একত্রিত লোক কত সংখ্যা কেবা করে ।
এত বড় পুরীখান তাহে নাহি ধরে ॥ ৯৪ ॥
গণনায়
সংখ্যা তার নাহি হয় সীমা ।
যে দিনে সাজায় কৃষ্ণ কালীর প্রতিমা ॥ ৯৫ ॥
রজত-কাঞ্চনময় নানা আভরণ ।
পরায় শ্যামায় যত পুরীর ব্রাহ্মণ ॥ ৯৬ ॥
রজত সহস্রদল পদ্মের উপর ।
বিরাজিতা শ্যামামাতা পদতলে হর ॥ ৯৭ ॥
পরম সুঠাম হেন নাহি কোনখানে ।
শ্যাম কি শ্যামার মূর্তি সাধ্য কার চিনে ॥ ৯৮ ॥
অতুল উপমা রূপ কান্তি প্রতিমার ।
শ্যাম-অঙ্গে শোভে যেন শ্যামা-অলঙ্কার ॥ ৯৯ ॥
এ-সময় বহু কষ্টে প্রভু গদাধর ।
জনতা
ঠেলিয়া যান মন্দির ভিতর ॥ ১০০ ॥
প্রতিমা প্রতিমা বলি জ্ঞান নাহি হয় ।
দেখিলা যেমন
শ্যামা আপুনি উদয় ॥ ১০১ ॥
কৈলাস করিয়া শূন্য বিরাজ মন্দিরে ।
অপরূপরূপে গোটা
পুরী আলো করে ॥ ১০২ ॥
অন্নপূর্ণা ক্ষেত্রে যেন নাহি অনাটন ।
চর্ব্য-চুষ্য-লেহ্য-পেয়
খায় লোকজন ॥ ১০৩ ॥
আহূত কি অনাহূত দুঃখী ক্ষুধাতুর ।
সমভাবে পার সবে প্রচুর প্রচুর ॥ ১০৪ ॥
কিন্তু সেই দিনে প্রভু ভব-কর্ণধার ।
পুরীর সম্পর্ক ভোজ্য না কৈল স্বীকার ॥ ১০৫ ॥
এক পয়সার মাত্র মুড়কি আনাইয়া ।
কাটাইলা গোটা দিন তাহাই খাইয়া ॥ ১০৬ ॥
পলায়ে আসেন প্রায় বেলা-অবসানে ।
রামকুমারের টোল আছিল যেখানে ॥ ১০৭ ॥
উদ্বিগ্ন অগ্রজ কোথা গেল গদাধর ।
কার মুখে কোন কিছু না পান খবর ॥ ১০৮ ॥
খুঁজিতে সময় নাই যায় ছয় দিন ।
শ্যামার সেবায় রত সেবা-পরাধীন ॥ ১০৯ ॥
উদ্বিগ্ন অগ্রজ বুঝি আপনা অন্তরে ।
আপুনি আইলা প্রভু ছয় দিন পরে ॥ ১১০ ॥
সিদা লয়ে এ সময় শ্রীরামকুমার ।
পাক করি খান অন্ন হাতে আপনার ॥ ১১১ ॥
জ্যেষ্ঠ সহোদরে প্রভু গদাধর কন ।
যখন দিতেন তাঁয় করিতে ভোজন ॥ ১১২ ॥
ক্ষুন্নমন মলিন বদন ভারি করি ।
কৈবর্তের অন্ন দাদা খাইতে না পারি ॥ ১১৩ ॥
উত্তরে বুঝায়ে দিলা শ্রীরামকুমার ।
ছড়াইয়া গঙ্গাজল করহ আহার ॥ ১১৪ ॥
গঙ্গাজলে সব শুদ্ধ কিছু নাহি দোষ ।
এই বলি করিতেন প্রভুরে সন্তোষ ॥ ১১৫ ॥
পুনশ্চ বলিলা প্রভু তুমি কি কারণ ।
শূদ্র-দত্ত দান-দ্রব্য করহ গ্রহণ ॥ ১১৬ ॥
উত্তর-বচনে জ্যেষ্ঠ কন ধীরি ধীরি ।
শাস্ত্র যাহা বলে আমি তাই মাত্র করি ॥ ১১৭ ॥
লৌকিক আচারে দোষ নহে শাস্ত্রমতে ।
বাহির করিলা শাস্ত্র তাঁরে দেখাইতে ॥ ১১৮ ॥
শাস্ত্র দেখি বড় খুশী প্রভু গদাধর ।
তখন হইল তাঁর সুস্থির অন্তর ॥ ১১৯ ॥
দেখহ প্রভুর খেলা অপূর্ব কেমন ।
উপরে বাহ্যিক চক্ষে কত সংগোপন ॥ ১২০ ॥
জগৎ-জীবন বায়ু নয়নে না মিলে ।
জলে স্থলে স্বভাবেতে সমভাবে খেলে ॥ ১২১ ॥
কৌশলে গাঁথেন প্রভু হেন লীলাহার ।
মানুষে কে বুঝে সুতা মধ্যে আছে তার ॥ ১২২ ॥
পরম আচারী বংশে প্রভুর জনম ।
শূদ্রের প্রদত্ত নহে কখন গ্রহণ ॥ ১২৩ ॥
চাটুয্যে শ্রীক্ষুদিরাম এত আঁটা কুলে ।
দুঃখী তবু সম্মুখেতে সাধ্য কার চলে ॥ ১২৪ ॥
সকলের পিতামাতা প্রভু ভগবান ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু করুণানিদান ॥ ১২৫ ॥
সকল সমান তাঁর যেই জন ডাকে ।
জাতির খাতির
তাঁর কাছে কোথা থাকে ॥ ১২৬ ॥
ভাঙ্গিতে লাগিলা প্রভু কুলের বাঁধনী ।
আগে দেখাইলা পথ
ধনী কামারিনী ॥ ১২৭ ॥
তাঁর ছেলে জ্যেষ্ঠ ভাই শ্রীরামকুমার ।
শূদ্রের ঠাকুর সেবা করিলা স্বীকার ॥ ১২৮ ॥
ভক্ত-প্রিয় ভক্ত-প্রাণ তুমি হরি ঠিক ।
ভকতে সতত দেখ প্রাণের অধিক ॥ ১২৯ ॥
পুরীতে ভক্তের সাধ সব ফেল দূরে ।
আনাইলা কেমন কৌশলে সহোদরে ॥ ১৩০ ॥
গুপ্তভাবে কৈলা মুক্ত আপনার পথ ।
সফল করিতে রানী-ভক্ত-মনোরথ ॥ ১৩১ ॥
ধন্য ধন্য ভক্তিমতী রানী রাসমণি ।
ভক্তিজোরে পেলে ঘরে অখিলের স্বামী ॥ ১৩২ ॥
আজন্ম তপস্যা করি যোগী যার ধ্যানে ।
না পায় সে হেন ধন আনিলে ভবনে ॥ ১৩৩ ॥
সম ভাগ্যবতী নাহি দেখি ধরাতলে ।
তোমার চরণরেণু বহু ভাগ্যে মিলে ॥ ১৩৪ ॥
তব সম কোথাও শ্রবণে নাহি শুনি ।
পাষণ্ডে তোমায় কয় কৈবর্ত-রমণী ॥ ১৩৫ ॥
কি আখ্যা তোমারে দিব কিছুই না পাই ।
বারে বারে তোমার চরণরেণু
চাই ॥ ১৩৬ ॥
গরদ বসন অর্থ শ্রীরামকুমারে ।
দান করিলেন রানী অতি উচ্চদরে ॥ ১৩৭ ॥
আর বড় ভট্টাচার্য আখ্যা দিয়া তাঁয় ।
সমাদরে রাখে রানী শ্যামার সেবায় ॥ ১৩৮ ॥
হেথা রানী রাসমণি পুরীর ভিতরে ।
ঠাকুরের ভোগ-রাগ বহু আড়ম্বরে ॥ ১৩৯ ॥
আরম্ভ করিলা মনে হেন করি সাধ ।
যত লোক আসে পাবে ঠাকুর-প্রসাদ ॥ ১৪০ ॥
রাধাশ্যাম কালীমার ভোগ আলাহিদা ।
প্রসাদ বৈষ্ণবে শাক্তে না করিবে দ্বিধা ॥ ১৪১ ॥
কিন্তু রানী কৈবর্তজা ইহার কারণ ।
উচ্চ জাতি নাহি করে প্রসাদ গ্রহণ ॥ ১৪২ ॥
বন্দেজ মতন ভোগ ঠাকুরেতে দিয়া ।
প্রসাদ লইয়া দেয় গঙ্গায় ফেলিয়া ॥ ১৪৩ ॥
বিষাদে রানীর হৃদি দেখে ফেটে যায় ।
ঠাকুর-প্রসাদ উচ্চ জেতে নাহি খায় ॥ ১৪৪ ॥
হায় রানী রাসমণি না চিনে এখন ।
পুরীতে প্রসাদ পান প্রভু নারায়ণ ॥ ১৪৫ ॥
হর্তা কর্তা পিতামাতা পরম ঈশ্বর ।
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশের সবার উপর ॥ ১৪৬ ॥
ইষ্টদেবী তোমার স্বপনে যাঁরে দেখা ।
প্রভুর পুরুষাধারে লীলাক্ষেত্রে ঢাকা ॥ ১৪৭ ॥
লইয়া ভাণ্ডারা যাঁর জন্যে আগুয়ান ।
যাঁর জন্মে কৈলে হেন পুরী বিনির্মাণ ॥ ১৪৮ ॥
আপনি হাজির ঠিক প্রতিষ্ঠার দিনে ।
দেখ না নেহারি দুঃখ অকারণ কেনে ॥ ১৪৯ ॥
ধন্য ধন্য পঞ্চভূত যাই বলিহারি ।
ঘরে পুরে দাও জোরে নাক ফুঁড়ে ডুরি ॥ ১৫০ ॥
কি ঘুমন্ত বদ্ধ জীব কিবা ভক্তিমান ।
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশেরও নাহিক এড়ান ॥ ১৫১ ॥
ভগবান কর কৃপা এ দাসের প্রতি ।
চিনি বা না চিনি যেন পদে রহে মতি ॥ ১৫২ ॥
লয়ে অনুমতি প্রভু অগ্রজের স্থানে ।
ফিরিয়া আইলা দেশে আপন ভবনে ॥ ১৫৩ ॥
দেশে হইয়াছে রাষ্ট্র কথা বহু দূর ।
শ্রীরামকুমার সেবে কৈবর্ত-ঠাকুর ॥ ১৫৪ ॥
নিন্দাবাদ আন্দোলন করে সর্বজনে ।
কুলের কলঙ্ক কাজ করিল কেমনে ॥ ১৫৫ ॥
কথায় না দেন কান প্রভু গদাধর ।
ভিতরে অন্তরে তাঁর আনন্দ বিস্তর ॥ ১৫৬ ॥
তাঁর খেলা কেবা বুঝে একা তিনি বিনে ।
স্বভাব-সুলভ হাসি-খুশী সবা সনে ॥ ১৫৭ ॥
শিশুবয়ঃ গেছে প্রভু বয়স্ক এখন ।
শৈশব ভাবের পক্ষে নাই বৈলক্ষণ ॥ ১৫৮ ॥
বয়সের সঙ্গে শিশুভাব হয় বড় ।
এ কথা বুঝিতে মন-বুদ্ধি চাই বড় ॥ ১৫৯ ॥
সরল শৈশব-ভাব চন্দ্রিমা-কিরণ ।
কলার কলায় বাড়ে কভু নহে কম ॥ ১৬০ ॥
বয়স দেখিয়া কয় প্রতিবাসিগণে ।
এবে গদায়ের বিয়া হইবে কেমনে ॥ ১৬১ ॥
হইলে বিয়ার কথা প্রভু অতি খুশী ।
কথার উত্তর দেন মৃদুমন্দ হাসি ॥ ১৬২ ॥
মনোমত ঘটে
কন্যা মিটে মন-সাধ ।
হয় যেন গাছতলা কর আশীর্বাদ ॥ ১৬৩ ॥
অদ্ভুত ঘটনা বিয়া কব পরে মন ।
শিয়ড়ে চলিলা প্রভু হৃদুর ভবন ॥ ১৬৪ ॥
গীতপ্রিয় গৌড়বাসী সর্বজনে জানা ।
শিয়ড়েতে একদিন গায় কোন জনা ॥ ১৬৫ ॥
গায়কের কণ্ঠরব কানে যার উঠে ।
নরনারী ছেলে বুড়ো সবে আসে
ছুটে ॥ ১৬৬ ॥
হৃদয়-সসঙ্গ প্রভু বসি সেই স্থলে ।
আইলা রমণী এক কন্যা করি কোলে ॥ ১৬৭ ॥
অল্পবয়া কন্যা তিন বর্ষ পরিমাণ ।
যুগল চরণে করি অসংখ্য প্রণাম ॥ ১৬৮ ॥
জননী ঝিউড়ি সেইখানে বাপ-ঘর ।
হৃদয়ের প্রতিবাসী চেনা পরস্পর ॥ ১৬৯ ॥
শুধু মাত্র চেনা নয় আত্মীরতা অতি ।
নিকট সম্পর্ক দ্বিজবংশ সম জাতি ॥ ১৭০ ॥
গায়কের গীত সাঙ্গ হয়ে গেলে পর ।
শিশু মেয়ে লয়ে লোকে জুড়িল রগড় ॥ ১৭১ ॥
তার মধ্যে বালিকায় কহে একজন ।
দেখ না এখানে কত লোক সমাগম ॥ ১৭২ ॥
মনোমত কারে চাহ করিবারে বিয়া ।
দেখাইয়া দাও দেখি হাত বাড়াইয়া ॥ ১৭৩ ॥
এত শুনি তখনি বালিকা তুলি কর ।
নির্দেশ করিয়া দিলা প্রভু গদাধর ॥ ১৭৪ ॥
কেবা এ বালিকা আর কে জননী তাঁর ।
পরে মন বিশেষিয়া কব সমাচার ॥ ১৭৫ ॥
অতি প্রিয় শ্রীপ্রভুর হৃদয়-বসতি ।
এলে পরে হয় তথা বহুদিন স্থিতি ॥ ১৭৬ ॥
হরিভক্ত এইখানে বড়ই বিরল ।
সংসারী বিষয় 'বাসে বিষয়ী সকল ॥ ১৭৭ ॥
তা সবার মধ্যে মাত্র দুই একজন ।
ভগবৎ-তত্ত্ব-কথা করে আন্দোলন ॥ ১৭৮ ॥
প্রভু সনে হরি-কথা আলাপন করি ।
অন্তরে সবার খেলে আনন্দ-লহরী ॥ ১৭৯ ॥
কথোপকথন যার
সঙ্গে একবার ।
এমন মঞ্জুর আর নহে ভুলিবার ॥ ১৮০ ॥
বঞ্চি কিছু দিন তথা আসিলেন ফিরে ।
স্ববাসে শ্রীপ্রভুদেব কামারপুকুরে ॥ ১৮১ ॥
স্বদেশ না লাগে ভাল যেন ছিল আগে ।
গঙ্গাতীর দক্ষিণশহর মনে জাগে ॥ ১৮২ ॥
যেই স্থানে
শ্রীপ্রভুর আদি লীলা স্থল ।
আসিতে তথায় সাধ হইল প্রবল ॥ ১৮৩ ॥
আগমন সত্বর হইল
শ্রীপ্রভুর ।
শুন রামকৃষ্ণ কথা শ্রবণমধুর ॥ ১৮৪ ॥