তৃতীয় খণ্ড

হৃদয়ের দুর্গোৎসবে প্রভুর জ্যোতিঃপথে গমন
এবং মথুরের দেহত্যাগ


জয় জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় শ্রীশ্রীমাতা জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় ইষ্টগোষ্ঠী জয় ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


সম্পদ-বিপদ সুখ-দুঃখ অগণন ।
ভাল-মন্দ জন্ম-মৃত্যু বিয়োগ-মিলন ॥ ১ ॥

উত্তাল তরঙ্গমালা সহিয়ে ভুগিয়ে ।
কালের প্রবাহে জীব চলিছে ভাসিয়ে ॥ ২ ॥

কোথায় আকর-ভূমি কবে কোন্ খানে ।
অবিরাম গতি কোথা কিছুই না জানে ॥ ৩ ॥

সচেতন অচেতন জাগিয়া ঘুমায় ।
শ্রীচৈতন্যময়ী মহামায়ার মায়ায় ॥ ৪ ॥

খুল মা চৈতন্যদ্বার চৈতন্য-রূপিণী ।
ত্রিগুণধারিণী তুমি ব্রহ্মসনাতনী ॥ ৫ ॥

তুমি তম-বিনাশিনী মহাবিদ্যা নাম ।
অজ্ঞান-তিমির হরি দেহ চক্ষুদান ॥ ৬ ॥

ঊর মা কমলে কণ্ঠে ঊর একবার ।
বাজুক হৃদয়-বীণা উঠুক ঝঙ্কার ॥ ৭ ॥

বীণাবাদ্য-বিনোদিনী বেদময়ী তুমি ।
পুরাও মনের সাধ শ্রীবাগ্‌ বাদিনী ॥ ৮ ॥

বাসনা গাইব মনে রামকৃষ্ণ লীলা ।
সভক্তে শ্রীপ্রভুদেব কি করিলা খেলা ॥ ৯ ॥

ভাবমুখে অবস্থিত কেবা এ ঠাকুর ।
কেই বা সেবকদ্বয় হৃদয় মথুর ॥ ১০ ॥



বাল্যাবধি শ্রীপ্রভুর সঙ্গেতে হৃদয় ।
ছায়াবৎ পাছু পাছু দিবারাতি রয় ॥ ১১ ॥

বিশেষতঃ যে অবধি পুরীতে এখানে ।
দ্বাদশবৎসরব্যাপী সাধন-ভজনে ॥ ১২ ॥

দু-এক সাধন নহে দুস্তর বিস্তর ।
প্রভুর ছিল না যবে দেহের খবর ॥ ১২ ॥

অনুক্ষণ নিমগন অসাধ্য-সাধনে ।
শ্রীদেহের সত্তাবোধ লুপ্ত ক্ষণে ক্ষণে ॥ ১৩ ॥

কত যে করিল সেবা তখন হৃদয় ।
আঁকিবার লিখিবার কহিবার নয় ॥ ১৪ ॥

মানুষে অসাধ্য তেন সেবা-সমাধানে ।
বুদ্ধিতে না আসে তেঁহ করিল কেমনে ॥ ১৫ ॥

সুনিশ্চয় হৃদয়ের দেবাংশে জনম ।
নররূপে শ্রীপ্রভুর সেবার কারণ ॥ ১৬ ॥

লম্বা প্রস্থে দীর্ঘাকার বীর বলবান ।
শিরানদী মধ্যে রক্তস্রোত বহমান ॥ ১৭ ॥

সমবয়ঃ শ্রীপ্রভুর প্রখর যৌবন ।
দেহখানি সেইমত যেন প্রয়োজন ॥ ১৮ ॥

বাহুল্য বাখান নয় যদি তারে বলি ।
কল্পতরু শ্রীদেহের একমাত্র মালী ॥ ১৯ ॥

প্রভুর সঙ্গেতে ভাব সম্বন্ধ হৃদয় ।
আত্মীয়-মমতা-মাখা অতি সুমধুর ॥ ২০ ॥

ঠাকুরের সঙ্গে থাকে সেবা করে তাঁর ।
আপন আত্মীয়-সমতুল্য ব্যবহার ॥ ২১ ॥

সেই সে মানুষবেশে সমতন্ত্রধারী ।
কেবা এরা কোথাকার বুঝিতে না পারি ॥ ২২ ॥

বুদ্ধিতে বুঝিতে গেলে বোধ হয় হেন ।
জাগ্রতে নিদ্রিতাবস্থা স্বপ্ন দেখি যেন ॥ ২৩ ॥

ভাব ভাবাভীতে যিনি নিত্য বিদ্যমান ।
সৃষ্টি স্রষ্টা পাতা কর্তা সর্বশক্তিমান ॥ ২৪ ॥

স্থূল-সুক্ষ্মে সমধারা ইন্দ্রিয়-অতীত ।
কিমভূত কিমাকার বিচিত্র চরিত ॥ ২৫ ॥

সেই বস্তু নরদেহে নরের প্রকৃতি ।
নর-রঙ্গ নর-সঙ্গ নরবৎ গতি ॥ ২৬ ॥

অথচ নরের সঙ্গে সব বিপরীত ।
দেখিতে বুঝিতে নর-বুদ্ধির অতীত ॥ ২৭ ॥



হৃদয়ের ষোলআনা মনের ধারণা ।
প্রভুর ভাগিনে তেঁহ প্রভু তার মামা ॥ ২৮ ॥

যখনি চাহিবে তারে আধ্যাত্মিক ধন ।
তখনি পাইবে তাহা বিনা আকিঞ্চন ॥ ২৯ ॥

স্ত্রীবিয়োগে এইবার বৈরাগ্য-উদয় ।
ভাব-দরশন-হেতু প্রভুদেবে কয় ॥ ৩০ ॥

তদুত্তরে প্রভু তায় কন বুঝাইয়ে ।
কেন হৃদু কিবা হবে এ সব লইয়ে ॥ ৩১ ॥

দেখহ অবস্থা মোর কিবা সর্বদাই ।
পরনের ধুতি তাও ঠিক থাকে নাই ॥ ৩২ ॥

তুমিও যদ্যপি হও এ হেন প্রকার ।
বল দেখি মুখে জল কে দিবে কাহার ॥ ৩৩ ॥

থাক তুমি সেবাকর্মে আছ যেইমত ।
ইহাতেই সব কর্ম হইবে সাধিত ॥ ৩৪ ॥

এখন হৃদুর ঘটে আর একজনা ।
বরাবরি এক জেদ নাহি শুনে মানা ॥ ৩৫ ॥

সান্ত্বনা-স্বরূপ পুনঃ প্রভুদেব কন ।
মায়ের হইলে ইচ্ছা হইবে তখন ॥ ৩৬ ॥

আজি থেকে হৃদয়ের পূজা-কালিকার ।
চতুর্গুণ অনুরাগ-ভক্তি-সহকার ॥ ৩৭ ॥

পূজান্তে বিজন স্থানে প্রভুর মতন ।
যজ্ঞসূত্র-বস্ত্রত্যাগ ধ্যানের সাধন ॥ ৩৮ ॥

একদিন কালিকার পুজার সময় ।
বর্ণনানুভূতি ভাব অল্প স্বল্প হয় ॥ ৩৯ ॥

অর্ধবাহ্যদশাবস্থা বসিয়া আসনে ।
হেনকালে শ্রীমথুর হাজির সেখানে ॥ ৪০ ॥

নেহারি হৃদুর দশা প্রভুদেবে কন ।
ও বাবা হৃদয়ে কেন করিলে এমন ॥ ৪১ ॥

মায়ে চেয়েছিল বুঝি পাইয়াছে তাই ।
মথুরে উত্তর এই করিলা গোসাঞি ॥ ৪২ ॥

পুনরায় প্রভুদেবে ভক্তবর কয় ।
তোমার এ খেলা বাবা অন্য কার নয় ॥ ৪৩ ॥

মোদের কি কাজ ইথে মোরা কি করিব ।
নন্দিভৃঙ্গী দুঁহ মোরা সেবার থাকিব ॥ ৪৪ ॥



ভুক্তভোগী শ্রীমথুর তাই হেন কয় ।
আক্কেল পেয়েছে পূর্বে শুন পরিচয় ॥ ৪৫ ॥

ইহার কিঞ্চিৎ আগে ঠাকুরের স্থানে ।
মথুরের নিবেদন ভাবের কারণে ॥ ৪৬ ॥

হৃদয়ের মত প্রভু কতই বুঝান ।
তথাপি প্রভুর বাক্যে নাহি দেন কান ॥ ৪৭ ॥

বারংবার মহাজেদে প্রভুদেব কন ।
মায়ের হইলে ইচ্ছা হইবে তখন ॥ ৪৮ ॥

হরষিত-চিত ভক্ত প্রভুর উত্তরে ।
ফিরিয়া আসিল জানবাজারের ঘরে ॥ ৪৯ ॥

দিনেকে আবেশভাব তারে ধরিয়াছে ।
উচ্চ ভূমিগত মন নাহি নামে নীচে ॥ ৫০ ॥

বিষয়-বাসনা ভোগ-লালসা বিস্তর ।
নিম্নদিকে আকর্ষণ করে নিরন্তর ॥ ৫১ ॥

ঢোঁড়ার মুষিক ধরা বিপদ যেমন ।
গিলিতে কি উগারিতে উভয় অক্ষম ॥ ৫২ ॥

তেমতি অবস্থাপন্ন মথুর এখানে ।
পাঠাইল বার্তা পরে প্রভু-সন্নিধানে ॥ ৫৩ ॥

ভকতবৎসল প্রভু হইয়া বিদিত ।
স্বরায় মথুরাবাসে হৈলা উপনীত ॥ ৫৪ ॥

দেখিলেন অঙ্গ-মধ্যে ভাবের লক্ষণ ।
উচ্চে মন, মুখ-বক্ষ রক্তিম-বরণ ॥ ৫৫ ॥

ভাব-রাজ্যেশ্বরে ভক্ত পাইয়া গোচরে ।
অভয় চরণ দুটি জড়াইয়া ধরে ॥ ৫৬ ॥

বলে বাবা লহ ফিরে ভাবটি তোমার ।
না বুঝিয়া মেগেছিনু মাাগিব না আর ॥ ৫৭ ॥

যদ্যপি রাখহ তুমি এইরূপ ভাবে ।
বিষয়-সম্পত্তি বাবা সবি নষ্ট হবে ॥ ৫৮ ॥

মাগিয়াছিলাম ভাব, মর্ম নাহি বুঝে ।
এ ভাব কেবল বাবা তোমাকেই সাজে ॥ ৫৯ ॥

শ্রীহস্ত বুলাইয়া বক্ষে ভাঙ্গাইলা ভাব ।
মথুর বাঁচিল এবে পাইয়া স্বভাব ॥ ৬০ ॥



হেথা হৃদয়ের কথা শুন শুন মন ।
রামকৃষ্ণ-লীলাগীত অমৃত কথন ॥ ৬১ ॥

একদিন রাত্রিকালে প্রভু ভগবান ।
পঞ্চবটী অভিমুখে ধীরগতি যান ॥ ৬২ ॥

হৃদয় গামছা গাড়ু ল'য়ে নিজ হাতে ।
যদি হয় প্রয়োজন চলিছে পশ্চাতে ॥ ৬৩ ॥

হেনকালে হৈল এক দিব্য দরশন ।
দেখিল শ্রীপ্রভু স্থূলদেহধারী নন ॥ ৬৭ ॥

রক্তমাংস নাহি তায় জ্যোতিঃঘন তনু ।
জ্যোতির ছটার তেজে পরাজিত ভানু ॥ ৬৮ ॥

আলোকিত চারিদিকে সব দেখা যায় ।
অবিকল যেই মত দিনের বেলায় ॥ ৬৯ ॥

জ্যোতির্ময় তনুখানি চলে শূন্যপথে ।
দেহের বাহক পদ পড়ে না মাটিতে ॥ ৭০ ॥

এখানে দর্শক হৃদু মনে মনে খুশে ।
দেখিতেছি হেন বুঝি নয়নের দোষে ॥ ৭১ ॥

দোষ নষ্ট হেতু করে চক্ষুর মার্জন ।
যতবার দেখে, দেখে একই রকম ॥ ৭২ ॥

আপনার দেহে দৃষ্টি করিয়া চালনা ।
সে দেখে, সে নয় আর অন্য এক জনা ॥ ৭৩ ॥

জ্যোতির্ময় দেহধারী দেব-অনুচর ।
চিরকাল দেবসঙ্গ দেব-সেবাপর ॥ ৭৪ ॥

দেবাংশ-সম্ভূত দেব-সেবার কারণ ।
স্বতন্ত্র শরীরমাত্র করে দরশন ॥ ৭৫ ॥

নিজের স্বরূপ তেঁহ হইয়া বিদিত ।
অন্তরে আনন্দস্রোত যেগে প্রবাহিত ॥ ৭৬ ॥

ভুলিলেন আপনারে, ভুলিল সংসার ।
ভুলিলেন ভালমন্দ যত কিছু আর ॥ ৭৭ ॥

অর্ধবাহ্য ভাবাবেশ উন্মত্তের ন্যায় ।
ধরিয়া প্রভুর নাম ডাকে উভরায় ॥ ৭৮ ॥

কহে আর নাহি মোরা স্থূলদেহধারী ।
চল যাই দেশে দেশে জীবোদ্ধার করি ॥ ৭৯ ॥

এত শুনি প্রভুদেব হৃদয়েরে কন ।
থাম্ হৃদু, কি হয়েছে কি হেতু এমন ॥ ৮০ ॥

যদি শুনে লোকজন আসিবে ছুটিয়ে ।
এখনই দিবে এক হাঙ্গামা বাধিয়ে ॥ ৮১ ॥

হৃদয় আপনহারা প্রভুদেবে কন ।
তুমি যেন রামকৃষ্ণ আমিও তেমন ॥ ৮২ ॥

তবে প্রভু নিজ বস্ত্র বাঁধিয়ে কোমরে ।
ত্বরান্বিত উপনীত হৃদুর গোচরে ॥ ৮৩ ॥

হৃদয়ের বক্ষদেশে হাত বুলাইয়ে ।
বলিলেন থাক্ শালা জড়বৎ হয়ে ॥ ৮৪ ॥

তখনি হৃদ্বয় হৈল আছিল যেমন ।
প্রভুদেবে কহে তবে করিয়া ক্রন্দন ॥ ৮৫ ॥

চাহিয়া শ্রীমুখ-পানে করুণার স্বরে ।
বলে মামা কেন জড় করিলে আমারে ॥ ৮৬ ॥

বুঝাইয়া প্রভু তায় করিলেন শান্ত ।
বলিলেন কালে হবে এবে হও ক্ষান্ত ॥ ৮৭ ॥



ভাবানন্দ নষ্ট হেতু হৃদু ক্ষুণ্ণ-মন ।
গম্ভীর গম্ভীর ভাব কেমন কেমন ॥ ৮৮ ॥

তার সঙ্গে অভিমান উদয় অন্তরে ।
ভাবিল আনিব ভাব সাধনার জোরে ॥ ৮৯ ॥

এত বলি আরম্ভিল সাধন-ভজন ।
পঞ্চবট-মূলে কৈল স্থান নিরূপণ ॥ ৯০ ॥

প্রভুর সাধনাসন ছিল যেই স্থলে ।
সচৈতন্য সিদ্ধভূমি তপস্যার বলে ॥ ৯১ ॥

সেই সে আসনে বসা নরে অসম্ভব ।
পীঠরক্ষা-হেতু বৃক্ষে আছেন ভৈরব ॥ ৯২ ॥

যদ্যপি কখন কেহ বসিবারে যায় ।
ভৈরব ভীষণ চক্রে তখনি খেদায় ॥ ৯৩ ॥

একদিন রাত্রিকালে হৃদূর গমন ।
আসনেতে উপবিষ্ট ধ্যানের কারণ ॥ ৯৪ ॥

আচম্বিতে অকস্মাৎ উঠিল চেঁচিয়ে ।
ওগো মামা রক্ষা কর, মোলাম পুড়িয়ে ॥ ৯৫ ॥

শুনিয়া কাতরধ্বনি শ্রীপ্রভূ ত্বরিত ।
পঞ্চবটীতলে গিয়া হৈলা উপনীত ॥ ৯৬ ॥

হৃদয় ব্যাকুল প্রাণে কহিল তাঁহারে ।
ওগো রক্ষা কর মোরে অঙ্গ গেল পুড়ে ॥ ৯৭ ॥

ধ্যানেতে বসিয়া ছিনু মুদিয়া নয়ন ।
কি জানি অলক্ষ্যে থাকি কেবা একজন ॥ ৯৮ ॥

আগুন আমার অঙ্গে দিয়াছে চালিয়ে ।
ওগো মামা, রক্ষা কর, মোলাম জ্বলিয়ে ॥ ৯৯ ॥

সকল বিদিত প্রভু তবে না তখন ।
অঙ্গস্পর্শ করি কৈলা জ্বালা নিবারণ ॥ ১০০ ॥

শ্রীপ্রভু বলেন, বাক্য করি অবহেলা ।
আপুনিই আনিতেছ আপনার জ্বালা ॥ ১০১ ॥

সাধনা তোমার কেন কি কাজ সাধনে ।
সেবা কর, সব হবে আমার সেবনে ॥ ১০২ ॥



এখানে রহস্য এক শুন শুন মন ।
যার জন্য কষ্টকর দুষ্কর সাধন ॥ ১০৩ ॥

সেই ধন মুর্তিমান চক্ষের উপর ।
তথাপি সাধনা-ইচ্ছা কেন করে নর ॥ ১০৪ ॥

অপ্রত্যয় অবিশ্বাস কারণ ইহার ।
রুপা বিনা অবতারে নহে ধরিবার ॥ ১০৫ ॥

নিত্যাপেক্ষা নরলীলা দুর্বোধ্যাতিশয় ।
ঘোল খায় নিত্যসঙ্গ ভাগিনে হৃদয় ॥ ১০৬ ॥

ঈশ্বরীর মহাশক্তি দিয়ে আবরণ ।
প্রত্যক্ষ ঈশ্বরে করে প্রত্যক্ষ গোপন ॥ ১০৭ ॥

যার অঙ্গোদ্ভবা মায়া তাঁহারে ঢাকায় ।
আশ্চর্য মহিমা মহামায়ার মায়ায় ॥ ১০৮ ॥

হাকিমের চেয়ে মন পিয়াদার জোর ।
ত্রিভুবন বিমোহন মায়ায় বিভোর ॥ ১০৯ ॥

এই দেখিলেন হৃদু প্রত্যক্ষ নয়নে ।
কেবা তিনি পুনঃ তিনি কাহার ভাগিনে ॥ ১১০ ॥

উভয়ের স্বস্বরূপ দুর্লভ দর্শন ।
অদ্ভুতানন্দানুভব সব বিস্মরণ ॥ ১১১ ॥

এবে বুঝিলেন তাঁর সাধ্য কতদূর ।
তাই করা শ্রেয়ঃ যাহা কহেন ঠাকুর ॥ ১১২ ॥

মনের বিষাদ কিন্তু কিসেও না যায় ।
বিরাগ উদাসভাব কালিকা-সেবায় ॥ ১১৩ ॥



আশ্বিনে অম্বিকাপুজা দেশে গিয়া ঘরে ।
প্রবল হৃদুর ইচ্ছা উদিল অস্তরে ॥ ১১৪ ॥

শ্রীগোচরে শ্রীপ্রভুর বাসনা জানায় ।
বুঝিয়া আপন মনে সায় দিলা রায় ॥ ১১৫ ॥

হৃদুও আপন মনে বুঝিল তখন ।
প্রভুও তাহার সঙ্গে করিবে গমন ॥ ১১৬ ॥

মথুর শুনিয়া তত্ত্ব কহিল অমনি ।
বাবায় পূজায় ছেড়ে নাহি দিব আমি ॥ ১১৭ ॥

পুজায় হৃদুর ঘরে যাহা হবে ব্যয় ।
সে সকল দিব আমি ভক্তরাজ কয় ॥ ১১৮ ॥

বাবায় দিব না কিন্তু এই মোর কথা ।
হৃদয় শুনিয়া পায় হৃদয়েতে ব্যথা ॥ ১১৯ ॥

ঘটনার পুনরুক্তি করিতে অক্ষম ।
হরিষে বিষাদ-হেতু হৃদু ক্ষুণ্ণমন ॥ ১২০ ॥

তাহারে সান্তনা-বাক্যে কহেন ঠাকুর ।
কি কারণ ক্ষুন্নমন দুঃখ কর দূর ॥ ১২১ ॥

নিত্য নিত্য তোর পুজা দেখিবার তরে ।
স্বপ্নদেহে আবির্ভাব হইব মন্দিরে ॥ ১২২ ॥

পূজার দিবস-ত্রয়ে ক্ষণের সময় ।
দেখিতে পাইবি তুই অঙ্কে কিন্তু নয় ॥ ১২৩ ॥

এত বলি উপদেশ দিলেন পুজার ।
ব্রাহ্মণ-নিয়োগে যেবা হবে তন্ত্র্রধার ॥ ১২৪ ॥

উপাসনা করিয়া মধ্যাহ্নে কেবল ।
খাবি মিছরির পানা সহ গঙ্গাজল ॥ ১২৫ ॥

যেমত কহিনু আমি করিলে এমন ।
নিশ্চয় অম্বিকা পূজা করিবে গ্রহণ ॥ ১২৬ ॥

গুনিয়া প্রভুর বাক্য হৃদুর পরান ।
ঘরে গিয়া আজ্ঞাবত করে অনুষ্ঠান ॥ ১২৭ ॥

সপ্তমী-বিহিতা পুন্দা শাল্ব করি রেতে ।
নীয়াদন-কালে হৃদু পাইল দেখিতে ॥ ১২৮ ॥

জ্যোতির্ময় যেহে প্রভুদেব রামকৃষ্ণ ।
দাড়াইয়া প্রতিমার পাশে ভাবাবিষ্ট ॥ ১২৯ ॥

এইরূপে তিন দিন ক্ষণের সময় ।
শ্রীপ্রভুর আবির্ভাব দেখিল হৃদয় ॥ ১৩০ ॥



হায়রে মানুষ-বুদ্ধি ততোধিক মন ।
দেখিয়া শুনিয়া এত না হয় চেতন ॥ ১৩১ ॥

সতত আবদ্ধ তুমি আছ মূলাধারে ।
কখন বা লিঙ্গে আর কখন উদরে ॥ ১৩২ ॥

ঘুর বনে আগমনে দুঃখ হয় দূর ।
বারে বারে উপদেশে কহিলা ঠাকুর ॥ ১৩৩ ॥

জাগ মা চৈতন্তদেবী ঘুমাও না আর ।
প্রবেশিতে দূর বনে যেহ অধিকার ॥ ১৩৪ ॥

উর মা বিশুদ্ধ পদ্মে হও অধিষ্ঠান ।
মিটারে মনের সাধ গাই লীলা-গান ॥ ১৩৫ ॥



সমাপিয়ে পুজোৎসব আপনার ঘরে ।
ফিরিয়া আসিল হৃহ প্রভুর গোচরে ॥ ১৩৬ ॥

এল গেল শীত গ্রীষ্ম যেইমত হয় ।
দারুণ বরষাগত ভীষণাতিশয় ॥ ১৩৭ ॥

আবরি দিনেশ-কারা নীরদের দল ।
তর্জন গর্জনে ঢালে অবিরত জল ॥ ১৩৮ ॥

উথলিলা ভাগীরথী গেরুয়া-বসনা ।
উন্মাদিনী-বেশ সিন্ধুসঙ্গম-বাসনা ॥ ১৩৯ ॥

অতি বেগবতী গতি কুটি দু'ফালিয়ে ।
ব্যাকুল পরানে ছুটে দুকূল ভাসায়ে ॥ ১৪০ ॥

শীতল জলের কণা করিয়া ধারণ ।
পবনের বেগে ছুটে আপনি পবন ॥ ১৪১ ॥

স্বাস্থ্যভঙ্গ জীবগণে নানা রোগ ধরে ।
কালাগত শ্রীমথুর শয্যাগত জ্বরে ॥ ১৪২ ॥

দিন দিন বৃদ্ধি পীড়া ঔষধ না যানে ।
বিকারেতে পরিণত সাত আট দিনে ॥ ১৪৩ ॥

শহরেতে যাবতীয় চিকিৎসকগণ ।
বিফল প্রয়ালে হৈল হতাশ এখন ॥ ১৪৪ ॥

স্নেহের ভাজন এত যদিও মথুর ।
দেখিবারে একদিনও না গেলা ঠাকুর ॥ ১৪৫ ॥

হৃদয় প্রেরিত নিত্য মথুরের ঘরে ।
দিনের ঘটনা তত্ত্ব আনিবার তরে ॥ ১৪৬ ॥

সময়ের সঙ্গে রোগ হয় বাড়াবাড়ি ।
ক্রমে পরে বাক্‌রোধ গতিহীন নাড়ী ॥ ১৪৭ ॥

তাড়াতাড়ি আত্মীয়েরা সকলেই জুটে ।
তীরস্থ করিতে যায় ল'য়ে কালীঘাটে ॥ ১৪৮ ॥

শেষদিন মথুরের হইয়া বিদিত ।
হৃদয়েও প্রভু নাহি করিলা প্রেরিত ॥ ১৪৯ ॥

অপরাহ্ণ সমাগত হইল যখন ।
দুই তিন ঘণ্টা প্রভু ভাবে নিগমন ॥ ১৫০ ॥

দক্ষিণশহরে রাখি আপন শরীর ।
জ্যোতির্ময় পথে সূক্ষ্মে হইলা হাজির ॥ ১৫১ ॥

পরান-প্রতিম ভক্তে প্রেরণ-কারণে ।
আকাঙ্ক্ষিত দেবীলোকে রথ-আরোহণে ॥ ১৫২ ॥

ভাবভঙ্গে ঠাকুরের যবে বাহ্যজ্ঞান ।
সন্ধ্যা প্রায় সমাগত যায় দিনমান ॥ ১৫৩ ॥

হৃদয়ে ডাকিয়ে তবে প্রভুদেব কন ।
শ্রীশ্রীমাতা অম্বিকার অনুচরীগণ ॥ ১৫৪ ॥

মথুরে লইয়া রথে দেবীলোকে গেল ।
শুনিয়া স্তম্ভিত হৃদু দাঁড়িয়ে রহিল ॥ ১৫৫ ॥

পুরীতে চাকরি করে কর্মচারীগণ ।
গিয়াছিল কালীঘাটে বিষন্নবদন ॥ ১৫৬ ॥

নিশীথে ফিরিয়া আসি দিল সমাচার ।
সাধের মথুর নাহি ইহলোকে আর ॥ ১৫৭ ॥

দ্বাদশবৎসরব্যাপী শ্রদ্ধা সযতনে ।
ছিল ভক্ত অনুরক্ত প্রভুর সেবনে ॥ ১৫৮ ॥

সাধিয়া লীলার কর্ম যে জন্য জনম ।
স্বস্থানে পয়ান কৈল কালিকা-ভুবন ॥ ১৫৯ ॥

মথুর হৃদয় দোঁহে নন্দিভৃঙ্গীদ্বয় ।
মথুর সেবিল অর্থে সামর্থ্যে হৃদয় ॥ ১৬০ ॥

রামকৃষ্ণ-লীলা-গীত শান্তির আগার ।
গাহিতে গাহিতে চল ভবসিন্ধুপার ॥ ১৬১ ॥