চতুর্থ খণ্ড

বিচিত্র ঠাকুরের বিচিত্র লীলা


জয় জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


অজ্ঞান-তমসাচ্ছন্ন দৃষ্টিশক্তি-হীন ।
দারুণ অবিদ্যাশক্তি বুদ্ধি পরিক্ষীণ ॥ ১ ॥

দেহ-সরোবরস্থিত মন-রূপ জল ।
বাসনা-পবনবেগে সতত চঞ্চল ॥ ২ ॥

আঁকিতে মহতী লীলা না পাই উপায় ।
অসাধ্য সাধন সাধে পড়িয়াছি দায় ॥ ৩ ॥

ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু তুমি ভাবেশ্বর ।
দয়াময় রামকৃষ্ণ লীলার সাগর ॥ ৪ ॥

লীলাময় লীলাপ্রিয় লীলার ঠাকুর ।
বিঘ্নবাধা কিঙ্করের সব কর দূর ॥ ৫ ॥

স্মরিয়া শ্রীপ্রভুদেবে কহি শুন মন ।
মহালীলা ঠাকুরের বিচিত্র কখন ॥ ৬ ॥

বিচিত্র ঠাকুর হেন কখন না শুনি ।
যেমন বলিবে তাঁয় সেইরূপ তিনি ॥ ৭ ॥

জানি না সৃষ্টিতে কেবা এই দেব ছাড়া ।
যে নামে যে ডাকে তাঁয় তাহে পায় সাড়া ॥ ৮ ॥

বিচিত্র অদ্ভুতকর্ম ভক্তজনে জানা ।
দেখিলেও আজীবন নাহি যায় চেনা ॥ ৯ ॥

একরূপে বহুরূপ লীলা সুমধুর ।
দেশীয় জাতীয় নহে বিশ্বের ঠাকুর ॥ ১০ ॥

বিচিত্র ভাবের বর্ণ কে করে নির্ণয় ।
শ্রীঅঙ্গ রঙ্গের ভূমে সমুদিত হয় ॥ ১১ ॥

কখন শ্রীঅঙ্গে হেন সমাধি গভীর ।
স-মন ইন্দ্রিয়-আদি প্রাণবায়ু স্থির ॥ ১২ ॥

শরীরবিজ্ঞানবিদ, দেহজ্ঞান ভারি ।
নানাবিধ পরীক্ষায় নাহি পায় নাড়ী ॥ ১৩ ॥

আঁখি-তারা অঙ্গুলির দ্বারা পরশন ।
তথাপি না হয় তাহে পলক-পতন ॥ ১৪ ॥

শারীরিক ক্রিয়াধর্ম লুপ্ত একেবারে ।
শরীর ব্যতীত কিছু থাকে না শরীরে ॥ ১৫ ॥



সমাধি দ্বিতীয় ধারা বিভিন্ন রকম ।
প্রাণের সঞ্চার দেহে রহে অনুক্ষণ ॥ ১৬ ॥

বদন প্রসন্নোজ্জ্বল চন্দ্রিমার পারা ।
অবিরত বিক্ষরিত আনন্দের ধারা ॥ ১৭ ॥

যেন কত প্রেমাস্পদ সঙ্গে আলিঙ্গন ।
অন্তরে উঠেছে তাই আনন্দ এমন ॥ ১৮ ॥

আনন্দ কেবলানন্দ আধেয় আধার ।
আনন্দপ্রতিম হেন নহে বর্ণিবার ॥ ১৯ ॥

আনন্দের ঘনমূর্তি করি দরশন ।
সান্নিধ্যে দর্শকবৃন্দে আনন্দে মগন ॥ ২০ ॥



কখন বা বাহ্যহীন নিদ্রিতের ন্যায় ।
দু-এক অস্ফুট বাণী বদনে বেরয় ॥ ২১ ॥

আদর আব্দার কভু কথোপকথনে ।
কোন্দল জগৎমাতা অম্বিকার সনে ॥ ২২ ॥

কখন বা অর্ধবাহ্যভূমে গুণমণি ।
'হুঁশ আছে হুঁশ আছে' বলেন আপনি ॥ ২৩ ॥

টলটল পা দুখানি আবেশ-বিহ্বলে ।
কভু গণ্ড বেয়ে ধারা পড়ে বক্ষঃস্থলে ॥ ২৪ ॥

কভু সাধারণ ভূমে মানুষের মত ।
ঈশ্বরীয় রঙ্গরস তত্ত্ব উক্তি কত ॥ ২৫ ॥

সুবেষ্টিত ভক্তবর্গে নানানপন্থীর ।
কখন চঞ্চল ভাব কখন গম্ভীর ॥ ২৬ ॥

সহজ সরল নগ্ন বালকের মত ।
পত্র-পতনের সরসর শব্দে ভীত ॥ ২৭ ॥

কখন কেশরী স্তব্ধ বিক্রম এমন ।
গম্ভীর গরজে ত্রস্ত কুলিশ-নিস্বন ॥ ২৮ ॥

কভু 'লোক পোক' জ্ঞানে পুরুষ উত্তর ।
কে জানে সে দিকপাল কিবা ক্ষিতীশ্বর ॥ ২৯ ॥

কখন বা দীনতায় তৃণ পরাজিত ।
ছোটবড়-নির্বিশেষে সম্মান বিহিত ॥ ৩০ ॥

তত্ত্ব-পিপাসুর পক্ষে পরম আত্মীয় ।
অন্তর বুঝিয়া তার যাহে হয় শ্রেয়ঃ ॥ ৩১ ॥

তাহাই প্রদান তায় পরম হরিষে ।
জাতি-বর্ণ-ধর্ম-পন্থা-ভাব-নির্বিশেষে ॥ ৩২ ॥

কখন বা উচ্চ-নীচ অভেদ-গিয়ান ।
যারে তারে সকলের সম্মান সমান ॥ ৩৩ ॥

সাদরে প্রদত্ত করে কারও গ্রহণ ।
কাহার অগ্রাহ্য তেঁহ যদিচ ব্রাহ্মণ ॥ ৩৪ ॥

কোথা বা গমন নহে সাধ্য-সাধনায় ।
কেহ বা বসিয়া ঘরে অনায়াসে পায় ॥ ৩৫ ॥

শত প্রার্থনায় কার কৃপা নাহি হয় ।
কোথাও বা অযাচকে পায় অতিশয় ॥ ৩৬ ॥

অন্তর্যামী এক পক্ষে পরম ঈশ্বর ।
বিভুরূপে সমভাবে সবার ভিতর ॥ ৩৭ ॥

অন্যপক্ষে ভেদাভেদ পাই দেখিবারে ।
ভাল-মন্দ তর-তম লীলার আসরে ॥ ৩৮ ॥

ভক্তজনে যত টান অন্যে তত নয় ।
বরাবর এই ধারা অবতারে বয় ॥ ৩৯ ॥

ভক্তগণ যেন তাঁর লীলারসে সাথী ।
তাঁরা যেন রথ তাহে প্রভু সারথি ॥ ৪০ ॥

ইহাদেরও মধ্যে দেখি দুইশ্রেণীভুক্ত ।
কাহারা বা নিকটের কাহারা দূরস্থ ॥ ৪১ ॥

কার্যেতে যদ্যপি দেখি দু প্রকার থাক ।
তথাপি একত্র যেন কলমির চাক ॥ ৪২ ॥

লক্ষ বুড়ি ডগা থাকে চাকের ভিতরে ।
একটিতে দিলে টান গোটা চাক নড়ে ॥ ৪৩ ॥

আর এক শ্রেণী আছে বহির্মুখ জাতি ।
পরিচয়ে শুন কহি তাঁদের প্রকৃতি ॥ ৪৪ ॥

বৃহদরণ্যানী মধ্যে মহা তরুবর ।
স্রষ্টার কৌশলে শিল্প সর্বাঙ্গসুন্দর ॥ ৪৫ ॥

নাহি আসে লক্ষ্যে শির গগন-বিভেদী ।
চৌদিকে বিস্তৃতি কাণ্ড শাখা-প্রশাখাদি ॥ ৪৬ ॥

অতিশয় ঘন পত্র বরন শ্যামল ।
যোজন-যোজন ব্যাপী ছায়া সুশীতল ॥ ৪৭ ॥

অপরূপ বৃক্ষে এক আশ্চর্য কৌশল ।
ভিন্ন ভিন্ন প্রশাখায় ভিন্ন ভিন্ন ফল ॥ ৪৮ ॥

আকারে বরনে ভাবে ভিন্ন ভিন্ন বটে ।
কিন্তু ফল সকলেই সমভাবে মিঠে ॥ ৪৯ ॥

তরুবর মুখরিত রহে দিনমানে ।
নানা জাতি বিহগের কূজনের গানে ॥ ৫০ ॥

কতই না আসে পাখী দূরান্তরে বাসা ।
এখানে কেবল পাকা ফলের লালসা ॥ ৫১ ॥

মুক্তকর তরুবর বিহঙ্গমগণে ।
অবিরত রুচিমত ফল-বিতরণে ॥ ৫২ ॥

যার যত ধরে পেটে পূর্ণোদরে খায় ।
ভরিলে উদর পরে স্ববাসে পলায় ॥ ৫৩ ॥

এইসব বিহগেরা বহির্মুখ জাতি ।
ফলের আশায় আসে না পোহায় রাতি ॥ ৫৪ ॥

প্রথমোক্তগণে নাহি ফলের পিয়াসা ।
সকাল বিকাল সম তরুবরে বাসা ॥ ৫৫ ॥

এই সব ভক্তবর্গ লীলার সহায় ।
যাদিগে লইয়া খেলা করিলেন রায় ॥ ৫৬ ॥

অবিহিত এই ভক্ত সাঙ্গোপাঙ্গ নামে ।
চিরসঙ্গ পরিচিত শ্রীপ্রভুর সনে ॥ ৫৭ ॥

তবে যে অচেনাবৎ বাল্যলীলাসরে ।
লীলার যে অঙ্গমাত্র জীব-শিক্ষা তরে ॥ ৫৮ ॥

আর লীলারঙ্গরস বর্ধন কারণ ।
স্বেচ্ছায় করেন যত ঐশ্বর্য গোপন ॥ ৫৯ ॥

আস্বাদন কর রস বুঝিয়া ব্যাপার ।
কলম কালিতে তত্ত্ব নহে আঁকিবার ॥ ৬০ ॥



কালের কুটিল গতি অকথ্য কথন ।
বর্তমানে নাই পূর্বে আছিল যেমন ॥ ৬১ ॥

হিন্দুধর্মরীতি-নীতি সব হত-প্রায় ।
ইংরেজী ভাষার শিক্ষা-দীক্ষার প্রভায় ॥ ৬২ ॥

জড় বিজ্ঞানের চর্চা বড়ই প্রবল ।
মত্ত যাহে নব্য সভ্য শিক্ষিতের দল ॥ ৬৩ ॥

স্থূল-যন্ত্র ইন্দ্রিয়াদি জনক জ্ঞানের ।
ইহাই কেবলমাত্র ধারণা তাঁদের ॥ ৬৪ ॥

মনোনীত সূক্ষ্মভূমি তাহার বারতা ।
গুনিলে শ্রবণে লাগে হিঁয়ালির কথা ॥ ৬৫ ॥

ত্যাগ-যোগ-তপস্যায় বুদ্ধি গোটা বাঁকা ।
রামায়ণ ভারতাদি কল্পনার লেখা ॥ ৬৬ ॥

ঈশ্বরের অবতারে পুরা অপ্রত্যয় ।
নরদেহে অখণ্ডের খণ্ডবোধ হয় ॥ ৬৭ ॥

ব্রাহ্মধর্ম-সমুজ্জ্বলে সব নিরাকার ।
সাকার-স্বীকারে বুঝে মাথার বিকার ॥ ৬৮ ॥

স্বল্পবয়ঃ সুকুমার সুকুমারী আদি ।
একতালে সকলেই নিরাকার-বাদী ॥ ৬৯ ॥

ঠাকুরের সাঙ্গেরাও তাঁহাদের সনে ।
কালধর্মে রঙিয়াছে সমান বরনে ॥ ৭০ ॥

চাঁই চাঁই ভক্ত যত নিরাকার-বাদী ।
কেশব বিজয় দুই সকলের আদি ॥ ৭১ ॥

শ্রীমহিম চক্রবর্তী চাটুয্যে কেদার ।
প্রভুর নরেন্দ্র যাঁর বিশাল আধার ॥ ৭২ ॥

হাজরা প্রতাপচন্দ্র নরেন্দ্রের মিতে ।
সখ্যতা সম্ভাবে হয়ে জড়িত পিরীতে ॥ ৭৩ ॥

জ্ঞানমার্গী উভয়েই নিরাকারে লক্ষ্য ।
সাকারে শ্রীনরেন্দ্রের বিষম কটাক্ষ ॥ ৭৪ ॥

মায়াবাদে মহাপতি অপার বিক্রমে ।
পণ্ডিত যদিও ভক্ত পরাজিত রণে ॥ ৭৫ ॥

শাস্ত্রীয় প্রমাণ ছাড়ে চোখা চোখা বাণ ।
প্রতিপক্ষ যদি প্রভু নাহিক এড়ান ॥ ৭৬ ॥

প্রথমাগমনকালে প্রভুর গোচর ।
জ্ঞান-ফণাযুক্ত এক এক বিষধর ॥ ৭৭ ॥

বিচিত্র ঠাকুর হেথা বিচিত্র কৌশল ।
জড়িগুণে উড়াইলা দারুণ গরল ॥ ৭৮ ॥

সমুন্নত ফণা আর নাহিক এখন ।
খোল-করতাল লয়ে হরি-সংকীর্তন ॥ ৭৯ ॥

কেহ মা মা কেহ কেহ কাঁদে হরিবোলে ।
সজল নয়নে লুটে প্রভু-পদতলে ॥ ৮০ ॥

ভাবের প্রাবল্যে কারও কণ্ঠ হয় রোধ ।
অঙ্গ কারও জড়বৎ নাহি বাহ্যবোধ ॥ ৮১ ॥

কারও বা খসিয়া পড়ে কটির বসন ।
কারও উচ্চহাসে হয় ভাব সংবরণ ॥ ৮২ ॥

অপরূপ প্রভু যেন অপরূপ খেলা ।
তিলেকে ভুলিয়ে দেন পাগলের মেলা ॥ ৮৩ ॥

প্রভুর আয়ত্তে যত মানুষের মন ।
সেইমত খেলে তিনি খেলান যেমন ॥ ৮৪ ॥



শক্তি-প্রতিবাদী-মধ্যে প্রধান কেশব ।
দুনিয়া জুড়িয়া যাঁর অশেষ গৌরব ॥ ৮৫ ॥

এবে তেঁহ দলে-বলে লয়ে মার নাম ।
পথে পথে সংকীর্তন করিয়া বেড়ান ॥ ৮৬ ॥

সত্যতত্ত্ব-অন্বেষক কেশব ধীমান ।
তদুপরি সেই হেতু শ্রীপ্রভুর টান ॥ ৮৭ ॥

বিবেক বৈরাগ্য ভক্তি দয়া সরলতা ।
নিষ্ঠা ত্যাগ অনুরাগ সাধুতা দীনতা ॥ ৮৮ ॥

যে আধারে বর্তমান সেই আপনার ।
হিন্দু কি যবন ম্লেচ্ছ নাহিক বিচার ॥ ৮৯ ॥

কেশবে সগুণ বহু তাহার প্রমাণ ।
কি বিষয়ী কিবা সাধু সবে দেয় মান ॥ ৯০ ॥

অপার প্রভুর কৃপা তাঁহার উপর ।
কেশবের রোগে শোকে শ্রীপ্রভু কাতর ॥ ৯১ ॥

রোগার্ত কেশব এবে জীবন-সংশয় ।
শুনিয়াই ঠাকুরের চিন্তা অতিশয় ॥ ৯২ ॥

দেখিতে গমন কৈলা পরান অস্থির ।
কেশব-ভবনে নাম কমল-কুটির ॥ ৯৩ ॥

অভ্যর্থনা করি তাঁর ব্রাহ্ম শিষ্যগণ ।
সদর মহলে দিল বসিতে আসন ॥ ৯৪ ॥

কিসেও নাহিক মন প্রভু একমনা ।
শ্রীকেশবে দেখিবারে কেবল বাসনা ॥ ৯৫ ॥

হেথা অন্তঃপুরে তেহ আছে শয্যাশায়ী ।
উঠিতে চলিতে দেহে শক্তি প্রায় নাই ॥ ৯৬ ॥

সেবাপর শিষ্যগণে প্রভুদেবে কয় ।
উঠিতে চলিতে তাঁর কষ্ট বড় হয় ॥ ৯৭ ॥

তদুত্তরে সমুৎসুকে কন প্রভুরায় ।
চল আমি নিজে যাই কেশব যেথায় ॥ ৯৮ ॥

হেন কালে ধীরে ধীরে কেশব হাজির ।
কলেবরে মাংস নাই কঙ্কালশরীর ॥ ৯৯ ॥

এখন ভাবস্থ প্রভু নাহি বাহ্য জ্ঞান ।
লুটাইয়া পদে করে কেশব প্রণাম ॥ ১০০ ॥

আজি নাহি কেশবের প্রণাম ফুরায় ।
যেন কি মিলেছে মিষ্টি শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ১০১ ॥

ঠাকুরের সঙ্গে যবে প্রথম মিলন ।
জানিত না শ্রীকেশব প্রণাম কেমন ॥ ১০২ ॥

জ্ঞানি-অভিমানে শির উচ্চে নাই আর ।
প্রভুর প্রসাদে এবে ভক্তির সঞ্চার ॥ ১০৩ ॥



ভাবেতে বিভোরচিত্ত প্রভু গুণমণি ।
বলিতে লাগিলা আদ্যাশক্তির কাহিনী ॥ ১০৪ ॥

সৃষ্টিরূপে আদ্যাশক্তি জীব ও জগৎ ।
চতুর বিংশতি তত্ত্ব নামে বলবৎ ॥ ১০৫ ॥

একমাত্র বস্তু ব্রহ্ম দুই ভাবে গতি ।
কখন পুরুষভাব কখন প্রকৃতি ॥ ১০৬ ॥

বিশেষ ভাঙ্গিয়া তত্ত্ব পুনঃ কন পিছে ।
থাকিলে পুরুষজ্ঞান মেয়েজ্ঞান আছে ॥ ১০৭ ॥

নির্গুণে পুরুষ আখ্যা পিতা নামে যিনি ।
সগুণে সৃষ্টিতে তেঁহ জগৎ-জননী ॥ ১০৮ ॥

মায়ের ধরম কর্ম লিপ্ত অনুক্ষণ ।
প্রসবাদি সযতনে লালন-পালন ॥ ১০৯ ॥

ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ যেবা যাহা চায় ।
মুক্তহস্তে বিতরণ করে সর্বদায় ॥ ১১০ ॥

জগমা নিজের মাতা নহে অন্যপর ।
মায়েতে সকল কর্ম ছেলের নির্ভর ॥ ১১১ ॥

মাতৃভাবে আত্মীয়তা অম্বিকার সনে ।
শেষ শিক্ষণ দেন প্রভু কেশব সজ্জনে ॥ ১১২ ॥



এ সময়ে বুঝেছেন সর্বজ্ঞ গোসাঞি ।
কেশবের দেহ রোগে রক্ষা পাবে নাই ॥ ১১৩ ॥

সেই হেতু ভক্তবরে আশ্বাসিয়া কন ।
অসুখে তোমার আছে বিশেষ কারণ ॥ ১১৪ ॥

ঈশ্বরীয় ভাব-হস্তী অতি মত্ততর ।
পীড়ন করেছে বহু দেহের ভিতর ॥ ১১৫ ॥

ক্ষীণতর দেহ-যন্ত্র গেছে ভাঙ্গা চুরা ।
তাহাই কেবল এই বিয়াধির গোড়া ॥ ১১৬ ॥

আগুন লাগিলে ঘরে হয় যে প্রকার ।
পুড়ায়ে কতক দ্রব্য করে ছারখার ॥ ১১৭ ॥

হৈ হৈ কাণ্ড এক তুলে তারপর ।
নিরানন্দ বিমরষ ভাব গুরুতর ॥ ১১৮ ॥

জ্ঞানাগ্নি তেমতি যার লাগে দেহঘরে ।
দেহবুদ্ধি সহ যত রিপুগণে মারে ॥ ১১৯ ॥

নষ্টশির অভিমান গুরু অহঙ্কার ।
পরিণামে দেহ মধ্যে তুলে মহামার ॥ ১২০ ॥

এই মহামারে দেহ-যন্ত্র বিশৃঙ্খল ।
ঈশ্বরীয় ভাবাদির প্রাবল্যের ফল ॥ ১২১ ॥

রবে না এ দেহ আর সঙ্কেতের তরে ।
বুঝাইতে প্রভুদেব প্রিয় ভক্তবরে ॥ ১২২ ॥

বসরাই গোলাপের উপমায় কন ।
কর্মদক্ষ উদ্যানের মালী যেরকম ॥ ১২৩ ॥

যাবতীয় গোলাপের গাছ খুঁড়ে তুলে ।
শীতের শিশিরে সিক্ত করিবারে মূলে ॥ ১২৪ ॥

যাহাতে পোষ্টাই বৃদ্ধি গাছের গৌরব ।
প্রফুল্ল কুসুম কালে করিবে প্রসব ॥ ১২৫ ॥

তাই বুঝি জগতের মালী ভগবান ।
ভাবাবেগে নষ্ট স্বাস্থ্য দেহ বর্তমান ॥ ১২৬ ॥

মূলসহ তুলিছেন পরম যতনে ।
ঘটাতে বিরাট কাণ্ড আগামী জনমে ॥ ১২৭ ॥

এইখানে এক প্রশ্ন পার করিবারে ।
প্রভুর পিরীতি এত যাহার উপরে ॥ ১২৮ ॥

মুক্তি না হইয়া তাঁর পুনর্জন্ম কেনে ।
কহি তার তত্ত্ব সার শুন এক মনে ॥ ১২৯ ॥

মানযশাকাঙ্ক্ষী বড় ছিলেন কেশব ।
দেশেতে যাহাতে উঠে নামের গৌরব ॥ ১৩০ ॥

শিষ্যদলবলপুষ্টি পরিণাম ফল ।
ইহাই বাসনা সাধ অন্তরে প্রবল ॥ ১৩১ ॥

বহু পূর্বে ঠাকুরের কেশবের সনে ।
নানাবিধ তত্ত্বালাপ কথোপকথনে ॥ ১৩২ ॥

বলিয়াছিলেন প্রভু প্রেমের গোসাঞি ।
গুরু কৃষ্ণ বৈষ্ণবেতে ভিন্ন ভেদ নাই ॥ ১৩৩ ॥

শুনিয়াই শিহরাঙ্গ আচার্যাভিমানী ।
প্রভুকে বিনয়ে কন জুড়ি দুই পাণি ॥ ১৩৪ ॥

যদি আমি মানি এই কথা আপনার ।
দলবল কিছু নাহি থাকিবে আমার ॥ ১৩৫ ॥

এইখানে কেশবের মন বুঝ মন ।
আচার্যাভিমান মনে প্রবল কেমন ॥ ১৩৬ ॥

বাসনা না হৈলে ক্ষয় ব্রহ্মসিদ্ধ কোথা ।
তাই কেশবের পর জন্মের ব্যবস্থা ॥ ১৩৭ ॥

বাসনা বিষম ব্যাধি ইষ্ট-সিদ্ধি-পথে ।
নিয়ে আকর্ষণ ঊর্ধ্বে নাহি দেয় যেতে ॥ ১৩৮ ॥

ধরাতলে ভবরোগ এবে পরিপূর্ণ ।
চিকিৎসার জন্য প্রভু বৈদ্য অবতীর্ণ ॥ ১৩৯ ॥

শ্রীপ্রভুর চিকিৎসায় কেশব এখন ।
ঈশ্বরীয় নামরূপভাবে নিমগন ॥ ১৪০ ॥



সহধর্মী কেশবের গোস্বামী বিজয় ।
এবে তাঁর অবস্থার শুন পরিচয় ॥ ১৪১ ॥

মহানৃত্য সংকীর্তনে নাচে হরিবোলে ।
ভাবেতে বিভোর কভু লুটান ভূতলে ॥ ১৪২ ॥

নিশিদিন হরিকথা ছাড়িতে না চায় ।
ধ্যানে লীলা-আন্দোলনে কালে না কুলায় ॥ ১৪৩ ॥

দেখিলে বিগ্রহ-মূর্তি সাষ্টাঙ্গ তখনি ।
গড়ইয়া গুরুদেহ লুটায় অবনী ॥ ১৪৪ ॥

দেশজুড়ে ব্যাপ্ত নাম ব্রাহ্ম মিশনারি ।
তাঁদের বেতন লয়ে করেন চাকরি ॥ ১৪৫ ॥

এবে তাঁর ভাবান্তর করি দরশন ।
নিন্দাবাদ করে যত ব্রাহ্মভ্রাতাগণ ॥ ১৪৬ ॥

সত্যতত্ত্ব-অন্বেষক ব্রাহ্মণ-সন্তান ।
ভ্রাতাদের প্রতিবাদে নাহি দেন কান ॥ ১৪৭ ॥

তত্বে মত্ত ধন-মানে নাহি আর মন ।
প্রভুর রূপায় লব্ধ অমূল্য রতন ॥ ১৪৮ ॥

নামরূপে মগ্ন মন অনুক্ষণ রহে ।
ভাবের আবেগে তত্ত্ব বক্তৃতায় কহে ॥ ১৪৯ ॥

দুনয়নে অশ্রুধারা বহে অনর্গল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ১৫০ ॥



রসিক-প্রবর প্রভু রসের আকর ।
ভক্তিরস লয়ে লীলা-খেলা নিরন্তর ॥ ১৫১ ॥

পাষাণ সরস যাহে স্বভাব ছাড়িয়ে ।
আজন্ম বিশুদ্ধ তর্ক উঠে মঞ্জরিয়ে ॥ ১৫২ ॥

বিচিত্র প্রসঙ্গ রঙ্গ বিচিত্র ব্যাপার ।
বিচিত্র কালের মত বিচিত্রাবতার ॥ ১৫৩ ॥

অযোধ্যা আশ্চর্য লীলা তত্ত্ব যে রকম ।
কৌতুকরহরঙ্গে কিছু নহে কম ॥ ১৫৪ ॥

অকর্তব্য একরূপে নহে বর্ণিবার ।
অন্যরূপে অপরূপ রসের ভাণ্ডার ॥ ১৫৫ ॥

সমুন্নত-ফণা যত জ্ঞানমার্গিগণে ।
ডমরু বাজায়ে প্রভু খেলান যেমনে ॥ ১৫৬ ॥

অভিনয় রঙ্গমঞ্চে বঙ্গের উপর ।
যেমন বিচিত্র তেন অতীব সুন্দর ॥ ১৫৭ ॥

লীলা-চিত্র দেখ মন ভাষার দুয়ারে ।
প্রথমে কানের কাজ নয়নের পরে ॥ ১৫৮ ॥

প্রথমাভিনয়ে জ্ঞানমার্গী শ্রীমহিম ।
জ্ঞান-অভিমান-তেজে অপার অসীম ॥ ১৫৯ ॥

পঞ্চদশী বেদান্তের বুলি আউড়িয়া ।
দিতেন আগোটা মঞ্চ আঁধার করিয়া ॥ ১৬০ ॥

চলনে গম্ভীরভাব গম্ভীরে আসন ।
সমুন্নত শিরোদেশ বিভেদি গগন ॥ ১৬১ ॥

এবে তেঁহ অবনত প্রভুর চরণে ।
দিয়া তালি হরি বলি নাচে সংকীর্তনে ॥ ১৬২ ॥

লম্বে চারিহস্তপূর্ণ সুদীর্ঘ গড়ন ।
অনুরূপ অবয়ব তাহার মতন ॥ ১৬৩ ॥

গুরুতর কলেবর অপরূপ সাজে ।
নাচেন যখন তেঁহ কীর্তনের মাঝে ॥ ১৬৪ ॥

গিয়াছে পূর্বের ফণা বিচার-গরল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ১৬৫ ॥



এইবার শ্রীপ্রভুর নরেন্দ্রের কথা ।
অবতার মায়াবাদে খালি নাড়ে মাথা ॥ ১৬৬ ॥

মায়া-প্রতিবাদে ছিল প্রভুকে উত্তর ।
ঘটিবাটি আদি করি তোমার ঈশ্বর ॥ ১৬৭ ॥

ভৌতিক প্রপঞ্চ খেলা সত্য কোন খানে ।
জড়েতে চৈতন্য জ্ঞান করিব কেমনে ॥ ১৬৮ ॥

ঈশ্বরীয় রূপ যাহা কর দরশন ।
মনের তোমার তাহা সে কেবল ভ্রম ॥ ১৬৯ ॥

আশ্চর্য হইয়া প্রভু কন তদুত্তরে ।
তাহারা যে কথা কয় পাই শুনিবারে ॥ ১৭০ ॥

শাস্ত্রের সঙ্গেতে মিলে সেই সব বাণী ।
তোর প্রতিবাদ কভু শুনিব না আমি ॥ ১৭১ ॥

তার প্রতিবাদে ভক্ত কহিত তখন ।
শ্রবণও ভ্রমের কর্ম দর্শন যেমন ॥ ১৭২ ॥

অবতারবাদে তর্ক অতি ঘোরতর ।
ধরিয়া মানুষদেহ আসেন ঈশ্বর ॥ ১৭৩ ॥

একথা বিশ্বাস মুই করিব কেমনে ।
উপযুক্ত যুক্তিযুক্ত প্রমাণ বিহনে ॥ ১৭৪ ॥

প্রভুপক্ষ-সমর্থনে অন্য জন ভাষে ।
ঈশ্বরের অবতার কেবল বিশ্বাসে ॥ ১৭৫ ॥

ইহাতে প্রমাণ কিবা তর্ক কি বিচার ।
বিশ্বাসে প্রত্যক্ষীভূত হন অবতার ॥ ১৭৬ ॥

যতকিছু নামরূপে হেরি মহীতলে ।
সকলেরে বস্তু বলি বিশ্বাসের বলে ॥ ১৭৭ ॥

মাটিকে যে মাটি বলি জলে বলি জল ।
বিশ্বাস ইহাতে মাত্র প্রমাণ কেবল ॥ ১৭৮ ॥

সেইমত অবতারে অবতার-জ্ঞান ।
বিশ্বাসের বলে হয় বিশ্বাস-প্রমাণ ॥ ১৭৯ ॥

অবতারে নরবুদ্ধি হয় যে জনার ।
বুঝিতে হইবে হেতু বুদ্ধির বিকার ॥ ১৮০ ॥

স্বভাবে শর্করা মিষ্ট তিক্ত লাগে যদি ।
জলন্ত লক্ষণ তার রসনায় ব্যাধি ॥ ১৮১ ॥

তবে কথা হেন জনে এতেক সংশয় ।
বড় গাছে বড় ঝড় জনশ্রুতি কয় ॥ ১৮২ ॥

তীক্ষ্ণসূক্ষ্মবুদ্ধি-যুক্ত এই ভক্তবর ।
বুঝিতে নিগূঢ় তত্ত্ব অতীব তৎপর ॥ ১৮৩ ॥

নিরন্তর তীক্ষ্ণদৃষ্টি আছিল তাঁহার ।
কি হেতু প্রভুকে অন্যে কহে অবতার ॥ ১৮৪ ॥

বহু পরীক্ষার পর ধারণা এখন ।
প্রভুদেবে অমানুষী শক্তি বিলক্ষণ ॥ ১৮৫ ॥

ভাবি-দৃষ্ট প্রভু যাহা করেন বাখান ।
ঘটনায় মিলে পরে দেখিবারে পান ॥ ১৮৬ ॥

কাজেই আশ্চর্য হয়ে মনে মনে ভাবে ।
অবশ্বই ঐশী কিছু আছে প্রভুদেবে ॥ ১৮৭ ॥

কখন বিশ্বাস কভু অবিশ্বাস করে ।
সর্বদা দোলায়মান স্বভাবের জোরে ॥ ১৮৮ ॥

কৌশলে খেলিয়া তারে ধীরে ধীরে রায় ।
আনিছেন লীলা-কার্যে ভক্তির সীমায় ॥ ১৮৯ ॥

গিয়ান-বিচার-তর্ক বহু এবে গেছে ।
ঠাকুরের সঙ্গে ভাবে সংকীর্তনে নাচে ॥ ১৯০ ॥

দুনয়নে অশ্রু কভু বহে অনর্গল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ১৯১ ॥

অশ্রু দেখি ঠাকুরের পরম আনন্দ ।
বলিতেন আজি ভারি কেঁদেছে নরেন্দ্র ॥ ১৯২ ॥



প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ যত আছিলেন জ্ঞানী ।
ঠাকুরের শ্রীগোচরে করিত মেলানি ॥ ১৯৩ ॥

সকলেই ভক্তিপদে রসাইলা রায় ।
সংকীর্তনে সকলেই নাচে কাঁদে গায় ॥ ১৯৪ ॥

ভাবের প্রভাবে কেহ কেহ বা বিহ্বল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ১৯৫ ॥

আর এক ঠাকুরের শুন বিচিত্রতা ।
শ্রবণ-মঙ্গল রামকৃষ্ণ-গুণগাথা ॥ ১৯৬ ॥

যে কোন ভাবের ভক্ত আসে শ্রীগোচর ।
সরল অন্তর সহ শ্রদ্ধা ভক্তিপর ॥ ১৯৭ ॥

সকলেই সমভাবে দেখিবারে পায় ।
তাঁদের ভাবের লোক রামকৃষ্ণ রায় ॥ ১৯৮ ॥

ব্রহ্মজ্ঞানিগণে দেখে প্রভু ব্রহ্মজ্ঞানী ।
বিষ্ণুভক্তে দেখেন বৈষ্ণব-চূড়ামণি ॥ ১৯৯ ॥

দেখেন পরমহংস বেদান্তবাদীরা ।
কৌল দেখে শাক্তগণ শক্তি ভজে যারা ॥ ২০০ ॥

বাউল বৈষ্ণবে দেখে তাহাদের সাঁই ।
কর্তাভজাগণ দেখে সহজ গোসাঞি ॥ ২০১ ॥

যীশুর প্রভাব চোখে দেখে খ্রীষ্টিয়ানে ।
শাস্ত্রের জ্বলন্ত মূর্তি দেখে শাস্ত্রিগণে ॥ ২০২ ॥

সাঙ্গোপাঙ্গ ভক্তগণে দেখিবারে পান ।
লীলাপর একেশ্বর বিভু ভগবান ॥ ২০৩ ॥

বিশ্বগুরু কল্পতরু স্বয়ম্ভু আপুনি ।
ভাবমুখে অবস্থিত সৃষ্টির জননী ॥ ২০৪ ॥

অদ্বৈত চৈতন্য নিত্যানন্দ একাধারে ।
দীনবন্ধু কর্ণধার ভবসিন্ধু-পারে ॥ ২০৫ ॥



করুণায় কি বিচিত্র প্রভু গুণমণি ।
একমনে শুন মন বিচিত্র কাহিনী ॥ ২০৬ ॥

তুলনা কি পরিমাণ নাহি করুণার ।
সাগর গোষ্পদ এত অকূল অপার ॥ ২০৭ ॥

লীলার পশরা-মধ্যে রূপা কানে কান ।
কৃপাঘন শ্রীমূরতি লোচনাভিরাম ॥ ২০৮ ॥

জলভারাক্রান্ত যেন ঘন বরিষার ।
হেঁকে ডেকে চারিদিকে ছুটে অনিবার ॥ ২০৯ ॥

জল দিতে অবনীতে বিশুষ্কাতিশয় ।
জীবে রূপাদানে তেন প্রভু দয়াময় ॥ ২১০ ॥

স্থানাস্থান নাই জ্ঞান সতত চঞ্চল ।
ত্রিতাপ-সন্তপ্ত চিতে করিতে শীতল ॥ ২১১ ॥

মনে নাই ক্ষুধা-তৃষা অশন-শয়ন ।
অহোরাত্র কর্মমাত্র রূপা-বরিষণ ॥ ২১২ ॥

ফুলহারা বসুন্ধরা বিচিত্র-নির্মাণ ।
লীলাপ্রিয় ঈশ্বরের খেলিবার স্থান ॥ ২১৩ ॥

মরুর সমান এবে কামের কল্মষে ।
অবিদ্যা যতেক রস লইয়াছে শুষে ॥ ২১৪ ॥

অবিদ্যা-সেবনে মত্ত দেখি জীবগণে ।
আগও তিতিয়ে অশ্রু ঝরে দুনয়নে ॥ ২১৫ ॥

নিত্যানন্দ নিরানন্দ পরান বিকল ।
দ্বাদশবৎসর-ব্যাপী সাধনার ফল ॥ ২১৬ ॥

জীবের কল্যাণে কৈলা সমস্ত প্রদান ।
শেষেতে বিগ্রহ বহু তাও বলিদান ॥ ২১৭ ॥

মাতৃগতপ্রাণ প্রভু অম্বিকার ছেলে ।
আহার বিহার খেলা অম্বিকার কোলে ॥ ২১৮ ॥

মায়ে পোয়ে এক হয়ে ভাবেতে বিভোর ।
বিকল পরান বহে তৃনয়নে জোর ॥ ২১৯ ॥

কৈলা কিবা অঙ্গীকার-সহ আশাবাণী ।
শুন সুধামাখা জগ-কল্যাণ-কাহিনী ॥ ২২০ ॥

"ও মা, যারা যারা সব আসিবে এখানে ।
একমাত্র আলম্বন আন্তরিক টানে ॥ ২২১ ॥

সরল অন্তর খোলা হৃদয়-নিলয় ।
তাহারা যেন মা সিদ্ধ সকলেই হয়” ॥ ২২২ ॥

ইহাতেও মনোমত তুষ্ট না হইয়ে ।
আবার কহেন প্রভু মায়ে সম্বোধিয়ে ॥ ২২৩ ॥

"ও মা, যারা যারা সব আসিবে এখানে ।
বিশ্বাস প্রত্যয় সহ সুসরল মনে ॥ ২২৪ ॥

অমনি চৈতন্ত্যোদয় হবে সবাকার ।
তপ-জপ-সাধনাদি নাহি দরকার" ॥ ২২৫ ॥

বিচিত্র ঠাকুর হেন দুর্লভ ভুবনে ।
ভবসিন্ধুপার যাঁর মাত্র দরশনে ॥ ২২৬ ॥

রতি-মতি শ্রীচরণে রাখি অনুক্ষণ ।
লীলা-গীতি সুমধুর কর আকর্ষণ ॥ ২২৭ ॥



করুণাপ্রতিম প্রভু বেদবিধি ছাড়া ।
করুণার উপাদানে মূর্তিখানি গড়া ॥ ২২৮ ॥

সান্ত নর-তনু কিন্তু অনন্ত আধার ।
সাগর গোষ্পদবৎ তুলনে তাহার ॥ ২২৯ ॥

প্রকাণ্ডতা পক্ষে নাহি আসে কল্পনায় ।
ডুবিলেও গোটা বিশ্ব তলাইয়া যায় ॥ ২৩০ ॥

এ হেন আধারে মোর প্রভুর আমার ।
আধেয় করুণা বই কিছু নাহি আর ॥ ২৩১ ॥

উত্তাল তরঙ্গ তাহে সদা উথলিত ।
শ্রীমুখ উৎসার দ্বারে করে অবিরত ॥ ২৩২ ॥

আবেগে আবেশভরে কহেন আপনে ।
সম্বোধিয়া কৃপাপ্রার্থী ভাগ্যবানগণে ॥ ২৩৩ ॥

এখানে নির্ভর আর বিশ্বাস করিলে ।
মা-কালী সাধিয়া দিবে কার্য অবহেলে ॥ ২৩৪ ॥

আবেশের ভরে আমি কহিলাম হেথা ।
মা সব করিয়া দিবে হবে না অন্যথা ॥ ২৩৫ ॥

করুণা কোমল কিন্তু তাহে এত বল ।
পরং ব্রহ্ম সনাতন যাহে টলমল ॥ ২৩৬ ॥

অটল সচ্চিদানন্দ চঞ্চল অস্থির ।
ধরায় আনিয়া তুলে ধরায়ে শরীর ॥ ২৩৭ ॥

এইখানে মানুষেরা বড় আলখাল ।
সকল কুবুদ্ধি ঘটে অতীব জঞ্জাল ॥ ২৩৮ ॥

কহে যে সান্তের মধ্যে অনন্তের সত্তা ।
ভাণ্ডেতে ব্রহ্মাও ইহা প্রলাপীর কথা ॥ ২৩৯ ॥

আরে মন দেখ দেখ বুদ্ধির বাহার ।
বিচার বিতর্কযুক্তি কিবা চমৎকার ॥ ২৪০ ॥

মীমাংসা-সিদ্ধান্ত শেষে এই হৈল ইতি ।
পুরাণাদি গীতা গাথা প্রলাপীর উক্তি ॥ ২৪১ ॥

শুক-ব্যাস-নারদাদি না পাইলা ঠাঁই ।
মরি মন লয়ে হেন বুদ্ধির বালাই ॥ ২৪২ ॥

এই সৃষ্টি সৃষ্টি যার নির্মাণ কৌশল ।
জীবের বুঝিতে তাঁয় কিবা আছে বল ॥ ২৪৩ ॥

ইহা না বুঝিয়া যেবা বুদ্ধি করে অন্য ।
সে জন মানুষ নয় পশুমধ্যে গণ্য ॥ ২৪৪ ॥

মায়ার অপার খেলা কে বুঝিতে পারে ।
যে চাবিতে খুলে তালা তাহে বন্ধ করে ॥ ২৪৫ ॥



ভক্তিহীনে ধরাতল রসাতলে গত ।
কুলাল-চক্রের ন্যায় মোহে বিঘূর্ণিত ॥ ২৪৬ ॥

দারুণ দুর্দশাগ্রস্ত দুঃস্থ অতিশয় ।
দেখিয়া করুণাকর প্রভু দয়াময় ॥ ২৪৭ ॥

সত্ত্বের ঐশ্বর্যে অবতীর্ণ ধরাদেশে ।
দীন-দুঃখী নিরক্ষর ব্রাহ্মণের বেশে ॥ ২৪৮ ॥

এবে সত্ত্ব প্রায় না মিলে আঘ্রাণ ।
তমে রজে তুলিয়াছে তুমুল তুফান ॥ ২৪৯ ॥

সত্ত্বের ঐশ্বর্য শুদ্ধ আধ্যাত্মিকে খেলা ।
জৈব বুদ্ধি কি বুঝিবে অবিজ্ঞায় ঘোলা ॥ ২৫০ ॥

তাই প্রভু বলিলেন করি উচ্চ রব ।
বারেক শ্রীকৃষ্ণ যেবা বারেকে রাঘব ॥ ২৫১ ॥

সেইজন অবতীর্ণ এবে ধরাধামে ।
জীবের উদ্ধার-হেতু রামকৃষ্ণ নামে ॥ ২৫২ ॥

পূর্ণ আবির্ভাব মোর এই অবতারে ।
অদ্বৈত চৈতন্য নিত্যানন্দ একাধারে ॥ ২৫৩ ॥

লক্ষণে বুঝিতে বস্তু কহিলেন রায় ।
যে আধার ভাসে ভক্তি প্রেমের বন্যায় ॥ ২৫৪ ॥

কখন পিশাচ কভু পাগলের পারা ।
কখন বা জড় কভু বালকের ধারা ॥ ২৫৫ ॥

হাসে নাচে কাঁদে গায় বিহ্বল-পরানী ।
বুঝে নিবে সে আধারে অবতীর্ণ তিনি ॥ ২৫৬ ॥

জন্মাবধি যত কর্ম পরার্থে কেবল ।
দেহ-দান যদি তাহে জীবের মঙ্গল ॥ ২৫৭ ॥

এতেক দেখিয়া যেবা পরিহার করে ।
সে নহে মানুষ-বাচ্য পশু বলি তারে ॥ ২৫৮ ॥

ভক্তিহীন কুলিশ কর্কশ এই কাল ।
ভক্তিরসে তাহে প্রভু করিলা রসাল ॥ ২৫৯ ॥

ধীরে ধীরে অলক্ষ্যেতে চালাইয়া কল ।
বিচিত্র শ্রীঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ॥ ২৬০ ॥



কি মহিমা শ্রীরায়ের অমৃত কখন ।
শ্রীপদে উপজে ভক্তি করিলে শ্রবণ ॥ ২৬১ ॥

জ্ঞান কর্ম ভক্তি এই ত্রিবিধ উপায় ।
তিনেরি জ্বলন্ত মূর্তি ঠাকুর শ্রীরায় ॥ ২৬২ ॥

কিন্তু ভক্তিপথে কর্ম সাধিবার তরে ।
শুন কিবা উপদেশ দিলা বারে বারে ॥ ২৬৩ ॥

অন্তরযামিত্বরূপে প্রভু বিশ্বপতি ।
নাম-রূপ-উপাধিতে বিরাট মূরতি ॥ ২৬৪ ॥

অন্তরে বাহিরে দুয়ে ব্যাপ্ত চরাচর ।
আধ্যাত্মিক রাজ্যের একক অধীশ্বর ॥ ২৬৫ ॥

কোথা কিবা আছে আর কোথা কিবা নাই ।
পুষ্প-অনুপুঙ্খরূপে বিদিত গোসাঞি ॥ ২৬৬ ॥

দেশকালপাত্র দেখি এবে ভগবান ।
জ্ঞান-কর্ম বাদে দিলা ভক্তির বিধান ॥ ২৬৭ ॥

জ্ঞানপক্ষে কি কহিলা শুন পরিচয় ।
কলিকালে জ্ঞানমার্গ কঠিনাতিশয় ॥ ২৬৮ ॥

স্বল্পায়ু মানুষ এবে অন্নগত প্রাণ ।
তদুপরি দেহবুদ্ধি ঘটে বলবান ॥ ২৬৯ ॥

দেহধর্মে ক্ষুধাতৃষ্ণা আছে বিলক্ষণ ।
দেহরক্ষা হেতু তাহা অবশ্য পালন ॥ ২৭০ ॥

অপালনে একুশ দিনের বেশী নয় ।
হইবে দেহের নাশ অতীব নিশ্চয় ॥ ২৭১ ॥

সে হেতু শরীরে 'নেতি' করিবে কেমনে ।
অগ্রাহ করিতে গ্রাহ্য নিষেধ গমনে ॥ ২৭২ ॥

দেহ নামধেয় দেখ এই যে শরীর ।
আশ্রয় আবাস নামে রোগের মন্দির ॥ ২৭৩ ॥

যন্ত্রণায় ছট ফট, ব্যাধির জ্বালায় ।
কি করিয়া 'নেতি নেতি' কহিবে তাহায় ॥ ২৭৪ ॥

দেহবুদ্ধি অহঙ্কার যাইবার নয় ।
তাই জ্ঞানমার্গে গতি কঠিনাতিশয় ॥ ২৭৫ ॥



জ্ঞানাপেক্ষা কর্মকাণ্ড আরও যে শক্ত ।
শুনিলে অসাধ্য বিধি শুষ্ক হয় রক্ত ॥ ২৭৬ ॥

ফলাকাঙ্ক্ষা না করিয়া কর্মের নিয়ম ।
জীবের অসাধ্য জ্ঞানপথের মতন ॥ ২৭৭ ॥

যতই না কর চেষ্টা নিষ্কামের বাটে ।
অলক্ষ্যে অজ্ঞাতে কাম স্বতঃ এসে জুটে ॥ ২৭৮ ॥

ক্রমশঃ কর্মের বৃদ্ধি যেখানে কামনা ।
চিঁড়ের বাইশ ফের না হয় গণনা ॥ ২৭৯ ॥

কর্মতরুবর অতি প্রকাণ্ড বিশাল ।
কর্মফল প্রসবয়ে যতকাল কাল ॥ ২৮০ ॥

কর্মফলে আনাগোনা জনম-মরণ ।
আগোটা কালেও নাহি হয় সংকুলন ॥ ২৮১ ॥

তাই কর্মকাণ্ড-বাটে হওয়া অগ্রসর ।
ক্ষীণ মন-প্রাণ জীবে অতীব দুষ্কর ॥ ২৮২ ॥

এবে ঘোরতর তমে মানুষ-নিকর ।
অজ্ঞান অবোধ নিম্নদৃষ্টি নিরন্তর ॥ ২৮৩ ॥

সতত প্রমত্তচিত্ত অবিদ্যা-সেবায় ।
দ্বেষ হিংসা প্রবঞ্চনা কর্ম ব্যবসায় ॥ ২৮৪ ॥

ধর্ম-পুণ্যশূক্ত পরিপূর্ণ হাহারোল ।
সুখের মুকুটধারী দুঃখে দেয় কোল ॥ ২৮৫ ॥

হীন হেয় পথে গতি মতি সর্বদায় ।
কোটি জনমেও নাহি নিস্তার-উপায় ॥ ২৮৬ ॥

জীবের দুর্গতি দেখি দুর্গতিবারণ ।
পাপতাপ কর্মফল কপালমোচন ॥ ২৮৭ ॥

দয়াকর সর্বেশ্বর দয়ায় অস্থির ।
অবতীর্ণ ধরাধামে ধরিয়া শরীর ॥ ২৮৮ ॥

দেশকালে বুঝিয়া জীবের দুরবস্থা ।
করিলেন নারদীয় ভক্তির ব্যবস্থা ॥ ২৮৯ ॥

রূপাকার রুচি মত যার যেন মন ।
স্মরণ-মননোপায় নাম সংকীর্তন ॥ ২৯০ ॥

ইহাতে জীবের হবে পরম কল্যাণ ।
জন্মজন্মার্জিত কর্মফলে পরিত্রাণ ॥ ২৯১ ॥

অব্যর্থ আশ্বাসবাক্য প্রভুর আমার ।
অচল টলিবে, বাক্য নহে টলিবার ॥ ২৯২ ॥

সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য ।
ছুটাইতে ধরণীতে ভকতির বন্যা ॥ ২৯৩ ॥

ভক্তিপ্রিয় বলিলেন নিজে বার বার ।
ঈশ্বরেতে ভালবাসা ভক্তিমাত্র সার ॥ ২৯৪ ॥

নামাইলা জ্ঞানমার্গী ভকতনিকরে ।
নাচিতে গাইতে ভক্তি কীর্তন-আসরে ॥ ২৯৫ ॥

দয়ার্ণব ঠাকুরের বিচিত্র কৌশল ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা ভুবন-মঙ্গল ॥ ২৯৬ ॥