তৃতীয় খণ্ড
শ্রীশ্রীমাতাদেবীর দক্ষিণেশ্বরে আগমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বাঞ্ছাকল্পতরু ।
জয় জয় ভগবান জগতের গুরু ॥
জয় জয় মাতৃদেবী জগৎ-জননী ।
রামকৃষ্ণভক্তিদাত্রী চৈতন্যদায়িনী ॥
জয় জয় ইষ্টগোষ্ঠী জয় ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বৈরাগ্যানুরাগাকর তম-বিনাশন ।
বিশ্বাস-প্রত্যয়-ভক্তি-শান্তি-নিকেতন ॥ ১ ॥
ভবসিন্ধু তরিবারে অপরূপ ভেলা ।
শ্রবণ কীর্তন রামকৃষ্ণ-মহালীলা ॥ ২ ॥
এবে শ্রীশ্রীমাতাদেবী পিতার আলয়ে ।
বয়স সতর ছাড়ি গিয়াছে এগিয়ে ॥ ৩ ॥
যে গ্রামে জন্মিলা মাতাদেবী ঠাকুরানী ।
পুণ্যময়ী লীলা তীর্থধামে তারে গণি ॥ ৪ ॥
শ্রীপ্রভুর পদরেণু বিকীর্ণ যেখানে ।
বিধাতার সুদুর্লভ তপস্যা-সাধনে ॥ ৫ ॥
অন্তরঙ্গ শ্রীপ্রভুর ভক্তগণ যেথা ।
ভক্তিসহ বারে বারে লুটাইল মাথা ॥ ৬ ॥
কিন্তু কি অবাক কাণ্ড বুঝিতে না পারি ।
এখানের লোকজন আবদ্ধ সংসারী ॥ ৭ ॥
বিষয়েই বদ্ধদৃষ্টি বিভোর তাহায় ।
পরচর্চা দ্বেষবাদ কেবল কথায় ॥ ৮ ॥
ঈশ্বরীয় তত্ত্ব কিবা শাস্ত্র-আলোচনা ।
তাহাদের ঠিকুজিতে যেন আছে মানা ॥ ৯ ॥
ভক্তিভক্ত মতিপথে বুদ্ধি বিচলিত ।
শ্রীকামারপুকুরের ঠিক বিপরীত ॥ ১০ ॥
এদেশ ওদেশ নয় সন্নিকট স্থান ।
ক্রোশেক কেবলমাত্র মধ্যে ব্যবধান ॥ ১১ ॥
প্রভুতে বিশ্বাসভক্তি উপহাসকথা ।
যেন কয় শুনে হয় হৃদয়েতে ব্যথা ॥ ১২ ॥
পল্লীবাসী পুরুষেরা আর যত মেয়ে ।
উন্মত্ত পাগল প্রভু রেখেছে বুঝিয়ে ॥ ১৩ ॥
শ-কার ব-কার কয় জল্পনার কালে ।
শুনিয়া মায়ের প্রাণ দুঃখানলে জ্বলে ॥ ১৪ ॥
জননী বয়স্কা এবে বিচিন্তিতমনা ।
মনে মনে আপনার করেন ভাবনা ॥ ১৯ ॥
আগে তাঁরে দেখিয়াছি মনের মতন ।
সত্য কি এখন তিনি নাহিক তেমন ॥ ২০ ॥
যদ্যপি তাহাই হয় ইচ্ছায় ধাতার ।
এখানে বসতি নহে কর্তব্য আমার ॥ ২১ ॥
পাশেতে থাকিয়া তাঁর সেবিব চরণ ।
যাঁহার জন্যেতে জন্ম শরীর-ধারণ ॥ ২২ ॥
মনের বাসনা তাঁর রহে মনে মনে ।
লজ্জা অসুবিধা হেতু সরে না বচনে ॥ ২৩ ॥
সুযোগ সুবিধা এক হয় সংঘটন ।
স্বদেশবাসিনী বহু রমণীর গণ ॥ ২৪ ॥
জাহ্নবীতে স্নানহেতু আসিবে হেথায় ।
বর্ষপরে শুভযোগ দোল পূর্ণিমায় ॥ ২৫ ॥
শুনি তা সবারে কন মাতাঠাকুরানী ।
তিনিও জাহ্নবীস্নানে হবেন সঙ্গিনী ॥ ২৬ ॥
অনুমতিহেতু তারা তাঁহার পিতার ।
জিজ্ঞাসা করিল যদি যেন তিনি সায় ॥ ২৭ ॥
মুখুয্যে শ্রীরামচন্দ্র জনকের নাম ।
সংসার-ব্যাপারে বিজ্ঞ ভারি বুদ্ধিমান ॥ ২৮ ॥
নন্দিনীর মনোভাব বুঝিয়া অন্তরে ।
আপনিই চলিলেন সঙ্গে ল'য়ে তাঁরে ॥ ২৯ ॥
অতিশয় কষ্টকর জাহ্নবীতে স্নান ।
চারি দিবসের পথ মধ্যে ব্যবধান ॥ ৩০ ॥
একদিন দুইদিন তিনদিন গেল ।
চতুর্থে পথের মধ্যে বিপদ ঘটিল ॥ ৩১ ॥
অটনে অভ্যাস নাই দেহ বলহীন ।
তাহে অতি পথশ্রমে গত তিন দিন ॥ ৩২ ॥
চলিতে অক্ষম মাতা শরীর কাতর ।
উদয় হইল অঙ্গে ভয়ঙ্কর জ্বর ॥ ৩৩ ॥
ঘটনায় পিতা তাঁর বিপন্নাতিশয় ।
বিশ্রামের তরে লহে চটিতে আশ্রয় ॥ ৩৪ ॥
মাতাও নিমগ্ন হেথা বিষাদ-সাগরে ।
সংজ্ঞাহীন শয্যাগত নিদারুণ জ্বরে ॥ ৩৫ ॥
মনে ঐকান্তিক চিন্তা অত্যন্ত ভাবনা ।
শ্রীপদ-সেবনে সাধ আছিল বাসনা ॥ ৩৬ ॥
বিধি-বিড়ম্বনহেতু পুরিল না আর ।
কপালের দোষে, দোষ নহে বিধাতার ॥ ৩৭ ॥
হেন কালে হৈল এক অপূর্ব ঘটন ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা অমৃত কথন ॥ ৩৮ ॥
বেহুঁশ হইয়া মাতা যখন পড়িয়ে ।
আসিয়া পাশেতে তাঁর বসে এক মেয়ে ॥ ৩৯ ॥
গায়ের বরন কালো রূপে নিরুপম ।
অশ্রুত অদৃষ্টপূর্ব সুন্দর এমন ॥ ৪০ ॥
শীতল শ্রীকর-স্পর্শ গায়ে বুলাইয়ে ।
সেবা করিছেন মার পাশেতে বসিয়ে ॥ ৪১ ॥
নেহারিয়া মাতা তাঁরে করিলা জিজ্ঞাসা ।
তোমার কোথা হোতে হইয়াছে আসা ॥ ৪২ ॥
তনুত্তরে কালো মেয়ে কহিলা মাতায় ।
দক্ষিণশহর থেকে আইনু হেথায় ॥ ৪৩ ॥
অবাক হইয়া মাতা আর বার কন ।
আমারও যাইতে সেথা ছিল বড় মন ॥ ৪৪ ॥
সেবিব চরণ তাঁয় দেখিব নয়নে ।
মনের বাসনা সাধ রয়ে গেল মনে ॥ ৪৫ ॥
মাতা কহে বটে ঘটে তুমি মোর কে ।
কালো মেয়ে কহে আমি ভগিনী সম্পর্কে ॥ ৪৬ ॥
আটকে রেখেছি তাঁরে তোমার কারণে ।
তুমিও আরোগ্য হ'য়ে যাবে সেইখানে ॥ ৪৭ ॥
এইরূপে দুইজনে কথোপকথন ।
ক্রমে পরে শ্রীমাতার নিদ্রা-আকর্ষণ ॥ ৪৮ ॥
মুখুয্যে উঠিয়া প্রাতে দেখিল মাতার ।
ছাড়িয়া গিয়াছে জ্বর গায়ে নাহি আর ॥ ৪৯ ॥
চলিতে আরম্ভ কৈলা চটিতে না থাকি ।
শেষপ্রায় আর অতি অল্প পথ বাকি ॥ ৫০ ॥
সেদিনও স্বল্প জ্বর হইল উদয় ।
প্রবল পূর্বের মত আজি কিন্তু নয় ॥ ৫১ ॥
কষ্টেসৃষ্টে রাত্রিকালে নয় ঘটিকায় ।
উপনীত প্রভুদেব বিরাজে যেথায় ॥ ৫২ ॥
অকস্মাৎ সমাগতা পীড়ায় কাতর ।
দেখিয়া হইল প্রভু উদ্বিগ্ন-অন্তর ॥ ৫৩ ॥
আপন আবাস-গৃহে স্বতন্ত্র শয্যায় ।
পরম যতন-ভরে রাখিলেন তাঁর ॥ ৫৪ ॥
মথুরের সেবা যত্ন স্মরণ করিয়ে ।
কহিলেন প্রভুদেব মায়ে সম্বোধিয়ে ॥ ৫৫ ॥
এতদিন পরে তুমি আইলে যেখায় ।
আর কি মথুর আছে দেখিবে তোমায় ॥ ৫৬ ॥
রীতিমত চিকিৎসা ও পথ্যাদির গুণে ।
আরোগ্য হইলা মাতা তিন-চারি দিনে ॥ ৫৭ ॥
দেখি
তবে প্রভুদেব তাঁর সুস্থাবস্থা ।
করিলেন স্বতন্তরে বাসের ব্যবস্থা ॥ ৫৮ ॥
নহবৎঘরে যেথা আই ঠাকুরানী ।
তাঁর কাছে এক সঙ্গে রহিলা জননী ॥ ৫৯ ॥