তৃতীয় খণ্ড
দীনাচার
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুদেবের লীলা-জলধির তলে ।
যে যা চায় তাই পায় তলিয়া খুঁজিলে ॥ ১ ॥
নাহি হেন রত্নধন যাহা নাই তায় ।
কাজে কাজে দেখ মন কি কাজ কথায় ॥ ২ ॥
গঙ্গার অপর কূলে কোন্নগর গ্রাম ।
ভক্তিমন্ত সম্ভ্রান্ত লোকের বাসস্থান ॥ ৩ ॥
বার বার আগমন হয় সেই গ্রামে ।
গেলে পরে অগণন লোকজন জমে ॥ ৪ ॥
বলিয়াছি শ্রীবচন কিবা রসে ভরা ।
শুনিলে পরমানন্দে করে মাতোয়ারা ॥ ৫ ॥
মহানন্দে মত্ত হ'য়ে পিয়ে বাক্যরস ।
দেহ বহির্গত মন শরীর অবশ ॥ ৬ ॥
কৃপাবলে একবার পেলে আস্বাদন ।
মরিলেও দেহ-অস্তে নহে বিস্মরণ ॥ ৭ ॥
একদিন শ্রীপ্রভুর আগমন গ্রামে ।
দীনবন্ধু ন্যায়রত্ন আসে কথা শুনে ॥ ৮ ॥
ন্যায়শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ব্রাহ্মণসন্তান ।
অন্তরেতে পরিপূর্ণ বিদ্যা-অভিমান ॥ ৯ ॥
ব্রাহ্মণ বড়ই করে গরিমা বিস্তার ।
যেথা বাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু অবতার ॥ ১০ ॥
দীনহীনাচারে পূর্ণ ধূলার সমান ।
যে বা চায় তায় হয় সেই বস্তু দান ॥ ১১ ॥
অহঙ্কারে
মহাভারি ব্রাহ্মণ কুমার ।
দেখা মাত্র অগ্রে প্রভু কৈলা নমস্কার ॥ ১২ ॥
প্রতিনমস্কার না করিয়া দ্বিজবর ।
উপবিষ্ট হইলেন প্রভুর গোচর ॥ ১৩ ॥
কহে দ্বিজ দম্ভভাবে নাহি জ্ঞানলেশ ।
আপনি কি ব্রাহ্মণের প্রণম্য বিশেষ ॥ ১৪ ॥
অর্থাৎ যদিও জন্ম ব্রাহ্মণের কুলে ।
হইয়াছে ভ্রষ্টাচার যজ্ঞসূত্র ফেলে ॥ ১৫ ॥
ব্রাহ্মণ করিলে পরে পৈতা পরিহার ।
ব্রাহ্মণের জাতি শক্তি নাহি থাকে আর ॥ ১৬ ॥
সাধন-ভজনে যবে বাহ্যজ্ঞানহারা ।
ক্ষুধা-তৃষ্ণা-বিবর্জিত অঙ্গে নাহি সাড়া ॥ ১৭ ॥
ঘন ঘন সমাধিস্থ সতত গোঁসাই ।
তখন হইতে তাঁর যজ্ঞসূত্র নাই ॥ ১৮ ॥
কবে কোথা যায় প'ড়ে প্রভু নাই জানে ।
আছে কি না আছে পৈতা কিছু নাই মনে ॥ ১৯ ॥
অঙ্গে নাই যজ্ঞসূত্র হৃদয় দেখিলে ।
নূতন নূতন পৈতা পরাইত গলে ॥ ২০ ॥
অদ্যাপি জীবিত আছে ভাগিনা হৃদয় ।
এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিলে এইমত কয় ॥ ২১ ॥
বাহ্যহীনহেতু সূত্র কভু যেত প'ড়ে ।
কখন দিতেন তিনি আপনিই ছেড়ে ॥ ২২ ॥
নিজে কেন ছাড়িতেন তাহার কারণ ।
অবস্থা বিশেষে হ'ত অসহ্য বন্ধন ॥ ২৩ ॥
বিদ্যামদে অভিমানী সুকর্কশ ভাষা ।
করিলেন দ্বিজবর প্রভুরে জিজ্ঞাসা ॥ ২৪ ॥
আমার প্রণম্য কি না বটেন আপনি ।
দীনভাবে উত্তরিলা প্রভু গুণমণি ॥ ২৫ ॥
আমি সকলের বাস এই বোধগম্য ।
মম শ্রেষ্ঠ সকলেই আমার প্রণম্য ॥ ২৬ ॥
নিম্নতর কোন কিছু নাই ত্রিভুবনে ।
আমি নিম্ন সকলের এই জ্ঞান মনে ॥ ২৭ ॥
ফাঁকি সুকৌশল দ্বিজ কহে আর বার ।
উত্তর এ নহে ঠিক প্রশ্নের আমার ॥ ২৮ ॥
আমি যজ্ঞসূত্রযুক্ত আপনার নাই ।
আমার প্রণম্য কিনা সেহেতু সুধাই ॥ ২৯ ॥
সন্ন্যাস-আশ্রম যাঁরা করেন গ্রহণ ।
সূত্রত্যাগ তাঁহাদের ব্যবস্থা নিয়ম ॥ ৩০ ॥
সন্ন্যাসীর যজ্ঞসূত্র যদি নাই গলে ।
সবার প্রণম্য তবু শাস্ত্রে হেন বলে ॥ ৩১ ॥
আপনি কি লয়েছেন সন্ন্যাস-আচার ।
হীনতমভাবে প্রভু করিলা স্বীকার ॥ ৩২ ॥
মূল ছেড়ে শাস্ত্রপাঠে কিবা ফলে ফল ।
সমুদ্রমন্থনে পায় অসুরে গরল ॥ ৩৩ ॥
শাস্ত্রপাঠে দম্ভ জুটে ঘটা করে ভারি ।
নামে কয় ন্যায়রত্ন কাজে কানাকড়ি ॥ ৩৪ ॥
ন্যায়পাঠী দ্বিজবর নারিল বুঝিতে ।
হেন দ্বীনতার ভাব বহে কার চিতে ॥ ৩৫ ॥
এ ভাবের অণুকণা ভুবনে বিরল ।
এ দীনতা দীননাথে সম্ভব কেবল ॥ ৩৬ ॥
জর জর দীননাথ অনাথের হরি ।
শাস্ত্র করি করিয়াছ বড় কারিগরি ॥ ৩৭ ॥
নমস্কার শাস্ত্রপাঠে শাস্ত্র-আলোচনা ।
তৃণকুটিরাশি শাস্ত্র মাত্র বিড়ম্বনা ॥ ৩৮ ॥
কি চক্রে হে চক্রপাণি গড়িয়াছ শাস্ত্র ।
শাস্ত্র প'ড়ে আনে ঘরে কেবল অনর্থ ॥ ৩৯ ॥
নাই জানি মূল কাজে কি সহায় করে ।
কোথার খুলিবে পেঁচ আরও এঁটে ধরে ॥ ৪০ ॥
দেখ ফল হলাহল লাগে ভেবাচেকা ।
কে বলে সুমূর্খতর তসরের পোকা ॥ ৪১ ॥
দিব্যভাবশূন্যুহৃদে পূর্ণ অহঙ্কার ।
অভক্তলক্ষণ যত অভক্ত আচার ॥ ৪২ ॥
দাম্ভিক পুরুষকার ছায় প্রতিপত্তি ।
গণ্যমান্য জনমাঝে অসার সম্পত্তি ॥ ৪৩ ॥
সযতনে শাস্ত্রপাঠে এই হয় সার ।
বিষম কণ্টক হরিভক্তির সেবার ॥ ৪৪ ॥
সর্বশাস্ত্র-পাঠে হয় দোষ-আরোপণ ।
উদ্দেশ্য না হয় যদি তত্ত্ব-অন্বেষণ ॥ ৪৫ ॥
এ বিষয়ে শ্রীপ্রভুর শ্রীবদনে শুনা ।
বৈরাগ্যবিহীনে শাস্ত্রপাঠের উপমা ॥ ৪৬ ॥
শকুনী গৃধিনী পাখী যেন কর মনে ।
কত উচ্চ দূরে উড়ে সুনীল গগনে ॥ ৪৭ ॥
পাইত দেবেশপুরী উদ্দেশ্য থাকিলে ।
যত ঊর্ধ্বে থাকে তার কিছু ঊর্ধ্বে গেলে ॥ ৪৮ ॥
কিন্তু নাহি রহে লক্ষ্য স্বর্গের উপরে ।
আঁখি তথা যেথা আছে পচা কায়া প'ড়ে ॥ ৪৯ ॥
সেইমত শাস্ত্রপাঠী বহু শাস্ত্র পড়ে ।
হীন হেয় ধন-মান-উপার্জন তরে ॥ ৫০ ॥
আর যেবা পড়ে শাস্ত্র তত্ত্বের আশায় ।
জ্ঞান ভক্তি অনুরাগ পাতা ঘেঁটে পায় ॥ ৫১ ॥
ভগবৎপাদপদ্মলুব্ধ যেই জন ।
সেই শাস্ত্রপাঠে পায় শ্রীগুরুচরণ ॥ ৫২ ॥
প্রভেদ উদ্দেশ্যে মাত্র শাস্ত্রে কিছু নাই ।
কেহ পায় নিধিরত্ব কেহ পায় ছাই ॥ ৫৩ ॥
বিশেষিয়া বিবরণ বলিতে হইলে ।
সেই মাত্র সৎকর্ম গুরু যার মূলে ॥ ৫৪ ॥
যে জন শ্রীগুরুপদ-অন্বেষণ তরে ।
সৎশাস্ত্রপাঠ কর্ম পথরূপে হরে ॥ ৫৫ ॥
তাঁর পাঠ তাঁর কর্ম সতেতে গণনা ।
শুরু ছেড়ে শাস্ত্র পড়া মাত্র বিড়ম্বনা ॥ ৫৬ ॥
অভিমানী ন্যায়রত্ব শাস্ত্র করি পাঠ ।
বসায়েছে হৃদিমাঝে অবিদ্যার হাট ॥ ৫৭ ॥
বিদ্যায় কি আছে কাজ বিস্তায় কি করে ।
যে বিদ্যায় বিদ্যা যিনি তাঁরে রাখে দূরে ॥ ৫৮ ॥
কামিনীকাঞ্চনপূর্ণ অবিদ্যা-আপণে ।
ধন জন মান খ্যাতি অহঙ্কার ভানে ॥ ৫৯ ॥
বিজ্ঞা-অভিমানে মত্ততর অতিশয় ।
এবে ধরাধামে নরনারীর হৃদয় ॥ ৬০ ॥
শ্রীপ্রভু দেখিয়া এবে সময়ের গতি ।
হইলেন নিরক্ষর হয়ে বিদ্যাপতি ॥ ৬১ ॥
দীনহীনাচার হয়ে শক্তির আধার ।
জীবশিক্ষা-হেতু, হেতু নহে অন্য আর ॥ ৬২ ॥
বুদ্ধিনাশী মহে হেন মদ বর্তমান ।
ভীষে নাহি ছাড়ে তারে যতক্ষণ প্রাণ ॥ ৬৩ ॥
এখন সময় নয় প্রলয়ের কাল ।
ব্রহ্মগত শক্তি ঘুচে সৃষ্টির জঞ্জাল ॥ ৬৪ ॥
লীলা-হেতু অবতীর্ণ ধরি কলেবর ।
পূর্ণব্রহ্ম প্রভুদেব দয়ার সাগর ॥ ৬৫ ॥
শ্রীপ্রভু অদ্ভুত লীলা করিলা জাহির ।
নিজে দুয়ে দুয়াইলা মদমত্ত শির ॥ ৬৬ ॥
সন্ন্যাস-আচার কি না ন্যায়রত্ন যবে ।
ফাঁকি ধরি জিজ্ঞাসা করিল প্রভুদেবে ॥ ৬৭ ॥
হেন দীনতমভাবে প্রভু দিলা সায় ।
সন্ন্যাসিভাবের অহং-গন্ধ নাহি তায় ॥ ৬৮ ॥
আমি ভক্ত আমি ত্যাগী যোগতপাচারী ।
এ ভাব অন্তরে যার সেই অহংকারী ॥ ৬৯ ॥
বিষম মদের ফল ফল যেন বিষে ।
অহংকার অভিমানে ত্যাগ ভক্তি নাশে ॥ ৭০ ॥
কি কঠিন মদত্যাগ মদনত মন ।
কেমনে কহিব তোরে কি আছে বচন ॥ ৭১ ॥
লোহার কাঠিন্য কিবা থাকে দেখ তার ।
আগুনে গলিলে পরে সলিলের প্রায় ॥ ৭২ ॥
নাহি থাকে আপন স্বভাব ধর্ম-রীতি ।
তেন মন্ত্রহীনে হয় ত্যাগীর প্রকৃতি ॥ ৭৩ ॥
গুরুর কৃপায় পেলে ইহার আভাস ।
তথাপিহ তাহে থাকে আমিত্বের বাস ॥ ৭৪ ॥
শূন্যঘৃতকুম্ভবৎ যেন উপমায় ।
আগুনে পুড়িলে তবু গন্ধ নাহি যায় ॥ ৭৫ ॥
শ্রীপ্রভুর স্থিতি কোথা ভাব কি রকম ।
নরশিরে কখন না হয় নিরূপণ ॥ ৭৬ ॥
গন্ধাদি বর্জিত ভাব বুঝা মহাদায় ।
যে ভাগ সর্বদা বহে শ্রীপ্রভুর গায় ॥ ৭৭ ॥
না যোগার বাক্যে দিতে আভাস তাহার ।
যে ভাবে সন্ন্যাসী প্রভু করিলা স্বীকার ॥ ৭৮ ॥
যাহার আভাসে ন্যায়রত্ন ভাগ্যবান ।
নুয়ায়ে উন্নত শির করিল প্রণাম ॥ ৭৯ ॥
প্রভুদেবে একবার প্রণামে কি কলে ।
অবশ্য পাইবে বার্তা চরিত শুনিলে ॥ ৮০ ॥
দেখিয়া অনন্যমন যত লোকজন ।
হিত-উপদেশ-উক্তি বিবিধ রকম ॥ ৮১ ॥
নানা রঙ্গরসে ভরা প্রচুর প্রচুর ।
সরল উপমাসহ শ্রুতিসুমধুর ॥ ৮২ ॥
কহিতে লাগিলা প্রভু হেন মিষ্ট ভাষে ।
দুর্বোধ্য যদিও মুর্খে বুঝে অনায়াসে ॥ ৮৩ ॥
শ্রীপ্রভুর দীনভাব দীনতম রীতি ।
উন্নত হইয়া এত সহজ প্রকৃতি ॥ ৮৪ ॥
উচ্চতম জ্ঞানতত্ত্ব সরল ভাষায় ।
বর্ণিবার মহাশক্তি যুক্ত রসনায় ॥ ৮৫ ॥
দেখিয়া শুনিয়া পায় গড়াইয়া পড়ে ।
আছিল একত্র যত সভার ভিতরে ॥ ৮৬ ॥
শ্রবণমঙ্গল শুন প্রভুর প্রচার ।
ফুটিবে চৈতন্য যাবে অজ্ঞান-আঁধার ॥ ৮৭ ॥
পাইবে শ্রীপ্রভুদেবে ধ্রুব কর্ণধার ।
অপার সংসারার্ণবে যাহে হবে পার ॥ ৮৮ ॥