দ্বিতীয় খণ্ড
স্বদেশ-যাত্রা
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
এবে বর্তমানে শুন লীলার খবর ।
যাবতীয় মতে পথে সাধনার পর ॥ ১ ॥
প্রিয়তর হৈল বড় অদ্বৈতের ভূমি ।
সেথায় বসতি ইচ্ছা দিবসযামিনী ॥ ২ ॥
বাসনা হইলে মনে রক্ষা আর নাই ।
অদ্বৈত-পাথারে মগ্ন হইলা গোসাঞি ॥ ৩ ॥
গুণহীন ক্রিয়াহীন দেশ-কাল-শূন্য ।
কিমাকার কি প্রকার শাস্ত্রের অগম্য ॥ ৪ ॥
বৃক্ষনীড়ে বাস যেন বিহঙ্গমগণে ।
কোথায় উড়িয়া যায় আহারান্বেষণে ॥ ৫ ॥
তেমতি শ্রীপ্রভুদেব পরিহরি ঘর ।
চলিয়া গেছেন নাহি দেহের খবর ॥ ৬ ॥
সংজ্ঞাহীন জড়বৎ শ্রীদেহের বাসা ।
অহর্নিশা ঘোর নেশা নাহি ক্ষুধা তৃষা ॥ ৭ ॥
সপ্তাধিক একভাবে গত হয় প্রায় ।
তথাপি ফিরিয়া ঘরে না আইলা রায় ॥ ৮ ॥
হেনকালে শুন কিবা দৈবের ঘটন ।
অকস্মাৎ উপনীত সাধু একজন ॥ ৯ ॥
বিচিত্র শ্রীপ্রভু যেন সাধুও বিচিত্র ।
সাধুর চরিত্র যেন প্রভুর চরিত্র ॥ ১০ ॥
প্রভুই যেমন এই সাধুর আকারে ।
বৈদ্যবেশে মুর্তিমান হাজির গোচরে ॥ ১১ ॥
এবে যে ভূমিতে গত আছেন গোসাঞি ।
গোসাঞি ব্যতীত তত্ত্ব কেহ জানে নাই ॥ ১২ ॥
তন্ত্র-গীতা ছয় গোটা দর্শন না জানে ।
তবে এই সাধুবর বুঝিল কেমনে ॥ ১৩ ॥
নিরখিয়া প্রভুদেবে বুঝে সাধুবর ।
তত্ত্বাতীত তত্ত্বে মগ্ন প্রভু সর্বেশ্বর ॥ ১৪ ॥
যদি কোন উপায়ে আনিতে পারে নীচে ।
জগতের সুমঙ্গল ধ্রুব হবে পিছে ॥ ১৫ ॥
এত ভাবি উপবিষ্ট হইয়া সকাশে ।
দারুণ প্রহারারম্ভ করে পৃষ্ঠদেশে ॥ ১৬ ॥
বৃহদ্জগর যেন পর্বতের ধারে ।
গুরুভার দেহখানি নড়াতে না পারে ॥ ১৭ ॥
ভাঙ্গিয়া পড়িলে গায়ে আগোটা শিখর ।
তবে যেন আসে কিছু দেহের খবর ॥ ১৮ ॥
তেমনি প্রহার কৈলে প্রহরেক প্রায় ।
তবে না সামান্য বাহ্য সমুদিত গায় ॥ ১৯ ॥
বিজলির ছটা মেঘে রহে যতক্ষণ ।
অতি অল্পস্থায়ী মাত্র বাহ্যিক চেতন ॥ ২০ ॥
এই অবকাশে সাধু দেয় শ্রীবদনে ।
কিঞ্চিৎ পানীয় দুগ্ধ দেহ-সংরক্ষণে ॥ ২১ ॥
থাকিতে না চান প্রভু অধঃতে নামিয়ে ।
নামিলে তখনি পুনঃ যান পলাইয়ে ॥ ২২ ॥
স্বভাবতঃ প্রিয় তাঁর অদ্বৈতের ঘর ।
মানব-লীলার গায়ে ভক্তির চাদর ॥ ২৩ ॥
চক্ষে দেখা ভক্ত-সঙ্গে লীলা-অভিনয়ে ।
ঘণ্টায় ঘণ্টায় যান অদ্বৈতে ছুটিয়ে ॥ ২৪ ॥
ধর্মমাত্রে সকলেরই সার পরিণাম ।
অমৃতসাগরবৎ অদ্বৈতগিয়ান ॥ ২৫ ॥
রূপ নাম রকমারি কিছু নাই যেথা ।
কেবল বিরাজে রাজ্যে সমতা একতা ॥ ২৬ ॥
যাবতীয় মতে পথে চরমে সবার ।
এক বস্তু
অদ্বিতীয় নিত্য নির্বিকার ॥ ২৭ ॥
এখন ধর্মের রাজ্যে ধর্মজ্ঞানহীন ।
ধর্মের
সমরভেরী বাজে রাত্র-দিন ॥ ২৮ ॥
ধার্মিকেরা ধর্মহারা ধর্মে ব্যভিচার ।
আনিয়া
তুলেছে ধর্মরাজ্যে হাহাকার ॥ ২৯ ॥
এক ভিন্ন অন্য ধর্ম না পাই খুঁজিয়ে ।
ঈশ্বরেতে
অনুরাগ মন-প্রাণ দিয়ে ॥ ৩০ ॥
ঈশপ্রেমে মগ্ন যেবা সেই ধর্মবান ।
হিন্দু মুসলমান
কিবা কিবা খ্রীষ্টিয়ান ॥ ৩১ ॥
প্রেমিকের এক লক্ষ্য একরূপ গতি ।
সকলেরই ত্যাগ-পথ
তারা এক জাতি ॥ ৩২ ॥
নিম্ন সাগরের ধারা তথা বিদ্যমান ।
সুধীর গম্ভীর নাই তরঙ্গতুফান ॥ ৩৩ ॥
মত পথ ধর্ম নহে মত মাত্র পথ ।
সরলে যে পথে ইচ্ছা পূরে মনোরথ ॥ ৩৪ ॥
রুচি-ভেদে মত পথ ভিন্ন স্বতন্তর ।
লক্ষ্যে কিন্তু সেই এক পরম ঈশ্বর ॥ ৩৫ ॥
তাই নানা মতে পথে সাধনা করিয়ে ।
দ্বন্দ-বিভঞ্জনে প্রভু দিলা দেখাইয়ে ॥ ৩৬ ॥
এখানে প্রভুর পাশে সাধু রাত্রি দিবা ।
পরম যতনে করে শ্রীদেহের সেবা ॥ ৩৭ ॥
যাহাতে কিঞ্চিৎ ভোজ্য প্রবেশে উদরে ।
এই লক্ষ্যে নানা ক্রিয়া নানা চেষ্টা করে ॥ ৩৮ ॥
এখন কিসেও আর নাহি মোটে মন ।
এক কর্ম এক চিন্তা শ্রীদেহ-রক্ষণ ॥ ৩৯ ॥
সাধন-ভজন যেন আয়াস-প্রয়াস ।
দুই এক নহে গেল গোটা ছয়মাস ॥ ৪০ ॥
তবে না আইল ঘরে প্রভু গুণমণি ।
ফুটিল অনিয়মাণা শ্রীমুখেতে বাণী ॥ ৪১ ॥
প্রভুর শ্রীদেহ গড়া কোন্ উপাদানে ।
জানি না জগতে কে সে যদি কেহ জানে ॥ ৪২ ॥
গোটা ছয় মাস কাল নাই নিদ্রাহার ।
মুখদ্যুতি পূর্ববৎ একই প্রকার ॥ ৪৩ ॥
দেব-মানবের ধারা একই আধারে ।
কখন না দেখি
শুনি সৃষ্টির ভিতরে ॥ ৪৪ ॥
প্রভুদেব না হইলে পরম ঈশ্বর ।
কেমনে সহিত এত কষ্ট
কলেবর ॥ ৪৫ ॥
দ্বাদশ-বৎসর ব্যাপী কঠোর সাধন ।
সর্বশক্তিমানত্বের ইহাই লক্ষণ ॥ ৪৬ ॥
যে হও সে হও প্রভু বিচারে কি কাজ ।
অভয় চরণ যেন জাগে হৃদিমাঝ ॥ ৪৭ ॥
শ্রীপদসেবায় দীনে কর অধিকারী ।
দীনবন্ধু দীননাথ করুণ কাণ্ডারী ॥ ৪৮ ॥
অতঃপর কি হইল শুনহ ঘটনা ।
দারুণ পেটের পীড়া দারুণ যন্ত্রণা ॥ ৪৯ ॥
মথুর ধনাঢ্য ভক্ত ব্যয় অকাতরে ।
আনায় প্রসিদ্ধ বৈদ্য চিকিৎসার তরে ॥ ৫০ ॥
কিছুই না বুঝা যায় গোসাঞির খেলা ।
এসময়ে বৈদান্তিক সাধুদের মেলা ॥ ৫১ ॥
কে জানে কোথায় ছিল এবে শ্রীগোচরে ।
আবাস মন্দির-মধ্যে আদতে না ধরে ॥ ৫২ ॥
সকলে বেদান্তমার্গী জ্ঞানীর আচার ।
অস্তি ভাতি প্রীতি করে ব্রহ্মের বিচার ॥ ৫৩ ॥
যেখানে বুঝিতে নারে দ্বন্দ্ব লাগে তায় ।
মৃদু মৃদু হাসে প্রভু বসিয়া খট্টায় ॥ ৫৪ ॥
সরল ভাবায় পরে দেন বুঝাইয়ে ।
সাধুগণে জুড়ে কর মহা তুষ্ট হ'য়ে ॥ ৫৫ ॥
এদিকে পেটের পীড়া না হয় আরাম ।
চলিছে ঔষধ-পথ্য পারে না ব্যারাম ॥ ৫৬ ॥
হৃদয়ে মথুরে তবে যুক্তি কৈল শেষে ।
প্রভুকে পাঠায়ে দিতে আপনার দেশে ॥ ৫৭ ॥
দেশের মিঠানি জল-বায়ু হিতকরী ।
পেটের পীড়ার পক্ষে মহৌষধ ভারি ॥ ৫৮ ॥
এত বলি শ্রীমধুর ভক্তচূড়ামণি ।
ভক্তিমতী জগদম্বা মথুর-গৃহিণী ॥ ৫৯ ॥
জানিয়া প্রভুর ঘর শিবের সংসার ।
কিছুই নাহিক থাকে সঞ্চয়-ভাণ্ডার ॥ ৬০ ॥
বস্তাদরে নানা দ্রব্য যাহা প্রয়োজন ।
সলিতা-খড়িকা আদি সব আয়োজন ॥ ৬১ ॥
দু'তিন মাসের মত প্রচুর প্রচুর ।
সহৃদয় দেশে যাত্রা হৈল শ্রীপ্রভুর ॥ ৬২ ॥
ভগবৎ-পদলুব্ধা ত্যাগী সন্ন্যাসিনী ।
মায়ের মতন সঙ্গে চলিল ব্রাহ্মণী ॥ ৬৩ ॥
সর্বাগ্রে প্রেরণ পত্র হইয়াছে ঘরে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন কামারপুকুরে ॥ ৬৪ ॥
নিবিড় আঁধার নিশা হইলে বিগত ।
প্রত্যুষ পূরবভাগে হ'য়ে বিরজিত ॥ ৬৫ ॥
তপনাগমন-বার্তা
করিলে ঘোষণা ।
বিহঙ্গমগণে গায় কূজন-বন্দনা ॥ ৬৬ ॥
তেন প্রভুর আগমন-সুসংবাদ পেয়ে ।
দেশে যত গ্রামবাসী পুরুষ কি মেয়ে ॥ ৬৭ ॥
পূর্বস্মৃতি জাগাইয়ে প্রীতি-মমতায় ।
গদায়ের গুণগীতি দিবারাতি গায় ॥ ৬৮ ॥
বিশেষতঃ কৃপাপ্রাপ্ত ভক্ত স্ত্রীলোকেরা ।
যথাকালে আগে গিয়া পথে করে ঘেরা ॥ ৬৯ ॥
পাছে কেহ অন্তে দেখে সংগোপনে চলে ।
মিষ্টিসহ ফুলমালা লুকায়ে আঁচলে ॥ ৭০ ॥
প্রভুদেবে তারা কিবা বুঝে বুঝ মন ।
মিষ্টি-মাখা চিড়া-দই সুমিষ্ট যেমন ॥ ৭১ ॥
আন্তরিক ভালবাসা আন্তরিক টান ।
আন্তরিক স্নেহ-প্রীতি প্রাণের সমান ॥ ৭২ ॥
বাটীস্থ হইলে প্রভু কাতারে কাতারে ।
আসে যত গ্রামবাসী দেখিবার তরে ॥ ৭৩ ॥
শ্রীপ্রভু স্বদেশ ছাড়া আট বর্ষ প্রায় ।
স্নেহ-মমতার চক্ষে যুগান্ত দেখায় ॥ ৭৪ ॥
গঙ্গাকূলে শ্রীপ্রভুর এ আট বৎসরে ।
গিয়াছে অশেষ কষ্ট সাধন-সমরে ॥ ৭৫ ॥
কাহিনী শুনিয়া বুঝেছিলেন সবাই ।
গদাইয়ে এখন নাই তাঁদের গদাই ॥ ৭৬ ॥
বিকৃতমস্তিষ্ক মত পাগলের প্রায় ।
কভু হাসে কভু কাঁদে কভু নাচে গায় ॥ ৭৭ ॥
কখন বা আল্লা বলে কখন বা হরি ।
কভু ক্ষীণবল কভু বিক্রমে কেশরী ॥ ৭৮ ॥
কখন পিশাচ-ভুলা কদর্য আচার ।
কখন উলঙ্গ দেহ বাল্যব্যবহার ॥ ৭৯ ॥
সত্য কিনা মিথ্যা তত্ত্ব প্রত্যক্ষ করিয়ে ।
চক্ষু ও কর্ণের দ্বন্দ্ব যাবে মিটাইয়ে ॥ ৮০ ॥
আনন্দপূর্ণিতাস্তরে করে নিরীক্ষণ ।
পূর্বের গদাই যেন এখনও তেমন ॥ ৮১ ॥
সেই সে মোহন মূর্তি সেই সরলতা ।
সেই মিষ্ট সম্ভাষণ নাশে হৃদি-ব্যথা ॥ ৮২ ॥
সেই হাসি সেই খুশী চন্দ্রিম-বদন ।
সেই সে সুমিষ্ট দৃষ্টি মোহে যাহে মন ॥ ৮৩ ॥
সেই রঙ্গ-পরিহাস সেই সে উদ্দাম ।
সেই ভক্তি ভাবোচ্ছ্বাসে ঈশ্বরের নাম ॥ ৮৪ ॥
ছোট-বড়-নির্বিশেষে মধুর সম্ভাষ ।
কে কোথার কে কেমন কুশল তল্লাস ॥ ৮৫ ॥
দুঃখে সুখে পূর্ববৎ সহ অনুভূতি ।
পুরাণের মত কথা পুরাণ ভারতী ॥ ৮৬ ॥
উভয় পক্ষের স্মৃতি দেয় যোগাইয়ে ।
আনন্দের নাহি ওর বলিয়ে শুনিয়ে ॥ ৮৭ ॥
অতীত কালের যত কাহিনী-লহর ।
অধিক করিল ঘন প্রেম পরস্পর ॥ ৮৮ ॥
মধুর সম্বন্ধ কিবা প্রভুর এখানে ।
সদাক্বষ্ট পরস্পর মধুর বন্ধনে ॥ ৮৯ ॥
সাংসারিক প্রসঙ্গেও নানা উপদেশ ।
যাহাতে তাদের হয় মঙ্গল অশেষ ॥ ৯০ ॥
ভক্তিমতীদের মধ্যে অনেক উন্নতা ।
বুঝিতে সক্ষম আধ্যাত্মিক তত্ত্বকথা ॥ ৯১ ॥
অবসরমত আসে কুলবতীগণে ।
সঙ্গে কিছু ভোজ্য দ্রব্য গোপন বসনে ॥ ৯২ ॥
প্রভু-দরশন সাধ এত বলবতী ।
দুবেলা ঘরশন তাহে হোক যত ক্ষতি ॥ ৯৩ ॥
কিবা মোহনিয়া প্রভু মোহের পাথার ।
বারেক দেখিলে পরে রক্ষা নাহি আর ॥ ৯৪ ॥
নানা ছাঁদে নানা ভাবে করে কত রঙ্গ ।
রূপগুণবাক্যাদির মোহন তরঙ্গ ॥ ৯৫ ॥
কাহারও নিস্তার নাই পড়িলে তাহায় ।
মোহিয়া টানিয়া ল'য়ে পাথারে ডুবায় ॥ ৯৬ ॥
পল্লীগ্রামে সমাজের নিগুঢ় বন্ধন ।
বন্ধ যাহে কোমলাঙ্গী কুলবতীগণ ॥ ৯৭ ॥
তৃণের মতন তাহা ছেদিয়ে ছিড়িয়ে ।
প্রভু-দরশনে আসে সংসার ফেলিয়ে ॥ ৯৮ ॥
প্রভু দরশনে একি দেখি পরমাদ ।
যত দেখে তত বাড়ে দেখিবারে সাধ ॥ ৯৯ ॥
এ সাধের অবসাদ নহে কোন কালে ।
দরশন-ফল হয় দরশন-ফলে ॥ ১০০ ॥
দিনে রেতে অবিরত দ্বার থাকে খোলা ।
দরিদ্রব্রাহ্মণাবাসে সদানন্দ মেলা ॥ ১০১ ॥
আনন্দের উপরে আনন্দ বাড়াবাড়ি ।
যেইখানে শ্রীপ্রভুর শ্বশুরের বাড়ি ॥ ১০২ ॥
ইতিপূর্বে হয়েছিল সংবাদ প্রেরণ ।
স্বদেশেতে শ্রীপ্রভুর শুভ আগমন ॥ ১০৩ ॥
শুভদিন নির্ধারিয়া আত্মীয়েরা পরে ।
শ্রীশ্রীমাকে আনাইলা কামারপুকুরে ॥ ১০৪ ॥
চতুর্দশ-বয়ঃ পল্লীবালিকা যেমন ।
অস্ফুট অঙ্গের মধ্যে যুবতী-লক্ষণ ॥ ১০৫ ॥
জৈববুদ্ধি-বিরহিতা সরলারূপিণী ।
প্রভুর চরণপদ্ম-সেবা-বিলাসিনী ॥ ১০৬ ॥
মন প্রাণ দেহ গত প্রভুর চরণে ।
প্রভু-পদে মাত্র মন অন্য নাহি মনে ॥ ১০৭ ॥
একান্ত শরণাগত করি বিলোকন ।
সাদরে শিক্ষার্থিভাবে করিলা গ্রহণ ॥ ১০৮ ॥
নানাবিধ যেন শিক্ষা জীবন-গঠনে ।
আধ্যাত্মিকে সমুন্নতা হইবে কেমনে ॥ ১০৯ ॥
নিঃস্বার্থ আদর যত্ন দিব্য-সঙ্গ-বলে ।
অন্তরে সন্তোষ মা'র বাড়ে পলে পলে ॥ ১১০ ॥
অল্পকাল-মধ্যে মাতা কৈল অনুভব ।
হৃদয়-আধারে শান্তি-সিন্ধুর উদ্ভব ॥ ১১১ ॥
মায়ের শিক্ষায় যত্ন দেখিয়া ব্রাহ্মণী ।
অন্তরে অন্তরে হৈল অতি বিষাদিনী ॥ ১১২ ॥
মার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনর্থ সম্ভবে ।
প্রভুর অথণ্ড ব্রহ্মচর্য নষ্ট হবে ॥ ১১৩ ॥
এত ভাবি সংগোপনে কহিলা প্রভুকে ।
উদাসীন প্রভু যেন কে কহে কাহাকে ॥ ১১৪ ॥
আপনার ভাবে প্রভু আপনি মগন ।
শ্রীশ্রীমার শিক্ষাদান কর্তব্য-পালন ॥ ১১৫ ॥
বড়ই হইল ক্ষুন্ন ব্রাহ্মণী অন্তরে ।
গম্ভীর গম্ভীর ভাব অভিমান-ভরে ॥ ১১৬ ॥
প্রথমতঃ ক্ষুন্ন পরে হৈল অভিমানী ।
পরিশেষে অহংকারে গর্বিতা ব্রাহ্মণী ॥ ১১৭ ॥
অহংকারে বুদ্ধিভ্রংশ শাস্ত্রের নির্ণীত ।
ছিলেন সাধিকা এবে কোথা উপনীত ॥ ১১৮ ॥
ইষ্টগোষ্ঠিবর্গে করে অযথা ব্যাভার ।
কার্কশ্যপ্রয়োগ প্রভু কভু তিরস্কার ॥ ১১৯ ॥
ঠাকুরের পরিবারে ঠাকুরের ধারা ।
শিষ্ট শান্ত সুবিনয়ী সুশীলা-আচারা ॥ ১২০ ॥
ব্রাহ্মণীকে প্রতিবাদে কিছু নাহি কয় ।
গুরুজন-জ্ঞানে তার তিরস্কার সয় ॥ ১২১ ॥
মাতাও সশ্রদ্ধাযুক্ত সতত হেথায় ।
আপনার পুজনীয়া শাশুড়ীর ন্যায় ॥ ১২২ ॥
প্রশ্রয় পাইয়া তবে সাধিকা এখন ।
প্রভুতে অবজ্ঞা-ভাব করে প্রদর্শন ॥ ১২৩ ॥
জটিল তত্ত্বের উত্থাপিত মীমাংসায় ।
প্রভুর নিকটে কেহ যেতে যদি চায় ॥ ১২৪ ॥
সমুন্নতা ফণা যেন ক্রুদ্ধ বিষধরী ।
নয়ন বিস্তারি কয় গরজন করি ॥ ১২৫ ॥
কিবা জানে রামকৃষ্ণ তত্ত্বের সন্ধান ।
আমি তো দিয়াছি ওগো তার চক্ষুদান ॥ ১২৬ ॥
কি হইল সাধিকার অবস্থা এখন ।
সশঙ্কিত চিত-বুদ্ধি জড়প্রায় মন ॥ ১২৭ ॥
তান্ত্রিক সাধনে যেবা প্রভুর সহায়া ।
চতুর্বেদ মুর্তিমতী নিজে যোগমায়া ॥ ১২৮ ॥
ছায়াসম শ্রীপ্রভুর কাছে অবিরত ।
প্রভু গৌরাঙ্গাবতার যদ্দ্বারা ঘোষিত ॥ ১২৯ ॥
স্তম্ভিত বিস্মিত যে কৈল ধীরগণে ।
বচনে কেবল নয় শাস্ত্রীয় প্রমাণে ॥ ১৩০ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে মহাভাব তাহার লক্ষণ ।
স্বচক্ষে দেখিয়া অন্তে কৈল প্রদর্শন ॥ ১৩১ ॥
মধুর-সাধনে অঙ্গ-দাহ শ্রীপ্রভুর ।
শাস্ত্রীয় উপায়ে যিনি করিলেন দূর ॥ ১৩২ ॥
বাৎসল্যে উচ্ছ্বাসান্তরে মাগিয়া ভিক্ষায় ।
নবনী মাখন আনি প্রভুরে খাওয়ায় ॥ ১৩৩ ॥
যোগজ দারুণ ক্ষুধা প্রভুর যখন ।
অদ্ভূত উপায়ে যেবা কৈল নিবারণ ॥ ১৩৪ ॥
তাহার অবস্থা হেন দেখে ভয় পায় ।
জীবশিক্ষা-হেতু মাত্র প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১৩৫ ॥
অভিমান অহংকারে ঘটায় উৎপাত ।
গগনবিভেদী গিরিবর ভূমিসাৎ ॥ ১৩৬ ॥
সমুন্নত সাধকেরও নাই অব্যাহতি ।
ক্ষুরের ধারের জায় ধরমের গতি ॥ ১৩৭ ॥
পতিতপাবন প্রভু মোরে কর দয়া ।
রক্ষা কর দীন দাসে দিয়ে পদছায়া ॥ ১৩৮ ॥
দীনবন্ধু দয়াসিন্ধু জীবহিতকারী ।
ভয়ঙ্কর
ভবার্ণবে করুণ কাণ্ডারী ॥ ১৩৯ ॥
অতঃপর হৈল কিবা শুনহ আখ্যান ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা অমৃত সমান ॥ ১৪০ ॥
ব্রাহ্মণীর ব্যবহারে এখানে হৃদয় ।
প্রভুর ইচ্ছায় হৈল ক্রুদ্ধ অতিশয় ॥ ১৪১ ॥
মনের মালিন্য বৃদ্ধি পায় দিনে দিনে ।
প্রকাশ না হয় গুমুয়িরা রহে মনে ॥ ১৪২ ॥
বর্ষণের আগে যেন প্রকৃতির ধারা ।
নীরব নীরব ভাব সুস্থিরা গম্ভীরা ॥ ১৪৩ ॥
এখানে তেমতি ঠিক ব্রাহ্মাণী হৃদয়ে ।
নাহি ঐক্য নাহি বাক্য ক্রোধে ভারী দুয়ে ॥ ১৪৪ ॥
ভক্তবর শ্রীনিবাস শাঁখারীর জাতি ।
ভগবৎ-ভক্ত তেঁহ প্রভুপথে মতি ॥ ১৪৫ ॥
প্রভুপদে মতি-রতি ইষ্টের সমান ।
বাল্যখণ্ডে গাইয়াছি যতেক আখ্যান ॥ ১৪৫ ॥
দিনেকে ব্রাহ্মণাবাসে প্রভুর গোচর ।
উপনীত হৈল চিনু ভকত প্রবর ॥ ১৪৬ ॥
আজি তার মনে মনে উগ্রতর সাধ ।
পাইবে ঠাকুর রঘুবীরের প্রসাদ ॥ ১৪৭ ॥
প্রকাশ করিয়া কথা কহিল এখন ।
ইষ্টগোষ্ঠী সকলেই হরষিত মন ॥ ১৪৮ ॥
একে ভক্ত তাহে পুনঃ বৃদ্ধক বয়েস ।
তদুপরি প্রভুপদে পিরীতি অশেষ ॥ ১৪৯ ॥
ব্রাহ্মণ বাটীতে নাই আনন্দের ওর ।
ঈশ্বরীয় লীলারসে বিভোর বিভোর ॥ ১৫০ ॥
সদানন্দ প্রভু তথা সবার অগ্রণী ।
তত্ত্বরসামোদী সঙ্গে আছেন ব্রাহ্মণী ॥ ১৫১ ॥
ভক্তসঙ্গে শ্রীপ্রভুর আনন্দের হাট ।
না দেলিলে বুঝিবার নাহি মিলে বাট ॥ ১৫২ ॥
মরি কিবা শ্রীপ্রভুর মোহন মুরতি ।
মৃদুমন্দ হাস্য সহ শ্রীবদন-দ্যুতি ॥ ১৫৩ ॥
ঈষৎ বঙ্কিম আঁখি হিল্লোলে তাহার ।
ঈষৎ রক্তিমাধর কিবা চমৎকার ॥ ১৫৪ ॥
পীযূষ্পূরিত যাহে ভাতে পল্লীবুলি ।
প্রফুল্ল করিতে তত্ত্ব কুসুমের কলি ॥ ১৫৫ ॥
ভক্ত-অলি মত্ততর তার পরিমলে ।
আনন্দে বিভোর নিজ সত্ত্বা যায় ভুলে ॥ ১৫৬ ॥
তত্ত্বরস-মধু পান করে নিরন্তর ।
নীরব নীরব নাহি গুন্ স্বর ॥ ১৫৭ ॥
প্রভুর হাটের কথা নহে বর্ণিবার ।
যে যেখেছে ডুবেছে সে কে বলিবে আর ॥ ১৫৮ ॥
এখানেতে হইয়াছে ভোজনের ঠাঁই ।
সঙ্গে ভক্ত শ্রীনিবাস বসিলা গোসাঞি ॥ ১৫৯ ॥
প্রসাদের মর্মজ্ঞাত চিন্তু ভক্তবর ।
বাসনা মিটায়ে পূর্ণ করেন উদর ॥ ১৬০ ॥
পরে ঠাঁই পরিষ্কারে চিনুর উদ্দাম ।
সাধিকা ব্রাহ্মণী তাঁয় করে নিবারণ ॥ ১৬১ ॥
বলে
আমি নিজে হাতে উঠাইব পাতা ।
ভক্তীমতী জানে না তো পাড়াগেঁয়ে প্রথা ॥ ১৬২ ॥
শূদ্রোচ্ছিষ্ট মুক্ত করা ব্রাহ্মণ হইয়ে ।
উচিত না হয় যায় সমাজে বাধিয়ে ॥ ১৬৩ ॥
ভক্তি ভক্ত মতে পথে নাহি কোন ক্ষতি ।
বরঞ্চ তাহার করে বিশেষ উন্নতি ॥ ১৬৪ ॥
ব্রাহ্মণীর এক বোল আমি উঠাইব ।
হৃদয় বলেন তাহা করিতে না দিব ॥ ১৬৫ ॥
কতই বুঝায় তবু ব্রাহ্মণী না বুঝে ।
ত্যাগী সন্ন্যাসিনী কয় আপনার তেজে ॥ ১৬৬ ॥
তবে না কুপিত হৃদু কহে ব্রাহ্মণীরে ।
তা'হলে দিব না তোরে থাকিবারে ঘরে ॥ ১৬৭ ॥
সাধিকা উত্তর কৈল না দাও না দিবে ।
মনসা তখন শীতলার কাছে শোবে ॥ ১৬৮ ॥
বাটীস্থ অন্যান্য সবে মধ্যস্থ হইয়ে ।
গণ্ডগোল উভয়ের দিল মিটাইয়ে ॥ ১৬৯ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা শ্রবণমঙ্গল ।
ঝরণা কোথায় দেখ কোথা ঝরে জল ॥ ১৭০ ॥
শ্রীপ্রভু মঙ্গলময় তাঁহার নিকটে ।
মঙ্গল ব্যতীত নাহি অমঙ্গল ঘটে ॥ ১৭১ ॥
ব্রাহ্মণীরে অহংকারে করি অহৎকৃত ।
কেমন মঙ্গলোন্নতি করিল সাধিত ॥ ১৭২ ॥
শুন কহি শ্রীপ্রভুর মহিমা অপার ।
মঙ্গলনিদান কথা অতি চমৎকার ॥ ১৭৩ ॥
শ্রীশ্রীমায়ে শিক্ষাদানে প্রভু পরমেশ ।
দেখিয়া ব্রাহ্মণী কৈল নিষেধোপদেশ ॥ ১৭৪ ॥
কর্তব্যপালনে ত্রুটি হইবে বলিয়ে ।
ব্রাহ্মণীর কথা প্রভু দিলেন ঠেলিয়ে ॥ ১৭৫ ॥
মনঃক্ষুন্ন সাধিকার আদিম কারণ ।
যাহাতে জন্মিল ঝরণার প্রস্রবণ ॥ ১৭৬ ॥
ধীর মন্দগতি আগে তাহে অভিমান ।
মধ্যপথে অহংকার স্রোত বহমান ॥ ১৭৭ ॥
তরঙ্গ তুফান কিবা হৈল পরিশেষে ।
ভীষণ অবজ্ঞা-ভাব প্রভু পরমেশে ॥ ১৭৮ ॥
উজানে তুলিয়া পরে আনিলা ভাটায় ।
লীলাকার্য শ্রীপ্রভুর পূর্ণ মহিমায় ॥ ১৭৯ ॥
উত্তেজনা হইলেই আছে অবসাদ ।
সাধিকা বুঝিল তার যত অপরাধ ॥ ১৮০ ॥
অহংকারে করায়েছে তারে কিবা কাজ ।
বলিতে শুনিতে কিবা উভয়েই লাজ ॥ ১৮১ ॥
সাধিকা লজ্জিতা অতি অনুতপ্ত মনে ।
কাটায় কয়েক দিন প্রভুর সদনে ॥ ১৮২ ॥
আপনি শ্রীভগবান গৌরাঙ্গাবতার ।
ভিতরে শ্রীকৃষ্ণ বাহ্যে ভাব শ্রীরাধার ॥ ১৮৩ ॥
সেই সে ঠাকুর এবে রামকৃষ্ণ নামে ।
মূর্তিমান নরলোকে লীলার কারণে ॥ ১৮৪ ॥
স্বরূপ প্রকৃত রূপ করি দরশন ।
ভক্তিমতী সাধিকার উদিল চেতন ॥ ১৮৫ ॥
আহরণ নিজ হস্তে কুসুমসম্ভার ।
গাঁথিল মমের মত মনোহর হার ॥ ১৮৬ ॥
চর্চিত করিয়া তায় সুরভি চন্দনে ।
পরাইল প্রভুদেবে শ্রীগৌরাঙ্গ-জ্ঞানে ॥ ১৮৭ ॥
করজোড়ে অপরাধ মার্জনার তরে ।
নিবেদন বারংবার করে শ্রীগোচরে ॥ ১৮৮ ॥
বিদার লইয়া তবে অভয় চরণে ।
চলিলেন সন্ন্যাসিনী কাশী তীর্থধামে ॥ ১৮৯ ॥
ঠাকুরের সন্নিধানে জননীর ন্যায় ।
ছয়টি বৎসর গোটা কাটিয়া হেথায় ॥ ১৯০ ॥
সায় করি অভিনয়ে পালা আপনার ।
তৃণের সমান স্রোতে ভাসিল আবার ॥ ১৯১ ॥
দেখি নাই সাধিকারে নাহি পরিচয় ।
আত্মীয় স্বজন কত মনে মনে হয় ॥ ১৯২ ॥
বিদেশ-সমনে যাত্রা করিলে স্বজন ।
ব্যাকুল আকুলে যেন কাঁদে প্রাণ-মন ॥ ১৯৩ ॥
কাশীতীর্থ-প্রয়াগেতে এই সাধিকার ।
অন্তরের মাঝে যেন তীব্র হাহাকার ॥ ১৯৪ ॥
জানি না সম্বন্ধ কিবা ব্রাহ্মণীর সনে ।
চরণের রজ ভিক্ষা মাগে এ অধমে ॥ ১৯৫ ॥
দেশের মিঠানি জলে ঠাকুর এখন ।
সুস্থকায় সবলাঙ্গ পূর্বের মতন ॥ ১৯৬ ॥
বিভিন্নতা একস্থলে দেখিবারে পাই ।
পূর্বের লাবণ্যকান্তি দেহে কিন্তু নাই ॥ ১৯৭ ॥
গা ফেটে পড়িত রূপ সোনার বরণ ।
বিশেষ বিলয় তার মলিন এখন ॥ ১৯৮ ॥
বহু কাণ্ড বাকি আছে লীলা-অভিনয়ে ।
দক্ষিণশহরে ত্বরা আইলা
ফিরিয়ে ॥ ১৯৯ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা মঙ্গলনিধান ।
ভাগ্যবানে কয় আর শুনে ভাগ্যবান ॥ ২০০ ॥
মাতোয়ারা প্রভু যবে সাধনার চোটে ।
প্রভুর প্রমত্ত-কথা স্বদেশেতে রটে ॥ ২০১ ॥
শ্রীপ্রভুর শ্বশুর শাশুড়ী শুনি কথা ।
মেয়ে পানে চেয়ে পান নিদারুণ ব্যথা ॥ ২০২ ॥
হৃদয়ের সঙ্গে দেশে দেখা হ'লে পরে ।
ঘটকের ভাই হৃদু তাই হেতু ধ'রে ॥ ২০৩ ॥
হেন বরে ঘটাইয়া কি মিটালে সাধ ।
এত বলি স্ত্রী-পুরুষে করেন বিবাদ ॥ ২০৪ ॥
রাখ প্রভু রাখ মাতা কিঙ্করজনাকে ।
যেন নহে অপরাধ লীলা-কথা লিখে ॥ ২০৫ ॥
ততখানি কয় যতখানি বোধ যার ।
দোষ নাই কে চিনিবে গুপ্ত অবতার ॥ ২০৬ ॥
চিরকাল দেখ মন মানিক রতন ।
দুর্লভ দুর্মূল্য যত তত সঙ্গোপন ॥ ২০৭ ॥
পাতালের কাছে নীচে মাটির ভিতর ।
অগাধ জলধিতল রতন-আকর ॥ ২০৮ ॥
সেইমত সার রত্ন দয়াল প্রভুকে ।
মহামায়া মহা মায়া-আবরণে ঢাকে ॥ ২০৯ ॥
আখির সম্মুখে তবু খুঁ'জিয়া না পাই ।
হাতের কনুই হাত বাড়াইলে নাই ॥ ২১০ ॥
পরমেশ-শক্তি মায়া ঈশের সমান ।
তাঁহারে রাখিলে বাদ কি আছে কল্যাণ ॥ ২১১ ॥
ঈশ্বর-দর্শন তার নহে কোন কালে ।
মহামায়া পরাশক্তি দ্বার না ছাড়িলে ॥ ২১২ ॥
সেই শক্তি মূর্তিমতী ব্রাহ্মণের ঘরে ।
জগৎ-জননী মাতা বালিকা-আকারে ॥ ২১৩ ॥
নাহি যেন বাপ মায় প্রবেশের দ্বার ।
রামকৃষ্ণ প্রভু এত শুপ্ত অবতার ॥ ২১৪ ॥
চাঁদের কিরণ যেন মেঘ হ'লে দূর ।
ব্যাধি-অন্তে কান্তি তেন উঠিল প্রভুর ॥ ২১৫ ॥
যেখিয়া হৃদুর বড় প্রফুল্লিত মন ।
প্রভুরে বলিল যাব এবারে ভবন ॥ ২১৬ ॥
শিয়ড় গ্রামেতে হয় হৃদয়ের ঘর ।
সেখান হইতে অষ্ট মাইল অন্তর ॥ ২১৭ ॥
জয়রামবাটী গ্রাম শিয়ড়ের কোলে ।
প্রভুর শ্বশুরবাড়ি হয় সেই স্থলে ॥ ২১৮ ॥
লইয়া প্রভুরে সাথে হৃদু যেতে চায় ।
প্রকাশ করিল কথা কথায় কথায় ॥ ২১৯ ॥
সার দিলা প্রভু তায় হরিষ অন্তর ।
বড়ই আনন্দ যেতে শ্বশুরের ঘর ॥ ২২০ ॥
এত আনন্দিত কেন প্রভু নারায়ণ ।
ভিতরে ইহার আছে বিস্তর কারণ ॥ ২২১ ॥
যে ভাবে আনন্দ উঠে মানুষের মনে ।
যাইবার আড়ম্বরে শ্বশুর-ভবনে ॥ ২২২ ॥
সে ভাবের গন্ধ নাই প্রভুর এ ভাবে ।
ধরিলে বালক-ভাব বুঝা যায় তবে ॥ ২২৩ ॥
বালকস্বভাব প্রভু সহজ অন্তর ।
দেখেন সকলে যায় শ্বশুরের ঘর ॥ ২২৪ ॥
নানাবিধ বেশভূষা আনন্দ অপার ।
খুশীর বিষয় ইহা নহে কিছু আর ॥ ২২৫ ॥
বাসনাবর্জিত প্রভু রিপুগণ মরা ।
ঘৃণা-লজ্জা-ভয়শূন্য বালকের পারা ॥ ২২৬ ॥
প্রভুর উপমা দিতে কি ধরে ধরণী ।
প্রভুর উপমা মাত্র প্রভুই আপুনি ॥ ২২৭ ॥
মেজ ভাই রামেশ্বর মহানন্দ মন ।
যোগাড় করিয়া দিলা যাহা প্রয়োজন ॥ ২২৮ ॥
গ্রামবাসী সবে খুশী শুনিয়া বারতা ।
রসভাষে হেসে হেসে কহে কত কথা ॥ ২২৯ ॥
উঠিল আনন্দরোল কামারপুকুরে ।
শুভদিন-নিরূপণ আসিবার তরে ॥ ২৩০ ॥
নির্ধারিত দিনে প্রাতে পুলকিত মন ।
প্রভুরে পরিতে দেয় সুন্দর বসন ॥ ২৩১ ॥
বহুবিধ মুল্যবান বসন প্রচুর ।
বস্তা বেঁধে দিয়াছেন ভকত মথুর ॥ ২৩২ ॥
লাল বারাণসী স্বর্ণ-জরি পাড় তায় ।
প্রভুর শ্রীঅঙ্গে হৃদু যতনে পরায় ॥ ২৩৩ ॥
সমান উড়না তাঁর স্কন্ধদেশে ঝুলে ।
নাগরিয়া লাল জুতা চরণযুগলে ॥ ২৩৪ ॥
ঝলমল অঙ্গকান্তি এমন রকম ।
স্বচ্ছ কাচে প্রতিবিম্ব চাঁদের কিরণ ॥ ২৩৫ ॥
ভুবনমোহন মূর্তি বেশ হেন তার ।
যে দেখেছে ধরি তাঁর চরণ মাথায় ॥ ২৩৬ ॥
বাহিরে আইলা প্রভু হৃদু সঙ্গে জুটে ।
দেখিবারে প্রতিবাসী দলে দলে ছুটে ॥ ২৩৭ ॥
কুলির দুধারে সবে দাঁড়াইল আসি ।
আবাল হইতে বুদ্ধ যত গ্রামবাসী ॥ ২৩৮ ॥
রূপরাশি জিনি শশী আঁখি ভরি দেখে ।
কোণের বহুড়ি কেহ ঘোমটা না রাখে ॥ ২৩৯ ॥
ডোমপাড়া সন্নিকটে যবে আগুসার ।
ডোমেরা তফাতে পথে কাতার কাতার ॥ ২৪০ ॥
অস্পর্শীয় ছোট জাতি হৃদে ভয় বাসে ।
শ্রীপ্রভুর সম্মুখেতে কি প্রকারে আসে ॥ ২৪১ ॥
দুঃখী দাসে শ্রীপ্রভুর দয়া অতিশয় ।
তাহা না হইলে কেন কবে দয়াময় ॥ ২৪২ ॥
দয়ার দ্রবিল হিয়া দয়ার সাগর ।
পালটিয়া ফিরিলেন আপনার ঘর ॥ ২৪৩ ॥
সজ্জাসহ গড়াগড়ি যেন ভূমিতলে ।
কর্দম হইল ধূলা নয়নের জলে ॥ ২৪৪ ॥
কাদায় ভরিল অঙ্গ সুন্দর বসন ।
প্রভুরামকৃষ্ণ-কথা অদ্ভুত কথন ॥ ২৪৫ ॥
পরদিন চুপে চুপে অতি প্রাতে উঠি ।
প্রভুরে লইয়া যায় জয়রামবাটী ॥ ২৪৬ ॥
আনন্দের ওর নাই প্রতিবাসিগণে ।
গদাই জামাই আসিছেন বার্তা শুনে ॥ ২৪৭ ॥
এগিয়া যাইয়া পথে যত নারীগণ ।
বারে বারে বন্দি আমি সবার চরণ ॥ ২৪৮ ॥
আনিলেন আলয়েতে প্রভু গুণমণি ।
পথে পথে জলধারা সহ শঙ্খধ্বনি ॥ ২৪৯ ॥
জামাই আনিতে নাই দেশে হেন রীতি ।
জলধারা শঙ্খধ্বনি অদ্ভুত ভারতী ॥ ২৫০ ॥
কি ভাবে করিল হেন রমণীর গণ ।
প্রভুরাগমন দিনে বিধান নূতন ॥ ২৫১ ॥
ভক্তির মূলক নহে মঙ্গল-আচার ।
প্রভুদেব ক্ষিপ্তপ্রায় জ্ঞান সবাকার ॥ ২৫২ ॥
নাহি রামকৃষ্ণ-ভক্তি কিছুই এখানে ।
বিষয়ী বিষয়ে মত্ত চাষা যত গ্রামে ॥ ২৫৩ ॥
রক্ষা কর কৃপাময়ী জগৎজননী ।
তুমি মা লেখাও পুঁথি তাই লিখি আমি ॥ ২৫৪ ॥
মা তোমার জন্মভূমি মহাতীর্থধাম ।
জড় কি চেতন তথা সকলে প্রণাম ॥ ২৫৫ ॥
ভাগ্যবান ভাগ্যবতী নরনারীগণ ।
হেলায় দুবেলা দেখে অভয়চরণ ॥ ২৫৬ ॥
নাহি রামকৃষ্ণভক্তি নাম নাহি লয় ।
এবা কিবা ভাব ভেবে হয়েছি বিস্ময় ॥ ২৫৭ ॥
বিশুষ্ক হৃদয়ভাব ভাব-দরশনে ।
কি খেলা বুঝায়ে দেহ সুমূর্খ সন্তানে ॥ ২৫৮ ॥
জগতের চাঁদা মামা তাহার কিরণ ।
সমভাবে সকলের উপর পতন ॥ ২৫৯ ॥
পূজ্য হেয় স্থানাস্থান বিচারবিহীনে ।
তেমতি আনন্দময় শ্রীপ্রভু যেখানে ॥ ২৬০ ॥
পূর্ণানন্দ নিজে প্রভু আনন্দ-আধার ।
যথায় উদর তথা আনন্দ-বাজার ॥ ২৬১ ॥
নারীগণে দরশনে রসভাষে তাঁর ।
প্রভু নাহি দেন কান কোনই কথায় ॥ ২৬২ ॥
মুখে শ্যামাগুণগান তালি দেয় কর ।
নৃত্য করে পদদ্বয় বড়ই সুন্দর ॥ ২৬৩ ॥
বরনমণ্ডলে শোভা অপরূপ খেলে ।
বুক বেয়ে কোঁচার কাপড় কাঁধে ঝুলে ॥ ২৬৪ ॥
দেখিয়া সকলে ভুলে কাছে যতক্ষণ ।
অন্তরালে গেলে বলে পাগল-লক্ষণ ॥ ২৬৫ ॥
প্রভুর শাশুড়ী হেথা দিদিঠাকুরানী ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দুখানি ॥ ২৬৬ ॥
ওগো বাছা বলি প্রভু সম্বোধনে তাঁয় ।
নানা রঙ্গ-পরিহাস কথায় কথায় ॥ ২৬৭ ॥
সলজ্জবদনা দিদি প্রভুর বোলে ।
কথা কহিতেন মুখ আধখানি খুলে ॥ ২৬৮ ॥
কোন কালে নাহি ছিল সম্পর্ক-বিচার ।
যেমন অল্পবয়ঃ শিশুর আচার ॥ ২৬৯ ॥
জনক জননী খুড়া সোদর মাতুল ।
শ্বশুর শাশুড়ী শালা সব সমতুল ॥ ২৭০ ॥
বাবু ভাই সম্পর্ক প্রভৃতি নাই জ্ঞান ।
আপন অপর কেবা সকলে সমান ॥ ২৭১ ॥
সংসার-সম্বন্ধে আছে যেরূপ ব্যাভার ।
ভিন্ন ভিন্ন জনে যেন বিভিন্ন আচার ॥ ২৭২ ॥
সে সব না ছিল কিছু শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ।
সর্বস্থানে সমরূপ
লজ্জা ভয় নাই ॥ ২৭৩ ॥
শ্রীপ্রভুর শাশুড়ীর সঙ্গে রঙ্গ হয় ।
শুনিয়াছি যেইরূপ শুন পরিচয় ॥ ২৭৫ ॥
প্রভু রামকৃষ্ণ-কথা বড়ই মজার ।
বাহিরে আছিল এক গাছ সজিনার ॥ ২৭৬ ॥
অবনত যত ডাল খোপা খোপা ফুলে ।
প্রসারিয়া শ্রীচরণ বসি তার তলে ॥ ২৭৭ ॥
মহানন্দে মুখে হাসি প্রভু ভগবান ।
শাশুড়ীরে লক্ষ্য করি গাইতেন গান ॥ ২৭৮ ॥
সজিনাতুল পাতার শাউড়ী তোর সনে ।
সজিনাফুলতলায় বসবো দুজনায়,
ফুরফুরে বাতাসে ফুল ঝোরে পোড়বে গায়,
আবার সজিনাফুলের খোপা ভেঙ্গে
পরায়ে দিব কানে ॥
হাসি হাসি দিদি আই বলিতেন তাঁরে ।
কে কোথা এমন কথা কহে শাশুড়ীরে ॥ ২৭৯ ॥
বলিতে কি আছে বাপ এখন বচন ।
আমি তো শাশুড়ী হই মায়ের মতন ॥ ২৮০ ॥
উত্তর-বচনেতে প্রভু বলিতেন তাঁয় ।
শাশুড়ী বলিয়া ছাপা আছে কি পাছায় ॥ ২৮১ ॥
বসনে চাকিয়া মুখ ছুটে দিদি আই ।
পাছু গাছু গীত গান প্রেমিক জামাই ॥ ২৮২ ॥
শাশুড়ী জামায়ে দেখ সম্পর্ক কেমন ।
বাহ্যে এক ভিতরে কি আছে সংগোপন ॥ ২৮৩ ॥
শ্রীপ্রভুর শাশুড়ীর ভাব পূর্বেকার ।
দিনে লয় হয় স্নেহের সঞ্চার ॥ ২৮৪ ॥
একদিন একত্র তথায় কত নারী ।
সবাকার পদরেণু মস্তকেতে ধরি ॥ ২৮৫ ॥
প্রভুদেব ল'য়ে হাতে কুসুম-চন্দন ।
সবার চরণতলে করেন অর্পণ ॥ ২৮৬ ॥
নারীগণ ত্রস্তমন শশব্যস্ত-প্রায় ।
পলায়ন করে মুখ ঢাকিয়া লজ্জায় ॥ ২৮৭ ॥
দেখি প্রভু বলিতেন সবে সম্বোধিয়ে ।
শ্যামার অৎশেতে জন্ম যত সব মেয়ে ॥ ২৮৮ ॥
মেয়ে-রূপে মহামায়া রূপে অগণন ।
তাই সমর্পিণু পদে কুসুম-চন্দন ॥ ২৮৯ ॥
পাড়াগেঁয়ে মোটা লোক বুঝিতে না পারে ।
অন্তরালে প্রভু খেপা বলাবলি করে ॥ ২৯০ ॥
আর দিন মনসার পূজা-আয়োজন ।
নৈবেদ্য সাজায়ে রাখে রমণীর গণ ॥ ২৯১ ॥
গাইতে গাইতে প্রভু শ্যামাগুণগীত ।
ভাবেতে বিভোর চিত তথা উপস্থিত ॥ ২৯২ ॥
দেখিয়া নৈবেদ্য থালে প্রভুদেব কন ।
নৈবেদ্য খাইতে কেন হইতেছে মন ॥ ২৯৩ ॥
খাও তবে নারীগণে কহিল তাঁহায় ।
অমনি বসিলা প্রভু নৈবেদ্য-সেবায় ॥ ২৯৪ ॥
ভাবাবেশে খাইতে লাগিলা গুণমণি ।
অনিমিখ আঁখি দেখে পাড়ার রমণী ॥ ২৯৫ ॥
অন্ত দিন প্রভুদেব শ্বশুরের ঘরে ।
ভোজন-সময় তাঁর ভোজনের তরে ॥ ২৯৬ ॥
করি ঠাঁই ডাকিয়া আনিল একজন ।
শুন কি হইল পরে অপূর্ব কখন ॥ ২৯৭ ॥
ডাকামাত্র প্রভুদেব প্রবেশিয়া ঘর ।
উপবিষ্ট হইলেন আসন উপর ॥ ২৯৮ ॥
শালী-সম্পর্কীয় এক হেঁশেলেতে যায় ।
অন্নব্যঞ্জনাদি ভোজ্য সাজাতে থালায় ॥ ২৯৯ ॥
ইতিমধ্যে শ্রীঅঙ্গেতে দিগম্বরাবেশ ।
উলঙ্গ ঘরের এক কোণে পরমেশ ॥ ৩০০ ॥
অদুরে পড়েছে খসি কটির বসন ।
দাঁড়ায়ে আছেন নাহি বাহ্যিক চেতন ॥ ৩০১ ॥
হেনকালে হাতে থালা শালী ঘরে যায় ।
ব্যাপার বেখিয়া ভয়ে ছুটিয়া পালায় ॥ ৩০২ ॥
বুঝ কি বিশেষ কাণ্ড শ্বশুর-ভবনে ।
উলঙ্গ দণ্ডায়মান আবাসের কোণে ॥ ৩০৩ ॥
লোকে জনে তত্ত্ব তাঁর কিছু বুঝে নাই ।
একবাক্যে কয় সবে উন্মত্ত জামাই ॥ ৩০৪ ॥
কোন না কারণে তথা হরি-কথা হ'লে ।
অমনি সমাধি হয় বাহ্য যায় চ'লে ॥ ৩০৫ ॥
পাড়াগেঁয়ে চাষা সবে মোটা লোকজন ।
চাষ করে থাকে ঘরে সামান্য জীবন ॥ ৩০৬ ॥
অবিদিত শাস্ত্র নাহি তত্ত্ব-আলাপনা ।
সমাধি ধিয়ান জপ কিছুই বুঝে না ॥ ৩০৭ ॥
প্রভুরে বুঝিবে কিসে তাহারা সকল ।
সে হেতু করিত তাঁর ভাবের নকল ॥ ৩০৮ ॥
অধিকাংশ দিন তাঁর কাটিত শিয়ড়ে ।
সেবক ভাগিনা হৃদু তাহাদের ঘরে ॥ ৩০৯ ॥
ধরাধামে ভাগ্যবান মুখুয্যে হৃদয় ।
সেবায় সন্তুষ্ট যার প্রভু অতিশয় ॥ ৩১০ ॥
জননী তাহার হেন করেছি শ্রবণ ।
চুলে মুছাইয়া দিত প্রভুর চরণ ॥ ৩১১ ॥
ছোট ভাই রাজারাম ছিল আজ্ঞাপর ।
তাই করে যবে যাহা প্রভুর রগড় ॥ ৩১২ ॥
প্রভুর যা প্রিয় খাদ্য জুটায় যতনে ।
যতই না হ'ক কষ্ট কিছু নাহি মানে ॥ ৩১৩ ॥
সাধনান্তে বলহীন পেটের পীড়ায় ।
পুষ্টিকর যাহা বুঝে ত্রিসন্ধ্যা যোগায় ॥ ৩১৪ ॥
জীবিত মাছের ঝোল প্রভুরে খাওয়াতে ।
ধরিত মাগুর কই নিদ্রা নাই রেতে ॥ ৩১৫ ॥
প্রাতে ল'য়ে কাঁধে জাল দূরান্তরে যায় ।
অবিরত নিয়োজিত প্রভুর সেবায় ॥ ৩১৬ ॥
পরম যতনে হৃদু প্রভুদেবে রাখে ।
খেতে শুতে পথে সদা প্রভু-সঙ্গে থাকে ॥ ৩১৭ ॥
হরিভক্ত তথা যথা এখানে সেখানে ।
আনিয়া করিত মেলা প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৩১৮ ॥
প্রভুভক্ত কিবা ভাবে কে আছে কোথায় ।
কি প্রকারে শ্রীপ্রভুর দরশন পায় ॥ ৩১৯ ॥
কি মনুষ্য কিবা পশু জীবজন্তগণ ।
জলে স্থলে শূন্যে কিবা কোথা নিকেতন ॥ ৩২০ ॥
শ্রবণ করিলে হয় নিরমল চিত ।
মঙ্গলনিধান রামকৃষ্ণ-গুণ-গীত ॥ ৩২১ ॥
হৃদি-তম-বিনাশন হৃদয়-আরাম ।
শুনহ ভকত কর্তা মাছের আখ্যান ॥ ৩২২ ॥
গ্রামের দক্ষিণপ্রান্তে হৃদয়ের ঘর ।
তাহার দক্ষিণে এক বৃহৎ প্রান্তর ॥ ৩২৩ ॥
প্রান্তর ধানের ক্ষেত পড়া ভূমি নয় ।
মাঝে মাঝে ছোট বড় বহু জলাশয় ॥ ৩২৪ ॥
জলপরিপূর্ণ এক পুকুরের পাড়ে ।
চলিলা শ্রীপ্রভু মলত্যাগ করিবারে ॥ ৩২৫ ॥
একাকী শ্রীপ্রভু প্রায় বেলা-অবসান ।
নিবারিলা সঙ্গে যেতে চায় রাজারাম ॥ ৩২৬ ॥
রাজারাম শ্রীপ্রভুরে জানে ভালমতে ।
রাখিয়া তাঁহায় লক্ষ্য থাকিত তফাতে ॥ ৩২৭ ॥
নালা দিয়া কলকল করি কোলাহল ।
পুকুরে পড়িছে নব বরিষার জল ॥ ৩২৮ ॥
এই জল মাছে লাগে সুধার মতন ।
যেথা পায় তথা যার মানে না মরণ ॥ ৩২৯ ॥
পুকুরের যেইখানে হয় নিপতিত ।
যাবতীয় মংস্যকুল সেথা একত্রিত ॥ ৩৩০ ॥
দাঁড়ায়ে দেখেন প্রভু গাছ-অন্তরালে ।
ছোট বড় নানা মাছ ধার জলে খেলে ॥ ৩৩১ ॥
ধীরে ধীরে পায় পায় গেলা প্রভুরায় ।
মাছের অত্যন্ত কাছে তবু না পলায় ॥ ৩৩২ ॥
দেখিয়া এতেক মাছ প্রভু কৈলা মনে ।
সঙ্কেত করিয়া তবে ডাকি রাজারামে ॥ ৩৩৩ ॥
অল্প জলে কত মাছ ধরিবে হেথায় ।
মাছের লাগিয়া তারা বহু কষ্ট পায় ॥ ৩৩৪ ॥
যেমন হইল মনে যুকতি তাঁহার ।
মোটা সোটা
কর্তা যেটা মাছের সর্দার ॥ ৩৩৫ ॥
যত জোর দিয়া লম্ফ পড়ে সেই ক্ষণে ।
দীনবন্ধু শ্রীপ্রভুর অভয় চরণে ॥ ৩৩৬ ॥
উলটপালট খায় চরণ নিকটে ।
যেন নাহি ছুঁয়ে পাছে পায়ে কাঁটা ফোটে ॥ ৩৩৭ ॥
বিপদনিবারী প্রভু দয়ার সাগর ।
দেখিয়া সর্দার মাছ অত্যন্ত কাতর ॥ ৩৩৮ ॥
শ্রীহস্ত বুলায়ে গায়ে কহেন গোসাঞি ।
ঘরে যা আর তোর কোন ভয় নাই ॥ ৩৩৯ ॥
এত বলি আশ্বাসিয়া দিলেন ফেলিয়ে ।
ছানা পোনা যেখা জ্বলে বেড়ায় খেলিয়ে ॥ ৩৪০ ॥
গভীর সলিলে গেল দলসহ তার ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা অমৃতভাণ্ডার ॥ ৩৪১ ॥
শিয়ড়েতে পড়িল বহুদিন গত হ'লে পর ।
প্রভুর প্রভুর মনে দক্ষিণশহর ॥ ৩৪২ ॥
বহুদূর তথা হ'তে দুদিনের পথ ।
পথের কাহিনী শুন শুনেছি যেমত ॥ ৩৪৩ ॥
হৃদুসঙ্গে পথিমধ্যে ভোজনের কালে ।
উপনীত হইলেন এক পান্থশালে ॥ ৩৪৪ ॥
স্নানান্তে খাওয়ায়ে জল প্রভুগুণধামে ।
হৃদয় রন্ধন করে পরম যতনে ॥ ৩৪৫ ॥
হৃদু ভাল জানে যাহা ভোজ্য রুচিকর ।
কে আর কোথায় হেন সেবক সুন্দর ॥ ৩৪৬ ॥
সামান্য সে চটি ভাল দ্রব্য নাহি জুটে ।
ভাল যা পাইল তাই আনিল আকুটে ॥ ৩৪৭ ॥
ভাত ভাল তরকারি হইল সকল ।
সর্বশেষে রাঁধে চুনা মাছের অম্বল ॥ ৩৪৮ ॥
প্রস্তুত করিয়া অন্ন হৃদু ডাকে তাঁরে ।
নাচিতে নাচিতে যান ভাত খাইবারে ॥ ৩৪৯ ॥
বালকস্বভাব প্রভু বালক প্রকৃত ।
যখন খেয়াল যেন কার্য সেইমত ॥ ৩৫০ ॥
অথচ সকলে আছে সুগুহ্য ব্যাপার ।
মম অধিকারে নাই সে সব বিচার ॥ ৩৫১ ॥
অম্বলেতে চুনা মাছ করি দরশন ।
বলিলেন আর মম হবে না ভোজন ॥ ৩৫২ ॥
পোনামাছ বিনা আজ ভাত নাহি খাব ।
বরঞ্চ আগোটা দিন উপবাস রব ॥ ৩৫৩ ॥
শিশু হ'তে শিশুসম বিষম রগড় ।
ধরিয়া শালার খুঁটি ঘুরে নিরন্তর ॥ ৩৫৪ ॥
প্রভুরে বুঝান হৃদু সাধ্য-অনুসারে ।
ততই ঘুরেন তিনি খুঁটি এটে ধ'রে ॥ ৩৫৫ ॥
ঘুরিতে ঘুরিতে মাঝে মাঝে হয় নাচ ।
সেই এক বোল মুখে খাব পোনামাছ ॥ ৩৫৬ ॥
খেয়াল না যাবে হৃদু বুঝিয়া আপনে ।
বাহির হইল পোনামাছ-অন্বেষণে ॥ ৩৫৭ ॥
সেবক হৃদুর মত খুঁজিয়া না পাই ।
এত আবদার যারে করেন গোসাঁই ॥ ৩৫৮ ॥
ভিক্ষুকের মত হৃদু দ্বারে দ্বারে ফিরে ।
শেষে উপনীত এক গৃহস্থের ঘরে ॥ ৩৫৯ ॥
বিয়া হেতু অনেক লোকের সমাগম ।
গৃহস্বামী যেবা তারে কৈল নিবেদন ॥ ৩৬০ ॥
সমস্ত বৃত্তান্ত শুনি গৃহী ভাগ্যবান ।
হৃদয়ে করিল এক গোটা মাছ দান ॥ ৩৬১ ॥
তুষ্ট হ'য়ে মাছ ল'য়ে ত্বরিত গমন ।
মনোমত পান্থশালে করিল রন্ধন ॥ ৩৬২ ॥
তাড়াতাড়ি ভোজন করিতে হৃদ্র কয় ।
দেরি হ'লে চ'লে যাবে গাড়ির সময় ॥ ৩৬৩ ॥
অতি সন্নিকটে তার রেল ইষ্টেশান ।
সময়ে না গেলে গাড়ি করিবে পয়ান ॥ ৩৬৪ ॥
কলিকাতা-অভিমুখে যেতে সেই দিনে ।
নাহিক দোসরা গাড়ি এক গাড়ি বিনে ॥ ৩৬৫ ॥
ঠিক সময়েতে যেতে না পারিলে তথা ।
সে দিন না হবে আর আসা কলিকাতা ॥ ৩৬৬ ॥
সেই হেতু প্রভুদেবে বিহিত বুঝান ।
স্বমনে ভোজন বাক্যে নাহি যায় কান ॥ ৩৬৭ ॥
বহু যত্নে সাঙ্গ যদি হইল ভোজন ।
পশ্চাৎ ঘটিল আর অদ্ভুত ঘটন ॥ ৩৬৮ ॥
অল্প দূর ব্যবধান ইষ্টেশানে যেতে ।
তার মধ্যে মলত্যাগে বসিলেন পথে ॥ ৩৬৯ ॥
কি এক কণ্টক তার নাম নাহি জানি ।
পুজিলে তাহায় বড় তুষ্ট শূলপাণি ॥ ৩৭০ ॥
মলভূমে অগণন কণ্টকনিচয় ।
নেহারিয়া শ্রীপ্রভুর প্রীতি অভিশয় ॥ ৩৭১ ॥
তাঁহার করম কার্য বুঝা মহাদায় ।
কণ্টক লইয়া মত্ত হইলা পূজায় ॥ ৩৭২ ॥
আবেশে মহেশ-পদে কণ্টক-প্রদান ।
দেখিয়া হৃদুর হয় আকুল পরাণ ॥ ৩৭৩ ॥
পূজার মরম-কথা হৃদু নাহি জানে ।
কত ডাকে মত্ত প্রভু কেবা ডাক শুনে ॥ ৩৭৪ ॥
এক সাধনেতে সিদ্ধ হইবার তরে ।
দীর্ঘবয়ঃ মহাঋষি বনের ভিতরে ॥ ৩৭৫ ॥
কাটায় জীবন গোটা সহি যত ঋতু ।
অশন গলিত পত্র প্রাণরক্ষা-হেতু ॥ ৩৭৬ ॥
তবু নহে সিদ্ধকাম শেষে ফেঁসে যায় ।
মরম অধিকে পঞ্চভূতেতে মিশায় ॥ ৩৭৭ ॥
তেমন দুষ্কর ব্রত কতই সাধন ।
হাতে হাতে অবহেলে যাঁর সমাপন ॥ ৩৭৮ ॥
প্রেমিক রসিকবর ভক্তির মুরতি ।
মাথায় প্রবাহ জ্ঞান-গঙ্গা দিবারাতি ॥ ৩৭৯ ॥
কামিনী-কাঞ্চন-যারা অবিস্থা মোহিনী ।
তুচ্ছ হেয় ঘৃণ্য যেন নরকের কৃমি ॥ ৩৮০ ॥
দিব্য পবিত্রতা-রূপ শুদ্ধসত্বময় ।
হরিতত্ত্ব দিবারাত্র হৃদয়ে উদয় ॥ ৩৮১ ॥
জীবহিত সদাব্রত কল্যাণ-আচার ।
মোহনীয়া ঠাম পরা পুরুষ-আকার ॥ ৩৮২ ॥
তিনি কেন শিশুসম মলভূমে ব'সে ।
কিবা বৃদ্ধিবলে বল বুঝিবে মানুষে ॥ ৩৮৩ ॥
ইতিমধ্যে সে দিনের নিরূপিত গাড়ি ।
চ'লে গেল যায় যেন ইষ্টেশান ছাড়ি ॥ ৩৮৪ ॥
যতক্ষণ পুজাসাঙ্গ না হইল তাঁর ।
উঠাতে না পারে হৃদু বড়ই বেজার ॥ ৩৮৫ ॥
কতক্ষণ পরে প্রভু আইলা আপনি ।
হৃদয় বলেন কোথা কাটাবে যামিনী ॥ ৩৮৬ ॥
গাড়ি চ'লে গেল আজ হইবে থাকিতে ।
কেবা হেথা আত্মজন কোথা রবে রেতে ॥ ৩৮৭ ॥
আপনে আছেন প্রভু না দেন উত্তর ।
হৃদয় আসিল ইষ্টেশানের ভিতর ॥ ৩৮৮ ॥
কর্মচারী জনৈকে জিজ্ঞাসে ব্যস্ত চিতে ।
আজ কি পাইব গাড়ি কলিকাতা যেতে ॥ ৩৮৯ ॥
প্রভুর আশ্চর্য খেলা কহিতে না পারি ।
নাহি অন্য গাড়ি আজ কহে কর্মচারী ॥ ৩৯০ ॥
তবে এক আলাহিদা গাড়ি স্বতন্তর ।
কাশী থেকে ছাড়িয়াছে তারের খবর ॥ ৩৯১ ॥
রেল কোম্পানীর এক চাকর-প্রধান ।
বড়ই মর্যাদাপন্ন অতুল সম্মান ॥ ৩৯২ ॥
কলিকাতা যাবে তেহ একা ল'য়ে গাড়ি ।
চেষ্টা পাব যদি তায় চড়াইতে পারি ॥ ৩৯৩ ॥
অপর যাত্রীর তাহে নাতি অধিকার ।
চেষ্টার না হবে ত্রুটি করিনু স্বীকার ॥ ৩৯৪ ॥
ও সদাচারী কর্মচারী গাড়ি এলে পরে ।
প্রভুরে উঠায়ে দিল তাহার ভিতরে ॥ ৩৯৫ ॥
ইচ্ছাময় প্রভুদেব ইচ্ছার তাঁহার ।
কোথা হ'তে কিবা হয় কে বুঝে ব্যাপার ॥ ৩৯৬ ॥
শুভাশুভ বোধে যারে তুমি ভাব মনে ।
কি ফল ঘটিবে তার ইচ্ছাময় জানে ॥ ৩৯৭ ॥
শ্রীপ্রভু মঙ্গলময় রাখি এই জ্ঞান ।
কর্ম যার ফল তার অমৃত-সমান ॥ ৩৯৮ ॥
ফল-আশে কৈলে কর্ম অবিদ্যা-ভুবনে ।
ফলে ফল হলাহল প্রাণ কাঁদে শুনে ॥ ৩৯৯ ॥
ফেরে ফেলে তারে গুটিপোকার মতন ।
কর্মসূত্র নাগপাশ নিগূঢ় বন্ধন ॥ ৪০০ ॥
মহাবিদ্যা প্রভু সনে কর কারবার ।
ছাড়িবে অবিদ্যা যাবে লোচন-আঁধার ॥ ৪০১ ॥
দেখিবে নূতন চক্ষে ঝরিবেক জল ।
প্রভু-হেতু কর্ম-গাছে ধরে প্রভু ফল ॥ ৪০২ ॥
আন্ কর্ম আন্ ফল দিয়া বিসর্জন ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা মধুর কথন ॥ ৪০৩ ॥