চতুর্থ খণ্ড
ভক্তদের সঙ্গে নানা রঙ্গ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুর লীলা-কথা বুঝা মহাদায় ।
বিষয়ী মলিন বুদ্ধি ধরিয়া মাথায় ॥ ১ ॥
সরল সহজ লীলা বাঁকা বোধ কেনে ।
অন্তরেতে অবিশ্বাস এই তার মানে ॥ ২ ॥
উপমায় বিশেষিয়া দেখ তুমি মন ।
জল বাঁকা নহে, বাঁকা নদীর গঠন ॥ ৩ ॥
লীলাকথা-আন্দোলনে বাঁকা সোজা হয় ।
রামকৃষ্ণলীলা-কথা যাহার প্রত্যয় ॥ ৪ ॥
অখিল বিশ্বের স্বামী প্রভুদেব রায় ।
সঙ্গে আনা আপ্তজনা ভক্ত বলি যায় ॥ ৫ ॥
অবতার শ্রীপ্রভুর শ্রীঅঙ্গে জনমে ।
তবু কেন গাই তাঁয় অবতার নামে ॥ ৬ ॥
তাহার কারণ মন তোমারে শুনাই ।
ভাষায় প্রভুর বাচ্য প্রতিশব্দ নাই ॥ ৭ ॥
পুঁথিমধ্যে প্রভুদেবে অবতার লেখা ।
ঠিক যেন জলধিরে সরোবর আঁকা ॥ ৮ ॥
সেইমত প্রভু-ভক্তে দিয়া ভক্তনাম ।
দেখাইনু হিমাচলে বালির সমান ॥ ৯ ॥
প্রভু-ভক্ত করুণার করিলে কটাক্ষ ।
তখনি জনমে কত ভক্ত লক্ষ লক্ষ ॥ ১০ ॥
হেন বস্তু প্রভু হেন বস্তু ভক্ত তাঁর ।
ভক্তিভরে শুন লীলা ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১১ ॥
প্রভু ভক্ত পদে মতি রাখি বিলক্ষণ ।
চলিলে পাইবে রামকৃষ্ণভক্তি-ধন ॥ ১২ ॥
বৃথায় জনম নষ্ট বুঝিবে নিশ্চয় ।
প্রভু-ভক্ত-পদে যদি মতি নাহি হয় ॥ ১৩ ॥
সুদুর্লভ প্রভু ভক্তি মিলয়ে সহজে ।
এক পন্থা প্রভু-ভক্ত চরণের রজে ॥ ১৪ ॥
শুন তবে খুলে বলি মধুর কথন ।
রেলের কলের মত প্রভু-ভক্তগণ ॥ ১৫ ॥
এক এক ভক্ত এত শক্তি ধরে গায় ।
হাজার বোঝাই গাড়ি নিজে টেনে যায় ॥ ১৬ ॥
রঙ্গালয় থিয়েটার অতিশয় হীন ।
লম্পট বেশ্যার দল অন্তর মলিন ॥ ১৭ ॥
তথায় রাখিয়া প্রভু আপনার জন ।
লীলারঙ্গরসাস্বাদ করেন কেমন ॥ ১৮ ॥
পতিত-উদ্ধার নাম-মহিমা প্রচার ।
অনাথ অধম পাপী তাপীর উদ্ধার ॥ ১৯ ॥
গিরিশ তাঁহার জন অতিশয় তেজা ।
গৃহিভক্তচূড়ামণি বিশ্বাসের রাজা ॥ ২০ ॥
কে তিনি শুনহ কথা সন্দ হবে দূর ।
একদিন প্রভুদেব লীলার ঠাকুর ॥ ২১ ॥
কহিছেন আপনার অন্তরঙ্গগণে ।
কালীর মন্দিরে আমি আপনার মনে ॥ ২২ ॥
উপবিষ্ট হেনকালে দেখি নিরখিয়া ।
আইল মূরতি এক নাচিয়া নাচিয়া ॥ ২৩ ॥
বগলে বোতল দুটি চুলে বাঁধা ঝুটি ।
পুরুষের চিহ্ন যেন খেজুরের আঁটি ॥ ২৪ ॥
কেবা সে যখন আমি জিজ্ঞাসিনু তাঁয় ।
কহিল ভৈরব মুই আইনু হেথায় ॥ ২৫ ॥
কিবা প্রয়োজন তারে পুছিলে আবার ।
উত্তর করিল কার্য করিব তোমার ॥ ২৬ ॥
গিরিশ আমার কাছে আসিবার পর ।
দেখিনু ভৈরব সেই তাহার ভিতর ॥ ২৭ ॥
বলিয়াছি বারে বারে অপূর্ব কখন ।
কেহ দেব কেহ দেবী প্রভুভক্তগণ ॥ ২৮ ॥
সাধিতে লীলার কার্য প্রভুভক্ত যত ।
নানা বেশে নানা স্থানে প্রয়োজন মত ॥ ২৯ ॥
অবস্থিত ধরাধামে নানা অবস্থায় ।
লীলার ঈশ্বর প্রভু তাঁহার ইচ্ছায় ॥ ৩০ ॥
জীবের প্রকৃতি দিয়া ভক্তের ভিতর ।
লীলারসাস্বাদ করে লীলার ঈশ্বর ॥ ৩১ ॥
ভক্তি জ্ঞান শক্তি কিন্তু মাথা থাকে গায় ।
তিলেকে জাগিয়া উঠে তিলেকে ঘুমায় ॥ ৩২ ॥
দারুণ নিদাঘে যেন দিবসের কায়া ।
কভু খরতর কর কভু মেঘছায়া ॥ ৩৩ ॥
শুন কহি বিবরণ অমৃত বিশেষ ।
গিরিশ শৈশব যবে দিগম্বর-বেশ ॥ ৩৪ ॥
তখন উদয় মনে হইত তাঁহার ।
জগতের মূল শক্তি সৃষ্টি করা যাঁর ॥ ৩৫ ॥
শক্তির প্রভাবে যদি সৃষ্টির জনম ।
তবে এ শক্তিরে সৃষ্টি কৈল কোন্ জন ॥ ৩৬ ॥
হেন প্রশ্ন যে শিশুর স্বতঃ উঠে মনে ।
মায়ামুগ্ধ জীব তাঁয় কহিব কেমনে ॥ ৩৭ ॥
অবিশ্বাসী সাধারণ মানুষনিচয় ।
ঈশ্বরের লীলাকথা করে না প্রত্যয় ॥ ৩৮ ॥
বিপরীত কয় কথা মায়ায় মগন ।
যাবৎ জগতে দেখে নিজের মতন ॥ ৩৯ ॥
বিষ্ণুপদোদ্ভবা গঙ্গা ব্রহ্ম-বারি তাঁয় ।
হীন হেয় কত শত স্রোতে ভেসে যায় ॥ ৪০ ॥
তাহার মহিমা তাঁর কিছু নাহি কমে ।
জীবের মুকতি একবিন্দু-পরশনে ॥ ৪১ ॥
সেইমত ভক্তদের জীবনের স্রোতে ।
কলঙ্ক-কালিমামালা অগণ্য তাহাতে ॥ ৪২ ॥
নাহি হয় তিল হানি মহিমার বল ।
পদরজঃ-পরশনে পরম মঙ্গল ॥ ৪৩ ॥
পবিত্র চরিত চিত নিরমল মন ।
পরে ফুটে হৃদে রামকৃষ্ণভক্তিধন ॥ ৪৪ ॥
প্রভু-ভক্ত-মহিমার অপূর্ব বারতা ।
আপনি পাইবে মন শুন লীলাকথা ॥ ৪৫ ॥
কোন্ দেহে কোন্ দেব দেবী সমাগত ।
সর্ব সমাচার মোর প্রভুর বিদিত ॥ ৪৬ ॥
এক দিনে শ্রীপ্রভুর দরশন-আশে ।
ভক্তিমতী মহিলা কতকগুলি আসে ॥ ৪৭ ॥
সম্ভ্রান্ত বংশের তাঁরা কুলের কামিনী ।
তার মধ্যে একজন দেবীঠাকুরানী ॥ ৪৮ ॥
রমণীর বেশে বাস প্রভু-অবতারে ।
দেখামাত্র চিনিলেন শ্রীপ্রভু তাঁহারে ॥ ৪৯ ॥
সংসারেতে চারি পাঁচ সন্তান সন্ততি ।
তবু অঙ্গে কান্তি যেন নবীনা যুবতী ॥ ৫০ ॥
সাধারণে পরিচয় বলিতে বারণ ।
সেই হেতু পুঁথিমধ্যে রহিল গোপন ॥ ৫১ ॥
সেবাপর আপ্তজনে প্রভু দেবরায় ।
বলিলেন সংগোপনে দেখাইয়া তাঁয় ॥ ৫২ ॥
বাখানিয়া মৃদুস্বরে যত পরিচয় ।
মানুষের বেশে মাত্র মানবিনী নয় ॥ ৫৩ ॥
প্রত্যক্ষ দেখিতে সাধ যদি হয় মনে ।
গন্ধদ্রব্যসহ দাও কুসুম চরণে ॥ ৫৪ ॥
লীলা-দরশনে-প্রিয় ভকতের কুল ।
ধূপধুনাসহ তাঁর পায়ে দিল ফুল ॥ ৫৫ ॥
ঘোমটার মধো ঢাকা ছিল মুখখানি ।
চকিতের মধ্যে কিবা আশ্চর্য কাহিনী ॥ ৫৬ ॥
গভীরসমাধিযুক্ত অঙ্গ সংজ্ঞাহীনা ।
জনমেও ধ্যান যাঁর মোটে নাই জানা ॥ ৫৭ ॥
সঙ্গিনীরা বুদ্ধিহারা দেখিয়া ব্যাপার ।
সশঙ্কিত ত্রস্তচিত জড়ের আকার ॥ ৫৮ ॥
কাহার বদনে আর সরে না বচন ।
যাদু-মুগ্ধ যেন সবে যায় বহুক্ষণ ॥ ৫৯ ॥
নিম্নদেশে মন আর না আসে দেবীর ।
ইন্দ্রিয়াদিসহ অঙ্গ একেবারে স্থির ॥ ৬০ ॥
গভীর ধিয়ানে বাহ্য নাহি আসে গায় ।
তখন শ্রীপ্রভুদেব ডাকেন শ্যামায় ॥ ৬১ ॥
ও মা কালী কি হইল রক্ষা কর এবে ।
জানিতে পারিলে লোকে মন্দ কটু কবে ॥ ৬২ ॥
ভীতভাবে এ মতে ডাকিলে কালীমায় ।
তখন চেতন অঙ্গে তাঁহার ইচ্ছায় ॥ ৬৩ ॥
ধ্যানের বিষম নেশা তাহাতে আকুল ।
নয়ন দুখানি রাঙ্গা যেন জবাফুল ॥ ৬৪ ॥
পদক্ষেপে নাহি শক্তি অঙ্গ থর থর ।
সঙ্গিনীরা লয়ে তুলে গাড়ির ভিতর ॥ ৬৫ ॥
প্রভু আর প্রভুভক্ত বস্তু কি রকম ।
বিন্দুমাত্র জানিতে না হইনু সক্ষম ॥ ৬৬ ॥
ভক্তিসহ শ্রীপ্রভুর পদে রাখি মতি ।
ভক্তির ভাণ্ডার শুন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৬৭ ॥
প্রভু-ভক্ত সাধারণ নিয়মের পার ।
করিলেও পাপকর্ম পাপ নহে তাঁর ॥ ৬৮ ॥
প্রজার শাসনে যত রাজার আইন ।
রাজকুমারেরা নহে তাহার অধীন ॥ ৬৯ ॥
প্রভুর বচনে শুন তাহার প্রমাণ ।
একদিন শ্রীমন্দিরে নিজে ভগবান ॥ ৭০ ॥
বিমরষ মন ভক্ত বিষ্ণুর কারণে ।
আত্মহত্যা কৈলা যেবা পিতার তাড়নে ॥ ৭১ ॥
বহু পূর্বে কহিয়াছি বিশেষ খবর ।
বালক-বয়স বিষ্ণু এড়েদহে ঘর ॥ ৭২ ॥
সন্নিকটে উপবিষ্ট ভক্তগণে কন ।
বিষ্ণুর কারণে আজি মন উচাটন ॥ ৭৩ ॥
বিদ্যালয়ভুক্ত তেঁহ বালক কেবল ।
রতি-মতি ভগবানে বুদ্ধি নিরমল ॥ ৭৪ ॥
পাঠে অনুরাগ তার নাহি ছিল তত ।
এখানে আমার কাছে সর্বদা আসিত ॥ ৭৫ ॥
একবার ঘর ছাড়ি দূরদেশে যায় ।
পশ্চিম অঞ্চলে কোন আত্মীয় যেথায় ॥ ৭৬ ॥
সুরম্য সে স্থান বড় মনের মতন ।
সুন্দর প্রান্তর মাঠ কাছে আছে বন ॥ ৭৭ ॥
নানাবিধ বৃক্ষরাজিসহ শৈলমালা ।
অবিরত বিরাজিত প্রকৃতির খেলা ॥ ৭৮ ॥
যোগপ্রিয়
ধ্যানানন্দ মনোমত স্থানে ।
ধ্যানেতে বিভোর-চিত থাকিত সেখানে ॥ ৭৯ ॥
কহিত আমার
কাছে আনন্দ-মগন ।
কত হয় ঈশ্বরের রূপ-দরশন ॥ ৮০ ॥
মৌন রহি কিছুক্ষণ কন পুনর্বার ।
বোধ হয় এই জন্ম শেষ জন্ম তার ॥ ৮১ ॥
পূর্বজন্মে বহুবিধ কর্ম ছিল করা ।
এইবারে বাকিটুকু হয়ে গেল সারা ॥ ৮২ ॥
কথায় কথায় প্রভু বিধির বিধাতা ।
কহিতে লাগিলা জীবতত্ত্বের বারতা ॥ ৮৩ ॥
ভক্তিভরে স-মনে শুনিলে তুমি মন ।
জনম-মরণ-ভয়ে হইবে মোচন ॥ ৮৪ ॥
প্রভুর বচনে শুন সুন্দর কাহিনী ।
চারিযুগ অক্ষয় অমর যত প্রাণী ॥ ৮৫ ॥
পূর্ব জনমের যাবতীয় সংস্কার ।
স্বীকার্য উচিত করা সবার স্বীকার ॥ ৮৬ ॥
প্রকৃত ঘটনাসহ প্রভুদেব কন ।
শুনিয়াছি কোনকালে কোন একজন ॥ ৮৭ ॥
করে শব-সাধনা নির্জন বনে বসে ।
কালীর অভয় পদ দরশন আশে ॥ ৮৮ ॥
আসন শবের বুকে বনমধ্যে একা ।
সাধনায় নানাবিধ দেখে বিভীষিকা ॥ ৮৯ ॥
শুন কি ঘটনা পরে কালীর ইচ্ছায় ।
বাঘেতে ধরিয়া তারে লইয়া পলায় ॥ ৯০ ॥
নিকটে অত্যুচ্চ গাছে ছিল আর জনা ।
প্রত্যক্ষ দেখিল চক্ষে যাবৎ ঘটনা ॥ ৯১ ॥
বিবেচনা মনে মনে করিল তখন ।
শব-সাধনার দ্রব্য সব আয়োজন ॥ ৯২ ॥
যা আছে কপালে হবে বসিব আসনে ।
এত বলি গাছ থেকে ধীরে ধীরে নামে ॥ ৯৩ ॥
বসিয়া শবের বুকে বিশ্বাসের ভরে ।
মহামন্ত্র কালীনাম খালি জপ করে ॥ ৯৪ ॥
অতি অল্পক্ষণমধ্যে দেখিবারে পায় ।
সদয়া হইয়া শ্যামা প্রত্যক্ষ তথায় ॥ ৯৫ ॥
কহিলেন ভক্তবরে মাগহ সত্বর ।
প্রসন্ন হয়েছি দিব মনোমত বর ॥ ৯৬ ॥
লুটায়ে মায়ের পায়ে কহে সেইজন ।
মা তোমায় এক কথা জিজ্ঞাসি এখন ॥ ৯৭ ॥
তোমার নিকটে বর মাগিবার আগে ।
যে করিল আয়োজন তারে লৈল বাঘে ॥ ৯৮ ॥
জ্ঞান-ভক্তি-সাধন-ভজনহীন আমি ।
আমারে এতেক রূপা কি হেতু জননী ॥ ৯৯ ॥
হাসিয়া হাসিয়া মাতা কন সেইজনে ।
জনমান্তরের কথা নাহি তোর মনে ॥ ১০০ ॥
জনমে জনমে কত শত অগণন ।
মম আশে করিয়াছ সাধন-ভজন ॥ ১০১ ॥
অল্প বাকি ছিল তাহা শেষ এইবারে ।
মনোমত মাগ বর দিব আমি তোরে ॥ ১০২ ॥
শ্রীবাক্য শুনিয়া এবে বুঝ তুমি মন ।
হইলেও বার বার দেহের পতন ॥ ১০৩ ॥
কর্মফল-স্মৃতি আর কর্মের অভ্যাস ।
দেহের সঙ্গেতে নহে কখনই নাশ ॥ ১০৪ ॥
অসক্ষ্যে জীবের সঙ্গে চলে অবিরল ।
বস্তুর সহিত যেন ছায়া অবিকল ॥ ১০৫ ॥
এত বলি কোন ভক্ত প্রভুদেবে কয় ।
আত্মহত্যা শুনে কিন্তু মনে লাগে ভয় ॥ ১০৬ ॥
কথার উত্তরে কথা কন গুণমণি ।
আত্মহত্যা মহাপাপ বার বার মানি ॥ ১০৭ ॥
বারে বারে আসে যায় আত্মঘাতী জনা ।
ভুগিবারে সংসারের যাবৎ যাতনা ॥ ১০৮ ॥
তবে যদি ভগবানে করি দরশন ।
করে কেহ শরীরের স্বেচ্ছায় নিধন ॥ ১০৯ ॥
কোন দোষ নাহি তার হয় তনুত্যাগে ।
আত্মহত্যা অপরাধ তাহাকে না লাগে ॥ ১১০ ॥
ঈশ্বরে জানিয়া যাহা জ্ঞানলাভ হয় ।
তাহাকেই একমাত্র জ্ঞান-বস্তু কয় ॥ ১১১ ॥
সেই জ্ঞান লাভ করি যদ্যপি গিয়ানী ।
স্বেচ্ছায় তিয়াগে তনু নাহি হয় হানি ॥ ১১২ ॥
যেন
নহে কোন ক্ষতি যদি কোন জনা ।
ছাঁচেতে ঢালিয়া লয়ে সোনার প্রতিমা ॥ ১১৩ ॥
আপনার প্রয়োজন ইচ্ছা-অনুসারে ।
মাটির বানান সেই ছাঁচ নষ্ট করে ॥ ১১৪ ॥
অনেক দিনের কথা শুন অতঃপর ।
জনৈক গোপাল নাম স্বভাব সুন্দর ॥ ১১৫ ॥
বরাহনগরে ঘর আসিত হেথায় ।
বয়স অধিক নয় বিশ বর্ষ প্রায় ॥ ১১৬ ॥
হরিভক্তি অনুরাগ হৃদয়-আগারে ।
ভাবরূপকান্তি তার ফুটিত শরীরে ॥ ১১৭ ॥
অধীর অবশ অঙ্গ ভাবের সময় ।
বাহ্যিক গিয়ান মোটে তাহে নাহি রয় ॥ ১১৮ ॥
একদিন ভাবে কাছে কহিল আমার ।
সংসারে তিষ্ঠিতে আমি নাহি পারি আর ॥ ১১৯ ॥
আপনার বহু দেরি হবে লীলাধামে ।
সে হেতু বিদায় মাগি অভয় চরণে ॥ ১২০ ॥
আমিও ভাবের ঘোরে কহিলাম তায় ।
পুনরায় এখানে কি আসিবে ধরায় ॥ ১২১ ॥
আসিব আবার কহি কথার উত্তরে ।
সেদিন চলিয়া গেল আপনার ঘরে ॥ ১২২ ॥
তার কিছুদিন পরে পাইনু খবর ।
ত্যজিয়াছে যুবক নিজের কলেবর ॥ ১২৩ ॥
হরি দরশন করি মুক্ত হ'য়ে জীব ।
করিলে শরীর-ত্যাগ না হয় অশিব ॥ ১২৪ ॥
এত বলি প্রভুদেব বিধির বিধাতা ।
বিশেষিয়া বিবরিলা জীবের বারতা ॥ ১২৫ ॥
যাবৎ যতেক জীব চারিজাতিভুক্ত ।
বন্ধ মুক্ত মুমুক্ষু কেহ বা নিত্যমুক্ত ॥ ১২৬ ॥
মাছের মতন জীব সংসারের জালে ।
ঈশ্বর যাঁহার মায়া তিনি যেন জেলে ॥ ১২৭ ॥
যখন জেলের জালে পড়ে মৎস্যগণ ।
কেহ বা ছিঁড়িয়া জাল করে পলায়ন ॥ ১২৮ ॥
তারে কহে মুক্তজীব মহাবল গায় ।
মায়ায় হইয়া বদ্ধ থাকিতে না চায় ॥ ১২৯ ॥
মুমুক্ষুর খালি চেষ্টা জাল কিসে কাটে ।
ছিড়িতে না পারে জ্বাল বলে নাহি আঁটে ॥ ১৩০ ॥
মুমুক্ষু ও মুক্ত এই দু'শ্রেণীর জীবে ।
থাকিতে না চায় হেন ভব-কূপে ডুবে ॥ ১৩১ ॥
তেকারণে কেহ বা পাইয়া ভগবান ।
স্বেচ্ছায় করেন দেহনষ্টের বিধান ॥ ১৩২ ॥
মুকতি পাইয়া তনু-ত্যাগের বারতা ।
বড়ই কঠিন বহু সুদুরের কথা ॥ ১৩৩ ॥
সাবধানী নারদাদি নিত্যমুক্ত যাঁরা ।
সংসারের জালে কভু না পড়েন ধরা ॥ ১৩৪ ॥
বন্ধজীব সংসারেতে তাদের লক্ষণ ।
পড়িয়াছে জালে জানে নিশ্চয় মরণ ॥ ১৩৫ ॥
তবু নাহি হুঁশ জালে বদ্ধ অবস্থায় ।
কামিনী-কাঞ্চন-পাঁকে শরীর লুকায় ॥ ১৩৬ ॥
পলাইতে নাহি চেষ্টা করে কোন কালে ।
বড় ভুষ্ট আসক্তির পঙ্কিল সলিলে ॥ ১৩৭ ॥
কত সহে দাগা-দুঃখ-বিপদনিচয় ।
তথাপি না হয় কভু চৈতন্য-উদয় ॥ ১৩৮ ॥
যাহাতে এতেক তার শোকের উদ্ভব ।
পুনঃপুনঃ বদ্ধজীব করে সেই সব ॥ ১৩৯ ॥
আপনার হাতে নালা করিয়া খনন ।
লোনা সিন্ধুবারি করে ঘরে আনয়ন ॥ ১৪০ ॥
কাঁটা ঘাসে উট প্রিয় যত তেঁহ খায় ।
দর দর রক্ত-ধারা মুখে বাহিরায় ॥ ১৪১ ॥
তথাপি কেমন নেশা আসক্তি কেমন ।
নাহি ছাড়ে
কাঁটা ঘাস করিতে ভক্ষণ ॥ ১৪২ ॥
যদি কোন বন্ধজীবে বুঝিবারে পারে ।
অসার সংসারে সার
নাহি একেবারে ॥ ১৪৩ ॥
অধম আমড়া উপমায় পরিপাটি ।
সার শাঁসহীন খালি খোসা আর আঁটি ॥ ১৪৪ ॥
জানিয়াও ছাড়িতে না পারে কদাচন ।
সঁপিবারে ঈশ্বরের পাদপদ্মে মন ॥ ১৪৫ ॥
কেশবের খুড়া বয়ঃ বছর পঞ্চাশ ।
দেখিলাম একদিন খেলিছেন তাস ॥ ১৪৬ ॥
নাহি হইয়াছে যেন তখনো তাঁহার ।
উচিত সময় হরিনাম লইবার ॥ ১৪৭ ॥
বন্ধঙ্গীব মাত্রে এক বিশেষ লক্ষণ ।
সাধুসঙ্গ বুঝে যেন প্রকৃত মরণ ॥ ১৪৮ ॥
বিস্তার পোকার মত আনন্দ বিষ্ঠায় ।
খায় মাখে সেই বিষ্ঠা হৃষ্ট-পুষ্ট তায় ॥ ১৪৯ ॥
এত বলি কথা সায় কৈলা গুণমণি ।
ঠাকুরের কথা ঠিক অমৃতের খনি ॥ ১৫০ ॥
ভক্তদের সঙ্গে রঙ্গ নানারূপ হয় ।
বিশেষিয়া বিবরিয়া বলিবারে নয় ॥ ১৫১ ॥
রঙ্গমঞ্চে বার বার যান প্রভুরায় ।
মহাবলী
বীরভক্ত গিরিশ যেথায় ॥ ১৫২ ॥
অকুতঃসাহস তেঁহ আপনার ভাবে ।
মনে যেন আসে তেন কন
প্রভুদেবে ॥ ১৫৩ ॥
জ্বলন্ত বিশ্বাস হৃদে নিরভয় মন ।
তমোগুণী ভক্ত তিনি প্রভুর বচন ॥ ১৫৪ ॥
ডাকাতের সম ধারা প্রবল আচার ।
মার কাট বাঁধ লুট রতন-ভাণ্ডার ॥ ১৫৫ ॥
একদিন মঞ্চমধ্যে প্রভুর গমন ।
নিরখিয়া শ্রীগিরিশ পুলকিত মন ॥ ১৫৬ ॥
পতিতপাবন প্রভু পতিত-ভরসা ।
পতিত উদ্ধার কাজে মঞ্চমাঝে আসা ॥ ১৫৭ ॥
পাকা ষোল আনা জ্ঞান গিরিশের মনে ।
সেই হেতু রঙ্গালয়ে রহে যে যেখানে ॥ ১৫৮ ॥
কি লম্পট কি কপট হীন হেয় মন ।
বেশ্যা বারাঙ্গনাজাতি অভিনেত্রীগণ ॥ ১৫৯ ॥
আবাহন সকলেই বারে বারে করে ।
পদরেণু ঠাকুরের শিরে ধরিবারে ॥ ১৬০ ॥
অভিনেতা পুরুষেরা আসিয়া তথায় ।
অভয়-চরণরেণু ধরিল
মাথায় ॥ ১৬১ ॥
গিরিশের আশ্বাস-বচনে পেয়ে বল ।
উপনীত অবশেষে বারাঙ্গনাদল ॥ ১৬২ ॥
গণনায় ষোলজনা যুবতী প্রখরা ।
বসনে ভূষণে সজ্জা মুনিমনোহরা ॥ ১৬৩ ॥
দেখিয়া শ্রীপ্রভুদেব ভাবেভরা চিত ।
ধরিলা মোহন কণ্ঠে শ্যামা-গুণগীত ॥ ১৬৪ ॥
মধুর প্রভুর স্বর পিকপাখী জিনি ।
শ্রবণে মোহিতচিত যতেক রমণী ॥ ১৬৫ ॥
তার মধ্যে একজন বিনোদিনী নাম ।
মুর্ছিতা হইয়া পড়ে ধরায় অজ্ঞান ॥ ১৬৬ ॥
প্রসারিত ঠাকুরের শ্রীচরণতলে ।
দিব্য-ভাব সমুদিত অন্তর-অঞ্চলে ॥ ১৬৭ ॥
আজন্ম আচার যার বেশ্যার ব্যবসা ।
তরিবারে ভবসিন্ধু নাহি কোন আশা ॥ ১৬৮ ॥
আজি তার ভক্তিভাবে ভরিল অন্তর ।
নিরখিয়া দীনবন্ধু লীলার ঈশ্বর ॥ ১৬৯ ॥
পতিত কাঙ্গাল দীন-হীন হেয় জন ।
পাপেভরা প্রাণে সারা দুর্বল অক্ষম ॥ ১৭০ ॥
আশাহীন মনক্ষীণ ভবসিন্ধুকূলে ।
নাহি বন্ধু করে পার অকূল সলিলে ॥ ১৭১ ॥
কিবা ভয় পারাপারে পাইবে সম্বল ।
ফেলিয়া নয়নে মাত্র এক ফোঁটা জল ॥ ১৭২ ॥
গাও রামকৃষ্ণনাম হইয়া আতুর ।
ক্ষণমধ্যে হবে পার কাণ্ডারী ঠাকুর ॥ ১৭৩ ॥
ত্রিবিধ ভক্তের জাতি প্রভুর বচনে ।
গুণ-অনুসারে ভেদ সত্ব রজঃ তমে ॥ ১৭৪ ॥
সত্বমূলাত্মক ভক্তি যেখানে বিকাশ ।
বাহ আড়ম্বর তথা একেবারে হ্রাস ॥ ১৭৫ ॥
দীনতার আবরণে গোপন আকার ।
শিষ্ট শান্ত অমায়িক অলোভ আচার ॥ ১৭৬ ॥
রজোগুণে আড়ম্বর বহু ব্যক্ত পায় ।
গলায় রুদ্রাক্ষ দুলে তিলক নাসায় ॥ ১৭৭ ॥
পূজা-আরাধনা-কালে অঙ্গ সুশোভন ।
পরিধেয় পরিপাটি পাটের বসন ॥ ১৭৮ ॥
তমোগুণাত্মক ভক্ত লক্ষণ তাহার ।
জ্বলন্ত বিশ্বাস চিত্তে জ্বলে অনিবার ॥ ১৭৯ ॥
ঈশ্বর নিজের লোক এই ভাব মনে ।
তিল গ্রাহ্য নাহি করে কাহারে ভুবনে ॥ ১৮০ ॥
ভাঙ্গিয়া দুয়ার-ঘর আপনার জোরে ।
মনের মতন ধন লুঠে ধনাগারে ॥ ১৮১ ॥
ইচ্ছামত রাখে কাছে যেন যায় মন ।
অন্য পরে যারে তারে করে বিতরণ ॥ ১৮২ ॥
গিরিশ প্রভুর ভক্ত এমন শ্রেণীর ।
সবল সকল শিরা বিশ্বাসের বীর ॥ ১৮৩ ॥
ভক্তিভরে শুন তবে কহিব কাহিনী ।
আর দিন মঞ্চমধ্যে প্রভু গুণমণি ॥ ১৮৫ ॥
বিবিধ ভাবের ভক্ত প্রভুর পিয়ারা ।
আজিদিনে অনেকেই সঙ্গে আছে তাঁরা ॥ ১৮৬ ॥
উচ্চতর কাঠাসনে প্রভুর আসন ।
চারিদিকে বেড়িয়া তাঁহার ভক্তগণ ॥ ১৮৭ ॥
জানু গাড়ি গিরিশ বসিল গিয়া শেষে ।
নিম্নভাগে ঠাকুরের চরণের পাশে ॥ ১৮৮ ॥
সুরায় বিভোর অঙ্গ চিত্ত মাতোয়ারা ।
অকুতঃসাহস যেন ছাতি ধরাবেড়া ॥ ১৮৯ ॥
জনমের যত কষ্ট স্মরিয়া অন্তরে ।
পাড়িতে লাগিল খালি গালি প্রভুবরে ॥ ১৯০ ॥
খেঁউর পচাল ভাষা সুকটু বাখান ।
আদিরস নাহি জানে যাহার সন্ধান ॥ ১৯১ ॥
নাট্যকার নিজে তেহ কবির বদন ।
নুতন সৃজিয়া গালি করে বরিষণ ॥ ১৯২ ॥
নাহি বাদ মাসী পিসী জনক জননী ।
নীরবে শুনেন সব প্রভু গুণমণি ॥ ১৯৩ ॥
অবশেষে গিরিশ কহেন প্রভুদেবে ।
স্বীকার করহ মোর ছেলে হতে হবে ॥ ১৯৪ ॥
এতক্ষণে শ্রীবদনে ফুটিল বচন ।
উত্তরে গিরিশচন্দ্রে কহেন তখন ॥ ১৯৫ ॥
তুই শালা স্বেচ্ছাচারী বহুবেশ্যাগামী ।
কি কারণে ছেলে তোর হতে যাব আমি ॥ ১৯৬ ॥
পরম-পবিত্র-চিত বিশুদ্ধ-আচার ।
ক্রিয়াবান নিষ্ঠাবান জনক আমার ॥ ১৯৭ ॥
এইরূপে দ্বন্দ্ব-কথা হয় অনর্গল ।
অবাক হইরা শুনে ভকতের দল ॥ ১৯৮ ॥
কেহ কিছু কহে, নহে কাহারও শকতি ।
কিন্তু সবে মহারুষ্ট গিরিশের প্রতি ॥ ১৯৯ ॥
দয়ালপ্রকৃতি প্রভু বালক-আচার ।
স্বার্থশূন্যে কামনা জীবের উপকার ॥ ২০০ ॥
থিয়েটার কেবল লম্পট বেশ্যা লয়ে ।
তথা তিনি তাহাদের ত্রাণের লাগিয়ে ॥ ২০১ ॥
তাহা না বুঝিয়া মনে বিপরীত ডালি ।
পেটভরে পিয়ে সুরা কটুভাষে গালি ॥ ২০২ ॥
ভক্তির বারতা কিছু বুঝা নাহি যায় ।
নানাভাবে ভক্তিভাব বিকাশিত পায় ॥ ২০৩ ॥
ভক্তিভাব প্রত্যেক ভক্তের স্বতন্তর ।
একের ভাবেতে লাগে অপরের জ্বর ॥ ২০৪ ॥
সকল ভাবের ভাবী কিন্তু যেইজন ।
তাঁহার নিকটে সব সমান রকম ॥ ২০৫ ॥
গিরিশের ভাষা আজি প্রভু ভগবানে ।
বড়ই লাগিল কটু ভক্তদের কানে ॥ ২০৬ ॥
প্রভুর শ্রবণে কিন্তু স্তুতি ভক্তিময় ।
ভাবগ্রাহী একা প্রভু অন্য কেহ নয় ॥ ২০৭ ॥
ভাবের ঘরেতে চুরি না করি যে জন ।
ঘৃণা লজ্জা ভয় তিনে হইয়া মোচন ॥ ২০৮ ॥
আচরণ তাঁর সঙ্গে করে ঠিক ঠিক ।
তুষ্ট তাঁয় প্রভু সর্বরসের রসিক ॥ ২০৯ ॥
ভক্তির বিধান নহে অপরের পারা ।
বেডউল ভক্তিভাব বেদ-বিধি ছাড়া ॥ ২১০ ॥
লক্ষণ ধরিয়া তার না মিলে সন্ধান ।
এক চিহ্ন ভক্তে নাহি ছাড়ে ভগবান ॥ ২১১ ॥
অঙ্গে করে কর্ম কাজ মন নাহি সরে ।
কম্পাসের কাঁটা যেন সতত উত্তরে ॥ ২১২ ॥
প্রভুর চরণ-পদ্মে একটানা মন ।
ইহাই কেবল এক ভক্তের লক্ষণ ॥ ২১৩ ॥
অন্তর-জগৎ নামে যাহা যায় শুনা ।
লীলাই তাহার এক বিস্তৃত বর্ণনা ॥ ২১৪ ॥
উপমা ধরিয়া এই মাত্র যায় বলা ।
অন্তর-জগৎ মূল টাকা তার লীলা ॥ ২১৫ ॥
গালি দিয়া প্রভুদেবে গিরিশ এখানে ।
শিরে ধরি পদরেণু চলিল ভবনে ॥ ২১৬ ॥
পরিহরি সেইক্ষণে রঙ্গের আলয় ।
বিষন্ন কি ক্ষুণ্ণ মন তিলমাত্র নয় ॥ ২১৭ ॥
পরদিনে চারিদিকে ছুটিল বারতা ।
প্রভুর শরণাপন্ন যেবা আছে যেথা ॥ ২১৮ ॥
গিরিশের কটুভাষ মঞ্চের ভিতর ।
যে শুনে তাহার হয় বিষণ্ণ অন্তর ॥ ২১৯ ॥
শুন তুই দিন পরে এই ঘটনার ।
ঘুরে ফিরে এল পুনঃ শুভ রবিবার ॥ ২২০ ॥
কর্মবন্ধ ভক্তগণ অবসর পায় ।
সকলেই প্রভুদেবে দেখিবারে যায় ॥ ২২১ ॥
বিশেষতঃ আজিদিনে ভক্ত-সমাগম ।
শ্রীমন্দিরে শ্রীপ্রভুর হইল বিষম ॥ ২২২ ॥
আন্দোলন এই কথা করে পরস্পরে ।
কেহ বা গোপনে কেহ প্রভুর গোচরে ॥ ২২৩ ॥
এমন সময় গিয়া উপনীত হয় ।
গৃহী-ভক্তচূড়ামণি রাম সদাশয় ॥ ২২৪ ॥
সেব্য-সেবকের ভাব বাঁধা একতানে ।
নিষ্ঠাবান ভক্তিমান প্রভুর চরণে ॥ ২২৫ ॥
সুন্দর মোহন মূর্তি গোউর-বরন ।
ভক্তির ছটায় ফুল সুচারু বদন ॥ ২২৬ ॥
পুণ্য-দরশন রাম আঁখির আরাম ।
মুক্তহস্ত মুক্ত আত্মা চাঁই ভক্ত রাম ॥ ২২৭ ॥
দেখিয়াই প্রভুদেব কহিলেন তায় ।
গিরিশ বড়ই গালি দিয়াছে আমায় ॥ ২২৮ ॥
ভূমিতে লুটিয়া বন্দি প্রভুর চরণ ।
দিলে গালি খেতে হবে ভক্তোত্তম কন ॥ ২২৯ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন যদি মারে অতঃপর ।
সহিতে হইবে তাহা রামের উত্তর ॥ ২৩০ ॥
যাহা দিয়াছেন যারে সেই দিবে তাই ।
কোথায় পাইবে দিতে তার যাহা নাই ॥ ২৩১ ॥
কালকূট একমাত্র ধন কালিয়ার ।
সে দিবে ধরিয়া বিষ যাহা আছে তার ॥ ২৩২ ॥
কি বুঝিয়া প্রভুদেব রামের বচনে ।
তখনি আনিতে গাড়ি আড্ডা হয় রামে ॥ ২৩৩ ॥
আজ্ঞাপর ভক্তবর আনিল সত্বর ।
যাত্রা যাহে করিলেন গিরিশের ঘর ॥ ২৩৪ ॥
কতিপয় ভক্তমাত্র প্রভুর সহিত ।
ত্বরান্বিত যথাস্থানে হইলা উপনীত ॥ ২৩৫ ॥
অন্দরে আরামশয্যা গিরিশ যেথায় ।
বার্তাবহ শুভ বার্তা তথা লয়ে যায় ॥ ২৩৬ ॥
পুলকে পূর্ণিত কায় প্রফুল্লিত যন ।
সদরে আসিয়া বন্দে প্রভুর চরণ ॥ ২৩৭ ॥
তড়িতের মত বার্তা ছুটে চারিধারে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন গিরিশের ঘরে ॥ ২৩৮ ॥
সন্নিকটে অনেক ভক্তের নিকেতন ।
ক্রমে ক্রমে বহু জন দিলা দরশন ॥ ২৩৯ ॥
ভরিল বৈঠকখানা অতি পরিসর ।
গালিচার গদি তার উপরে চাদর ॥ ২৪০ ॥
সুন্দর বিছানা পাতা তাকিয়ায় ঠেস ।
উপবিষ্ট রামকৃষ্ণ বিভু পরমেশ ॥ ২৪১ ॥
নানা রঙ্গে রসভাষ ভক্ত-ভগবানে ।
মঞ্চের ঘটনা মোটে নাহি কারো মনে ॥ ২৪২ ॥
গিরিশের ঘরে নাই কোন অনাটন ।
সেবার কারণে করে নানা আয়োজন ॥ ২৪৩ ॥
পরম বৈষ্ণব ভক্ত বন্ধু বলরাম ।
শুভ্র পরিচ্ছদ শিরে পাগ শোভমান ॥ ২৪৪ ॥
মহানন্দে মৃদুমন্দ আস্যে হাসিরেখা ।
গিরিশের আবাসে আসিয়া দিল দেখা ॥ ২৪৫ ॥
ভক্তিভরে প্রভুবরে দূরে প্রণমিয়া ।
করজোড়ে একধারে রহে দাঁড়াইয়া ॥ ২৪৬ ॥
প্রস্তুত প্রভুর ভোজ্য লুচি তরকারি ।
বিবিধ রকম ভাজি কত রকমারী ॥ ২৪৭ ॥
সন্দেশ সহিত মিষ্টি নানান প্রকার ।
আনিয়া থুইল যেথা শ্রীপ্রভু আমার ॥ ২৪৮ ॥
উপবিষ্ট বিছানায় তাহার উপরে ।
গিরিশের কথামত ব্রাহ্মণ চাকরে ॥ ২৪৯ ॥
ভক্ত বন্ধু বলরাম বৈষ্ণব-আচার ।
লাগিল তাঁহার চক্ষে অতি কদাকার ॥ ২৫০ ॥
সেই হেতু চিন্তে তেঁহ আপনার মনে ।
বিছানায় ভোজ্য থাল ধুইল কেমনে ॥ ২৫১ ॥
বসুর অন্তর-কথা বুঝিয়া অন্তরে ।
হাসিয়া হাসিয়া প্রভু বলিলেন তাঁরে ॥ ২৫২ ॥
তোমার ভবনে যবে করিব ভোজন ।
এরূপে সে নহে, রবে স্বতন্ত্র আসন ॥ ২৫৩ ॥
যার যেন ভাব প্রভু তেন তাঁর কাছে ।
বিনা প্রভু সাধ্য কার ভক্তভাব বাছে ॥ ২৫৪ ॥
একরূপে বহুরূপ প্রভুপরমেশে ।
তার কাছে তেন রূপ যে যেমন বাসে ॥ ২৫৫ ॥
বিবিধ ভাবের ভক্ত লীলায় এবার ।
শুন ভক্তসংজোটন অমৃত-ভাণ্ডার ॥ ২৫৬ ॥
ভকত প্রতাপচন্দ্র হাজরা উপাধি ।
প্রভুর নিকটে তেঁহ রহে নিরবধি ॥ ২৫৭ ॥
কর্মেতে পিয়ারা বড় কর্ম তার খেলা ।
কঠোর আচারসহ সদা জপে মালা ॥ ২৫৮ ॥
প্রভুদেব তাঁহার স্বভাব সুবিদিত ।
শুদ্ধজ্ঞান-বিচারেতে পরম পণ্ডিত ॥ ২৫৯ ॥
মনোভাব হাজরার হৃদে বলবৎ ।
স্বপনের সম এই অলীক জগৎ ॥ ২৬০ ॥
পুজা সেবা আরাধনা ভক্তি-প্রকরণ ।
সকল কেবলমাত্র মনের ভরম ॥ ২৬১ ॥
আমি নিজে সেই বস্তু নিজের উপাস্য ।
স্বরূপচিন্তাই মাত্র একক উদ্দেশ্য ॥ ২৬২ ॥
প্রিয়পাত্র শ্রীপ্রভুর মহাভাগ্যধর ।
লীলার সহায় তেঁহ নিত্য সহচর ॥ ২৬৩ ॥
কতই হইল খেলা হাজরার সনে ।
পুতচিত সুনিশ্চিত ভারতী-শ্রবণে ॥ ২৬৪ ॥
হাজরা প্রতাপচন্দ্র ভক্তির বিরোধী ।
সেই সে করণে তাঁয় প্রভু গুণনিধি ॥ ২৬৫ ॥
রঙ্গপ্রিয় রঙ্গহেতু সবিনয়ে কন ।
করিবারে কিছু কাল চরণ-সেবন ॥ ২৬৬ ॥
এড়াইতে নারে বাক্য অনন্য উপায় ।
রোগীতে ঔষধ যেন অনিচ্ছায় খায় ॥ ২৬৭ ॥
সেইমত সেবে পদ অন্তরে অরুচি ।
ক্ষণে ক্ষণে করে মনে ছেড়ে দিলে বাঁচি ॥ ২৬৮ ॥
ঊর্ধ্ব গতি রাতি ক্রমে হয় অগ্রসর ।
হাজরা প্রভুর কাছে মাগে অবসর ॥ ২৬৯ ॥
প্রভু কন কোথা যাবে কি করিবে গিয়া ।
ধীরে ধীরে দেহ পায় হাত বুলাইয়া ॥ ২৭০ ॥
বিবিধ প্রসঙ্গ তার তুষ্টির কারণ ।
তাহাতে আদতে নাই হাজরার মন ॥ ২৭১ ॥
এই মতে রাতি যবে অবসান প্রায় ।
তখন ছাড়িয়া তারে দিলা প্রভুরায় ॥ ২৭২ ॥
পুনরায় পরদিনে মধ্যাহ্নের পর ।
ডাকেন সেবিতে পদ লীলার ঈশ্বর ॥ ২৭৩ ॥
আহারান্তে কিছুকাল আরাম-অভ্যাস ।
সম্ভোগে হাজরা নাহি পায় অবকাশ ॥ ২৭৪ ॥
এইমত দিন দিন কিছু দিন যায় ।
বিরক্ত হাজরা বড় হইল তাহায় ॥ ২৭৫ ॥
একদিন আহার করিয়া সমাপন ।
সংগোপন স্থানে গিয়া করিল শয়ন ॥ ২৭৬ ॥
রঙ্গপ্রিয় প্রভুদেব করিয়া সন্ধান ।
ধরিয়া শ্রীহস্তে হাঁকা ধীরে ধীরে যান ॥ ২৭৭ ॥
ডাকাডাকি কত তায় নাহি দেয় সাড়া ।
কপট নিদ্রার বেশ বস্ত্রে মুখ মোড়া ॥ ২৭৮ ॥
তবে প্রভু সুবাসিত তামাকের ধুম ।
নাকের নিকটে দেন ভাঙ্গাইতে ঘুম ॥ ২৭৯ ॥
সুন্দর রঙ্গের খেলা ভক্ত-ভগবানে ।
ভক্তির ভাণ্ডার কথা শুনে ভাগ্যবানে ॥ ২৮০ ॥
তখন মুখের বাস করি উন্মোচন ।
হাজরা হাসিতে থাকে তুষ্ট রুষ্ট মন ॥ ২৮১ ॥
কলিকা শ্রীপ্রভুদেব দিয়া তার করে ।
ধরিয়া আনিলা তবে নিজের মন্দিরে ॥ ২৮২ ॥
খাটের উপরে পরে বসাইয়া তায় ।
পূর্ববৎ নিয়োজিলা চরণ-সেবায় ॥ ২৮৩ ॥
অতঃপর শ্রীপ্রভুর কি হইল মন ।
হাজরায় নহে আজ্ঞা সেবিতে চরণ ॥ ২৮৪ ॥
সেই মহাকার্যে রত রহে রেতেদিনে ।
রাখাল হরিশ লাটু ভক্ত তিন জনে ॥ ২৮৫ ॥
হাজরার নামগন্ধ নাহি তথা আর ।
নরলীলা ঈশ্বরের বড়ই মজার ॥ ২৮৬ ॥
এক পক্ষাধিক প্রায় গত এরকমে ।
উপজিল সন্দ এক হাজরার মনে ॥ ২৮৭ ॥
স্বেচ্ছায় সেবিতে পদ একদিন যায় ।
অতীব নারাজ তাহে হৈলা প্রভুরায় ॥ ২৮৮ ॥
পরশিতে কোনমতে না দেন চরণে ।
ক্ষুণ্ণমন হইয়া ফিরিল নিজ স্থানে ॥ ২৮৭ ॥
পরদিনে মনে মনে যুক্তি কৈল সার ।
ছিনিয়া সেবিব ভাগ্যে যা হোক আমার ॥ ২৮৮ ॥
এত ভাবি ধীরে ধীরে মন্দিরে গমন ।
দেখিলা শয্যায় প্রভু আশ্চর্য কথন ॥ ২৮৯ ॥
কেহ নাহি সন্নিকটে শ্রীমন্দিরে একা ।
বালাপোশে পা হইতে বুকতক ঢাকা ॥ ২৯০ ॥
ভাগ্যবান পুণ্যবান প্রতাপ হাজরা ।
ধরি ধরি করে, প্রভু নাহি দেন ধরা ॥ ২৯১ ॥
পাটোয়ারী বুদ্ধি তাঁর ঘটে বিলক্ষণ ।
সেই হেতু নাহি হয় অভীষ্ট-সাধন ॥ ২৯২ ॥
কখন সন্দেহ করে কখন বিশ্বাস ।
এই দোষে নাহি আর পুরে অভিলাষ ॥ ২৯৩ ॥
এখন বিশ্বাস হৃদে বহে বলবতী ।
চরণ সেবিতে করে কাকুতি-মিনতি ॥ ২৯৪ ॥
কোনমতে প্রভুদেব না হন স্বীকার ।
হাজরা বুঝিল দেহে পাপের সঞ্চার ॥ ২৯৫ ॥
মহাপুরুষের দেহ পবিত্র পরম ।
পাপীর পরশ লাগে বিষের মতন ॥ ২৯৬ ॥
সেই হেতু নিবারণ শ্রীঅঙ্গ-পরশে ।
করিব উপায় আজি পাপের বিনাশে ॥ ২৯৭ ॥
গঙ্গামাটি-ভক্ষণ একাগ্র মনে জপ ।
এই দুই মহৌষধি বিনাশিতে পাপ ॥ ২৯৮ ॥
এত ভাবি মশারি খাটায়ে সেইক্ষণে ।
রচনা করিল শয্যা কম্বল-আসনে ॥ ২৯৯ ॥
শিয়রে মাটির তাল গুলি গুলি খায় ।
নয়ন মুদিয়া জপ করেন শয্যায় ॥ ৩০০ ॥
প্রতাপের জপে প্রভু ভকতবৎসল ।
শ্রীমন্দিরে বিছানায় হইয়া চঞ্চল ॥ ৩০১ ॥
নীরবে গোপনভাবে যান ধীরে ধীরে ।
প্রতাপ শুইয়া যেখা মশারির আড়ে ॥ ৩০২ ॥
বারে বারে মন্দ স্বরে ডাকেন তাঁহায় ।
রোকভরে করে জপ নাহি দেয় সায় ॥ ৩০৩ ॥
অভিমান বলবান ততই অন্তরে ।
যতই ডাকেন প্রভু পদ সেবিবারে ॥ ৩০৪ ॥
অবশেষে গরজিয়া মানভরে কয় ।
পদ সেবিবারে না পারিব মহাশয় ॥ ৩০৫ ॥
প্রত্যুত্তর সবিনয়ে প্রভুর আমার ।
বেশী নহে পরশিবে মাত্র একবার ॥ ৩০৬ ॥
অন্তরে অপার তুষ্ট বাহে কোপ করি ।
মন্দিরে প্রভুর পিছে যায় ধীরি ধীরি ॥ ৩০৭ ॥
সুভাগ্য হাজরা চাষা মহাপুণ্যধর ।
ঈশ্বরের সেবা করে খাটের উপর ॥ ৩০৮ ॥
ত্রিদশ-ঈশ্বর যাহা ছুইতে না পায় ।
হাজরার পদরজ এ অধম চায় ॥ ৩০৯ ॥
অতি অল্পক্ষণ মধ্যে কন গুণমণি ।
পরিতৃপ্ত সেবায়
সন্তুষ্ট এবে আমি ॥ ৩১০ ॥
আপন শয্যায় তুমি করহ গমন ।
হাজরা বলেন নাহি ছাড়িব চরণ ॥ ৩১১ ॥
সত্য মানি আপনার পরিতৃপ্ত বটে ।
না হইলে মোর তৃপ্তি কোন্ শালা উঠে ॥ ৩১২ ॥
আঁটিয়া
চরণ দুটি করে আকর্ষণ ।
যতই করেন প্রভু তাঁরে নিবারণ ॥ ৩১৩ ॥
নরলীলা ঈশ্বরের অপূর্ব ভারতী ।
শুনিলে শ্রীপদে মিলে বিমল ভকতি ॥ ৩১৪ ॥
হাজরার সঙ্গে সদা খেলেন গোসাঁই ।
বিশ্বাস অন্তরে কিন্তু নাহি পায় ঠাঁই ॥ ৩১৫ ॥
উচ্চতম গৃহী ভক্ত প্রভুর আমার ।
শ্রীমনোমোহন রাম চাটুয্যে কেদার ॥ ৩১৬ ॥
দেবীপুত্র শ্রীসুরেন্দ্র সিমুলায় ঘর ।
কালীভক্ত ইষ্ট শ্যামা প্রভু গুরুবর ॥ ৩১৭ ॥
ইষ্ট গুরু অভিন্নাত্মা এই জ্ঞান সনে ।
মনপ্রাণগত তাঁর প্রভুর চরণে ॥ ৩১৮ ॥
দম্ভ মনে অগোচরে হাজরা এখন ।
তাঁহাদের নিন্দাবাদ করে বিলক্ষণ ॥ ৩১৯ ॥
ভক্ত-প্রিয় ভগবান ভক্তগত প্রাণ ।
লাগিল ভক্তের নিন্দা বাজের সমান ॥ ৩২০ ॥
প্রভুর বিষম শিক্ষা শিক্ষা দেন কাজে ।
আজন্ম স্মরণ শিক্ষা হাড়ে হাড়ে ভিজে ॥ ৩২১ ॥
ভক্তনিন্দাহেতু শিক্ষা দিতে জীবগণে ।
শুন কি করিলা প্রভু হাজরার সনে ॥ ৩২২ ॥
পরদিন প্রতাপের বুকের ভিতর ।
উঠিল শূলের ব্যথা অতি গুরুতর ॥ ৩২৩ ॥
সুস্থ-কলেবর তাহে শুদ্ধাচার রহে ।
হঠাৎ কি হেতু ব্যথা সঞ্চারিল দেহে ॥ ৩২৪ ॥
কিছুই বুঝিতে নারে চিন্তে অনুক্ষণ ।
ঔষধ উচিতমত করেন সেবন ॥ ৩২৫ ॥
উপশম কোন মতে নহে তিল আধ ।
বরঞ্চ বাড়িতে থাকে বিষম প্রমাদ ॥ ৩২৬ ॥
রুগ্নদেহ হৈল বুকে বেদনার বাসা ।
শ্রীপ্রভু কিছুই নাহি করেন জিজ্ঞাসা ॥ ৩২৭ ॥
কত কথা তার সঙ্গে হয় রোজ রোজ ।
এখন আদতে কিন্তু নাহি নেন খোঁজ ॥ ৩২৮ ॥
হাজরার এই কষ্ট মনের ভিতর ।
বুকের বেদনা চেয়ে হইল কষ্টকর ॥ ৩২৯ ॥
বিবিধ ভাবিয়া যুক্তি কৈলা মনে মনে ।
অন্ত্যত্রে গমন শ্রেয়ঃ প্রাতে পরদিনে ॥ ৩৩০ ॥
গোপনে গোপনে করে আয়োজন তার ।
অস্তরে বুঝিয়া তত্ত্ব শ্রীপ্রভু আমার ॥ ৩৩১ ॥
শ্রীমুখেতে মধুর মৃদু হাস্যসহকারে ।
হাজির হাজরা যেথা তারে তুষিবারে ॥ ৩৩২ ॥
শ্রীবদন-বিগলিত হাস্য সুমধুর ।
যে দেখে তাহার জন্ম জন্ম দুঃখ দূর ॥ ৩৩৩ ॥
দরশন নহে যার দূরদৃষ্ট দশা ।
বৃথা তার নরজন্ম ধরাধামে আসা ॥ ৩৩৪ ॥
অমিয়বরষী ভাষা সরল সরল ।
হাজরায় জিজ্ঞাসেন শরীর-কুশল ॥ ৩৩৫ ॥
ভুলিয়া সকল ব্যথা উত্তর তখন ।
পক্ষাবধি বক্ষঃস্থলে শূলের বেদন ॥ ৩৩৬ ॥
ভ্রাতৃপুত্র রামলালে কন ডাক দিয়া ।
ঠাণ্ডা জলে দেহ কিছু চিনি ভিজাইয়া ॥ ৩৩৭ ॥
কিঞ্চিৎ লেবুর রস মিশাইয়া তায় ।
এখনি খাইতে তুমি দেহ হাজরায় ॥ ৩৩৮ ॥
পিয়ে পেয় সুশীতল শীতল যখন ।
বুঝাইয়া হাজরায় প্রভুদেব কন ॥ ৩৩৯ ॥
শূলের বেদনা বুকে বড় পরমাদ ।
বিয়াধির মূল-হেতু ভক্ত-অপরাধ ॥ ৩৪০ ॥
ভক্তদের নিন্দাবাদ করিয়া রটনা ।
আপনি এনেছ নিজে বুকের বেদনা ॥ ৩৪১ ॥
আরোগ্য উপায়ে এই আছে এক বিধি ।
ভক্তদের পদরজ পরম ঔষধি ॥ ৩৪২ ॥
কিছুক্ষণ পরে তেহ করে দরশন ।
উপনীত রাম আদি শ্রীমনোমোহন ॥ ৩৪৩ ॥
চকিতে উঠিয়া তবে প্রফুল্লিত মনে ।
শিরে ধরে ভক্ত-রজ লুটাইয়া ভূমে ॥ ৩৪৪ ॥
সেদিন হইতে আর বুকে নাহি ব্যথা ।
ভব-ব্যাধি-মহৌষধি রামকৃষ্ণকথা ॥ ৩৪৫ ॥
হাজরা মহিমা যত দেখে বার বার ।
কোনমতে নাহি হয় বিশ্বাস-সঞ্চার ॥ ৩৪৬ ॥
শুন তবে কই কথা অপূর্ব ভারতী ।
মিলে জ্ঞান-ভক্তি তার শুনে যেবা পুঁথি ॥ ৩৪৭ ॥
দিনেকে হাজরা কহে অতি সংগোপনে ।
ভকত রাখাল লাট্টু এই দুইজনে ॥ ৩৪৮ ॥
বৃথা কেনে এইখানে ছাড়ি ঘর-দ্বার ।
উন্নতি কিমন্ত আছে করিলে ইঁহার ॥ ৩৪৯ ॥
সাধন-ভজন কোথা ধ্যান-জপচয় ।
খাইয়া খেলিয়া নষ্ট করিয়া সময় ॥ ৩৫০ ॥
কেন নাহি কহ গিয়া উহার নিকটে ।
দিন পক্ষ মাস বর্ষ বৃথা যায় কেটে ॥ ৩৫১ ॥
অকপটহৃদয় প্রভুর ভক্তদ্বয় ।
বালকবয়স চিত্ত সরলাতিশয় ॥ ৩৫২ ॥
বুঝিলেন মিথ্যা নয় হাজরার কথা ।
মনঃক্ষুন্ন বিষন্নবদন যান সেথা ॥ ৩৫৩ ॥
যেইখানে শ্রীমন্দিরে প্রভুদেবরায় ।
আপনে আপনা-গত বসিয়া খট্টায় ॥ ৩৫৪ ॥
সকলেই বটে ভক্ত উনো দুনো নাই ।
সেই রামকৃষ্ণ কল্পতরুমূলে ঠাঁই ॥ ৩৫৫ ॥
প্রভুর পরমপ্রিয় যতনের ধন ।
কিন্তু ভাব-ভেদে সবে প্রত্যেক রকম ॥ ৩৫৬ ॥
লাট্টুর সেবক-ভাব সেব্য শ্রীগোসাঁই ।
কাছে গিয়ে কয় কথা হেন শক্তি নাই ॥ ৩৫৭ ॥
আজ্ঞাপর সেবাপর যুক্তকর দূরে ।
রাখাল ছেলের মত কোলের উপরে ॥ ৩৫৮ ॥
জানাইতে মনোভাব শ্রীপ্রভুর কাছে ।
সর্বাগ্রে রাখালচন্দ্র লাট্টু চলে পিছে ॥ ৩৫৯ ॥
কেশ-কণ্ডুয়নসহ জড়-জড় স্বর ।
রাখাল কহেন কথা প্রভুর গোচর ॥ ৩৬০ ॥
এতদিন এইখানে দিবাবিভাবরী ।
কি হইল ফল কিছু বুঝিতে না পারি ॥ ৩৬১ ॥
শুনি বাণী রাখালের প্রভু গুণধর ।
আতঙ্কে শিহরে অঙ্গ সভীত অন্তর ॥ ৩৬২ ॥
চমকিয়া উঠিয়া কহেন সেইক্ষণে ।
অনিমেষে নিরখিয়া রাখালের পানে ॥ ৩৬৩ ॥
কেবা দিল হেন শিক্ষা ভীষণ বারতা ।
এ নহে তোদের নিজ অন্তরের কথা ॥ ৩৬৪ ॥
নিরমল-চিত্ত তোরা অন্তর সরল ।
তাহে কে ঢালিয়া দিল ভীষণ গরল ॥ ৩৬৫ ॥
জড়-স্বরে শিরে হাত বুদ্ধি আলখাল ।
হাজরার শিক্ষা ইহা কহেন রাখাল ॥ ৩৬৬ ॥
গরজিয়া প্রভুদেব কেশরীর ন্যায় ।
দ্রুতপদে ধাইলেন হাজরা যেথায় ॥ ৩৬৭ ॥
কর্কশ-ভাষায় কত তিরস্কার তারে ।
পশ্চাৎ কহেন তুমি যাও স্থানান্তরে ॥ ৩৬৮ ॥
কৃত কষ্টে লালি-পালি ছাবাল আমার ।
বিনষ্ট কারণে দেহ শিক্ষা কদাকার ॥ ৩৬৯ ॥
লজ্জা-ভয়ে ত্রস্তচিত হাজরা তখন ।
কি দিবে উত্তর মুখে না সরে বচন ॥ ৩৭০ ॥
তপ-জপ ক্রিয়াকাণ্ড সাধন-ভজন ।
অবিরত যোগে রত ধ্যানে নিমগন ॥ ৩৭১ ॥
উচ্চতর কিসে কিছু না পাই ভাবিয়ে ।
কমলার সেব্য প্রভু সেবনের চেয়ে ॥ ৩৭২ ॥
বসনে নয়নবাঁধা মানুষ যেমন ।
সন্নিকটে বস্তু নাহি পায় দরশন ॥ ৩৭৩ ॥
তেমনি প্রতাপচন্দ্র মায়ার মায়ায় ।
এক ঘরে প্রভুদেব দেখিতে না পায় ॥ ৩৭৪ ॥
দেহ আঁখি ভগবান রাখ এ অধীনে ।
ভক্তি রহে যেন তব ভক্তের চরণে ॥ ৩৭৫ ॥
ভক্ত প্রতি ঠাকুরের অতিশয় টান ।
সঙ্গে আনা আপ্তজনা প্রাণের সমান ॥ ৩৭৬ ॥
বিপদসঙ্কুল এই ধরায় আনিয়া ।
সতত সতর্কভাবে আসেন বসিয়া ॥ ৩৭৭ ॥
শুন তবে কই অতি মধুর কখন ।
পুরীমধ্যে এসময় আসে একজন ॥ ৩৭৮ ॥
বাউল-সন্ন্যাসী তেহ মহাশক্তিধর ।
করতালসম চক্ষু ডাগর ডাগর ॥ ৩৭৯ ॥
দেখিতে আকার তার বুঝিলা ঠাকুর ।
সিদ্ধায়ের শক্তি ধরে শরীরে প্রচুর ॥ ৩৮০ ॥
সেই বলে নানা মঠে করিয়া ভ্রমণ ।
স্বভাব-সাধুর করে সাধুত্ব হরণ ॥ ৩৮১ ॥
ডাইনের মত কার্য কদর্য আচার ।
এক চিন্তা অমঙ্গল কিমতে কাহার ॥ ৩৮২ ॥
কালীর প্রসাদ খায় পুরীমধ্যে থাকে ।
কে কোথায় সাধু-ভক্ত সমাচার রাখে ॥ ৩৮৩ ॥
অবশেষে
দেখিতে পাইল বিচক্ষণ ।
সাধুত্বে মণ্ডিত যত প্রভু ভক্তগণ ॥ ৩৮৪ ॥
সুযোগ উপায় চেষ্টা
উদ্দেশ্যসাধনে ।
সযতনে অন্বেষণ করে রেতেদিনে ॥ ৩৮৫ ॥
সাধুর সঙ্গেতে বসি করিলে
আহার ।
সহজে সম্পূর্ণ হয় উদ্দেশ্য তাহার ॥ ৩৮৬ ॥
সেই হেতু শ্রীপ্রভুর ভক্তদের সনে ।
কেমনে ভোজন রহে তাহার সন্ধানে ॥ ৩৮৭ ॥
সন্ন্যাসী আদতে তত্ত্ব না পায় সন্ধান ।
হরিতে যাঁহার শক্তি সদা চেষ্টাবান ॥ ৩৮৮ ॥
তাঁরা সবে-পোষাপাখী যতনের ভরে ।
নিরাপদে শ্রীপ্রভুর স্নেহের পিঞ্জরে ॥ ৩৮৯ ॥
স্পর্শ করে প্রভু-ভক্তে সাধ্য কার নাই ।
রক্ষাকর্তা নিজে হেথা জগৎ-গোসাঁই ॥ ৩৯০ ॥
যৌবনে যখন মুই করিনু প্রবেশ ।
প্রভুর সংসারে এবে সাদা দাড়ি-কেশ ॥ ৩৯১ ॥
লেশমাত্র বুঝিতে নারিনু ভক্তগণে ।
কিবা বস্তু কোথাকার শ্রীপ্রভুর সনে ॥ ৩৯২ ॥
অপার মহিমারাজি অপরূপ বল ।
পদরজ অধমের পথের সম্বল ॥ ৩৯৩ ॥
শুন তবে কি হইল কথা অতঃপর ।
ভকত বৎসল প্রভু লীলার ঈশ্বর ॥ ৩৯৪ ॥
ভক্তেন্দ্র নরেন্দ্রনাথে কহেন বচন ।
কিবা সুমধুর আস্যে হাস্য সুশোভন ॥ ৩৯৫ ॥
ভিক্ষায় মাগিয়া দ্রব্য করিয়া যোগাড় ।
আপনি রাঁধিয়া দেহ করিব আহার ॥ ৩৯৬ ॥
ঠাকুরের প্রেমে মগ্ন ত্যাগী যোগীশ্বর ।
শ্রীআজ্ঞা ধরিয়া তবে শিরের উপর ॥ ৩৯৭ ॥
অন্তরে আনন্দ কত কহা নাহি যায় ।
আয়োজন কৈলা দ্রব্য মাগিয়া ভিক্ষায় ॥ ৩৯৮ ॥
পঞ্চবটীতলে হয় রন্ধনের স্থান ।
বাউল সন্ন্যাসী সব পাইল সন্ধান ॥ ৩৯৯ ॥
উদ্দেশ্যসাধনে দেখি সুন্দর উপায় ।
একসঙ্গে ভক্তদের খাইবার চায় ॥ ৪০০ ॥
অন্তর বুঝিয়া তারে প্রভুদেব কন ।
পুরীর ছত্রেতে গিয়া করহ ভোজন ॥ ৪০১ ॥
এইখানে ভোজনের নাহিক উপায় ।
শঠ ধূর্ত সন্ন্যাসী যাইতে নাহি চায় ॥ ৪০২ ॥
তবে প্রভুদেবরায় কন রুষ্ট ভাবে ।
কি তোর বুকের পাটা কিরূপ সাহসে ॥ ৪০৩ ॥
ভোজন-প্রয়াস ইচ্ছা কর এইখানে ।
এই সব শুদ্ধ-আত্মা ভক্তদের সনে ॥ ৪০৪ ॥
প্রয়াসে হতাশ হয়ে সন্ন্যাসী তখন ।
পরিহরি কালীপুরী কৈল পলায়ন ॥ ৪০৫ ॥
শুন রামকৃষ্ণায়ন তাপ হবে দুর ।
তিল সন্দ নাহি তার জামিন ঠাকুর ॥ ৪০৬ ॥
ভক্তগণ শ্রীপ্রভুর পরানের বাড়া ।
সদা সঙ্গে প্রভু নন এক তিল ছাড়া ॥ ৪০৭ ॥
সকলের জন্য তাঁর চিন্তা রেতেদিনে ।
কে কোথায় কিবা ভাবে রহে কি রকমে ॥ ৪০৮ ॥
লীলা-আন্দোলনে তত্ত্ব পাইবে সর্বথা ।
শুন ভক্ত সংজোটন অপরূপ কথা ॥ ৪০৯ ॥
শ্রীনবগোপাল ঘোষ কায়স্থের জাতি ।
পূর্বখণ্ডে বলিয়াছি তাঁহার ভারতী ॥ ৪১০ ॥
তিন বর্ষ পূর্বে তেঁহ কিশোরীর সনে ।
একদিন মাত্র আসা প্রভু-দরশনে ॥ ৪১১ ॥
সঙ্গে লয়ে অল্পবয়ঃ কুমারী কুমার ।
ভক্তিমতী পুণ্যবতী পত্নী আপনার ॥ ৩১২ ॥
এতাধিক কাল আর নাহি দেখাশুনা ।
প্রভুর অন্তরে তাই বড়ই ভাবনা ॥ ৩১৩ ॥
কিশোরীকে প্রভুদেব কন একদিনে ।
হেঁ রে সেই ঘর যার বাদুরবাগান ॥ ৩১৪ ॥
আফিসেতে উচ্চকাজ সদয়াল মন ।
দুঃখিগণে ঔষধ করয়ে বিতরণ ॥ ৩১৫ ॥
তোমার সঙ্গেতে হৈল তিন বর্ষ প্রায় ।
আসিয়াছিলেন তেঁহ এখন কোথায় ॥ ৩১৬ ॥
যদ্যপি তোমার সঙ্গে দেখা হয় তার ।
আসিতে বলিও মাত্র আর একবার ॥ ৩১৭ ॥
কিশোরী ভক্তের মধ্যে বড়ই বিটল ।
গড়ন যেমন তেন অন্তর সরল ॥ ৩১৮ ॥
জোরে জোরে কয় কথা প্রভুর সদনে ।
সর্বদা মেলানি করে প্রভু-দরশনে ॥ ৩১৯ ॥
রাখিয়া যুবতী ভার্যা শ্বশুরের ঘরে ।
যামিনী কাটায় হেথা প্রভুর মন্দিরে ॥ ৩২০ ॥
শ্বশুর ঘরের লোক পাইয়া সন্ধান ।
তাড়া করে শ্রীমন্দিরে যেথা ভগবান ॥ ৩২১ ॥
লোকবশীকরণের দিয়া নিন্দাবাদ ।
প্রভুর সঙ্গেতে করে তুমুল বিবাদ ॥ ৩২২ ॥
তার সঙ্গে শত শত কটু কথা কয় ।
সর্বসহ প্রভুদেব তাই তাঁর সয় ॥ ৩২৩ ॥
সংগোপনে কিশোরীকে কন প্রভুরায় ।
এখানে আসিতে করি নিষেধ তোমায় ॥ ৩২৪ ॥
অভিমানে যায় মাত্র থাকিতে না পারে ।
পুনঃ উপনীত দুই-তিন দিন পরে ॥ ৩২৫ ॥
প্রভুর বারতা লয়ে চলিল কিশোরী ।
বাদুড়বাগানে যেখা গোপালের বাড়ি ॥ ৩২৬ ॥
আজি কিবা শুভ দিন ভাগ্যে গোপালের ।
যোগী ঋষি ধ্যানে যাঁর নাহি পায় টের ॥ ৩২৭ ॥
প্রেরিত তাঁহার আজ্ঞা ভক্তের দ্বারায় ।
আসিতে প্রভুর কাছে দেখিতে তাঁহায় ॥ ৩২৮ ॥
সন্দেশ পশিবামাত্র গোপালের কানে ।
বিস্ময়ে আবিষ্ট চিত্ত চমকিত প্রাণে ॥ ৩২৯ ॥
মনে মনে ভাবে এ কি করুণা অপার ।
তিন বর্ষ পূর্বে সঙ্গে দেখা একবার ॥ ৩৩০ ॥
কত লোক দিন দিন আসে যায় কাছে ।
তথাপি অদ্যাপি মোরে মনে তাঁর আছে ॥ ৩৩১ ॥
অহেতুক দয়া স্নেহ দীনের উপর ।
এই বোধে গোপালের উথলে অন্তর ॥ ৩৩২ ॥
কানায় কানায় জল ছাপাইয়া পড়ে ।
বাহিরে গড়ায় শেষে চক্ষুর দুয়ারে ॥ ৩৩৩ ॥
আনন্দের সীমা নাই রবিবার দিনে ।
শুভযাত্রা করিলেন প্রভু-দরশনে ॥ ৩৩৪ ॥
সঙ্গে ভক্তিমতী সহধর্মিণী তাঁহার ।
ছোট বড় যতগুলি কুমারী কুমার ॥ ৩৩৫ ॥
উতরিয়া শ্রীমন্দিরে শ্রীপ্রভুর পায় ।
জনে জনে শ্রীচরণে গড়াগড়ি যায় ॥ ৩৩৬ ॥
এত দিনে কেন আর নাহি ছিল আসা ।
স্নেহভরে গোপালেরে করিলা জিজ্ঞাসা ॥ ৩৩৭ ॥
গোপাল শ্রীপ্রভুদেবে করিল উত্তর ।
সুর-যোগে গেল মোর এ তিন বছর ॥ ৩৩৮ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন যোগ্য সাধন-ভজন ।
করিবার তোমার নাহিক প্রয়োজন ॥ ৩৩৯ ॥
বারত্রয় মাত্র তুমি আসিও হেথায় ।
বাসনা হইবে পূর্ণ মায়ের কৃপায় ॥ ৩৪০ ॥
সময় আগত দেখি প্রভু নারারণ ।
এইবারে গোপালেরে কৈলা আকর্ষণ ॥ ৩৪১ ॥
আকর্ষণে কিবা কাণ্ড নহে কহিবার ।
উপমায় বরিষায় গঙ্গার জুয়ার ॥ ৩৪২॥
কেমন লাগিল চক্ষে প্রভু গুণধরে ।
গোপাল থাকিতে আর নাহি পারে ঘরে ॥ ৩৪৩ ॥
প্রভুর মূরতি-চিন্তা দিবসযামিনী ।
অবসর পাইলেই গোচরে মেলানি ॥ ৩৪৪ ॥
একা কভু নয় সঙ্গে যত পরিবার ।
ভক্তিমতী সাথী দারা কুমারী কুমার ॥ ৩৪৫ ॥
কুমারদিগের মধ্যে সুরেশ যে জন ।
পাঁচ-ছয় বর্ষ মাত্র মোটে বয়ঃক্রম ॥ ৩৪৬ ॥
সুন্দর গড়নখানি নয়ন-বিনোদ ।
হৃদি-ঘটে ভক্তিভরা দেখিলেই বোধ ॥ ৩৪৭ ॥
শিশুবরে শ্রীপ্রভুর কৃপা অতিশয় ।
জননী রতনগর্ভা তার পরিচয় ॥ ৩৪৮ ॥
আশ্চর্য বালক কিবা হেন বয়ঃক্রমে ।
খোলেতে সঙ্গত করে কীর্তনের গানে ॥ ৩৪৯ ॥
জন্মাববি তাল-বোধ ভক্তিভরা ঘট ।
শিশুর আদর বড় প্রভুর নিকট ॥ ৩৫০ ॥
ভাগ্যবান ভাগ্যমতী জনক-জননী ।
পদরজ তাঁহাদের মহাভাগ্য গণি ॥ ৩৫১ ॥
গোপাল প্রভুর এক ভক্ত অন্তরঙ্গ ।
পরিচয় পাবে শুন লীলার প্রসঙ্গ ॥ ৩৫২ ॥
লীলা-রঙ্গালয়ে রঙ্গ লয়ে ভক্তগণে ।
এ তত্ত্ব না বুঝে অন্যে ভক্তগণ বিনে ॥ ৩৫৩ ॥
শুন কিবা ভক্তসঙ্গে শ্রীপ্রভুর খেলা ।
একদিন শ্রীমন্দিরে ভকতের মেলা ॥ ৩৫৪ ॥
যারে তারে কৃপাদৃষ্টি হয় শ্রীপ্রভুর ।
কল্পতরুবেশে যেন কৃপার ঠাকুর ॥ ৩৫৫ ॥
ভাব দেখি ঠাকুরের রাম ভক্তবর ।
গোপনে গোপালে কহে সংবাদ সুন্দর ॥ ৩৫৬ ॥
এই বেলা যাও কাছে করহ প্রার্থনা ।
যা চাবে তাহাই পাবে পুরিবে কামনা ॥ ৩৫৭ ॥
সন্নিধানে যাইয়া গোপাল তবে কয় ।
আমরা সংসারী জাতি দুর্বলাতিশয় ॥ ৩৫৮ ॥
সাধন-ভজন করি শক্তি নাহি গায় ।
তবে প্রভু আমাদের কি হবে উপায় ॥ ৩৫৯ ॥
শুনিয়া ভক্তের কথা কন গুণনিধি ।
সাধন-ভজন-ধ্যানে শক্তি নাহি যদি ॥ ৩৬০ ॥
করো তবে এক কর্ম ধরহ বচন ।
দিনের মধ্যেতে মোরে বারেক স্মরণ ॥ ৩৬১ ॥
কথায় না আসে মন ঠাকুরের কথা ।
রহিল হৃদয়-পটে যাবতীয় গাঁথা ॥ ৩৬২ ॥
কহিবার নহে কথা কি কহিব তোরে ।
যা কহি কেবলমাত্র বাতিকের জোরে ॥ ৩৬৩ ॥
ভক্ত সঙ্গে করি খেলা জীবের শিক্ষায় ।
দয়া কলেবর দেশ রামকৃষ্ণরায় ॥ ৩৬৪ ॥
আশ্বাসিলা যাবতীয় জগতের জনে ।
কিবা ভয় ভব-পারাবারের তুফানে ॥ ৩৬৫ ॥
জীবনের মধ্যে মাত্র যদি একবার ।
স্মরণ করহ মোরে হইবে উদ্ধার ॥ ৩৬৬ ॥
ঘোর অবিশ্বাসী কাল ভক্তিবিবর্জিত ।
আগোটা হৃদয়াকাশ তমসে আবৃত ॥ ৩৬৭ ॥
কামিনীকাঞ্চনাসক্ত প্রীতি অবিদ্যায় ।
দয়াল কাণ্ডারী যেন রামকৃষ্ণরায় ॥ ৩৬৮ ॥
কেহ নাহি চায় তাঁয় নাহি চায় পানে ।
কিনিবারে একবার স্মরণের পাণে ॥ ৩৬৯ ॥
কি দিব জীবের দোষ দোষ কিবা তার ।
বলিহারি কারিগার ডুবি অবিদ্যার ॥ ৩৭০ ॥
বিষম মায়ার মায়া দৃষ্টিচোরা ফাঁদ ।
ছানিতে না দেয় আছে অগতের চাঁদ ॥ ৩৭১ ॥
প্রভুর কৃপায় প্রাপ্ত দৃষ্টি যে জনার ।
যে দেখিতে পায় চক্ষে খেলা অবিদ্যার ॥ ৩৭২ ॥
ভৌতিক বিকারমার কাহিনীকাঞ্চন ।
যাহাতে বিমুগ্ধ-চিত জগতের জন ॥ ৩৭৩ ॥
ঘৃণা অস্পর্শীয় অতি কদাকার কারা ।
সমাদর ততক্ষণ যতক্ষণ মায়া ॥ ৩৭৪ ॥
বিভেদি যাহার ঘোর চাঁদ-দরশনে ।
যদ্যপি কাহার হয় এই সাধ মনে ॥ ৩৭৫ ॥
প্রবণ-কীর্তনে লীলা মিলিবে উপায় ।
জামিন তাহার অল্প রামকৃষ্ণরায় ॥ ৩৭৬ ॥
পূর্ণব্হ্মসনাতন প্রভু পরদেশ ।
জীবে দিতে গুরু-তত্ত্ব বিশ্বগুরুবেশ ॥ ৩৭৭ ॥