দ্বিতীয় খণ্ড
তীর্থ-পর্যটন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্টগোষ্ঠীগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রামকৃষ্ণলীলা-সিন্ধু অতলপরশী ।
মুকুতা মাণিক রত্ন মণি রাশি রাশি ॥ ১ ॥
বিভাতি বিশাল গর্ভ শোভে স্তরে স্তরে ।
নিগমন হও মন অমৃত-পাথারে ॥ ২ ॥
এখন বিপদ বড় মথুরের ঘরে ।
ভক্তিমতী জগদম্বা
প্রায় মরে মরে ॥ ৩ ॥
পরাজিত শহরের চিকিৎসকগণ ।
হতাশে মথুর এবে চিন্তাকুল মন ॥ ৪ ॥
প্রত্যাগত প্রভুদেব দক্ষিণশহরে ।
শুনিয়া মঞ্জুর ত্বরা আইল গোচরে ॥ ৫ ॥
উপায় কি হবে বলি কৈল নিবেদন ।
সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস অতি উচাটন মন ॥ ৬ ॥
ভক্ত-সখা দেখি ভক্তে অতীব কাতর ।
বহ্যহহীন আর নাহি দেহের খবর ॥ ৭ ॥
ভাবাবেশে বলিলেন ভক্ত শ্রীমধুরে ।
ভয় নাই জগদম্বা শীঘ্র যাবে সেরে ॥ ৮ ॥
প্রভুতে বিশ্বাস এত করিত মথুর ।
শুনিরা অমনি তার সব চিন্তা দূর ॥ ৯ ॥
ঘরে না যাইয়া রহে দক্ষিণশহরে ।
দিনে দিনে পার বার্তা জগদম্বা সারে ॥ ১০ ॥
একে তো মথুর ভক্ত ভক্তির আকর ।
প্রভুরে দেখিয়া পায় হাতে শশধর ॥ ১১ ॥
তদুপরি প্রিয়তমা প্রাণের সমান ।
প্রভুর কৃপায় মাত্র পাইলেন প্রাণ ॥ ১২ ॥
দেখিয়া মজিল এত প্রভুর চরণে ।
তিলেক না দেখি দেখে অন্ধকার দিনে ॥ ১৩ ॥
সুবৃহৎ কালীপুরী মহাপরিসর ।
মনোহর পুষ্পোদ্যান তাহার ভিতর ॥ ১৪ ॥
নানা জাতি ফুটে ফুল সৌরভে অতুল ।
যেখানে সেখানে গন্ধে করে প্রাণাকুল ॥ ১৫ ॥
বিশেষতঃ যূথী বেলা মালতী টগর ।
গোলাপ রজনীগন্ধা গন্ধ মনোহর ॥ ১৬ ॥
গাছভরা গন্ধরাজ পঞ্চমুখী জবা ।
চামেলী অপরাজিতা শোভমান কিবা ॥ ১৭ ॥
পদ্মগন্ধা বক পুষ্প রক্তিম রঙ্গন ।
চন্দ্রমুখী সূর্যমুখী বিবিধ বরণ ॥ ১৮ ॥
লাল সাদা পদ্মগন্ধ করবী অতুল ।
পরিসীমা নাই তথা কত ফোটে ফুল ॥ ১৯ ॥
মথুর করেন আজ্ঞা যত ভৃত্যগণে ।
প্রস্ফুটিত যাবতীয় কুসুম-চয়নে ॥ ২০ ॥
গাঁথিয়া ফুলের হার বিবিধ বরণ ।
সাজায় শ্রীপ্রভুরায় মনের মতন ॥ ২১ ॥
মন্দিরে সাধের শ্যামা-মুর্তি বিদ্যমান ।
দ্বাদশ-মহেশ-লিঙ্গ আর রাধাশ্যাম ॥ ২২ ॥
পুরী বিনির্মাণ হৈল যাঁদের লাগিয়া ।
সে সব মথুর এবে গিয়াছে ভুলিয়া ॥ ২৩॥
শ্যাম শ্যামা শিব রাম প্রভু ভগবান ।
মধুরের খাঁটি পাকা ষোল আনা জ্ঞান ॥ ২৪ ॥
সামান্য মথুর নয় বুদ্ধি বার আনা ।
আনা তার বুদ্ধি যার সেই এক জনা ॥ ২৫ ॥
বড় জমিদারি বর্ষে লক্ষ লক্ষ আয় ।
ঘরে ব'সে হেসে হেসে ইঙ্গিতে চালায় ॥ ২৬ ॥
ইহা বিষয়ের কথা তাহে এত দূর ।
কত উচ্চ ভক্তি পথে দেখহ মথুর ॥ ২৭ ॥
এতই পিরীতি তাঁর শ্যামার চরণে ।
সাত লক্ষ টাকা দেয় পুরী-বিনির্মাণে ॥ ২৮ ॥
যেমন অতিথিশালা ভাণ্ডার তেমন ।
ছত্রে খায় দিনে রেতে লোক অগণন ॥ ২৯ ॥
যেমন তেমন নয় যাহা ইচ্ছা যার ।
ভক্তাভক্ত ছোটবড় নাহিক বিচার ॥ ৩০ ॥
আবাসে দ্বাদশ মাসে পর্ব ত্রয়োদশ ।
অন্নবান বস্ত্রবান দেশজুড়ে যশ ॥ ৩১ ॥
স্বর্ণ রৌপ্য পাত্র দেয় বিদায় ব্রাহ্মণে ।
সম্বৎসরে বারে বারে হিসাব-বিহীনে ॥ ৩২ ॥
মূল্যবান পরিচ্ছদ গরব বসন ।
অকাতরে যারে তারে করে বিতরণ ॥ ৩৩ ॥
পথঘাট সুপ্রশস্ত কর্ম পরহিতে ।
তুলনায় কে দাঁড়ায় মথুরের সাথে ॥ ৩৪ ॥
এতই উন্নত আত্মা হয় যেই জন ।
মরি হরি একবার ভেবে দেখ মন ॥ ৩৫ ॥
বুদ্ধিহারা কিবা হেতু হয় এইখানে ।
গরীব ব্রাহ্মণবেশী শ্রীপ্রভুর স্থানে ॥ ৩৬ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভগবান ।
দিনে দিনে নানারূপ তাঁহারে দেখান ॥ ৩৭ ॥
শ্রীপ্রভুর সেবা আর তাঁর আরাধন ।
মঞ্জুর বুঝিত এই সর্বোচ্চ করম ॥ ৩৮ ॥
আশ্বিনে অম্বিকা-পূজা মথুরের ঘরে ।
সুঠামা প্রতিমা-মূর্তি কারিগরে গড়ে ॥ ৩৯ ॥
যেমন তেমন নহে এই কারিগর ।
কর্ম দেখে বিশ্বকর্মা পায়ে করে গড় ॥ ৪০ ॥
হেন কারিগর নাহি মিলে দুনিয়ায় ।
মাটির প্রতিমা করে জীবন্তের প্রায় ॥ ৪১ ॥
তবু যতক্ষণ প্রভু নাহি তথা যান ।
কারিগরে নাহি দিতে পারে চক্ষুদান ॥ ৪২ ॥
শ্রীপ্রভুর চক্ষুদান এতই সুন্দর ।
দেখিয়া চরণে পড়ে হেন কারিগর ॥ ৪৩ ॥
কোন কাজে কেহ নাহি প্রভুর সমান ।
আগাগোড়া প্রভুলীলা তাহার প্রমাণ ॥ ৪৪ ॥
মহাপুজা তিন দিন মথুরের ঘরে ।
মথুর রাখিত তাঁয় নাহি দিত ছেড়ে ॥ ৪৫ ॥
বলিতেন শ্রীমধুর ভক্ত মহারাজা ।
তুমি না থাকিলে বাবা কার হবে পুজা ॥ ৪৬ ॥
কি হবে নৈবেদ্য সব দিব খালে থালে ।
কে খাইবে আর বাবা তুমি না খাইলে ॥ ৪৭ ॥
পূজাদিনে যথাকালে নানা উপচার ।
খালায় থালায় করে ব্রাহ্মণে যোগাড় ॥ ৪৮ ॥
সারি সারি প্রতিমার সম্মুখেতে রাখে ।
দাঁড়ায়ে মথুর নিজে স্বচক্ষেতে দেখে ॥ ৪৯ ॥
মনোমত সুসজ্জিত দেখি উপচার ।
বলিতেন আনিবারে বাবারে এবার ॥ ৫০ ॥
আসিবার আগে প্রভু প্রতিমা-মন্দিরে ।
পথেই যাইত প্রায় বাহ্যজ্ঞান ছেড়ে ॥ ৫১ ॥
যখন পশিত কানে পূজা-স্তুতি-পাঠ ।
বিভোর তখন আর নাহি পান বাট ॥ ৫২ ॥
ধরিয়া আনিয়া তাঁরে বসাইয়া দিত ।
যেইখানে নৈবেদ্যাদি রহে সুসজ্জিত ॥ ৫৩ ॥
যখন দুর্গায় ভোজ্য করে নিবেদন ।
ব্রতিরূপে নিয়োজিত পূজক ব্রাহ্মণ ॥ ৫৪ ॥
ভক্ষণ করেন প্রভু শ্রীহস্তে লইয়া ।
দেখিয়া ব্রাহ্মণগণে উঠে চমকিয়া ॥ ৫৫ ॥
অমনি মথুর কহে যতেক ব্রাহ্মণে ।
বুঝিনু সম্পূর্ণ পূজা বাবার গ্রহণে ॥ ৫৬ ॥
সার্থক হইল দুর্গাপুজা-আরাধন ।
নৈবেদ্য যখন বাবা করিলা গ্রহণ ॥ ৫৭ ॥
ভক্তিহীন ব্রাহ্মণেরা বুঝিতে না পারে ।
মনে করে বলে কিছু কিন্তু নারে ডরে ॥ ৫৮ ॥
কার সাধ্য প্রভুদেবে কহে রুক্ষ ভাষ ।
তখনি লইবে মাথা মথুর বিশ্বাস ॥ ৫৯ ॥
বাবার কৃপায় তাঁর অশঙ্কিত হৃদি ।
অটল বিশ্বাস ভক্তি খেলে নিরবধি ॥ ৬০ ॥
যেমন শ্রীপ্রভু ভক্ত মনোমত তাঁর ।
ধন্য তুমি নমো নমো কৈবর্তকুমার ॥ ৬১ ॥
ভাষায় না জুটে কথা গুণ বলিবারে ।
করুণ কটাক্ষ কর কায়স্থ-কিঙ্করে ॥ ৬২ ॥
অন্তরেতে নিদারুণ র'য়ে গেল ব্যথা ।
ভাগ্যে না হইল পদে লুটাইতে মাথা ॥ ৬৩ ॥
যেমন মথুর তাঁর মতন গৃহিণী ।
ভক্তিমতী জগদম্বা কৈবর্তনন্দিনী ॥ ৬৪ ॥
শ্যামাতে অতুল ভক্তি মায়ের মতন ।
আছয়ে সোদরা কেহ না হয় এমন ॥ ৬৫ ॥
মনোমত আর যত ঘরে পরিবার ।
ধরাধামে মথুরের সোনার সংসার ॥ ৬৬ ॥
নবমীপূজার দিনে পূজার সময় ।
অন্তঃপুরে মহাভাব শ্রীঅঙ্গে উদয় ॥ ৬৭ ॥
দুইজনে স্ত্রীপুরুষে ভাব দেখি গায় ।
নানাবিধ অলঙ্কারে শ্রীঅঙ্গ সাজায় ॥ ৬৮ ॥
সুন্দর রচিল বেশ অতি পরিপাটি ।
শেষে পরাইল লাল বারাণসী শাটী ॥ ৬৯ ॥
আবেশে অবশ অঙ্গ ঢলে ঢলে পড়ে ।
ধীরে ধীরে উপনীত প্রতিমা-গোচরে ॥ ৭০ ॥
সখীভাবে নিজ করে চামর-ব্যজন ।
মথুর পশ্চাতে থাকি করে নিরীক্ষণ ॥ ৭১ ॥
হেন ঠাম ধরিলেন প্রভু সেইক্ষণে ।
কে প্রতিমা কেবা প্রভু সাধ্য কার চিনে ॥ ৭২ ॥
কতই হইল খেলা মথুরের ঘরে ।
নানারূপ দেখাইয়া ধরা দিলা তারে ॥ ৭৩ ॥
প্রভু আর প্রভুভক্ত পদে রাখি মতি ।
ক্রমে ক্রমে শুন রামকৃষ্ণলীলা-গীতি ॥ ৭৪ ॥
একদিন সন্ধ্যাকালে মথুর-বনিতা ।
মানস যাইতে তীর্থে তুলিলেন কথা ॥ ৭৫ ॥
তীর্থযাত্রা ধর্ম-কর্ম পুণ্য-প্রদায়িনী ।
মথুর ভুলেছে পেয়ে প্রভু গুণমণি ॥ ৭৬ ॥
প্রভুদেব বিনা অন্যে নাহি জানে আর ।
সগোষ্ঠী একত্রে সেবে শ্রীচরণ তাঁর ॥ ৭৭ ॥
প্রভু বিনা শ্রীমথুর কিছু নাহি চায় ।
সে হেতু উত্তর কৈল আপন ভার্যায় ॥ ৭৮ ॥
পুছহ বাবায় ইহা আমি নাহি জানি ।
বাবায় ছাড়িয়া যেতে কাঁপে মোর প্রাণী ॥ ৭৯ ॥
অনর্থক অর্থনষ্ট কষ্ট কত হবে ।
বাবা যদি যান সঙ্গে যেতে পারি তবে ॥ ৮০ ॥
কাতর প্রভুরে কয় মথুর-গৃহিণী ।
যাওয়া হয় তীর্থে যদি যাও বাবা তুমি ॥ ৮১ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভগবান ।
ধরিলে ভকতে আর নাহিক এড়ান ॥ ৮২ ॥
ভালমন্দ স্থানাস্থান বিচারবিহীনে ।
সম্পদ-বিপদ সখা রহে রেতে দিনে ॥ ৮৩ ॥
কি করেন প্রভুদেব দিলেন সম্মতি ।
মহা আস্বা জগদম্বা পুলকিত অতি ॥ ৮৪ ॥
লীলাময় প্রভু তাঁর কর্ম বুঝা ভার ।
মানুষ থাকুক দূরে অসাধ্য ব্রহ্মার ॥ ৮৫ ॥
কেহ বা কতই করে অসাধ্য সাধন ।
সহি শীতাতপ কত বিহীন-অশন ॥ ৮৬ ॥
কটিতে কৌপীন মাত্র তরুতলে বাস ।
সজল নয়নে ছাড়ে সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ॥ ৮৭ ॥
আত্মসুখ-বিবর্জিত ক্ষুধা-তৃষ্ণাহারা ।
জীর্ণ-শীর্ণ চর্মহীন হাড়ের চেহারা ॥ ৮৮ ॥
তথাপি তিলেক তরে না পায় দর্শন ।
কেহ সঙ্গে রঙ্গে করে জীবনযাপন ॥ ৮৯ ॥
যথা তথা ইচ্ছামত সঙ্গে ল'য়ে যায় ।
ভগবৎ-তত্ত্ব গুপ্ত ব্যক্ত মাত্র তাঁয় ॥ ৯০ ॥
তাঁর তত্ত্ব তিনি বিনা কে বুঝিতে পারে ।
ধূমাগার মাথা তার যে যার বিচারে ॥ ৯১ ॥
তীর্থে যেতে আয়োজন করেন মথুর ।
মনোমত ভৃত্য অর্থ প্রচুর প্রচুর ॥ ৯২ ॥
বস্তায় বস্তায় বাঁধা বিছানা বসন ।
যখা আজ্ঞা আয়োজন করে ভৃত্যগণ ॥ ৯৩ ॥
দক্ষিণশহরে এবে আই ঠাকুরানী ।
অতিবৃদ্ধা শুভ্রাকেশা প্রভুর জননী ॥ ৯৪ ॥
চরণ বন্দনা আর সম্মতিকারণে ।
আসিলেন প্রভুদেব তাঁর সন্নিধানে ॥ ৯৫ ॥
আইর সর্বস্ব রক্ত পুত্র গদাধর ।
তীর্থে যেতে ছেড়ে দিতে না মানে অন্তর ॥ ৯৬ ॥
হেথা প্রতিশ্রুত প্রভু মঞ্জুর-আবাসে ।
তাহাদের সঙ্গে যাওয়া হবে তীর্থবাসে ॥ ৯৭ ॥
না যাইলে বাক্যরক্ষা-পক্ষে হয় দোষ ।
গেলে পরে জননীর মনে অসন্তোষ ॥ ৯৮ ॥
উভয় রক্ষার হেতু করিলা উপায় ।
তীর্থবাসে সঙ্গে যেতে কহিলেন মায় ॥ ৯৯ ॥
পরিহরি গঙ্গাতীর তীর্থপর্যটনে ।
যাইতে আইর ভাল লাগিল না মনে ॥ ১০০ ॥
অগত্যা দিলেন সায় পুত্র গদাধরে ।
তীর্থ পর্যটন-শেষে ফিরিতে সত্বরে ॥ ১০১ ॥
শ্রীপ্রভুর তীর্থে যাত্রা হয় শুভদিনে ।
সঙ্গে যায় সেবাপর হৃদয় ভাগিনে ॥ ১০২ ॥
অপর ব্রাহ্মণ কতক দাসদাসীগণ ।
বস্তা বস্তা সজ্জা শয্যা বিবিধ রকম ॥ ১০৩ ॥
এর পূর্বে প্রয়াগ পর্যন্ত একবার ।
গিয়াছিলা প্রভু-সঙ্গে মথুর কুমার ॥ ১০৪ ॥
দ্বিতীর এবার তাঁর তীর্থ-পর্যটন ।
শুনিয়াছি যেই মত শুন বিবরণ ॥ ১০৫ ॥
কল্যাণনিধান কথা মথুর আখ্যান ।
গাইলে শুনিলে করে দুঃখে পরিত্রাণ ॥ ১০৬ ॥
পথিমধ্যে এক ঠাঁই বিস্তৃত প্রান্তরে ।
অনাথ দরিদ্র বহু লোক বাস করে ॥ ১০৭ ॥
পত্রের কুটার বাঁধা তাও দুলে যায় ।
তরুতলস্থিত সেই হেতু রক্ষা পায় ॥ ১০৮ ॥
অন্ন বিনা জীর্ণ-শীর্ণ রুগ্নকলেবর ।
অনায়াসে গোনা যায় বুকের পাঁজর ॥ ১০৯ ॥
পরিধেয় শতগ্রন্থি মলিন বসন ।
এত খাট তাও নহে লজ্জা-আবরণ ॥ ১১০ ॥
মূর্তিমান দরিদ্রতা তথা বিঘ্নমান ।
দেখিয়া দয়াল প্রভু করুণানিধান ॥ ১১১ ॥
রোদন করেন কত নাহিক অবধি ।
গদগদ স্বরে কন শ্যামার সম্বোধি ॥ ১১২ ॥
ত্রিলোকপালিনী তুমি তুমি বিশ্বেশ্বরী ।
কি বিচার না তোমার বুঝিতে না পারি ॥ ১১৩ ॥
তোমার কর্মের মর্ম বুঝা অতি ভার ।
কারও ভাতে দুধ চিনি নানা উপচার ॥ ১১৪ ॥
অন্ন বিনা কেহ শীর্ণ দড়িবাটে আঁতে ।
দিনান্তেও এক মুঠা নাহি পায় খেতে ॥ ১১৫ ॥
দীনবন্ধু প্রভুদেব কাঙ্গালের ধন ।
অহেতুক রূপানিধি দারিদ্র্যভঞ্জন ॥ ১১৬ ॥
অনাথের নাথ প্রভু দ্রবিয়া অন্তরে ।
ধীরে ধীরে বলিলেন ভক্ত শ্রীমথুরে ॥ ১১৭ ॥
কখন না দেখি শুনি কাঙ্গালী এমন ।
যথাসাধ্য কর অন্ন-বস্ত্র বিতরণ ॥ ১১৮ ॥
এদের মতন দুঃখী নাহি ত্রিসংসারে ।
বলিতে বলিতে জল দু'নয়নে ঝরে ॥ ১১৯ ॥
দুঃখী দীনে যদি তব না দ্রবে অন্তর ।
কি হেতু কহিবে জীবে দয়ার সাগর ॥ ১২০ ॥
জয় জয় দীনবন্ধু কাঙ্গালের হরি ।
যে দীনে উপজে ধরা তারে নমঃ করি ॥ ১২১ ॥
যে তোমার দয়াপাত্র সে কিসে কাঙ্গালী ।
সার্থক জীবন তার রত্নবান বলি ॥ ১২২ ॥
যে যে কাঙ্গালীকে দেখি শ্রীনয়নে বারি ।
জনে জনে তে সবার পদযুগ ধরি ॥ ১২৩ ॥
কাঙ্গালীর বেশমাত্র কাঙ্গালী কেমনে ।
ভাগ্যবান সুরপূজ্য এবে ধরাধামে ॥ ১২৪ ॥
অমূল্য শ্রীপাদপদ্ম দরশন-আশে ।
বিরলেতে করে বাস কাঙ্গালীর বেশে ॥ ১২৫ ॥
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ আজি শ্রীপ্রভু দুয়ারে ।
অন্ন-বস্ত্রধান-হেতু কহিলা মথুরে ॥ ১২৬ ॥
মথুর তাহাই করে যে আজ্ঞা যখন ।
জানি না এবারে তেহ বুঝিল কেমন ॥ ১২৭ ॥
উত্তরে প্রভুর প্রতি ভক্তবর কয় ।
কোথা পাব এত অর্থ বহু হবে ব্যয় ॥ ১২৮ ॥
দয়ালস্বভাব তুমি দয়ার সাগর ।
পরদুঃখে দ্রবে তব করুণ অন্তর ॥ ১২৯ ॥
এত দরিদ্রের দুঃখ করিতে মোচন ।
কোথায় পাইব বাবা রাশি রাশি ধন ॥ ১৩০ ॥
তুমি নাহি জান বাবা অর্থের মরম ।
তাই কহ করিবারে এ হেন করম ॥ ১৩১ ॥
ঠাকুর ঈষৎ কষ্টে কন আর বার ।
রাজেশ্বরী মাতা সৃষ্টি তাহার ভাণ্ডার ॥ ১৩২ ॥
নিজস্ব কাহারও নাই এক কড়া কড়ি ।
যার কাছে ধন সেই মায়ের ভাণ্ডারী ॥ ১৩৩ ॥
মায়ের ভাণ্ডারী মাত্র তুমি একজন ।
আজ্ঞা তাঁর কর অন্ন-বস্ত্র বিতরণ ॥ ১৩৪ ॥
ওরে শালা আমি তোর কাশী নাহি যাব ।
অনাথ কাঙ্গালী এরা এইখানে রব ॥ ১৩৫ ॥
এত শুনি শ্রীমথুর কহিল তখন ।
অবশ্য করাব বাবা কাঙ্গালী-ভোজন ॥ ১৩৬ ॥
অবিলম্বে পাঠাইল পত্রিকা ভবনে ।
প্রেরণ করিতে বস্ত্র বস্তা বস্তা কিনে ॥ ১৩৭ ॥
চর্ব্যয চূষ্য লেহ্য পেয় প্রচুর প্রচুর ।
আয়োজন করিলেন ভক্ত শ্রীমথুর ॥ ১৩৮ ॥
সপ্তাহ কাটিয়া যায় কাঙ্গালী-ভোজনে ।
দেখিয়া ঠাকুর মহাপরিতোষ মনে ॥ ১৩৯ ॥
অর্থসহ নব বস্ত্র শেষ দিনে দান ।
পশ্চাৎ হইল কাশীতীর্থেতে পয়ান ॥ ১৪০ ॥
জয় জয় ভাগ্যবান কাঙ্গালীর গণ ।
তোমাদের পদরজ মাগে এ অধম ॥ ১৪১ ॥
কিবা ভাগ্য তোমাদের বলিতে না পারি ।
দুয়ারে পাইলে ভবসিন্ধুর কাণ্ডারী ॥ ১৪২ ॥
অঘটন-সঙ্ঘটন কি ভাগ্যের বলে ।
ঋষি মূনি যোগী জনে কদাচিৎ মিলে ॥ ১৪৩ ॥
দীনতা যদ্যপি হয় কারণ তাহার ।
দেহ অণুকণা ভিক্ষা করি বার বার ॥ ১৪৪ ॥
তরণীতে যে সময় গঙ্গা-অতিক্রম ।
ভাবচক্ষে শ্রীপ্রভুর হয় দরশন ॥ ১৪৫ ॥
শিবপুরী বারাণসী সুবর্ণে নির্মিত ।
অন্নদানে অন্নপূর্ণা নিজে বিরাজিত ॥ ১৪৬ ॥
উতরিলে অন্য পারে ভাব ভেঙ্গে যায় ।
শিবিকায় সাবধানে ঠাকুরে উঠায় ॥ ১৪৭ ॥
নিরূপিত বাসাবাটী প্রাসাদের মত ।
দলেবলে শ্রীমথুর হয় উপনীত ॥ ১৪৮ ॥
পল্লীতে পড়িল সাড়া মহা আড়ম্বর ।
আচরণে শ্রীমথুর যেন রাজেশ্বর ॥ ১৪৯ ॥
রাজপথে দু পা যেতে সমারোহ কত ।
রজতে নির্মিত ছাতা চাকরে ধরিত ॥ ১৫০ ॥
অঙ্গ-রক্ষকের গণ আসাসোঁটা হাতে ।
সুন্দর পোশাক-পরা ঘেরা চারিভিতে ॥ ১৫১ ॥
দানকর্মে কর্ণ যেন মুক্তহস্তে ব্যয় ।
যেখানে যা লাগে দেয় কাতর না হয় ॥ ১৫২ ॥
বিশ্বনাথ-দরশনে পায়ে হেঁটে যায় ।
সঙ্গে রহে ভৃত্যগণ প্রভু শিবিকায় ॥ ১৫৩ ॥
হৃদয় শিবিকা-পার্শ্বে প্রভুর নিকটে ।
সতর্কে থাকেন কিবা কখন কি ঘটে ॥ ১৫৪ ॥
দেবদেবী-দরশনে শ্রীপ্রভুর ধারা ।
স্থানে যাইবার পূর্বে পথে বাহ্যহারা ॥ ১৫৫ ॥
এখানেও তাই পথে ইন্দ্রিয়াদি মন ।
করিয়াছে কোন্ রাজ্যে সবে পলায়ন ॥ ১৫৬ ॥
শিবিকার বাহ্যহারা ঠাকুর হেথায় ।
শ্রীদেহ ধরিয়া হৃদু মন্দিরে উঠায় ॥ ১৫৭ ॥
এখানে আবেশ-নেশা হৈল ঘনতর ।
জড়বৎ কায়াখানি প্রাণশূন্য ঘর ॥ ১৫৮ ॥
সাবধানে ল'য়ে তাঁরে সেই অবস্থায় ।
বলেবলে শ্রীমধুর ফিরিল বাসায় ॥ ১৫৯ ॥
দরশনে এই কাণ্ড নিত্য নিত্য হয় ।
তথাপিহ একবার না আসিলে নয় ॥ ১৬০ ॥
ঠাকুরের পরিচয় ঠাকুরে বিদিতি ।
বায়ুর প্রাবল্যে লিখি রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১৬১ ॥
বহুতর ধনেশ্বর বৈঠে নানা ঠাঁই ।
মথুরের মত দাতা হেন কেহ নাই ॥ ১৬২ ॥
উদারতা সরলতা স্বার্থশূন্যদানে ।
দ্বিতীয় ইহার মত মিলে না নয়নে ॥ ১৬৩ ॥
অর্জুন যেমন ছিল লঘুহস্ত বাণে ।
মথুর তেমতি হেথা মুক্তহস্ত দানে ॥ ১৬৪ ॥
বিশাল নগরী এই বারাণসীধাম ।
নানান দেশের লোকে জনাকীর্ণ স্থান ॥ ১৬৫ ॥
ইহাতে আছয়ে যত পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ।
শ্রীমথুর করিলেন সবে নিমন্ত্রণ ॥ ১৬৬ ॥
ভোজনায়োজন-কথা বাহুল্য বাখান ।
প্রতিজনে টাকা টাকা দক্ষিণার দান ॥ ১৬৭ ॥
আগাগোড়া দেখিতেছি প্রভুর প্রকৃতি ।
সাধুভক্ত দেখিবারে বড়ই পিরীতি ॥ ১৬৮ ॥
দেশজুড়ে খ্যাতি এক সাধু এইখানে ।
কারও সঙ্গে কথা নাই মৌনাবলম্বনে ॥ ১৬৯ ॥
বহুকাল কাশীতীর্থে লোকের রটনা ।
প্রকৃত উমের কত কারও নাহি জানা ॥ ১৭০ ॥
পানভোজনের চেষ্টা নাহিক তাঁহায় ।
খাওয়াইয়া দিলে কেহ তবে তেঁহ খায় ॥ ১৭১ ॥
শীতাতপে সমধারা নগ্ন কলেবর ।
আপনাতে মগ্ন নাহি দেহের খবর ॥ ১৭২ ॥
পরিচয় এই মহোন্নত অবস্থার ।
শ্রীমৎ ত্রৈলঙ্গ স্বামী নাম মহাত্মার ॥ ১৭৩ ॥
স্বামীজীরে দেখিবারে প্রভুর গমন ।
হৃদয় সর্বদা সঙ্গে ভুঙ্গীর মতন ॥ ১৭৪ ॥
যথাস্থানে উতরিয়া দেখে প্রভুঘর ।
শুইয়া আছেন তপ্ত বালির উপর ॥ ১৭৫ ॥
অবিকৃত মন দেহে নাহিক যাতনা ।
দুগ্ধফেন শয্যা তপ্ত বালির বিছানা ॥ ১৭৬ ॥
মহা আনন্দিত স্বাধী প্রভুকে দেখিয়ে ।
অভ্যর্থনা কৈল তাঁর নস্যদানী দিয়ে ॥ ১৭৭ ॥
বসিয়া স্বামীর পাশে পুছিলেন রায় ।
বাক্যের দুয়ারে নহে মাত্র ইশারায় ॥ ১৭৮ ॥
বল দেখি এক কিবা বহুল ঈশ্বর ।
তখনি সঙ্কেতে মৌনী করিল উত্তর ॥ ১৭৯ ॥
দেখা যায় এক তিনি ধ্যান-অবস্থায় ।
বহুল বহুল বোধ বিরাট লীলায় ॥ ১৮০ ॥
স্বামীর প্রশংসা প্রভু করিয়া বিস্তর ।
বলিলেন তাঁর খোলে নিজে বিশ্বেশ্বর ॥ ১৮১ ॥
পায়সান্ন ছিল সঙ্গে আদর করিয়ে ।
আপুনি ঠাকুর তাঁর দেন খাওয়াইয়ে ॥ ১৮২ ॥
দয়ানন্দ সরস্বতী আর একজন ।
সাধুদের মধ্যে তাঁর খ্যাতি বিলক্ষণ ॥ ১৮৩ ॥
দেবভাষা সংস্কৃত বিশেষিয়া জানা ।
উহাতেই কথাবার্তা তর্ক আলোচনা ॥ ১৮৪ ॥
জ্ঞানমার্গী বেদান্তের পথে মতে গতি ।
শিষ্য চেলা বহু আর্য-সমাজাধিপতি ॥ ১৮৫ ॥
ঠাকুরের রীতি সাধু-সন্তে মানদান ।
দয়ানন্দে একদিন দেখিবারে যান ॥ ১৮৬ ॥
অগ্রণী হইয়া তাঁর চেলা একজন ।
ঈশ্বরীয় তত্ত্বকথা করে উত্থাপন ॥ ১৮৭ ॥
নামরূপ সাকারের প্রতিবাদী তিনি ।
রামনামে যেইমত হয় ভূতযোনি ॥ ১৮৮ ॥
ঠাকুরের সঙ্গে কথা সাকার লইয়ে ।
মারার ব্যাপার বলি দেয় উড়াইয়ে ॥ ১৮৯ ॥
বাক্বিতণ্ডায় সাধু অতি বিচক্ষণ ।
অনর্থ তর্কের দ্বন্দ্বে পক্ষ-সমর্থন ॥ ১৯০ ॥
তর্কবিদ্যা বিশারদ তর্কেতে চতুর ।
ততই খণ্ডন যত কহেন ঠাকুর ॥ ১৯১ ॥
বচনে হবে না কার্য এই অনুমানি ।
স্বরূপধারণ তবে কৈলা গুণমণি ॥ ১৯২ ॥
সুস্থির আছিল জল দুলাইল যায় ।
অর্ধবাহ্য আবেশেতে কহিলা তাহায় ॥ ১৯৩ ॥
এত যে করিনু আমি দিয়ে প্রাণমন ।
জগমাতা অম্বিকার সাধন-ভজন ॥ ১৯৪ ॥
তত্তৎভূত অনুভূতি দরশনাবলী ।
প্রতারণা প্রবঞ্চনা মিথ্যা কি সকলি ॥ ১৯৬ ॥
এত বলি এই দেখ দেহ দেখাইয়ে ।
সমাধিস্থ প্রভুত্বের উঠে দাঁড়াইয়ে ॥ ১৯৭ ॥
শ্রীচৈতন্য-ঘনমূর্তি প্রভুর আমার ।
প্রদর্শন যেইখানে প্রভাবে তাহার ॥ ১৯৮ ॥
তামস-বিনাশ বাতি চৈতন্য-তপন ।
উদয় হইয়া দেয় নবীন নয়ন ॥ ১৯৯ ॥
চৈতন্যপ্রসূত এই নধীন নয়নে ।
কি দেখে চৈতন্যবান অন্যে নাহি জানে ॥ ২০০ ॥
সেই সৃষ্টি সেই কাল সেই রাত্রি দিন ।
সব সেই পূর্বেকার তথাপি নবীন ॥ ২০১ ॥
আপনে আপনহারা বুদ্ধি হয় হত ।
বিস্ময়স্তম্ভিতাচল পর্বতের মত ॥ ২০২ ॥
কখন কখন হাসে কভু চোখে জল ।
কখন বা নাচে গায় আনন্দে বিহ্বল ॥ ২০৩ ॥
সীসার নির্মিত তার দড়ির মতন ।
ভারি যেন তেন লম্বা যোজন যোজন ॥ ২০৪ ॥
তড়িতের শক্তি যবে সঞ্চালিত তায় ।
আগাগোড়া থর থর তাহারে কাঁপায় ॥ ২০৫ ॥
সেইমত ঠাকুরের ভাবের প্রতাপে ।
ভাগ্যবান বৈদান্তিক উঠে কেঁপে কেঁপে ॥ ২০৬ ॥
জানি না শ্রীঅঙ্গে কিবা করি দরশন ।
ধরণী লুটায় ধরি প্রভুর চরণ ॥ ২০৭ ॥
নাহি দিলে ধরা নিজে সাধ্য কার ধরে ।
বিধির বিধান ছাড়া অচেনা ঠাকুরে ॥ ২০৮ ॥
শ্রীঅঙ্গে নাহিক কোন অঙ্কিত নিশান ।
নাসিকা কপালে কিবা ফোঁটা লম্বমান ॥ ২০৯ ॥
নাই অঙ্গে ভস্মমাখা জটা নাই শিরে ।
রুদ্রাক্ষ তুলসী-মালা গলায় কি করে ॥ ২১০ ॥
গায়ে নাই নামাবলী নাই বাঘাম্বর ।
ধুনি জ্বালা সঙ্গে চেলা মুখে হর হর ॥ ২১১ ॥
পরিধান একমাত্র সুতার বসন ।
প্রয়োজনমত মাত্র গাত্র-আবরণ ॥ ২১২ ॥
নাই শাস্ত্র-বেদ-পাঠ নিরক্ষর বেশ ।
পুরাণ কোরান ছাড়া গ্রন্থ পরমেশ ॥ ২১৩ ॥
মানুষের কথা কিবা ধাতা ফাঁকি পায় ।
নরলীলা ঈশ্বরের বুঝা মহাদায় ॥ ২১৪ ॥
বিশেষতঃ এ লীলায় বড়ই গোপন ।
আপুনি যেমন প্রভু সাঙ্গেরা তেমন ॥ ২১৫ ॥
এই তো চেলার কথা হেতা সরস্বতী ।
সাধক শাস্ত্রজ্ঞ যাঁর দেশময় খ্যাতি ॥ ২১৬ ॥
বেদ-বেদান্তালোচক নানা গুণ তাঁয় ।
দুনিয়ার লোকে কাছে তত্ত্ব আশে যায় ॥ ২১৭ ॥
পুণ্য-দরশন তেহ পুণ্যবান রটে ।
শিক্ষার্থী শিষ্যেরা বহু বাস করে মঠে ॥ ২১৮ ॥
সরল প্রাণেতে করে তত্ত্ব-অন্বেষণ ।
তাই আজি তাঁর কাছে প্রভুর গমন ॥ ২১৯ ॥
সরলতা যেথা হোক যে কোন পন্থীর ।
সেই শ্রীপ্রভুর প্রিয় তথায় হাজির ॥ ২২০ ॥
এই ধারা বরাবর দেখি শ্রীপ্রভুর ।
যেন তিনি জগতের সবার ঠাকুর ॥ ২২১ ॥
দয়ানন্দ অনিমিখে দেখি নিরখিয়ে ।
প্রভুর সমাধি বেশ বিশেষ করিয়ে ॥ ২২২ ॥
অবাক হইয়া কহে অন্তর সরল ।
বেদ-বেদান্তাদি মোরা পড়েছি কেবল ॥ ২২৩ ॥
কিন্তু তার ফল দেখি এই মহাজনে ।
সার্থক জীবন মহাত্মার দরশনে ॥ ২২৪ ॥
জীবন্তপ্রতিম যাহা বেদান্তে বাখান ।
দেখিয়া পাইমু আজি প্রত্যক্ষ প্রমাণ ॥ ২২৫ ॥
শাস্ত্র গাঁথা পণ্ডিতেরা করিয়া মন্থন ।
ঘোলাংশ কেবলমাত্র করে আস্বাদন ॥ ২২৬ ॥
সার অংশ মাখনের অধিকারী এঁরা ।
সচল বিগ্রহবেশী এই মহাত্মারা ॥ ২২৭ ॥
ঠাকুরের লীলা খেলা না যায় বাখানি ।
সঙ্গেতে মিলিলা হেথা সাধিকা ব্রাহ্মণী ॥ ২২৮ ॥
চৌষট্টি যোগিনী নামে পল্লীর মাঝার ।
নিবাসের বাসা-বাটী আছিল তাঁহার ॥ ২২৯ ॥
ঠাকুরের বারংবার তথা আগমন ।
সাধিকার পূর্ববৎ তুষ্ট যাহে মন ॥ ২৩০ ॥
হৃদয়-যাতনা যত একেবারে দূর ।
করিলেন নিজগুণে দয়ার ঠাকুর ॥ ২৩১ ॥
মণিকর্ণিকাদি পঞ্চতীর্থ দরশনে ।
একদিন তরীযোগে মথুরের সনে ॥ ২৩২ ॥
আগমন ঠাকুরের পরম হরিষে ।
উত্তরিল তরী মণিকর্ণিকার পাশে ॥ ২৩৩ ॥
সেস্থান হইতে প্রভু দেখিবারে পান ।
জনাকীর্ণ নগরীর প্রকাণ্ড শ্মশান ॥ ২৩৪ ॥
চিতায় পুড়িছে মড়া অগণ্য অগণ্য ।
নরদৃষ্টি-বিরোধিনী ধূমে পরিপূর্ণ ॥ ২৩৫ ॥
নৌকার ভিতর প্রভু ছিলা ধীর স্থির ।
হঠাৎ উৎফুল্লান্তরে হইলা বাহির ॥ ২৩৬ ॥
উপনীত একেবারে তরীর কিনারে ।
তরণীস্থ সবে যায় ধরিবার তরে ॥ ২৩৭ ॥
বাহ্যহারা সমাধিস্থ এবে প্রভুরায় ।
প্রসন্ন উজ্জ্বল জ্যোতি বন্ধনে বেরায় ॥ ২৩৮ ॥
দিগ্চর আলোময় ছটার প্রভাবে ।
মাঝি-মাল্লা তীর্থ-পাণ্ডা নেহারিছে সবে ॥ ২৩৯ ॥
নয়নে পলক নাই হৃদয় বিস্মিত ।
ভূতলে অতুল দৃশ্য না যার বর্ণিত ॥ ২৪০ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে ভাব ভেঙ্গে যায় ।
তীর্থকার্যে মথুরাদি নামিল ডাঙ্গায় ॥ ২৪১ ॥
ভক্তবর শ্রীমথুরে কহেন তখন ।
ভাবের নয়নে কিবা হৈল দরশন ॥ ২৪২ ॥
ভাঙ্গিয়া অপূর্ব কথা কন প্রভুরায় ।
বলেন দেখিনু এক মূর্তি দীর্ঘকায় ॥ ২৪৩ ॥
পিঙ্গল-বর্ণের জটা শোভে শিরোপরে ।
অঙ্গেতে রজতকান্তি ত্রিশূল শ্রীকরে ॥ ২৪৪ ॥
ধীর মন্দ পদক্ষেপে গম্ভীর ধারায় ।
প্রত্যেক চিতার পাশে বেড়িয়া বেড়ায় ॥ ২৪৫ ॥
প্রত্যেক চিতায় প্রতি দেহীটিকে ভুলে ।
পরংব্রহ্ম-মন্ত্র তার দেন কর্ণফুলে ॥ ২৪৬ ॥
চিতার অপর পার্শ্বে দেখিনু আবার ।
নির্বাণদায়িনী মহাকালীর আকার ॥ ২৪৭ ॥
নিস্তারিণী আপনি মা সুন্দর সুঠামে ।
বিরাজিতা রয়েছেন শ্মশানের ধূমে ॥ ২৪৮ ॥
পুরুষের মন্ত্রপুত দেহীকে লইয়ে ।
যতেক বন্ধন তার দিতেছে খুলিয়ে ॥ ২৪৯ ॥
উন্মুক্ত করিয়া দ্বার আপনার করে ।
প্রেরিছেন সদ্য সদ্য অখণ্ডের ঘরে ॥ ২৫০ ॥
অদ্বৈতের ভূমানন্দ বহু তপস্যায় ।
গুহারণ্যবাসী ঋষি তপস্বী না পায় ॥ ২৫১ ॥
তাই দেন বিশ্বনাথ যে লহে শরণ ।
জীব হয় শিব যদি কাশীতে মরণ ॥ ২৫২ ॥
পশ্চাতে কহেন প্রভু আশ্চর্য ব্যাপার ।
যে শিবদর্শন পথে হৈল আমার ॥ ২৫৩ ॥
প্রথমেতে দেখিলাম তেঁহ অতি দূরে ।
সন্নিকটে অগ্রসর হৈল তার পরে ॥ ২৫৪ ॥
পরিশেষে স্পষ্টরূপে প্রত্যক্ষ হইল ।
আমার দেহের মধ্যে মিলাইয়া গেল ॥ ২৫৫ ॥
একেশ্বর প্রভু সৃষ্টিবাস সৃষ্টিস্বামী ।
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশের নিকেতন-ভূমি ॥ ২৫৬ ॥
সৃষ্টি-হেতু তিন গুণে এই দেবত্রয় ।
ঠাকুরের আজ্ঞামত উদয় বিলয় ॥ ২৫৭ ॥
ঠাকুর শ্রীরাম মাত্র সকলের রাজা ।
তাঁহার পুজার হয় ত্রিলোকের পূজা ॥ ২৫৮ ॥
ত্রিলোক-নিবাস তেঁহ সবার ভিতর ।
স্থাবর জঙ্গমরূপে দৃষ্ট চরাচর ॥ ২৫৯ ॥
এক এক রূপে বিদ্যমান অহরহ ।
সৃষ্টির সমষ্টিখানি বিরাট বিগ্রহ ॥ ২৬০ ॥
নিত্যলীলা উভয়েতে ঠাকুর কেবল ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা ভূবনমঙ্গল ॥ ২৬১ ॥
কাশীবাস কর্ম নাশে জীবে পায় ত্রাণ ।
জীব যত দিন দেহ দেহান্তে নির্বাণ ॥ ২৬২ ॥
এই মহা সত্য কথা বহুকাল শুনা ।
প্রভুর বাক্যে হৈল বিশ্বাস-স্থাপনা ॥ ২৬৩ ॥
এ এক অপূর্ব রঙ্গ শ্রীপ্রভুর স্থানে ।
সকল প্রত্যয় হয় তাঁহার বচনে ॥ ২৬৪ ॥
শ্রীবাক্য জনমভূমে জন্মে যে প্রত্যয় ।
সেই সে প্রত্যয়খানি যেন তেন নয় ॥ ২৬৫ ॥
প্রত্যয় প্রত্যয়ী জনে দেয় দেখাইয়ে ।
কি চিত্র আঁকিলা প্রভু বর্ণাক্ষর দিয়ে ॥ ২৬৬ ॥
শ্রীমুখের প্রতিবাক্য প্রত্যেক অক্ষর ।
সিদ্ধ বীজ সিদ্ধ মন্ত্র অক্ষর অমর ॥ ২৬৭ ॥
হোক না পাষাণ ক্ষেত কঠিনাতিশয় ।
কালেতে অঙ্কুর তাহে তুলিবে নিশ্চয় ॥ ২৬৮ ॥
প্রত্যয়ের নামান্তর মাত্র ভগবান ।
যাহার ভিতরে তাঁর নিত্য অধিষ্ঠান ॥ ২৬৯ ॥
বিশ্বাস প্রত্যয় কিবা ভক্তি ভগবানে ।
ভিন্ন ভেদ কিছু নাই এক বস্তু তিনে ॥ ২৭০ ॥
অবিশ্বাস অপ্রত্যয় প্রমাদ ব্যাপার ।
তুলে অন্তঃসারশূক্ত অনর্থ-বিচার ॥ ২৭১ ॥
কলি-কর্ম দুই নষ্ট পরিণাম ফল ।
অসুরে মন্থনে যেন পার হলাহল ॥ ২৭২ ॥
মন্থনে উঠিল বটে বিবিধ জিনিস ।
প্রত্যয় পাইল সুধা তর্কে পার বিষ ॥ ২৭৩ ॥
ফলাশা বিচার তর্কে করে মুঢ় জন ।
বিশ্বাসে উপজে মহা অমূল্য রতন ॥ ২৭৪ ॥
ক'এ কেন ক কহিব কহে যদি ছেলে ।
বিদ্যালাভ নাহি তার হয় কোন কালে ॥ ২৭৫ ॥
বিচারে চিবিয়া খায় কাল কর্ম নাশে ।
সরমে গিলিয়া ফেলে প্রত্যয় বিশ্বাসে ॥ ২৭৬ ॥
শ্রীপ্রভুর দরশন ভাবের নয়নে ।
মানুষে দেখিবে কিবা আভাস না জানে ॥ ২৭৭ ॥
আধ্যাত্মিক সূক্ষ্মরাজ্য দুর্বোধ্যাতিশয় ।
রূপরস-যুদ্ধ চক্ষে দেখিবার নয় ॥ ২৭৮ ॥
ঈশ্বরানুরাগ-রূপ পরিলে অঞ্জন ।
তবে সেই দিব্য দৃশ্য হয় দরশন ॥ ২৭৯ ॥
রছে না সন্দেহ-তমঃ বিদূরিত ধাঁধা ।
কায়মনোবাক্যে যেথা এক সুরে বাঁধা ॥ ২৮০ ॥
ভাবেগর প্রভুদেব ভাবের আধার ।
ভাব ভাষাতীত রাজ্যে সতত বিহার ॥ ২৮১ ॥
পঞ্চভূত মরুতাদি তেজাকাশ ক্ষিতি ।
মন বুদ্ধি অহংকার নিকৃষ্ট প্রকৃতি ॥ ২৮২ ॥
ফুলের মালায় গুপ্ত সূতার মতন ।
প্রকৃষ্ট প্রকৃতি পরাশক্তি যে রকম ॥ ২৮৩ ॥
স্থূল সূক্ষ্মে ওতপ্রোত ব্যাপ্ত চরাচর ।
লীলাকারে খেলা করে সৃষ্টির ভিতর ॥ ২৮৪ ॥
দেখেন বসিয়া পলে পলে এক ঠাঁই ।
সত্বাধার সকলের যেমন গোসাঞি ॥ ২৮৫ ॥
এ হেন ঠাকুরে জীব বুঝিবে কেমনে ।
জ্ঞান-মন-বুদ্ধি-হারা কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ২৮৬ ॥
শাস্ত্র-মহাজন-বাক্যে বিশ্বাস কেবল ।
ভয়ঙ্করী ভবার্ণব পারের সম্বল ॥ ২৮৭ ॥
জয় প্রভু রামকৃষ্ণ মানব-সূরতি ।
কল্পতরু বিশ্বগুরু শক্তি-অধিপতি ॥ ২৮৮ ॥
ভাবমুখে অবস্থিত ভাবের ঠাকুর ।
যে ভূমি হইতে ফুটে সৃষ্টির আঁকুর ॥ ২৮৯ ॥
জয় জয় শূল-অসি ধনু-বেণুধারী ।
শক্তি-সঙ্গ সদারঙ্গ গুপ্তলীলাকারী ॥ ২৯০ ॥
দীন-হীন জগবন্ধু কাঙ্গাল-শরণ ।
শ্রীপদে বিশ্বাস-ভক্তি মাগে এ অধম ॥ ২৯১ ॥
এবে তীর্থবাস-লীলা করহ শ্রবণ ।
সসঙ্গ মথুর হয় প্রয়াগে গমন ॥ ২৯২ ॥
মস্তকমুণ্ডন দান যথাযোগ্য জনে ।
মথুর করিল সাঙ্গ বিধি-অনুক্রমে ॥ ২৯৩ ॥
বিধি-ছাড়া শ্রীশ্রীরায় বিধির বিধাতা ।
অবিধি তাঁহার পক্ষে মুড়াইতে মাথা ॥ ২৯৪ ॥
বুঝাইতে শ্রীমথুরে কহিলা তখন ।
আমাকে করিতে নাই মস্তক মুণ্ডন ॥ ২৯৫ ॥
দিনত্রয় মাত্র হেথা প্রয়াগে কাটিয়ে ।
পুনরায় কাশীধামে আসেন ফিরিয়ে ॥ ২৯৬ ॥
বৃন্দাবনে আগমন অতঃপর কথা ।
তীর্থবাস শ্রীপ্রভুর সুন্দর বারতা ॥ ২৯৭ ॥
বিশ্বাস-ভকতি বৃদ্ধি গাইলে ভারতী ।
একমনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুথি ॥ ২৯৮ ॥
মথুরা হইয়া বৃন্দাবনধামে যেতে ।
অপূর্ব ঘটনা শুন কি হইল পথে ॥ ২৯৯ ॥
কংস-ত্রাসে বসুদেব কৃষ্ণ করি কোলে ।
যে ঘাটে যমুনা পার পলায় গোকুলে ॥ ৩০০ ॥
সেই ঘাটে আসা মাত্র প্রভু গুণমণি ।
দেখিলেন বসুদেব আকুল পরানী ॥ ৩০১ ॥
অন্ধকার যামিনী ভীষণা অতিশয় ।
কোলে কৃষ্ণ রূপে আলো করে দিক্চয় ॥ ৩০২ ॥
যায় পার যমুনার ছুটে ঊর্ধ্বশ্বাস ।
যেখিয়া প্রভুর মহাভাবের উচ্ছ্বাস ॥ ৩০৩ ॥
গভীর সমাধিযুক্ত কিসেও না ছুটে ।
অবিরাম কৃষ্ণনাম কর্ণ-মূলে রটে ॥ ৩০৪ ॥
দুই কানে দুই জনে হৃদয় মথুর ।
কিসেও না হুঁশ অঙ্গে আইল প্রভুর ॥ ৩০৫ ॥
মথুর দেখিয়া পরে অনন্ত-উপায় ।
প্রভুদেবে ল'য়ে যেতে শিবিকা আনায় ॥ ৩০৬ ॥
মহাভাবে ডুবে ডুবে প্রভু পরমেশ ।
নরযানে বৃন্দাবনে করেন প্রবেশ ॥ ৩০৭ ॥
দু তিন প্রহর কাল যায় এ রকম ।
তবে না উদয় বাহ্যজ্ঞানের লক্ষণ ॥ ৩০৮ ॥
পূর্ণভাবে এলে বাহ্য বৃন্দাবন দেখি ।
বর্ণিবার সীমা পার প্রভু এত সুখী ॥ ৩০৯ ॥
বিশেষ বিশেষ শ্রীকৃষ্ণের লীলাস্থলে ।
একবার শ্রীপ্রভুর নয়নে পড়িলে ॥ ৩১০ ॥
সকল বৃত্তান্ত তাঁর হয় উদ্দীপন ।
তখনি চলিয়া যায় বাহ্যিক চেতন ॥ ৩১১ ॥
মহাভক্ত শ্রীমথুর বিচারিয়া মনে ।
ভাগিনা হৃদয়ে বলিলেন সঙ্গোপনে ॥ ৩১২ ॥
নরযানে ল'য়ে যাবে যথা হয় মন ।
কি জানি কোথায় যায় বাহ্যিক চেতন ॥ ৩১৩ ॥
নয়যানে যেতে ইচ্ছা না হয় প্রভুর ।
হৃদয়ে বলেন কথা ভকত মধুর ॥ ৩১৪ ॥
যদি নাহি যান যানে সঙ্গে তুমি রবে ।
বাহকেরা ল’য়ে যান পাছু পাছু যাবে ॥ ৩১৫ ॥
সঙ্গেতে হৃদয় সহ কত লোকজন ।
চলিলেন দরশনে গিরি-গোবর্ধন ॥ ৩১৬ ॥
গোবর্ধন নাম শুনে হৃদয় যাঁহার ।
উথলিয়া হ'য়ে হয় অকূল পাথার ॥ ৩১৭ ॥
সেই লীলাস্থল গিরি চাক্ষুষ দর্শনে ।
কি ব্যাপার হবে হৃদু ভাবে মনে মনে ॥ ৩১৮ ॥
দেখামাত্র লীলাস্থল মনোহর গিরি ।
খেলা করে নানা ধারে ময়ূর ময়ূরী ॥ ৩১৯ ॥
ভাবের আবেগ অঙ্গে তুলিল তুফান ।
শ্রীঅঙ্গ হইল মহাবলের আধান ॥ ৩২০ ॥
কাহার না হয় শক্তি রাখিতে ধরিয়া ।
লম্ফদানে গোবর্ধনে উঠিলেন গিয়া ॥ ৩২১ ॥
পাণ্ডাগণ শ্রীপ্রভুর পাছু পাছু ধায় ।
অনেক যতনে তবে নীচেতে নামায় ॥ ৩২২ ॥
গোটা দিন একই রকমে যায় কেটে ।
বিবিধ উপায় হৈল নেশা নাহি ছুটে ॥ ৩২৩ ॥
শ্রীবঙ্কুবিহারী-মূর্তি-দরশন পরে ।
কৃষ্ণের অধিক শক্তি ইহার ভিতরে ॥ ৩২৪ ॥
দেখামাত্র হইলেন শ্রীপ্রভু অস্থির ।
মহাভাবাবস্থাগত সমাধি গভীর ॥ ৩২৫ ॥
সহজে নাহিক ছুটে ভাব শ্রীপ্রভুর ।
নরযানে কুঞ্জে ফিরে আনিল মথুর ॥ ৩২৬ ॥
কৃষ্ণের মুরতি যত আছে ব্রজধামে ।
মথুরে বলেন সবে ভোগ দেহ কিনে ॥ ৩২৭ ॥
যেখানে দেখেন যাহা সমাধিস্থ তথা ।
মূর্খ আমি কিবা কব ব্রজের বারতা ॥ ৩২৮ ॥
ভক্তভাবে কুলে কুঞ্জে বেড়িয়া বেড়ান ।
লইয়া গৌড়িয়া ভেক প্রভু ভগবান ॥ ৩২৯ ॥
কি সুন্দর মনোহর অক্ষে ভেক ধরে ।
মাধুকরী করিলেন দুয়ারে দুয়ারে ॥ ৩৩০ ॥
একদিন নিধুবনে প্রভু গুণমণি ।
সাক্ষাতে পাইলা এক অপূর্ব রমণী ॥ ৩৩১ ॥
সৌন্দর্যে অপূর্ব নয় গুণ নিরুপম ।
অনুরাগ কান্তি মাখা হৃদি সুশোভন ॥ ৩৩২ ॥
বয়সে প্রাচীনা নাহি কটিতে বসন ।
একমাত্র আল্ফি গায় লজ্জা-আবরণ ॥ ৩৩৩ ॥
হৃদিখানি একেবারে গোপীভাবে ভরা ।
বয়স্কা যদিও ভাবে বালিকার পারা ॥ ৩৩৪ ॥
গলায় পুঁটুলি বাঁধা শালগ্রাম তায় ।
যেমন শ্রী প্রভুদেবে দেখিল তথায় ॥ ৩৩৫ ॥
আনন্দে বিভোর ডাকে দুই হাত তুলি ।
আইস আইস ঘরে দুলালী দুলালী ॥ ৩৩৬ ॥
কত ভাগ্য তোমার পাইনু দরশন ।
দুলালী দেখিয়া হৈল সার্থক জীবন ॥ ৩৩৭ ॥
কভু নহে পরিচিত শ্রীপ্রভুর সনে ।
বুঝ মন দুলালী বলিয়া ডাকে কেনে ॥ ৩৩৮ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভগবান ।
যেরূপ যে চায় তার সেরূপ দেখান ॥ ৩৩৯ ॥
আজীবন ব্রজে বাস দুলালী বাসনা ।
মহাভাবমরী রাই কনক-বরণা ॥ ৩৪০ ॥
সেই শ্রীরাধার মূর্তি প্রভু-অঙ্গে দেখে ।
হাত তুলি দুলালী বলিয়া তাই ডাকে ॥ ৩৪১ ॥
সকল বিস্তার পরিচয় দেওয়া চলে ।
পরীক্ষার্থী দেয় যেন পরীক্ষার স্থলে ॥ ৩৪২ ॥
গুরুদত্ত বিদ্যা নাহি আসে পরীক্ষায় ।
কি বলিবে কি লিখিবে কি আছে ভাষায় ॥ ৩৪৩ ॥
কি দেখান কি শিখান প্রভু নারায়ণ ।
কিরূপ আকার তার বরণ গঠন ॥ ৩৪৪ ॥
কিবা আস্বাদন কেহ বলিতে না পারে ।
আপনে করিয়া ভোগ আপনে পাসরে ॥ ৩৪৫ ॥
এ হেন নারীর কথা না হয় বর্ণন ।
রাধারূপে প্রভু যায়ে দিলা দরশন ॥ ৩৪৬ ॥
গঙ্গামাতা নাম তাঁর ছিল বৃন্দাবনে ।
তাঁরে খুশী ব্রজবাসী জনে জনে চিনে ॥ ৩৪৭ ॥
প্রভুরে দেখিয়া চক্ষু ঝরে অনিবার ।
দুলালী দুলালী বই বাক্য নাহি আর ॥ ৩৪৮ ॥
অবশ আগোটা অঙ্গ শক্তি নাহি চলে ।
প্রসারিয়া বাহু যায় করিবারে কোলে ॥ ৩৪৯ ॥
রবি শশী দেখি যেন উথলে জলধি ।
প্রভুরে পাইয়া তেন গঙ্গামার হৃদি ॥ ৩৫০ ॥
প্রভুও তেমতি প্রীত পেয়ে গঙ্গামাতা ।
ধন্য ধন্য শ্রীপ্রভুর ভক্তবৎসলতা ॥ ৩৫১ ॥
যাহার যেমন সাধ সে ভাবে মিটান ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভগবান ॥ ৩৫২ ॥
কোথা ভক্তচূড়ামণি মথুর বিশ্বাস ।
সসঙ্গ ব্রাহ্মণী কোথা নাহিক তল্লাস ॥ ৩৫৩ ॥
আছে কেহ অন্য আর কিছু নাহি মনে ।
গোটা দিন কেটে যায় মাইর আশ্রমে ॥ ৩৫৪ ॥
হৃদয় লইয়া অন্ন তথায় যোগায় ।
রাত্রি এলে প্রভুদেবে আনিত বাসায় ॥ ৩৫৫ ॥
মাইর উপরে তাঁর বড় হৈল টান ।
প্রত্যুষে উঠিয়া হয় আশ্রমে পয়ান ॥ ৩৫৬ ॥
মাই বিনা অন্য সব হইল অপর ।
আশ্রম হইল যেন আপনার ঘর ॥ ৩৫৭ ॥
অতি পুলকিত মাই বসাইয়া কোলে ।
নানাবিধ ভোজ্য দেন শ্রীবদনে তুলে ॥ ৩৫৮ ॥
উদর পূরায়ে তাঁরে করায়ে ভোজন ।
পশ্চাৎ করেন মহাপ্রসাদ গ্রহণ ॥ ৩৫৯ ॥
ভোজন করিয়া প্রভু মাইর আশ্রমে ।
ভ্রমিতেন হেথা সেথা হৃদয়ের সনে ॥ ৩৬০ ॥
নানা স্থানে ইচ্ছামত করিয়া ভ্রমণ ।
সেই আশ্রমেতে হয় পুনরাগমন ॥ ৩৬১ ॥
যমুনার তীরে একদিন ভগবান ।
পাছে পাছে আছে হৃদু সহ নরযান ॥ ৩৬২ ॥
যতেক লহরী জলে তত ভাব হৃবে ।
উন্মত্ত বিভোর প্রার পরম আহ্লাদে ॥ ৩৬৩ ॥
কালীয়াবরণ যেই কালিন্দীর জল ।
দেখিতে দেখিতে প্রাণ হইল বিহ্বল ॥ ৩৬৪ ॥
হেনকালে সেখানে রাখাল কয় জনা ।
গোপাল সহিতে পার হতেছে যমুনা ॥ ৩৬৫ ॥
ভাবে ভরা মাতোয়ারা প্রভু নারায়ণ ।
সঘনে ডাকেন কৃষ্ণে করিয়া রোদন ॥ ৩৬৬ ॥
নীরদবরণশ্যাম বাঁশী ধরা করে ।
হেলে দুলে শিখিপাখা শিরের উপরে ॥ ৩৬৭ ॥
অধরে মধুর হাসি নেচে নেচে যায় ।
মধুর নূপুর বাদ্য বাজে দুই পায় ॥ ৩৬৮ ॥
বেষ্টিত রাখালবলে লইয়া গোধনে ।
যায় পার যমুনার গোষ্ঠে-গোচারণে ॥ ৩৬৯ ॥
এই যায় ওই কৃষ্ণ মুরলী-বয়ান ।
এত বলি লক্ষ দিয়া ধরিবারে যান ॥ ৩৭০ ॥
ভাব দেখি হৃদয় ধরিল গিয়া তাঁয় ।
সমাধিস্থ প্রভুদেব বাহ্য নাহি গায় ॥ ৩৭১ ॥
সহজে না ছুটে ভাব-আবেশ বিষম ।
নরযানে ল'য়ে হৃদু ফিরিল আশ্রম ॥ ৩৭২ ॥
জলধির গর্ভ যেন রতন-আকর ।
গঙ্গামাই দেখে প্রভু ভাবের সাগর ॥ ৩৭৩ ॥
নিত্যই নূতন ভাব সমুন্বিত গায় ।
ভাবান্তে বসায়ে কোলে বলেন তাঁহায় ॥ ৩৭৪ ॥
ভাবময়ী ব্রজেশ্বরী ভাবের পাথারে ।
দিনে রেতে মেতে মেতে উঠু ডুবু করে ॥ ৩৭৫ ॥
আর নাহি দিব ছেড়ে দুলালী তোমায় ।
রাখিব যতন করি থাকিবে হেথায় ॥ ৩৭৬ ॥
সহাস্য বদনে প্রভু গঙ্গামায়ে কন ।
আতপ তণ্ডুল তুমি করহ ভোজন ॥ ৩৭৭ ॥
সিদ্ধান্ন ভোজন মম মাছ তাহে গাই ।
মাছ ছাড়া সব দিব কহে গঙ্গামাই ॥ ৩৭৮ ॥
পেটের ব্যায়াম বড় মাঝে মাঝে হয় ।
কে বল করিবে মুক্ত কহিল হৃদয় ॥ ৩৭৯ ॥
গঙ্গামাতা বলে আমি নিকাইব হাতে ।
দুলালীর জন্যে প্রাণ পারি ছেড়ে দিতে ॥ ৩৮০ ॥
এইরূপে কিছু দিন যায় বৃন্দাবনে ।
মথুর প্রয়াস করে ফিরিতে ভবনে ॥ ৩৮১ ॥
প্রভু-পরিধানে ব্যক্ত কৈল অভিপ্রায় ।
কথায় নাহিক কোনমতে দেন সায় ॥ ৩৮২ ॥
বারে বারে করে জেদ ভকত মথুর ।
কোন গ্রাহ্য তাহাতে না আইসে প্রভুর ॥ ৩৮৩ ॥
বিপদে পড়িল বড় মথুর বিশ্বাস ।
প্রভুর দেখিয়া ভাব পাইল তরাস ॥ ৩৮৪ ॥
অনুমানি শ্রীপ্রভুর ভাবের বারতা ।
নাহি মন পুনরাগমনে কলিকাতা ॥ ৩৮৫ ॥
নাড়ী ছাড়া কায়া যেন করে হায় হায় ।
কেন এনু তীর্থবাসে নারীর কথায় ॥ ৩৮৬ ॥
স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী শাস্ত্রে কথা রটে ।
বুঝিতে নারিনু এত বুদ্ধি বল ঘটে ॥ ৩৮৭ ॥
তীর্থবাসে যার আশে আসে লোকজন ।
ভবনে আছিল রেতে দিনে সেই ধন ॥ ৩৮৮ ॥
কুমতি হইল তাঁয় তীর্থবাসে এনে ।
বৃন্দাবন-ধন বুঝি যায় বৃন্দাবনে ॥ ৩৮৯ ॥
সংগোপনে হৃদয়ে কহেন সকাতরে ।
করাও বাবার মত ফিরিবারে ঘরে ॥ ৩৯০ ॥
অন্যদিকে গঙ্গামাতা টানে অনিবার ।
প্রাণের দুলালী ছেড়ে নাহি দিব আর ॥ ৩৯১ ॥
বড় ফেরে পড়িলেন প্রভু গুণমণি ।
শুন রামকৃষ্ণ-কথা অমৃত-কাহিনী ॥ ৩৯২ ॥
স্মরণে যাহার নাম বিপদে উদ্ধার ।
ভক্তের কারণে দেখ বিপদ কি তাঁর ॥ ৩৯৩ ॥
যে বা নিরাকারবাদী কি কব তাঁহাকে ।
না মানেন অবতার বুদ্ধির বিপাকে ॥ ৩৯৪ ॥
শুদ্ধমাত্র বুঝেছেন হরি নিরাকার ।
সর্বশক্তিমান পুনঃ করেন স্বীকার ॥ ৩৯৫ ॥
শক্তির আধার যেই এক নারায়ণ ।
আকার ধরিতে তিনি কি হেতু অক্ষম ॥ ৩৯৬ ॥
সর্বশক্তিমানত্ব আকারে লোপ নয় ।
স্বল্পাধারে ধরে তাঁর সব পরিচয় ॥ ৩৯৭ ॥
কাগজের মধ্যে দেখ অল্প আয়তন ।
পৃথিবীর মানচিত্র অঙ্কিত কেমন ॥ ৩৯৮ ॥
দীর্ঘ প্রস্থে আধ হাত আধারের মাঝে ।
তাহার খবর পায় যেই যাহা খুঁজে ॥ ৩৯৯ ॥
সেইমত পরিমিত আকার ভিতর ।
সোনার অক্ষরে লেখা সকল খবর ॥ ৩৯৪ ॥
আরে অবিশ্বাসী মন কি কব তোমারে ।
চরাচর সৃষ্টি স্থিতি বদন-বিবরে ॥ ৩৯৫ ॥
সৃজন পালন নাশ যে শক্তির কাজ ।
মুর্তিমান সদা করে শ্রীঅঙ্গে বিরাজ ॥ ৩৯৬ ॥
টলটল বসুন্ধরা পরণর কাঁপে ।
একবার শ্রী প্রভুর চরণের চাপে ॥ ৩৯৭ ॥
লীলাহেতু নররূপ আকার-ধারণ ।
আছে রোগ শোক তাপ নরের মতন ॥ ৩৯৮ ॥
যেমন মানুষ তাই কিন্তু নহে নর ।
লীলা মানে কিবা বুঝ খেলা নামান্তর ॥ ৩৯৯ ॥
সাজ কাজ অবিকল নরের মতন ।
ভিতরে সুগুপ্ত বিশ্বপতির লক্ষণ ॥ ৪০০ ॥
নগর-ভ্রমণে যথা নবাবের রীতি ।
রূপান্তর ছদ্মবেশ বণিক-প্রকৃতি ॥ ৪০১ ॥
উদ্দেশ্য সাধন নহে চিনিলে প্রজায় ।
ঈশ্বরের নরলীলা সেইরূপ প্রায় ॥ ৪০২ ॥
আনবুদ্ধি প্রতিবাদ সাকারে যে করে ।
শ্রীপ্রভুর বিড়ম্বনা কি কহিব তারে ॥ ৪০৩ ॥
মানুষের বুদ্ধি-বলাতীত ভগবান ।
লীলায় দুর্বল-বেশ কিন্তু শক্তিমান ॥ ৪০৪ ॥
বুঝেছ কি কথা মন বলী বলে কারে ।
বল সত্ত্বে বল যেবা সংবরিতে পারে ॥ ৪০৫ ॥
সর্বসহা ধরা ধর উপমা যেমন ।
ঈষৎ নাড়িলে অঙ্গ কি হয় ঘটন ॥ ৪০৬ ॥
অটল অচল-শৃঙ্গ গগন পরশি ।
খসিয়া পড়িয়া হয় ধুলারেণুরাশি ॥ ৪০৭ ॥
বলি এ ধরায় বলী বলের আধান ।
মাটি হ'য়ে প'ড়ে আছে মাটির সমান ॥ ৪০৮ ॥
ততোধিক কত বলী শ্রীপ্রভু আমার ।
কত লোকে কত বলে করে অত্যাচার ॥ ৪০৯ ॥
না কহেন কোন কথা সব সংবরণ ।
কখন না শুনি এক বর্ণ উচ্চারণ ॥ ৪১০ ॥
অত্যাচারী এই যায় করি অত্যাচার ।
পুনঃ দরশনে তারে আগে নমস্কার ॥ ৪১১ ॥
জয় জয় সর্বসহ জয় মানবমূরতি ।
সর্বশক্তিমান জয় অখিলের পতি ॥ ৪১২ ॥
জয় প্রভু দীনবেশ হীন-অহঙ্কার ।
সৃজন-পালন-লয়-শক্তির আধার ॥ ৪১৩ ॥
জয় বিদ্যাহীন প্রভু নিরক্ষর বেশ ।
মহাবিদ্যাপতি জয় হরি পরমেশ ॥ ৪১৪ ॥
জয় জয় প্রভুদেব ত্যাগিশিরোমণি ।
সকলের মূলাধার অখিলের স্বামী ॥ ৪১৫ ॥
বলের না থাকে কমি সাকার হইলে ।
সর্বদা স্মরণ রাখ নাহি যাবে ভুলে ॥ ৪১৬ ॥
নিরাকার সাকার সকল একেশ্বর ।
এ ভিন্ন যা অন্য নাই যাহার খবর ॥ ৪১৭ ॥
তাও সেই ঈশ্বর দোসর যার নাই ।
এই কথা বারে বারে বলিলা গোসাঁই ॥ ৪১৮ ॥
নিরাকারে রসগন্ধ কিছু নাহি জানি ।
সাকারেতে শ্রীপ্রভুর মধুর কাহিনী ॥ ৪১৯ ॥
সাকারে বিবিধ রস মিষ্ট আস্বাধন ।
ভক্তিসহ দাও প্রভু দেখিতে চরণ ॥ ৪২০ ॥
ভক্ত-ভগবানে খেলা বড়ই সুন্দর ।
বৃন্দাবনে কিবা হয় শুন অতঃপর ॥ ৪২১ ॥
প্রভুর না হয় মন গঙ্গামায় ছেড়ে ।
আসে মথুরের সঙ্গে দক্ষিণশহরে ॥ ৪২২ ॥
হেথায় মথুর করে নানান কৌশল ।
কিন্তু তাহে বিন্দুমাত্র নাহি ফলে ফল ॥ ৪২৩ ॥
প্রভুর স্বভাব শ্রমথুর ভাল জানে ।
সর্বদা যুকতি করে হৃদয়ের সনে ॥ ৪২৪ ॥
মাতৃভক্তি শ্রীপ্রভুর বুঝিয়া প্রবল ।
সংগোপনে কৈল এই যুকতি কৌশল ॥ ৪২৫ ॥
হৃদয়েরে বলিলেন কহিবারে তাঁয় ।
কেন অনর্থক দুঃখ দিবে বৃদ্ধা মায় ॥ ৪২৬ ॥
কত কাঁদিবেন তিনি শুনিলে বারতা ।
কি কারণ ফিরিয়া না যাবে কলিকাতা ॥ ৪২৭ ॥
যখাবৎ হৃদয় করিল নিবেদন ।
শিহরিলা প্রভু শুনি মায়ের রোদন ॥ ৪২৮ ॥
শশব্যস্তে বলিলেন চল তবে যাব ।
মার কাছে কলিকাতা হেথা নাহি রব ॥ ৪২৯ ॥
তেমনি উঠিল যেন কথা শ্রীগোসাঁই ।
করিব বলিলে তাঁর আর রক্ষা নাই ॥ ৪৩০ ॥
গঙ্গামাতা দেখিলেন প্রভু যান চলি ।
কাঁদিতে লাগিলা বলি দুলালী দুলালী ॥ ৪৩১ ॥
কোথায় যাইবে তুমি দুলালী আমার ।
এ হেন আশ্রম মম করিয়া আঁধার ॥ ৪৩২ ॥
রতনসর্বস্ব তুমি নয়নের তারা ।
পেয়ে কেন পুনঃ বল হব তোমা হারা ॥ ৪৩৩ ॥
কাঁদিতে কাঁদিতে মাই ধরিলেন হাতে ।
প্রভু না পারেন আর এক পদ যেতে ॥ ৪৩৪ ॥
যাত্রাকাল গত হবে এই অনুমানে ।
অন্য হাত ধরিয়া ভাগিনা হৃদু টানে ॥ ৪৩৫ ॥
বিষন বিভ্রাটে প্রভু হারা বৃদ্ধি বল ।
বালক-স্বভাব যেন রোদন সম্বল ॥ ৪৩৬ ॥
পরাণ দুলালী কাঁদে দেখি গঙ্গামাতা ।
অন্তরে লাগিল তাঁর নিদারুণ ব্যথা ॥ ৪৩৭ ॥
অমনি ছাড়িয়া দিল ধরা হাত তাঁর ।
হৃদয় লইয়া তাঁরে হৈল আগুসার ॥ ৪৩৮ ॥
তাড়াতাড়ি শ্রীমথুর ল'য়ে ভগবান ।
পুনরার কাশীধামে করিল পয়ান ॥ ৪৩৯ ॥
কথার কথায় প্রভু শুনিলেন কানে ।
একজন শ্রীমহেশ সরকার নামে ॥ ৪৪০ ॥
বীণা-বাদ্য বিশারদ আছেন তথায় ।
শ্রবণ-বিমুগ্ধ এত সুমিষ্ট বাজার ॥ ৪৪১ ॥
বালক স্বভাব প্রভু শুনিবারে মন ।
চলিলেন হৃদু সঙ্গে তার নিকেতন ॥ ৪৪২ ॥
সমাদরে বাদ্যকর বলাইয়া তাঁয় ।
বেঁধে তান তুলে প্রাণ রাগিণী বাজায় ॥ ৪৪৩ ॥
যেমন পশিল কানে বীণা বাজ-ধ্বনি ।
সেইক্ষণে সমাধিস্থ হৈলা গুণমণি ॥ ৪৪৪ ॥
কিছুক্ষণ পরে বাহ্য সমুদিলে গায় ।
চমৎকার বীণকার পুনশ্চ বাজায় ॥ ৪৪৫ ॥
তবে প্রভু অম্বিকায় সম্বোধিয়া কন ।
হুঁশে রাখ বীণাবাদ্য করিব শ্রবণ ॥ ৪৪৬ ॥
কেবা প্রভু কে অম্বিকা বুঝা মহা ভার ।
একাত্ম লীলায় মাত্র বিভিন্ন আকার ॥ ৪৪৭ ॥
বাহ্যভূমে অবস্থান করিয়া ঠাকুর ।
শুনিলেন বীণাবাদ্য শ্রবণ-মধুর ॥ ৪৪৮ ॥
বিভীষিকাময়ী ধরা ঘোর অন্ধকার ।
অবিদ্যায় দিশেহারা গতি দুনিয়ার ॥ ৪৪৯ ॥
সতত ঘূর্ণায়মান দারুণ দুর্দশা ।
নিবারিতে শ্রীপ্রভুর ছদ্মবেশে আসা ॥ ৪৫০ ॥
জগৎকারণ প্রভু কপালমোচন ।
দীনবন্ধু দীনত্রাতা দুর্গতি-খণ্ডন ॥ ৪৫১ ॥
অহেতুক কৃপাসিন্ধু কল্যাণনিধান ।
অনুক্ষণ এক চিন্তা জীবের কল্যাণ ॥ ৪৫২ ॥
এই শিবপুরী মধ্যে অনেকেই
শৈবী ।
তান্ত্রিক সাধক বহু ভৈরব ভৈরবী ॥ ৪৫৩ ॥
বামাচারী বীরভাবে কঠিন সাধনা ।
পরে পদে পদের স্খলন সম্ভাবনা ॥ ৪৫৪ ॥
তম ধরি সত্ত্বে গতি বড়ই দুষ্কর ।
সিদ্ধিলাভ দু-একের পতনই বিস্তর ॥ ৪৫৫ ॥
বিশ্বগন্ধ শ্রীপ্রভুর গন্ধ মনোহর ।
যেখানে যে কেহ আছে ভক্ত মধুকর ॥ ৪৫৬ ॥
কালের কৌশল-চক্রে আঘ্রাণ পাইয়ে ।
গুনগুন রবে আসে ছুটিয়ে ছুটিয়ে ॥ ৪৫৭ ॥
প্রভু-দরশনে আসে তান্ত্রিকের গণ ।
সাধনা-সম্বন্ধে বহু কথোপকথন ॥ ৪৫৮ ॥
শ্রীপ্রভুর সাধনে সিদ্ধ অন্তরে ধারণা ।
করজোড়ে একদিন করিল প্রার্থনা ॥ ৪৫৯ ॥
করুণা করিয়া যদি করেন গমন ।
যেথা তারা করে চক্রে সাধন ভজন ॥ ৪৬০ ॥
কৃপাপরবশ প্রভু আনন্দিত মনে ।
চলিলা ভৈরবী-চক্রে তাহাদের সনে ॥ ৪৬১ ॥
শ্রীপ্রভু দেখেন গিয়া অপরূপ ছবি ।
প্রতি ভৈরবের সঙ্গে জনেক ভৈরবী ॥ ৪৬২ ॥
পরে যত ভৈরবীরা প্রভু গুণধরে ।
কারণ-পানের জন্য অভ্যর্থনা করে ॥ ৪৬৩ ॥
অস্বীকার কৈলে প্রভু তবু করে জেদ ।
শ্রীপ্রভু বলেন মাগো ইহাতে নিষেধ ॥ ৪৬৪ ॥
তখন করিয়া চক্র সবে একত্তরে ।
বসিল কারণপানে প্রথা অনুসারে ॥ ৪৬৫ ॥
জপ ধ্যান গেল উড়ে আনন্দে উন্মত্ত ।
পাইয়া আনন্দময়ে সবে করে নৃত্য ॥ ৪৬৬ ॥
মনোরথ পূর্ণ আমি সাধন সফল ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা শ্রবণমঙ্গল ॥ ৪৬৭ ॥
মথুর মানস কৈল সাধু সন্ত জনে ।
বসন-বাসন-ধন-অর্থ-বিতরণে ॥ ৪৬৮ ॥
শুনি হরষিত অতি প্রভু গুণমণি ।
দানের ব্যবস্থা নিজে করিলা আপুনি ॥ ৪৬৯ ॥
মথুরের দানধর্ম শ্রীপ্রভুর পায় ।
তবে যে বানের ইচ্ছা প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ৪৭০ ॥
প্রার্থিগণে যে যা চায় তাই করে দান ।
বিতরণ অতিশয় প্রভুর বিধান ॥ ৪৭১ ॥
অতঃপর ঘরে ফিরিবার হয় কথা ।
তীর্থবাস শ্রীপ্রভুর অপূর্ব বারতা ॥ ৪৭২ ॥
মথুর করিল ইচ্ছা গয়ায় বাইতে ।
ভবনাভিমুখে তার ফিরিবার পথে ॥ ৪৭৩ ॥
প্রভুর নিকটে কথা করে উত্থাপন ।
অমনি মথুরে প্রভু কহিলা তখন ॥ ৪৭৪ ॥
গয়া থেকে আসিয়াছি যাই যদি গয়া ।
নিশ্চয় যাইবে নাহি রবে এই কায়া ॥ ৪৭৫ ॥
'গয়া থেকে আসিয়াছি' বুঝেছ কি মন? ।
প্রভুর জনমকথা করহ স্মরণ ॥ ৪৭৬ ॥
শিহরাঙ্গ শ্রীমপুর শুনিয়া বারতা ।
ল'য়ে তাঁয় সত্ববরে ফিরিল কলিকাতা ॥ ৪৭৭ ॥
আসামাত্র শ্রীমথুরে শ্রীআজ্ঞা তাঁহার ।
প্রচুর ভাণ্ডারা ত্বরা করহ যোগাড় ॥ ৪৭৮ ॥
মথুরের নাই ত্রুটি যে আজ্ঞা যখন ।
বড় খুশী ভাণ্ডারাকরিয়া নিরীক্ষণ ॥ ৪৭৯ ॥
পুনশ্চ কহিলা প্রভু ভকতরতনে ।
বিতর ভাণ্ডারা যত দীন-দুঃখিগণে ॥ ৪৮০ ॥
অতিথি সন্ন্যাসী নাগা ক্ষুধাতৃষাতুর ।
যুক্তহস্তে দাও সবে প্রচুর প্রচুর ॥ ৪৮১ ॥
যেমন শ্রীপ্রভুদেব ভাণ্ডারী তেমন ।
দিনে রেতে মুক্তহস্তে করে বিতরণ ॥ ৪৮২ ॥
প্রভু-আজ্ঞা-সম্পাদনে নাহি করে ভয় ।
তীর্থে শুনি পঁচাশি হাজার টাকা ব্যয় ॥ ৪৮৩ ॥
পুনরায় ঘরে এসে ভাণ্ডারা যোগাড় ।
খাতির নাহিক ব্যয় হাজার হাজার ॥ ৪৮৪ ॥
বৃন্দাবনে শ্যামকুণ্ড রাধাকুণ্ড দুটি ।
উভয় কুণ্ডের কিছু রজ আর মাটি ॥ ৪৮৫ ॥
আনিয়াছিলেন প্রভু সঙ্গে আপনার ।
এবে তাহে কি করিলা শুন সমাচার ॥ ৪৮৬ ॥
হৃদয়ে হইল আজ্ঞা ছড়াইয়া দিতে ।
পঞ্চবটতলে আর তার চারিভিতে ॥ ৪৮৭ ॥
বাকি অংশ প্রভু নিজে লইয়া শ্রীকরে ।
পুঁতিয়া দিলেন নিজ সাধনাকুটীরে ॥ ৪৮৮ ॥
আর কিবা বলিলেন শুন শুন মন ।
আজি থেকে এইস্থান হৈল বৃন্দাবন ॥ ৪৮৯ ॥
অতঃপর অনুমতি ভক্ত শ্রীমথুরে ।
মহোৎসব আয়োজন করিবার তরে ॥ ৪৯০ ॥
আনন্দ-উৎফুল্লান্তর মথুর এখন ।
বৈষ্ণব গোস্বামিবর্গে পাঠায় লিখন ॥ ৪৯১ ॥
কেহ না রহিল বাকি রহে যে যেখানে ।
দলে দলে উপনীত নির্ধারিত দিনে ॥ ৪৯২ ॥
বৈষ্ণব-ভোজনে হেথা কুবেরী ভাণ্ডারা ।
প্রচুর প্রচুর দ্রব্য ভাণ্ডারেতে ভরা ॥ ৪৯৩ ॥
পঞ্চবটমূলে হয় মহা মহোৎসব ।
মহানন্দে সংকীর্তনে প্রমত্ত বৈষ্ণব ॥ ৪৯৪ ॥
এই মহোৎসবে নাই আনন্দের ইতি ।
আনন্দে আরম্ভ যেন আনন্দে সমাপ্তি ॥ ৪৯৫ ॥
ঘটার উৎসব যেন তেমতি বিদায় ।
ষোল ষোল টাকা প্রতি গোস্বামী জনায় ॥ ৪৯৬ ॥
অন্যান্য বৈষ্ণব প্রতি এক এক টাকা ।
পরমার্থ কি পাইল বাহ্যে রৈল ঢাকা ॥ ৪৯৭ ॥
জীবের উপরে এত প্রভুর করুণা ।
বিস্তারে
গভীরে তার মিলে না তুলনা ॥ ৪৯৮ ॥
তুলা দিতে ভাণ্ডারেতে একমাত্র সিন্ধু ।
সে সিন্ধু তলিয়া গিয়া বোধ হয় বিন্দু ॥ ৪৯৯ ॥
দীনবন্ধু জগবন্ধু তাপিত নিস্তার ।
করুণার ঘন মূর্তি প্রভু অবতার ॥ ৫০০ ॥
এক চিন্তা জীবহিত জনম অবধি ।
প্রত্যক্ষে দেখিবে তিনি চক্ষু দেন যদি ॥ ৫০১ ॥
শ্যামাগত শ্রীপ্রভুর দেহ মন প্রাণ ।
যা কিছু তাঁহার তাঁয় সব সমর্পণ ॥ ৫০২ ॥
নিজের বলিতে কিছুমাত্র নাই তাঁর ।
শ্যামাপদ-সুধাহ্রদে মগ্ন অহংকার ॥ ৫০৩ ॥
দেহমধ্যে শ্রীপ্রভুর করিলে তল্লাস ।
দেখিবে শ্রীপ্রভুর স্থানে অম্বিকার বাস ॥ ৫০৪ ॥
তনুখানি ঠাকুরের যন্ত্রের মতন ।
যন্ত্রিরূপা কালিকার আবাস-ভবন ॥ ৫০৫ ॥
চলান বলান যেন তেন চলা বলা ।
শ্রীদেহ-আধারে মাত্র অম্বিকার খেলা ॥ ৫০৬ ॥
মায়ের অসংখ্য নাম কটা কব আমি ।
উমা শ্যামা কালী তারা শিবানী ভবানী ॥ ৫০৭ ॥
ইত্যাদি ইত্যাদি যত গোটা অভিধান ।
এইবারে এক বৃদ্ধি রামকৃষ্ণ নাম ॥ ৫০৮ ॥
ভক্তিপথে সেবা পদে আত্মনিবেদন ।
জ্ঞানমার্গে ভাবাতীত ভূমে নিমগন ॥ ৫০৯ ॥
উভয়েই সমরসে অবস্থা সমান ।
রসজ্ঞ ব্যতীত অন্যে না জানে সন্ধান ॥ ৫১০ ॥
যাবতীয় দেবদেবী অবতারগণ ।
স্থূল সূক্ষ্ম ভূতাদি ইন্দ্রিয় সহ মন ॥ ৫১১ ॥
জগৎ-কারণরূপে শাস্ত্রে ব্যাখ্যা যাঁর ।
তিনি প্রভু রামকৃষ্ণ জননী সবার ॥ ৫১২ ॥
দর্শন স্পর্শন যেবা করিয়াছে রায় ।
ধন্য সে মানুষ তার কর্মকাণ্ড সায় ॥ ৫১৩ ॥
রাণাঘাট-ভুক্ত মহকুমা সাতক্ষীরে ।
তাহার নিকটে পল্লী নাম সোনাবেড়ে ॥ ৫১৪ ॥
নামে যেন সোনাবেড়ে কাজে তাই বটে ।
এইখানে মথুরের জন্মভূমি ভিটে ॥ ৫১৫ ॥
রামকৃষ্ণ-উপাসকে তীর্থের সমান ।
মহাভক্ত মথুরের জনমের স্থান ॥ ৫১৬ ॥
অন্যান্য অনেক গ্রাম তার সন্নিহিত ।
সেই সব মথুরের জমিদারিভুক্ত ॥ ৫১৭ ॥
প্রয়োজনহেতু ভক্তবর এই বার ।
পরিদরশনে করে যাত্রার যোগাড় ॥ ৫১৮ ॥
প্রভুকে ছাড়িয়া যেতে নাহি হয় মন ।
সঙ্গে যাইবার তরে করে নিবেদন ॥ ৫১৯ ॥
পরস্পর দোঁহে দোঁহা ভাব ভালবাসা ।
বড়ই মধুর নাই বর্ণিবার ভাষা ॥ ৫২০ ॥
কখন প্রভুতে ভাব ইষ্টের মতন ।
কখন স্নেহের ভাব সন্তানে যেমন ॥ ৫২১ ॥
কখন মিত্রের ভাবে জিজ্ঞাসেন হিত ।
কখন রক্ষকভাবে সতর্ক বিহিত ॥ ৫২২ ॥
কখন জনকভাবে পিতার মতন ।
সস্ত্রীক শয্যার মধ্যে একত্র শয়ন ॥ ৫২৩ ॥
কখন জ্যেষ্ঠের ভাবে সান্ত্বনার কথা ।
কখন আত্মীয়ভাবে সমতা মমতা ॥ ৫২৪ ॥
সপ্রেম সম্বন্ধ কিবা পঞ্চভাবে মাখা ।
যে জানে সে জানে চিত্র নাহি যায় আঁকা ॥ ৫২৫ ॥
যখনই যাইতে সঙ্গে ভক্তবর কয় ।
অমনি সানন্দে সায় তিল দেরি নয় ॥ ৫২৬ ॥
বাজিল আনন্দ-ডঙ্কা মথুরের ঘরে ।
লোকজন হলে বলে দেশে যাত্রা করে ॥ ৫২৭ ॥
সসজ্জা মথুর রাজরাজের মতন ।
সসঙ্গ ঠাকুর দেশে উপনীত হন ॥ ৫২৮ ॥
অন্যত্রে প্রভুর সঙ্গে একত্রে বিহার ।
কি আনন্দ মথুরের নহে বর্ণিবার ॥ ৫২৯ ॥
হৃদয় ভরিয়া তাহা ভোগের ইচ্ছায় ।
নৌকায় চূর্ণির খালে বেড়িয়া বেড়ায় ॥ ৫৩০ ॥
নিকটস্থ এক গ্রামে দারিদ্র্য প্রবল ।
অনাথ কাঙ্গাল দুঃখী সেখানে কেবল ॥ ৫৩১ ॥
করুণহৃদয় প্রভু দ্রবিয়া অন্তরে ।
অন্ন-বস্ত্রবানহেতু কহেন মথুরে ॥ ৫৩৪ ॥
মাথা ভরা তেল আর নূতন বসন ।
প্রতি জনে এক এক দিনের ভোজন ॥ ৫৩৫ ॥
মথুর করিল দান অনুমতিক্রমে ।
জন্মদাতা জন্ম মাত্র ধন বিতরণে ॥ ৫৩৬ ॥
মথুরের গুরুবংশ সন্নিকট গ্রামে ।
গমনের প্রয়োজন বিশেষ কারণে ॥ ৫৩৬ ॥
হৃদয় সহিত প্রভু হস্তীর উপর ।
আপুনি শিবিকামধ্যে চলে ভক্তবর ॥ ৫৩৭ ॥
ত্বরায় তথায় কার্য করি সমাপন ।
ফিরিয়া আইল কলিকাতার ভবন ॥ ৫৩৮ ॥
সঙ্গসুখ শ্রীপ্রভুর মত্ততর রস ।
রসজ্ঞে স্বতই করে তার পরবশ ॥ ৫৩৯ ॥
অতিরিক্ত বিমর্ষ অভাবে তাহার ।
উচাটন মন চিত্তে রোল হাহাকার ॥ ৫৪০ ॥
বিশেষ এখন এই মথুরের দশা ।
অতিরিক্ত পাশে বৃদ্ধি অতিরিক্ত আশা ॥ ৫৪১ ॥
উদাস বিষয়কর্মে লাগে জ্বালাতন ।
প্রভুসঙ্গরসপানে ইচ্ছা অনুক্ষণ ॥ ৫৪২ ॥
মনোমত কর্মকাণ্ডে বুদ্ধি শক্তি বল ।
উদ্যোগ উদ্দাম চেষ্টা উপায় সম্বল ॥ ৫৪৩ ॥
অভাব অভাব সদা পূর্ণিত ভাণ্ডার ।
সরল উদার চিত্তে বিমুগ্ধ দুয়ার ॥ ৫৪৪ ॥
ভক্তি-ধন-বিদ্যা-বল-ভাগ্য-গুণমান ।
অবনীতে অদ্বিতীয় একা অসমান ॥ ৫৪৬ ॥
দেখিয়াছি তুলা দিয়ে অর্জুনের সাথে ।
সে মাত্র খদ্যোৎবৎ রাখি চন্দ্রিমাতে ॥ ৫৪৭ ॥
অলঙ্কার অত্যুক্তির অস্পর্শ এখানে ।
কোটিতেও কোটি ত্রুটি রামকৃষ্ণায়নে ॥ ৫৪৮ ॥
লীলার আকর লীলা সমষ্টি লীলার ।
লীলা যেন সেই মত নায়ক ইহার ॥ ৫৪৯ ॥
সত্য বটে ভাসিল না সাগরের জলে ।
সুগুরু হইতে গুরু গুরুতর শিলে ॥ ৫৫০ ॥
বানরসহায়ে রগ রাক্ষস বিনাশ ।
দুর্জয় ধনুক হাতে ত্রিভুবন-ত্রাস ॥ ৫৫১ ॥
হইল না সত্য বটে ধরা গোবর্ধন ।
পুতনা প্রভৃতি কংস অসুর-নিধন ॥ ৫৫২ ॥
কালীয়দমন-কীর্তি কালিন্দীর জলে ।
আলোড়ন ত্রিভুবন স্বর্গ ধরাতলে ॥ ৫৫৩ ॥
পার্থসারথির বেশে অষ্টাদশ দিনে ।
অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা নষ্ট রণে ॥ ৫৫৪ ॥
বিরাট দ্বারকালীলা ঐশ্বর্যের সার ।
পঞ্চদশ হয় কোটি কৃষ্ণ পরিবার ॥ ৫৫৫ ॥
ইত্যাদি ইত্যাদি কত না আসে সংখ্যায় ।
তদধিক ততোধিক প্রভুর লীলায় ॥ ৫৫৬ ॥
ভাসা চোখে ভেসে যায় না হয় দর্শন ।
চতুর্বেদাধিক কিসে রামকৃষ্ণায়ন ॥ ৫৫৭ ॥
আধ্যাত্মিক ভাবরাজ্যে একক ঈশ্বর ।
নিরক্ষর বেশ প্রভু লীলার আকর ॥ ৫৫৮ ॥
এখানে মথুর কিবা করে শুন মন ।
তেমতি মথুরনাথ মথুর যেমন ॥ ৫৫৯ ॥
ব্রহ্মবারি প্রবাহিনী গঙ্গার উপর ।
ভাসাইল তরী এক অতীব সুন্দর ॥ ৫৬০ ॥
সর্বাঙ্গীণ সজ্জীভূত উপরে ভিতরে ।
ফল মূল ভোজ্যদ্রব্য রাখা স্তরে স্তরে ॥ ৫৬১ ॥
প্রাণতুল্য প্রভুদ্বেষে তুলিয়া তাহার ।
গঙ্গাবায়ু-সেবনেতে বিহারে বেড়ায় ॥ ৫৬৩ ॥
শীতল সলিলকণা সহ গন্ধবহ ।
সুখসেব্য অতিশয় বহে অহরহ ॥ ৫৬৪ ॥
দক্ষিণ দক্ষিণেতর দুই পাশ খোলা ।
অধঃ উর্ধ্ব দশদিকে প্রকৃতির খেলা ॥ ৫৬৫ ॥
এখানে তরণীমধ্যে ঠাকুর আপুনি ।
ভবসিন্ধু ভরি যাঁর চরণ দুখানি ॥ ৫৬৬ ॥
ভোগে যোগে পরিপূর্ণ মথুরের ন্যায় ।
কুত্রাপি কখন নাহি জন্মিল ধরায় ॥ ৫৬৭ ॥
মায়ের ইচ্ছায় যেন চালিত ঠাকুর ।
প্রভুর ইচ্ছায় তেন এখানে মথুর ॥ ৫৬৮ ॥
নবদ্বীপ অভিযুগে চলিল তরণী ।
গৌরাঙ্গদেবের যেখা জন্মলীলাভূমি ॥ ৫৬৯ ॥
দিনরাত্রি অনুক্ষণ শয়নে স্বপনে ।
হৃষ্টান্তর ভক্তবর বাবার যতনে ॥ ৫৭০ ॥
মধুরসম্বন্ধ-রসে ভুলিয়াছে সব ।
উঠিতে বসিতে মাত্র বাবা বাবা রব ॥ ৫৭১ ॥
পবিত্রাণু ভাগীরথী আনন্দে উথলা ।
খেলিছে নাচিছে তনু তরঙ্গের মালা ॥ ৫৭২ ॥
বক্ষেতে ধরিয়ে সেই অভয় চরণ ।
জীব উদ্ধারিতে তাঁর যেখানে জনম ॥ ৫৭৩ ॥
ধীর মন্দ সমীরণ ধীরে বহে বারি ।
ধীরে দুলাইয়া অঙ্গ ধীর চলে তরী ॥ ৫৭৪ ॥
ধীর স্থির একবারে ঘাটের সমীপ ।
তীরস্থিত যেইখানে তীর্থ নবদ্বীপ ॥ ৫৭৫ ॥
শ্রীপ্রভুর পূর্বেকার আদিম ধারণা ।
সন্দেহ গৌরাঙ্গদেব অবতার কিনা ॥ ৫৭৬ ॥
পুরাণ কি ভাগবতে নাহি কোন তত্ত্ব ।
সন্দেহে দোলায়মান মিথ্যা কি এ সত্য ॥ ৫৭৬ ॥
নবদ্বীপ-আগমনে মিলিবে নিশ্চয় ।
দরশন গৌরাঙ্গের যদি সত্য হয় ॥ ৫৭৭ ॥
সেই হেতু বর্তমানে হেথা আগমন ।
এখানে সেখানে ধামে তত্ত্ব অন্বেষণ ॥ ৫৭৮ ॥
গৌরাঙ্গোপাসক বহু গোস্বামী এখানে ।
মতি রতি ভক্তি ভারি গৌরাঙ্গ-চরণে ॥ ৫৭৯ ॥
কাঠের বিগ্রহ মূর্তি মন্দিরে স্থাপনা ।
ভক্তিভরে সেবা রাগ পুজা উপাসনা ॥ ৫৮০ ॥
প্রতি গোস্বামীর ঘরে প্রভুর গমন ।
যদি কোথা মিলে দেবভাবের লক্ষণ ॥ ৫৮১ ॥
ক্ষুন্নমন প্রভুদেব বিফল প্রয়াসে ।
তরী যেখা উপনীত ফিরিত মানসে ॥ ৫৮২ ॥
কি আশ্চর্য শুন কথা অবাক কাহিনী ।
প্রতি আগমনে যবে ছাড়িল তরণী ॥ ৫৮৩ ॥
অদূরে গঙ্গার গর্ভে তরণী যখন ।
সে সময়ে খোলা চোখে হয় দরশন ॥ ৫৮৪ ॥
কিশোর বালকদ্বয় অপূর্ব মূরতি ।
সোনার বরণ অঙ্গে শিরে ভাতে জ্যোতি ॥ ৫৮৫ ॥
ঊর্ধ্বে হস্ত উত্তোলন সহাস্যয বদনে ।
শ্রীপ্রভুর মুখ চেয়ে আসিছে বিমানে ॥ ৫৮৬ ॥
তখন ঠাকুর কিবা ভাবেতে মাতিয়ে ।
এলোরে এলোরে বলি উঠিল চেঁচিয়ে ॥ ৫৮৭ ॥
বলিতে বলিতে কথা কিশোরের দ্বয় ।
ঠাকুরের শ্রীদেহেতে লীনরূপে লয় ॥ ৫৮৮ ॥
আপনে আপনি গত তখনি গোসাঞি ।
জড়বৎ সমাধিস্থ বাহ্য বোধ নাই ॥ ৫৮৯ ॥
বিরাট আলয় যেন ঠাকুরের দেহ ।
নামরূপ জগতের সম্মিলনা গৃহ ॥ ৫৯০ ॥
যাবতীয় দৃষ্ট রূপ দেহে লীন পায় ।
বিরাট বিগ্রহ তনু রামকৃষ্ণ রায় ॥ ৫৯১ ॥
মথুর চিনেছে ভাল প্রভু গুণধরে ।
দিনে রেতে গেতে শুতে সঙ্গ নাহি ছাড়ে ॥ ৫৯২ ॥
প্রভুর এ করুণা তেন তাঁহার উপর ।
কিবা হেন ভাগ্যবান অবনী ভিতর ॥ ৫৯৩ ॥
যথা ইচ্ছা সঙ্গে ল'য়ে করেন বিহার ।
ঘরেতে অচলা লক্ষ্মী পূর্ণিত ভাণ্ডার ॥ ৫৯৪ ॥
কামিনী-কাঞ্চন যাহা বিষের মতন ।
অণুরে অমৃত-ধারা করে বরিষণ ॥ ৫৯৫ ॥
ঘরে দারা জগদম্বা নন্দন নন্দিনী ।
প্রভুর শ্রীপদে ভক্তি কিবা ভাগ্য মানি ॥ ৫৯৬ ॥
মহাসাধ মিটাইল লইয়ে কাঞ্চনে ।
দীন দুঃখী দেব দ্বিজ সাধুর তোষণে ॥ ৫৯৭ ॥
পালন প্রভুর আজ্ঞা সকলের আগে ।
যোগায় যতনজরে যখন যা লাগে ॥ ৫৯৮ ॥
সুকোমল বারাণসী রেশমী বসন ।
কোমলাঙ্গ প্রভু যেন তাহার মতন ॥ ৫৯৯ ॥
বিবিধ বর্ণের পাড় শোভমান কত ।
সাজাইতে প্রভুদেবে কত আনাইত ॥ ৬০০ ॥
তখনি যোগায় তাহা যাহা ইচ্ছা হয় ।
খইর মোয়ায় করে শত তঙ্কা ব্যয় ॥ ৬০১ ॥
অবিদ্যারূপিণী এই কামিনী-কাঞ্চন ।
যাদুতে যাহার মুগ্ধ গোটা ত্রিভুবন ॥ ৬০২ ॥
কিবা বিশ্ববিমোহিনী শক্তি বল ধরে ।
বিমোহে শিবের মন জীবে রাখা দূরে ॥ ৬০৩ ॥
ভক্ত শ্রীমথুর কিন্তু প্রভুর কৃপায় ।
ভাই ল'য়ে ভাগে জলে জলে যে ডুবায় ॥ ৬০৪ ॥
যেখানে অবিদ্যা সেথা নাই ভগবান ।
কহিয়া সাধিয়া প্রভু দিলেন প্রমাণ ॥ ৬০৫ ॥
অধিক অনর্থকরী এ দোহা হইতে ।
নাহি কিছু অন্য আর ঈশ্বরের পথে ॥ ৬০৬ ॥
হরি-দরশন-সাধ বলবতী যার ।
পরিহার্য উভয়েই অবশ্য তাহার ॥ ৬০৭ ॥
নচেৎ না মিলে হরি হরির নিয়ম ।
কুপায় মথুর কৈল বিধি অতিক্রম ॥ ৬০৮ ॥
ভকতবৎসল প্রভু ভক্তপ্রাণ নাম ।
ভক্তের নিকটে নাই তাঁহার এড়ান ॥ ৬০৯ ॥
ভাঙ্গিয়া আপন বিধি নিরবধি র'ন ।
যেখানে মথুর সঙ্গে কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৬১০ ॥
সন্ধ্যার প্রাক্কালে এবে প্রায় প্রতিদিন ।
নানা সাজে শ্রীমথুর সাজায় ফিটন ॥ ৬১১ ॥
সুন্দর ফিটন গাড়ি কি কব বারতা ।
উচ্চৈঃশ্রবা সম অশ্ব জোড়া জোড়া জোতা ॥ ৬১২ ॥
দেবাদির রূপ যেন দ্রুতগতি এত ।
চক্ষুর নিমিখ মধ্যে অদৃশ্য হইত ॥ ৬১৩ ॥
ফিটনের মধ্যভাগে প্রভুকে রাখিয়ে ।
নিজেই চালায় অশ্ব চাবুক ধরিয়ে ॥ ৬১৪ ॥
সুন্দর মধুর যেন সুন্দর ফিটন ।
কি সুন্দর প্রভুদেব তাহে সমাসীন ॥ ৬১৫ ॥
পবনের বেগে গাড়ি ছুটে ময়দানে ।
সাহেব মেমেরা সব ভ্রমে যেইখানে ॥ ৬১৬ ॥
না মানে সাহেব বিবি চাবুক চালায় ।
ফিটনের গতিরোধ বুঝেন যেথায় ॥ ৬১৭ ॥
দিনেক ভ্রমণ করি ময়দান মাঠে ।
উপনীত আদি ব্রাহ্মসমাজ নিকটে ॥ ৬১৮ ॥
জিজ্ঞাসিলা প্রভুদেব কি হয় এখানে ।
মথুর ভাঙ্গিয়া কয় প্রভু বিদ্যমানে ॥ ৬১৯ ॥
প্রভুর বালক ভাব ক'ন শ্রীমথুরে ।
দেখিব কিরূপ হয় ইহার ভিতরে ॥ ৬২০ ॥
উতরিয়া গাড়ি থেকে চলিল মথুর ।
সমাজ-মন্দিরে যেন শ্রীআজ্ঞা প্রভুর ॥ ৬২১ ॥
এখন শ্রীপ্রভুদেবে অল্প লোকে চিনে ।
কর্মে মত্ত আপনার অতি সংগোপনে ॥ ৬২২ ॥
সরল সহজ প্রভু স্বভাবে যেমন ।
শ্রীঅঙ্গে নাহিক কোন বাহ্যিক লক্ষণ ॥ ৬২৩ ॥
সমাসীন সংগোপনে সমাজ-মন্দিরে ।
সমথুর শ্রোতাদের সঙ্গে একধারে ॥ ৬২৪ ॥
ব্রাহ্মসমাজের কথা শুন কহি মন ।
নিরাকার অরূপের বক্তৃতা ভজন ॥ ৬২৫ ॥
দর্শনের অদর্শন তার গন্ধ নাই ।
যদিও বচনে আছে বেদান্ত দোহাই ॥ ৬২৬ ॥
শ্রবণ মনন নিদিধ্যাসন কেমন ।
অস্তি ভাতি প্রীতি কিবা বিচারান্দোলন ॥ ৬২৭ ॥
দেহাত্মবুদ্ধির নাশে নেতি নেতি বোল ।
ত্যাগ-নবনীত নাই আসক্তির ঘোল ॥ ৬২৮ ॥
উচ্চরোল গণ্ডগোল কালো নহে কটা ।
সাহেবালি ধরনেতে বক্তৃতার ঘটা ॥ ৬২৯ ॥
বক্তৃতার ঘটা আজি বিপুলায়োজনে ।
নয়ন মুদিয়া যত শ্রোতৃবর্গ শুনে ॥ ৬৩০ ॥
যেন কত ধ্যানে মগ্ন হয়েছে সবাই ।
ব্যাপার বিদিত সব হইলা গোসাঞি ॥ ৬৩১ ॥
অতি নিরমল স্বচ্ছ শ্রীপ্রভুর মন ।
সৃষ্টি গোটা জোড়া এক প্রকাণ্ড দর্পণ ॥ ৬৩২ ॥
যা কিছু যেথায় নহে তিলার্ধ তফাত ।
অবিকল ঘটনার হয় প্রতিভাত ॥ ৬৩৩ ॥
ধীরে ধীরে শ্রীমথুর পুছে প্রভুবরে ।
কি বাবা কেমনে হেথা দেখিছ কাহারে ॥ ৬৩৪ ॥
উত্তরিলা প্রভুদেব মৃদু মন্দ হাসি ।
দেখাইয়া শ্রীকেশবে অঙ্গুলি নির্দেশি ॥ ৬৩৫ ॥
তরুণ যুবক এই অনুরাগী জনা ।
হেলে দুলে নড়িতেছে ইহার ফাতনা ॥ ৬৩৬ ॥
অপর যতেক তুমি
দেখিছ চৌপাশে ।
ধিয়ানের নামমাত্র ভানে আছে বোসে ॥ ৬৩৭ ॥
শ্রীকেশব সেন অতি সরল আচার ।
অতঃপর সময়েতে কব সমাচার ॥ ৬৩৮ ॥
উপবিষ্ট এত শ্রোতা সমাজ-আসরে ।
কারও না পড়িল লক্ষ্য প্রভুর উপরে ॥ ৬৩৯ ॥
দেখা নাহি দিলে তাঁরে দেখে সাধ্য কার ।
প্রভুকে স্মরিয়া শুন চরিত তাঁহার ॥ ৬৪০ ॥
সরলতাপ্রিয় প্রভু সরলতাময় ।
সরলতা যেথা তথা আকর্ষণ হয় ॥ ৬৪১ ॥
শ্রীপ্রভুর আকর্ষণ কিরূপ প্রকার ।
আকৃষ্ট জানিতে না পারে সমাচার ॥ ৬৪২ ॥
অগণ্য যোজনান্তর বহু দূর দেশ ।
যেখানে আপনাসনে আছেন দিনেশ ॥ ৬৪৩ ॥
কোথায় ভবন তাঁর কোথা ধরাতল ।
কিসে টেনে তুলে শূন্যে জলধির জল ॥ ৬৪৪ ॥
সে কল কৌশল মাত্র দিবাকর জানে ।
আধার বিহীনে জল খেলিছে বিমানে ॥ ৬৪৫ ॥
অলক্ষ্যে শ্রীকেশবের আকর্ষিয়া মন ।
সমথুর করিলেন প্রতি আগমন ॥ ৬৪৬ ॥
সময়
এখন নয় কিছু আছে দেরি ।
কাঁটায় গাঁথিয়া তায় ছাড়িলেন ডুরি ॥ ৬৪৭ ॥
যে খেলা খেলিলা প্রভু কেশবের সনে ।
উপজে বিমল ভক্তি ভারতী-শ্রবণে ॥ ৬৪৮ ॥
রামকৃষ্ণলীলাগীতি অমৃত কথন ।
মত্ত হ'য়ে কর দ্বিবারাতি আন্দোলন ॥ ৬৪৯ ॥
চিরকেলে ভাষা কথা আছে বিশ্ববেড়া ।
নাড়িলেই লাডুগুলি পড়ে তার গুঁড়া ॥ ৬৫০ ॥
প্রভুর ভারতী অতি কল্যাণ-নিধান ।
সায় এই দ্বিতীয় খণ্ডের লীলাগান ॥ ৬৫১ ॥
তৃতীয় খণ্ডের কথা মঞ্জুর কথন ।
প্রচার প্রকাশ আর ভক্ত-সংজোটন ॥ ৬৫২ ॥
দ্বিতীয়
খণ্ড সমাপ্ত