চতুর্থ খণ্ড
ভক্তসঙ্গে খেলা
জয়
জয়
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
নরাকারে বদ্ধজীব নামে জানা যারা ।
অতি হতভাগ্য প্রাণী রতি মতি হারা ॥ ১ ॥
পাশজালে বিজড়িত নাহিক নিস্তার ।
নিকটে ধীবর কাল করিতে সংহার ॥ ২ ॥
ভীষণ নরককুণ্ডে পরিণামে ঠাঁই ।
কারাদণ্ড দীর্ঘকাল যুগে আঁটে নাই ॥ ৩ ॥
জগৎ-গোসাঁই মোর করুণাসাগর ।
উদ্ধারিতে হেন জীবে ধরি কলেবর ॥ ৪ ॥
লয়ে রামকৃষ্ণ নাম হই অবতরি ।
কেমনে হইলা কূলহীনের কাণ্ডারী ॥ ৫ ॥
বিচিত্র মহিমাকথা শুনে তাপ হরে ।
এক মনে শুন মন ভক্তি সহকারে ॥ ৬ ॥
ভক্তসংজোটন কাণ্ডে দেখহ প্রমাণ ।
পতিতপাবন বেশে রামকৃষ্ণ নাম ॥ ৭ ॥
ছুটিতেছে যত ভক্ত শ্রীপ্রভুর স্থানে ।
একমাত্র হেতু নাম-মাহাত্ম্যের গুণে ॥ ৮ ॥
একবার শ্রবণে পশিলে পরে নাম ।
আপাদ মস্তকে জোরে ধরে এক টান ॥ ৯ ॥
অচল অপেক্ষা শুরু তনু অভিমানে ।
ভাষায় তাহায় যেন তৃণের তুফানে ॥ ১০ ॥
আহার-বিরাম নাই চলে নিরন্তর ।
করুণানিধান যথা প্রেমের সাগর ॥ ১১ ॥
নামে ভক্ত জুটাইয়া প্রভু গুণধাম ।
জীবের উদ্ধারে দিলা রামকৃষ্ণনাম ॥ ১২ ॥
চারি বর্ণ চারি বেদ নামের শরণ ।
লইলে অচিরে হয় তম-বিমোচন ॥ ১৩ ॥
আত্মজ্ঞান সমন্বিত চৈতন্য-সঞ্চার ।
জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষ নাহিক বিচার ॥ ১৪ ॥
সাধ-পথে মিলে নাম কড়ি নাহি লাগে ।
বারেক লইয়া দেখ ভক্তি অনুরাগে ॥ ১৫ ॥
প্রভু-অবতারে নব খেলিবার রীতি ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন প্রেমের মূরতি ॥ ১৬ ॥
ভাঙ্গা গড়া কোন ধর্মে কিছু না করিয়া ।
নূতন করিলা খেলা সব সংরক্ষিয়া ॥ ১৭ ॥
ধর্মে ধর্মে বিবাদ-বিদ্বেষ চিরকাল ।
মিটিল প্রভুর প্রেমে সে সব জঞ্জাল ॥ ১৮ ॥
বিশ্বব্যাপী শ্রীপ্রভুর প্রেমের জোয়ারে ।
ভাসিল সকলে কলি ডুবিল পাথারে ॥ ১৯ ॥
নানা জাতি নানা ধর্মে একত্রে মিলন ।
প্রেমে করিলেন প্রভু তাহার পত্তন ॥ ২০ ॥
ভেদাভেদ জাতি-ধর্মে উত্তম-অধমে ।
পুরুষে স্ত্রীলোকে কিবা চণ্ডালে ব্রাহ্মণে ॥ ২১ ॥
ধনাঢ্যে নির্ধনে কিবা ধীরে নিরক্ষরে ।
ধার্মিকাধার্মিকে কিবা ব্যাধে তপাচারে ॥ ২২ ॥
দূরীভূত এইবারে প্রেমে শ্রীপ্রভুর ।
একা কারও নন তিনি সবার ঠাকুর ॥ ২৩ ॥
গগনের চাঁদা মামা সবে পায় আলো ।
কাহারও নহেন মন্দ সকলের ভাল ॥ ২৪ ॥
সব ধর্মে সব মতে সাধনা করিয়া ।
ধর্মমাত্রে সত্য প্রভু দিলা দেখাইয়া ॥ ২৫ ॥
প্রভুর নিকটে ধর্ম সকল সমান ।
সকল ধর্মের মতে তাঁর অধিষ্ঠান ॥ ২৬ ॥
যত ধর্ম দেহ তাঁর ভাব যত রূপ ।
সকলের মধ্যে তিনি প্রাণের স্বরূপ ॥ ২৭ ॥
রামকৃষ্ণ-পন্থা যাহা সমষ্টি সহার ।
সকল জাতির তাহে সম অধিকার ॥ ২৮ ॥
এই ঠাঁই সকলের করি সম্মিলন ।
হইল প্রভুর নাম বিবাদ-ভঞ্জন ॥ ২৯ ॥
রামকৃষ্ণ পূজার সেবায় আরাধনে ।
অধিকারী আপামর চণ্ডাল ব্রাহ্মণে ॥ ৩০ ॥
ঘটে কিবা পটে করি প্রভুর স্থাপনা ।
ভক্তি-সহকারে যে করিবে আরাধনা ॥ ৩১ ॥
যথাসাধ্য ভোজ্য যদি ভাল নাহি জুটে ।
ধরিলে সম্মুখে খুদ তাও তাঁর মিঠে ॥ ৩২ ॥
চন্দনে মাখিয়া ফুল হোক যে রকম ।
যে দিবে অঞ্জলি পায় করিয়া যতন ॥ ৩৩ ॥
যদি নাহি রহে মন্ত্র ছন্দে বাঁধা স্তুতি ।
নাহি হয় অঙ্গহীন নাহি কোন ক্ষতি ॥ ৩৪ ॥
স্ত্রীলোক পুরুষ হোক্ যেন অবস্থার ।
যবন ম্লেচ্ছ কি হিন্দু নাহিক বিচার ॥ ৩৫ ॥
শুচি কি অশুচি হোক অবস্থা-বিশেষে ।
পুজায় সেবায় দোষ নাহি হয় কিসে ॥ ৩৬ ॥
সমভাবে অধিকারী হয় সর্বজনা ।
রজস্বলা স্ত্রীলোকের তিন দিন মানা ॥ ৩৭ ॥
দীনের ঠাকুর প্রভু পতিত-পাবন ।
ত্রুটি-দোষ নাহি সাধ্য যাহার যেমন ॥ ৩৮ ॥
এ সবে
অক্ষম যেবা শরীরে দুর্বল ।
নাম লয়ে ফেরে যদি দুনয়নে জল ॥ ৩৯ ॥
তখনি হইবে ধন্য তিল নহে দেরি ।
দীনবন্ধু প্রভুদেব দীনের কাণ্ডারী ॥ ৪০ ॥
অধিকারী পূজায় সেবায় করিবারে ।
অগণ্য উপায় দিলা জীবের উদ্ধারে ॥ ৪১ ॥
ভক্তিসহকারে লয়ে নামের শরণ ।
যে পথে যে কাজে যেবা করিবে গমন ॥ ৪২ ॥
সেই পথ সেই কাজ পন্থা সেবা তাঁর ।
সহজ এতই পথ প্রভু ভজিবার ॥ ৪৩ ॥
দয়াময় রামকৃষ্ণ নামের প্রতাপে ।
পাপপুরে বাস তবু না ছুঁইবে পাপে ॥ ৪৪ ॥
লইলে শরণ পদে শ্রীপ্রভুর রীতি ।
শরণাপন্নের হন তখনই সারথি ॥ ৪৫ ॥
ইন্দ্রিয়াদিমত্ত অশ্ব মুখের লাগাম ।
শ্রীকরে ধরিয়া রথ শরীর চালান ॥ ৪৬ ॥
জীবে না
জানিতে পারে কোথা যায় রখ ।
কিন্তু যেই পথ যায় সেই তার পথ ॥ ৪৭ ॥
অবিদ্যা-প্রবল কাল জীব পাপমতি ।
সরলে লইলে নাম অবহেলে গতি ॥ ৪৮ ॥
জগৎ ভাসান প্রেমে প্রভু অবতার ।
সকলে পাইবে প্রেম রূপায় তাঁহার ॥ ৪৯ ॥
আজ নহে কাল নয় দুই দিন পরে ।
লইবে সকলে নাম শ্রীনামের জোরে ॥ ৫০ ॥
ভক্তিভাবে আরাধিবে প্রভুরে আমার ।
রামকৃষ্ণ অবতারে সব একাকার ॥ ৫১ ॥
একাকার ভক্তিগত জাতিগত নয় ।
ধর্ম-পন্থা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সমন্বয় ॥ ৫২ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি মন ।
কোন পূজা শ্রীপ্রভুর মনের মতন ॥ ৫৩ ॥
কেমন ধরন কিবা প্রয়োজন তায় ।
সন্তুষ্ট যাহাতে প্রভু রামকৃষ্ণ রায় ॥ ৫৪ ॥
প্রতিষ্ঠা করিয়া তাঁরে হৃদয়ের মাঝে ।
বিবেক বিরাগ দ্বয় ঝাঁজ-ঘণ্টা বাজে ॥ ৫৫ ॥
বিশুদ্ধ জ্ঞানের বাতি মনের ভিতর ।
ধূপ-ধুনা আত্মসুখ জ্বলে নিরন্তর ॥ ৫৬ ॥
সৌরভ সুগন্ধ যদি মন্দিরে ছুটায় ।
অনুকূল অনুরাগ-ব্যজনের বায় ॥ ৫৭ ॥
দয়া ধর্ম দাক্ষিণ্যাদি সদগুণ অতুল ।
চরণযুগলে হয় অঞ্জলির ফুল ॥ ৫৮ ॥
মাখামাখি ভক্তিরসে চন্দনের প্রায় ।
ঘন ক্ষীর-প্রেম যদি নৈবেদ্য থালায় ॥ ৫৯ ॥
স্তুতি মন্ত্র চারিবর্ণ রামকৃষ্ণ নাম ।
কায়মনোবাক্যে যদি রটে অবিরাম ॥ ৬০ ॥
দীনদুঃখী সুবিনীত ধরিয়া প্রকৃতি ।
যেই পথে প্রভুদেব অখিলের পতি ॥ ৬১ ॥
জীবের শিক্ষার হেতু হৈলা আগুসার ।
সে পথে গমন হয় উচ্চ পূজা তাঁর ॥ ৬২ ॥
গুরুহারা কাল এবে ঘোর অন্ধকার ।
সকলে কাঙ্গালী ধন-জন-প্রতিষ্ঠার ॥ ৬৩ ॥
বলিতেন দয়ানিধি মানুষনিকর ।
ঘোর তমাচ্ছন্ন কূপে ডুবে নিরন্তর ॥ ৬৪ ॥
কামিনী-কাঞ্চনে মন মুগ্ধ একেবারে ।
কি গুরু কি হেতু গুরু বোধ নাহি শিরে ॥ ৬৫ ॥
হইল না ধন পুত্র বিষাদে ইহার ।
ঘটি ঘটি আঁখি-বারি ফেলে বার বার ॥ ৬৬ ॥
কিন্তু পরা-সখা গুরু বিপদের বন্ধু ।
তাঁহার অভাবে নাহি করে এক বিন্দু ॥ ৬৭ ॥
শখের
সাজান ধরা মনোহর স্থান ।
গুরুভক্তিহীনে যেন শ্মশান সমান ॥ ৬৮ ॥
লীলা-প্রিয় ভগবান পতিত ভরসা ।
একশেষ ধরণীর দেখিয়া দুর্দশা ॥ ৬৯ ॥
নর-দেহ ধরি আসা দ্রবিয়া দয়ায় ।
জীবে দিতে গুরু-তত্ত্ব ত্রাণের উপায় ॥ ৭০ ॥
শীলা-নিধি মথিয়া করহ প্রণিধান ।
বিশ্ব-গুরু-বেশে এবে প্রভু ভগবান ॥ ৭১ ॥
সার্বভৌম ভাব-কান্তি অঙ্গে করে খেলা ।
নিবারিতে ধর্মে ধর্মে বিবাদের জ্বালা ॥ ৭২ ॥
সার্বভৌম ভাবে হয় সব একাকার ।
ভবের হাটেতে খুলে প্রেমের বাজার ॥ ৭৩ ॥
জগৎ ডুবান এই ভাব সুবিশাল ।
বিধি বিষ্ণু মহেশ যা না পায় নাগাল ॥ ৭৪ ॥
রামে কি রমেশে কিবা দয়াল গোরায় ।
তেজপুঞ্জ কলেবর ঈশা কি মুশায় ॥ ৭৫ ॥
কভু না ফুটিল যাহা অবতারকালে ।
এবে প্রভু রামকৃষ্ণে পূর্ণভাবে খেলে ॥ ৭৬ ॥
কোন্ অবতারে ভাব এমন সুন্দর ।
সর্ব ধর্মে সব মতে সমান আদর ॥ ৭৭ ॥
রামে শ্যামে জ্যাকে জনে রহিমে খলিলে ।
সমান যতনে সমভাবে এক কোলে ॥ ৭৮ ॥
এই সার্বভৌম ভাব ভাবের বারতা ।
নানা ফুলে ফুল-হার এক সূত্রে গাঁথা ॥ ৭৯ ॥
দ্বেষ-হিংসা দ্বন্দ্ব-হীন প্রাণের আরাম ।
এই বিশ্বজনীন ধরম যার নাম ॥ ৮০ ॥
এই বিশ্বব্যাপী ভাব শিক্ষা দিতে জীবে ।
বিশ্বগুরু বিনা অন্যে কভু না সম্ভবে ॥ ৮১ ॥
কার সাধ্য দেখাইতে পারে এই পট ।
সুশীতল বটচ্ছায়া দেয় একা বট ॥ ৮২ ॥
সুবিশাল সার্বভৌম শ্রীপ্রভুর মত ।
নিশ্চয় অবশ্য কালে হবে বলবৎ ॥ ৮৩ ॥
কলির কলুষ তম ধ্রুব হবে দূর ।
জীবে পাবে গুরু-তত্ত্ব কৃপায় প্রভুর ॥ ৮৪ ॥
তাহার অমর বীজ করিতে রোপণ ।
রামকৃষ্ণ-অবতার বিবাদ-ভঞ্জন ॥ ৮৫ ॥
আস্বাদ পাইয়া পরে সে তত্ত্বের তার ।
গুরুত্বে বরিবে সব প্রভুরে আমার ॥ ৮৬ ॥
জীবের ভরসা আশা প্রভু ভগবান ।
শ্রীবচনে শুন মন তাহার প্রমাণ ॥ ৮৭ ॥
ভাবাবেশে বলিতেন অখিলের রাজা ।
ক্রমে পরে ঘরে ঘরে হবে মোর পূজা ॥ ৮৮ ॥
অকাট্য প্রভুর বাক্য মহাশক্তিমান ।
পশ্চাতে ফুটিয়া হবে ছবি মূর্তিমান ॥ ৮৯ ॥
স্রোত আছে তাই নদী স্রোতস্বিনী নাম ।
বরষায় বেগে ভরা সিন্ধু-মুখে টান ॥ ৯০ ॥
অদ্ভূল পাখার সিদ্ধ অপার সলিলে ।
যত আসে দেয় স্থান আপনার কোলে ॥ ৯১ ॥
অটল অচল ভাবে নাহি হেমাদোলা ।
ধরণীর ভসে যেন প্রকৃতির মেলা ॥ ৯২ ॥
কিন্তু শ্রীপ্রভুর ভাবে হবে এত টান ।
জলধিত নাহি পাবে তাহাতে এড়ান ॥ ৯৩ ॥
গোউরের লীলা নহে খেলা নদীয়ায় ।
জোর ডুবে শান্তিপুর নদে ভেসে যায় ॥ ৯৪ ॥
বঙ্গ থেকে নীলাচলে কিছু কিছু টান ।
এইবারে অবতার প্রভু ভগবান ॥ ৯৫ ॥
প্রবল তুফানবেগ প্রলয়ের পারা ।
উলটপালট খাবে সসাগরা ধরা ॥ ৯৬ ॥
নিরক্ষর বেশে আসা তাহার কারণ ।
বিদ্যার করিতে গর্ব খর্ব বিলক্ষণ ॥ ৯৭ ॥
বিজ্ঞানিধি বিদ্যার সাগর যে যেখানে ।
হইবে শরণাপন্ন প্রভুর চরণে ॥ ৯৮ ॥
শ্রীপ্রভুর মহিমার পাইয়া আস্বাদ ।
ঘুচিবে বিদ্যার মদ অবিদ্যার গাদ ॥ ৯৯ ॥
জগৎ-ভাসান তাঁর প্রেমের প্রভাবে ।
ধর্মে ধর্মে রেষ হিংসা সকল ঘুচিবে ॥ ১০০ ॥
জেতা-জিতে দোঁহে মিলে এক গৃহে বাস ।
পরস্পর প্রণয়েতে প্রেমের সম্ভাষ ॥ ১০১ ॥
বাঘেতে বলদে খাবে এক ঘাটে জল ।
সাগরান্ত দেশ হবে স্বদেশ অঞ্চল ॥ ১০২ ॥
এই যে প্রেমের ভাব কল্পনার পার ।
জীবের বুদ্ধিতে কিসে হইবে সঞ্চার ॥ ১০৩ ॥
তত্ত্বান্বেশী শ্রীকেশর ব্রাহ্ম মতিমান ।
তাঁহার চরণে করি অসংখ্য প্রণাম ॥ ১০৪ ॥
প্রিয়জন শ্রীপ্রভুর তাহার কৃপায় ।
লীলা তত্ত্বাভাস মাত্র দেখিবারে পায় ॥ ১০৫ ॥
কতটুকু দরশন তাহার উপমা ।
অরুণ-উদয়ে যেন সূর্যোদয় জানা ॥ ১০৬ ॥
আভাসেই মত্তচিত্তে কেশব সজ্জন ।
ভিতরে প্রবেশ নাহি করি বিলক্ষণ ॥ ১০৭ ॥
নূতন ধর্মের এক শরীর নির্মাণ ।
সাজাইয়া দিল নববিধানের নাম ॥ ১০৮ ॥
যে ধর্মের যেই অংশ তাঁর মনোমত ।
পূজিতে ধর্মেতে তাহা কৈল সংযোজিত ॥ ১০৯ ॥
কেমন নূতন ধর্ম কেশবের গড়া ।
ঠিক যেন বিবিধ কুসুমে বাঁধা তোড়া ॥ ১১০ ॥
নববিধানের কথা তোড়া তুলনায় ।
সকল ধর্মের কিছু কিছু আছে তায় ॥ ১১১ ॥
মহাভাব শ্রীগৌরাঙ্গের প্রেমসমন্বিত ।
কৃষ্ণের প্রকট জ্ঞান গীতায় কথিত ॥ ১১২ ॥
সহিষ্ণুতা ক্রাইষ্টের নির্ভরতা বল ।
অপার করুণারাজি ভাব সমুজ্জ্বল ॥ ১১৩ ॥
বাল্যভাব শ্রীপ্রভুর পরা যত্নে রাখা ।
সন্তানের সমতুল্য মা বলিয়া ডাকা ॥ ১১৪ ॥
অন্য অন্য স্থানে যাহা বুঝিল সুন্দর ।
লইল তাহার কিছু করিয়া আদর ॥ ১১৫ ॥
আগাগোড়া দিয়া বাদ কণাংশ লইয়া ।
নববিধানের দেহ দিল সাজাইয়া ॥ ১১৬ ॥
নামে মাত্র দেহ চক্ষে দেখা নাহি ঘটে ।
আকাশকুসুমসম বস্তু নাই মোটে ॥ ১১৭ ॥
যথাশক্তি বুঝি ধর্ম বলিতে হইলে ।
নববিধানের গাছে ফল নাহি ফলে ॥ ১১৮ ॥
ফল ফলা অসম্ভব স্পষ্ট দেখা যায় ।
তোড়াতে ফুলের খেলা গাছ কোথা তায় ॥ ১১৯ ॥
পরম সুন্দর তোড়া দেখায় সম্প্রতি ।
মলিন কুসুম দল পোহাইলে রাতি ॥ ১২০ ॥
কল্পনাতে ঝুলে ধর্ম ধর্ম কল্পনার ।
বিশেষ বলিতে নহে মম অধিকার ॥ ১২১ ॥
অভিনয়ে নব ধর্ম প্রচারের শখ ।
নববৃন্দাবন নামে রচিল নাটক ॥ ১২২ ॥
এ সময়ে একদিন প্রভুর সহিত ।
প্রভু-প্রিয় শ্রীকেশব হইল মিলিত ॥ ১২৩ ॥
বদনে আনন্দছটা অন্তরে যেমন ।
কেশবে কহেন প্রভু বিবাদ-ভঞ্জন ॥ ১২৪ ॥
আসিয়াছে মম পাশে এক মতিমান ।
শৌর্যে বীর্যে পরাক্রমে কেশরী সমান ॥ ১২৫ ॥
বিবেকী বিরাগী ত্যাগী জ্ঞানের মূরতি ।
বিশাল আধারে ধরে অপার শকতি ॥ ১২৬ ॥
সমুজ্জ্বল আঁখি-ভাতি তাহার প্রমাণ ।
নয়ন-পিরীতি অতি প্রভুর বয়ান ॥ ১২৭ ॥
নরেন্দ্র তাহার নাম বসতি শহরে ।
একদিন দেখাইব নিশ্চয় তোমারে ॥ ১২৮ ॥
একটি তোমার শক্তি প্রভাবে যাহার ।
স্বদেশে বিদেশে এত প্রশংসা-প্রচার ॥ ১২৯ ॥
ধনী মানী গুণী মধ্যে উপার্জিলে যশ ।
নরন্দ্রের হেন শক্তি আছে অষ্টাদশ ॥ ১৩০ ॥
বালক এমন শক্তি অন্তরে নিহিত ।
সময়ে সকলগুলি হবে বিকশিত ॥ ১৩১ ॥
ধরণী ধরিয়া দিলে এক প্রান্তে নাড়া ।
কম্পিত অপর প্রান্ত সবে পাবে সাড়া ॥ ১৩২ ॥
সুন্দর সুশ্রাব্য সুর কণ্ঠের দুয়ারে ।
গুনিলে শ্রবণ মুগ্ধ মন-প্রাণ হরে ॥ ১৩৩ ॥
সমাজ মন্দিরে তব প্রার্থনার স্থানে ।
লইয়া রাখিলে পাবে পরানন্দ প্রাণে ॥ ১৩৪ ॥
যথা আজ্ঞা শ্রীপ্রভুর করি শিরোধার্য ।
নরেন্দ্রে লইয়া যান কেশব আচার্য ॥ ১৩৫ ॥
মধুর সঙ্গীতে হয় মুগ্ধ যত জন ।
ব্রাহ্মদের সঙ্গে খুব হইল মিলন ॥ ১৩৬ ॥
এখন প্রভুর কাছে শুনহ কাহিনী ।
দিবারাতি হয় বহু লোকের মেলানি ॥ ১৩৭ ॥
বিশেষতঃ রবিবারে নহে গণনায় ।
ঈশ্বরীয় তত্ব-কথা শুনিবারে যায় ॥ ১৩৮ ॥
প্রভুর মহিমা-কথা না যায় বর্ণন ।
করেন বিবিধ খেলা লয়ে লোকজন ॥ ১৩৯ ॥
জ্ঞানভক্তিপূর্ণ উক্তি হিত-উপদেশ ।
প্রমত্ত হইয়া কন প্রভু পরমেশ ॥ ১৪০ ॥
যে কথা
শুনিতে যার ইচ্ছা হয় ঘটে ।
শ্রীবদনে আপনিই সেই কথা ফুটে ॥ ১৪১ ॥
জিজ্ঞাসা করিতে
কারে কখন না হয় ।
মহাসুখে শুনে লোকে হইয়া বিস্ময় ॥ ১৪২ ॥
নানান শ্রেণীর লোক নানা
ভাব সহ ।
সকলেই পায় প্রীতি বাদ নাহি কেহ ॥ ১৪৩ ॥
নানাভাবে নানাভাব করেন প্রকাশ ।
যাহাতে সকলে পায় অপার উল্লাস ॥ ১৪৪ ॥
কখন কাহারে আজ্ঞা গাইবারে গান ।
শুনিয়া
সমাধিগত প্রভু ভগবান ॥ ১৪৫ ॥
কখন গাহিয়া গীত শ্রীপ্রভু আপনি ।
মত্তভাবে নৃত্য হয়
কতই না জানি ॥ ১৪৬ ॥
কখন রহস্যকথা হয় হেন চোটে ।
যে শুনে হাসিয়া তার পেট যায় ফেটে ॥ ১৪৭ ॥
শ্রীপ্রভু এমন সুরসিক চূড়ামণি ।
নীরসে আসিত রস রস-ভাব শুনি ॥ ১৪৮ ॥
তত্বালাপে ভক্তে ভক্তে বাদ-প্রতিবাদ ।
কখন হইত তাঁর শুনিবার সাধ ॥ ১৪৯ ॥
দুইপক্ষে ঘোর তর্ক রুষিয়া গর্জিয়া ।
নিরপেক্ষ প্রভুদেব দেখেন বসিয়া ॥ ১৫০ ॥
মৃদুমন্দ অধরে সুহাসি সুশোভন ।
রঙ্গসহ উত্তেজনা যুদ্ধ হুতাশন ॥ ১৫১ ॥
কৃতবিদ্য সুপণ্ডিত ধীর যেন দেখে ।
জিজ্ঞাসা পড়ায় মত্ত পড়ুয়া বালকে ॥ ১৫২ ॥
শ্রীপদপ্রাপ্তির আশে যাহার গমন ।
ভাবাবেশে হয় তাঁর চরণ অর্পণ ॥ ১৫৩ ॥
কোন আশে আসা নয় হেন দেখা যায় ।
কেহ বা পাইল কৃপা প্রভুর কৃপায় ॥ ১৫৪ ॥
সকলে সুবিদিত পুরী রম্য স্থান ।
গঙ্গাকূলে বরাবর ফুলের বাগান ॥ ১৫৫ ॥
সুন্দর বাঁধান ঘাটে চাঁদনিয়া খাসা ।
শ্যামা-বাটী পঞ্চবটী আঁখির লালসা ॥ ১৫৬ ॥
গঙ্গাতটে হেন পুরী নাহি কোন স্থানে ।
শুনিলে নিশ্চয় সাধ হয় দরশনে ॥ ১৫৭ ॥
রবিবারে বিশেষতঃ ভ্রমণকারণ ।
নবীন যুবক কত করে আগমন ॥ ১৫৮ ॥
তার মধ্যে বিশেষ যুবক কোন জনে ।
শ্রীপ্রভু ডাকিয়া তারে যান সংগোপনে ॥ ১৫৯ ॥
শ্যামা যথা শ্রীমন্দিরে করেন বিহার ।
অবহেলে দেন খুলে ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১৬০ ॥
কি ভাবে কাহারে কৃপা করেন কখন ।
কি আছে শকতি করি নির্দেশ কারণ ॥ ১৬১ ॥
বালক-স্বভাব বটে শিশুবদাচার ।
কিন্তু মনে বহে পুরা জ্ঞানের জোয়ার ॥ ১৬২ ॥
ভোগা দিয়া লয় বস্তু কার সাধ্য নাই ।
শঠের উপরে শঠ শ্রীপ্রভু গোসাঁই ॥ ১৬৩ ॥
যেখানে সেখানে নহে কৃপা-বিতরণ ।
কাল পাত্র বুঝিবারে বুদ্ধি বিলক্ষণ ॥ ১৬৪ ॥
বলিতেন প্রভুদেব ভাবের আবেশে ।
শেষ জন্ম যার সে আসিবে মম পাশে ॥ ১৬৫ ॥
তবে যারে তারে কৃপা তাও আছে তাঁর ।
কখন কি যাতে প্রভু বুঝা অতি ভার ॥ ১৬৬ ॥
কখন দয়ার বেগে এত মত্ততর ।
দুনয়নে বারি-ধারা ঝরে নিরন্তর ॥ ১৬৭ ॥
অশান্তির একমাত্র কারণ কেবল ।
কেমনে হইবে কিসে জীবের মঙ্গল ॥ ১৬৮ ॥
কখন বেষ্টিত প্রভু ভকতের দলে ।
ভ্রাম্যমাণ গুণধাম জাহ্নবীর কূলে ॥ ১৬৯ ॥
পানসি-জাহাজ তরী যত জলযান ।
কলনাদী তটিনীর লহরী উজান ॥ ১৭০ ॥
বিভিন্ন অবস্থাগত তরঙ্গের মালা ।
অনুকূল প্রতিকূল বায়ুসনে খেলা ॥ ১৭১ ॥
অগাধ সলিলে মাছ শুশুক নিচয় ।
উঠে ডুবে করে রঙ্গ সময় সময় ॥ ১৭২ ॥
সুনীল গগন-বক্ষে জলদ-সঞ্চার ।
কেহ গিরি-রূপ কেহ শিখর-আকার ॥ ১৭৩ ॥
অপরূপ নানা রূপ করিয়া ধারণ ।
নিরাশ্রয়ে খ-এ করে রঙ্গে বিচরণ ॥ ১৭৪ ॥
প্রসবি বিবিধ বর্ণ রবি অন্তপ্রায় ।
প্রতিভাতে মেঘ-জালে সুবর্ণ ফলায় ॥ ১৭৫ ॥
ছটায় হারায় কান্তিযুক্ত রত্ন মণি ।
বর্ণহীন শূন্যাকাশ সুবর্ণের খনি ॥ ১৭৬ ॥
প্রতিবিম্ব তে সবার জাহ্নবীর জলে ।
সোনার তরঙ্গমালা খেলায় সলিলে ॥ ১৭৭ ॥
তটস্থিত হর্ম্যরাজি অন্তপ্রায় রবি ।
যতনে সাদরে গঙ্গা হৃদে ধরে ছবি ॥ ১৭৮ ॥
যথা প্রভু তিন ধারে কুসুমের বন ।
পত্রে ফুলে কলিকায় অতি সুশোভন ॥ ১৭৯ ॥
আঁধার-বসনা নিশি আগত দেখিয়া ।
অতুল কুসুমকুল উঠিল ফুটিয়া ॥ ১৮০ ॥
সৌরভ সুগন্ধ যত গন্ধবহ বয় ।
জুটে মতে যুথে যুথে মধুপনিচয় ॥ ১৮১ ॥
মধুপানে অলিগণে উন্মতের প্রায় ।
অবশে ঢলিয়া পড়ে কলিকার গায় ॥ ১৮২ ॥
পবন-চালনে পত্র দুলে নিরন্তর ।
অলিদল যথা কুল্ল ফুলের উপর ॥ ১৮৩ ॥
হিংসা-দ্বেষ-পরবশ হইয়া যেমন ।
খেদাইতে অলিযুথে করে আক্রমণ ॥ ১৮৪ ॥
দিনমানে করি রাজ্য প্রচণ্ড প্রভায় ।
ক্লান্তকায় দিনমণি চলিল শয্যায় ॥ ১৮৫ ॥
দেখিয়া সুধাংশু মুখ উঁকি দিয়া তুলে ।
ভয়ে যেন ছিল ঢাকা মেঘের আড়ালে ॥ ১৮৬ ॥
সঙ্গে লয়ে আপনার ক্ষীণতর বল ।
মন্দভাতি হীন-জ্যোতিঃ তারকার দল ॥ ১৮৭ ॥
পাখী সব কলরব চারিদিকে করে ।
কেহ শূন্যে কেহ শাখায় কেহ বা নীড়ে ॥ ১৮৮ ॥
এই সব স্বভাবের পট দেখাইয়া ।
শ্রীপ্রভু দুর্বোধ্য তত্ত্ব দেন বুঝাইয়া ॥ ১৮৯ ॥
সরল মধুরবাক্যে প্রত্যক্ষ উপমা ।
গুনিয়া দেখিয়া যেবা অতি মূর্খ কানা ॥ ১৯০ ॥
সহজে বুঝিয়া যায় জলের সমান ।
যোগে তপে যাহা নাহি হয় প্রণিধান ॥ ১৯১ ॥
কখন লইয়া লুচি মিষ্টান্ন আপনে ।
ডাকিতেন শিবানী বলিয়া শ্রীবদনে ॥ ১৯২ ॥
মধুর প্রভুর স্বর শুনে কুতূহলী ।
নিকটে আসিত ছুটে শৃগাল-শৃগালী ॥ ১৯৩ ॥
অতি বৃদ্ধ কুকুর আছিল এক তাঁর ।
দিতেন প্রসাদ নিত্য করিতে আহার ॥ ১৯৪ ॥
কভু কোল সমাগত বালকে লইয়া ।
খেলিতেন শিশুসম উলঙ্গ হইয়া ॥ ১৯৫ ॥
অতিশয় আর্তভাবে কহেন কখন ।
ক্ষুধায় আকুল কিছু করিব ভোজন ॥ ১৯৬ ॥
অভাব কিছুই নাই নানা নিধি ঘরে ।
যোগান ভকতবর্গ ভক্তিসহকারে ॥ ১৯৭ ॥
অতি অল্প ভোজন করেন গুণমণি ।
দুই অঙ্গুলির অগ্রে ধরে যতখানি ॥ ১৯৮ ॥
এবে তাঁর আপ্তগণ সেবার কারণে ।
শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে রহে রেতে দিনে ॥ ১৯৯ ॥
নুতন কেহই নন যাঁরা চিরকাল ।
সেবক হরিশ লাট্টু, প্রাণের রাখাল ॥ ২০০ ॥
দাস্যভাব নহে তাঁর রাখালের সনে ।
সুন্দর সম্পর্ক পরস্পর দুইজনে ॥ ২০১ ॥
প্রভুর গোপাল তাঁরে কতই আদর ।
বসাইয়া আপনার কোলের উপর ॥ ২০২ ॥
আচার ব্যাভার দু'হে হয় কি রকম ।
কহি দুই-এক কথা শুন শুন মন ॥ ২০৩ ॥
রাখাল করিলে সেবা প্রীতি নহে তাঁর ।
প্রীতি অতি সেবিতে করিলে অস্বীকার ॥ ২০৪ ॥
আছে শারীরিক কষ্ট সেবা আচরণে ।
রাখালের কষ্টে তাঁর বাজ লাগে প্রাণে ॥ ২০৫ ॥
রাখালের সঙ্গে প্রভু রঙ্গ করিবারে ।
সহাস্য বদনে কম পান সাজিবারে ॥ ২০৬ ॥
রাখালের উত্তর 'সাজিতে নাহি জানি' ।
ততই করেন জেদ প্রভু গুণমণি ॥ ২০৭ ॥
এই ভাবরসাস্বাদ রাখালের সনে ।
পালনে অতুষ্ট তুষ্ট আজ্ঞা-অপালনে ॥ ২০৮ ॥
যেন
রাখালচন্দ্র তেন তাঁর দারা ।
শ্রীমনোমোহন মিত্র তাঁর সহোদরা ॥ ২০৯ ॥
অতি ভক্তিমতী সতী মিত্রের জননী ।
প্রভু ভক্ত যতগুলি নন্দন-নন্দিনী ॥ ২১০ ॥
দুর্লভ জগতে হেন ভক্ত-পরিবার ।
কিছুই অভাব নাই সোনার সংসার ॥ ২১১ ॥
একত্রেতে শ্রীপ্রভুর দরশন তরে ।
এখন তখন আসে দক্ষিণশহরে ॥ ২১২ ॥
উপযুক্ত উপদেশ যাহার যেমন ।
বিতরেন প্রভুদেব ভক্ত-বিনোদন ॥ ২১৩ ॥
নানান ভক্তের সঙ্গে নানাবিধ খেলা ।
বিশেষিয়া সবিশেষ সাধ্য নহে বলা ॥ ২১৪ ॥
বিদেশে ধরণীধামে আপনার জনে ।
আনিয়া আপন সঙ্গে লীলার কারণে ॥ ২১৫ ॥
রেখেছেন প্রভুদেব নানা অবস্থায় ।
সাধারণ জীবসম মোহিয়া মায়ায় ॥ ২১৬ ॥
ক্রমশঃ খুলেন ঠুলি লোচন-তমস্ ।
সম্ভোগিয়া মনোমত লীলারঙ্গরস ॥ ২১৭ ॥
সদ্গোপ প্রতাপচন্দ্র হাজরা উপাধি ।
প্রভুর নিকটে এবে রহে নিরবধি ॥ ২১৮ ॥
প্রভুতে বিশ্বাস হৃদে নাহি এক ভোলা ।
উপেক্ষিয়া শ্রীবচন শুধু জপে মালা ॥ ২১৯ ॥
অবিশ্বাসী ইহার সমান আর নাই ।
কত খেলা তাঁর সঙ্গে করেন গোসাঁই ॥ ২২০ ॥
তপে জপে হাজরার একান্ত বাসনা ।
লণ্ড ভণ্ড কাণ্ড করি প্রভু দেন হানা ॥ ২২১ ॥
করে লম্বে করমালা হাজরা যখন ।
করে ইষ্ট-মন্ত্র-রূপ মুদিয়া নয়ন ॥ ২২২ ॥
ধীর মন্ত্র-পদ-ক্ষেপে নিকটে যাইয়া ।
ছিনাইয়া মালা প্রভু যান পলাইয়া ॥ ২২৩ ॥
শ্রীমুখে সুন্দর হাসি মন-বিমোহন ।
হাজরা পশ্চাতে ধায় মালার কারণ ॥ ২২৪ ॥
জপ তপ বারণ করেন গুণমণি ।
অনর্থক কেন কার্য হইবে আপনি ॥ ২২৫ ॥
বিশ্বাস না হয় তাঁর প্রভুর কথায় ।
জপে বসিলেন মালা লয়ে পুনরায় ॥ ২২৬ ॥
করুণানিধান হেন প্রভুর মতন ।
বিশ্বমধ্যে কোথা কে করেছে দরশন ॥ ২২৭ ॥
সাধন-ভজন বিনা দেন পরা ফল ।
সকলের সার ইষ্ট-চরণকমল ॥ ২২৮ ॥
কৃপা কর প্রভুদেব তম-বিমোচন ।
যুগল চরণে যেন মগ্ন থাকে মন ॥ ২২৯ ॥
প্রভুর নিজের যারা শ্রীপ্রভুর দাস ।
তাঁর রূপে তাঁর পদে অটল বিশ্বাস ॥ ২৩০ ॥
তাঁহাদের নাহি কোন সাধন-ভজন ।
প্রভুর কৃপায় পান প্রভুর চরণ ॥ ২৩১ ॥
সেবক হরিশচন্দ্র গঙ্গা-উপকূলে ।
একদিন ধ্যানে মগ্ন পঞ্চবটতলে ॥ ২৩২ ॥
একেবারে বাহিক গিয়ান বিরহিত ।
হেনকালে প্রভুদেব তথা উপস্থিত ॥ ২৩৩ ॥
অধরে মধুর হাসি অতি সুশোভন ।
জাগাইলা বক্ষে করি কর পরশন ॥ ২৩৪ ॥
অমিয়বরযী বাক্যে কহিলেন তাঁয় ।
কার ধ্যান কর পঞ্চবটের তলায় ॥ ২৩৫ ॥
আইস আমার সঙ্গে মন্দির ভিতরে ।
দিব মিঠা পাকা আম খাবে পেট ভরে ॥ ২৩৬ ॥
সাধন ভজন কষ্টে কিবা প্রয়োজন ।
হেলায় পাইবে নিধি মানিক-রতন ॥ ২৩৭ ॥
অপার বিশ্বাস তাঁর প্রভুর কথায় ।
হরিষে হরিশ শ্রীপ্রভুর পাছু ধায় ॥ ২৩৮ ॥
হাজরায় স্বতস্তর রীতি বুদ্ধি আন ।
শ্রীবাক্য হৃদয়ে মোটে নাহি পায় স্থান ॥ ২৩৯ ॥
হাজরার মনে মনে ইহাই ধারণা ।
প্রভুর অপেক্ষা তিনি কর্মী একজনা ॥ ২৪০ ॥
শৌর্যে বীর্যে গুণেতে অধিক শ্রেষ্ঠতর ।
সেহেতু শ্রীবাক্যে নাহি উপজে আদর ॥ ২৪১ ॥
কল্পতরু প্রভুদেব তাঁহার নিকটে ।
যার যেন ভাব তার সেই মত জুটে ॥ ২৪২ ॥
কামারহাটির
সেই বৃদ্ধক ব্রাহ্মণী ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দুখানি ॥ ২৪৩ ॥
বালিকা-বিধবা করে
গঙ্গাকূলে বাস ।
প্রভুদেবে অদ্যাপিহ না হয় বিশ্বাস ॥ ২৪৪ ॥
কৈবর্তের যাজক
শ্রীপ্রভু ভগবান ।
এই ছিল ব্রাহ্মণীর প্রকৃত গিয়ান ॥ ২৪৫ ॥
সেই হেতু প্রভুদত্ত প্রসাদ লইয়া ।
অন্যে লুকাইয়া দেন নিজে না খাইয়া ॥ ২৪৬ ॥
জানিয়াও যেন প্রভু অজ্ঞাত বারতা ।
শুন পরে কি হইল অপরূপ কথা ॥ ২৪৭ ॥
সন্নিকটে খড়দহ নামে এক গ্রাম ।
গঙ্গাকূলস্থিত সুবিদিত জনস্থান ॥ ২৪৮ ॥
বৈষ্ণব গোস্বামী বংশ করেন বসতি ।
ভক্তিরাগে পূজে এক বিগ্রহ মূরতি ॥ ২৪৯ ॥
পরম সুঠাম শ্যামসুন্দর আখ্যায় ।
নানান স্থানের লোক দরশনে যায় ॥ ২৫০ ॥
জাগ্রত বিগ্রহ অতি নয়ন-রঞ্জন ।
একদিন ব্রাহ্মণীর তথা আগমন ॥ ২৫১ ॥
তুষ্টচিত্তে পুরীমধ্যে বিগ্রহ দেখিয়া ।
বাহির প্রাঙ্গণে যবে আসেন ফিরিয়া ॥ ২৫২ ॥
দেখিলা বসিয়া তথা এক যোগিবর ।
বদনে বিকাশে ভাতি অতি মনোহর ॥ ২৫৩ ॥
কটাক্ষ করিয়া তেঁহ কহে ব্রাহ্মণীরে ।
পাইলে প্রসাদ খাবে ভক্তিসহকারে ॥ ২৫৪ ॥
পড়ে যদি কোন কথা হাজারের মাঝে ।
জনশ্রুতি যার কথা তারে গিয়া বাজে ॥ ২৫৫ ॥
গুনিয়া যোগীর কথা আশ্চর্য কাহিনী ।
চমকিয়া উঠিলেন বৃদ্ধক ব্রাহ্মণী ॥ ২৫৬ ॥
অমনি পড়িল মনে প্রভুর প্রসাদ ।
অবহেলি হইয়াছে বড় পরমাদ ॥ ২৫৭ ॥
উঠে পড়ে তাড়াতাড়ি আইলা আবাসে ।
প্রভুর নিকটে ত্বরা আসিবার আশে ॥ ২৫৮ ॥
প্রভুর কারণে ভোজ্য বাঁধিয়া পুঁটুলি ।
প্রভু যথা উৎরিল পায়ে ভরা ধুলি ॥ ২৫৯ ॥
দেখামাত্র প্রভুদেব কহিলেন তায় ।
কিবা আনিয়াছ দেহ আতুর ক্ষুধায় ॥ ২৬০ ॥
উথলিল ব্রাহ্মণীর বাৎসল্যের রস ।
পুঁটুলি খুলিতে নারে অঙ্গুলি অবশ ॥ ২৬১ ॥
ব্রাহ্মণীর মত ভাগ্য কোথা আছে কার ।
মিষ্টায় লইয়া প্রভু করেন আহার ॥ ২৬২ ॥
সেই দিন হইতে শ্রীপ্রভু ভগবান ।
গোপালের মা বলিয়া থুইলেন নাম ॥ ২৬৩ ॥
ভক্তমুখে শুনা বৃদ্ধা কৃষ্ণ-অবতারে ।
ফল বিক্রি করিতেন গোকুলনগরে ॥ ২৬৪ ॥
একদিন নন্দালয়ে যশোমতী রানী ।
প্রাঙ্গনে বেড়ান লয়ে কাঁখে নীলমণি ॥ ২৬৫ ॥
উপনীত বৃদ্ধা তথা হয় হেন কালে ।
বজরায় ভরা ফল বহিয়া কাঁকালে ॥ ২৬৬ ॥
ফল-লুব্ধ গোপাল কহেন যশোদারে ।
ফল খাব ফল খাব কিনে দেহ মোরে ॥ ২৬৭ ॥
এত শুনি নন্দরানী কিনিবারে যায় ।
কড়ি-বিনিময়ে বুড়ী দিতে নাহি চায় ॥ ২৬৮ ॥
হাত বাড়াইয়া বুড়ী কহিল গোপালে ।
কল দিব মা বলিয়া এস যদি কোলে ॥ ২৬৯ ॥
তখনি বুড়ীর কোলে উঠিল গোপাল ।
ভক্তপ্রিয় শিশুরূপ নন্দের দুলাল ॥ ২৭০ ॥
মহাভাগ্য-পুণ্যবতী মহানন্দ মনে ।
পাকা পাকা দেয় ফল কৃষ্ণের বদনে ॥ ২৭১ ॥
ফলবেচা বুড়ী যেই গোকুলনগরে ।
সেই এই ব্রাহ্মণী শ্রীপ্রভু অবতারে ॥ ২৭২ ॥
নানা খেলা করেন শ্রীপ্রভু তাঁর সনে ।
একদিন ব্রাহ্মণীর বসতি যেখানে ॥ ২৭৩ ॥
রন্ধনের কাজে বৃদ্ধা বিব্রত যখন ।
হেনকালে প্রত্যক্ষ করেন নিরীক্ষণ ॥ ২৭৪ ॥
শুষ্ক বৃক্ষ-পত্র শাখা দেন কুড়াইয়া ।
প্রভুদেব অল্পবয়ঃ বালক হইয়া ॥ ২৭৫ ॥
কভু খেলা শিশুসম স্বভাব চঞ্চল ।
ভাগ্যবতী ব্রাহ্মণীর ধরিয়া আঁচল ॥ ২৭৬ ॥
প্রভুর এতেক খেলা বুঝিয়া অন্তরে ।
ব্রাহ্মণী প্রভুর কাছে আসে বারে বারে ॥ ২৭৭ ॥
দেখিলেই ব্রাহ্মণীরে প্রভু নারায়ণ ।
বলিতেন কি এনেছ করিব ভোজন ॥ ২৭৮ ॥
ব্রাহ্মণী মিষ্টান্ন দেন পরম সাদরে ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু শ্রীপ্রভুর করে ॥ ২৭৯ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন পুনঃ আসিবে যখন ।
মিষ্টান্ন বদলে এন রাখিয়া ব্যঞ্জন ॥ ২৮০ ॥
শুনিয়া প্রভুর কথা মহাভাগ্য মানি ।
আহলাদে গলিয়া বাসে ফিরিল ব্রাহ্মণী ॥ ২৮১ ॥
দুঃখিনী ব্রাহ্মণী নাই সন্তান-সন্ততি ।
নিকট আত্মীয় বন্ধু দেয় কড়িপাতি ॥ ২৮২ ॥
পরগৃহে স্থিতিবাস জাহ্নবীর তটে ।
যথাসাধ্য শাক-পাতি আনিল আকুটে ॥ ২৮৩ ॥
আপনে আপন ভাবে হইয়া মগন ।
আঁখি-জলে পাকশালে ভাসে দুনয়ন ॥ ২৮৪ ॥
শ্রীবয়ান সতত স্মরণ বারে বারে ।
রাঁধিল ব্যঞ্জন অতি সোহাগের ভরে ॥ ২৮৫ ॥
যথারীতি পুঁটুলিতে করিয়া বন্ধন ।
উত্তরিল যথা প্রভু ভক্ত বিনোদন ॥ ২৮৬ ॥
ব্যঞ্জন খাইতে শ্রীপ্রভুর মন ভারি ।
পুঁটুলি খুলিতে আর নাহি সয় দেরি ॥ ২৮৭ ॥
শ্রীবদনে ব্যঞ্জন লাগিল যেন ক্ষুধা ।
শুদ্ধমাত্র শাকে উচ্ছে আলু দিয়া রাঁধা ॥ ২৮৮ ॥
হেন ভক্তিমতী বিশ্বে কোথা বিদ্যমান ।
ভক্তিতে করিল তিক্তে সুধার সমান ॥ ২৮৯ ॥
কার দ্রব্যে তুষ্ট রামকৃষ্ণদেব রায় ।
বিচিত্র শ্রীলীলা তাঁর কহা নাহি যায় ॥ ২৯০ ॥
খোট্টা মাড়োয়ারী জেতে মস্ত মহাজন ।
বড়বাজারেতে গদি ত্রিতল ভবন ॥ ২৯১ ॥
সাধু ভক্ত সন্ন্যাসীর সেবায় পিরীতি ।
বংশপরম্পরা এই তাহাদের রীতি ॥ ২৯২ ॥
শুনিয়া প্রভুর নাম আসে কত শত ।
সঙ্গে লয়ে মোয়া মিষ্টি বজরাপুর্ণিত ॥ ২৯৩ ॥
সুপক্ক কাবুলি ফল বেদানা আঙ্গুর ।
বিষতুল্য লাগে তাহা নয়নে প্রভুর ॥ ২৯৪ ॥
ভোজনের কিবা কথা নহে পরশন ।
আঁখির সম্মুখে রহে তাও নহে মন ॥ ২৯৫ ॥
কেহ বা কিনিয়া দ্রব্য যবন-দোকানে ।
দেখিলে জনমে ঘৃণা অনাচারে আনে ॥ ২৯৬ ॥
তাও লাগে সুধাময় প্রভুর জিহ্বায় ।
ভক্তিমতী ব্রাহ্মণীর ব্যঞ্জনের প্রায় ॥ ২৯৭ ॥
কেহ ভারি কদাচারী যবন-বিশেষ ।
স্বধর্ম-তিয়াগী নাই ভকতির লেশ ॥ ২৯৮ ॥
ভক্তিহীন কৃপণ মমতা নাই মোটে ।
শ্রীপ্রভু মাগিয়া খান তাহার নিকটে ॥ ২৯৯ ॥
দীনের অধিক তাঁর মাগিবার ধারা ।
দেখিয়া শুনিয়া লীলা হয় বুদ্ধিহারা ॥ ৩০০ ॥
দয়ার সাগরে ঘৃণা লজ্জা ভয় নাই ।
জীবের মঙ্গলে সদা উন্মত্ত গোসাঁই ॥ ৩০১ ॥
কলিতে যেমন জীব পাতকী পামর ।
তেমতি শ্রীপ্রভুদেব কৃপার সাগর ॥ ৩০২ ॥
শুনহ সুন্দর লীলা কর অবধান ।
শহরের মধ্যে আছে নন্দনবাগান ॥ ৩০৩ ॥
ধনবান একজন ব্রাহ্মধর্মে মতি ।
কাশীশ্বর মিত্র নামে তথায় বসতি ॥ ৩০৪ ॥
পরলোকে গেছে এবে নাহি ধরাধামে ।
উত্তরাধিকারিস্বত্বে রাখি পুত্রগণে ॥ ৩০৫ ॥
একবার ব্রহ্মোৎসব তাঁহার আগারে ।
প্রভুর গমন হেতু নিমন্ত্রণ করে ॥ ৩০৬ ॥
গুণের সাগর মোর প্রভুদেবরায় ।
ভাল ভাল বলিয়া দিলেন তাহে সায় ॥ ৩০৭ ॥
যা বলেন প্রভু তাহা অবশ্য পালন ।
যথাদিনে যথাকালে হইল গমন ॥ ৩০৮ ॥
পরিপূর্ণ প্রার্থনার স্থান সমুদয় ।
বেশভূষা মদ-মত্ত ব্রাহ্ম ব্রাহ্মিকায় ॥ ৩০৯ ॥
যথা প্রথা উৎসব হইলে সমাপন ।
ব্রাহ্মদের মহানন্দে চলিল ভোজন ॥ ৩১০ ॥
কিবা কথা প্রভুদের আরাধ্য সবার ।
বিরিঞ্চি-বাঞ্ছিত পদ সেব্য কমলার ॥ ৩১১ ॥
বিশ্বগুরু কল্পতরু বিধির বিধাতা ।
মহাসুখে চারি মুখে বন্দে যাঁরে ধাতা ॥ ৩১২ ॥
শমন কম্পিতকায় দুয়ারে প্রহরী ।
করজোড়ে দেবগণ কুবের-ভাণ্ডারী ॥ ৩১৩ ॥
আদ্যাশক্তি মহামায়া সৃষ্টির কারণ ।
সতত সতর্ক আজ্ঞা করিতে পালন ॥ ৩১৪ ॥
হেন দেব রামকৃষ্ণ প্রভু অবতার ।
বহুভাগ্যে ভবনে খবর নাহি তাঁর ॥ ৩১৫ ॥
দীনের ঠাকুর মোর পতিত-পাবন ।
উপবিষ্ট এক পাশে দীনের মতন ॥ ৩১৬ ॥
কাঙ্গাল-উদ্ধার যেন কাঙ্গালের বাড়া ।
অধরে অধর লগ্ন মুখে নাহি সাড়া ॥ ৩১৭ ॥
বসিয়া দেখেন ব্রাহ্মদের রঙ্গ-রীতি ।
পান-ভোজনেতে মত্ত অদ্ভুত
প্রকৃতি ॥ ৩১৮ ॥
অভুক্ত রাখিয়া তাঁরে সর্বাগ্রে আহার ।
অপরাধ যাহাদের এমন আচার ॥ ৩১৯ ॥
জীবহিতব্রত প্রভু করুণানিধান ।
জীবের মঙ্গলে যাঁর চিন্তা অবিরাম ॥ ৩২০ ॥
তাঁর
বিদ্যমানে হেন দোষের কারণ ।
কভু নহে কেন প্রভু পতিত-তারণ ॥ ৩২১ ॥
উচ্চকণ্ঠে
ফুকারিয়া লাগিলা ডাকিতে ।
ওগো আমি ক্ষুধাতুর দাও কিছু খেতে ॥ ৩২২ ॥
একবার দুইবার নহে বার বার ।
কেহ না উত্তর করে প্রভুরে আমার ॥ ৩২৩ ॥
সঙ্গেতে রাখালচন্দ্র গোপাল প্রভুর ।
ব্রাহ্মদের ব্যবহারে লজ্জিত প্রচুর ॥ ৩২৪ ॥
ধীরে ধীরে চুপে চুপে প্রভুদেবে কন ।
চল যাই ফিরে কেন ডাক অকারণ ॥ ৩২৫ ॥
রাখালে বলেন প্রভু জগৎ-গোসাঁই ।
জানি আমি গেঁটে তোর নাহি এক পাই ॥ ৩২৬ ॥
কেন তবে রোক কথা না পারি শুনিতে ।
অভুক্ত ফিরিলে হবে উপবাস রেতে ॥ ৩২৭ ॥
একবার আগেকার কথা স্মর মন ।
যে সময়ে শ্রীপ্রভুর সাধন-ভজন ॥ ৩২৮ ॥
মহারাগ-অনুরাগ ভাবের বিহ্বলে ।
মাস মাস অনাহারে কোথা গেছে চলে ॥ ৩২৯ ॥
আজি তাঁর একরাতি সহ্য নাহি হয় ।
প্রভুর দয়ার কথা কহিবার নয় ॥ ৩৩০ ॥
গৃহস্থের অমঙ্গল অভুক্ত ফিরিলে ।
ডাকিতে লাগিলা প্রভু পুনঃ উচ্চরোলে ॥ ৩৩১ ॥
ওগো আমি এত ডাকি না পাও শুনিতে ।
বড়ই পেয়েছে ক্ষুধা দাও কিছু খেতে ॥ ৩৩২ ॥
এবার গুনিয়া কথা কোন ব্রাহ্ম ভাই ।
প্রভুরে করিয়া দিল ভোজনের ঠাঁই ॥ ৩৩৩ ॥
ভোজনের ঠাঁই অতি কদাকার স্থান ।
কাছে এত জুতা যেন জুতার দোকান ॥ ৩৩৪ ॥
পাতায় পড়িল লুচি যেমন তেমন ।
জনৈক স্ত্রীলোক দিল আনিয়া ব্যঞ্জন ॥ ৩৩৫ ॥
অপবিত্র অঙ্গ তার অন্তর অশুচি ।
ব্যজনে প্রভুর আর হইল না রুচি ॥ ৩৩৬ ॥
লবন-সংযোগে লুচি একআধখানি ।
খাইয়া পরম তৃপ্ত প্রভু গুণমণি ॥ ৩৩৭ ॥
নানাস্থানে শ্রীপ্রভুর নানাবিধ ধারা ।
কারণ বুঝিতে গেলে হয় বুদ্ধি হারা ॥ ৩৩৮
॥
কোন স্থানে অগ্রভাগ অন্য জনে দিলে ।
তাহাতে ভোজন শ্রীপ্রভুর নাহি চলে ॥ ৩৩৯ ॥
পরভাগে এইখানে প্রভুর আহার ।
কখন কেমন প্রভু বুঝা অতি ভার ॥ ৩৪০ ॥
কব দুই-এক কথা কর অবধান ।
একদিন প্রভু-ভক্তবর দত্ত রাম ॥ ৩৪১ ॥
সঙ্গেতে সুরেন্দ্র মিত্র শ্রীমনোমোহন ।
দরশনে শ্রীপ্রভুর করেন গমন ॥ ৩৪২ ॥
অশাস্ত্রীয় রিক্ত হস্তে গুরুদরশন ।
ভোজ্যদ্রব্য সেহেতু একান্ত প্রয়োজন ॥ ৩৪৩ ॥
জিলাপি প্রভুর প্রিয় বিচারিয়া মনে ।
কিনিলেন এক ঠোঙ্গা মোদক-দোকানে ॥ ৩৪৪ ॥
ভাড়াটিয়া ঘোড়ার গাড়িতে আগমন ।
সেই কালে ভক্তত্রয় করে আরোহণ ॥ ৩৪৫ ॥
জনৈক অনাথ শিশু পাইল দেখিতে ।
ঠোঙ্গাভরা জিলাপি রামের আছে হাতে ॥ ৩৪৬ ॥
শিশুর স্বভাব যেন লোলুপ হইয়া ।
গাড়ির পশ্চাৎ ধায় জিলাপি মাগিয়া ॥ ৩৪৭ ॥
রাম বুঝিলেন মনে ভক্তির উচ্ছ্বাসে ।
এই খেলা শ্রীপ্রভুর বালকের বেশে ॥ ৩৪৮ ॥
সেহেতু জিলাপি লয়ে করিয়া আদর ।
বালকের হাতে দিল প্রসারিয়া কর ॥ ৩৪৯ ॥
এতেক হইল কাণ্ড পথের মাঝারে ।
যথাকালে উত্তরিল দক্ষিণশহরে ॥ ৩৫০ ॥
দেখিলেন প্রভুদেব অখিলের রাজ ।
নিজ ভাবে শ্রীমন্দিরে করেন বিরাজ ॥ ৩৫১ ॥
স্বভাবতঃ যেইমত কথোপকথন ।
সেমতে সময় গত হয় কিছুক্ষণ ॥ ৩৫২ ॥
শিশুসম শ্রীপ্রভুর আছে যেন ধারা ।
মাঝে মাঝে টুকটুক জল পান করা ॥ ৩৫৩ ॥
হইলে সময় প্রভু বলিলা আপনি ।
হইয়াছে ক্ষুধা মোরে দেহ কিছু আন ॥ ৩৫৪ ॥
এত শুনি খুশী বড় ভক্ত দত্ত রাম ।
থুইলা জিলাপিগুলি প্রভু-বিদ্যমান ॥ ৩৫৫ ॥
কিবা বুঝি কিবা ভাব হইল প্রভুর ।
বাম হাতে জিলাপি ভাঙ্গিয়া কৈলা চুর ॥ ৩৫৬ ॥
ভোজন দূরের কথা না লইলা বাস ।
শ্রীঅঙ্গে কিঞ্চিৎ ভাবাবেশের আভাস ॥ ৩৫৭ ॥
পাখালি দক্ষিণেতর কর পরমেশ ।
শ্যামার মন্দিরে গিয়া করিলা প্রবেশ ॥ ৩৫৮ ॥
ঝটিতি আইলা প্রভু আপন মন্দিরে ।
কি ভাবে থাকেন প্রভু কে বুঝিতে পারে ॥ ৩৫৯ ॥
রামের অন্তরে দুঃখ না যায় বর্ণন ।
শ্রীপ্রভুর হইল না জিলাপি-ভোজন ॥ ৩৬০ ॥
কোন কথা নাহি আর প্রভুর বদনে ।
স্বধামে আইলা রাম ফিরিয়া সে দিনে ॥ ৩৬১ ॥
দহিছে হৃদয় খেদে নিরানন্দ অতি ।
প্রবল আহুতি স্মৃতি দেয় দিবা রাতি ॥ ৩৬২ ॥
পর দরশনে যবে দক্ষিণশহরে ।
অধিক না হয় দেরি চারি দিন পরে ॥ ৩৬৩ ॥
নিজ মনে প্রভুদেব লাগিলা কহিতে ।
অগ্রভাগ দিলে অন্যে না পারি খাইতে ॥ ৩৬৪ ॥
আর দিন শুন কথা বিস্ময় ব্যাপার ।
কৃষ্ণানুরাগিণী গৌরমাতা নাম যাঁর ॥ ৩৬৫ ॥
বলরাম বসুর আবাসে এবে বাস ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে অপার উল্লাস ॥ ৩৬৬ ॥
মাঝে মাঝে দক্ষিণশহরে হয় গতি ।
ভোজ্যদ্রব্য নানাবিধ লইয়া সংহতি ॥ ৩৬৭ ॥
দারুময় জগন্নাথ বসুর ভবনে ।
ভোগরাগ নিতি নিতি করয়ে ব্রাহ্মণে ॥ ৩৬৮ ॥
একদিন গৌরমাতা ভোগের কারণ ।
করিলেন নানান দ্রব্যের আয়োজন ॥ ৩৬৯ ॥
অপর উদ্দেশ্য নয় মনে মনে সাধ ।
প্রভু-দরশনে যাবে লইয়া প্রসাদ ॥ ৩৭০ ॥
প্রসাদে বড়ই তুষ্ট প্রভু নারায়ণ ।
স্নানান্তে প্রসাদ অগ্রে পশ্চাৎ ভোজন ॥ ৩৭১ ॥
আজিকার প্রসাদে ঘটিল বৈলক্ষণ ।
কিবা বুঝি গৌর মার কি হইল মন ॥ ৩৭২ ॥
প্রসাদের অগ্রভাগ অন্যে খাওয়াইয়া ।
বাদ বাকি বাঁধিলেন প্রভুর লাগিয়া ॥ ৩৭৩ ॥
উতরিয়া যথাকালে দক্ষিণশহরে ।
ভোজ্য সহ যখন প্রবেশে শ্রীমন্দিরে ॥ ৩৭৪ ॥
লাগিল এমতি প্রভুদেবের নাসায় ।
অতি কটু দুর্গন্ধ মন্দিরে থাকা দায় ॥ ৩৭৫ ॥
কি ভাবে কখন প্রভু কে বুঝিতে পারে ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা ভক্তি সহকারে ॥ ৩৭৬ ॥
আগে কহিয়াছি ভক্ত যোগীন্দ্রের নাম ।
দক্ষিণশহরে বাস পিতা ধনবান ॥ ৩৭৭ ॥
নিত্যযুক্ত প্রখর বিরাগ ভরা মনে ।
হলাহলসম বোধ কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ৩৭৮ ॥
শ্রীপদপঙ্কজে এবে মজিয়াছে মন ।
বড় খুশী প্রভুর নিকটে যতক্ষণ ॥ ৩৭৯ ॥
পুরীতে চাকরি কর্মে দাসী এক জনা ।
শ্রীপ্রভুর শ্রীমন্দির করিত মার্জনা ॥ ৩৮০ ॥
বুদ্ধিহীনা ক্ষুদ্রমতি কর্মফল গুণে ।
দিন দিন যোগীন্দ্রে কহয়ে সংগোপনে ॥ ৩৮১ ॥
ভিতরে প্রভুর ভাব সংসারীর ধারা ।
পুরীতে করেন বাস সঙ্গে আছে দারা ॥ ৩৮২ ॥
এ সময় গুরুমাতা দক্ষিণশহরে ।
বাস করিছেন হেথা পুরীর ভিতরে ॥ ৩৮৩ ॥
যেমন তাঁহার রীতি অতি সংগোপনে ।
নহবতখানায় স্বতন্ত্র নিকেতনে ॥ ৩৮৪ ॥
প্রভুর মন্দির হতে অনতি অন্তর ।
কত লোক আসে কেহ জানে না খবর ॥ ৩৮৫ ॥
সন্দেহ উদয় বড় যোগীন্দ্রের মনে ।
রিত মতি ভক্তিহীনা দাসীর বচনে ॥ ৩৮৬ ॥
একদিন নিশামণি বিস্তারি কিরণ ।
করিয়াছে ত্রিযামারে দিনের মতন ॥ ৩৮৭ ॥
তৃণ কুটি যথা যেটি কিছু নাহি ঢাকা ।
চারিদিকে আলোময় সব যায় দেখা ॥ ৩৮৮ ॥
উর্ধ্বগতি রাতি প্রায় অর্ধেকের পার ।
শয্যায় প্রকৃতিদেবী সুষুপ্তি-সঞ্চার ॥ ৩৮৯ ॥
শব্দ নাই ঝিমঝিম চলিছে যামিনী ।
হেনকালে মলভূমে যান গুণমণি ॥ ৩৯০ ॥
মায়ের আশ্রম যেই দিকে পথ তাঁর ।
যোগীন্দ্রের মনে মনে সন্দেহ অপার ॥ ৩৯১ ॥
অলক্ষ্যে পশ্চাৎ ভাগে ধীরে ধীরে যায় ।
জানিতে প্রভুর এবে গমন কোথায় ॥ ৩৯২ ॥
দেখিলে শ্রীযোগীন্দ্র প্রভু নারায়ণ ।
এড়াইয়া চলিলেন মায়ের আশ্রম ॥ ৩৯৩ ॥
বাহির দুয়ারে মাতা জগৎ-জননী ।
সমাধিতে বসিয়া আছেন একাকিনী ॥ ৩৯৪ ॥
প্রকাশ্য বদন আবরণ নাহি তায় ।
চন্দ্র সূর্য পবনে যা দেখিতে না পায় ॥ ৩৯৫ ॥
যে ভাবে আছেন মাতা প্রত্যাকৃতি তাঁর ।
জানি না আঁকিতে শক্তি জগতে কাহার ॥ ৩৯৬ ॥
লজ্জা-পরিপূর্ণ দেহে মোটে নাহি মন ।
বিশ্বহিত-ধিয়ানে যেমন নিমগন ॥ ৩৯৭ ॥
ফিরিলেন অবিলম্বে প্রভুদেবরায় ।
পায়ে চটি জুতা ফুট ফুট শব্দ তায় ॥ ৩৯৮ ॥
কোন দিকে কোন লক্ষ্য নাহি একবারে ।
উপনীত বরাবর নিজের মন্দিরে ॥ ৩৯৯ ॥
ক্ষণেকের ব্যাপার করিয়া নিরীক্ষণ ।
যোগীন্দ্রের যাবতীয় সন্দেহ-মোচন ॥ ৪০০ ॥
নিত্যমুক্ত ভক্তবর সন্দেহের স্থলে ।
পাইনা অচলা ভক্তি দুঁহু পদতলে ॥ ৪০১ ॥
অগণ্য প্রভুর ভক্ত রহে নানা ঠাঁই ।
কার সঙ্গে কিবা রঙ্গ করেন গোসাঁই ॥ ৪০২ ॥
সাধ্য নাই বলিবার তিল আধখানি ।
সাগর-সমান লীলা আমি ক্ষুদ্র প্রাণী ॥ ৪০৩ ॥
শ্রীপ্রভুর ভক্তমুখে শুনা যতদূর ।
কহি শুন লীলা-কথা শ্রবণ-মধুর ॥ ৪০৪ ॥
প্রভুর শরণাপন্ন ভক্ত একজন ।
গুণবান পণ্ডিত শহরে নিকেতন ॥ ৪০৫ ॥
সুবর্ণবণিক জেতে মহাভাগ্যধর ।
উপাধি তাঁহার সেন নাম শ্রীঅধর ॥ ৪০৬ ॥
হাকিমী চাকরি করে কোম্পানির ঘরে ।
সরলস্বভাব সবে সমাদর করে ॥ ৪০৭ ॥
দেবভাষা সংস্কৃত বিশেষিয়া জানা ।
বিদ্যার স্বভাব যেন অন্তরে গরিমা ॥ ৪০৮ ॥
নিরক্ষর প্রভুদেব গিয়ান তাঁহার ।
অবিদিত দেবভাষা বিদ্যার ভাণ্ডার ॥ ৪০৯ ॥
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভুদেব অখিলের রাজ ।
সর্বভূতে বিধিমতে করেন বিরাজ ॥ ৪১০ ॥
পশু-পাখী ক্ষুদ্র কীট ভূচর খেচর ।
দেব কি দানব দৈত্য গন্ধর্ব কিন্নর ॥ ৪১১ ॥
সৃষ্টির মধ্যেতে করে বাস যে যথায় ।
অতি উর্ধ্বলোকে কিবা পাতাল-তলায় ॥ ৪১২ ॥
কি ভাষায় কয় কথা কিবা কার সনে ।
স্পষ্ট কি অপরিস্ফুট ইঙ্গিত বচনে ॥ ৪১৩ ॥
সকল বুঝেন প্রভু মঙ্গলনিধান ।
কল্পতরু বিশ্বগুরু বিভু ভগবান ॥ ৪১৪ ॥
অদ্যাপি বিশ্বাস হেন অধরের নাই ।
শুন কি করিলা রঙ্গ জগত-গোসাঁই ॥ ৪১৫ ॥
শ্রীমহিম চক্রবর্তী কাশীপুরে ঘর ।
জমিদার তদুপরি পণ্ডিত প্রবর ॥ ৪১৬ ॥
শাস্ত্রালাপে অনুরাগ নানা শাস্ত্র পড়ে ।
রাখিয়া পণ্ডিত এক আপনার ঘরে ॥ ৪১৭ ॥
একদিন অধর তথায় উপনীত ।
যে সময়ে তন্ত্রপাঠ করেন পণ্ডিত ॥ ৪১৮ ॥
যেন তাঁহাদের ধারা ব্যাখ্যা সহকারে ।
ব্যাখ্যায় অধরচন্দ্র প্রতিবাদ করে ॥ ৪১৯ ॥
মহিম তাহাতে কৈল অন্যবিধ মানে ।
এইরূপে বিবাদে পড়িল তিন জনে ॥ ৪২০ ॥
কেহ নহে ন্যূন বলে সমান সোসর ।
নিজ পক্ষসমর্থনে বাক্যের সমর ॥ ৪২১ ॥
মীমাংসার হেতু সবে সেই ক্ষণে ছুটে ।
দক্ষিণশহরে শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে ॥ ৪২২ ॥
আপনা অন্তরে হেথা প্রভু গুণমণি ।
সুবিদিত আদ্যোপান্ত যাবৎ কাহিনী ॥ ৪২৩ ॥
প্রভুরে জিজ্ঞাসা প্রশ্ন করিবার পূবে ।
আপনি করেন ব্যাখা আপনার ভাবে ॥ ৪২৪ ॥
অবাক হইয়া শুনে দ্বন্দ্বী তিন জন ।
সে অংশে প্রভুর ব্যাখ্যা চতুর্থ রকম ॥ ৪২৫ ॥
প্রাণে প্রাণে সেই অর্থ পশিল সবার ।
ফুটিল আলোক গেল গরিমা বিদ্যার ॥ ৪২৬ ॥
অধরের মহাভ্রান্তি একেবারে দূর ।
চৌগুণ বিশ্বাস বাড়ে চরণে প্রভুর ॥ ৪২৭ ॥
অধর প্রভুর এক অন্তরঙ্গ জন ।
সঙ্গে আনা আপ্তজনা লীলার কারণ ॥ ৪২৮ ॥
বার বার মহোৎসব হৈল যার ঘরে ।
বেনিয়াটোলায় বাড়ি শহর ভিতরে ॥ ৪২৯ ॥
সুবর্ণবণিক জাতি সংসারী আচার ।
ইংরেজের আদালতে পদ ম্যাজিস্টর ॥ ৪৩০ ॥
নিরক্ষর প্রভুদেবে বুঝে যেই জনা ।
আঁখি সবে দুপুর বেলায় দিনে কানা ॥ ৪৩১ ॥
শুন কহি আর কথা কর অবধান ।
সর্বজ্ঞ শ্রীপ্রভু মোর বিভু ভগবান ॥ ৪৩২ ॥
দিনেক ভকত বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ।
বেদপাঠ করেন শুনেন প্রভুরায় ॥ ৪৩৩ ॥
বর্ণাশুদ্ধি-হেতু পাঠাশুদ্ধি যেইখানে ।
অশনি-সমান লাগে শ্রীপ্রভুর কানে ॥ ৪৩৪ ॥
অসন্তোষে চীৎকার করেন গুণমণি ।
বেদপাঠ অশুদ্ধ ভক্তের মুখে শুনি ॥ ৪৩৫ ॥
তখনি থামেন তথা ভক্ত উপাধ্যায় ।
শুনিতে কি শুদ্ধ বাক্য কন প্রভুরায় ॥ ৪৩৬ ॥
নিজে নাহি কহি কথা প্রভু ভগবান ।
শুদ্ধ বাক্য পাঠকের বদনে বলান ॥ ৪৩৭ ॥
এই কি হইবে যবে কহে উপাধ্যায় ।
উল্লসিত হইয়া শ্রীপ্রভু দেন সায় ॥ ৪৩৮ ॥
প্রভুর মহিমা কথা কি কহিতে পারি ।
সংসারী সুমূর্খ তাহে জীব-বুদ্ধি ধরি ॥ ৪৩৯ ॥
ভক্তিমতী গৌরমার বাসনা অন্তরে ।
প্রভুদেব গোরারূপে নদীয়ানগরে ॥ ৪৪০ ॥
কি রঙ্গ করিয়াছিলা লয়ে ভক্তগণ ।
একবার বড় সাধ করি দরশন ॥ ৪৪১ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু শ্রীপ্রভু গোসাঁই ।
ভক্তসনে খেলা বিনা অন্য কাজ নাই ॥ ৪৪২ ॥
পুরাতে ভক্তের বাঞ্ছা শ্রীপ্রভু আপনে ।
স্বতই পিরীতি তাঁর আপনার গুণে ॥ ৪৪৩ ॥
ভক্তপ্রাণ ভক্তপ্রিয় প্রভু পরমেশ ।
ভক্তের উপরে তাঁর করুণা অশেষ ॥ ৪৪৪ ॥
কেমনে করিলা বাঞ্ছাপূর্ণ গৌরমার ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা অমৃত-ভাণ্ডার ॥ ৪৪৫ ॥
কিছু দিন পরে রবিবারে একদিন ।
একত্রিত বহু ভক্ত নবীন প্রবীণ ॥ ৪৪৬ ॥
সেই দিন গৌরমাতা মায়ের মন্দিরে ।
রন্ধনশালায় রত ভকতির ভরে ॥ ৪৪৭ ॥
শ্রীপ্রভুর সেবা হেতু পরম যতন ।
খেচরান্ন ব্যঞ্জনাদি করেন রন্ধন ॥ ৪৪৮ ॥
মধ্যাহ্ন সময় এবে দিবা দু-প্রহর ।
উঠিয়াছে দিনমণি মাথার উপর ॥ ৪৪৯ ॥
এটি-ওটি রাঁধিতে এতেক হইল বেলা ।
শশব্যস্ত গৌরমাতা ব্রাহ্মণের বালা ॥ ৪৫০ ॥
প্রভুর মন্দিরে করি ভোজন-আসন ।
ভোজ্যদ্রব্য আনিবারে করিল গমন ॥ ৪৫১ ॥
ভক্তগণ দরশন করেন বেড়িয়া ।
কেহ বা দণ্ডায়মান কেহ বা বসিয়া ॥ ৪৫২ ॥
আনন্দে পূর্ণিত হৃদি অন্তর খোলসা ।
জীবন-মুক্তির সম সকলের দশা ॥ ৪৫৩ ॥
সঙ্কল্প বিকল্প-ভাব মনের যেমন ।
সংসার-সুখের কাম কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৪৫৪ ॥
তিলেক
বিশ্রাম নাই সদা রেতে দিনে ।
সলিলে যেমন বিশ্ব পঙ্ক-বিলোড়নে ॥ ৪৫৫ ॥
ভক্তগণ যতক্ষণ প্রভুর নিকটে ।
মনের স্বভাব মনে আদতে না ফুটে ॥ ৪৫৬ ॥
চিত্তহর হেন রূপ প্রভু-অঙ্গে খেলে ।
চঞ্চল এমন মন সেও গেছে ভুলে ॥ ৪৫৭ ॥
সেহেতু জীবনমুক্ত রহে ভক্তগণ ।
মনোহর শ্রীপ্রভু কাছে যতক্ষণ ॥ ৪৫৮ ॥
সম্মুখে কেদারচন্দ্র চাটুয্যে উপাধি ।
ভক্তিপ্রেমে শ্রীপ্রভুর মগ্ন নিরবধি ॥ ৪৫৯ ॥
দেখিলেই প্রভুদেবে প্রায় বাক্যহারা ।
অবিরত বিগলিত দুনয়নে ধারা ॥ ৪৬০ ॥
ভাবেতে বিহ্বলহেতু এত চোখে পানি ।
জাহ্নবী যমুনা যেন নয়ন দুখানি ॥ ৪৬১ ॥
সন্নিকটে উপবিষ্ট প্রভুর আমার ।
শ্রীঅঙ্গেও কিছু কিছু ভাবের সঞ্চার ॥ ৪৬২ ॥
হেনকালে গৌরমাতা ভক্তি-অনুরাগে ।
থুইল ভোজন খাল শ্রীপ্রভুর আগে ॥ ৪৬৩ ॥
ভক্তপ্রিয় প্রভুদেব জগৎ-গোসাঁই ।
ভক্তের অধিক তাঁর আর কিছু নাই ॥ ৪৬৪ ॥
প্রাণসম ভক্তবর্গে একত্র দেখিয়া ।
অপার আনন্দে গেল উদর ভরিয়া ॥ ৪৬৫ ॥
দেখাইয়া গৌরমায় দেবীঠাকুরানী ।
বলিলেন কিছু তাঁর সংক্ষেপ কাহিনী ॥ ৪৬৬ ॥
শুনিয়া কেদারচন্দ্র মাতা সম্বোধিয়া ।
প্রণমিলা গৌরমায় শির নামাইয়া ॥ ৪৬৭ ॥
কেদারে করিতে মাই প্রতিনমস্কার ।
চারি চোখে দেখাদেখি হইল দোঁহার ॥ ৪৬৮ ॥
প্রেমাবেশে বিহ্বল কাঁদেন দুই জনে ।
আহা আহা বলেন শ্রীপ্রভু বদনে ॥ ৪৬৯ ॥
আপনে আপনি প্রভু হইয়া মগন ।
উঠিলেন পরিহরি নিজের আসন ॥ ৪৭০ ॥
কে আর আহার করে কেবা খায় ভাত ।
পাখলিয়া দিল ভক্তে অন্নমাখা হাত ॥ ৪৭১ ॥
কেহ দিল সম্মুখেতে তাম্বুল ধরিয়া ।
কেহ দিল হাতে হুঁকা তামাক সাজিয়া ॥ ৪৭২ ॥
ধরিয়া শ্রীহস্তে হুঁকা প্রভুদেবরায় ।
দাঁড়াইলা উত্তরদিকের বারাণ্ডায় ॥ ৪৭৩ ॥
যেইখানে বহু ভক্ত ছিল দাঁড়াইয়া ।
রঙ্গ দেখি শ্রীপ্রভুর অবাক হইয়া ॥ ৪৭৪ ॥
এখন শ্রীঅঙ্গে ভাব অতি মনোহর ।
সুন্দর হইতে দৃশ্য পরম সুন্দর ॥ ৪৭৫ ॥
আঁকিতে নাহিক শক্তি ভাবের চেহারা ।
আনন্দিত ভক্তবৃন্দ উন্মত্তের পারা ॥ ৪৭৬ ॥
ভাবেতে বিহ্বল বিষ্ণুভক্ত একজন ।
ভূমিতে পড়িল জড় যষ্টির যতন ॥ ৪৭৭ ॥
শ্রীমনোমোহন মিত্র উন্মত্তের প্রায় ।
হাসিয়া লুটিয়া পড়ে শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ৪৭৮ ॥
আনন্দের বন্যা যেন হৃদি উথলিয়া ।
বদন দুয়ারে যায় বাহির হইয়া ॥ ৪৭৯ ॥
কাহার ভাবেতে অঙ্গ জড়ের মতন ।
কোথায় গিয়াছে মোটে দেহে নাই মন ॥ ৪৮০ ॥
কেহ অর্ধবক্র ঠিক ধনুকের প্রায় ।
কেহ বা পতিত ভূমে বাহ নাই গায় ॥ ৪৮১ ॥
কেহ বা ঢলিয়া অঙ্গে পড়য়ে কাহার ।
কেহ অনিমিখ আঁখি শবের আকার ॥ ৪৮২ ॥
নিকটে দণ্ডায়মান বুদ্ধি আলখাল ।
হাতেতে প্রভুর হুঁকা কাঁপেন রাখাল ॥ ৪৮৩ ॥
শ্রীপ্রভুর লীলা-রঙ্গ নাহি যায় বলা ।
তিলেকে মন্দিরে হইল পাগলের মেলা ॥ ৪৮৪ ॥
আনন্দে উথলা হৃদি ভক্ত দত্ত রাম ।
উচ্চ নাদে গায় জয় রামকৃষ্ণনাম ॥ ৪৮৫ ॥
দশা দেখি সকলের প্রভু নারায়ণ ।
ভাব ভাঙ্গিবারে কৈলা অঙ্গ পরশন ॥ ৪৮৬ ॥
স্বভাবস্থ হয় সবে শ্রীহস্ত-পরশে ।
বলিবার নহে কথা ভাষা যায় ভেসে ॥ ৪৮৭ ॥
থালভরা প্রসাদ আছিল শ্রীমন্দিরে ।
ভক্তগণ খায় মহা আনন্দের ভরে ॥ ৪৮৮ ॥
প্রসাদে প্রসাদ জ্ঞান সমান সবার ।
একত্রে ভোজন নাই জাতির বিচার ॥ ৪৮৯ ॥