দ্বিতীয় খণ্ড
ইসলাম-সাধনা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুর লীলাকাণ্ড লীলার আকর ।
যাবতীয় লীলারঙ্গ ইহা্র ভিতর ॥ ১ ॥
ভাবময়ী রঙ্গেশ্বরী লীলার প্রাঙ্গণে ।
এখন করিলা যাহা সকল এখানে ॥ ২ ॥
বীজতলা জগতের সকলই আছে ।
সমরসযুক্ত সব ঠাকুরের কাছে ॥ ৩ ॥
সর্বধর্মসমন্বয়ে অনর্থ-বিচার ।
একত্রিত অঙ্গীভূত স্বতই লীলার ॥ ৪ ॥
একে সব সবে এক শাস্তির নিষ্পত্তি ।
একমাত্র এ লীলার নিজস্ব সম্পত্তি ॥ ৫ ॥
চিরকাল ধর্মরাজ্যে দ্বেষ দ্বন্দ ভারি ।
অমৃতসাগরে যেন বিষের লহরী ॥ ৬ ॥
অদ্যাপিহ নিবারিতে পারিল না কেও ।
বরঞ্চ ক্রমশঃ বৃদ্ধি গরলের ঢেও ॥ ৭ ॥
নিরক্ষর দীনবেশে হ'য়ে অবতার ।
দুরন্ত তরঙ্গে গ্রন্থ করিলা নিবার ॥ ৮ ॥
কুলিশের গতিরোধ কুসুমের দলে ।
রক্ষজয়ী হতবল বালকের বলে ॥ ৯ ॥
একমাত্র তৃণে বদ্ধ প্রমত্ত বারণ ।
শৈবালের ধারে ব্রহ্ম-অস্ত্রের ছেদন ॥ ১০ ॥
নির্বাণ বাড়বানল ফটিকের জলে ।
কেমনে করিলা প্রভু লীলার কৌশলে ॥ ১১ ॥
দেখিতে যদ্যপি তোর সাধ হয় মন ।
বিশ্বখণ্ড লীলাকাণ্ড কর দরশন ॥ ১২ ॥
অসম্ভবে সম্ভব করিয়া কৈলা খেলা ।
শান্তির আকর শুন রামকৃষ্ণলীলা ॥ ১৩ ॥
ওরে মন ঠাকুরের লীলা-গুণগান ।
গুনিয়া আমার সাধ পরম কল্যাণ ॥ ১৪ ॥
কি ছার মিছার ত্যজি রূপ-রস-আশা ।
প্রভু-কল্পতরুতলে নিত্য কর বাসা ॥ ১৫ ॥
নিত্য নিত্য দাও নাড়া খাও মিঠা ফল ।
দুহাত তুলিয়া নাচ বাজায়ে বগল ॥ ১৬ ॥
জাতিতে ক্ষত্রিয় নাম শ্রীগোবিন্দ রায় ।
সন্নিকটে দমদমা বসতি তথায় ॥ ১৭ ॥
পারসী আরবী ভাষা বিশেষিয়া জানা ।
ঈশ্বরানুরাগী ভক্ত তত্ত্বান্বেষী জনা ॥ ১৮ ॥
নানা ধর্ম আলোচনা তত্ত্বলাভেচ্ছায় ।
নির্ণয় করিতে তার নিজের উপায় ॥ ১৯ ॥
নিত্যই কোরাণ গ্রন্থ-পাঠ মনোযোগে ।
সুফী দর্বেশের মত মিষ্টতর লাগে ॥ ২০ ॥
এ পথ
কেবলমাত্র ভক্তি-প্রেমে ভরা ।
ভাবিলে ভাবুক ফুটে ভাবের ফুয়ারা ॥ ২১ ॥
হিন্দু-মতে
পঞ্চভাবে যেন উপাসনা ।
ভাবের পসরা শিরে ভাব-বেচা-কেনা ॥ ২২ ॥
হেথাও ভাবের খেলা
সেই মত ঠিক ।
মনোমত গোবিন্দের গোবিন্দ প্রেমিক ॥ ২৩ ॥
তাই ইসলামীয় ধর্ম করিয়া
গ্রহণ ।
নিভৃতে নির্জনে করে তাহার সাধন ॥ ২৪ ॥
ঈশ্বরানুরাগী যারা তারা এফ জাতি ।
হইলেও বিভিন্ন ধর্ম একই প্রকৃতি ॥ ২৫ ॥
হোক না যে কোন ধর্ম জানিহ নিশ্চয় ।
ভক্তি-অনুরাগ বিনে কিছু নাহি হয় ॥ ২৬ ॥
ভক্তি
অনুরাগ যেন মহা ঝঞ্ঝাবাত ।
বিধি-নিষেধের থেকে অনেক তফাত ॥ ২৭ ॥
কুল-শীল-অভিমান কোথা যায় উড়ে ।
থাকে মাত্র এক লক্ষ্য চক্ষের উপরে ॥ ২৮ ॥
সরল বিশ্বাস সহ ভাবিয়া উপায় ।
যদ্যপি কখন কেহ ধর্মান্তরে যায় ॥ ২৯ ॥
তাহাতে তাহার নাহি হয় কোন ক্ষতি ।
বরঞ্চ চরমে করে পরম উন্নতি ॥ ৩০ ॥
দৈবের ঘটনা কিবা দক্ষিণশহরে ।
উপনীত শ্রীগোবিন্দ পুরীর ভিতরে ॥ ৩১ ॥
আনন্দের সীমা নাহি দেখি রম্য স্থান ।
দেবালয় সাধুশালা ফুলের বাগান ॥ ৩২ ॥
নিরজন পঞ্চবটী ভাগীরথী-কূল ।
একত্রিত যাবতীয় সাধনানুকুল ॥ ৩৩ ॥
ভিক্ষায় সহজ-সাধ্য রানীর ভাণ্ডারে ।
সবধর্মপন্থী পায় সমান আদরে ॥ ৩৪ ॥
গোবিন্দ করিল থানা দেখি মনোমত ।
আপনার কর্মে রহে নিরন্তর রত ॥ ৩৫ ॥
চুম্বকের সঙ্গে যেন সম্বন্ধ লোহার ।
সরল বিশ্বাসে তেন ঠাকুর আমার ॥ ৩৬ ॥
সরলতা বিশ্বাসে প্রিয় প্রভুরায় ।
আপুনি হাজির নিজে গোবিন্দ যেথায় ॥ ৩৭ ॥
প্রেমিক গোবিন্দ দেখি পরম আনন্দ ।
আলাপনে আলোচনা ধর্মের প্রবন্ধ ॥ ৩৮ ॥
ঠাকুর করেন চিন্তা আপনার মনে ।
ইসলামীর পথ এক পথের বিধানে ॥ ৩৯ ॥
ভাবেশ্বরী লীলাময়ী এই পথ দিয়ে ।
দেন কত সাধকের বাঞ্ছা পুরাইয়ে ॥ ৪০ ॥
মারের শ্রীপাদ-পদ্ম-লাভ এই পথে ।
কিরূপে কেমনে হয় মানস দেখিতে ॥ ৪১ ॥
এত বলি গোবিন্দকে দীক্ষা-শুরু করি ।
সাধনা করেন এপ্রভু ধর্মবিধি ধরি ॥ ৪২ ॥
একমাত্র আল্লা-মন্ত্র অহোরাত্র জপে ।
গমন না হয় মার মন্দির-তরফে ॥ ৪৩ ॥
দেব কি দেবীর নাম ফুটে না বদনে ।
বাহিরে বাহিরে বাস এখানে সেখানে ॥ ৪৪ ॥
পরিধান-ধুতি নাই কাছা আঁটা তায় ।
হাবভাব কথাবার্তা যবনের প্রায় ॥ ৪৫ ॥
যবন-বন্ধন-ঘ্রাণ আস্বাদনে সাধ ।
মথুর দেখিল একি হৈল পরমাদ ॥ ৪৬ ॥
নানামতে প্রভুরে বুঝান সংগোপনে ।
যবনের রান্না বাবা খাইবে কেমনে ॥ ৪৭ ॥
শ্রীপ্রভু বলেন খানা রাঁধিবে যখন ।
সানকি বদনা ল'য়ে করিব ভক্ষণ ॥ ৪৮ ॥
পিয়াজ রসুন গন্ধ ছাড়িবে খানায় ।
পাইলে এমন গন্ধ তৃপ্তি হবে তায় ॥ ৪৯ ॥
পুনশ্চয় প্রভুদেবে বুঝাইয়া কন ।
ব্রাহ্মণে যদ্যপি করে সেরূপ রন্ধন ॥ ৫০ ॥
তাহাতে না হবে কোন ক্ষতি আপনার ।
ভাল বলি প্রভুদেব করিলা স্বীকার ॥ ৫১ ॥
তখনি আনায় এক পাচক ব্রাহ্মণ ।
যাবনিক সুপকর্মে বিজ্ঞ বিলক্ষণ ॥ ৫২ ॥
তফাতে দেখেন রান্না প্রভু ভগবান ।
হিন্দুমতে পাচকের ধূতি পরিধান ॥ ৫৩ ॥
মথুরে ডাকাইয়ে প্রভু কন অন্তরালে ।
ব্রাহ্মণে বলহ যেন রাঁধে কাছা খুলে ॥ ৫৪॥
প্রভুর সাধনা শিক্ষা বুঝা কেন ভার ।
বিশেষিয়া বলিবারে কি শক্তি আমার ॥ ৫৫ ॥
যত বার অবতার ভিন্ন ভিন্ন যুগে ।
হইলেন ভগবান এবারের আগে ॥ ৫৬ ॥
প্রতি বারে ভাব কর্ম একৈক রকম ।
রামকৃষ্ণ অবতারে সব বৈলক্ষণ ॥ ৫৭ ॥
যাবতীর জাগতিক বর্ণের মেলানি ।
একা দিনকয়-কর সকলের খনি ॥ ৫৮ ॥
যে বরণ দিনেশ-কিরণে নাহি মিলে ।
যে বরণ নামে সভা নাই কোন কালে ॥ ৫৯ ॥
সেইমত বুঝ প্রভুদেব অবতার ।
অদ্যাবধি যত রূপ সবার আধার ॥ ৬০ ॥
সব বর্ণ সব রূপ সমভাবে বহে ।
একরূপে বহুরূপী শ্রীপ্রভুর দেহে ॥ ৬১ ॥
যেবা হিন্দু-শিরোমণি ধর্ম যার প্রাণ ।
সে দেখে প্রভুরে তার হরি ভগবান ॥ ৬২ ॥
কেহ বা পুরুষ দেখে কেহ বা প্রকৃতি ।
বিভিন্ন বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন মুরতি ॥ ৬৩ ॥
ধর্মান্তরে মুসলমান দেখে আলাহিদা ।
মহান্ পুরুষ তার ত্রাতা পাতা খোদা ॥ ৬৪ ॥
ভিন্নধর্ম-অবলম্বী খ্রীষ্টান যবন ।
দয়াময় সেই যীশু করে দরশন ॥ ৬৫ ॥
পশ্চাৎ পাইবে পূর্ণ পরিচয় তার ।
একাধারে প্রভু সর্ব রূপের আধার ॥ ৬৬ ॥
হেথায় হৃদয় আর ভক্ত শ্রীমথুর ।
বলে এবা কিবা ভাব হইল প্রভুর ॥ ৬৭ ॥
শ্যামা যাঁর ধিয়ান গিয়ান মন প্রাণ ।
দিনান্তেও একবার না করেন নাম ॥ ৬৮ ॥
যাবনিক হাবভাব প্রবল অন্তরে ।
কি বিষম পরমাদ হৃদয় বিদরে ॥ ৬৯ ॥
নিবারণোপায় বুঝি ভাগিনা হৃম্বর ।
তীব্র তিরস্কার-সহ প্রভুদেবে কয় ॥ ৭০ ॥
হেঁগা মামা একি তব দেখি আচরণ ।
যবন-আচার কেন হইয়া ব্রাহ্মণ ॥ ৭১ ॥
শুদ্ধাচারী নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের ছেলে ।
কিবা কবে লোকজন এরূপ দেখিলে ॥ ৭২ ॥
কাছা খুলে ধুতি পরা কহিবারে লাজ ।
পৈতা দিলে ফেলে চাহ করিতে নমাজ ॥ ৭৩ ॥
ভীতচিত প্রভুদ্বেষ উত্তরিলা তায় ।
দেখ হৃদু কেবা যেন করায় আমায় ॥ ৭৪ ॥
নানা বুঝাইয়া হৃদু শান্ত করি তাঁরে ।
শ্যামাসেবা হেতু যায় শ্যামার মন্দিরে ॥ ৭৫ ॥
স্বভাবে যেখন প্রভু হৈল তেমন ।
মসজিদে নমাজ করিতে বড় মন ॥ ৭৬ ॥
প্রভুর বাসনা যেন সিন্ধুর জুয়ার ।
চোটে ছুটে নহে কোন বাধা মানিবার ॥ ৭৭ ॥
সৃষ্টিগ্রাসী বেগ কে দাঁড়ায় ছামুখানে ।
চলিলেন সন্নিকটে মসজিদ যেখানে ॥ ৭৮ ॥
এখানে ভাগিনা হৃদু খুঁজে চারিধারে ।
না পাইয়া প্রভুদেবে আপন মন্দিরে ॥ ৭৯ ॥
দ্রুতগতি ধাইলেন করিয়া সন্ধান ।
দেখিল নেমাজ করে প্রভু ভগবান ॥ ৮০ ॥
জানি না সে কোন্ ভক্ত মসজিদ যাহার ।
যেখানে নেমাজ কৈলা প্রভু অবতার ॥ ৮১ ॥
গরহিত কাজে রত বালক যেমন ।
অকস্মাৎ উপস্থিত যদি গুরুজন ॥ ৮২ ॥
দরশন করি সশঙ্কিত চিত হয় ।
হৃদয়ে দেখিয়া তেন প্রভুর হৃদয় ॥ ৮৩ ॥
হৃদয় তাঁহারে কিছু কহিবার আগে ।
সভরে বিনয়মাথা শ্রীবদনভাগে ॥ ৮৪ ॥
রসনা জড়িত যেন নাহি সরে ভাষ ।
দূরে থেকে হৃদয়েরে করেন সম্ভাষ ॥ ৮৫ ॥
নাহি দোষ মম, দেখ হৃদু বলি তোরে ।
কে যেন করিয়া জোর আনিল আমারে ॥ ৮৬ ॥
ভাষায় করুণ রস এতই প্রবল ।
কুলিশ শুনিলে হয় সহজেই জল ॥ ৮৭ ॥
এতো ভক্তহৃদয়, ভাগিনা পুনঃ তায় ।
হাতে ধ'রে সমাদরে মন্দিরে ফিরায় ॥ ৮৮ ॥
অদ্ভুত সাধনা নাহি আসে বুদ্ধিবলে ।
একদিন প্রভুদেব পঞ্চবটমূলে ॥ ৮৯ ॥
গঙ্গায়-জুয়ার দেখিছেন ব'সে ব'সে ।
পচা মরা গরু এক ভেসে ভেসে আসে ॥ ৯০ ॥
সন্নিকটে কূলে লাগে তরঙ্গ আঘাতে ।
আইল কুকুর এক লাগিল খাইতে ॥ ৯১ ॥
বুঝি না কি ভাবে মগ্ন হৈলা নারায়ণ ।
কুকুরের এক সঙ্গে আস্বাদনে মন ॥ ৯২ ॥
আরোপ করিলা নিজে তাহার শরীরে ।
যতক্ষণ আস্বাদন বাসনা না পূরে ॥ ৯৩ ॥
হিন্দুমতে সাধনায় দর্শন যেমন ।
নানাবিধ দেবদেবী-মূর্তি অগণন ॥ ৯৪ ॥
এখানেতে একমাত্র প্রথম দিবসে ।
জ্যোতির্ময় মূর্তি এক অপূর্ব পুরুষে ॥ ৯৫ ॥
অতিশয় দীর্ঘ শ্মশ্রু ঝুলে লম্বমান ।
লীলাকথা ঠাকুরের অমৃত সমান ॥ ৯৬ ॥
সগুণ নির্গুণ ভাবে শেষ অনুভূতি ।
যেখানেতে হয় তাঁর সাধনার ইতি ॥ ৯৭ ॥