পঞ্চম খণ্ড
প্রভু কর্তৃক অন্তরঙ্গগণের বাসনাপূরণ ও ভক্তগণ কর্তৃক মঠস্থাপন
বন্দ
মন বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণরায় ।
প্রেমানন্দে বন্দ গুরুদারা জগন্মায় ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ ভক্ত দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
প্রভুর দারুণ ব্যাধি শরীরের মাঝে ।
তালে টানে মন কিন্তু বাঁধা আছে কাজে ॥ ১ ॥
অবিরত মহালীলা চলিছে কেবল ।
বরষায় দিনেরেতে করে যেন জল ॥ ২ ॥
এই জল রহে লীলা ক্ষেত্র-সরোবরে ।
যাহাতে প্রচারাবাদ হইলেক পরে ॥ ৩ ॥
ছদ্মবেশ অবতার বড়ই গোপন ।
জানিতে না দেন কারে তিনি কোন্ জন ॥ ৪ ॥
মায়া-পরিচ্ছদে ঢাকা স্বরূপত্ব আছে ।
তিলে তিলে ভয় তার জানে কেহ পাছে ॥ ৫ ॥
আপনে প্রচারে হাত নাহি দিলা রায় ।
পশ্চাতে প্রচার কৈলা ভক্তের দ্বারায় ॥ ৬ ॥
সেই মহা কর্মে যাহা যাহা প্রয়োজন ।
তাহার উদ্যোগ প্রভু করেন এখন ॥ ৭ ॥
অপরে বুঝিতে তত্ত্ব লাগে মহা ধাঁধা ।
সে বুঝে যাহার মন ভক্ত-পদে বাঁধা ॥ ৮ ॥
পূর্বে বলিয়াছি আমি প্রভুর সেবায় ।
যা লাগে সংসারী ভক্তে সকল যোগায় ॥ ৯ ॥
সংসারীর যতই না থাক ঘরে ধন ।
ব্যয়েতে কাতর সদা হয় বিলক্ষণ ॥ ১০ ॥
সংসারীর টাকাকড়ি বুকের শোণিত ।
কাণাকড়ি-ব্যয়ে হয় বড়ই ক্ষোভিত ॥ ১১ ॥
প্রভুর সেবায় রত যে যে ভক্তগণ ।
সকলের চেয়ে ঘরে সুরেন্দ্রের ধন ॥ ১২ ॥
বাদ বাকি অন্য সবে হাতে পেটে খায় ।
সঞ্চয় রাখিবে কিবা ব্যয় না কুলায় ॥ ১৩ ॥
জীবিকা নির্বাহ শ্রমে নাহি জমিদারি ।
কমিয়ে ঘরের ব্যয় হেথা দেয় কড়ি ॥ ১৪ ॥
সংসার-তিয়াগী যাঁরা প্রভুর সেবনে ।
সেবা-হেতু শ্রীপ্রভুর কাছে রেতেদিনে ॥ ১৫ ॥
প্রভু বিনা যাঁহাদের আর কিছু নাই ।
খরচের টাকা থাকে তাঁহাদের ঠাই ॥ ১৬ ॥
সকলে কুমারবয়ঃ তিয়াগ-প্রকৃতি ।
মোটেই জানে না কিবা সংসারের রীতি ॥ ১৭ ॥
বিষয়-বুদ্ধির গন্ধ জানে না কেমন ।
কোলে ছিল মা-বাপের সেবায় এখন ॥ ১৮ ॥
কোন কোন বিষয়ে অধিক ব্যয় করে ।
সংসারীরা সহ্য তাহা করিতে না পারে ॥ ১৯ ॥
উদ্যানেতে ব্যয়াধিক্য দেখিয়া গৃহীরা ।
একত্তরে পরামর্শ করে যোগ্য যাঁরা ॥ ২০ ॥
রামচন্দ্র কালীপদ সুরেন্দ্র এ তিনে ।
বলিলেন সেবাপর কুমারের গণে ॥ ২১ ॥
করিতেছ অপব্যয় শোভা নাহি পায় ।
হিসাব রাখিতে হবে তুলিয়া খাতায় ॥ ২২ ॥
হুট্কো গোপাল প্রায় উদ্যানেতে থাকে ।
কথামত ব্যয়ের হিসাব-পত্র রাখে ॥ ২৩ ॥
গৃহীরা আসিয়া দেখে সময় সময় ।
কোন্ মাসে কোন্ কর্মে কত হয় ব্যয় ॥ ২৪ ॥
এইবার ব্যয় দেখে হয় হুলস্থূল ।
মূল তার হিসাবেতে ঠিকে ছিল ভুল ॥ ২৫ ॥
সেই হেতু কালীপদ দানা আখ্যা যাঁর ।
হুট্কো গোপালে করে মিষ্ট তিরস্কার ॥ ২৬ ॥
তুমুল হইল দ্বন্দ্ব ক্রমে পরিশেষে ।
নরেন্দ্রে বিদিত তাহা কৈল পরমেশে ॥ ২৭ ॥
নরেন্দ্রে দেখিয়া ক্ষুণ্ণ কন প্রভুরায় ।
চল্ আমি যাব তোরা যাইবি যেথায় ॥ ২৮ ॥
যেখানে থাকিবি তোরা সেইখানে রব ।
যেমন রাখিবি মোরে তেমতি থাকিব ॥ ২৯ ॥
নরেন্দ্র বলেন স্কন্ধে তোমায় লইয়া ।
রাখিব খাওয়াব ভিক্ষা দুয়ারে মাগিয়া ॥ ৩০ ॥
এত শুনি গুণমণি কন আর বার ।
গৃহীদের টাকাকড়ি লইও না আর ॥ ৩১ ॥
টানিয়া লইব না কি ইন্দ্রনারায়ণে ।
প্রচুর সম্পত্তি ধন তাহার ভবনে ॥ ৩২ ॥
কিছুক্ষণ বিচারিয়া পুনঃ প্রভু কন ।
কাজ নাই করে ইন্দ্র যবনী-গমন ॥ ৩৩ ॥
তারপর বলিলেন হৃদয়বিহারী ।
ডাকিয়া আনহ সেই খোট্টা মারোয়াড়ী ॥ ৩৪ ॥
খোট্টা মারোয়াড়ী এক ধনের ঈশ্বর ।
বড়বাজারেতে তার অট্টালিকা ঘর ॥ ৩৫ ॥
বহু কাল হইতে বাসনা মনে মনে ।
যোগাইতে অর্থপাতি প্রভুর সেবনে ॥ ৩৬ ॥
ভক্তবাঞ্ছা-কল্পতরু প্রভু ভগবান ।
পুরাতে বাসনা তাঁর করিলেন নাম ॥ ৩৭ ॥
খবর পাইয়া সেই খোট্টা মারোয়াড়ী ।
গোচরে হাজির সঙ্গে লয়ে টাকাকড়ি ॥ ৩৮ ॥
সম্মুখে দেখিয়া টাকা প্রভুদেব কন ।
আমি না করিব তব কাঞ্চন গ্রহণ ॥ ৩৯ ॥
করজোড়ে কহে তেঁহ বিনয়বচনে ।
আনিয়াছি মহারাজ তোমার কারণে ॥ ৪০ ॥
ফিরিয়া লইয়া যাই শক্তি নাই গায় ।
এত বলি টাকা রাখি ফিরিয়া পালায় ॥ ৪১ ॥
সম্মুখে টাকার গাদা দেখি প্রভূবর ।
ভক্তগণে আজ্ঞা শীঘ্র কর স্থানান্তর ॥ ৪২ ॥
যথা আজ্ঞা সেবকেরা চলিলা সত্ত্বরে ।
রাখিয়া আসিল কাছে মহিমের ঘরে ॥ ৪৩ ॥
ব্যয়ের কি হবে তবে বিচারিয়া মনে ।
গিরিশে ডাকিতে আজ্ঞা হৈল সেইক্ষণে ॥ ৪৪ ॥
মহাভক্ত শ্রীগিরিশ বিশ্বাসের বীর ।
বারতা পাইয়া হৈল গোচরে হাজির ॥ ৪৫ ॥
শ্রীমুখে শুনিয়া তবে সব বিবরণ ।
প্রভুর সম্মুখে তেঁহ করিলেন পণ ॥ ৪৬ ॥
একা যোগাইব ব্যয় ভয় কিবা তায় ।
নহি ভীত যদি মোর ভিটামাটি যায় ॥ ৪৭ ॥
গিরিশের বাক্যে হয়ে সাহসে পূর্ণিত ।
সেই সঙ্গে কৈলা পণ সেবকেরা যত ॥ ৪৮ ॥
গৃহিগণে দরশনে আসিতে না দিব ।
লাঠি-সোটা লয়ে দ্বারে প্রহরী থাকিব ॥ ৪৯ ॥
যুক্তিমত পর দিনে নিত্যনিরঞ্জন ।
বসিলেন দ্বারদেশ রক্ষার কারণ ॥ ৫০ ॥
মহাবীর বলবান লাঠি-সোটা হাতে ।
মাথায় পাগড়ী বাঁধা সুন্দর দেখিতে ॥ ৫১ ॥
চিরুণি আরশি সঙ্গে রামায়ণপুঁথি ।
ভোজপুরী দ্বারীদের যে প্রকার রীতি ॥ ৫২ ॥
দ্বিতলে যাইতে আর নাহি দেন কারে ।
দরশনে আসে যারা সবে যায় ফিরে ॥ ৫৩ ॥
ক্রমান্বয়ে তিন দিন ফিরিল সুরেন্দ্র ।
কতবার ফিরিলেন ভক্ত রামচন্দ্র ॥ ৫৪ ॥
অতুল ফিরিয়া গেলা গিরিশের ভাই ।
ছোটখাট কত ফিরে সংখ্যা সীমা নাই ॥ ৫৫ ॥
শ্রীঅতুল অভিমানে করিলেন পথ ।
আটক করিল দ্বারে নিত্যনিরঞ্জন ॥ ৫৬ ॥
যদি তেঁহ আপনি আসিয়া মোর ঘরে ।
ডাকিয়া লইয়া যায় প্রভুর গোচরে ॥ ৫৭ ॥
তবে যাব নৈলে আর এ জনমে নয় ।
এই দৃঢ় পণ মোর রহিল নিশ্চয় ॥ ৫৮ ॥
রাম ও সুরেন্দ্রের দুয়ে বিষাদিত মন ।
সুরেন্দ্র নির্জনে করে অশ্রু বিসর্জন ॥ ৫৯ ॥
গম্ভীরাত্মা রামচন্দ্র ভিতরে গুমরে ।
মনোদুঃখ সহসা প্রকাশ নাহি করে ॥ ৬০ ॥
অন্তরে বুঝিয়া তত্ত্ব প্রভু ভক্ত-প্রাণ ।
ডাকাইলা উভয়ে আপন সন্নিধান ॥ ৬১ ॥
সামঞ্জস্য করিয়া দিলেন পরস্পর ।
গৃহি সন্ন্যাসীতে এই থেকে মনান্তর ॥ ৬২ ॥
কেমন কৌশলচক্র দেখহ প্রভুর ।
ভক্তমাত্রে সকলের সমান ঠাকুর ॥ ৬৩ ॥
স্মরণ করহ কিবা প্রভুর বচন ।
চাঁদামামা সকলের একা কারও নন ॥ ৬৪ ॥
গৃহী সন্ন্যাসীতে দুয়ে সমান আদর ।
মধ্যে বাধাইয়া দ্বন্দ্ব করিলা রগড় ॥ ৬৫ ॥
এই দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে প্রচারে পোষ্টাই ।
প্রভুর মতন চক্রী ত্রিভুবনে নাই ॥ ৬৬ ॥
এখানে অতুলকৃষ্ণ ঘরে অভিমানে ।
এক দিন কন কভু নিত্যনিরঞ্জনে ॥ ৬৭ ॥
যাও তুমি একবার গিরিশের ঘরে ।
অতুলে ডাকিয়া আন হাত দেখিবারে ॥ ৬৮ ॥
নাড়ীজ্ঞান ব্যাধিজ্ঞান এত অতুলের ।
যেন তেঁহ ধন্বন্তরি বেশে মানুষের ॥ ৬৯ ॥
আজ্ঞামাত্র ধাইলেন নিত্যনিরঞ্জন ।
শুনিয়া অতুলকৃষ্ণ পুলকিত-মন ॥ ৭০ ॥
শ্রীপ্রভুর রঙ্গ কিবা বুঝিয়া অন্তরে ।
ত্বরান্বিত উপনীত হইলা গোচরে ॥ ৭১ ॥
ভিতরের কাণ্ড কিবা নিজে বুঝ মন ।
বেদাধিক গুরুতর রামকৃষ্ণায়ন ॥ ৭২ ॥
মুরুব্বী গোপাল সিঁতিগ্রামে ঘর যাঁর ।
চীনেবাজারেতে যাঁর ছিল কারবার ॥ ৭৩ ॥
সন্তানাদি বনিতার বিয়োগের পরে ।
মহেন্দ্র আনিলা তাঁয় প্রভুর গোচরে ॥ ৭৪ ॥
দরশনে শ্রীচরণে বাঁধা পড়ে মন ।
সন্নিধানে রহে করে প্রভুর সেবন ॥ ৭৫ ॥
হাতে ছিল টাকাকড়ি ইচ্ছা এবে মনে ।
বস্ত্র কিনে বিতরণ করে সাধুজনে ॥ ৭৬ ॥
গঙ্গাসাগরীয় যাত্রী বহু এইকালে ।
অতিথি সন্ন্যাসী নাগা শহর অঞ্চলে ॥ ৭৭ ॥
সেই সবে নব বস্ত্র দানের ইচ্ছায় ।
অনুমতি-হেতু তেঁহ কহিলেন রায় ॥ ৭৮ ॥
প্রভুদেব দেখাইয়া সেবকের গণে ।
বলিলেন দাও যদি দাও এইখানে ॥ ৭৯ ॥
এমন সুন্দর সাধু ভুবনে বিরল ।
অকলঙ্ক তনু ঘটে ভরা গঙ্গাজল ॥ ৮০ ॥
শুনিয়া গোপাল তবে প্রভুর বচন ।
কিনিয়া আনিল বস্ত্র মনের মতন ॥ ৮১ ॥
গেরুয়ার রঙে বস্ত্র সব ছোবাইলা ।
সেই সঙ্গে ছড়া রুদ্রাক্ষের মালা ॥ ৮২ ॥
বস্ত্র মালা একত্রেতে গোপাল এখানে ।
হাজির করিয়া দিলা প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৮৩ ॥
সন্ন্যাসের উপযুক্ত যে যে ভক্তগণ ।
প্রত্যেকে বসন মালা কৈলা বিতরণ ॥ ৮৪ ॥
একখানি বস্ত্র বাকি থাকে অবশেষে ।
পর দিনে দান কৈলা শ্রীগিরিশ ঘোষে ॥ ৮৫ ॥
গিরিশ সংসারী যদি মনে ত্যাগ তাঁর ।
সংসারে আছেন নাই অন্তরে সংসার ॥ ৮৬ ॥
শ্রীগিরিশ সত্য মিথ্যা উভয়ের পারে ।
প্রভুর আশিস এই তাঁহার উপরে ॥ ৮৭ ॥
একবার কন প্রভু কথোপকথনে ।
গিরিশের আছে যোগ এ দেহের সনে ॥ ৮৮ ॥
যোগী ভোগী দুই তেঁহ অপূর্ব-প্রকৃতি ।
গিরিশে না পাওয়া যায় মানুষের রীতি ॥ ৮৯ ॥
কোথাকার এই সব ভক্তনামধারী ।
সদা সঙ্গে অদ্যাপিহ বুঝিতে না পারি ॥ ৯০ ॥
হায় প্রভু কবে মোর ফুটাবে নয়ন ।
পুজা করি ভক্ত-পদ জুড়াব জীবন ॥ ৯১ ॥
গৃহী কি সন্ন্যাসী দু য়ে দীনের মিনতি ।
তোমা সবাকার পদে রহে যেন মতি ॥ ৯২ ॥
প্রভুর অবস্থা এবে বর্ণনার নয় ।
তেমন সুন্দর তনু দিনে দিনে ক্ষয় ॥ ৯৩ ॥
এ সময়ে দুগ্ধমাত্র কেবল আহারে ।
এক পোয়া দিলে যায় ছটাক উদরে ॥ ৯৪ ॥
বদনের কান্তি কিবা মনের আনন্দ ।
তিলেকের তরে নাই এক তিল বন্ধ ॥ ৯৫ ॥
বিয়াধি অসাধ্য কেহ কহিলে গোচরে ।
উত্তর প্রভুর এই আনন্দের ভরে ॥ ৯৬ ॥
"পীড়া জানে দেহ জানেরে আমার মন ।
অবিরত রহ তুমি আনন্দে মগন" ॥ ৯৭ ॥
দেহাতীত মনখানি প্রভুর আমার ।
অনুগত বশীভূত ইচ্ছামত তাঁর ॥ ৯৮ ॥
জীবের কল্যাণে মাত্র দেহেতে কদর ।
দয়াতে রাখেন দেহ দয়ার সাগর ॥ ৯৯ ॥
মহানন্দময় নিজে আনন্দের খনি ।
প্রভুর বারতা প্রভু জানেন আপনি ॥ ১০০ ॥
বিষণ্ণ হইতে তিনি নাহি দেন কারে ।
দেখিলে আনন্দ তাঁর বহে শতধারে ॥ ১০১ ॥
ভকত-রঞ্জন ভাব প্রাবল্যের বলে ।
ভক্তবর্গ ভাসে সদা আনন্দ-সলিলে ॥ ১০২ ॥
আনন্দে নরেন্দ্রনাথ সহচর সনে ।
কাটেন রজনী গোটা সাধন-ভজনে ॥ ১০৩ ॥
দিনমানে গীত-বাদ্য অবিরত চলে ।
সতত আনন্দে মগ্ন প্রভুর কৌশলে ॥ ১০৪ ॥
প্রভুর গলার হার অন্তরঙ্গগণে ।
তাঁহারাও চিরদাস প্রভুর চরণে ॥ ১০৫ ॥
প্রাণে প্রাণে টানাটানি প্রেম-সমন্বিত ।
পরস্পর পরস্পরে বিরামরহিত ॥ ১০৬ ॥
আঁখির আড়ালে যদি তিলেকের তরে ।
তাহাও বিরহ হেন ভাব পরস্পরে ॥ ১০৭ ॥
গৃহীরা সংসারকর্মে রহে স্থানান্তর ।
মনখানি কিন্তু হেথা প্রভুর গোচর ॥ ১০৮ ॥
অহেতুক ভালবাসা কর্ম স্বার্থহীনে ।
প্রত্যক্ষ দেখিহ আগে শুনা ছিল কানে ॥ ১০৯ ॥
আগোটা লীলার মধ্যে প্রভু অবতারে ।
দেখা শুনা হৈল যাহা উদ্যান ভিতরে ॥ ১১০ ॥
অতিশয় গুহ তত্ত্ব কহিবার নয় ।
অবাক হইনু দেখে এমন কি হয় ॥ ১১১ ॥
যে সকল এ ধরার নহে কারখানা ।
একমাত্র ভক্তে আর ভগবানে জানা ॥ ১১২ ॥
দেন প্রভু ভুঞ্জে ভক্ত প্রেমানন্দরোল ।
অন্তরে অন্তরে স্রোত বাহে নাহি গোল ॥ ১১৩ ॥
লোকের বাজার নাই এখন গোচরে ।
দেখিয়া দারুণ ব্যাধি সবে গেছে সরে ॥ ১১৪ ॥
সন্দেহ উদয় মনে তাঁদের এবার ।
দারুণ বিয়াধি কেন যদি অবতার ॥ ১১৫ ॥
নানা জনে নানা ভাবে নানা কথা কয় ।
গুনিলে স্মরিলে পরে বিদরে হৃদয় ॥ ১১৬ ॥
কলুষ-মানুষ বুদ্ধি দোষ কিবা তায় ।
এসেছিল দূরে গেল প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১১৭ ॥
লীলা-অবসান-কাল দেখিয়া গোসাঁই ।
করিলেন অন্তরঙ্গগণের বাছাই ॥ ১১৮ ॥
তে সবারে একত্তরে লইয়া নির্জনে ।
নিগঢ় ঈশ্বর-তত্ত্ব কন সঙ্গোপনে ॥ ১১৯ ॥
অন্তরঙ্গের মধ্যে দ্বিবিধ প্রকৃতি ।
কেহ কেহ ত্যাগী কেহ গৃহস্থের জাতি ॥ ১২০ ॥
ভাব-ভেদে উভয়ের ভিন্ন উপদেশ ।
যাহে হবে উভয়ের মঙ্গল অশেষ ॥ ১২১ ॥
প্রভুর কৌশল এক ইহার ভিতরে ।
জানিতে না দেন কিবা উপদেশ কারে ॥ ১২২ ॥
তাঁরে দেন সেই রস লীলার ঈশ্বর ।
যে রস যাহার পক্ষে পরিপুষ্টকর ॥ ১২৩ ॥
কাহারে বা দেন ধরা সময়-বিশেষে ।
রূপান্তর-প্রদর্শন সন্দেহ-বিনাশে ॥ ১২৪ ॥
শুন দিনেকের কথা অপূর্ব কাহিনী ।
শ্রীঅতুল গিরিশের সহোদর যিনি ॥ ১২৫ ॥
নাড়ীজ্ঞান বড় তাঁর সেই সে কারণে ।
প্রভুর প্রবল পীড়া দেখি এক দিনে ॥ ১২৬ ॥
সেবাপর ভক্তগণে কহিলেন তাঁয় ।
থাকিতে প্রভুর কাছে রেতের বেলায় ॥ ১২৭ ॥
দিবাভাগে এই কথা করিয়া স্বীকার ।
অতুল চলিয়া যান ঘরে আপনার ॥ ১২৮ ॥
পান-ভোজনাদি কর্ম রাজির মতন ।
ঝটীতি ভবনে সব কৈলা সমাপন ॥ ১২৯ ॥
অতীত হইলে রাত্রি প্রহরেক প্রায় ।
উদ্যানাভিমুখে আসে শ্রীপ্রভু যেথায় ॥ ১৩০ ॥
পথিমধ্যে ভক্তবর করে মনে মনে ।
শুভ রাত্রি যাবে আজি প্রভুর সেবনে ॥ ১৩১ ॥
মহাভাগ্যবান বিনা ভাগ্যে ঘটে কার ।
বিশ্বপতি শ্রীপ্রভুর সেবা-অধিকার ॥ ১৩২ ॥
এতেকাভিমান মনে উল্লাস সহিত ।
আন্দোলন করিতে করিতে উপনীত ॥ ১৩৩ ॥
যেখানে শ্রীপ্রভুদেব উদ্যান-ভিতরে ।
রাত্রি বেশী তালাবন্ধ ফটকের দ্বারে ॥ ১৩৪ ॥
দুয়ার হইতে তেঁহ করেন চীৎকার ।
সব স্তব্ধ সাড়া শব্দ নাহি মিলে কার ॥ ১৩৫ ॥
দারুণ মাঘের শীতে হিমানী বিস্তর ।
ঠাণ্ডা বায়ে শ্রীঅতুল কাঁপে থর থর ॥ ১৩৬ ॥
পূর্বেকার সুখ আশা সব হৈল দূর ।
তাহার বদলে হৃদে যাতনা প্রচুর ॥ ১৩৭ ॥
নানাবিধ চিন্তা ভাবে আকাশ-পাতাল ।
মাঝে মাঝে ডাকে ডাক না পায় নাগাল ॥ ১৩৮ ॥
হেনকালে শুন কিবা কৌশল প্রভুর ।
বাহির হইতে এক আসিল কুকুর ॥ ১৩৯ ॥
দ্রুতগতি ফটকের সরু ছিদ্র দিয়া ।
তিলেকের মধ্যে গেল উদ্যানে ঢুকিয়া ॥ ১৪০ ॥
অতুল চৈতন্যবান প্রভুর কৃপায় ।
সুপণ্ডিত ঘটনা পঠন-শক্তি গায় ॥ ১৪১ ॥
উদ্দেশিয়া প্রভুরায় মরম-বেদনা ।
জানাইয়া সেইক্ষণে করেন প্রার্থনা ॥ ১৪২ ॥
অধম হইনু প্রভু কুকুর হইতে ।
সে গেল ভিতরে মুই দাঁড়াইয়া পথে ॥ ১৪৩ ॥
হাজার ধিকার হেন দিয়া আপনাকে ।
দ্বার মুক্ত-হেতু এই শেষ ডাক ডাকে ॥ ১৪৪ ॥
শুনিতে পাইয়া তাহা মুরুব্বী গোপাল ।
ফটক খুলিয়া দিল ঘুচিল জঞ্জাল ॥ ১৪৫ ॥
উদ্যানে প্রবেশ করি যান ধীরে ধীরে ।
প্রভুর যেখানে শয্যা দ্বিতল-উপরে ॥ ১৪৬ ॥
দেখিলেন মহাভক্ত শ্রীশশী ঠাকুর ।
দাঁড়াইয়া করে পাখা শ্রীঅঙ্গে প্রভুর ॥ ১৪৭ ॥
মাছি মশা চালাইতে পাখার চালনা ।
শীত ঋতু এবে নাই গ্রীষ্মের তাড়না ॥ ১৪৮ ॥
আর এক পাশে লাটু ঘুমে অচেতন ।
গোটা রাতি জ্বলে বাতি গরম ভবন ॥ ১৪৯ ॥
অতুলে দেখিয়া শশী পাখা দিয়া তাঁয় ।
বিশ্রামের হেতু নীচে লইলা বিদায় ॥ ১৫০ ॥
শয্যায় শ্রীপ্রভুদেব নাহি নড়াচড়া ।
আপাদ-মস্তক গোটা বালাপোষে মোড়া ॥ ১৫১ ॥
কিছু পরে শ্রীঅতুল করে দরশন ।
প্রভুর গা ফুটে উঠে উজ্জ্বল কিরণ ॥ ১৫২ ॥
গাত্র আবরণখানি স্বচ্ছ নিরমল ।
দেখা যায় গোটা অঙ্গ করে ঝলমল ॥ ১৫৩ ॥
কিরণে উত্তপ্ত গৃহ হইল বহুল ।
শীতবস্ত্র জোড়া শাল খুলিল অতুল ॥ ১৫৪ ॥
খুলিয়া রাখিতে শাল সময় ক্ষণেকে ।
অন্য দিকে গেল দৃষ্টি ছাড়িয়া প্রভুকে ॥ ১৫৫ ॥
এই অবসরমধ্যে শুন বিবরণ ।
কি হইল শ্রীঅঙ্গের পটের বর্তন ॥ ১৫৬ ॥
শ্রীপ্রভুর এক অঙ্গ ভাগে আধা আধা ।
দক্ষিণাঙ্গে কৃষ্ণরূপ বাম অঙ্গে রাধা ॥ ১৫৭ ॥
কৃষ্ণাঙ্গে নীলিমাকান্তি নয়ন-রঞ্জন ।
রাধা অঙ্গ ঢল ঢল সোনার বরন ॥ ১৫৮ ॥
তখন অতুলকৃষ্ণ নিরখি ব্যাপার ।
বুঝিলেন এ আমার মাথার বিকার ॥ ১৫৯ ॥
মস্তিষ্কে প্রবল ঊনপঞ্চাশের বাই ।
মনে করে এইবারে লাটু কে উঠাই ॥ ১৬০ ॥
ভয়ে দেহে ঝরে ঘাম অন্তর সভীত ।
হেনকালে শরৎ উপরেতে উপনীত ॥ ১৬১ ॥
অমনি শ্রীপ্রভুদেব লীলার ঈশ্বর ।
নাড়া দিয়া খুলিলেন মুখের কাপড় ॥ ১৬২ ॥
অতুলে দেখিয়া তবে করেন জিজ্ঞাসা ।
তুমি যে গো এখানে কখন হৈল আসা ॥ ১৬৩ ॥
নীচে গিয়া বিশ্রাম করহ এইবারে ।
শরৎ আমার নিকট থাকিবে উপরে ॥ ১৬৪ ॥
মরি কি প্রভুর রঙ্গ স্বগণসহিত ।
সুধার-আসার রামকৃষ্ণ লীলা-গীত ॥ ১৬৫ ॥
একদিন গৃহত্যাগী ভক্তগণে কন ।
তোদের ভিক্ষার অন্ন ভোজনেতে মন ॥ ১৬৬ ॥
স্নেহ-প্রেমপরিপূর্ণ শ্রীবাক্য শুনিয়া ।
নাচিতে লাগিলা সবে উল্লাসে ভরিয়া ॥ ১৬৭ ॥
প্রধান নরেন্দ্রনাথ বাল মহেশ্বর ।
পরদিন প্রাতঃকালে সঙ্গে সহচর ॥ ১৬৮ ॥
আনন্দ-অন্তর তবে সাজিলা ভিক্ষায় ।
প্রথমে মাগিয়া ভিক্ষা গুরুদারা মায় ॥ ১৬৯ ॥
জগৎপালিকা দেবী জগৎ-জননী ।
ভিক্ষাপাত্রে যোল-আনা দিলেন আপনি ॥ ১৭০ ॥
উদ্যান হইতে পরে বাহির হইয়া ।
দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা আনিলা মাগিয়া ॥ ১৭১ ॥
তামা-রূপা তণ্ডুলাদি ভিক্ষার জিনিস ।
নয়নে দেখিয়া প্রভু পরম হরিষ ॥ ১৭২ ॥
সেই তণ্ডুলের মণ্ড তরল তরল ।
খাইয়া বলেন প্রভু পরান শীতল ॥ ১৭৩ ॥
ঈশ্বরের নরলীলা যাই বলিহারী ।
শুক ব্যাস ভাগবত বর্ণনাধিকারী ॥ ১৭৪ ॥
কি করিতে পারি মুই অতি তুচ্ছ ছার ।
বিদ্যা-বুদ্ধিহীন হেয় দাস অবিদ্যার ॥ ১৭৫ ॥
রাজেন্দ্র ডাক্তার করে চিকিৎসা এখন ।
উপশম নহে ব্যাধি পূর্বের মতন ॥ ১৭৬ ॥
দিন দিন তনু ক্ষীণ আকার বিকার ।
ভক্তগণে আনাইলা সাহেব ডাক্তার ॥ ১৭৭ ॥
ব্যাধি পরীক্ষিয়া তেঁহ শ্রীগোচরে কয় ।
বাড়িয়া গিয়াছে আর আরোগ্যের নয় ॥ ১৭৮ ॥
সাহেব চলিয়া গেল ছেড়ে দিয়ে হাল ।
অতঃপর আসিলেন শ্রীনবীন পাল ॥ ১৭৯ ॥
সুবিজ্ঞ ডাক্তার তেঁহ দেহে বহু গুণ ।
ব্যবসায়ে পক্ককেশ চিকিৎসা-নিপুণ ॥ ১৮০ ॥
যুক্তি-পরামর্শ করি রাজেন্দ্রের সনে ।
চিকিৎসা আরম্ভ কৈলা ব্যাধি-বিনাশনে ॥ ১৮১ ॥
আইলা ফাগুন মাস এবে দোল-লীলা ।
ঘরে ঘরে করে লোক আবিরের খেলা ॥ ১৮২ ॥
শ্রীপ্রভুদেবের যত অন্তরঙ্গগণে ।
একত্রিত হইলেন ফাগুয়ার দিনে ॥ ১৮৩ ॥
এইখানে আবিরের করি আয়োজন ।
আরম্ভিল নৃত্য-গীত আনন্দে মগন ॥ ১৮৪ ॥
বসনাদি সহ সব ভক্তে লালে লাল ।
উচ্চরোল বাজে তালে খোল করতাল ॥ ১৮৫ ॥
অবশেষে মাতোয়ারা ভক্ত যুথে যুথে ।
বাহিরে আইলা হেথা উদ্যানের পথে ॥ ১৮৬ ॥
যে মন্দিরে প্রভুদেব চারিধারে তার ।
সুন্দর সড়ক পথ অতি পরিষ্কার ॥ ১৮৭ ॥
সেই পথে উপনীত হয়ে ভক্তগণ ।
নাচে গায় শ্রীমন্দির করিয়া বেষ্টন ॥ ১৮৮ ॥
মহৎ প্রভু ভগবান লীলার ঈশ্বর ।
উঠিতে শকতি নাই অঙ্গ থর থর ॥ ১৮৯ ॥
দ্বিতলে দেওয়াল ধরি পথে গবাক্ষের ।
দাঁড়ায়ে দেখেন নৃত্য-গীত ভক্তদের ॥ ১৯০ ॥
প্রফুল্ল মুখারবিন্দ করে ঝলমল ।
ভক্তমন-বিমোহন আনন্দের স্থল ॥ ১৯১ ॥
ভক্তদের লক্ষ্য হৈল প্রভুর উপরে ।
প্রেমানন্দ-বিবর্ধন গবাক্ষের ধারে ॥ ১৯২ ॥
নিরখি আনন্দময় সবে মাতোয়ারা ।
অন্তরে ছুটিল যেন শতেক ফোয়ারা ॥ ১৯৩ ॥
শরীর হইল মহাবলের আধান ।
আনন্দের ধ্বনি করি ফাটায় বাগান ॥ ১৯৪ ॥
গিরিশের সহোদর অতুল যে জন ।
গুরুকায় প্রায় দুই মণের ওজন ॥ ১৯৫ ॥
পাঁচ ছয় জন মিলে একত্র হইয়া ।
নাচিতে লাগিলা তাঁরে শূন্যে উঠাইয়া ॥ ১৯৬ ॥
পাকশাঠ দিয়া কভু লুফে আস্মান ।
লক্ষে ঝম্পে পদচাপে ধরা কম্পমান ॥ ১৯৭ ॥
কেহ কেহ শ্রীপ্রভুর মুখ নিরখিয়া ।
ভূমে যায় গড়াগড়ি লুটিয়া লুটিয়া ॥ ১৯৮ ॥
কেহ বা আবির লয়ে মুঠায় মুঠায় ।
শূন্যে ছুঁড়ে বরিষণ করে ভক্তগায় ॥ ১৯৯ ॥
অবিরল লাল রেণু চারিদিকে ছুটে ।
সড়ক হইল রাঙ্গা ফাগুয়ার চোটে ॥ ২০০ ॥
শ্রীপদে প্রণাম করি পরে ভক্তগণ ।
দোলখেলা আজিকার কৈল সমাপন ॥ ২০১ ॥
নিরঞ্জনে একদিন কন প্রভুরায় ।
হ্যাঁ রে যদি ব্যাধি মোর ভাল হয়ে যায় ॥ ২০২ ॥
কি কর্ম করিবি তুই কি করিতে মন ।
এত শুনি কহে তবে নিত্যনিরঞ্জন ॥ ২০৩ ॥
বাগানের যত গাছ টান দিয়া তুলে ।
সমূলে উপাড়ি ফেলি জাহ্নবীর জলে ॥ ২০৪ ॥
শ্রীমুখে মধুর হাস্যে কন আর বার ।
তা তুই পারিস নহে অসাধ্য তোমার ॥ ২০৫ ॥
শ্রীপ্রভুর মহালীলা কি কহিতে পারি ।
দীনদুঃখী দ্বিজ-সাজে নিজে অবতরি ॥ ২০৬ ॥
সেই সে মহান বস্তু অকূল অপার ।
অন্তরঙ্গগণ এক এক অবতার ॥ ২০৭ ॥
প্রভুর বিচিত্র রঙ্গ নরেন্দ্র দেখিয়া ।
মনসন্দ-বিনাশনে জিজ্ঞাসিল গিয়া ॥ ২০৮ ॥
তুমি সিদ্ধ কিংবা তাহা ছাড়া কিছু আর ।
করিয়া সংশয় মুক্ত করহ আমার ॥ ২০৯ ॥
প্রভু বলিলেন যেই রাম সেই কৃষ্ণ ।
ইদানীতে এ আধারে সেই রামকৃষ্ণ ॥ ২১০ ॥
জীবনের গুপ্ত কথা কন প্রকাশিয়া ।
লীলা-অবসান-কাল নিকটে দেখিয়া ॥ ২১১ ॥
একদিন শ্রীনরেন্দ্র সংগোপনে কন ।
করিবারে কিছুদিন রামের সাধন ॥ ২১২ ॥
বৃক্ষমূলে রাত্রিকালে জ্বালাইয়া ধুনী ।
রামের ধিয়ানে রহে আগোটা রজনী ॥ ২১৩ ॥
দিনের বেলায় যত সঙ্গীত সহিত ।
বাদ্যযন্ত্রসহ হয় রাম-গুণ-গীত ॥ ২১৪ ॥
একদিন বেলা প্রায় আড়াই প্রহর ।
একত্রিত বহু ভক্ত ভবন-ভিতর ॥ ২১৫ ॥
মধ্যেতে নরেন্দ্রনাথ মহাত্যাগী যোগী ।
করে ধরা তানপুরা সঙ্গে বাজে ডুগী ॥ ২১৬ ॥
সমস্বরে এক সঙ্গে লয়ের সহিত ।
গাইছেন রাম-গুণ মধুর সংগীত ॥ ২১৭ ॥
গীত
সীতাপতি রামচন্দ্র রঘুপতি রঘুরাই ।
ভজলে অযোধ্যানাথ দোসরা ন কোঈ ॥
হসন বোলন
চতুর চাল অয়ন বয়ান দৃগ-বিশাল ।
ভ্রূকুটি-কুটিল তিলক-ভাল নাসিকা সোহাঈ ॥
মোতিনকো কণ্ঠমাল, তারাগণ ঊর বিশাল ।
শ্রবণকুণ্ডল ঝলমলাত রতিপতি ছবি ছাঈ ॥
সখা সহিত সরযূতীর বিহরে রঘুবংশবীর ।
তুলসীদাস হরষ নিরখি চরণরজ পাঈ॥
গীতে গরগরচিত্ত যত ভক্তগণ ।
ধ্বনিতে ফাটিয়া পড়ে আগোটা ভবন ॥ ২১৮ ॥
সংগীতের রাগে ভাবে বিভোর সকলে ।
ঘুরে-ফিরে গীতখানি ঘণ্টা ভোর চলে ॥ ২১৯ ॥
দ্বিতল উপরে হেথা প্রভু ভগবান ।
রাগমাখা গীত শুনি সুখে ভাসমান ॥ ২২০ ॥
রঙ্গ-হেতু বাহ্যে রুষ্ট ভাবপ্রদর্শনে ।
সেবাপর ভক্ত যারা ছিল সন্নিধানে ॥ ২২১ ॥
তে সবারে কহিলেন প্রভু অবতরি ।
কেহ প্রাণে মরে কেহ বলে হরি হরি ॥ ২২২ ॥
অতুল বলেন তবে মানা করি গিয়ে ।
প্রভু কন, না—শালারা লিগ্ মোরে দুয়ে ॥ ২২৩ ॥
একত্রেতে পুলকে আনন্দে গীত গায় ।
হইবেক রসভঙ্গ কি কাজ মানায় ॥ ২২৪ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে নরেন্দ্র আপনি ।
দ্বিতলে হাজির যেথা প্রভু গুণমণি ॥ ২২৫ ॥
নিরখিয়া তাঁহে প্রভু পুলকিত মন ।
প্রভুর নরেন্দ্রনাথ জীবন-জীবন ॥ ২২৬ ॥
ভক্তবরে
গুণমণি কহিলেন পিছে ।
যে গীত গাইছ তার আরো কলি আছে ॥ ২২৭ ॥
এত বলি সেই কলি গান আউরিয়া ।
জনেক তখনি নিল কাগজে লিখিয়া ॥ ২২৮ ॥
গীতাংশ
কেশরকো তিলক ভাল মানরবি প্রাতঃকাল ।
শ্রবণকুণ্ডল ঝলমলাত রতিপতি ছবিছাঈ ॥
নিম্নতলে পুনঃ সবে হয়ে একত্রিত ।
গাইতে লাগিলা সেই আগোটা সংগীত ॥ ২২৯ ॥
নরেন্দ্র না মানে মোটে সাকারের কথা ।
প্রভুর মোহনে মত্ত রামনামে হেথা ॥ ২৩০ ॥
নরেন্দ্র সাধক-শ্রেষ্ঠ রামের সাধনে ।
একদিন দরশন কৈলা হনুমানে ॥ ২৩১ ॥
তাহাতে কেমন ভাব হইল তাঁহার ।
ভাগবত লীলা-তত্ত্ব বুঝা অতি ভার ॥ ২৩২ ॥
ভাবের প্রবলবেগে শরীর অস্থির ।
হাতেতে ধরিয়া লাঠি ঘুরে শ্রীমন্দির ॥ ২৩৩ ॥
একেবারে মত্ততুল্য নাহি বাহ্যজ্ঞান ।
মন্দির বেষ্টন করি ঘুরিয়া বেড়ান ॥ ২৩৪ ॥
ভাব দেখি বিশ্বাস প্রতীত হয় মনে ।
যেন
তাঁর প্রভুদেব মানিকরতনে ॥ ২৩৫ ॥
পাছে কেহ লয়ে যায় করিয়া হরণ ।
সেহেতু প্রহরিভাবে
মন্দির বেষ্টন ॥ ২৩৬ ॥
রামকৃষ্ণ-গত-প্রাণ প্রেমিক বৈরাগী ।
প্রভুর কারণে যেবা
সর্বস্ব-তিয়াগী ॥ ২৩৭ ॥
মাতা-ভ্রাতা ঘরবাড়ি সব বিসর্জন ।
আত্মীয় বান্ধৰ আদি দেহ প্রাণমন ॥ ২৩৮ ॥
এহেন সন্ন্যাসী যিনি শ্রীনরেন্দ্রনাথ ।
বন্দিতে চরণ তাঁর কোটি প্রণিপাত ॥ ২৩৯ ॥
যোগিবর ত্যাগিবর অবিদ্যা বিজিত ।
নানাভাষাবিদ্যাবিদ শাস্ত্রাদি অতীত ॥ ২৪০ ॥
বালমহেশ্বর মূর্তি তেজঃপুঞ্জ-তনু ।
অবিরত দীপ্তিমান শিরে জ্ঞান-ভানু ॥ ২৪১ ॥
অন্তরের ঘটমধ্যে বহে কল্ কল্ ।
প্রেম-ভক্তি-জাহ্নবীর নিরমল জল ॥ ২৪২ ॥
গন্ধর্ব-নিন্দিতকণ্ঠ নয়ন বিশাল ।
জন-মনবিমোহন হৃদয় দয়াল ॥ ২৪৩ ॥
এহেন সন্ন্যাসী যিনি শ্রীনরেন্দ্রনাথ ।
বন্দিতে চরণ তাঁর কোটি প্রণিপাত ॥ ২৪৪ ॥
দিন দিন দেহ ক্ষয় দেখিয়া প্রভুর ।
অন্তরে নরেন্দ্রনাথ বড়ই আতুর ॥ ২৪৫ ॥
প্রভুদেবে একদিন খেদভরে কন ।
নিজ স্থানে পলাইবে করিছ উদ্যম ॥ ২৪৬ ॥
মুই তিয়াগিনু সব তোমার কারণে ।
কি করিলে মোর কিবা হবে পরিণামে ॥ ২৪৭ ॥
নীরবে শুনিলা সব লীলার ঈশ্বর ।
সে দিনে না দিলা কোন কথার উত্তর ॥ ২৪৮ ॥
দিবস কয়েক পরে আর নয় বেশী ।
হঠাৎ ধিয়ানে মগ্ন প্রেমিক সন্ন্যাসী ॥ ২৪৯ ॥
গভীর ধিয়ানে যেন তনুখানি জড় ।
শ্রীগোচরে সমাচার চলিলা সত্বর ॥ ২৫০ ॥
ভক্তের ঈশ্বর প্রভু হাস্যাননে কন ।
"পশ্চাতে ভাঙ্গিব-ভোগ করুক এখন" ॥ ২৫১ ॥
চৌদিকে দণ্ডায়মান আছে ভক্তশ্রেণী ।
বহুক্ষণ পরে দিলা অঙ্গ নাড়া ধ্যানী ॥ ২৫২ ॥
কিছু পরিমাণে যবে আইল চেতন ।
তখন হইল তাঁর দেহের স্মরণ ॥ ২৫৩ ॥
সমাধিতে দেহী দেহে ছিল স্বতন্তর ।
এবে টেঠা তাই দেহী চান দেহ-ঘর ॥ ২৫৪ ॥
দেহ কোথা দেহ কোথা বলিয়া এখন ।
হাতড়িয়া দেহের করেন অন্বেষণ ॥ ২৫৫ ॥
শয্যাগত রোগী যেন অন্ধকার ঘরে ।
হামা দিয়া কোন বস্তু অন্বেষণ করে ॥ ২৫৬ ॥
প্রভুকে বিদিত কৈল ভকতনিচয় ।
ধ্যানীর অবস্থা কিবা মুখে কিবা কয় ॥ ২৫৭ ॥
আজ্ঞামত ভক্ত-বর্গে ধরিয়া ধ্যানীরে ।
উপরে লইয়া যান প্রভুর গোচরে ॥ ২৫৮ ॥
বাহ্য চেঁঠা দিয়া তারে কন ভগবান ।
এই সেই বস্তু যার করহ সন্ধান ॥ ২৫৯ ॥
দেহভাববিলুপ্ত সমাধি নাম এর ।
অপরের কথা কি দুর্লভ যোগেশের ॥ ২৬০ ॥
"সমাধির ঘর এবে রৈল আঁটা তোলা ।
আগে কর কর্ম মোর পরে পাবে খোলা" ॥ ২৬১ ॥
কর্ম মানে এইখানে প্রচার প্রভুর ।
এ কাজে সুযোগ্য জন নরেন্দ্রঠাকুর ॥ ২৬২ ॥
প্রভুর অধিক শক্তি ইহার ভিতরে ।
সবিশেষ পরিচয় ক্রমে পাবে পরে ॥ ২৬৩ ॥
প্রচারেতে শক্তিপ্রাপ্ত অগ্রে কয়জন ।
পূর্বেকার কথা এবে কহি শুন মন ॥ ২৬৪ ॥
পীড়াগ্রস্ত হইবার কিছুকাল আগে ।
একদিন প্রভুদেব আবেশের বেগে ॥ ২৬৫ ॥
বলিলেন মা কালীকে সম্বোধন করি ।
মা আমি কহিব কত আর নাহি পারি ॥ ২৬৬ ॥
বিজয় মহেন্দ্র রাম গিরিশ কেদার ।
এই কয়জনে কর শক্তির সঞ্চার ॥ ২৬৭ ॥
শিখাইয়া বুঝাইয়া অন্য লোকজনে ।
চাষ দিয়া হৃদি ক্ষেত্রে আনিবে এখানে ॥ ২৬৮ ॥
আমি মাত্র একবার করি পরশন ।
তাদের করিয়া দিব কার্য সমাপন ॥ ২৬৯ ॥
কি তোরে কহিব মন প্রভুদেব কেবা ।
বাঞ্ছাপূর্ণ ধ্রুব কর ভক্ত-পদসেবা ॥ ২৭০ ॥
অন্তরঙ্গ সঙ্গে রঙ্গ এই মত করি ।
অতীত হইল প্রায় মাস তিন চারি ॥ ২৭১ ॥
এখন দেখিলে তাঁরে চেনা নাহি যায় ।
এমত অবস্থাপন্ন হইলেন রায় ॥ ২৭২ ॥
তথাপি ভরসা আশা সকলের করে ।
পীড়াতে বিমুক্ত প্রভু হইবেন পরে ॥ ২৭৩ ॥
একদিন প্রভুদেব নিরঞ্জনে কন ।
"দেখরে অবস্থা এক এসেছে এখন ॥ ২৭৪ ॥
যে কেহ দেখিবে মোরে হেন অবস্থায় ।
সে হবে জীবন-যুক্ত মায়ের ইচ্ছায় ॥ ২৭৫ ॥
কিন্তু সেই সঙ্গে কথা বুঝিও নিশ্চয় ।
পরমায়ু অধিক হইবে মোর ক্ষয়" ॥ ২৭৬ ॥
শ্রীবাণী শুনিয়া তবে নিত্যনিরঞ্জন ।
হাতে লাঠি দ্বারদেশে বসিল তখন ॥ ২৭৭ ॥
দিনেরেতে সতত সতর্কভাবে থাকে ।
আসিতে না দেন কোন বাহিরের লোকে ॥ ২৭৮ ॥
অবোধ্য যে জন তাঁর অবোধ্য সকল ।
অতলের কোনকালে কেবা পায় তল ॥ ২৭৯ ॥
সিন্ধুর তরঙ্গরাজি বিন্দুর আধারে ।
কর্মকাণ্ড দেখিয়া ধাতার ধাতু ছাড়ে ॥ ২৮০ ॥
এত যে আসিল লোক প্রভুর নিকটে ।
ষোল আনা পাঁচসিকা বুদ্ধি-বল ঘটে ॥ ২৮১ ॥
নানাশাস্ত্রবিদ্যাবিদ সিদ্ধ সাধনায় ।
কেহই বুঝিতে কিছু পারিল না তাঁয় ॥ ২৮২ ॥
অদ্ভুত যেমন প্রভু অদ্ভুত তেমন ।
নিজে যেন সেইমত অঙ্গের গঠন ॥ ২৮৩ ॥
কার্যাদি তদনুরূপ বুঝিবার নয় ।
সরল হইয়া হৈলা বাঁকা অতিশয় ॥ ২৮৪ ॥
কঠিন যেমন তেন আবার কোমল ।
গাম্ভীর্যে সুমেরু শিশু-সমান চঞ্চল ॥ ২৮৫ ॥
ন্যায়পরায়ণতায় নিক্তির ওজন ।
দয়ায় জীবের তরে প্রাণ সমর্পণ ॥ ২৮৬ ॥
বিধানে বিধানাতীতে পূর্ণত্ব সমান ।
বিশ্বের মঙ্গলে একা মঙ্গলনিদান ॥ ২৮৭ ॥
দেহের গড়নে নাই সাধারণ রীত ।
বুঝিতে নারিল এল এতো ব্যাধিবিৎ ॥ ২৮৮ ॥
পাইল না নাগাল কেহই বিয়াধির ।
সুদূরে সাহস কাছে দেখে বুদ্ধি স্থির ॥ ২৮৯ ॥
এখন দেহের দশা আছে মাত্র প্রাণী ।
কঙ্কালবিশিষ্ট তাহে চামের ছাউনি ॥ ২৯০ ॥
প্রবল ব্যাধির ক্রম ইহার উপরে ।
দেখিলেই দর্শকের নাড়ীধাতু ছাড়ে ॥ ২৯১ ॥
ব্যাধির বিক্রম কথা না যায় বর্ণন ।
এক দিন এ সময়ে শোণিত-বমন ॥ ২৯২ ॥
মুখ বেয়ে রক্তস্রাব বিস্তর বিস্তর ।
নরেন্দ্র ধরেন তাহা লইয়া ডাবর ॥ ২৯৩ ॥
এক পাত্র হৈল পূর্ণ অন্য পাত্র ধরে ।
বাহিরে আসিল রক্ত যা ছিল শরীরে ॥ ২৯৪ ॥
নীচেতে বাগানে শশী মাটির ভিতর ।
শোণিত পুঁতিয়া খালি করেন-ডাবর ॥ ২৯৫ ॥
বুঝা নাহি যায় এই জীর্ণ শীর্ণ কায় ।
বমন এতেক রক্ত — আছিল কোথায় ॥ ২৯৬ ॥
ইহাতেও হ্রাস নাহি কান্তি বদনের ।
কিংবা কিছু চিন্তা ত্রাস শ্রীপ্রভুদেবের ॥ ২৯৭ ॥
সর্বৈব প্রকারে প্রভু অবোধ্য সবার ।
দেবেশ যোগেশ কিবা শিবাদি ব্রহ্মার ॥ ২৯৮ ॥
অন্তরঙ্গগণে প্রভু আভাসেতে কন ।
নিত্যধামে এইবারে করিব গমন ॥ ২৯৯ ॥
বুঝিয়াও কেহ কিন্তু বুঝিতে না পারে ।
মায়ায় ভুলায়ে দেন কিছুক্ষণ পরে ॥ ৩০০ ॥
একদিন মাস্টারের সঙ্গে কথা হয় ।
এ দেহ অধিক দিন আর নাহি রয় ॥ ৩০১ ॥
মাস্টার উত্তরে কন অন্তরে বিষাদ ।
আমাদের কিন্তু কিছু মিটিল না সাধ ॥ ৩০২ ॥
প্রত্যুত্তরে বলিলেন প্রভুদেবরায় ।
এই সাধ ভক্তদের কভু না ফুরায় ॥ ৩০৩ ॥
বাহুল্যে ইহার অর্থ কহি শুন মন ।
আদর্শাবতারে প্রভু আসেন যখন ॥ ৩০৪ ॥
ভক্তসঙ্গে ধরাধামে খেলিবার তরে ।
বুঝিতে সক্ষম ভক্ত অন্য কেহ নারে ॥ ৩০৫ ॥
আদর্শাবতারে হয় বিচিত্র লেখনী ।
লাখে লাখে বদ্ধজীব হয় উর্ধ্বগামী ॥ ৩০৬ ॥
লাখে লাখে বন্ধ মুক্ত দয়ার কারণ ।
অপার সংসারার্ণবে সেতুর বন্ধন ॥ ৩০৭ ॥
তাড়িতে বারতা বহে লোক চতুর্দশে ।
দিবারাতি গতিবিধি ভূতলে আকাশে ॥ ৩০৮ ॥
অশরীরী দেবদেবী শরীর সহিত ।
নানাবেশে লীলাধামে রহে বিরাজিত ॥ ৩০৯ ॥
তীর্থ যত জাগরিত পাপক্ষয়ে হয় ।
গোলক মরুত দিব্য অনুক্ষণ কয় ॥ ৩১০ ॥
সংসার মরুতে ধরে বৃন্দাবন-রীত ।
সহ পুঞ্জ কুঞ্জরাজি চৌদিকে ব্যাপিত ॥ ৩১১ ॥
মূর্তিমান ভগবান নিজে কল্পদ্রুম ।
ঘরে ঘরে ঈশ্বরে অর্চনার ধূম ॥ ৩১২ ॥
বিবেকবিরাগদ্বয় ঝাঁজ ঘণ্টা বাজে ।
গোটা ধরা আলোময় চৈতন্যের তেজে ॥ ৩১৩ ॥
চমকিত নিদ্রাতুর জগবাসী জনে ।
অশ্রুত অভূতপূর্ব পটদরশনে ॥ ৩১৪ ॥
সত্ত্বগুণে রতি মতি স্বচ্ছ নিরমল ।
স্বধর্মানুরাগবৃত্তি স্বভাবে প্রবল ॥ ৩১৫ ॥
গুরুজনে শ্রদ্ধা-ভক্তি বৈধি আচরণ ।
শাস্ত্রে রাগ শাস্ত্রবাক্যপালনে যতন ॥ ৩১৬ ॥
আদর্শাবতারে এই ভাবাদি সকল ।
সহজে জীবেতে হয় স্বতই প্রবল ॥ ৩১৭ ॥
অন্তরঙ্গে এই সব করে দরশন ।
অপরে দেখিতে তাহা না পায় কখন ॥ ৩১৮ ॥
স্বতন্তর খেলা তাঁর অন্তরঙ্গ সনে ।
যাহাতে প্রমত্ত চিত্ত রহে ভক্তগণে ॥ ৩১৯ ॥
লীলা-রঙ্গরস-পানে হয় মত্ততর ।
ভক্ত বিনা অন্যে যার জানে না খবর ॥ ৩২০ ॥
লীলার প্রাঙ্গণে লীলা-রসের আস্বাদ ।
যতই না ভোগে ভক্ত নাহি মিটে সাধ ॥ ৩২১ ॥
মাস্টারের কাছে প্রভু বলিলেন তাই ।
এই সাধ ভক্তদের কভু মিটে নাই ॥ ৩২২ ॥
এবে শ্রাবণের মাস প্রায় শেষ হয় ।
আট নয় দিন বাকি আর বেশী নয় ॥ ৩২৩ ॥
একদিন শ্রীযোগীনে শ্রীআজ্ঞা তাঁহার ।
পঁচিশে হইতে পাঠ কর পঞ্জিকার ॥ ৩২৪ ॥
দিন তারিখের তিথি নক্ষত্র যেমন ।
সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রভু করিলা শ্রবণ ॥ ৩২৫ ॥
পয়লা ভাদ্রের কথা আরম্ভে গোসাঁই ।
বলিলেন থাক আর পাঠে কাজ নাই ॥ ৩২৬ ॥
আর দিন বিধিমত ক্রিয়া সমাপনে ।
সন্ন্যাস দিলেন প্রভু ভক্ত দশজনে ॥ ৩২৭ ॥
নরেন্দ্র যোগীন লাটু নিত্যনিরঞ্জন ।
বাবুরাম কালীচন্দ্র বণিকনন্দন ॥ ৩২৮ ॥
সুন্দর শরৎ শশী ও তারক ঘোষাল ।
শেষ জন নাম যাঁর মুরুবিব গোপাল ॥ ৩২৯ ॥
রাখাল না ছিলা আজি গিয়াছিলা ঘরে ।
পশ্চাতে সন্ন্যাস প্রাপ্ত আইলে গোচরে ॥ ৩৩০ ॥
এই একাদশে আজ্ঞা দিলা গুণমণি ।
যার তার খাস তোরা হইবে না হানি ॥ ৩৩১ ॥
এ সময় কিছু দিন ক্রমান্বয়ে প্রায় ।
ভক্তেন্দ্র নরেন্দ্রনাথে কন প্রভুরায় ॥ ৩৩২ ॥
"দেখ কি আশ্চর্য এক করি দরশন ।
সুবিশাল ময়দানে শিশু একজন ॥ ৩৩৩ ॥
নানাবিধ রত্ন মণি গাদা চারিধারে ।
যারে যারে ইচ্ছা তায় বিতরণ করে" ॥ ৩৩৪ ॥
এই সব মহাবাক্যে কিবা গূঢ় মানে ।
সহজে
বুঝিবে লীলা শ্রবণ-কীর্তনে ॥ ৩৩৫ ॥
আর দিন শশীকে কহেন প্রভুরায় ।
ডাকিয়া আনিতে গুরু-দারা জগন্মায় ॥ ৩৩৬ ॥
বুদ্ধিমতী তিনি তাঁরে করিতে জিজ্ঞাসা ।
কি উপায় হইবে হইল হেন দশা ॥ ৩৩৭ ॥
ব্রহ্মজ্ঞানে অবিরত এবে প্রভুরায় ।
ব্রহ্মজ্ঞানে তত্ত্বকথা কথায় কথায় ॥ ৩৩৮ ॥
দেখ গো জানি না মোর কহ কি কারণে ।
সর্বদাই ব্রহ্মভাব-উদ্দীপনা মনে ॥ ৩৩৯ ॥
দেহে মন ছাড়া ছাড়া দেহে উদাসীন ।
সংগোপনে দেবেন্দ্র কহেন একদিন ॥ ৩৪০ ॥
প্রবল বাসনা সদা উঠিছে অন্তরে ।
সমাধিস্থ হয়ে থাকি সপ্তমের ঘরে ॥ ৩৪১ ॥
একত্রিশে সংক্রান্তিতে শ্রাবণ মাহার ।
বারশ তিরানববই সাল রবিবার ॥ ৩৪২ ॥
বড় বিপদের দিন অতি ভয়ঙ্কর ।
নিত্যধামে যাইবেন লীলার ঈশ্বর ॥ ৩৪৩ ॥
পরিহরি লীলাধামে সাঙ্গোপাঙ্গগণে ।
শ্রীপ্রভুর মহালীলাপ্রচার-কারণে ॥ ৩৪৪ ॥
দিনমান গেল এল বিকালের বেলা ।
উদ্যানের মধ্যে বহু ভক্তদের মেলা ॥ ৩৪৫ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে জ্বালা আজি বর্ণন-অতীত ।
ক্ষয়-নাড়ী মাঝে মাঝে চালনা রহিত ॥ ৩৪৬ ॥
উপনীত চিকিৎসক হৈল হেনকালে ।
ভক্তেরা লইয়া তাঁরে চলিলা দ্বিতলে ॥ ৩৪৭ ॥
ডাক্তার নবীন পাল নাড়ী পরীক্ষিয়া ।
বুঝিতে নারিল কিছু বিশেষ করিয়া ॥ ৩৪৮ ॥
দিনের অবস্থা তাঁরে কন প্রভুরায় ।
দেখ গো আমার যেন প্রত্যেক শিরায় ॥ ৩৪৯ ॥
চলিতেছে গরম জলের পিচকারী ।
অতিশয় অঙ্গ জ্বলে সহিতে না পারি ॥ ৩৫০ ॥
নাড়ীর পরীক্ষা আজি অনেকে করিল ।
প্রকৃত অবস্থাখানি বুঝিতে নারিল ॥ ৩৫১ ॥
একাকী অতুলকৃষ্ণ ক্ষয়নাড়ী কয় ।
এমত অবস্থাপন্নে পরান-সংশয় ॥ ৩৫২ ॥
ভবনে গমন-কালে কন ভক্তগণে ।
সচকিত থাকিতে প্রভুর সন্নিধানে ॥ ৩৫৩ ॥
সন্ধ্যার অলপ আগে প্রভু ভগবান ।
বোধ করিলেন বুকে হাঁপানির টান ॥ ৩৫৪ ॥
দেখাইয়া সেবাপর ভক্তদের দলে ।
বলিলেন ইহাকেই নাভি-শ্বাস বলে ॥ ৩৫৫ ॥
বিশ্বাস না হৈল কার প্রভুর কথায় ।
আনিল সুজির বাটি খাওয়াইতে তাঁয় ॥ ৩৫৬ ॥
নরেন্দ্রের আজ্ঞামত মুই আজি দিনে ।
রাত্রির মতন ছিনু সেবার কারণে ॥ ৩৫৭ ॥
এমন সময় ডাক হইল আমায় ।
দেখিনু শয্যার পাশে বসিয়া শ্রীরায় ॥ ৩৫৮ ॥
সুজি খাওয়াতে চেষ্টা ভক্তগণে করে ।
মুখ বেয়ে পড়ে ছুঁয়ে না যায় উদরে ॥ ৩৫৯ ॥
অতি অল্প পরিমাণে গলাধঃকরণ ।
জঠরে যেমন ক্ষুধা রহিল তেমন ॥ ৩৬০ ॥
মুখ পাখালিয়া পুনঃ মুছায়ে বসনে ।
বিছানায় শুইয়া দিল সাবধানে ॥ ৩৬১ ॥
পদ-প্রসারণে শক্তি নাহিক প্রভুর ।
বালিসে মেলায়ে দিলা শ্রীশশীঠাকুর ॥ ৩৬২ ॥
বিরাট তালের পাখা দিয়া মোর হাতে ।
বলিলেন কোমলাঙ্গে ব্যজন করিতে ॥ ৩৬৩ ॥
সেইমত আর পাখা শাণ্ডেলের করে ।
তিনিও চালান পাখা শক্তি অনুসারে ॥ ৩৬৪ ॥
দেখিতে দেখিতে মাত্র চকিত ভিতর ।
সমাধিস্থ প্রভুদেব তনুখানি জড় ॥ ৩৬৫ ॥
স্বাভাবিক সমাধির মত ইহা নয় ।
বৈলক্ষণ্য-গুণে সবে সভীত হৃদয় ॥ ৩৬৬ ॥
সংশয়-সংযুক্তে অঙ্গে নাড়িয়া প্রভুর ।
কাঁদিতে লাগিলা কাছে শ্রীশশীঠাকুর ॥ ৩৬৭ ॥
ত্বরিত গমনে যুক্তি কহিলা আমারে ।
সংবাদপ্রদানহেতু গিরিশের ঘরে ॥ ৩৬৮ ॥
গিরিশ ও রামে দিনু সংবাদ যাইয়া ।
এখন দুডণ্ড রাত্রি প্রহর ছাড়িয়া ॥ ৩৬৯ ॥
প্রভুর সমাধি ভঙ্গ দুপুরের পর ।
বলেন ক্ষুধায় মোর জ্বলিছে উদর ॥ ৩৭০ ॥
সেবাপর ভক্তগণে পাইয়া পরানী ।
শ্রীবদনে শ্রীপ্রভূর শুনিয়া শ্রীবাণী ॥ ৩৭১ ॥
উঠিয়া বসিলা প্রভু শয্যার উপর ।
খাইলেন সব সুজি ভরিয়া উদর ॥ ৩৭২ ॥
এক তোলা যার পক্ষে দুস্কর ভোজন ।
কি কব আশ্চর্য কথা এবে সেইজন ॥ ৩৭৩ ॥
পাত্র পরিপূর্ণ সুজি খান অবহেলে ।
গলায় বিয়াধি যেন নাই কোনকালে ॥ ৩৭৪ ॥
ভোজনান্তে শান্তি বোধে কন ভগবান ।
উদর-তৃপ্তিতে হৈল শীতল পরান ॥ ৩৭৫ ॥
প্রভুর ভোজন হেন বহুদিন পরে ।
দেখিয়া আনন্দে মগ্ন ভকতনিকরে ॥ ৩৭৬ ॥
নরেন্দ্র শ্রীপ্রভুদেবে কহেন তখন ।
নিদ্রায় আরাম চেষ্টা উচিত এখন ॥ ৩৭৭ ॥
এত শুনি গুণমণি লীলার ঈশ্বর ।
বহুকালাবধি কণ্ঠে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বর ॥ ৩৭৮ ॥
আজি পূর্ণকণ্ঠে নাহি বিয়াধি যেমন ।
তিনবার কালী কালী কৈলা উচ্চারণ ॥ ৩৭৯ ॥
মা কালী জীবন তাঁর ডাকিয়া তাঁহারে ।
ধীরে
ধীরে শুইলেন শয্যার উপরে ॥ ৩৮০ ॥
নানামতে সেবা করে ভকতনিকর ।
শ্রীপাদসেবায় শ্রীনরেন্দ্র নরবর ॥ ৩৮১ ॥
বিধিমতে সেবাচেষ্টা করে ভক্তশ্রেণী ।
যাহে হন নিদ্রাগত ঠাকুর আপনি ॥ ৩৮২ ॥
প্রভুকে সুস্থির দেখি নরেন্দ্র তখন ।
বিশ্রামের হেতু নীচে করেন গমন ॥ ৩৮৩ ॥
ইতিমধ্যে কি হইল শুন অতঃপর ।
কণ্টকিত চকিতে প্রভুর কলেবর ॥ ৩৮৪ ॥
নাসিকার অগ্রভাগে আঁখিদৃষ্টি স্থির ।
সুশোভন হাস্যানন সমাধি গভীর ॥ ৩৮৫ ॥
এই সমাধিতে হইল সমাধি মহান্ ।
লীলাধামে ফিরে না আইলা ভগবান ॥ ৩৮৬ ॥
ভক্তগণে সমাধির অবস্থা দেখিয়া ।
প্রাণে-সারা বাক্য-হারা রহিল বসিয়া ॥ ৩৮৭ ॥
একটা বাজিয়া মাত্র দুমিনিট পার ।
মহাসমাধিস্থ যবে শ্রীপ্রভু আমার ॥ ৩৮৮ ॥
ইহারই কিঞ্চিত পরে আইল বাগানে ।
ভক্ত রামচন্দ্র আর গিরিশ দুজনে ॥ ৩৮৯ ॥
আদি-অন্ত শুনিয়া সকল বিবরণ ।
বুঝিতে না পারে কিবা কর্তব্য এখন ॥ ৩৯০ ॥
উপায়-বিধান কিছু করিবারে স্থির ।
সভীত বসিয়া বাঁধাঘাটে সরসীর ॥ ৩৯১ ॥
যুকতি-উপায় স্থির যে বুদ্ধির বলে ।
ব্যাপার দেখিয়া গেছে সেই বুদ্ধি টলে ॥ ৩৯২ ॥
যে প্রভুর বিদ্যমানে দিবা কি যামিনী ।
গগন ভেদিয়া উঠে আনন্দের ধ্বনি ॥ ৩৯৩ ॥
বিপরীত ভাব আজি সবে ম্রিয়মান ।
অকূল পাখারে মগ্ন আগোটা উদ্যান ॥ ৩৯৪ ॥
কৃষ্ণা প্রতিপদে চাঁদে পূর্ণিমার সাজ ।
ছটা ঘটা-সহকারে গগনে বিরাজ ॥ ৩৯৫ ॥
সোনার বরন কর ঢালে রাশি রাশি ।
কর বিতরণে যেন কল্পতরু শশী ॥ ৩৯৬ ॥
মণ্ডল-আকার এক রেখা সুশোভন ।
চাঁদের চৌদিকভাগে দিল দরশন ॥ ৩৯৭ ॥
বিচিত্র আসন যেন পাতিল সভায় ।
বসাইতে দেবদলে আগত তথায় ॥ ৩৯৮ ॥
হরষে উৎফুল্ল মন দেবতার পতি ।
সম্ভাষিতে প্রভুরায় পোহাইলে রাতি ॥ ৩৯৯ ॥
নিত্যধামে গমনে উদ্যত লীলেশ্বর ।
সমাধি-আশ্রমে ত্যজি নর কলেবর ॥ ৪০০ ॥
কেহ হাসে কেহ কাঁদে লীলার যে রীত ।
হেথা অন্তরঙ্গগণে শোকে আকুলিত ॥ ৪০১ ॥
ইতি-উতি ভাবিতে চিন্তিতে রাতি গেল ।
অরুণ উদয় ক্রমে প্রভাত হইল ॥ ৪০২ ॥
হেথা গত রেতে কালীপুরীর ভিতর ।
অদ্ভুত ঘটনা কিবা শুন অতঃপর ॥ ৪০৩ ॥
রাত্রিকালে মা কালীর লুচিভোগ রীত ।
যে কোন কারণে তাহা হয়েছে স্থগিত ॥ ৪০৪ ॥
পুরীতে পূজারী বহু ব্রাহ্মণ সজ্জন ।
সুন্দর বন্ধানি সত্ত্বে এরূপ ঘটন ॥ ৪০৫ ॥
অতি আশ্চর্যের কথা কারণ ইহার ।
নিজ মনে আন্দোলনে পাবে সমাচার ॥ ৪০৬ ॥
এখানে শহর-মধ্যে ঘটনা রাত্রির ।
দ্রুতগতি ছুটে যেন মন্ত্রপূত তীর ॥ ৪০৭ ॥
ভক্ত উপভক্ত যেবা আছিল যেখানে ।
জুটিতে লাগিল ক্রমে এখানে বাগানে ॥ ৪০৮ ॥
ভক্তিমতী কুলবতী কুলের ললনা ।
দর্শনলোলুপ ঘরে নাহি মানে মানা ॥ ৪০৯ ॥
চরিদিকে উঠে খালি হাহাকার রব ।
যে গুনে সে হয় যেন জীবস্তের শব ॥ ৪১০ ॥
ভক্তগণ এখনো আছেন প্রত্যাশায় ।
যদ্যপি ফিরিয়া ঘরে আসেন শ্রীরায় ॥ ৪১১ ॥
বিশ্বনাথ উপাধ্যায় কাপ্তেন যে জন ।
আট বাজে বাগানে দিলেন দরশন ॥ ৪১২ ॥
সমাধির ধারা তাঁর বিশেষিয়া জানা ।
অবস্থা বুঝিতে কৈল ক্রিয়ার সূচনা ॥ ৪১৩ ॥
শ্রীপৃষ্ঠের শিরদাঁড়া তাহার উপর ।
গব্যঘৃত মালিস করেন নিরন্তর ॥ ৪১৪ ॥
কিছুপরে লক্ষণে বুঝিয়া নির্ধারিত ।
এখনো সমাধিদেহ আছয়ে জীবিত ॥ ৪১৫ ॥
এই দেহে যদি কেহ অগ্নি-ক্রিয়া করে ।
ব্রহ্মহত্যা-মহাপাপ তাহার উপরে ॥ ৪১৬ ॥
এত বলি নীরব হইয়া উপাধ্যায় ।
বসিয়া রহিল হস্ত স্থাপিয়া মাথায় ॥ ৪১৭ ॥
দুপুর
হইয়া প্রায় ঘণ্টা অতীত ।
হেনকালে মহেন্দ্র ডাক্তার উপনীত ॥ ৪১৮ ॥
পরীক্ষা করিয়া কন বিষাদে বিভোর ।
দেহত্যাগ হইয়াছে আধঘণ্টা জোর ॥ ৪১৯ ॥
ভক্তবর্গ ভর দিয়া কথায় তাঁহার ।
শেষকর্ম সম্পাদনে করেন যোগাড় ॥ ৪২০ ॥
সুন্দর শয্যার সহ মূল্যবান খাট ।
ধূপ-ধুনা গন্ধ-দ্রব্য চন্দনের কাঠ ॥ ৪২১ ॥
প্রয়োজনাতীত ঘৃত বসন সুন্দর ।
বিস্তর ফুলের গোড়ে মালা মনোহর ॥ ৪২২ ॥
দিবসের শেষভাগে নাবাইয়া রায় ।
চন্দনে চর্চিত কৈলা রাখিয়া খট্টায় ॥ ৪২৩ ॥
ফুলের মালায় বিভূষিত তনুখানি ।
এ সজ্জা ভীষণতর না যায় বাখানি ॥ ৪২৪ ॥
অতি বিষাদিত-চিত্ত মহেন্দ্র ডাক্তার ।
বলিলেন শ্রীপ্রভু হেন অবস্থার ॥ ৪২৫ ॥
ফটো রাখিবার আছে অতি প্রয়োজন ।
দশ টাকা দিনু এর ব্যয়ের কারণ ॥ ৪২৬ ॥
এত বলি টাকা রাখি করিল পয়ান ।
ভক্তবর্গে ফটোর করিল সরঞ্জাম ॥ ৪২৭ ॥
দিনমান গতপ্রায় তৃতীয় প্রহর ।
প্রভুদেবে সঙ্গীভূত খাটের উপর ॥ ৪২৮ ॥
লইয়া চলিল সবে জাহ্নবীর তটে ।
বরাহনগরে পরামানিকের ঘাটে ॥ ৪২৯ ॥
পাছু পাছু ভক্তবর্গ শোকাকুল যায় ।
পথের দুপাশে লোকে করে হায় হায় ॥ ৪৩০ ॥
ঘাটের ঘটনা কথা না যায় বাখানি ।
এখানে থাকিতে নাহি জুয়ায় পরানী ॥ ৪৩১ ॥
প্রহরেক রাত্রি সবে ক্রিয়া-সমাপনে ।
প্রাণহীন দেহ যেন ফিরিয়া বাগানে ॥ ৪৩২ ॥
কলের পুতুল সম মুখে নাহি স্বর ।
লইয়া দেহাবশিষ্ট কলসী ভিতর ॥ ৪৩৩ ॥
সে সুখের বাগান নাহিক আজি আর ।
আঁধারের চেয়ে অতি নিবিড় আঁধার ॥ ৪৩৪ ॥
পাষাণে বাঁধিয়া বুক সন্ন্যাসীর গণে ।
শুদ্ধাচারে কলসীটি থুইল যতনে ॥ ৪৩৫ ॥
এখানে উদ্যানমধ্যে মাতাঠাকুরানী ।
আদ্যাশক্তি গুরুদারা-ভক্তের জননী ॥ ৪৩৬ ॥
শোকেতে আকুলচিত্ত প্রভুর বিহনে ।
সান্ত্বনা করেন তায় ভক্তিমতীগণে ॥ ৪৩৭ ॥
সেবাহেতু সর্বদাই কাছে আছে তাঁর ।
প্রভুর চরিত যেন তেমতি মাতার ॥ ৪৩৮ ॥
শুন এক কথা হেথা শোক হবে দূর ।
মহীয়ান মহতী মহিমা শ্রীপ্রভুর ॥ ৪৩৯ ॥
পরদিনে যথারীতি মাতাঠাকুরানী ।
একে একে
অলঙ্কার খুলেন আপনি ॥ ৪৪০ ॥
পরিশেষে শ্রীহস্তের সুবর্ণ বলয় ।
টান দিয়া খুলিতে উদ্যত যে সময় ॥ ৪৪১ ॥
সশরীরে প্রভুদেব আসিয়া তখন ।
খুলিতে হাতের বালা কৈলা নিবারণ ॥ ৪৪২ ॥
অদ্যাবধি সেই বালা মায়ের দুহাতে ।
তিলেক নাহিক ছাড়া আছে দিনেরেতে ॥ ৪৪৩ ॥
অতিক্ষুদ্র লালপেড়ে সুতার বসন ।
প্রভুর নিষেধ অঙ্গে বৈধব্য-লক্ষণ ॥ ৪৪৪ ॥
এখানে সন্ন্যাসিগণে যুক্তি করি সার ।
শ্রীপ্রভুর ভোগ-রাগ পূজা সহকার ॥ ৪৪৫ ॥
আজি হতে আরম্ভ করিল নিয়মিত ।
শয্যায় শ্রীমূর্তি এক করিয়া স্থাপিত ॥ ৪৪৬ ॥
রামকৃষ্ণ-মহালীলা সুবিশাল তরু ।
লীলাক্ষেত্রে প্রভুদেব জগতের গুরু ॥ ৪৪৭ ॥
হরিহর-বিধি-পূজ্য সৃষ্টির আধান ।
রোপিয়া তাহার কাজ হৈলা অন্তর্ধান ॥ ৪৪৮ ॥
অন্তর্ধান মানে ইহা উফে যাওয়া নয় ।
রামকৃষ্ণ বলে ডাক পাবে পরিচয় ॥ ৪৪৯ ॥
প্রয়োজন মত কালবিগ্রহের রূপে ।
বিরাটমূর্তি এবে গোটা বিশ্ব ব্যাপে ॥ ৪৫০ ॥
সরাটে বিগ্রহ দেহে আছিল আলয় ।
এখন হইল সৃষ্টি রামকৃষ্ণময় ॥ ৪৫১ ॥
বিগ্রহমূর্তিও আছে পূর্বেকার ঠামে ।
প্রত্যেক ভক্তের প্রতি হৃদয়ের ধামে ॥ ৪৫২ ॥
ভক্তের হৃদয় তাঁর বৈঠকের খানা ।
ঠিক ঠিক ভক্তমাত্রে সকলের জানা ॥ ৪৫৩ ॥
এক এক ভাবে প্রভু এক এক ঠাঁই ।
ভক্তের সমষ্টিমধ্যে আগোটা গোসাঁই ॥ ৪৫৪ ॥
অবিরত খেলা তাঁর লয়ে ভক্তগণ ।
প্রত্যক্ষ আছিল এবে অলক্ষ্য এখন ॥ ৪৫৫ ॥
ভাবরূপে ভক্তের হৃদয়মধ্যে খেলা ।
ভক্তের করান কর্ম নিজে দিয়া ঠেলা ॥ ৪৫৬ ॥
লীলাবৃক্ষ তুলিবারে কি করিলা কল ।
শুন রামকৃষ্ণ-গীতি শ্রবণমঙ্গল ॥ ৪৫৭ ॥
প্রভুর বিরহে মাত্র দিনত্রয় খেদ ।
পরে গৃহী-সন্ন্যাসীতে লাগিল বিচ্ছেদ ॥ ৪৫৮ ॥
শ্রীঅস্থি সমাধিগত সপ্তাহ ভিতরে ।
এই বিধি শাস্ত্রমধ্যে শাস্ত্রকার করে ॥ ৪৫৯ ॥
শ্রীঅস্থি কলসী-মধ্যে আছয়ে এখন ।
ইহার সমাধি কথা হৈল উত্থাপন ॥ ৪৬০ ॥
নিরূপিত ঠাঁই আর ঠিক নাহি হয় ।
সচিন্তিত ভক্তবর্গ অবিরত রয় ॥ ৪৬১ ॥
সব কর্মে সদাশয় রাম আগুয়ান ।
কাঁকুড়গাছিতে আছে তাঁহার বাগান ॥ ৪৬২ ॥
সেইখানে বহুপূর্বে প্রভুর গমন ।
মনের মতন স্থান অতি নিরজন ॥ ৪৬৩ ॥
তুলসীকানন এক তাহার ভিতর ।
দেখিয়া বড়ই খুশী প্রভু গুণধর ॥ ৪৬৪ ॥
ভূমিষ্ঠ হইয়া সেই ঠাঁই বারবার ।
স্থানের মাহাত্ম্য-গুণে কৈলা নমস্কার ॥ ৪৬৫ ॥
সেই কথা রামের পড়িয়া গেল মনে ।
প্রকাশ করিয়া কন সবা-সন্নিধানে ॥ ৪৬৬ ॥
রাম কহে তুলসী-কানন অংশ যত ।
সমাধির তরে দিব হইনু স্বীকৃত ॥ ৪৬৭ ॥
সন্ন্যাসীরা রহে যদি বাগানভিতর ।
সমর্পণ করিব আছয়ে এক ঘর ॥ ৪৬৮ ॥
কিন্তু যেইমত তথা নিয়ম-আইন ।
থাকিতে হইবে সবে তাহার অধীন ॥ ৪৬৯ ॥
সে কথা শুনিয়া কহে সন্ন্যাসী সকলে ।
চাই সমাধির ঠাঁই জাহ্নবীর কূলে ॥ ৪৭০ ॥
বানাইয়া দাও মঠ অবশ্যই থাকিব ।
স্বাধীন সন্ন্যাসী নাহি আইন মানিব ॥ ৪৭১ ॥
গৃহীদের মধ্যে একা কার্যকারী রাম ।
মুক্তহস্ত চাঁই ভক্ত সবার প্রধান ॥ ৪৭২ ॥
সব কর্মে অগ্রসর কর্তৃত্বাভিমানে ।
অন্য যত সহকারী রামের পেছনে ॥ ৪৭৩ ॥
রাম কহে
গঙ্গাতীরে কিনিবারে জমি ।
কোথায় এতেক টাকা-কড়ি পাব আমি ॥ ৪৭৪ ॥
বাদ-প্রতিবাদ এইরূপে দুই দলে ।
চারি পাঁচ দিবস ক্রমশঃ গেল চলে ॥ ৪৭৫ ॥
শ্রীপ্রভুর গৃহী ভক্ত আছে এতগুলি ।
কিন্তু এই কর্মে বেশী রামের বিকুলি ॥ ৪৭৬ ॥
সন্ন্যাসী বালকবর্গে বুঝায়ে বিহিত ।
কাঁকুড়গাছিতে মত কৈল স্থিরীকৃত ॥ ৪৭৭ ॥
সমাধি-দিনের ঠিক পূর্বেকার রেতে ।
কলসী পাইল তবে আপনার হাতে ॥ ৪৭৮ ॥
ভবনে লইয়া হাতে ভক্তবর রাম ।
যার জন্য ছয়দিন তুমুল সংগ্রাম ॥ ৪৭৯ ॥
পরদিন প্রাতে সংকীর্তনের সহিত ।
গৃহী ও সন্ন্যাসী সবে হইয়া মিলিত ॥ ৪৮০ ॥
কলসী ধরিয়া শিরে সহ সংকীর্তনে ।
চলিল কাঁকুড়গাছি রামের বাগানে ॥ ৪৮১ ॥
তুলসীকানন যেথা স্থান মনোহর ।
কলসী সমাধিত গর্তের ভিতর ॥ ৪৮২ ॥
তবে তদুপরি করি বেদির সূচনা ।
ক্রমশঃ হইল পরে মন্দির স্থাপনা ॥ ৪৮৩ ॥
নিত্য নিত্য ভোগ রাগ যেইমত বিধি ।
কালে কালে পর্বোৎসব হয় অদ্যাবধি ॥ ৪৮৪ ॥
এখানের কাজকর্ম যত হয় ব্যয় ।
একাকী যোগায় রাম আর কেহ নয় ॥ ৪৮৫ ॥
সমাধির পরে নানা ঘটনার জন্য ।
রামে সন্ন্যাসীতে হয় মনের মালিন্য ॥ ৪৮৬ ॥
নাহি হয় রাজী তাঁরা থাকিতে এখানে ।
কর্তৃত্বাভিমানী রাম তাঁহার অধীনে ॥ ৪৮৭ ॥
প্রভুর কৌশল কিবা শুন অতঃপরে ।
সুরেন্দ্র প্রভুর ভক্ত বহু অর্থ ঘরে ॥ ৪৮৮ ॥
শ্রীনরেন্দ্রজীকে তেঁহ কন সংগোপনে ।
মঠ বানাইব যদি থাক সেইখানে ॥ ৪৮৯ ॥
এত বলি গঙ্গাতীরে বরাহনগরে ।
মঠের পত্তন কৈলা ভাড়াটিয়া ঘরে ॥ ৪৯০ ॥
অতি পরিসর বাড়ী উত্তর দক্ষিণে ।
মুন্সিদের ভাঙ্গা বাড়ী সাধারণে জানে ॥ ৪৯১ ॥
শ্রীপ্রভুর ব্যবহৃত দ্রব্যাদি সকল ।
শয্যা বস্ত্র পাদুকাদি হুকাসহ নল ॥ ৪৯২ ॥
সাজাইয়া যথাস্থানে যত্নসহকারে ।
শ্রীমূর্তিসহিত শশী নিত্যসেবা করে ॥ ৪৯৩ ॥
এক্ষণে সন্ন্যাসিগণে হেথা এইবার ।
কুলগত নাম আখ্যা কৈলা পরিহার ॥ ৪৯৪ ॥
আশ্রমাভিভুক্ত নব নামের ধারণ ।
কার কি হইল নাম শুন বিবরণ ॥ ৪৯৫ ॥
শ্রীনরেন্দ্রজী — স্বামী বিবেকানন্দ
শ্রীরাখালজী — স্বামী ব্রহ্মানন্দ
শ্রীযোগীনজী — স্বামী যোগানন্দ
শ্রীনিত্যনিরঞ্জনজী — স্বামী নিরঞ্জনানন্দ
শ্রীবাবুরামজী — স্বামী প্রেমানন্দ
শ্রীশশীজী — স্বামী শ্রীরামকৃষ্ণানন্দ
শ্রীশরৎজী — স্বামী সারদানন্দ
শ্রীলাট্টুজী — স্বামী অদ্ভুতানন্দ
শ্রীকালীজী — স্বামী অভেদানন্দ
শ্রীতারকজী — স্বামী শিবানন্দ
মুরুব্বী শ্রীগোপালজী — স্বামী অদ্বৈতানন্দ
এই সব পূজ্যপাদ সন্নাসিনিকর ।
প্রভুর কৃপায় তেজপুঞ্জ কলেবর ॥ ৪৯৬ ॥
সার করি প্রভুপদ বিসর্জিয়া সব ।
রটিতে লাগিল প্রভু-মাহাত্ম্য-গৌরব ॥ ৪৯৭ ॥
আরাধ্য বিবেকানন্দ বিশেষতঃ একা ।
অচিরে উড়িল যাঁর যশের পতাকা ॥ ৪৯৮ ॥
ভূখণ্ডের চারিদিকে সাগরের পার ।
প্রভুর মাহাত্ম্য-গীতি করিয়া প্রচার ॥ ৪৯৯ ॥
বেলুড়ে তুলিয়া মঠ জাহ্নবীর তীর ।
মনোহর শ্রীপ্রভুর দ্বিতল মন্দির ॥ ৫০০ ॥
কীর্তি-স্তম্ভ স্বামীজীর অতুল ভুবনে ।
সাগরান্ত দেশে চেলা বিশেষে মার্কিনে ॥ ৫০১ ॥
বারে বারে বন্দি আমি তাঁহার চরণ ।
ভুবন-বিজয়-খ্যাতি পুণ্য-দরশন ॥ ৫০২ ॥
অনুকরণীয়ভাব পবিত্র-চরিত ।
স্বতঃ প্রকৃতিতে জৈব-ভাব-বিবর্জিত ॥ ৫০৩ ॥
বিজিত ইন্দ্রিয় মন অকলঙ্ক তনু ।
মাগি রামকৃষ্ণ-ভক্তি সহ পদরেণু ॥ ৫০৪ ॥
মম সঙ্গে স্বামীজীর সম্বন্ধ আচার ।
সংক্ষেপে শুনহ মন কহি সমাচার ॥ ৫০৫ ॥
দেবেন্দ্রের আজ্ঞাক্রমে গ্রন্থারম্ভ হয় ।
যে সময়ে লিখি বাল্যলীলা পরিচয় ॥ ৫০৬ ॥
স্বামীজী শুনিয়া কথা লোকপরস্পরে ।
ডাকাইয়া লইলেন মঠের ভিতরে ॥ ৫০৭ ॥
বরাহনগরে মঠ নূতন এখন ।
মুন্সীদের ভাঙ্গা বাড়ি দ্বিতল ভবন ॥ ৫০৮ ॥
লীলাংশ করিয়া পাঠ বিনা প্রতিবাদ ।
বৃহৎ হইবে পুঁথি কৈলা আশীর্বাদ ॥ ৫০৯ ॥
পশ্চাতে ইহাই বলি আশিসিলা মোরে ।
তুমি মাত্র অধিকারী পুঁথি লিখিবারে ॥ ৫১০ ॥
তখন আমার ঘটে কোন বোধ নাই ।
স্বামীজী কহিলা কিবা না পাইনু খাঁই ॥ ৫১১ ॥
প্রেমিক সন্ন্যাসী তিনি দূরদৃষ্টিমান ।
নিরমল মুক্ত-আঁখি অতি জ্যোতিষ্মান ॥ ৫১২ ॥
সিদ্ধবাক্ নিত্যসিদ্ধ দয়াল প্রকৃতি ।
নিরাপদে লিখাইতে রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৫১৩ ॥
বলিলেন অন্য যত সব সন্ন্যাসীরে ।
চলহ ইহারে লয়ে যাই গঙ্গাতীরে ॥ ৫১৪ ॥
বেলুড়ে আছেন যেথা জগৎ-জননী ।
তাঁরে শুনাইলে কৃপা করিবেন তিনি ॥ ৫১৫ ॥
শ্রবণাস্তে মাতা তবে কৈল আশীর্বাদ ।
নির্বিঘ্নে সমাধা পুঁথি পূর্ণ হবে সাধ ॥ ৫১৬ ॥
স্বামীজী সঁপিয়া মোরে মায়ের চরণে ।
নিরুদ্দেশ হইলেন তীর্থ-পর্যটনে ॥ ৫১৭ ॥
মায়ের কৃপার স্বাদ পাইয়া এখন ।
পাছু পাছু রহি মার স্বদেশে যখন ॥ ৫১৮ ॥
কামারপুকুরে মাতা যবে একবার ।
বড়ই পাইনু কৃপা কৃপায় মাতার ॥ ৫১৯ ॥
শুন তবে কহি কথা মাতা একদিন ।
ডাকাইলা গ্রাম্য মেয়ে প্রাচীন প্রাচীন ॥ ৫২০ ॥
শ্রীপ্রভুর সময়ের কৃপাপ্রাপ্ত তাঁর ।
শুনিবারে লীলা-পুঁথি প্রভুর আমার ॥ ৫২১ ॥
সে দিনের লীলা-পুঁথি করিয়া শ্রবণ ।
জানি নাই জননীর কি হইল মন ॥ ৫২২ ॥
আশিস করিলা মোরে দুই হাত তুলি ।
যত ইচ্ছা লিখ পুঁথি এই কথা বলি ॥ ৫২৩ ॥
বারবার কত কৃপা করিলা জননী ।
বাহুল্য বর্ণন করা সে সব কাহিনী ॥ ৫২৪ ॥
লীলা-গীতি-বিরচনে যে শকতি ছাপা ।
সে নহে সম্পত্তি মোর জননীর কৃপা ॥ ৫২৫ ॥
যে যে সব ভক্তদের অপার করুণা ।
যে বলে পাইনু পুঁথি মিটিল বাসনা ॥ ৫২৬ ॥
বন্দনা করিয়া তে সবার শ্রীচরণ ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি করি সমাপন ॥ ৫২৭ ॥
প্রথমতঃ গুরুরূপে দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
যাঁহার কৃপায় হইল প্রভু দরশন ॥ ৫২৮ ॥
লীলাগীতি গ্রন্থারম্ভ তাঁহার আজ্ঞায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫২৯ ॥
দ্বিতীয় গিরিশচন্দ্র ঘোষ ভক্তবর ।
দিলা যেবা গুহ্য গুহ্য লীলার খবর ॥ ৫৩০ ॥
অন্তরে অন্তরে ভালবাসিয়া আমায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫৩১ ॥
তৃতীয়তঃ যোগানন্দ প্রেমিক সন্ন্যাসী ।
আমার উপরে যাঁর কৃপা রাশি রাশি ॥ ৫৩২ ॥
করুণ
প্রার্থনা যেবা কৈলা বারে বারে ।
জননীর কাছে মোর মঙ্গলের তরে ॥ ৫৩৩ ॥
স্বার্থশূন্য প্রীতি স্নেহ কৈলা যে আমায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫৩৪ ॥
চতুর্থ যে জন তিনি নিত্য নিরঞ্জন ।
সদা আস্যে হাস্যরাশি সুসরল মন ॥ ৫৩৫ ॥
পবিত্র করিলা যেবা মম জন্মস্থলী ।
বিতরিয়া সুদুর্লভ চরণের ধূলি ॥ ৫৩৬ ॥
সার্থক জীবন মম যাঁহার কৃপায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫৩৭ ॥
শেষে রামকৃষ্ণানন্দ শ্রীশশী ঠাকুর ।
সতত উন্মত্ত যিনি সেবায় প্রভুর ॥ ৫৩৮ ॥
লীলাতত্ত্ব সিন্ধুতীরে দিলা যে আমায় ।
কিঙ্কর জন্মের মত বিকি তাঁর পায় ॥ ৫৩৯ ॥
সায় এইখানে রামকৃষ্ণলীলা-গান ।
বদনে সকলে বল রামকৃষ্ণ নাম ॥ ৫৪০ ॥
পঞ্চম খণ্ড সমাপ্ত
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথি সমাপ্ত