দ্বিতীয় খণ্ড
বিবাহ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ক্রমে পরে শুনিলেন আই ঠাকুরানী ।
প্রভুর কারণে হৈলা আকুল পরাণী ॥ ১ ॥
ছেড়ে গেছে জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামকুমার ।
শোক-তাপানলে হৃদি দহে অনিবার ॥ ২ ॥
তাহার উপরে এ কি ভীষণ বারতা ।
বায়ুরোগে গদাই'র উন্মাদের কথা ॥ ৩ ॥
যতেক মমতা স্নেহ তাঁহার উপর ।
প্রাণের অধিক ছোট ছেলে গদাধর ॥ ৪ ॥
সংবরিতে নারে শোক কাঁদে উচ্চরোলে ।
তিতিল আগোটা বক্ষ নয়নের জলে ॥ ৫ ॥
তখন আইল ধেয়ে পুত্র রামেশ্বর ।
সংসারের ভার এবে যাঁহার উপর ॥ ৬ ॥
কাঁদিতে কাঁদিতে আই কহিলেন তাঁরে ।
ব্যবস্থা করিয়া ঘরে আন গদাধরে ॥ ৭ ॥
সান্ত্বনা করিয়া মায়ে কহে রামেশ্বর ।
রোদন সংবর তারে আনিব সত্বর ॥ ৮ ॥
অল্পদিন মধ্যে তেহ করিল তাহাই ।
আইর পরাণ
ঠাণ্ডা পাইয়া গদাই ॥ ৯ ॥
এখানে প্রভুর ভাব হইল স্বতন্তর ।
কখন সুস্থিরতর কভু বহে
ঝড় ॥ ১০ ॥
সুস্থিরেতে হাসিখুশী প্রতিবাসী সনে ।
হইত যেমন পূর্বে গ্রাম্য আলাপনে ॥ ১১ ॥
বহিলে অন্তরে ঝড় নীরব গদাই ।
সম্মুখে আসিলে কেহ কোন কথা নাই ॥ ১২ ॥
রাত্রিদিন উদাসীন আপনে আপন ।
ঘৃণা-লজ্জা-ভয়-হীন বাহ্য আচরণ ॥ ১৩ ॥
কানাকানি লোকজনে পরস্পর কয় ।
উপদেবতার কর্ম অন্ত কিছু নয় ॥ ১৪ ॥
সে হেতু আনিয়া ওঝা করে ঝাড়ফুক ।
বসিয়া বসিয়া প্রভু দেখেন কৌতুক ॥ ১৫ ॥
ওঝার টোটকা ব্যর্থে সবে মুহ্যমান ।
চণ্ড নামাইতে লোকে করিল বিধান ॥ ১৬ ॥
আসিয়া চণ্ডর ওঝা নির্ধারিত দিনে ।
দেখিবারে উপনীত গ্রাম্য লোকজনে ॥ ১৭ ॥
পূজাবলি লয়ে চণ্ড হৈল অধিষ্ঠান ।
যেইখানে দর্শকেরা আছে বিদ্যমান ॥ ১৮ ॥
ওঝারে ডাকিয়া চণ্ড বলিল এখনে ।
পূজাবলি দিলে তুমি যাহার কল্যাণে ॥ ১৯ ॥
দেহে তার ভূত-স্পর্শ কিংবা নাই ব্যাধি ।
অকারণ ঝাড়-ফুক অথবা ঔষধি ॥ ২০ ॥
সম্বোধিয়া প্রভুদেবে চণ্ডর বচন ।
ও গদাই, সাধু হ'তে এত যদি মন ॥ ২১ ॥
সুপারি ভক্ষণ কেন এত পরিমাণে ।
যাহাতে কামের বৃদ্ধি দেহমধ্যে আনে ॥ ২২ ॥
সুপারি ভক্ষণাভ্যাস অধিক তখন ।
চণ্ডর আদেশে প্রভু কৈলা বিসর্জন ॥ ২৩ ॥
জপ-পূজা-স্বস্ত্যয়ন কল্যাণের তরে ।
আচরেন আত্মীয়েরা প্রভু যাতে সারে ॥ ২৪ ॥
কিছুতেই নাহি হয় মনোমত হিত ।
তেকারণ সকলেই সর্বদা চিন্তিত ॥ ২৫ ॥
এখানেতে প্রভুদেব আপনার মনে ।
কখন ঠাকুরপূজা কখন শ্মশানে ॥ ২৬ ॥
কথন বসন থাকে শরীরে সংলগ্ন ।
কখন বসনহীন অঙ্গ গোটা নগ্ন ॥ ২৭ ॥
একত্রে আত্মীয়বর্গে যুক্তি স্থির করে ।
পারিলে বিবাহ দিতে হিত হ'তে পারে ॥ ২৮ ॥
বিবাহে বায়ুর কোপ নষ্ট হয় প্রায় ।
সংসারে পড়িবে মন মোহমমতায় ॥ ২৯ ॥
পূর্বাপর
আগাগোড়া ভাবিয়ে চিন্তিয়ে ।
বুঝে কিছু উপশম আগেকার চেয়ে ॥ ৩০ ॥
ত্বরিত বিহিত বিয়া পরম মঙ্গল ।
যদি পরে হয় রোগ পুনশ্চ প্রবল ॥ ৩১ ॥
তাই ভাই রামেশ্বর সাধিতে কল্যাণ ।
এখানে সেখানে করে পাত্রীর সন্ধান ॥ ৩২ ॥
আত্মীয়-স্বজন লক্ষ্মী মুখুয্যে আখ্যান ।
হৃদয়ের ভাই তাঁর শিয়ড়েতে ধাম ॥ ৩৩ ॥
ঘটকালিকার্য তাঁর হাতে দিয়া ভার ।
ভাই রামেশ্বর দেখে অপর যোগাড় ॥ ৩৪ ॥
হৃদয়
লক্ষ্মীর সঙ্গে বড় ভালবাসা ।
প্রভুর সতত তাই শিয়ড়েতে আসা ॥ ৩৫ ॥
প্রভুর বড়ই প্রীতি আছিল শিয়ড়ে ।
তাই সন্নিকটে পাত্রী অন্বেষণ করে ॥ ৩৬ ॥
অর্ধ ক্রোশ দূর মাত্র পূরব অঞ্চলে ।
ক্ষুদ্র গ্রাম নাম জয়রামবাটী বলে ॥ ৩৭ ॥
জয়রাম মুখুয্যে নামক তথাকার ।
কালী নামে কন্যা এক আছিল তাঁহার ॥ ৩৮ ॥
প্রথমে সম্বন্ধ হয় সে কন্যার সনে ।
ভেঙ্গে দিল জয়রাম পাত্র ক্ষেপা শুনে ॥ ৩৯ ॥
তাঁর খুল্লতাত ভাই মহাভাগ্যবান ।
মুখুয্যে শ্রীরামচন্দ্র ব্রাহ্মণের নাম ॥ ৪০ ॥
দশকর্মান্বিত দ্বিজ আছে যজমান ।
সংকীর্ণ অবস্থা চলে কষ্টে গুজরান ॥ ৪১ ॥
বাস উপযুক্ত মাত্র ছোট মেটে ঘর ।
আপনি ব্রাহ্মণ আর তিন সহোদর ॥ ৪২ ॥
একটি নন্দিনী তাঁর চারিটি নন্দন ।
সর্বসুলক্ষণা কন্যা জনমে প্রথম ॥ ৪৩ ॥
এবে কি হইল শুন ঘটকেরে লৈয়া ।
ব্রাহ্মণ সম্মত দিব
দুহিতার বিয়া ॥ ৪৪ ॥
বিবাহের সব কথা করি স্থিরতর ।
রামেশ্বরে পাঠাইয়া দিলেন খবর ॥ ৪৫ ॥
পুলক অন্তর তেহ শুভ সমাচারে ।
দিন করি স্থিরতর কুটুম্বের ঘরে ॥ ৪৬ ॥
পাঠাইল নিমন্ত্রণ লিখন করিয়া ।
আই ঠাকুরানী কন ঘরে ঘরে গিয়া ॥ ৪৭ ॥
প্রতিবাসী নর-নারী খুশী অতিশয় ।
সর্বাধিক খুশী প্রভু হবে পরিণয় ॥ ৪৮ ॥
আনন্দ সাগরে ভাসে গ্রামের রমণী ।
মহানন্দে আত্মহারা আই ঠাকুরানী ॥ ৪৯ ॥
মেজ ভাই রামেশ্বর বনিতা তাঁহার ।
প্রভুরে
দেখেন যেন পুত্র আপনার ॥ ৫০ ॥
বড় সাধ বিবাহেতে হয় বাদ্য-ঘটা ।
দৈবক্রমে কিন্তু না
ঘটিয়া উঠে সেটা ॥ ৫১ ॥
ঘরে ঘরে প'ড়ে গেল আনন্দের ঘুম ।
রাত্রিকালে কারো চোখে নাহি আসে ঘুম ॥ ৫২ ॥
ক্রমে বিবাহের দিন হৈল উপনীত ।
প্রতিবাসী রমণীরা সবে উপস্থিত ॥ ৫৩ ॥
পরম সুঠাম প্রভুদেবে সাজাইতে ।
কেহ বা চন্দন ঘষে কেহ মালা গাঁথে ॥ ৫৪ ॥
যতনে রচনা কৈল বেশ মনোহর ।
মন হরে হেরে পরা সুন্দর কাপড় ॥ ৫৫ ॥
গ্রাম্য রমণীরা করে মাঙ্গলিক ধ্বনি ।
আহলাদে কাঁদেন মেজ ভাজ-ঠাকুরানী ॥ ৫৬ ॥
বাদ্য-ঘটা না হইল বড় দুঃখ মন ।
অন্তরেতে বুঝিলেন প্রভু নারায়ণ ॥ ৫৭ ॥
সান্ত্বনা-কারণ তবে বলিলেন তাঁয় ।
দেখ শুন কিবা বাদ্য বাজিছে বিয়ায় ॥ ৫৮ ॥
এত বলি দেন মুখে বোল পরিপাটি ।
ডেলে গু ডেলে গু ডেলে ডেলে কাটি ॥ ৫৯ ॥
ঢোলের স্বরূপ
হাতে পাছা বাজাইয়া ।
বাজান ডোমের বাদ্য নাচিয়া নাচিয়া ॥ ৬০ ॥
মহারঙ্গকর প্রভু
অতুল ভুবনে ।
নকলে সুপটু হেন নাহি শুনি কানে ॥ ৬১ ॥
বাদ্যাপেক্ষা রঙ্গাধিক
প্রভুর বাজন ।
নাড়ী ফাটে হেসে লুটে দর্শকের গণ ॥ ৬২ ॥
কোনই সরম লজ্জা নাহি
শ্রীপ্রভুর ।
সরল সহজ সোজা গদাই ঠাকুর ॥ ৬৩ ॥
বিবাহেতে লজ্জাহীন যত হ'ক নর ।
তথাপি
সলজ্জ বাহ্যে জড় জড় স্বর ॥ ৬৪ ॥
প্রভুর দেখহ লজ্জা গন্ধ মাত্র নাই ।
বুঝিতে এ সব কথা বাল্যভাব চাই ॥ ৬৫ ॥
চাই দিব্য মুক্ত খোলা সরল নয়ন ।
সরল বিশ্বাস আর হরি লুব্ধ মন ॥ ৬৬ ॥
সুসরল মন স্বচ্ছ স্ফটিকের প্রায় ।
তার মধ্য দিয়া যত লীলা দেখা যায় ॥ ৬৭ ॥
যদ্যপি কালিমা ম'লা মনে গিয়া ধরে ।
আজন্মে বিগত হয় আঁধারে আঁধারে ॥ ৬৮ ॥
ভাঙ্গিয়া দিতাম কথা কলমেতে আঁকি ।
যত কর তিলমাত্র সব রবে বাকি ॥ ৬৯ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলাকাণ্ড অপরূপ খনি ।
পূর্ণিত সজ্জিত তায় নানা রত্ন-মণি ॥ ৭০ ॥
কথার এ কথা নয় কর দরশন ।
নীরবে লইয়া
সঙ্গে সুসরল মন ॥ ৭১ ॥
রঙ্গে মাতি বরযাত্রী জুটিয়া সকলে ।
আগে পাছে শ্রীপ্রভুর বিয়া দিতে চলে ॥ ৭২ ॥
শুনা কথা শিবের বিবাহ মনে পড়ে ।
উমা সহ যেইবার অচল-আগারে ॥ ৭৩ ॥
বিয়া দিতে যত ভূতে মহা মেতে চলে ।
যেতে পথে নানা মতে জাতি-খেলা খেলে ॥ ৭৪ ॥
মহারঙ্গী নন্দী ভৃঙ্গী ভৈরব বেতাল ।
দ্বৈতাদানা ধূর্তপনা ধরা আল্থাল্ ॥ ৭৫ ॥
ছুটাছুটি হুটপাট মাটি ফাটে দাপে ।
মহাফণী ত্রস্ত প্রাণী কোটি শিরে কাঁপে
॥ ৭৬ ॥
ভূতদলে আলো জ্বালে মুখের ভিতর ।
চারি ধারে যায় ঘেরে ষাঁড়ে দিগম্বর ॥ ৭৭ ॥
সেই মত
বরযাত্রী শ্রীপ্রভুর সাথে ।
খোলা পায় খোলা গায় ঠেঙ্গা লাঠি হাতে ॥ ৭৮ ॥
গামছা কাঁধেতে বাঁধা কোমরে চাদর ।
কৌতুক রহস্য মুখে হাজার রগড় ॥ ৭৯ ॥
যেতে পথে কত রঙ্গ কব আমি কটি ।
উতরিল সন্নিকটে জয়রামবাটী ॥ ৮০ ॥
জ্বালিয়া সাতাশ কাঠি বিবাহের কালে ।
ঘুরে যবে বরে ঘেরে রমণীসকলে ॥ ৮১ ॥
জ্বালা কাঠি লাগিয়া কি হৈল শুন কথা ।
পুড়ে গেল শ্রীপ্রভুর মাঙ্গলিক সুতা ॥ ৮২ ॥
হরিদ্রা-মাখান সুতা ছিল বাঁধা হাতে ।
অপূর্ব প্রভুর খেলা দেখিতে শুনিতে ॥ ৮৩ ॥
চিরশক্তি আপনার করিয়া গ্রহণ ।
ছলে পুড়াইয়া দিলা অবিদ্যা বন্ধন ॥ ৮৪ ॥
সমাপ্ত হইলে পরে শুভ পরিণয় ।
কন্যা-কর্তা হইলেন ব্যস্ত অতিশয় ॥ ৮৫ ॥
খাওয়াতে বরযাত্রী কন্যাযাত্রিগণে ।
প্রথম খাইতে বসে যতেক ব্রাহ্মণে ॥ ৮৬ ॥
দরিদ্র ব্রাহ্মণ ভাগমত এক ঘর ।
রচিয়াছে নারীগণে তাহাতে বাসর ॥ ৮৭ ॥
ভোজনের ঠাঁই হয় তাহার দুয়ারে ।
দেখিয়া প্রভুর খেলা আত্মহারা করে ॥ ৮৮ ॥
বিশ্বরানী মাতা বিশ্বেশ্বর শ্রীগোসাঁই ।
জনম যাঁহার ঘরে তাঁর ঘর নাই ॥ ৮৯ ॥
জীবন উপায় মাত্র রকমে রকমে ।
গড়া হ'তে এত গুপ্ত সাধ্য কার চিনে ॥ ৯০ ॥
তথাপি সরলে কিছু নাহি লাগে ফের ।
যে না বুঝে নর-লীলা তার তর্ক ঢের ॥ ৯১ ॥
কিংবা যেবা বলে হরি বিরাট আকার ।
চৌদ্দপুরা আধারেতে নহে ধরিবার ॥ ৯২ ॥
আপদ বিপদ দুঃখ কেঁদে কেঁদে বুলে ।
জানে না সে লীলা তত্ত্ব লীলা কারে বলে ॥ ৯৩ ॥
সর্বশক্তিসান যিনি শক্তির আধার ।
প্রকাণ্ড সৃষ্টির সৃষ্টি সঙ্কেতে যাঁহার ॥ ৯৪ ॥
সিন্ধু-বিন্দুমধ্যে যাঁর বিরাজের ঠাঁই ।
আকার ধরিতে কহ কেন শক্তি নাই ॥ ৯৫ ॥
প্রমাণ-প্রয়োগে তত্ত্ব নহে বুঝিবার ।
বিশ্বাসে প্রত্যক্ষীভূত হন অবতার ॥ ৯৬ ॥
দেখান যাঁহারে তেঁহ পায় দেখিবারে ।
বিরাটেতে যেই বস্তু সেই সে আকারে ॥ ৯৭ ॥
সবিশ্বাসে লীলাকথা শুন তুমি মন ।
নিত্য লীলা দেখিবারে পাইবে নয়ন ॥ ৯৮ ॥
বাসরে দেখিয়া প্রভু অনেক রমণী ।
শুন কি হইল পরে অপূর্ব কাহিনী ॥ ৯৯ ॥
নানাবিধ রমণীর নানারঙ্গ হেরে ।
রঙ্গময়ী মার লীলা জাগিল অন্তরে ॥ ১০০ ॥
মা মা বলি
হৈলা প্রভু ভাবাবেশান্বিত ।
কোকিল জিনিয়া কণ্ঠে ধরিলেন গীত ॥ ১০১ ॥
যেমন কাঁদান গানে মোহিত নাগিনী ।
সেই মত স্তব্ধীভূত পুরুষ-রমণী ॥ ১০২ ॥
পাতে হাত মুখে ভাত খেতে যারা ছিল ।
পুতুলের প্রায় গান শুনিতে লাগিল ॥ ১০৩ ॥
বাসরে রমণীগণ মোহিত অবাকে ।
দেখে বরে নিরখিয়া অনিমিখ চোখে ॥ ১০৪ ॥
ছিল মনে কত মত রঙ্গ করিবারে ।
দেখে রঙ্গ রঙ্গ করা সব গেল উড়ে ॥ ১০৫ ॥
শ্যামাগুণগানে প্রভু এত মত্ততর ।
কোমরে কাপড় নাই প্রায় দিগম্বর ॥ ১০৬ ॥
বাসর সাজায়ে ছিল যতগুলি নারী ।
সবার চরণ-রজ মস্তকেতে ধরি ॥ ১০৭ ॥
মহাধন্যা পুণ্যবতী মহা পূজ্যতর ।
ল'য়ে হরগৌরী যারা সাজালে বাসর ॥ ১০৮ ॥
যে যুগল-দরশনে বিরিঞ্চি অক্ষম ।
আঁখির মিটায়ে সাধ কৈল দরশন ॥ ১০৯ ॥
তবে কিনা কি দেখিল না বুঝে ব্যাপার ।
বড় গুপ্ত এই বারে প্রভু অবতার ॥ ১১০ ॥
ব্রাহ্মণীর নাম শ্যামা প্রভুর শাশুড়ী ।
উদরে জনমে যাঁর জগত-ঈশ্বরী ॥ ১১১ ॥
বলিয়াছি কিছু আগে দেখ মনে ক'রে ।
একবার প্রভুদেব হৃদয়ের ঘরে ॥ ১১২ ॥
জনেক গায়ক তথা গায় একদিন ।
শুনে জুটে নর-নারী নবীন প্রাচীন ॥ ১১৩ ॥
নারীদের মধ্যে এক কন্যা করি কোলে ।
শুনে গান এক সঙ্গে নারীদের দলে ॥ ১১৪ ॥
একত্রিত যত সব চেনা পরস্পর ।
প্রতিবাসী কাছে দূরে সেই গ্রামে ঘর ॥ ১১৫ ॥
নিকটসম্বন্ধযুক্ত আপনা আপনি ।
তাই তথা সমবেত পুরুষ-রমণী ॥ ১১৬ ॥
অল্পবয়া শিশুমেয়ে কোলে ছিল যাঁর ।
গীত-সমাপনে এক আত্মীয় তাঁহার ॥ ১১৭ ॥
আদরে কহিলা বালিকায় সম্বোধিয়া ।
এত লোক কারে চাই করিবারে বিয়া ॥ ১১৮ ॥
অমনি দেখান বালা তুলি দুই করে ।
সন্নিকটে সমাসীন প্রভুগদাধরে ॥ ১১৯ ॥
এই বালা গুরুমাত ব্রাহ্মণ-কুমারী ।
জননী তাঁহার শ্যামা প্রভুর শাশুড়ী ॥ ১২০ ॥
ছিল জোড়া দিদি আই হেঁশেলের কাজে ।
জামায়ের মিঠা স্বর হৃদি মাঝে বাজে ॥ ১২১ ॥
শুনি মুরলীর গান যেমন গোপিনী ।
বাসরে আইল ধেয়ে দিদি ঠাকুরানী ॥ ১২২ ॥
দূর লাজ গেল খুলে মুখের বসন ।
আপনা হারায়ে হেরে জামাতা-রতন ॥ ১২৩ ॥
রূপের পুতুলি প্রভুদেব গদাধর ।
যৌবন-প্রারম্ভ প্রায় পঁচিশ বৎসর ॥ ১২৪ ॥
একেত মুখের ঢাকা গেছে দিদি আই ।
সামাল অঙ্গের বাস বিষম জামাই ॥ ১২৫ ॥
জগজন-মন-চোরা প্রভু ভগবান ।
গুপ্ত অবতার তাই পাইলে এড়ান ॥ ১২৬ ॥
কেবা সমভাগ্যবতী ভুবন-ভিতরে ।
উদরে ধরিলে যার ব্রহ্মাণ্ড উদরে ॥ ১২৭ ॥
জামাই অখিলপতি ব্রহ্ম সনাতন ।
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশের পুজিত চরণ ॥ ১২৮ ॥
ধন্য ধন্য দিদি আই প্রভু অবতারে ।
ঈশ্বর বালিকাবেশে খেলে যাঁর ঘরে ॥ ১২৯ ॥
বসাইয়া
কোলে তাঁরে খাওয়াইলে মাই ।
হীনের কি আছে সাধ্য স্বরূপত্ব গাই ॥ ১৩০ ॥
জামাতা
দুহিতা তব তাঁদের চরণে ।
জন্ম জন্ম রহে মতি ভিক্ষা দেহ দীনে ॥ ১৩১ ॥
শ্বশুর শাশুড়ী
কিবা আত্মীয়-স্বজন ।
কারে নাহি ধরা-দু'য়া দিলা ভগবান ॥ ১৩২ ॥
মুগ্ধমন যতক্ষণ দেখে
শুনে তাঁয় ।
অন্তর হইলে পরে সব ভুলে যায় ॥ ১৩৩ ॥
ভুলিতে না পারে কিন্তু মুরতি
সুন্দর ।
পিক-পাখী-বীণা জিনি শ্রীকণ্ঠের স্বর ॥ ১৩৪ ॥
মরি কি মোহন কান্তি খেলে
শ্রীবয়ানে ।
বিশেষে ঈষৎ বাঁকা নয়নের কোণে ॥ ১৩৫ ॥
কি শোভা অধরে মৃদু সুহাসির খেলা ।
কিবা ঠাম ধীর পদ-সঞ্চালন বেলা ॥ ১৩৬ ॥
রূপের আকর প্রভু ঠাকুর গদাই ।
বিধাতার
তুলি-স্পর্শ শ্রীঅঙ্গেতে নাই ॥ ১৩৭ ॥
শিল্পকলা বিধাতার নাহি এতদূর ।
আপনারে
গঠিয়াছে আপনি ঠাকুর ॥ ১৩৮ ॥
ভুলাইতে জগজন তাদের কল্যাণে ।
বিমোহিত যারা তুচ্ছ
কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ১৩৯ ॥
শুন রামকৃষ্ণ-লীলা অপূর্ব কথন ।
ভব-সিন্ধু তরিবারে বাঞ্ছা
যদি মন ॥ ১৪০ ॥