দ্বিতীয় খণ্ড

মধুরভাবে সাধনা


জয় জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


রামকৃষ্ণ-লীলাকথা গাইলে শুনিলে ।
সাধন-ভজনহীন হেন কলিকালে ॥ ১ ॥

অনায়াসে মিলে সুদুর্লভ ভক্তিধন ।
হেলায় টুটিয়া যায় ভবের বন্ধন ॥ ২ ॥

অকূল-সাগর-পার দেশদেশান্তরে ।
নিজ প্রয়োজনে যদি কোন জন ফিরে ॥ ৩ ॥

মন-মুগ্ধ বিজাতীয় দ্রব্যাদি রকম ।
নিত্যই কতই শত করে দরশন ॥ ৪ ॥

নূতন নূতন সঙ্গে দিবানিশি বাস ।
তথাপি বিদেশী দুঃখে সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ॥ ৫ ॥

নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে ছাড়ে বদন মলিন ।
ভাবে করে পাবে পুনঃ জনম-জমিন্ ॥ ৬ ॥

সেইরূপ প্রভুদেব নানা অবস্থায় ।
পতিত যদিও তবু না ভুলেন মায় ॥ ৭ ॥

নানান সাধনে নানা মূর্তি আরাধনা ।
সাধনান্তে সেই নাম শ্যামা শ্যামা শ্যামা ॥ ৮ ॥

শ্যামার আনন্দময়ী পরমা মুরতি ।
সমভাবে হৃদে তাঁর জাগে দিবারাতি ॥ ৯ ॥

মা মা বোল অবিরত ফুটে শ্রীবদনে ।
শ্যামা সকলের মূল ষোল আনা মনে ॥ ১০ ॥

কখন রমণীবেশ ধরিলা আপুনি ।
সখীভাবে সেবিতেন জগৎ-জননী ॥ ১১ ॥

কখন শ্যামায় হয় চামরব্যজন ।
কখন প্রদান পরে বিল্ব সচন্দন ॥ ১২ ॥

মনেতে উদয় তাঁর যে ভাব যখন ।
জীবের অবোধ্য সেইমত আচরণ ॥ ১৩ ॥

বুঝিতেন শ্যামা মায় সকলের সার ।
যাবতীয় মুরতির শ্যামাই আধার ॥ ১৪ ॥

শ্যামা তুষ্টে সব তুষ্ট তবে সিদ্ধ কাজ ।
সর্ব ঘটে এক শ্যামা করেন বিরাজ ॥ ১৫ ॥

সাকারা আকারহীনা অনন্ত অদ্ভুত ।
যত অবতার শ্যামা-সিন্ধুর বুদ্বুদ ॥ ১৬ ॥

কুলকুণ্ডলিনী শ্যামা দ্বার দিলে ছেড়ে ।
তবে জীব যেতে পারে ইষ্টের গোচরে ॥ ১৭ ॥

শ্যামা গৃহ শ্যামা গৃহী শ্যামা রাজা রানী ।
দ্বারিরূপে দ্বার রক্ষা করেন আপুনি ॥ ১৮ ॥

শ্যামা সুপ্রসন্না অগ্রে না হইলে পরে ।
নঙ্গর ফেলিয়া জীব দাঁড় টেনে মরে ॥ ১৯ ॥

মহাশক্তি রাখে যদি প্রচ্ছন্ন মায়ায় ।
কোন কালে কোন্ বলে কে চৈতন্য পায় ॥ ২০ ॥

বরাবর তাই প্রভু প্রভু অবতারে ।
নিজে ভজি দিলা শিক্ষা শক্তি ভজিবারে ॥ ২১ ॥

শ্রীপ্রভুর লীলাকাণ্ড রত্নের আকর ।
নানা ধর্মভাব মর্ম ইহার ভিতর ॥ ২২ ॥

রুচিপ্রিয় যাবতীয় সকলই মিলে ।
একা রামকৃষ্ণলীলা-সাগরে ডুবিলে ॥ ২৩ ॥



অতুল ব্রজের ভাব অবোধ্য বারতা ।
সুরের অজ্ঞাত তত্ত্ব নরের কা কথা ॥ ২৪ ॥

মায়া-বিরহিত পরিশুদ্ধ নির্বিকার ।
স্বার্থগন্ধ-পরিশূন্য ভাব শ্রীরাধার ॥ ২৫ ॥

অতীব সুগূঢ় তত্ত্ব অতি দুরজ্ঞেয় ।
রাধাই আধার তার রাধাই আধেয় ॥ ২৬ ॥

রূপ-রস-গন্ধ-আদি বিষয়বিমুখ ।
নিত্যসিদ্ধ আত্মারাম ব্যাস-পুত্র শুক ॥ ২৭ ॥

ব্রহ্মর্ষি নারদ ঋষি আধি মুনিগণ ।
পুরাণে বহুলভাবে করেছে কীর্তন ॥ ২৮ ॥

আসক্তি-সম্বল জীব স্বার্থগতপ্রাণ ।
ধরিতে ইহাতে নারে কহে কি পুরাণ ॥ ২৯ ॥

শুদ্ধসত্ত্বাধারে প্রেমধন মূর্তি ধরি ।
জীবে দিতে পরতত্ত্ব নিজে ব্রজেশ্বরী ॥ ৩০ ॥

বার বার অবতীর্ণ লীলার প্রাঙ্গণে ।
সম্বল সমর্থ প্রেম সাধ্যের তোষণে ॥ ৩১ ॥

এই যে মধুরভাব নিজস্ব রাধার ।
ষোল আনা পরিপূর্ণ তাঁর অধিকার ॥ ৩২ ॥

অন্য অন্য গোপিকার চারি পাঁচ আনা ।
একান্ত সেবিকা যারা রাইগতপ্রাণা ॥ ৩৩ ॥

জগজনে যে প্রতিমা জানা রাধা নামে ।
বিবাহিতা আয়ানের বাস বৃন্দাবনে ॥ ৩৪ ॥

জটিলে কুটিলে যাঁর শাশুড়ী ননদী ।
কৃষ্ণ-বিরাগিণী কৃষ্ণনামে প্রতিবাদী ॥ ৩৫ ॥

কুলাদি সর্বস্বহারা কৃষ্ণের কারণ ।
কৃষ্ণকলঙ্কিনী নাম অঙ্গের ভূষণ ॥ ৩৬ ॥

মূল স্বরূপত্ব তাঁর না জানিলে পরে ।
অধিকারী নহে ব্রজলীলা শুনিবারে ॥ ৩৪ ॥

ভূতের যেখানে নাই প্রবেশাধিকার ।
রূপ-রস-সন্ধাধির সাগরের পার ॥ ৩৫ ॥

অতিন্দ্রিয় রাজ্য যাহা পুরাণে কীর্তিত ।
ব্রহ্মভাবচন্দ্র হয় সেখানে উদিত ॥ ৩৬ ॥

রূপ-রসে মত্ত মন অভাবে বিষাদ ।
শুনে যদি ব্রজলীলা করে অপরাধ ॥ ৩৭ ॥

অচ্যুতের লীলামৃত শ্রবণ-মঙ্গল ।
জৈবভাবাপন্ন শুনে পার হলাহল ॥ ৩৮ ॥

শ্রীকৃঞ্চ অদ্বৈতভাবে ক্রিয়াগুণ-হীন ।
কৃষ্ণশক্তি রাধা থাকে তাহাতে বিলীন ॥ ৩৯ ॥

দুঁহু সঙ্গে দোঁহাকার এত প্রেম প্রীতি ।
এক ভিন্ন দুই আর না হয় প্রতীতি ॥ ৪০ ॥

এই প্রেমপ্রীতি করিবারে আস্বাদন ।
এক হয়ে দুঁহু কৈলা লীলার পত্তন ॥ ৪১ ॥

বৃন্দাবনে প্রেমঘন মূর্তি দোঁহাকার ।
উভয়ে বিশুদ্ধ সত্ত্ব ত্রিগুণের পার ॥ ৪২ ॥

ইহা না জানিয়া ব্রজলীলা শুনে যদি ।
মঙ্গল দূরের কথা হয় অপরাধী ॥ ৪৩ ॥



নিষ্কাম নিঃস্বার্থ ভাব মধুরেতে ভোগ ।
তৈলধারাবৎ যেথা শ্রীকৃষ্ণেতে যোগ ॥ ৪৪ ॥

বাহ্যে কি অন্তরে একা কৃষ্ণের স্ফুরণ ।
কৃষ্ণ ভিন্ন অন্য নাহি হয় দরশন ॥ ৪৫ ॥

মধুরের অঙ্গে খালি নিষ্কামের খেলা ।
কালেতে করিল জীব ভোগ দিয়া ঘোলা ॥ ৪৬ ॥

জীবের কল্যাণে ভাব করিতে প্রচার ।
রাধাভাবে নদীয়ার গৌরাঙ্গাবতার ॥ ৪৭ ॥

এবে প্রভু লীলাকর ভাব-পরমেশ ।
ভাবের সাধনা কৈলা মধুরেতে শেষ ॥ ৪৮ ॥



অন্তরে উদয় যেন হইল বাসনা ।
সহে না তিলেক দেরি সাধিতে সাধনা ॥ ৪৯ ॥

মনের তীব্রতা তাঁর এতই প্রবল ।
সাধনানুরূপ দেহ সর্বাংশে বদল ॥ ৫০ ॥

পুংদেহে পুরুষোচিত বৃত্তি আর নাই ।
ললনাসুলভভাবে ভাবিত গোসাঞি ॥ ৫১ ॥

চলন বলন চেষ্টা কটাক্ষ ইঙ্গিত ।
অঙ্গ রঙ্গ হাসি আধি স্বভাব চরিত ॥ ৫২ ॥

ঠমক ঠমক ঠিক ঠিক ললনার প্রায় ।
স্ত্রী কি পুরুষ প্রভু চেনা নাহি যায় ॥ ৫৩ ॥

বসন ভূষণপক্ষে কিছু নাহি ত্রুটি ।
শিরে পরচুলা কেশপাশ পরিপাটি ॥ ৫৪ ॥

পরিধানে বারাণসী শাড়ী থাকে পরা ।
কখন বা পেশোয়াজ জরির কিনারা ॥ ৫৫ ॥

কাঁচলিতে আঁটা বুক ঢাকা ওড়নায় ।
সাঁচ্চার ঝালটা বলি ঝুলে কিনারায় ॥ ৫৬ ॥

অঙ্গভূষা এক সুট স্বর্ণ-অলঙ্কার ।
চরণ-শোভন হেতু নূপুর রূপার ॥ ৫৭ ॥

ধনবান মহাভক্ত সঙ্গে শ্রীমথুর ।
তখনি যোগায় যাহা লাগে শ্রীপ্রভুর ॥ ৫৮ ॥

এইরূপে প্রভুদেব ললনার বেশে ।
আচরিলা হাসী-সেবা রাধার উদ্দেশে ॥ ৫৯ ॥

তুলিয়া কুসুমরাশি গাঁথি দিব্য হার ।
সাজাতেন যুগ্ম-মূর্তি কৃষ্ণ-শ্রীরাধার ॥ ৬০ ॥

চামর ধরিয়া করে কখন ব্যজন ।
কখন প্রার্থনা-সহ আত্মনিবেদন ॥ ৬১ ॥

বিষ্ণুর মন্দির-মধ্যে সদা সর্বক্ষণ ।
শ্রীমদ্ভাগবত-পাঠ-শ্রবণ মনন ॥ ৬২ ॥



দিনেক মন্দিরাঙ্গনে পাঠের সময় ।
হইল বিচিত্র খেলা শুন পরিচয় ॥ ৬৩ ॥

জ্যোতির্ময় দড়া এক বিচিত্র রুচির ।
কৃষ্ণের শ্রীঅঙ্গ থেকে হইল বাহির ॥ ৬৪ ॥

ক্রমশঃ বিস্তার দড়া হইতে লাগিল ।
পাঠকের গ্রন্থে আসি পরশ করিল ॥ ৬৫ ॥

পশ্চাৎ বিস্তারতর হ'য়ে অগ্রসর ।
আসিরা হইল যোগ প্রভুর ভিতর ॥ ৬৬ ॥

ভগবান-ভাগবত-ভক্ত এই ত্রয় ।
তিনে হয়ে এক বস্তু আলাহিদা নয় ॥ ৬৭ ॥



মধুরের এক রাই স্বত্বাধিকারিণী ।
মহাভাবময়ী মহাভাব-স্বরূপিণী ॥ ৬৮ ॥

যেই ভাব নেই কৃষ্ণ দুয়ে নহে আন ।
একে দুই দুয়ে হয় একের সমান ॥ ৬৯ ॥

ভাবশক্তি যেই বস্তু রাধা তাঁরে বলে ।
শক্তির করুণা বিনা কৃষ্ণ নাহি মিলে ॥ ৭০ ॥

প্রভুদেব সেই হেতু জগৎ-শিক্ষায় ।
সকলের অগ্রে ভজিলেন শ্যামা মায় ॥ ৭১ ॥

এখানে মধুরে সেই শক্তির সাধনা ।
এক চিন্তা কিসে হয় রাধার করুণা ॥ ৭২ ॥

কোথা রাই কিসে পাই শ্যাম-সোহাগিনী ।
মহাভাবময়ী মহাভাব-স্বরূপিনী ॥ ৭৩ ॥

দিয়া দেখা কেনাদাসী কর অভাগীরে ।
কিঙ্করী করুণাভিক্ষা মাগে সকাতরে ॥ ৭৪ ॥

আবেগের বেগেতে করুণ নিবেদন ।
কখন রাধার ধ্যানে গভীর মগন ॥ ৭৫ ॥

পরে হৈল দরশন পূরিল কামনা ।
কামগন্ধহীনা রাই কনকবরণা ॥ ৭৬ ॥

পুতোজ্জ্বলা রাধারূপ নহে বর্ণিবার ।
দেখিতে দেখিতে অঙ্গে মিশিল তাঁহার ॥ ৭৭ ॥

নিজাঙ্গে শ্রীমতী রাই করিলে প্রবেশ ।
শ্রীঅঙ্গেতে সমুদিত রাধার আবেশ ॥ ৭৮ ॥

রাধাতে প্রভুতে আর ভিন্নভেদ নাই ।
রাধাভাব-সাগরেতে নিমগ্ন গোসাঞি ॥ ৭৯ ॥

সেই হাব সেই ভাব সেই চেষ্টাবলী ।
রাগে প্রেমে ঠিক সেই শ্রীকৃষ্ণ-পাগলী ॥ ৮০ ॥

বিরহবিধুর ভাব শ্রীঅঙ্গে পূর্ণিত ।
দৈহিক ক্রিয়ায় ঘোষে লক্ষণ বিহিত ॥ ৮১ ॥

প্রকৃতির ভাবে প্রভু এতই তন্ময় ।
মাসে মাসে তিন দিন রজোদ্‌গম হয় ॥ ৮২ ॥

পুং-ইন্দ্রিয়ের উচ্চে দ্ব্যঙ্গুলি-প্রমাণ ।
লোমকূপদ্বারে রক্ত নির্গমের স্থান ॥ ৮৩ ॥

বস্ত্রদুষ্টনিবারণে ভাবিয়া উপায় ।
হৃদয় দিবসত্রয় কৌপীন পরায় ॥ ৮৪ ॥

আশ্চর্য শ্রীপ্রভু যেন আশ্চর্যচরিত ।
সখেদে কখন হয় বিরহের গীত ॥ ৮৫ ॥

প্রিয়তমা অনুচরীরূপে সম্বোধিয়ে ।
শিরে লগ্ন করদ্বয় কান্দিয়ে কান্দিয়ে ॥ ৮৬ ॥

শ্যামের লাগাল যদি না পাইনু সই ।
বল তবে কিবা সুথে ঘরে আর রই ॥ ৮৭ ॥

শ্যাম যে আমার সই নয়নের তারা ।
তিল আধ না দেখিলে হই দিশেহারা ॥ ৮৮ ॥

যদ্যপি হইত শ্যাম মস্তকের চুল ।
বাধিতাম বেণী দিয়া বকুলের ফুল ॥ ৮৯ ॥

সদা দরশন সাধে বিকল পরানী ।
ইতি উতি চাই যেন বনের হরিণী ॥ ৯০ ॥

এরূপে গাইতে গীত যায় বাহ্যজ্ঞান ।
তন্ময় হইয়া ঘটে গভীর ধিয়ান ॥ ৯১ ॥

দেহের সঙ্কটাবস্থা পূর্বের সাধনে ।
গিয়াছিল পুনরায় হয় বর্তমানে ॥ ৯২ ॥

কৃষ্ণ-দরশনাবেগ বাতিক পবন ।
ধরিয়া প্রবল গতি অতীব ভীষণ ॥ ৯৩ ॥

উঠিল প্রভুর হৃদি-আকাশের মাঝে ।
আধারিয়া দশ দিশি আপনার তেজে ॥ ৯৪ ॥

উলটপালট খায় দেহ-তরুবর ।
প্রভুর নাহিক আর দেহের খবর ॥ ৯৫ ॥



শ্রীদেহের যত্ন এবে দুজনার হাতে ।
ব্রাহ্মণী দিনের বেলা হৃদয় রাত্রিতে ॥ ৯৬ ॥

ব্রাহ্মণী সুতীক্ষ্ণা দৃষ্টি করে দরশন ।
শ্রীঅঙ্গেতে পুনঃ মহাভাবের লক্ষণ ॥ ৯৭ ॥

নিদারুণ দেহোত্তাপে জ্বালার যন্ত্রণা ।
দিবানিশি কিবা কষ্ট না যায় বর্ণনা ॥ ৯৮ ॥

শাস্ত্রের নির্দেশ মত ব্রাহ্মণী হেথায় ।
উপশমহেতু অঙ্গে চন্দন মাখায় ॥ ৯৯ ॥

উত্তাপের প্রবলতা এতই তখন ।
দিবারাত্র ধূলিবৎ আলেপ্য চন্দন ॥ ১০০ ॥

শ্রীদেহের যাবতীয় লোমকূপ দিয়ে ।
শোণিত-কণিকা যার বাহির হইয়ে ॥ ১০১ ॥

দেহস্থিত গ্রন্থিযন্ত্র শিথিল সবাই ।
নিজ নিজ কর্ম করে হেন শক্তি নাই ॥ ১০২ ॥

দেহপানি সংজ্ঞাশূন্য নিশ্চেষ্ট অচল ।
বিশের শিকারযুক্ত সব বিশৃঙ্খল ॥ ১০৩ ॥

কোন্ উপাদানে গড়া শ্রীপ্রভুর দেহ ।
জানি না সে কোন্ জন জানে যদি কেহ ॥ ১০৪ ॥

এতেক যন্ত্রণা যায় দেহের উপরে ।
তথাপিহ মনখানি কৃষ্ণ নাহি ছাড়ে ॥ ১০৫ ॥

বাহ্যজ্ঞানশূন্যে যুক্তে দুই অবস্থায় ।
প্রাণে মনে জাগিতেছে সাধ্য সর্বদায় ॥ ১০৬ ॥



ভাবিয়া দেখহ মন আপনার মনে ।
প্রভুর স্বরূপ কিবা প্রভু কোন্ জনে ॥ ১০৭ ॥

কিবা নাম কিবা বস্তু কোথায় বসতি ।
কোথায় আরম্ভ তাঁর কোথা তাঁর ইতি ॥ ১০৮ ॥

কোথা গতি এইখানে কিবা প্রয়োজন ।
নারায়ণ নিজে পূর্ণব্রহ্ম সনাতন ॥ ১০৯ ॥

চিনিয়াও প্রভুদেবে নাহি গেল চেনা ।
পুঁথিতে প্রভুর নাম রহিল অচেনা ॥ ১১০ ॥

অচেনা ঠাকুর মোর অতি অপরূপ ।
তিনিই জানেন মাত্র তাঁহার স্বরূপ ॥ ১১১ ॥

সঙ্কট-অবস্থাপন্ন সাধনা সময় ।
ঘন ঘন অচেতন বাহ্য নাহি রয় ॥ ১১২ ॥

মথুর উৎকণ্ঠপ্রাণ তাহার কারণে ।
পাছে ঘটে অমঙ্গল যতন-বিহনে ॥ ১১৩ ॥

ধরা-মাঝে ধন্য ভক্ত মথুর বিশ্বাস ।
করজোড়ে পদরেণু মাগে ক্রীতদাস ॥ ১১৪ ॥

গুরুভক্তি মহারত্ন ভিক্ষা দেহ মোরে ।
দণ্ডবৎ পদানত অধম কিঙ্করে ॥ ১১৫ ॥

যত্নে রাখিবারে তাঁর এতেক ভাবিয়া ।
জানবাজারের ঘরে গেলেন লইয়া ॥ ১১৬ ॥

সদা সচকিত থাকে সহ পরিবারে ।
বাহিরে না রাখি তাঁর রাখিল অন্দরে ॥ ১১৭ ॥

যেমন মথুর ভক্ত সমযোগ্য তাঁর ।
ভক্তিমতী জগদম্বা ঘরে পরিবার ॥ ১১৮ ॥

কন্যাগণ বিলক্ষণ ভক্তি ঘটে ধরে ।
যেন পিতৃ-মাতৃ-রক্ত বহমান শিরে ॥ ১১৯ ॥

সকলে সমানভাবে যত্ন করে অতি ।
ভক্তের আকর ভক্ত মথুর-বসতি ॥ ১২০ ॥

দিনরাতি রাখে তাঁয় আঁখির উপরে ।
শয্যা রচে আপনার শয়ন-আগারে ॥ ১২১ ॥

প্রভুরে সরম লাজ নাহি আসে কার ।
স্ত্রীলোক দেখিত তাঁয় স্বজাতি তাহার ॥ ১২২ ॥

প্রভুরে পুরুষ জ্ঞান কভু না হইত ।
বর্ণে বর্ণে স্ত্রীলোকের স্বভাবে মিলিত ॥ ১২৩ ॥

পুরুষ-আকার প্রভু পুরুষ প্রধান ।
রমণী বলিয়া কেন রমণীর জ্ঞান ॥ ১২৪ ॥

সমস্যা বুঝিতে যদি সাধ হয় মন ।
বিরলে বসিয়া স্মর প্রভুর চরণ ॥ ১২৫ ॥

ক্ষীণ হীন নয়-বুদ্ধি হেয় অতিশয় ।
অবিরত স্বার্থে রত কুঞ্চিত-হৃদয় ॥ ১২৬ ॥

নীচমুখে মনোভাব দৃষ্টি অধস্তলে ।
কলুষ কামনা যত শিরে শিরে খেলে ॥ ১২৭ ॥

ইন্দ্রিয়ের বাহ্য ভোগে সংজ্ঞাহীন ঘুরে ।
যেন তৃণ ঘূর্ণিপাকে নদীর ভিতরে ॥ ১২৮ ॥

কাদা-মাখা পাঁকে মগ্ন তেজহীন মন ।
তার সঙ্গে লীলা দেখা না হয় কখন ॥ ১২৯ ॥

চাই শুদ্ধ সংবুদ্ধি যাহার গোচর ।
সত্যময় শুদ্ধময় পরম-ঈশ্বর ॥ ১৩০ ॥

তাই বলি স্মর প্রভু সরল পরাণে ।
যদি থাকে সাধ তাঁর লীলা-দরশনে ॥ ১৩১ ॥

অদ্ভুত এ লীলাখেলা বুঝে উঠা ভার ।
প্রকৃত রমণী প্রভু পুরুষ-আকার ॥ ১৩২ ॥

ভিতরে ঢুকিতে মন বুদ্ধি যায় ছলে ।
রমণীয় ভাব ধর্মসাধনার বলে ॥ ১৩৩ ॥

কায়মনোবাক্যে খেলে ভাবধর্ম-রীতি ।
কে চিনে পুরুষ প্রভু প্রকৃত প্রকৃতি ॥ ১৩৪ ॥

সৃষ্টি ছাড়া তাঁর কর্ম কিসে নরে বুঝে ।
বদলে ব্রহ্মার সৃষ্টি মহিমার তেজে ॥ ১৩৫ ॥

বিশেষিয়া বলিবারে না পারিছ মন ।
কলমে আঁকিতে চিত্র অধম অক্ষম ॥ ১৩৬ ॥

অদ্ভুত সাধনা কৈলা প্রভু পরমেশ ।
দিবারাতি এ সময় রমণীর বেশ ॥ ১৩৭ ॥

নারী বিনা নর-জান নাহি আসে মনে ।
ঘন ঘন বাহ্যহারা হয় এ সাধনে ॥ ১৩৮ ॥

বাহ্যহারা কারে বলে সে বা কি রকম ।
শুনিলে না রয় বাহ্য অকথ্য কথন ॥ ১৩৯ ॥

শুন মন একমনে ভক্তিসহকারে ।
অনর্থের মূল বাহ্য ক্রমে যাবে ছেড়ে ॥ ১৪০ ॥

চোখে চোখে রাখে তাঁরে যত পরিবার ।
একদিন শুন কিবা হইল ব্যাপার ॥ ১৪১ ॥

উপবিষ্ট একধারে প্রভু পরমেশ ।
বিভোর বিভোর অঙ্গ ভাবের আবেশ ॥ ১৪২ ॥

বাহ্যিক চেতনহীন কেহ নাহি জানে ।
অতিশয় অনাবিষ্ট ভৃত্য এক জনে ॥ ১৪৩ ॥

অগ্নিবর্ণ গুলে ভরা কলিকা লইয়া ।
যাইতে যাইতে দ্রুত সেই পথ দিয়া ॥ ১৪৪ ॥

ফেলে এক পোড়া-গুল রক্তিম বরণ ।
যেখানে প্রভুর পিঠ কাঁধে সংলগন ॥ ১৪৫ ॥

বারে বারে কত যে সহেন নারায়ণ ।
পাপে রত ভ্রষ্ট জীব উদ্ধার কারণ ॥ ১৪৬ ॥

বিশেষতঃ আগাগোড়া কষ্ট এইবারে ।
জানি না পাষাণ কেবা সৃষ্টির ভিতরে ॥ ১৪৭ ॥

নাহিক মমতা দয়া শুনিয়া সকল ।
সম্বরিতে পারে চক্ষে না ফেলিয়া জল ॥ ১৪৮ ॥

মায় যেন সয় কষ্ট অকাতর-প্রাণে ।
সন্তানের এক তিল মঙ্গল-সাধনে ॥ ১৪৯ ॥

সাধন-ভজনে তেন প্রভু পরমেশ ।
জীবের মঙ্গল-হেতু সহিলা অশেষ ॥ ১৫০ ॥

কষ্টে নহে পরাঙ্মুখ নহে ক্ষুণ্ণ মন ।
বরঞ্চ সন্তুষ্ট কষ্টে জীবের কারণ ॥ ১৫১ ॥

দুপুর বেলায় যেন ঘড়ির দুকাঁটা ।
তেমতি তাঁর মন ব্রহ্মে সদা আঁটা ॥ ১৫২ ॥

সমাধি হইলে মন ব্রহ্মে হয় যোগ ।
সমাধির ফল ব্রহ্মানন্দ-উপভোগ ॥ ১৫৩ ॥

তুচ্ছ করি তারে কৈলা জীবের কল্যাণ ।
অহেতুক রূপাসিদ্ধ প্রভু ভগবান ॥ ১৫৪ ॥

শিবময় ধরাসর মঙ্গলস্বরূপ ।
জীবের কল্যাণ যাঁর ব্রত এইরূপ ॥ ১৫৫ ॥

ত্রাতা পাতা রক্ষাকর্তা করুণাসাগর ।
কেন তাঁর নাহি চায় জীব সুপামর ॥ ১৫৬ ॥

কিবা জীব হেন জীব জীব যেবা নামে ।
কে বল গড়িল তায় কোন উপাদানে ॥ ১৫৭ ॥

যে আদরে মারে তায় ফেলে মহাপাকে ।
যে মারে আদরে ধরি বুকে তায় রাখে ॥ ১৫৮ ॥

দূরে রাখে সুখ-দুখে সখা সেই জন ।
যত্ন করে রাঙ্গা লুড়ি দারা-পুত্র-ধন ॥ ১৫৯ ॥

পতিততারণ প্রভু সংবৃদ্ধি-দাতা ।
জ্ঞানের জনক সেবাপ্রেমাভক্তি-মাতা ॥ ১৬০ ॥

কৃপা কর কৃপাকর হর অন্ধকার ।
দেহি যে চৈতন্যরত্ন সকলের সার ॥ ১৬১ ॥

করিয়াছ কর জীব তাহে নাহি ক্ষতি ।
রাখিও অভয় পথে ষোল আনা মতি ॥ ১৬২ ॥

নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে যেন ডাকিবারে পারি ।
অকূল পাথারে কোথা ভবের কাণ্ডারী ॥ ১৬৩ ॥

হেথা অগ্নিবর্ণ গুলে পিঠ পুড়ে যায় ।
চর্ম-দগ্ধ-গন্ধ সবে আঘ্রাণেতে পায় ॥ ১৬৪ ॥

সতর্ক নয়নে সবে দেখে চারি ধারে ।
বলে এত গন্ধ কিসে কি পুড়ে কি পুড়ে ॥ ১৬৫ ॥

কোনমতে কেহ কিছু না পায় সন্ধান ।
মথুর দেখিল বাহ্যহারা ভগবান ॥ ১৬৬ ॥

শ্রীপ্রভুর ভাব যেন শ্রীমধুর জানে ।
তাড়াতাড়ি আসিলেন তাঁর সন্নিধানে ॥ ১৬৭ ॥

বাহ্য আনিবারে কানে দেন কৃষ্ণনাম ।
কতক্ষণ পরে আসে কিঞ্চিৎ গিয়ান ॥ ১৬৮ ॥

এখন এমন যেন সিদ্ধ গেলে পরে ।
এই ক্ষণে আসে হুশ পরক্ষণে ছাড়ে ॥ ১৬৯ ॥

অবিরাম কৃষ্ণনাম দেন কর্ণমূলে ।
নাহি জানে শ্রীপ্রভুর পিঠ পুড়ে গুলে ॥ ১৭০ ॥

ক্রমশঃ প্রকাশ বাহ্য পরে পরে ।
প্রভুর নাহিক সাড়া পিঠ যায় পুড়ে ॥ ১৭১ ॥

প্রভুর সমাধি-কথা বল কে বুঝিবে ।
ছিল ঘেহভাব লুপ্ত সত্তা এল এবে ॥ ১৭২ ॥

দেহেতে নামিলে যন জড় জড় স্বরে ।
বলিলেন পিঠে কেন চিনচিন্ করে ॥ ১৭৩ ॥

পিঠ দেখি মথুরের পরান আকুল ।
ভিতরে ঢুকেছে অগ্নিবর্ণ লাল গুল ॥ ১৭৪ ॥

মুখে নাহি সয়ে কথা দেখিয়া ব্যাপার ।
অমনি টানিয়া আনে হাতে আপনার ॥ ১৭৫ ॥

বলে ভাল যত্ন হেতু আনিনু ভবনে ।
কি হ'ল কি হ'ল কালী রক্ষা কর দীনে ॥ ১৭৬ ॥

যত দিন দগ্ধ স্থান নাহি গেল সেরে ।
সবে মিলে ঘেরে তাঁরে রাখিল অন্দরে ॥ ১৭৭ ॥

মথুর দেখেন তার জীবন-জীবন ।
তৎক্ষণে তাই করে যে আজ্ঞা যখন ॥ ১৭৮ ॥

ভক্তিমতী জগদম্বা ভক্তি করে তাঁর ।
সাজাইত মনোমত ফুলের মালায় ॥ ১৭৯ ॥

প্রভুর তেমতি কৃপা তাঁদের উপর ।
ধরাধামে ধন্য শ্রীমথুর ভক্তবর ॥ ১৮০ ॥

পরিবার সহ বাস ল'য়ে নরহরি ।
ভক্তবাঞ্চাকল্পতরু করুণাকাণ্ডারী ॥ ১৮১ ॥

ধন জন দাস দাসী পুরবাসিগণ ।
ভক্তিমতী দারা যত নন্দিনী নন্দন ॥ ১৮২ ॥

আপনার বলিতে আছিল তার যত ।
প্রভুর সেবায় হয় সকল প্রদত্ত ॥ ১৮৩ ॥

কোটি কোটি দণ্ডবৎ মথুর-চরণে ।
মাগি রামকৃষ্ণভক্তি ভিক্ষা দেহ দীনে ॥ ১৮৪ ॥

লোহা যেন সোনা হয় পরেশ-পরলে ।
মধুর হইল তেন প্রভু-সহবাসে ॥ ১৮৫ ॥



এবে সাধনার কথা শুন দিয়া মন ।
কিছু দিন পরে হইল কৃষ্ণ-দরশন ॥ ১৮৬ ॥

রাধা-মনোবিমোহন অপরূপ ঠাম ।
নবীন নীরদকান্তি ত্রিভঙ্গিম শ্যাম ॥ ১৮৭ ॥

মাথার মোহন চূড়া বামভাগে হেলা ।
মৃদু মন্দ সমীরণে চুলে করে খেলা ॥ ১৮৮ ॥

তিলকা-অলকাবলি কপালের তলে ।
কনক কুণ্ডল কানে দুলু দুলু দোলে ॥ ১৮৯ ॥

আকর্ণ পুরিয়া বাঁকা নয়নের টান ।
কটাক্ষ-হিল্লোলে ছুটে সম্মোহন বাণ ॥ ১৯০ ॥

তিলফুল জিনি দাসা গজমতি তায় ।
চঞ্চল আঁখির বেগে সুমন্দ দোলায় ॥ ১৯১ ॥

মুখামৃতে সিক্ত দুটি রক্তিম অধর ।
মনোবাসী হাসি যাহে খেলে নিরন্তর ॥ ১৯২ ॥

কাঞ্চন-বলয় হাতে মোহন বাঁশরী ।
রাধা রাধা গীত-স্বরে মন করে চুরি ॥ ১৯৩ ॥

ঘোলে গলে বনমালা সৌরভে আকুল ।
শুনু শুনু রবে গুজে মধুপের কুল ॥ ১৯৪ ॥

নীলাভবরণ বক্ষঃ অতি সুশোভিত ।
কুসুম-ভূষণসহ চন্দনে চর্চিত ॥ ১৯৫ ॥

কটিতটে গুঞ্জবেড়া পিঠে পীত ধটি ।
পীতবাস পরিধানে অতি পরিপাটি ॥ ১৯৬ ॥

কনক নূপুর শোভা করে রাঙ্গা পায় ।
সুমধুর রুনুঝুনু বাদ্য বাজে তায় ॥ ১৯৭ ॥

ভুবনমোহন রূপাকর কৃষ্ণরায় ।
উদিয়া প্রভুর অঙ্গে অমনি মিশায় ॥ ১৯৮ ॥

যখন যে মূর্তি হয় প্রভুর গোচর ।
শ্রীপ্রভুর দেহ যেন তাহাদের ঘর ॥ ১৯৯ ॥

আপনে আপনি প্রভু দেখেন এখন ।
তিনিই শ্রীকৃষ্ণ নিজে রাধিকারমণ ॥ ২০০ ॥

ভাবাযুক্তে ভাবাতীতে স্বগুণ নির্গুণে ।
সাধনা মধুরভাবে ইতি এইখানে ॥ ২০১ ॥



ব্রাহ্মণী উন্মত্তা এবে প্রভুর কৃপায় ।
নানা ভাব-বেগ হৃদে স্রোত ব'য়ে যায় ॥ ২০২ ॥

যখন যে ভাব হৃদে হয় জাগরণ ।
সেইমত হয় তার বাহ্য আচরণ ॥ ২০৩ ॥

যখন বাৎসল্যভাব হৃদয়ে সঞ্চার ।
প্রভুরে দেখিত ঠিক গোপাল তাঁহার ॥ ২০৪ ॥

ভিক্ষা মাগিবার তরে ঘরে ঘরে বায় ।
গোপাল গোপাল বলি কাঁদে উভরায় ॥ ২০৫ ॥

ভিক্ষা-লব্ধ বিনিময়ে মাখন নবনী ।
আনিয়া প্রভুর মুখে দিতেন ব্রাহ্মণী ॥ ২০৬ ॥

স্নেহে গর গর হৃদি মুখপানে চায় ।
কাছে রহে নাহি ইচ্ছা যাইতে কোথায় ॥ ২০৭ ॥

ভিক্ষায় না গেলে নয় তাই হয় যেতে ।
নবনী ছানার হেতু প্রভুরে খাওয়াতে ॥ ২০৮ ॥

গোঠেতে আটক বৎস গাভীর মতন ।
ব্রাহ্মণীর কোনখানে নাহি থাকে মন ॥ ২০৯ ॥

বিরহের গান গায় বিষম উচ্ছ্বাসে ।
চক্ষে ঝরে জলধারা বক্ষঃ যায় ভেসে ॥ ২১০ ॥

এমন হৃদয়-দ্রব ঠামে গীত গায় ।
মানুষ দূরের কথা পাষাণে গলায় ॥ ২১১ ॥

কেঁদে কেঁদে যার ভেসে সুখের সাগরে ।
বলিতে নারিনু কিবা ব্রজভাবে ধরে ॥ ২১২ ॥

প্রেম-ভক্তি-অনুরাগ সুদুর্লভ ধন ।
কোটির মধ্যেতে যদি পায় এক জন ॥ ২১৩ ॥

বৃথায় জনম বৃথা নরদেহ ধরা ।
কৃষ্ণ-অনুরাগে যদি না হইল হারা ॥ ২১৪ ॥

ব্রহ্মার বাঞ্ছিত ধন প্রভু-অবতারে ।
অহেতুক কৃপানিধি দিল মুঠা ভ'রে ॥ ২১৫ ॥

মানিক রতন নিধি মণি যার নাম ।
যে না চিনে তার কাছে আছে কিবা দাম ॥ ২১৬ ॥

কামিনীকাঞ্চনাসক্ত বদ্ধ জীবগণ ।
বুঝে কৃষ্ণভক্তি তুচ্ছ তৃণের মতন ॥ ২১৭ ॥

প্রেমভক্তি-আস্বাদনে কিবা মিঠা লাগে ।
কি তার সুতার ভরা আছে অনুরাগে ॥ ২১৮ ॥

আদতেই বোধ নাই আসক্তির প্রাণে ।
সন্তুষ্ট বীষের কীট হলাহলপানে ॥ ২১৯ ॥

গুরুবাক্য মহামন্ত্র হৃদয়ের ক্ষেতে ।
রূপার জগৎ-গুরু দেন যার পুঁতে ॥ ২২০ ॥

আঁতে আঁতে গাঁথে তার বেড়াজাল মূল ।
বীজমন্ত্র দেয় তুলে অঙ্কুর অতুল ॥ ২২১ ॥

পুষ্টি-হেতু চারাগাছে দুখানি নয়ন ।
ধীরে ধীরে মূলে করে বারি বিসিঞ্চন ॥ ২২২ ॥

মজার রসের গাছ রসে রসে বাড়ে ।
প্রসারি প্রশাখা-শাখা ত্রিভুবন বেড়ে ॥ ২২৩ ॥

লোকে জানে হৃদিক্ষেত অল্প আয়তন ।
অলীক সে কথা তার মধ্যে ত্রিভুবন ॥ ২২৪ ॥

আঁখি ঢালে তত জল যত টানে মূল ।
ডগে ডগে ফুটে বিশ্ব-বিনোদিনী ফুল ॥ ২২৫ ॥

আকুল পরাণ এত সৌরভের বল ।
গাছের যে কাছে যায় সে হয় পাগল ॥ ২২৬ ॥

বিশ্বগন্ধা কুসুমের কণিকা ভিতরে ।
অনুরাগ ভক্তি প্রেম তিন ফল ধরে ॥ ২২৭ ॥

তিন রূপ ফল কিন্তু এক আস্বাদন ।
এক আস্বাদনে তবু বিবিধ রকম ॥ ২২৮ ॥

বিষম হেঁয়ালি মন কি দিব বুঝায়ে ।
আগাগোড়া ইক্ষুগাছা গোটা দেখ খেয়ে ॥ ২২৯ ॥

বড়ই সুন্দর গাছ কিবা কব তার ।
হলে ডগে চলে বেগে রসের জুয়ার ॥ ২৩০ ॥

কখন গম্ভীর স্থির ফুলপত্র পোষে ।
কখন হইয়া ফল ফলসঙ্গে মিশে ॥ ২৩১ ॥

অনুরাগে বেগবতী থামে ভক্তি হ'লে ।
সাগরসঙ্গমে প্রেম সঙ্গে যায় মিলে ॥ ২৩২ ॥

প্রেমে রসে মিশে গেছে ব্রাহ্মণী এখন ।
শুন রামকৃষ্ণকথা মঙ্গলকথন ॥ ২৩৩ ॥



বহুদিন অদর্শন ছিল শ্রীপ্রভুর ।
ঘরে ল'য়ে গিয়াছিল ভকত মথুর ॥ ২৩৪ ॥

এবে পুরীমধ্যে তাঁর আগমন শুনি ।
আনন্দে পূর্ণিতান্তরা হইল ব্রাহ্মণী ॥ ২৩৫ ॥

দর দর বারিধারা বহে দুনয়নে ।
সবেগে বাৎসল্যভাব সমুদিত মনে ॥ ২৩৬ ॥

কতক্ষণে চন্দ্রাননে নবনী মাখন ।
প্রভুরে করিয়া কোলে করিবে অর্পণ ॥ ২৩৭ ॥

উচাটন মন স্থির কিসেও না আর ।
পরা বারাণসী শাড়ি গায়ে অলঙ্কার ॥ ২৩৮ ॥

হাতে থাল পরিপূর্ণ ছানা ননী ক্ষীর ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে হইল বাহির ॥ ২৩৯ ॥

গায় কৃষ্ণ-বিচ্ছেদের প্রভাসের গান ।
ভাবেতে ব্রাহ্মণী নন্দরানীয় সমান ॥ ২৪০ ॥

পাগলিনী-সম গায় ভাসে আঁখিজলে ।
যে শুনে সে কাঁদে আর সঙ্গে এসে মিলে ॥ ২৪১ ॥

পুরীর ফটক-দ্বারে যবে উপনীতা ।
চারিধারে বামাদলে ব্রাহ্মণী বেষ্টিতা ॥ ২৪২ ॥

যেই দেখে শুনে হয় সেই বিমোহিত ।
গাইতে লাগিল নিম্নলিখিত সঙ্গীত ॥ ২৪৩ ॥

দ্বারে দাঁড়ায়ে আছে তোর মা নন্দরানী ।
তোরে নিতে আসি না দেখে যাব চাঁদ-বদনখানি ।
আয়রে কোলে দিব তুলে বদনে সর ননী ॥


তিল-আধ প্রাণ যদি থাকে তোর মন ।
ব্রাহ্মণীর হৃদি-ভাব কর বিলোকন ॥ ২৪৪ ॥

কোথায় গিয়াছে ভেসে কোণা তার প্রাণ ।
কি সুখলহরী মধ্যে এবে ভাসমান ॥ ২৪৫ ॥

কি আর রেখেছে দেখ আপনার ঘরে ।
মহাপ্রেমে গেছে গ'লে প্রেমের পাথারে ॥ ২৪৬ ॥

হায়রে তপস্বী মহাঋষি মুনিগণ ।
ত্রিভুবন সর্বজন আরাধ্যচরণ ॥ ২৪৭ ॥

আজীবন অনশন তরুতলে বাস ।
অবিরত নানা ব্রত কঠোর সন্ন্যাস ॥ ২৪৮ ॥

প্রয়াস কেবলমাত্র তুচ্ছধনহেতু ।
ত্রিতাপ-সন্তাপ-ভয়ে হ'য়ে অতি ভীতু ॥ ২৪৯ ॥

যোগানন্দ ব্রহ্মানন্দ সুখদুঃখ পার ।
হ'ল না দেখিতে সাধ ব্রজের ব্যাপার ॥ ২৫০ ॥

তুলনায় কি আনন্দ যোগানন্দ ধরে ।
যে আনন্দ গোপিনীর এক বিন্দু নীরে ॥ ২৫১ ॥

ব্রজের রহস্য কথা পরম কৌতুক ।
সুখে দেখে সুখ নয় দুঃখে মহাসুখ ॥ ২৫২ ॥

কিছুই না পায় সুখ সহাস্ত বরনে ।
পরম আনন্দবোধ কেবল রোদনে ॥ ২৫৩ ॥

ঢালিয়া আখির জ্বল ব্রাহ্মণী দেখায় ।
সুবেষ্টিতা বামাদলে ধীরে ধীরে যায় ॥ ২৫৪ ॥

গায় প্রেমমাখা গান মুগ্ধ যেন শুনে ।
ভাব-বেগে বন্ধগতি মাঝে মাঝে থামে ॥ ২৫৫ ॥

একে রমণীর কণ্ঠ মিষ্টকণ্ঠা তায় ।
তদুপরি প্রেম-বেগ রাগে বাহিরায় ॥ ২৫৬ ॥

কিবা কান্তিমাখা গায় চেহারা কেমন ।
আঁকিতে নারিনু ধরি কাঠির কলম ॥ ২৫৭ ॥

সুপামর চিত্রকর চিত্রে নাই হাত ।
বর্ণহীন পুজিমাত্র কালির দুয়াত ॥ ২৫৮ ॥

অন্তর বুঝিয়া তুমি কর দরশন ।
কি ঠামে চলিয়া যায় ব্রাহ্মণী এখন ॥ ২৫৯ ॥

ফটক হইতে প্রায় দশ বিঘা দূর ।
যেখানে একত্রে প্রভু হৃদয় মথুর ॥ ২৬০ ॥

হৃদয় মথুর স্বর শুনিবার আগে ।
ব্রাহ্মণীর প্রেমমাখা গীত গিয়া লাগে ॥ ২৬১ ॥

মহাবেগে বাণসম প্রভুর শ্রবণে ।
বাহ্য গেল সমাধিস্থ হৈলা সেইক্ষণে ॥ ২৬২ ॥

পশ্চাৎ মথুর শুনি কহিল হৃদয়ে ।
কে বা গায় মিষ্ট গীত দেখ না এগিয়ে ॥ ২৬৩ ॥

হৃদয় একত্রে দেখে নারী কয় জনা ।
তার মধ্যে ব্রাহ্মণীরে নাহি যায় চেনা ॥ ২৫৪ ॥

আভরণে রঙ্গিন বসনে সজ্জা করা ।
লুকায়েছে তার মধ্যে তাহার চেহারা ॥ ২৫৫ ॥

ব্রাহ্মণী নিকটে আসি করে নিরীক্ষণ ।
সমাধিস্থ প্রভুদেব নাহিক চেতন ॥ ২৫৬ ॥

ব্রাহ্মণীও অচেতন প্রায় ভূমে পড়ে ।
খাল সহ হৃদয় যাইয়া তার ধরে ॥ ২৫৭ ॥

কিছু পরে ব্রাহ্মণী সম্বিৎ পেয়ে উঠে ।
বিভোর শ্রীপ্রভুদেব নেশা নাহি ছুটে ॥ ২৫৮ ॥

শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে বসিল ব্রাহ্মণী ।
অবিরল ঢালে জল নয়ন দুখানি ॥ ২৫৯ ॥

বাঞ্চাকল্পতরু প্রভু ভাবের বিহ্বলে ।
শিশুসম বসিলেন ব্রাহ্মণীর কোলে ॥ ২৬০ ॥

খালা থেকে ল'য়ে ননী হৃদয় আপনে ।
টুকু টুকু স্কুলে দেয় প্রভুর বদনে ॥ ২৬১ ॥

পঞ্চমবর্ষীয়-বয়ঃ বালক সমান ।
ব্রাহ্মণীর কোলে বসে ননী সর খান ॥ ২৬২ ॥

আসক্তির দাস মন দেখ আঁখি মেলে ।
কি ছাড় কাঞ্চন-নারী ল'য়ে আছ ভুলে ॥ ২৬৩ ॥

ব্রাহ্মণীর কোলে কিবা দৃশ্য করে গেলা ।
ধরিয়াছে ধরাতল বৈকুণ্ঠের মেলা ॥ ২৬৪ ॥

বিনা-পণে দরশনে না হইল সাধ ।
এবা কিবা নরবুদ্ধি অতি পরমাদ ॥ ২৬৫ ॥

দ্রবময়ী ব্রহ্মবারি জলাধারে ভরা ।
জীবের জীবনরস সুরম্য চেহারা ॥ ২৬৬ ॥

স্বভাব-সুলভ ভাবে সদা আছে গ'লে ।
উথলায় যেন তায় পবন হিল্লোলে ॥ ২৬৭ ॥

তেমনি রসের সিন্ধু প্রভু ভগবান ।
ভক্তভাব-বাতে তাহে তুলিছে তুফান ॥ ২৬৮ ॥

বিশেষতঃ শ্রীপ্রভুর বৈষ্ণব সাধনে ।
ব্রাহ্মণী ভকতিমুখী ভক্তি ভাল চিনে ॥ ২৬৯ ॥

বিষম রগড় বড় তুলেন ব্রাহ্মণী ।
একমনে শুন মন কহিব কাহিনী ॥ ২৭০ ॥

কখন গোপিনীবেশ সুন্দর দেখিতে ।
আনন্দলহরী ধরা আছে ডান হাতে ॥ ২৭১ ॥

মাতোয়ারা হ'য়ে গায় নীচে লেখা গান ।
যে শুনে তাহার হয় দ্রবীভূত প্রাণ ॥ ২৭২ ॥

আয় গো আর গোষ্ঠে, গোচারণে যাই ।
শুনচি নিধুবনে রাখালরাজা 

হবেন রাই, হায় শুনতে পাই ।
পীতধড়া মোহন চূড়া রাইকে পরাবে,
হাতে বাঁশরি দিবে —
রাইকে রাজা সাজাইয়ে, কোটাল হবে প্রাণ-কানাই ।
ললিতা বিশাখা আদি অষ্ট সখীগণ,
রাখাল হবে পঞ্চজন —
তারা আবা দিয়ে যনে বনে,
ফিরাবে ধবলী গাই ॥


প্রভুর পুরুষের মত নাহি কোন লাজ ।
প্রিয় দরশন গায় বাউলের সাজ ॥ ২৭৩ ॥

কোমরেতে বাঁধা ডুগি বাজে তালে তালে ।
গোরা গুণ-গীত গায় ভক্তি-রসে গ'লে ॥ ২৭৪ ॥

গৌর-প্রেমের ঢেউ লেগেছে গায় ।
তার হিল্লোলে পাষণ্ড দলন,
এ ব্রহ্মাণ্ড তলিয়ে যায় ।
মনে কবি ডুবে তলিয়ে রই,
গৌরচাদের প্রেম-কুমীরে
গিলেচে গো সই ।
এমন বাখার ব্যথী কে আর আছে,
হাত ধরে টেনে তোলায় ॥


প্রভু হন বাহ্যহারা ব্রাহ্মণীর গানে ।
তখনি অমনি যেই ক্ষণে ঢুকে কানে ॥ ২৭৫ ॥

ভাবময়ী ভক্তিময়ী ব্রাহ্মণীর দেহ ।
মানবী-আকার কিন্তু মহাদেবী কেহ ॥ ২৭৬ ॥



অদ্ভুত অদ্ভুত নরনারী নানা বেশে ।
সময়েতে শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে আসে ॥ ২৭৭ ॥

ভক্তিসহকারে মন শুন একমনে ।
কলিকাল সত্য সম প্রভুরাগমনে ॥ ২৭৮ ॥

বলে দলে ধরাতলে দেবদেবীগণ ।
ধরি নরদেহ করে প্রভু দরশন ॥ ২৭৯ ॥

পরিচিত ব্রাহ্মণীর কিছু আগেকার ।
চন্দ্র নাম বিষ্ণু-অংশে জনম তাঁহার ॥ ২৮০ ॥

রজভাবে ভরা ছবি ভোগের বাসনা ।
অঙ্গকান্তি পরিচ্ছদে মন ষোল আনা ॥ ২৮১ ॥

নয়নরঞ্জন মূর্তি সুন্দর গড়ন ।
বৈষ্ণব-বিভূতি তায় আছে বিলক্ষণ ॥ ২৮২ ॥

গোপনে লিখিয়া পত্র পাঠায় ব্রাহ্মণী ।
কোথার এখন কি বা পেয়েছেন তিনি ॥ ২৮৩ ॥

বিশেষিয়া বিবরিয়া শক্তি যতদূর ।
কিবা প্রভু রামকৃষ্ণ দয়াল ঠাকুর ॥ ২৮৪ ॥

আর অনুরোধ পত্রে করিল তাঁহারে ।
করা করি আসিবারে দক্ষিণশহরে ॥ ২৮৫ ॥

এখানেতে একদিন প্রভুর নিকটে ।
কথায় কথায় তাঁর নাম গেল উঠে ॥ ২৮৬ ॥

যেমন চন্দ্রের নাম করিল ব্রাহ্মণী ।
অমনি কহিলা প্রভু আমি তারে জানি ॥ ২৮৭ ॥

বিষ্ণু-অংশে জন্ম তার দেখিয়াছি তারে ।
বিষ্ণুচক্রযুক্ত এক শিলার ভিতরে ॥ ২৮৮ ॥

পুনশ্চ ব্রাহ্মণী কহে প্রভুর সাক্ষাৎ ।
একবার দেখিয়াছি তার চারি হাত ॥ ২৮৯ ॥

নানাবিধ কথোপকথন হৈলে সায় ।
ব্রাহ্মণী চলিয়া গেল নিজের বাসায় ॥ ২৯০ ॥

আছিল প্রভুর রীতি হৃদয়ের সনে ।
দেখিবারে ব্রাহ্মণীরে তাঁহার আশ্রমে ॥ ২৯১ ॥

যাইতেন প্রীতিভরে মাঝে মাঝে প্রায় ।
এবার না যান আর বহুদিন যার ॥ ২৯২ ॥

ইতিমধ্যে ব্রাহ্মণীর পত্রমর্মে জানি ।
পরমদেবতা প্রভুদেবের কাহিনী ॥ ২৯৩ ॥

আইল সত্বর চন্দ্র ব্রাহ্মণীর ঠাঁই ।
না জানেন কোন বার্তা জগৎ-গোসাঁই ॥ ২৯৪ ॥

আপনার কাছে চন্দ্রে রাখিয়া গোপনে ।
ব্রাহ্মণী পাঠার বার্তা প্রভু-সন্নিধানে ॥ ২৯৫ ॥

আসিবারে একবার আশ্রমে তাঁহার ।
বহুদিন গেল কেন নহে আসা আর ॥ ২৯৬ ॥

প্রভুর শ্রীমুখে আগে শুনেছে ব্রাহ্মণী ।
যে তোমার চন্দ্র আমি তারে ভাল চিনি ॥ ২৯৭ ॥

লেগেছে বিস্ময় বাক্যে ব্রাহ্মণীয় প্রাণে ।
আগে দেখা পরে চেনা না দেখে কে চেনে ॥ ২৯৮ ॥

দেখিতে রহস্য কিবা চন্দ্রে রাখি ঘরে ।
অন্নাদি ব্যঞ্জন রাঁধে বাহির দুয়ারে ॥ ২৯৯ ॥

হেনকালে উপনীত প্রভু নারায়ণ ।
দূর থেকে ঘরে চন্দ্রে করি নিরীক্ষণ ॥ ৩০০ ॥

এসেছ এসেছ চন্দ্র এতেক কহিয়া ।
ওহে চন্দ্র চন্দ্র বলি ডাকেন চেঁচিয়া ॥ ৩০১ ॥

নীরব ব্রাহ্মণী চন্দ্র নাহি দেয় সাড়া ।
এমন সময় প্রভু হৈলা বাহ্যহারা ॥ ৩০২ ॥

তাড়াতাড়ি এখন আসিয়া চন্দ্রনাথ ।
সবলে ধরিল তেড়ে শ্রীপ্রভুর হাত ॥ ৩০৩ ॥

ভাবভঙ্গে ঈষৎ আবেশ মাত্র গায় ।
বলিলেন এহে চন্দ্র চিনেছি তোমায় ॥ ৩০৪ ॥

চন্দ্রনাথ কয় তাঁয় উত্তর বচনে ।
চিনিয়াছ? এতদিন ভুলে ছিলে কেনে ॥ ৩০৫ ॥

ঈশ্বর-ইচ্ছায় প্রভু কৈলা প্রত্যুত্তর ।
চন্দ্র কহে অন্য কেবা তুমিই ঈশ্বর ॥ ৩০৬ ॥

শ্রীপ্রভু বলেন আমি এবে দেহধারী ।
ভুল হয় সদা ঠিক রাখিতে না পারি ॥ ৩০৭ ॥

চন্দ্রের আছিল আর এক শক্তি গায় ।
অলক্ষ্যে যাইতে পারে বাসনা যেখায় ॥ ৩০৮ ॥

কামতৃপ্তি-হেতু করে শক্তির চালনা ।
বারে বারে প্রভু তার করিলেন মানা ॥ ৩০৯ ॥

শ্রীআজ্ঞার অনাবিষ্ট দেখিয়া তাহারে ।
টানিয়া লইলা শক্তি নিজের শরীরে ॥ ৩১০ ॥

চন্দ্র হৈল বিষহীন ভুজঙ্গের প্রায় ।
সরোদনে শ্রীচরণে লুটালুটি খায় ॥ ৩১১ ॥

রামকৃষ্ণলীলা অতি মধুর কথন ।
শুন অতঃপর কিবা পশ্চাৎ সাধন ॥ ৩১২ ॥



সমকালে প্রচলিত কর্তাভজা মত ।
ভগবানে যাইবার এও এক পথ ॥ ৩১৩ ॥

পথটি বড়ই নোংরা উপমা তাহার ।
যেমন বাড়ির থাকে নানান দুয়ার ॥ ৩১৪ ॥

কোন দ্বার সদরেতে প্রবেশের তরে ।
কোন দ্বারে যাওয়া যায় অন্দর ভিতরে ॥ ৩১৫ ॥

মেথরের জন্য থাকে আলাহিদা পথ ।
সেইমত অবিশুদ্ধ কর্তাভজা মত ॥ ৩১৬ ॥

প্রকৃতি লইয়া সঙ্গে সাধনার প্রথা ।
দুর্বল জীবের পক্ষে মুস্কিলের কথা ॥ ৩১৭ ॥

বিশেষে এ কলিকালে মানুষের মন ।
স্বভাবতা কামিনীকাঞ্চনে নিমগন ॥ ৩১৮ ॥

মূর্তিমতী অবিদ্যা এতেক শক্তি তার ।
নরলোকে বসায়েছে ভেড়ার বাজার ॥ ৩১৯ ॥

এক ছত্রে ধরাতল করিছে শাসন ।
অধিকার করিয়া ধর্মের রত্নাসন ॥ ৩২০ ॥

প্রজাগণ ল'য়ে মন প্রাণ বুদ্ধি স্মৃতি ।
যুক্তকরে দেয় কর তার দিবারাতি ॥ ৩২১ ॥

বিশেষে কামিনীকায়া না যার বাখানি ।
প্রকৃত সাগরস্থিত চুম্বকের খনি ॥ ৩২২ ॥

লৌহপাতে তলা মোড়া তরীরূপ নরে ।
পাইলে অমনি তায় ডুবায় পাথারে ॥ ৩২৩ ॥

প্রভুদেব বলিতেন মায়ারূপা মেয়ে ।
যাহা ছিল ঘরে দিল সমুদায় খেয়ে ॥ ৩২৪ ॥

পদে পদে উপদেশ দিলা ভগবান ।
কামিনীকাঞ্চন যেথা রহ সাবধান ॥ ৩২৫ ॥

ঘুণ-রূপা কামিনী যদ্যপি গিয়া পশে ।
জ্বারা জ্বারা করে কাঁচা নররূপ বাঁশে ॥ ৩২৬ ॥

হেন মেয়ে ল'য়ে যেথা সাধনা উপায় ।
কোটির ভিতরে কটা লোকে রক্ষা পায় ॥ ৩২৭ ॥

প্রভু বলিতেন এই পথ নহে সোজা ।
কামিনী হিজড়া হবে, নর হবে খোজা ॥ ৩২৮ ॥

তবে হয় কর্তাভজা, না নইলে নয় ।
পথে পথে সাধকের পতনের ভয় ॥ ৩২৯ ॥



এই সম্প্রদায়ভুক্ত বৈষ্ণবচরণ ।
ভাগাতাচার্য ভক্ত প্রভুপদে মন ॥ ৩৩০ ॥

শহরের সন্নিকট কাছির বাগান ।
যেখানে তাদের গুপ্ত সাধনার স্থান ॥ ৩৩১ ॥

বৈষ্ণবচরণ ছিল আচার্য তথায় ।
সাধক সাধিকা বহু ভক্ত সম্প্রদায় ॥ ৩৩২ ॥

গোপনে গোপনে তথা হ'য়ে একত্রিত ।
আচার্যের দীক্ষামত সাধনা করিত ॥ ৩৩৩ ॥

মধুর-স্বভাবযুক্ত বৈষ্ণবচরণ ।
সত্য-তত্ত্বান্বেষী শুদ্ধ সুসরল মন ॥ ৩৩১ ॥



প্রভুর চরণাম্বুজে পাইয়া আত্মায় ।
মনে মনে উঠে তাঁয় উগ্রতর সাধ ॥ ৩৩২ ॥

তদাদিষ্ট সকলের মঙ্গল-কারণ ।
যদ্যপি আড্ডার হয় প্রভুর গমন ॥ ৩৩৩ ॥

শ্রীচরণ-পরশনে স্থান হবে শুদ্ধ ।
সাধন-ভজনে শিব মনোরথ সিদ্ধ ॥ ৩৩৪ ॥

যথাবৎ মনোবাঞ্ছা কহে একদিন ।
তখনি সম্মতি সায় দিলা ভক্তাধীন ॥ ৩৩৫ ॥

যথাযোগ্য আয়োজন নির্ধারিত দিনে ।
সসঙ্গ বৈষ্ণব যাত্রা কাছির বাগানে ॥ ৩৩৬ ॥

আড্ডা-মধ্যে রূপবতী সাধিকা বিস্তর ।
ছোট বড় তর তম কমল নিকর ॥ ৩৩৭ ॥

জগৎলোচন প্রভুদেবের উদয়ে ।
হৃদিপদ্ম তাহাদের উঠে বিকশিয়ে ॥ ৩৩৮ ॥

কমল সাবিকাদের হৃদয়কমল ।
অনুয়ে তুলিল এক দিব্য পরিমল ॥ ৩৩৯ ॥

আমোদিত গোটা আড্ডা দিব্যতম ভাবে ।
নেহারে নয়ন ভরি দিনেশ শ্রীদেবে ॥ ৩৪০ ॥

যত বল সূর্যালোক এত অতি কাছে ।
দেখিবারে দৃষ্টি শক্তিমান কেবা আছে ॥ ৩৪১ ॥

তদুত্তরে বলি শুন কিবা গূঢ় মর্ম ।
প্রভু দিনকরে ধরে মানিকের ধর্ম ॥ ৩৪২ ॥

দিনেশে দাহিকা-শক্তি প্রবল কেবল ।
মানিক-আলোক হৃদি আঁখি সুশীতল ॥ ৩৪৩ ॥

তদুপরি দিব্য ছটা বন্ধনে বিকালে ।
ভগবৎ-প্রেমোভূত ভাবের আবেশে ॥ ৩৪৪ ॥

ভাবে ভরা বাহ্যহারা মুদিত নয়ন ।
অদৃষ্ট অশ্রুতপূর্ব অপূর্ব দর্শন ॥ ৩৪৫ ॥

দেহ মন প্রাণখানি কতই বিকল ।
আঁকিবারে চিত্রখানি ঠিক অবিকল ॥ ৩৪৬ ॥

অক্ষমে হাঁপিরা মরি এত মহা দায় ।
যদিও প্রাণেতে ছবি না আসে ভাষায় ॥ ৩৪৭ ॥

ইন্দ্রিয়বিজয়ী প্রভু দেখি পরীক্ষায় ।
অটুট সহজ বলি বুঝিল তাঁহার ॥ ৩৪৮ ॥

কর্তাভজা মতে পথে সিদ্ধ যেই জনা ।
অটুট পহল নামে হন খ্যাতনামা ॥ ৩৪৯ ॥

দেহাধারে অধিষ্ঠান আলেক আপনি ।
শিষ্য-মধ্যে শুরুভাবে পুজনীয় তিনি ॥ ৩৫০ ॥

তাই তারা নিজ নিজ কল্যাণের আশে ।
কেহ বা ইন্দ্রিয় কেহ পদাঙ্গুলি চুষে ॥ ৩৫১ ॥

কেহ বা চরণতলে লুটালুটি যায় ।
মনোরগ-পূর্ণ-হেতু রুপা ভিক্ষা চায় ॥ ৩৫২ ॥

আবেশস্থ প্রভুদেব বাহ্য কিছু নাই ।
অত্যাশ্চর্য অদ্ভুত জগৎ-গোসাঁই ॥ ৩৫৩ ॥

সবার ঠাকুর প্রভু ব্রহ্ম সনাতন ।
সকলে চরণ পার যে চায় চরণ ॥ ৩৫৪ ॥

রামকৃষ্ণ অবতার পরন দয়াল ।
হইলেও অতি ক্ষুদ্র সে পায় নাগাল ॥ ৩৫৫ ॥

ফল ভারে বৃক্ষ যেন নীচে নেমে পড়ে ।
সেইমত প্রভুদেব করুণার ভারে ॥ ৩৫৬ ॥

ঢালিয়া কৃপার ধারা সাধকের দলে ।
ফিরিলেন সেই দিন আপনার স্থলে ॥ ৩৫৭ ॥

শ্রীপ্রভু অপেক্ষা তাঁর করুণার বল ।
যাহায় করেছে তাঁয় পুকুরের জল ॥ ৩৫৮ ॥

অতি সোজা অনায়াসে সহজেই মিলে ।
উদয় গোলকচন্দ্র এখন ভূতলে ॥ ৩৫৯ ॥

দলে দলে মধুলুব্ধ মধুপের প্রায় ।
মহামত্ত গোটা কর্তাভজা-সম্প্রদায় ॥ ৩৬০ ॥

নানান অবস্থা ভুক্ত পুরুষ রমণী ।
দক্ষিণশহরে করে নিত্যই মেলানি ॥ ৩৬১ ॥

সাজাইয়া ফুলহারে মনের মতন ।
মাঝে রাখি প্রভুদেবে করিত বেষ্টন ॥ ৩৬২ ॥

এ হেন সময় আর এক কথা শুনি ।
গুপ্তমুখী কত শত কুলের কামিনী ॥ ৩৬৩ ॥

মিষ্টিসহ মিঠা ফল আনিয়া গোপনে ।
পরম সোহাগে দিত প্রভুর বদনে ॥ ৩৬৪ ॥

পরিপক হ'লে ফল গাছেতে যেঘন ।
বিবিধ স্বভাবযুক্ত বিবিধ বরণ ॥ ৩৬৫ ॥

অগণন বিহঙ্গম বাসা দূরদেশে ।
পাইয়া ফুলের গন্ধ ফল খেতে আসে ॥ ৩৬৬ ॥

যেমন উদর যার সেইমত গায় ।
ক্ষুধা মিটাইয়া পরে স্ববাসে পালায় ॥ ৩৬৭ ॥

ঠিক তাই নানা সম্প্রদায়ভুক্ত দল ।
প্রভু বাঞ্ছাকল্পগাছে গায় পাকা ফল ॥ ৩৬৮ ॥

এক গাছে যত ফল একই রকম ।
সমান আকার বর্ণ এক আস্বাদন ॥ ৩৬৯ ॥

সব বিহঙ্গম তৃপ্তি নাহি পায় তায় ।
বিজাতীয় ফল দেখি স্থানান্তরে যায় ॥ ৩৭০ ॥

কল্পগাছ তেন নয় এক গাছ বটে ।
ভিন্ন ভিন্ন ফল তার ভিন্ন ভিন্ন বটে ॥ ৩৭১ ॥

নানা আস্বাদন নানা মিষ্টরসে ভরা ।
এক জাতি কত শত কে করে কিনারা ॥ ৩৭২ ॥

কোন্ পাখী কটা খাবে পেটে কত বল ।
করবৃক্ষপ্রভু তাঁয় ধরে নানা ফল ॥ ৩৭৩ ॥

কখন সাধনা কিবা কৈলা ভগবান ।
কেহ নাহি জানে তার সঠিক সন্ধান ॥ ৩৭৪ ॥

মানুষে বুঝিতে নারে প্রভুর সাধনা ।
স্বচক্ষে যাহার দেখা সেও যেন কানা ॥ ৩৭৫ ॥

বাউল প্রভৃতি নবরসিকের মত ।
ভগবানে যাইবারে যত রূপ পথ ॥ ৩৭৬ ॥

সকল বিদিত প্রভু আদি থেকে অন্ত ।
গোকলে আরম্ভ শেষ লইয়া বেদান্ত ॥ ৩৭৭ ॥

শুনিয়াছি সাধা তাঁর অগণ্য সাধন ।
নিজে যেন গুপ্ত তেন সাধনা গোপন ॥ ৩৭৮ ॥

ঊনিশ রকম ভাব শ্রীঅঙ্গে খেলিত ।
শাস্ত্র ল'য়ে মিলাইয়া ব্রাহ্মণী দেখিত ॥ ৩৭৯ ॥

অপার মহিমার্ণব প্রভু ভগবান ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা সুধার সমান ॥ ৩৮০ ॥