চতুর্থ খণ্ড
অবতারবাদ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বিশ্বগুরু যিনি।
জয় মাতা শ্যামাসুতা জগৎ জননী ॥
জয় জয় যাবতীয় ভক্ত দোঁহাকার ।
এ অধ্ম পদরজ মাগে সবাকার ॥
ভক্তপ্রিয় রামকৃষ্ণ ভকত বৎসল ।
ভক্তের কারণে সদা যেমন পাগল ॥ ১ ॥
নয়নের তারা তাঁর ভকতনিচয় ।
অদর্শনে দিনমান অন্ধকারময় ॥ ২ ॥
লোকালয় ঠিক বোধ শ্মশানের পারা ।
বিরহ-সন্তাপে ঝরে চক্ষে বারিধারা ॥ ৩ ॥
রাত্রিকালে নিদ্রা নাই শয্যায় যাতনা ।
দুঃখ দূর হেতু হয় শ্যামায় প্রার্থনা ॥ ৪ ॥
অল্পবয়ঃ ভক্তগণ নিজ নিজ ঘরে ।
মা-বাপের তাড়নায় আসিতে না পারে ॥ ৫ ॥
সেইহেতু দেখিবারে ভকতের দলে ।
আকুল অন্তরে যান শহর-অঞ্চলে ॥ ৬ ॥
প্রধান বৈঠক হয় আসিয়া শহরে ।
মহাভক্ত বলরাম বসুর মন্দিরে ॥ ৭ ॥
গৌর-অবতারে যেন শ্রীবাস-অঙ্গন ।
এবে তেন বলরাম বসুর ভবন ॥ ৮ ॥
আজি একদিন তথা উপনীত রায় ।
ভক্তের বিরহ-দুঃখ দূরের আশায় ॥ ৯ ॥
আর এক লালসায় রঙ্গ করিবারে ।
নররূপে যে কারণ লীলার আসরে ॥ ১০ ॥
একত্রিত করিবারে প্রিয় ভক্তগণে ।
সমাদেশ করিলেন বন্ধু বলরামে ॥ ১১ ॥
নিমন্ত্রণ করিবারে পরম আনন্দে ।
ভবনাথ শ্রীরাখাল ভক্তেন্দ্র নরেন্দ্রে ॥ ১২ ॥
আর পূর্ণচন্দ্র নামে শিশু-কলেবর ।
বদনে যাঁহার লক্ষ ব্রাহ্মণের ঘর ॥ ১৩ ॥
ঈশ্বর-কোটির ছোট-নরেন্দ্র যে জন ।
তার সঙ্গে বালক-বয়স নারায়ণ ॥ ১৪ ॥
বিশেষিয়া কন প্রভু ভক্ত বলরামে ।
ঈশ্বরের সেবা হয় এদের সেবনে ॥ ১৫ ॥
ইহারা সামান্য নয় মহা-অনুভব ।
জন্মিয়াছে ঈশ্বরের অংশে এরা সব ॥ ১৬ ॥
ভবিষ্য মঙ্গল তব শুন সংগোপনে ।
ব্রতী যদি হও তুমি এদের সেবনে ॥ ১৭ ॥
প্রভু আজ্ঞা শিরোধার্য করি বলরাম ।
জনে জনে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠান ॥ ১৮ ॥
তৃতীয় প্রহর যবে গগনেতে বেলা ।
বসুর ভবনে হৈল ভকতের মেলা ॥ ১৯ ॥
পরিপূর্ণ নিকেতন নাহি মিলে বাট ।
প্রেমের বেসাত খালি আনন্দের হাট ॥ ২০ ॥
ভক্তগণ-সহ যেথা প্রভুর মেলানি ।
গোলোক বৈকুণ্ঠ চেয়ে সেইখানে গণি ॥ ২১ ॥
স্থানের
মহিমা কিবা কহিবার নয় ।
দরশনে জীবের শিবত্ব-পদ হয় ॥ ২২ ॥
ধ্রুব লয় জৈব ভাব সেবা-ভক্তি মিলে ।
দুর্লভ চৈতন্যধন-প্রাপ্তি অবহেলে ॥ ২৩ ॥
ভক্তসঙ্গে রঙ্গে যাহা কথোপকথন ।
তার বহু নীচে বেদ আগম নিগম ॥ ২৪ ॥
উচ্চ হিমালয়-চূড়ে যেমন উঠিলে ।
নিরীক্ষণ হয় তাঁর বহু নিম্নতলে ॥ ২৫ ॥
বিবিধ আকারযুক্ত জলদের মালা ।
স্বভাবে গগনবক্ষে রঙ্গে করে খেলা ॥ ২৬ ॥
কথোপকথনে নাই ভাষার চলন ।
কেবল কটাক্ষে হাস্যে আশ্চর্য রকম ॥ ২৭ ॥
সঙ্কেতে বুঝহ তত্ত্ব নহে বলিবার ।
বুঝে ভক্তে অন্যে লাগে নিবিড় আধার ॥ ২৮ ॥
জ্ঞান-ভক্তি ঈশতত্ব জীব-শিক্ষা হেতু ।
মত-পথ ভবসিন্ধু-পারাপারে সেতু ॥ ২৯ ॥
বাখানিয়া দেখাইলা প্রভু যতগুলি ।
একমনে শুন মন যা বলান বলি ॥ ৩০ ॥
উদ্দেশ্য কেবল এবে প্রভু-অবতারে ।
অভিনব যুগধর্ম-প্রচারের তরে ॥ ৩১ ॥
জীবের হিতার্থে মাত্র একক কারণ ।
আচরিয়া যাবতীয় সাধন-ভজন ॥ ৩২ ॥
জাতীয় স্থানীয় নহে প্রকৃতি ধর্মের ।
সার্বভৌম অধিকার আছে সকলের ॥ ৩৩ ॥
যুগধর্ম বিশ্ববপু এক কলেবর ।
অলঙ্কৃত নানা বর্ণে পরম সুন্দর ॥ ৩৪ ॥
নানা বর্ণ ধর্ম খণ্ড রুচির বিশেষে ।
সমভাবে সবে পুষ্ট অনুরাগ-রসে ॥ ৩৫ ॥
দ্বন্দ্ব দ্বেষ বিসংবাদ হিংসা নাই তথা ।
বিরাজিত পূর্ণ শান্তি সমতা একতা ॥ ৩৬ ॥
যাহার ঈশ্বরলাভে বাসনা প্রবল ।
অনুরাগে আত্মহারা সদা চক্ষে জল ॥ ৩৭ ॥
ক্ষুধা নাই তৃষ্ণা নাই ক্ষিপ্ত রাত্রিদিন ।
শীতাতপে বরিষায় আশ্রমবিহীন ॥ ৩৮ ॥
হুঁশ নাই আছে কিনা লজ্জা-নিবারণ ।
স্পর্শ-শক্তি বোধ-রোধ পাগল-লক্ষণ ॥ ৩৯ ॥
হেন জন লভি যদি পরম-ঈশ্বরে ।
যুগধর্ম কিবা সাধ করে দেখিবারে ॥ ৪০ ॥
মুক্ত আঁখি দরশনে অধিকার তাঁর ।
সম্প্রদায়ীদের পক্ষে নিবিড় আঁধার ॥ ৪১ ॥
গোঁড়া-সম্প্রদায়ী নামে যাহাদের আখ্যা ।
বিচিত্র চরিত মুখে ধর্ম করে ব্যাখ্যা ॥ ৪২ ॥
ব্যাখ্যাই কেবলমাত্র নয়নে বদনে ।
ধর্ম-মূল হরি কোথা মোটে নাই প্রাণে ॥ ৪৩ ॥
অনুরাগহীন চিত্ত ভক্তি নাহি মোটে ।
ঈশ্বরের বিড়ম্বনা অবিদ্যার মুটে ॥ ৪৪ ॥
ঈশ-লাভ ঈশতত্ব ঈশ-অনুরাগ ।
ভক্তি প্রেম জ্ঞান শিক্ষা বিবেক বিরাগ ॥ ৪৫ ॥
অহংকার-বিবর্জিত দীনাধিকাচার ।
এই সব শিক্ষা দিতে প্রভু অবতার ॥ ৪৬ ॥
রূপরস ভোগ-ইচ্ছা যাহাদের মনে ।
হেন জনে নাহি ঠাঁই প্রভুর চরণে ॥ ৪৭ ॥
শ্রীবদনে বলিতেন প্রভু ভগবান ।
ঈশ্বরলাভেতে যার ব্যাকুলিত প্রাণ ॥ ৪৮ ॥
স্থান তার সমাদরে আমার সদন ।
ধনপুত্র প্রার্থনা এখানে অকারণ ॥ ৪৯ ॥
কেমনে ঈশ্বরলাভ প্রাণে সাধ যাঁর ।
প্রভুর মন্দিরে তাঁর বিমুক্ত দুয়ার ॥ ৫০ ॥
শরণ লইলে পদে ঈশ্বরের তরে ।
মনসাধ পূর্ণ প্রভু করেন অচিরে ॥ ৫১ ॥
কিবা বস্তু প্রভুদেব দেখ মন ঘটে ।
ভুবন-মোহিনী মায়া অবিদ্যার হাটে ॥ ৫২ ॥
পূর্ণব্রহ্মসনাতন অকূল-কাণ্ডারী ।
দীনবেশে অবতার নরদেহ ধরি ॥ ৫৩ ॥
চেনা দায় নর-রূপে যবে ভগবান ।
জীবের কি সাধ্য শিব ব্রহ্মা ঘোল খান ॥ ৫৪ ॥
জীবের অবোধ্য বিভু সব অবস্থায় ।
স্বরাটে বিরাটে কিবা নিত্য কি লীলায় ॥ ৫৫ ॥
অবোধ্য অবোধ্য যেবা বোধের অতীত ।
অবস্থার তারতম্যে না হয় আয়ত্ত ॥ ৫৬ ॥
সৃষ্টিরূপে নিজে স্রষ্টা পরম ঈশ্বর ।
সত্ত্বা তার প্রতি অণু-রেণুর ভিতর ॥ ৫৭ ॥
যদি কহ অংশমাত্র বিরাজ তাঁহার ।
শিরোধার্য কথা মুই করিনু স্বীকার ॥ ৫৮ ॥
পদতলে দলি অতি তুচ্ছ দূর্বাদল ।
বল দেখি বুঝিবারে আছে কার বল ॥ ৫৯ ॥
পূর্ণ অবস্থায় যাঁর অবোধ্য চরিত ।
অংশতেও সেই মত বুঝিবে নিশ্চিত ॥ ৬০ ॥
অনন্ত অখণ্ড যিনি অনাদি চেহারা ।
সীমাবদ্ধ আধারেও যোল-আনা খাড়া ॥ ৬১ ॥
তত্ত্বের মীমাংসা-হেতু ভক্তদের সনে ।
অবতারবাদে কথা কথোপকথনে ॥ ৬২ ॥
শ্রীবদনে বলিলেন যাহা গুণমণি ।
শুন তবে কহি কথা অমৃতের খনি ॥ ৬৩ ॥
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর রঙ্গ এই দিন ।
সমাগত বহু ভক্ত নবীন প্রবীণ ॥ ৬৪ ॥
তত্ত্বকথা-গাঁথা গাথা চলিছে কেবল ।
যাহাতে প্রমত্ত-চিত্ত ভকত সকল ॥ ৬৫ ॥
অতঃপর লীলা-কথা ভক্তদের সনে ।
শ্রীবদনে বিগলিত হৈল আজি দিনে ॥ ৬৬ ॥
যতন সহিত মন কর অবধান ।
শ্রবণে কীর্তনে লীলা পরম কল্যাণ ॥ ৬৭ ॥
পাঁচসিকা বুদ্ধিযুক্ত গিরিশ ধীমান ।
পরম বিশ্বাসী ভক্ত মহাভাগ্যবান ॥ ৬৮ ॥
উত্থাপন কৈলা কথা প্রভুর গোচর ।
নরেন্দ্র বলেন যেই পরম-ঈশ্বর ॥ ৬৯ ॥
অনন্ত অখণ্ড তিনি একমাত্র সার ।
কখন তাঁহার খণ্ড নহে হইবার ॥ ৭০ ॥
হেন উত্থাপন কেন শুনহ বিহিত ।
গিরিশে নরেন্দ্রে হয়ে মত বিপরীত ॥ ৭১ ॥
বিশ্বাসী গিরিশচন্দ্র মানে অবতার ।
নরেন্দ্র তাহাতে নাহি করেন স্বীকার ॥ ৭২ ॥
পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী তর্কদ্বন্দ
করে ।
উভয়েই মহাবীর সোসর সমরে ॥ ৭৩ ॥
মীমাংসার হেতু সেই তত্ত্ব গুরুতর ।
গিরিশ তুলিল তাই প্রভুর গোচর ॥ ৭৪ ॥
প্রভুর উত্তর তবে কর অবধান ।
যতই হউন বড় বিষ্ণু ভগবান ॥ ৭৫ ॥
সারবস্তু তাঁর ধ্রুব সমুদিতে পারে ।
চৌদ্দপোয়া পরিমিত নর-কলেবরে ॥ ৭৬ ॥
নরদেহে
অবতারে আসেন ধরায় ।
উপমা ধরিয়া তাহা বুঝান না যায় ॥ ৭৭ ॥
তুলনায় কিঞ্চিৎ আভাস-প্রাপ্তি হয় ।
অনুভব প্রত্যক্ষের গোচর বিষয় ॥ ৭৮ ॥
অনন্ত ঈশ্বর গাভী উপমা এখানে ।
পদ শৃঙ্গ কিবা তার অন্য কোন স্থানে ॥ ৭৯ ॥
পরশন কর যদি বুঝিবে নিশ্চয় ।
সেই এক গাভীকেই পরশন হয় ॥ ৮০ ॥
অনন্ত হইতে যেইমত অবতার ।
অবতার-স্পর্শে হয় পরশ তাঁহার ॥ ৮১ ॥
গাভীর সাংরাংশ দুধ জানা চরাচরে ।
লেজে শৃঙ্গে নহে, মিলে বাঁটের দুয়ারে ॥ ৮২ ॥
সেইরূপ অনন্তের তত্ত্ব-পরিচয় ।
মিলে মাত্র অবতারে অন্যত্রেতে নয় ॥ ৮৩ ॥
প্রাণ-কুতূহলী বুলি শুনি শ্রীবদনে ।
গিরিশ পুনশ্চ কন প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৮৪ ॥
ঈশ্বর অনন্তাপার নরেন্দ্রের মতে ।
সমস্ত ধারণা নাহি হয় কোনমতে ॥ ৮৫ ॥
ইহার উত্তরে কথা বলিলা গোসাঁই ।
সমস্ত ধারণা তাঁর আবশ্যক নাই ॥ ৮৬ ॥
ঈশ্বরের বড় ভাব অবোধ্য যেমন ।
অতিশয় ক্ষুদ্র যেটি সেটিও তেমন ॥ ৮৭ ॥
তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করা প্রয়োজন অতি ।
ধরায় উদয় যবে ধরিয়া মূরতি ॥ ৮৮ ॥
অবতার-বেশে তিনি অবতীর্ণ হন ।
অবতার-দরশনে ঈশ্বর-দর্শন ॥ ৮৯ ॥
অবতারে ঈশ্বরেতে ভিন্ন কিবা আর ।
যে বস্তু ঈশ্বর সেই বস্তু অবতার ॥ ৯০ ॥
সাগরের এক বিন্দু বারি-পরশনে ।
সাগরেই স্পর্শ হয় বুঝে দেখ মনে ॥ ৯১ ॥
অগ্নিতত্ব সত্য বটে সব জায়গায় ।
কাঠেতে যেমন বেশী এমন কোথায় ॥ ৯২ ॥
ঈশ্বরের তত্ত্ব যদি করে কোন জন ।
নরদেহে উচিত তাহার অন্বেষণ ॥ ৯৩ ॥
নরদেহে অধিকাংশ বিকাশ তাঁহার ।
অগ্নি-তত্ত্ব বেশী কাঠে যেমন প্রকার ॥ ৯৪ ॥
যে আধারে প্রেমভক্তি উথলিয়া পড়ে ।
ঈশ্বরের জন্যে যেবা ক্ষিপ্ত প্রায় ঝুরে ॥ ৯৫ ॥
অদর্শনে ঈশ্বরের দিক দেখে শূন্য ।
সেই সে আধারে তিনি নিজে অবতীর্ণ ॥ ৯৬ ॥
তবে আর এক কথা শুনহ এখন ।
কোথাও প্রকাশ বেশী কোথাও বা কম ॥ ৯৭ ॥
কোথাও বা পূর্ণভাবে আবির্ভাব তাঁর ।
বিশ্বপতি ঈশ্বর শক্তির অবতার ॥ ৯৮ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি মন ।
অবতারবাদে যাহা প্রভুর বচন ॥ ৯৯ ॥
লক্ষণ ধরিয়া তার দেখ ঘটে তুমি ।
রামকৃষ্ণ প্রভু মোর অখিলের স্বামী ॥ ১০০ ॥
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন পূর্ণ অবতার ।
ভাসে বেদ সাক্ষ্য দিতে মহামহিমার ॥ ১০১ ॥
"আচণ্ডালে প্রেম দিতে যতন সতত ।
লোকাতীত করুণায় জীবহিতব্রত ॥ ১০২ ॥
প্রাণবন্ধু জানকীর তুল্য নাহি যাঁর ।
তিনি এবে রামকৃষ্ণ পূর্ণ অবতার ॥ ১০৩ ॥
স্তব্ধকরী হুহুঙ্কার কুরুক্ষেত্র-রণে ।
সদ্যোজাত মহামোহ নিধন-কারণে ॥ ১০৪ ॥
সুগম্ভীর গীতোক্তিতে সিংহনাদ যাঁর ।
তিনি এবে রামকৃষ্ণ পূর্ণ অবতার১"
॥ ১০৫ ॥
বিশ্বাসী গিরিশচন্দ্র উৎফুল্লাতিশয় ।
মহোল্লাসে পরমেশে পুনরায় কয় ॥ ১০৬ ॥
নরেন্দ্র বলেন সেই পরম ঈশ্বর ।
বাক্য-মন-ইন্দ্রিয়াদিগের অগোচর ॥ ১০৭ ॥
তাহার উত্তরে কথা কন প্রভুরায় ।
এ মনে বুঝিতে তাঁরে মিলা মহাদায় ॥ ১০৮ ॥
কিন্তু যদি হয় পরে শুদ্ধ বুদ্ধি মন ।
ঈশ্বর গোচর তবে তাহার তখন ॥ ১০৯ ॥
কামিনীকাঞ্চনাসক্তি দূর পরিহারে ।
মন-বুদ্ধি দোঁহাকেই শুদ্ধতম করে ॥ ১১০ ॥
অবিদ্যার আধিপত্য হৃদে যতক্ষণ ।
শুদ্ধ হইবার নহে বুদ্ধি কিবা মন ॥ ১১১ ॥
মন বুদ্ধি দুটি বস্তু নামে কহা যায় ।
দুয়ে মিলে এক হয় শুদ্ধ অবস্থায় ॥ ১১২ ॥
বিশুদ্ধ অবস্থা যবে দুয়ে নয় ভিন্ন ।
উভয়ের এক নাম তখন চৈতন্য ॥ ১১৩ ॥
চৈতন্য হইলে কিবা ব্যাপার সুন্দর ।
চৈতন্যের বলে হয় চৈতন্য গোচর ॥ ১১৪ ॥
ভক্তি জ্ঞান বস্তুদ্বয়ে রক্ষা করে পথে ।
মহাবিদ্যা বিরোধিনী অবিদ্যার হাতে ॥ ১১৫ ॥
অকূল অবিদ্যা-সিন্ধু উত্তীর্ণের হেতু ।
এক ভক্তি-পারাবারে একমাত্র সেতু ॥ ১১৬ ॥
তরঙ্গ-তুফানে সেতু হয় নাড়াচাড়া ।
তখন পথিকে রক্ষা করে শক্ত-বেড়া ॥ ১১৭ ॥
জ্ঞান নামে এই বেড়া হয় অভিহিত ।
সতত সংলগ্ন সেই বেড়ার সহিত ॥ ১১৮ ॥
নিশ্চিত বুঝিবে তত্ত্ব কর অবধান ।
যেথা রহে ভক্তি সেথা জ্ঞান বিদ্যমান ॥ ১১৯ ॥
উপমা ধরিয়া তবে শুন বিবরণ ।
বহ্নির সতত সঙ্গে পবন যেমন ॥ ১২০ ॥
এই বেশে প্রভুদেব পরম ঈশ্বর ।
অন্তে জ্ঞান বাহ্যে গায়ে ভক্তির চাদর ॥ ১২১ ॥
হাতীর দ্বিবিধ দন্ত যেন উপমায় ।
ভিতরে গোপন দন্তে ভোজ্যদ্রব্য খায় ॥ ১২২ ॥
মনোহর শুভ্রতর
যুগল বাহিরে ।
সাধারণে সে কেবল প্রদর্শন তরে ॥ ১২৩ ॥
জ্ঞান-ভক্তি বুঝাইতে মঙ্গল-নিধান ।
শুন কিবা পিক-কণ্ঠে গাইলেন গান ॥ ১২৪ ॥
গীত
"যতনে
হৃদয়ে রেখো
আদরিণী
শ্যামা মাকে ।
মন, তুমি
দেখ আর আমি দেখি
আর যেন
তাঁয় কেউ না দেখে ॥
কামাদিয়ে
দিয়ে ফাঁকি
আয় মন
বিরলে দেখি
রসনারে
সঙ্গে রাধি
সে যেন মা
বলে
ডাকে ॥
কুরুচি
কুমন্ত্রী যত
নিকট হোতে
দিও নাকো
জ্ঞান-নয়নে প্রহরী রেখো
সে যেন
(খুব) সাবধানে থাকে ॥
দেবেশ-দুর্লভ জ্ঞান-ভক্তি-প্রার্থী যেবা ।
একোপায়
তাঁহার প্রভুর পদসেবা ॥ ১২৫ ॥
শ্রীপদসেবনে পুরে পূর্ণ মনস্কাম ।
চরণ-দুখানি
কল্পতরু মূর্তিমান ॥ ১২৬ ॥
১
'বীরবাণী' ২য় স্তোত্র − স্বামী
বিবেকানন্দ