তৃতীয় খণ্ড

মোদকের বাঞ্ছা পূর্ণ ও স্বদেশে মহাসঙ্কীর্তন


জয় প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


বাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু ভকতবৎসল ।
সুদীন-দরিদ্র দুঃখী-দুর্বলের বল ॥ ১ ॥

কৃপাময় অবতার দয়ায় দ্রবিয়া ।
ভরসিন্ধুপারাবারে সদা দেন খেয়া ॥ ২ ॥

স্বার্থশূন্য নেয়ে নাহি লন দানকড়ি ।
যেই যায় ঘাটে তার লয়ে দেন পাড়ি ॥ ৩ ॥

যে না জানে পারঘাট ডাক দেন তায় ।
সম্বলবিহীন কে রে পারে যাবি আয় ॥ ৪ ॥

অন্ধজনা চক্ষু বিনা দেখিতে না পেলে ।
প্রসারি শ্রীকরদ্বয় নায়ে নেন তুলে ॥ ৫ ॥

অপার কৃপার ধাম, কৃপার মুরতি ।
শুন মন একমনে রামকৃষ্ণ পুঁথি ॥ ৫ ॥

দিবারাতি মাতি নাতি শুন একমনে ।
দিয়া পাতি নিজ ছাতি ভবের তুফানে ॥ ৬ ॥

সংসারসাগর মহাতরঙ্গ-আলয় ।
ধন-জন দারা-পুত্র স্বার্থনাশ ভয় ॥ ৭ ॥

ভীষণ তরঙ্গচর ধর ছাতি পাতি ।
তবে না হইবে শুনা রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৮ ॥



এ সময় শ্রীপ্রভুর বেশে আগমন ।
সঙ্গে চলে সেবাপর আত্মীয়-স্বজন ॥ ৯ ॥

হৃদয় ভাগিনা আর মাতাঠাকুরানী ।
শুনহ অদ্ভুত কথা পথের কাহিনী ॥ ১০ ॥

ভক্তবাঞ্ছা-কল্পতরু শ্রীপ্রভু কেমন ।
লীলায় বুঝিয়া দেখ অবিশ্বাসী মন ॥ ১১ ॥

অকপট হৃদে সাধ যেই যাহা করে ।
সর্বঘটবার্তাবিদ ঈশ্বরগোচরে ॥ ১২ ॥

প্রভু পূর্ণ করেন সহস্র গুণে তার ।
লীলায় প্রত্যক্ষ আছে উপমা হাজার ॥ ১৩ ॥

কল্পনার নয় কথা চাক্ষুষ নয়নে।
মেজে হয়ে দেখা সব আলোদয় দিনে ॥ ১৪ ॥

অবতার মূল গ্রন্থ ব্রহ্মাণ্ডের স্বামী।
লজ্জাপটাবৃতা মাতা জগৎজননী ॥ ১৫ ॥

নাহি চাই পরংব্রহ্ম যিনি নিরাকার।
বড় মিষ্ট রামকৃষ্ণ ঠাকুর আমার ॥ ১৬ ॥

বার বার লীলাচ্ছলে খেলা ধরাধামে।
ধর্ম-সংরক্ষণ আর ভূভার-হরণে ॥ ১৭ ॥

শুনহ কেমন লীলা হইল প্রভুর।
শুনিয়াছি দেখিয়াছি আমি যতদূর ॥ ১৮ ॥

পথেতে দেয়ানগঞ্জ আছে গণ্ডগ্রাম।
নদীতটস্থিত তাই ব্যবসার স্থান ॥ ১৯ ॥

বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী সর্বলোকে জানে।
ধনাঢ্য ব্যবসাদার বহু সেই গ্রামে ॥ ২০ ॥

তাহাদের মধ্যে সাধু ভক্ত এক জন।
মহাভাগ্যবান বন্দি তাঁহার চরণ ॥ ২১ ॥

জাতিতে ময়রা তেঁহ গঞ্জে আদি বাস।
দ্বিজভক্ত সাধুপদে অটল বিশ্বাস ॥ ২২ ॥

পরিপাটী সুন্দর আবাস নিকেতন।
সাধ্যমত অর্থব্যয়ে বানায় নূতন ॥ ২৩ ॥

হেন ভাব পরিপূর্ণ আবাস ভিতরে।
দেখা মাত্র বোধ যেন লক্ষ্মী আছে ঘরে ॥ ২৪ ॥

দিব্য শুদ্ধ সত্ত্বভাব অবিরত খেলে।
রজস্তম কিবা তার গন্ধ নাহি মিলে ॥ ২৫ ॥

সাধু ভক্ত পেলে পরে মহা অনুরাগে।
যাহা থাকে দেয় নিজে ভোগিবার আগে ॥ ২৬ ॥

প্রকৃতিসুলভ তাঁর এইনত রীতি।
বানাইয়া বাড়ি তেঁর ভাবে দিবারাতি ॥ ২৭ ॥

যদি ভাগ্যবলে মিলে সাধু উদাসীন।
নূতন আবাসে তাঁরে রাখি তিন দিন ॥ ২৮ ॥

করিয়া যেমন সাধ্য সেবা আদি তাঁর।
পশ্চাৎ আনিব দারা পুত্র পরিবার ॥ ২৯ ॥

এই আশে আছে ব'সে ভকত সজ্জন।
হেনকালে শ্রীপ্রভুর গ্রামে আগমন ॥ ৩০ ॥

ঝরে মেঘ ঝুরু ঝুরু দিবা-অবসান।
হৃদয় ভাগিনা করে বাসার সন্ধান ॥ ৩১ ॥

ভক্তিমান ময়রার কাছে এলে পরে।
সৌভাগ্য-উদয় মহা সহাদর করে ॥ ৩২ ॥

পরিচয় পাইয়া প্রণত বার বার।
বাসা দিল নূতন আবাসে আপনার ॥ ৩৩ ॥

ছিল সাধু-ভক্ত আশে দিলিল কি ঘরে।
সাধুভক্তগণ আশে ফিরে যাঁর তরে ॥ ৩৪ ॥

প্রভুর করুণা কত কহা নাহি যায়।
তালবৎ দেন তাঁরে তিল যেবা চায় ॥ ৩৫ ॥

সিদ্ধিদাতা ভবাব্ধির করুণ কাণ্ডারী।
হলাহল লয়ে দেন অমৃতের হাঁড়ি ॥ ৩৬ ॥

মোদকের ভাগ্যসীমা না যার বাখানি।
ঘরে যাঁর প্রভুসঙ্গে ত্রিলোকতারিণী ॥ ৩৭ ॥

ধরাধামে যে সময়ে হরি অবতার।
ছড়াছড়ি কৃপা যেন ধারা বরিষার ॥ ৩৮ ॥

প্রভুর মহিমা কই শক্তি নাই ঘটে।
আগমন হবে যথা মহানন্দ উঠে ॥ ৩৯ ॥

স্বভাবে সৌরভি পদ্ম যথা বিদ্যমান।
নিকটে যে থাকে পায় সুগন্ধ মহান ॥ ৪০ ॥

চরণ-সরোজ যেন প্রভুর আমার।
যথা ফুটে তথা উঠে আনন্দ অপার ॥ ৪১ ॥

তায় পূর্ণানন্দময়ী গুরুমাতা সাথে।
পাইয়া মোদক গেছে মহানন্দে মেতে ॥ ৪২ ॥

জানে না মোদক এঁরা বটে কোন্ জন।
কেবা সেবাপর হৃদু আত্মীয় স্বজন ॥ ৪৩ ॥

পাইয়াও নাহি পায়, দেখেও না দেখে।
লীলা নিত্য উভয়েই ইন্দ্রিয়ে না ঢুকে ॥ ৪৪ ॥



মলিন মানুষবুদ্ধি লাগে কিবা কাজে।
মায়া-আঠা-মাখা রজ্জু জলে নাহি ভিজে ॥ ৪৫ ॥

হেন বৃদ্ধি ল'য়ে মহা গর্ব করে নর।
নাহি পায় হাতে যেবা হাতে নিরন্তর ॥ ৪৬ ॥

বাহ্যেন্দ্রিয় তার হয় বাহ্য-বস্তু-জ্ঞান।
ভিতরে না গেলে পরে কি আছে কল্যাণ ॥ ৪৭ ॥

চক্ষে দেখে আলোময় দিনের আকার ।
এই গাছ এই পাতা এই ত্বক তার ॥ ৪৮ ॥

এই মেঘ এই সূর্য এই পাখিগণ ।
এই আমি এই তুমি এই উপবন ॥ ৪৯ ॥

বাহ্যদৃশ্য ইহা কি ভিতরে দেখে তার ।
বলিবে ভিতরে গেলে আঁধার আঁধার ॥ ৫০ ॥

কেবল আধার নয় আধার নিবিড় ।
ইন্দ্রিয়াদি সহ মন একেবারে স্থির ॥ ৫১ ॥

হাসিয়া হাসিরা দেখে মহান রগড় ।
দৃষ্টিহীন দিনমণি আলোর আকর ॥ ৫২ ॥

আলোময় যেবা দেখে সে দেখে অলীক ।
আঁধার আঁধার দেখা এই দেখা ঠিক ॥ ৫৩ ॥

খুলিয়া বলিলে মন খাবে ভেবাচেকা ।
আঁখি মেলি দেখা নয় আঁখি মুদে দেখা ॥ ৫৪ ॥



মোদকের অন্য জ্ঞান কিছু নাই এবে ।
মহানন্দে গেছে মেতে পেয়ে প্রভুদেবে ॥ ৫৫ ॥

আনন্দে ডুবেছে তলে ইন্দ্রিয়াদি মন ।
আনন্দ-আধার কেবা করে অন্বেষণ ॥ ৫৬ ॥

কি পদ্ম কেমন পদ্ম কিবা গুণ ধরে ।
পেলে অলি পিয়ে মধু না যায় বিচারে ॥ ৫৭ ॥

এখানে সেখানে ছুটে দ্রব্য-আয়োজনে ।
গর্জিয়া ঝরিছে মেঘ বৃষ্টি নাহি মানে ॥ ৫৮ ॥

নাহি ত্রাস মহোল্লাস মোদক-অন্তরে ।
দ্রব্যহেতু ভ্রাম্যমাণ দুয়ারে দুয়ারে ॥ ৫৯ ॥

জোত্রাপন্ন অর্থের অভাব নাহি তাঁর ।
তদুপরি হৃদিখানি ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৬০ ॥

পাড়াগায়ে যত দূর খাদ্যদ্রব্য জুটে ।
দুনো মূল্যে স্বরান্বিত আনিল আকুটে ॥ ৬১ ॥

রাত্রিকার মত সাধ্য হৈল যতদূর ।
যতনে মোদক সেবা কৈল শ্রীপ্রভুর ॥ ৬২ ॥

ভকত মোদক প্রভু মোদকের ঘরে ।
দিয়াছেন মহামিষ্টি ছড়াছড়ি ক'রে ॥ ৬৩ ॥

খাইয়া মোদক মত না মুদে নয়ন ।
মাতোয়ারা প্রায় করে রাত্রি জাগরণ ॥ ৬৪ ॥

আঁখিতে না আসে ঘুম একমাত্র ভাবে ।
পুহাইলে রাতি কিবা দ্রব্য যোগাইবে ॥ ৬৫ ॥

উচ্চতম কর্মে তাঁর মজিয়াছে মন ।
দাস্যভাবে প্রভুর সেবা-আচরণ ॥ ৬৬ ॥

ভক্তবাঞ্ছাপূর্ণ কিসে শ্রীপ্রভুর রীতি ।
ভক্তপ্রিয় ভক্তপ্রাণ ভক্তপ্রীতে প্রীতি ॥ ৬৭ ॥

অন্তরে বুঝিয়া কিবা সাধ মোদকের ।
পূর্ণ কৈলা প্রভু কেহ না পাইল টের ॥ ৬৮ ॥

অদ্ভুত কৌশলী চক্রী প্রভু ভগবান ।
কেমনে অল্পধী নরে পাইবে সন্ধান ॥ ৬৯ ॥

উষ্ণরক্ত সে সময় ভাগিনা হৃদয় ।
প্রভুর উপরে করে জোর অতিশয় ॥ ৭০ ॥

ইচ্ছামত বলে করে না করি বিচার ।
সেবাধীন শ্রীপ্রভুর অগত্যা স্বীকার ॥ ৭১ ॥

যা বলে করিতে হয় ইচ্ছা যদি নাই ।
এমন অবস্থাপন্ন তখন গোসাঁই ॥ ৭২ ॥

সাধন ভজন পূর্ণ হ'লে সমুদয় ।
সংশয়পরান প্রায় পেটের পীড়ায় ॥ ৭৩ ॥

জীর্ণ-শীর্ণ কলেবর সে লাবণ্যহীন ।
সেবা-প্রয়োজন তাই হৃদুর অধীন ॥ ৭৪ ॥

প্রভুর সুযোগ্য সেবা হৃদয় জানিত ।
প্রভুর উপরে তাই প্রভুত্ব করিত ॥ ৭৫ ॥

যাঁহার শক্তিতে সেবা পায় জগজন ।
তাঁহার এখন সেই সেবা-প্রয়োজন ॥ ৭৬ ॥

প্রয়োজন কিবা কথা অধীন সেবায় ।
যা বলেন হৃদু তাহে শ্রীপ্রভুর সায় ॥ ৭৭ ॥

পরদিনে যদ্যপি থাকিতে করে মানা ।
পূর্ণ নহে মোদকের মনের বাসনা ॥ ৭৮ ॥

সেই হেতু মেঘ আর জল নাহি ছাড়ে ।
দিনে রেতে একরূপ অবিরাম ঝরে ॥ ৭৯ ॥



প্রত্যুষেতে উঠে মেতে মোদক সজ্জন ।
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর করিল বন্দন ॥ ৮০ ॥

মোদক মোদক বটে নিপুণ ভিয়ানে ।
মিষ্টি দিয়া তুষ্ট কৈল প্রভু ভগবানে ॥ ৮১ ॥

ভক্তিরসে গোল্লা করি তুষিল ঈশ্বর ।
হেন মোদকের পায় লক্ষ কোটি গড় ॥ ৮২ ॥

প্রাতে আয়োজিতে থাকে দ্রব্য সেবাদির ।
নানাবিধ ক্ষণমধ্যে করিল হাজির ॥ ৮৩ ॥

পাড়ায় পাড়ায় সাড়া গঞ্জে গেল প'ড়ে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন মোদকের ঘরে ॥ ৮৪ ॥

অনায়াসে এসে লোকে করে দরশন ।
বিশেষে বয়স্ক যারা গোসাই ব্রাহ্মণ ॥ ৮৫ ॥

অন্য জাতি কৃষ্ণভক্ত বৈষ্ণব সংসারী ।
শেষে প্রভু মিষ্টভাষী ঘুম করে ভারী ॥ ৮৬ ॥

প্রাণ-গলানিয়া বাণী প্রভুর বদনে ।
সাহস আশায় ভরা প্রাণ ফুলে শুনে ॥ ৮৭ ॥

কলিকালে দেখ মন মানুষনিকরে ।
সুখন কুয়াসা সম মায়ার ভিতরে ॥ ৮৮ ॥

বিষম মায়ায় ঘেরা দৃষ্টিচোরা ফাঁদ ।
যেখিতে না দেয় কৃষ্ণ জগতের চাঁদ ॥ ৮৯ ॥

আঁখিতে সতত গেলে মহাকালঘুম ।
কৃষ্ণকথা বুঝে যেন আকাশ-কুসুম ॥ ৯০ ॥

স্বপ্নবৎ ছায়াবাজি কথার এ কথা ।
নামে মাত্র কৃষ্ণ তাঁর কেবা পায় কোথা ॥ ৯১ ॥

কৃষ্ণ মিলে কলিকালে না করে প্রত্যয় ।
এত কৃষ্ণহারা ছাড়া নরের হৃদয় ॥ ৯২ ॥

দীক্ষাগুরু ব্যবসায় শবের মতন ।
শক্তিহীন মন্ত্র করে শিষ্যেরে অর্পণ ॥ ৯৩ ॥

ভোঁতা ছুরি কদলীর খোলা নাহি কাটে ।
কাজেই প্রণবমন্ত্র নাহি পশে ঘটে ॥ ৯৪ ॥

শত পুরশ্চরণে না ফলে কোন ফল ।
বিশ্বাস শিষ্যের হৃদে নাহি পায় স্থল ॥ ৯৫ ॥

অগ্নিবাণ মূর্তিমন্ত্র প্রভুর বচন ।
আঁধার নাহিক আর প্রক্ষেপ যখন ॥ ৯৬ ॥

কৃষ্ণময় বাক্য তাঁর বাক্যে কৃষ্ণ বাঁধা ।
শুনা মাত্র দুরীভূত অবিশ্বাস ধাঁধা ॥ ৯৭ ॥

চূড়াধড়াসহ কৃষ্ণ শ্রীবাক্যেতে খেলে ।
ব্রহ্মায় দুর্লভ যাহা প্রভুবাক্যে মিলে ॥ ৯৮ ॥

বুঝ মন কিবা শক্তি শ্রীবাক্যে প্রভুর ।
লোহার গোলায় কিসে গিরি করে চুর ॥ ৯৯ ॥

বুঝ মন লোকজন মোদকভবনে ।
কিবা দেখে শুনে প্রভু আগমনে ॥ ১০০ ॥

কিবা ভাবে মাতোয়ারা হয়েছে মোদক ।
প্রভু এবে ধরাধামে ভুলোক গোলোক ॥ ১০১ ॥

যত লোক গ'লে পড়ে প্রভুর কথায় ।
কেহ নাচে কেহ হরি-গুণ-গীতি গায় ॥ ১০২ ॥

হয়েছে আনন্দময় মোদকভবন ।
দিনে রেতে পরিপূর্ণ আছে লোকজন ॥ ১০৩ ॥

মোহকের বাঞ্ছা পূর্ণ করিতে কেবল ।
প্রভুর ইচ্ছায় হয় ত্রিরাত্র বাদল ॥ ১০৪ ॥

চতুর্থ দিবসে হয় পরিষ্কার দিন ।
শিয়ড়ে চলিলা বরাবর ভক্তাধীন ॥ ১০৫ ॥



এবারে না হইল যাওয়া কামারপুকুরে ।
বৃহৎ কারণ এক ইহার ভিতরে ॥ ১০৬ ॥

শিয়ড়ীরা বড় খুশী প্রভু আগমনে ।
দলে দলে এসে মিলে গ্রামবাসিগণে ॥ ১০৭ ॥

নফর বাঁড়ুয্যে গ্রামে উচ্চ ভক্ত তাঁর ।
সেবাদির জন্য করে বিবিধ যোগাড় ॥ ১০৮ ॥

দিনে রেতে সাথে সাথে তিলেক না ছাড়ে ।
সন্ধ্যা এলে ল'য়ে প্রভু সঙ্কীর্ত্তন করে ॥ ১০৯ ॥

আরে মন দেখ কিবা প্রভুর মহিমা ।
সকল প্রথমে হেথা শিয়ড়িয়া জনা ॥ ১১০ ॥

জানিতে না গোউর নিতাই কোন্ জন ।
কার ছেলে কোথায় বাড়ি কোথায় জনম ॥ ১১১ ॥

কত যে করিলা লীলা প্রভু অবতরি ।
বিতরি ভকতি প্রেম পাতকী উদ্ধারি ॥ ১১২ ॥

দেখিলে চৈতন্যভক্ত উচ্চ উপহাস ।
করিত সকলে তাড়া হাতে লাঠিবাঁশ ॥ ১১৩ ॥

গোউর নিতাই বলি যেথা সঙ্কীর্তন ।
কেড়ে ভেঙ্গে দিত খোল গ্রামবাসিগণ ॥ ১১৪ ॥

এবে সবে শ্রীপ্রভুর করুণার জোরে ।
প্রতিদিন সন্ধ্যকালে সঙ্কীর্তন করে ॥ ১১৫ ॥

দু'নয়নে ঝুরে ডাকে চৈতন্যের নাম ।
চৈতন্যে গিয়ান করে কৃষ্ণ ভগবান ॥ ১১৬ ॥

গোরানাম উচ্চারে রোমাঞ্চ কলেবর ।
বৈষ্ণব ভকতে করে মহা সমাদর ॥ ১১৭ ॥

সঙ্কীর্তনে সবে ঘর এবে এইবার ।
মহাভক্ত শ্রীনফর দলের সর্দার ॥ ১১৮ ॥

প্রভুবে লইয়া পথে গ্রামের ভিতর ।
মাঝে মাঝে সঙ্কীর্তনে হয় মত্ততর ॥ ১১৯ ॥

শান্তিনাথ নামে এক শিবলিঙ্গ গ্রামে ।
জাগ্রত ঠাকুর সবে দেশজুড়ে জানে ॥ ১২০ ॥

পাষাণে বাঁধান গোটা মন্দির-প্রাঙ্গণ ।
সেইখানে বহু ক্ষণ হয় সঙ্কীর্তন ॥ ১২১ ॥

একদিন ভক্তগণ হয়ে মত্তচিত ।
সঙ্কীর্তনে ধরে নিম্নলিখিত সঙ্গীত ॥ ১২২ ॥

সঙ্কীর্তনে আমার গোরা নাচে ।
দেখো রে বাপ নরহরি ।
থেকো গোউরের কাছে,
সোনার বরন গোউর আমার,
ধুলায় পড়ে পাছে ॥


শুনিয়া শ্রীপ্রভু এই সংকীর্তন-গান ।
মহাভাবে হৈলা মহাবলের আধান ॥ ১২৩  ॥

সুবর্ণ-বরন কান্তি অঙ্গ ফেটে পড়ে ।
মহালম্ফে সংকীর্তন প্রাঙ্গন-উপরে ॥ ১২৪ ॥

বারে বারে এক ধুয়া যত ভক্ত গায় ।
তাহাতে হইলা প্রভু উন্মত্তের প্রায় ॥ ১২৫ ॥

নাহি আর বাহ্যুজ্ঞান কি ভাবে কে জানে ।
লুটালুটি যান গোটা মন্দির প্রাঙ্গনে ॥ ১২৬ ॥

পাষাণে প্রাঙ্গণ বাঁধা সুকর্কশ তায় ।
সুকোমল প্রভু অঙ্গ কত ছোড়ে যায় ॥ ১২৭ ॥

বিভ্রাট দেখিয়া ভক্তগণ একত্তরে ।
ধরিয়াও প্রভুদেবে নিবারিতে নারে ॥ ১২৮ ॥

মহাশক্তি অঙ্গে কেহ নাহি আঁটে বলে ।
মত্ততা ভাঙাতে মন্ত্র হৃদু কানে বলে ॥ ১২৯ ॥

কিসে জাগে কিসে ভাঙে মত্ততা প্রভুর ।
বিধিমতে জানিতেন হৃদয় ঠাকুর ॥ ১৩০ ॥

স্বদেশের লোক দেখে অদ্ভুত ব্যাপার ।
সে হ'তে সেখানে নহে সংকীর্তন আর ॥ ১৩১ ॥

শান্ত করি প্রভুদেবে যত ভক্তগণে ।
ফিরিলেন সেই দিন হৃদুর ভবনে ॥ ১৩২ ॥



কি ছিল হইল এবে শিয়ড়িয়াগণে ।
প্রভুপদে মজে মন ভারতী-শ্রবণে ॥ ১৩৩ ॥

অদ্যাপি তুলসী কেহ না পরে গলায় ।
শুন কি করিলা প্রভু সুন্দর উপায় ॥ ১৩৪ ॥

একদিন হৃদয়ে হইল আজ্ঞা তাঁর ।
করিবারে এক কুড়ি মালার যোগাড় ॥ ১৩৫ ॥

যথা আজ্ঞা হৃদয় করিল আহরণ ।
মালা পেয়ে প্রভুদেব পরিতুষ্ট মন ॥ ১৩৬ ॥

শিয়ড়িয়া ভক্তজনা যবে একত্তর ।
তুলসী-মহিমা-কথা বিস্তর বিস্তর ॥ ১৩৬ ॥

বলিতে লাগিলা প্রভুদেব নারায়ণ ।
শ্রীবাক্যে স্বভাবে ভক্তি শক্তি-সঞ্চালন ॥ ১৩৭ ॥

শ্রবণে যতেক শ্রোতা ভক্তিসহকারে ।
উদ্দেশিয়া তুলসীরে নমস্কার করে ॥ ১৩৮ ॥

উত্তপ্ত হইলে ধাতু তবে না গঠন ।
কাল বুঝি তে-সবারে প্রভুদেব কন ॥ ১৩৯ ॥

এক এক মালা দিয়া প্রত্যেকের করে ।
নারায়ণ-শিলা আছে যাঁহাদের ঘরে ॥ ১৪০ ॥

উপদেশে বলিলেন সর্বাগ্রে প্রথমে ।
পরশি তুলসীমালা শিলার চরণে ॥ ১৪১ ॥

উচ্চারিয়া মহামন্ত্র গুরুদত্ত ধন ।
পশ্চাৎ করিবে সবে গলায় ধারণ ॥ ১৪২ ॥

প্রীতিভরে পালিবারে শ্রীআজ্ঞা তাঁহার ।
লবে গেল যেথা ঘরে শিলা আপনার ॥ ১৪৩ ॥

মালা হাতে একমাত্র বাঁড়ুয্যে নফর ।
বসে আছে একভাবে প্রভুর গোচর ॥ ১৪৪ ॥

সুন্দর শ্রীধর-শিলা তাঁহার ভবনে ।
নিত্য নিত্য সেবা-পূজা করে সযতনে ॥ ১৪৫ ॥

ভাগ্যবান যেন দ্বিজ ভক্তিদান তত ।
প্রভুতে বিশ্বাস ভক্তি চিতে অবিরত ॥ ১৪৬ ॥

হৃদি বুঝি প্রভুদেব রূপের আকর ।
দেখাইলা শ্রীনফরে সুঠাম সুন্দর ॥ ১৪৭ ॥

শ্রীধরের প্রতিমূর্তি অঙ্গে আপনার ।
শ্রীপ্রভুর লীলাখেলা অপূর্ব ব্যাপার ॥ ১৪৮ ॥

এই ঘোর কলিকাল ভক্তিহীন জীব ।
কামিনী-কাঞ্চন-আশে সদা উদ্‌গ্রীব ॥ ১৪৯ ॥

যেমন গোবর-পোকা জনমে গোবরে ।
সতত সুগুপ্ত কায় গোময়ভিতরে ॥ ১৫০ ॥

গোময়ে সুপুষ্ট দেহ বুঝে স্বাদ তার ।
তাহার গিয়ান ঠিক অমৃতভাণ্ডার ॥ ১৫১ ॥

তেমতি যতেক জীব অবিদ্যার তলে ।
মন প্রাণ গত তায় তাই ল'য়ে খেলে ॥ ১৫২ ॥

তদুপরি কিবা আছে নাহি কিছু জানা ।
শুনিলেও কৃষ্ণকথা না পায় ঠিকানা ॥ ১৫৩ ॥

অবিদ্যানেশায় মত্ত আঁখিভরা ঘুম ।
কামিনী-কাঞ্চনে ল'য়ে দিবানিশি ধুম ॥ ১৫৪ ॥

ঘোর অবিশ্বাসে কহে কৃষ্ণ কেবা পায় ।
কৃষ্ণ ভগবান মাত্র কেবল কথায় ॥ ১৫৫ ॥

কৃষ্ণকথা কৃষ্ণরূপ কৃষ্ণ মিলে কিসে ।
কি কৃষ্ণ আদতে তত্ত্ব হৃদে নাহি পশে ॥ ১৫৬ ॥

কুমিরের পিঠ যেন কঠিন মহান্ ।
শাণিত অসির ধার নাহি পায় স্থান ॥ ১৫৭ ॥

সেই মত মানুষের মনের উপর ।
রহিয়াছে মায়া শত পাষাণের গড় ॥ ১৫৮ ॥

ভক্তিহীনে গুরু দীক্ষা দিলে কর্ণমূলে ।
সুকঠিন বন্ধজীবে কিছুই না ফলে ॥ ১৫৯ ॥

কিন্তু মন দেখ হেন ভক্তিহীন কাল ।
কৃপাবলে শ্রীপ্রভুর পরম দয়াল ॥ ১৫৪ ॥

অবহেলে ব'লে মিলে সুদুর্লভ ধন ।
ব্রহ্মার বাঞ্ছিত কৃষ্ণ বঙ্কিমনয়ন ॥ ১৫৫ ॥

তাই বলি শ্রীপ্রভুর খেলা অপরূপ ।
নফর দেখেন অঙ্গে শ্রীধরের রূপ ॥ ১৫৬ ॥

তুমিই শ্রীধর বলি কাকুতি করিয়া ।
প্রভুর চরণে মালা দিল জড়াইয়া ॥ ১৫৭ ॥

সমাধিস্থ প্রভুদেব বাহ্য আর নাই ।
শ্রীদেহ ছাড়িয়া কোথা গেলেন গোসাঁই ॥ ১৫৮ ॥

পেয়ে তত্ত্ব শ্রীনকর পুলকিত মন ।
গলায় তুলসীমালা করিল ধারণ ॥ ১৫৯ ॥



প্রভুসনে সংকীর্তনে আস্বাদন পেয়ে ।
শিয়ড়ে অনেক লোক উঠেছে জাগিয়ে ॥ ১৬০ ॥

কভু কোথা কীর্তন বা হয় সংকীর্তন ।
সযতনে সবে মিলে করে অন্বেষণ ॥ ১৬১ ॥

নিকটে মেমানপুর শিয়ড়ের ধারে ।
দ্বাদশ উৎসব হয় বৎসরে বৎসরে ॥ ১৬২ ॥

উৎসব আরম্ভ তথা হয়েছে এখন ।
প্রসিদ্ধ গোপাল করে আসরে কীর্তন ॥ ১৬৩ ॥

জানি না মিশান কিবা গোপালের গানে ।
পাষাণে উপজে জল সংকীর্তন শুনে ॥ ১৬৪ ॥

দেশজুড়ে ব্যাপ্ত নাম সুধামাখা স্বর ।
এ দেশে বসতি নয় উত্তরেতে ঘর ॥ ১৬৫ ॥

বরষে বরষে আসে ব্যবসা কীর্তন ।
যেথা গায় তথা হয় মানুষের বন ॥ ১৬৬ ॥

দূর-দূরান্তর গ্রামে যাহাদের বাস ।
সময় বুঝিয়া রাখে তাহার তল্লাস ॥ ১৬৭ ॥

এখন মেমানপুরে গোপাল উদ্বয় ।
নিত্যই কীর্তন করে উৎসব সময় ॥ ১৬৮ ॥

সমাচার পেয়ে যত শিয়ড়িয়া জনা ।
এতেক আনন্দ নাই আনন্দের সীমা ॥ ১৬৯ ॥

মন্ত্রণা করিল পরস্পর সঙ্গোপনে ।
প্রভুদেবে ল'য়ে যাবে কীর্তনশ্রবণে ॥ ১৭০ ॥

দেখিবে পরমানন্দে মহাভাব গায় ।
যে ভাবে অপরানন্দ উদয় যেথায় ॥ ১৭১ ॥

আনন্দ-আকর প্রভু আনন্দ যেখানে ।
ভাবাবেশে উচ্চানন্দ যদি বল কেনে ॥ ১৭২ ॥

সুস্থির কমল প্রভু ভাবাবেশহীনে ।
আন্দোলিত ভাবাবেশে যেমন পবনে ॥ ১৭৩ ॥

আন্দোলনে বহু গুণে সৌরভ-বিস্তার ।
তাই লোক-জনে পায় আনন্দ অপার ॥ ১৭৪ ॥

সে আনন্দ আশা করি থাকে লোক জনে ।
কখন দোলায় তাঁয় আবেশ পবনে ॥ ১৭৫ ॥

সেই হেতু প্রভুদেবে শিয়ড়িয়া জনা ।
যাইতে মেমানপুরে করিল প্রার্থনা ॥ ১৭৬ ॥



শুনি কথা প্রভুদেব দিলেন উত্তর ।
হৃদুরে পাঠাও আগে জানিতে খবর ॥ ১৭৭ ॥

দেখে এসে হৃদু মোরে যেতে যদি কয় ।
তা হ'লে মেমানপুরে যাইব নিশ্চয় ॥ ১৭৮ ॥

শুন মন বলি তোরে পারি যতদূর ।
কার্যের কৌশল কিবা ছিল শ্রীপ্রভুর ॥ ১৭৯ ॥

কি কলে গোপালে হৈল শিয়ড়েতে আনা ।
পুরাইতে শিয়ড়ের লোকের বাসনা ॥ ১৮০ ॥

সন্ধ্যার প্রাক্কালে হয় হৃদুর গমন ।
প্রসিদ্ধ গোপাল যেথা করেন কীর্তন ॥ ১৮১ ॥

আসরে হৃদয় যবে হৈল সমাসীন ।
গোপাল কীর্তন ভঙ্গ কৈল সেই দিন ॥ ১৮২ ॥

প্রভুর প্রসিদ্ধ নাম গোপাল শুনিয়া ।
হৃদয়ের সঙ্গে চলে সঙ্গিগণ লৈয়া ॥ ১৮৩ ॥

উঠে পড়ে তাড়াতাড়ি হৃদিভরা প্রীতি ।
এখন হইল প্রায় ছয় দণ্ড রাতি ॥ ১৮৪ ॥

নাহি মানে মেঠো পথ নাহি মানে রাত ।
পথে যবে অর্ধ ক্রোশ শিয়ড় তফাত ॥ ১৮৫ ॥

শব্দযোগে পাঠাইতে অগ্রে সমাচার ।
গোপালে বলিল হৃদু হেথা একবার ॥ ১৮৬ ॥

খোল-রণশিক্ষাসহ করহ বাজনা ।
অর্ধক্রোশ হ'তে হেন শব্দ যায় শুনা ॥ ১৮৭ ॥

এক খোল একমাত্র রণশিঙ্গারব ।
অর্ধক্রোশ পারে যায় ইহা অসম্ভব ॥ ১৮৮ ॥

যথাকথা যথাশক্তি গোপাল বাজায় ।
হেনকালে শুন কি করেন প্রভুরায় ॥ ১৮৯ ॥

আবেশেতে অবশাঙ্গ লোক চারিধারে ।
বলিলেন দেখ হৃদু আপিছে এবারে ॥ ১৯০ ॥

শুন বাজে গোল বাজে শিঙ্গা করতাল ।
হৃদয় আসিছে লৈয়া সঙ্গেতে গোপাল ॥ ১৯১ ॥

বিস্ময়ে আপন্ন গত লোক জন কয় ।
কিবা কথা অকস্মাৎ কহ মহাশয় ॥ ১৯২ ॥

এত লোকমধ্যে মোরা কেহ নাহি শুনি ।
আপনি পাইলা একা খোল-শিঙ্গাধ্বনি ॥ ১৯৩ ॥

স্তদ্ধীভূত একত্রিত যত লোকজন ।
পরস্পর সেই কথা করে আন্দোলন ॥ ১৯৪ ॥

বহুক্ষণ পরে যবে কিঞ্চিৎ তফাতে ।
কীর্তনিয়া সহ হৃদু আসিতেছে পথে ॥ ১৯৫ ॥

বাজাইতে হৃদয় বলিল পুনরায় ।
এইবারে লোক সবে শুনিবারে পায় ॥ ১৯৬ ॥

সমাধিস্থ প্রভুদেব নাহি বাহ্যজ্ঞান ।
গোপাল শ্রীপদে আসি করিল প্রণাম ॥ ১৯৭ ॥

ভাবভঙ্গে আরম্ভ হইল সংকীর্তন ।
ক্রমে ক্রমে জুটে গেল গ্রামবাসিগণ ॥ ১৯৮ ॥



প্রভুকে মধ্যেতে রাখি বসে তিন ভিত ।
গোপাল গাইতে থাকে গোরা গুণ-গীত ॥ ১৯৯ ॥

কিবা ভাব কিবা গান শুন শুন মন ।
গোপালের গানভঙ্গ হৈল কি কারণ ॥ ২০০ ॥

মধুর কীর্তন প্রভু করিলা আপনে ।
শ্রীচরণে মজে মন ভারতী-শ্রবণে ॥ ২০১ ॥

গোপাল — ভুবনসুন্দর গোউর নদেয় কে আনিল রে ।
        এমন রূপ বিধি বুঝি দেখে নাই,
        (গঠেছে বটে) কিন্তু বিধি দেখে নাই,
        দেখলে ছেড়ে দিত নাই − ইত্যাদি ॥

প্রভু — গোপাল রে তুই কি বল্লি রে,
        গোরারূপ বিধির গড়া নয়,
        স্বয়ং স্বপ্রকাশরূপ বিধির গড়া নয় − ইত্যাদি ॥


বিধির গঠিত রূপ গৌরাঙ্গের গায় ।
শ্রীগোপাল কীর্তনিয়া এই কথা গায় ॥ ২০২ ॥

যেই গোরাচাঁদ হয় বিধির বিধাতা ।
তাঁহাতে বিধির হাত এ কেমন কথা ॥ ২০৩ ॥

সেই হেতু প্রভুদেব আখরের ছলে ।
লইলেন গোপালের গীত নিজে তুলে ॥ ২০৪ ॥

উত্তরে গাইলা প্রভুদেব ভগবান ।
কি কর গোপাল গোরারূপের বাখান ॥ ২০৫ ॥

স্বপ্রকাশ গোরারূপ ভুবনমোহন ।
কখন না হয় ইহা বিধির গঠন ॥ ২০৬ ॥

এইরূপে গোরারূপ আখরে আখরে ।
গাইতে লাগিলা প্রভু সুমধুর স্বরে ॥ ২০৭ ॥

মূর্তিমান প্রভুবাক্য রূপ-বিবর্ণনে ।
গড়ায় গোউররূপ শ্রীবাক্যের সনে ॥ ২০৮ ॥

শ্রীপ্রভুর শ্রীবচনে গোরারূপ দেখা ।
নীহারে যেমন সূর্য-কিরণের রেখা ॥ ২০৯ ॥

চক্ষু কর্ণ উভয়ের মিটাইয়া রণ ।
শতদলে একত্তরে যত লোকজন ॥ ২১০ ॥

শ্রবণ দর্শনে মুগ্ধ গোরারূপখানি ।
শুন রামকৃষ্ণকথা অমৃতের খনি ॥ ২১১ ॥

নহে সায় না ফুরায় রূপের বর্ণন ।
ক্রমে রাতি উর্ধ্বগতি চলিছে কীর্তন ॥ ২১২ ॥

ভোজনের আয়োজন হৃদর ভবনে ।
ক্লান্তকায় সমুদয় কীর্তনিয়াগণে ॥ ২১৩ ॥

গোটা দিন মহাশ্রমে হইয়াছে গত ।
অন্তরে শ্রীপ্রভুদেব হইয়া বিদিত ॥ ২১৪ ॥

আপুনি করিলা ভঙ্গ আপনার গানে ।
নিরানন্দ শ্রোতৃবৃন্দ গীত-সমাপনে ॥ ২১৫ ॥

দণ্ডবৎ নিপতিত শ্রীপদে গোপাল ।
হৃদয় জানায় ডেকে ভোজনের কাল ॥ ২১৬ ॥

অদ্যাপি শিয়ড়ে এই কীর্তনের কথা ।
দেখা শুনা যাহাদের মনে আছে গাথা ॥ ২১৭ ॥

কি দেখেছে কি শুনেছে প্রভুর ভিতরে ।
সঠিক চেহারা কেহ দিতে নাহি পারে ॥ ২১৮ ॥

স্মরণে অপার সুখ সমস্বরে কয় ।
আ মরি আ মরি কথা কহিবার নয় ॥ ২১৯ ॥



বার্তা পেয়ে আসে ধেয়ে ভক্ত নটবর ।
গোস্বামী ব্রাহ্মণ শ্যামবাজারেতে ঘর ॥ ২২০ ॥

ল'য়ে গেল প্রভুদেবে আপন ভবনে ।
সঙ্গে চলে সেবাপর হৃদয় ভাগিনে ॥ ২২১ ॥

যেমন গোস্বামী তাঁর তেমতি ঘরণী ।
প্রভুর সেবায় রত দিবসযামিনী ॥ ২২২ ॥

প্রভুর পিরীতি বুঝি কীর্তনশ্রবণে ।
সংবাদ পাঠায়ে দিল ধনু দের স্থানে ॥ ২২৩ ॥

কাছে রামজীবনপুরেতে তার ঘর ।
সকলেই জানে গায় কীর্তন সুন্দর ॥ ২২৪ ॥

সমযোগ্য বাদ্যকর শ্রীরাইচরণ ।
দুজনে কীর্তনে যদি হয় সম্মিলন ॥ ২২৫ ॥

মধুর কীর্তন হেন না ফুটে কপার ।
শুনিয়া গাছের পাতা বিছার তলায় ॥ ২২৬ ॥

তত্ত্ব পেয়ে আইলেন ধনু যে সত্বর ।
সুন্দর আসর রচে ভক্ত নটবর ॥ ২২৭ ॥

স্বতন্ত্র সর্বোচ্চাসন প্রভুর কারণে ।
নিজ হাতে বানাইল যথাযোগ্য স্থানে ॥ ২২৮ ॥

দুই ধারে নীচে তার যে হয় আসন ।
উদ্দেশ্য বসিবে তায় পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ॥ ২২৯ ॥

সন্নিকটে পাণ্ডুগ্রাম নহে বহু দূরে ।
গোসাঁই ব্রাহ্মণ বহু তথা বাস করে ॥ ২৩০ ॥

ভক্তিসহকারে পাঠাইল নিমন্ত্রণ ।
আসিতে ভবনে তাঁর শুনিতে কীর্তন ॥ ২৩১ ॥

এখানেতে যথাকালে বসিল আসর ।
সমাসীন প্রভু উচ্চ আসন উপর ॥ ২৩২ ॥

করিতেছে ধনু দে সুমিষ্ট সংকীর্তন ।
হেনকালে দিল দেখা গোসাঁইর গণ ॥ ২৩৩ ॥

সমাদরে নটবর বসাইল কাছে ।
যে আসন পাতা ছিল শ্রীপ্রভুর নীচে ॥ ২৩৪ ॥

নাহি জানে গোসাঁইরা প্রভু কেবা বটে ।
উচ্চাসনে দেখি তাঁয় সবে গেল চটে ॥ ২৩৫ ॥

উঠে গেল এসেছিল যেন একত্তরে ।
গ্রামেতে অনেক শিষ্য জনৈকের ঘরে ॥ ২৩৬ ॥

কহে তথা নটবরে অপ্রিয় বচন ।
কেমনে প্রভুরে দিল সর্বোচ্চ আসন ॥ ২৩৭ ॥

গোসাঁই ব্রাহ্মণ মোরা থাকি ভক্তিপথে ।
কেবা উনি ব্রহ্মজ্ঞান অন্যবিধ জেতে ॥ ২৩৮ ॥

নাহি তুলসীর মালা যজ্ঞসূত্র গলে ।
নাহি ছিটাফোঁটা কাটা নাকে কি কপালে ॥ ২৩৯ ॥

নাই হরিনামলেখা নামাবলী গায় ।
জপমালাধার ঝুলি তাঁহার কোথায় ॥ ২৪০ ॥

গোসাঁই ব্রাহ্মণ তুমি নিজে নটবর ।
উচ্চাসন হিয়া তাঁয় সাজালে আসন ॥ ২৪১ ॥

মোরা এত হীন কিসে কেন নীচাসন ।
অপমান বুঝি কৈলে হেতু নিমন্ত্রণ ॥ ২৪২ ॥

ভালমত দিব সাজা নটবর তোরে ।
দেখিব কেমনে কেবা রক্ষা আজ করে ॥ ২৪৩ ॥

ভীতচিত নটবর ফিরিল ভবনে ।
হৃদয়ে কহিল কথা ডাকিয়া গোপনে ॥ ২৪৪ ॥

হৃদয়ে অকুতোভয় কর নটবরে ।
আছে কার সাধ্য কাছে আসিবারে পারে ॥ ২৪৫ ॥

চলিতেছে কীর্তন এখন নয় শেষ ।
অন্তরে বুঝিলা সব প্রভু পরমেশ ॥ ২৪৬ ॥

ভক্ত নটবরে বলিলেন কানে কানে ।
বিবাদ না পার শোভা মম বর্তমানে ॥ ২৪৭ ॥

কীর্তন করিয়া বন্ধ যাও শীঘ্রগতি ।
ডাকিয়া আনহ যেবা দল-অধিপতি ॥ ২৪৮ ॥

গোস্বামী ব্রাহ্মণদের সর্দার যে জন ।
নটবর কাছে তাঁর করিল গমন ॥ ২৪৯ ॥

টেনেছেন প্রভুদেব আর কেবা রাখে ।
উপনীত অধিপতি প্রভুর সম্মুখে ॥ ২৫০ ॥

অমানীর মানদাতা প্রভু নারায়ণ ।
নীচাসনে নামিলেন ত্যজি নিজাসন ॥ ২৫১ ॥

সর্দারের বদন মলিন গুরুভার ।
দেখি প্রভু করিলেন অগ্রে নমস্কার ॥ ২৫২ ॥

জানি না কি নমস্কারে আছিল প্রভুর ।
যার জোরে অভিমান-গিরি করে চুর ॥ ২৫৩ ॥

দল-অধিপতি করি প্রতিনমস্কার ।
লজ্জায় বদনখানি নাহি তুলে আর ॥ ২৫৪ ॥

প্রভুদেব করিবারে লজ্জা তার ভঙ্গ ।
বলিলেন কহ কিছু ঈশ্বর-প্রসঙ্গ ॥ ২৫৫ ॥

অধিপতি শাস্ত্রাধ্যায়ী বটে এক জনা ।
বেদান্ত কিঞ্চিৎ তাঁর ছিল পড়াশুনা ॥ ২৫৬ ॥

শ্রীঅঙ্গ লক্ষণশূন্যে ধারণা তাঁহার ।
ব্রহ্মজ্ঞানী প্রভু ভাল লাগে নিরাকার ॥ ২৫৭ ॥

সেই হেতু কহিতে লাগিল দ্বিজবর ।
বেদান্তে কি কয় নিরাকারের খবর ॥ ২৫৮ ॥

রূপহীন গুণহীন বিহীন আকার ।
আদ্যন্তক্রিয়াদিহীন ব্রহ্মসমাচার ॥ ২৫৯ ॥

গোসাঁইব্রাহ্মণমুখে বেদান্তের ভাব ।
শুনি প্রভু বাহ্য কোপ করিয়া প্রকাশ ॥ ২৬০ ॥

মধুর কর্কশ ভাবে মিশাইয়া তান ।
কহিলেন গোসাঁইরে সাকার-আখ্যান ॥ ২৬১ ॥

কৃষ্ণগতপ্রাণ যাঁরা গোসাঁইব্রাহ্মণ ।
নিরাকার তত্ত্বকথা কহ কি কারণ ॥ ২৬২ ॥

জাতিভ্রষ্ট পথছাড়া আপন করমে ।
উচিত না হয় তব মুখদরশনে ॥ ২৬৩ ॥

নিত্যই সাকার তিনি রূপের আধার ।
লীলাময় লীলাপ্রিয় গুণের ভাণ্ডার ॥ ২৬৪ ॥

ভক্তগতপ্রাণ ভক্তপরান-পুতলি ।
অখণ্ড আগোটা বিশ্ব তাঁর লীলাস্থলী ॥ ২৬৫ ॥

তেজোময় প্রভুবাক্য যাহে করে খেলা ।
শ্রীহরির রূপগুণ অবতারে লীলা ॥ ২৬৬ ॥

সেই বাক্যে প্রভুদেব করেন বর্ণন ।
বুঝাইতে দ্বিজবরে যাহা প্রয়োজন ॥ ২৬৭ ॥

একমনে গোসাঁই ব্রাহ্মণ কথা শুনে ।
বুঝ কিবা ভাবে এবে ঝুরে দুনয়নে ॥ ২৬৮ ॥

হেনকালে সেই স্থলে দিল দরশন ।
বংশে জাত দলভুক্ত অন্য যত জন ॥ ২৬৯ ॥

অধিপতি দেখিয়া সকলে সমাগত ।
বলিল শ্রীপ্রভুপদে হ'তে অবনত ॥ ২৭০ ॥

কাঁদিয়া কাঁদিয়া কয় বিষম প্রমাদ ।
করেছি মহাত্মা জনে নিন্দা অপবাদ ॥ ২৭১ ॥

কাকুতি-মিনতি সবে করিলে বিস্তর ।
শাস্তি দিলা জনে জনে শান্তির সাগর ॥ ২৭২ ॥



যতেক ব্রাহ্মণে প্রভু ল'য়ে পরদিনে ।
তুলিলা অতুলানন্দ হরি-সংকীর্তনে ॥ ২৭৩ ॥

হেন কীর্তনের কথা কোথাও না শুনি ।
মহাসংকীর্তন নামে ইহারে বাগানি ॥ ২৭৪ ॥

পুণ্যবতী বঙ্গে যেন হেথা বার মাস ।
দিনে রেতে ষড়ঋতু প্রত্যহ প্রকাশ ॥ ২৭৫ ॥

সেই মত প্রভু রামকৃষ্ণ অবতারে ।
আছে সব যা হয়েছে যুগযুগান্তরে ॥ ২৭৬ ॥

গুপ্ত এবে সহজে না পাওয়া যায় দেখা ।
সোনার অক্ষরে লীলা-অঙ্গে আছে লেখা ॥ ২৭৭ ॥

দেখিবারে সাধ যদি থাকে তোর মন ।
বিরলে বসিয়া কর প্রভুর স্মরণ ॥ ২৭৮ ॥

সাত দিন সাত রাত্রি হয় সংকীর্তন ।
অবিরাম হরিনাম বিভেদি গগন ॥ ২৭৯ ॥

কোমল অঙ্কুরোদ্‌গম বীজে যেইমত ।
পরে ভক্তবরে তাই হয় পরিণত ॥ ২৮০ ॥

সে রকম সংকীর্তন আরম্ভন-কালে ।
কেবল কয়েকজন লোক মাত্র মিলে ॥ ২৮১ ॥

কিবা কব শ্রীপ্রভুর কীর্তনের কথা ।
যখন যেখানে তথা প্রচুর জনতা ॥ ২৮২ ॥

ভয়ঙ্করী রণকথা শুনে কাঁপে কায় ।
শিহরাঙ্গ মহাবীর জড়সড় প্রায় ॥ ২৮৩ ॥

কিন্তু রণবাদ্য যবে রণক্ষেত্রমাঝে ।
বিস্তারি কৌহিক-নাদ ঘর্‌ ঘর্‌ বাজে ॥ ২৮৪ ॥

শুনে সাজে হীনবলা কুলের অঙ্গনা ।
সম্মুখীন চতুরঙ্গ-বলে দিতে হানা ॥ ২৮৫ ॥

নাহি মানে কোন মানা মহা আস্ফালন ।
প্রভুর কীর্তনে তেন জুটে লোকজন ॥ ২৮৬ ॥

বলাকর হরিনামে হ'য়ে মত্ততর ।
এক পায়ে খোঁড়া নাচে প্রহর প্রহর ॥ ২৮৭ ॥

কি তাজ্জব জন্মমূক হরিনাম গায় ।
মুর্তিমান নাম অন্ধে দেখিবারে পায় ॥ ২৮৮ ॥

তাহে গেলে শক্তিসহ শ্রীকণ্ঠের স্বর ।
ঘৃণালজ্জাত্রাসনাশী মনোমুগ্ধকর ॥ ২৮৯ ॥

শ্রবণগোচর একবার হ'লে পরে ।
সাধ্য কার রাখে আর তাহারে অন্তরে ॥ ২৯০ ॥

প্রভুর মোহন নৃত্য হ'য়ে মাতোয়ারা ।
কভু অঙ্গে বাহ্যজ্ঞান কভু বাহ্যহারা ॥ ২৯১ ॥

অযুত উন্মত্ত করী সম গায় বল ।
শ্রীচরণ চাপে ধরা করে টলমল ॥ ২৯২ ॥

বাহ্যহারা যবে অঙ্গ জড়ের সমান ।
লোকে দেখে বুঝে যেন নাহি তার প্রাণ ॥ ২৯৩ ॥

তখনি কিঞ্চিৎ পরে করে দরশন ।
বিকশিত মুখপদ্মে চাঁদের কিরণ ॥ ২৯৪ ॥

মোহন নৃত্যন পুনঃ শতগুণে জোর ।
হুঙ্কারিয়া হরিনাম আনন্দে বিভোর ॥ ২৯৫ ॥

বারেক যে হেরে হেন শ্রীপ্রভুর ধারা ।
বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে হয় বুদ্ধিহারা ॥ ২৯৬ ॥

কহে হেন মানুষ কোথায় কে দেখেছে ।
এইক্ষণে হতপ্রাণ পরক্ষণে বাঁচে ॥ ২৯৭ ॥

পাড়াগেঁয়ে লোক সব বোধহীন জন ।
নাহি বুঝে ভাবাবেশ সমাধিলক্ষণ ॥ ২৯৮ ॥

আচরণ জাতিগত ধরম ব্যবসা ।
কামার কুমার বেনে তাঁতী তেলী চাষা ॥ ২৯৯ ॥

উচ্চ জাতি যদি কেহ কায়স্থ ব্রাহ্মণ ।
নামে মাত্র উচ্চ কিন্তু সমান রকম ॥ ৩০০ ॥

বুঝে না সাধনা আদি কিবা তায় ফলে ।
সৎশাস্ত্রপাঠে কিবা সাধুসঙ্গে মিলে ॥ ৩০১ ॥

কেন তীর্থপর্যটন উদ্দেশ্য কি তার ।
বিষয়ে মগন মন সংসারী আচার ॥ ৩০২ ॥

বৈষ্ণব সংজ্ঞায় যাঁরা হরিনাম করে ।
কোথা হরি কি সে হরি থাকে কার ঘরে ॥ ৩০৩ ॥

কি প্রকারে মিলে তাঁরে কিবা হয় গেলে ।
এসকল তত্ত্ব কভু চিত্তে নাহি খেলে ॥ ৩০৪ ॥

দেশ জুড়ে বার্তা বেড়ে পড়িল ঘোষণা ।
সমবেত কত লোক না হয় গণনা ॥ ৩০৫ ॥

অপার বালুকা-মধ্যে সাগরবেলায় ।
তিল-পরিমাণে রত্ন দেখা নাহি যায় ॥ ৩০৬ ॥

তেমতি জনতা-মধ্যে প্রভু নারায়ণ ।
সকলে না পায় তাঁয় করিতে দর্শন ॥ ৩০৭ ॥

দরশনে লুব্ধ মন আসিয়াছে ছুটে ।
উপায়স্বরূপে লোকে চালে গাছে উঠে ॥ ৩০৮ ॥

গাছে উঠে এত লোক দেখিবারে নাচ ।
গাছ গোটা বোধ যেন মানুষের গাছ ॥ ৩০৯ ॥

পরম আনন্দ পায় দেখিয়া মুরতি ।
পতিতপাবন প্রভু অখিলের পতি ॥ ৩১০ ॥

ধন্য ধন্য কলির মানুষ ধন্য কলি ।
যে কালে হেলায় মিলে প্রভুপদধূলি ॥ ৩১১ ॥

অনায়াসে যেই কালে প্রভুদরশন ।
দেবের দুর্লভ বস্তু সাধনের ধন ॥ ৩১২ ॥

সমধারা জনতার সাত দিন রাত ।
কেবা কোথা থাকে কেবা কোথা খায় ভাত ॥ ৩১৩ ॥

কিছুই নির্ণয় নাই কোথা হতে আসে ।
করিবারে সংকীর্তন প্রভুসঙ্গে মিশে ॥ ৩১৪ ॥

ধরাবাসী নহে যেন লোকান্তরে ঘর ।
ক্ষুধা-তৃষ্ণা নাহি দেহে অজর অমর ॥ ৩১৫ ॥

একমাত্র ক্ষুধা-তৃষ্ণা প্রভু-দরশন ।
ধরায় এসেছে ছেড়ে স্ব স্ব নিকেতন ॥ ৩১৬ ॥

এইরূপে সপ্তাহ আগত হ'লে পর ।
প্রভুর পড়িল লক্ষ্য শ্রীঅঙ্গ-উপর ॥ ৩১৭ ॥

এই কার্যে কার্য মম নহে সমাপন ।
অতএব আবশ্যক শরীর-রক্ষণ ॥ ৩১৮ ॥

দেহ গেলে কি করিব বহু কর্ম বাকি ।
গোপনে আইলা প্রভু লবে দিয়া ফাঁকি ॥ ৩১৯ ॥

কে বুঝিবে শ্রীপ্রভুর কর্মের কৌশলে ।
অলক্ষ্যেতে আগমন মলত্যাগ-ছলে ॥ ৩২০ ॥

টের পেয়ে পাছে লোকে ধরাধরি করে ।
একবারে গঙ্গাপার দক্ষিণশহরে ॥ ৩২১ ॥

তিলক কপালে নাকে হাতে থাকে ঝুলি ।
শ্রেষ্ঠ চিত্রাঙ্কিতকায় গায়ে নামাবলী ॥ ৩২২ ॥

ডাল রুটি হৃদ মিষ্টি একাদশী দিনে ।
চব্বিশ-প্রহরে জুটে নাচে সংকীর্তনে ॥ ৩২৩ ॥

এই বৈষ্ণবের সার পরিণাম-ফল ।
আরাধিলে কৃষ্ণ মিলে এ বোধ বিরল ॥ ৩২৪ ॥

সুদ্ধমাত্র পাড়াগাঁয়ে নহে এই রীতি ।
দুনিয়া জুড়িয়া এই নরের প্রকৃতি ॥ ৩২৫ ॥

কৃষ্ণ কোথা হেন কথা কেহ নাহি কয় ।
বিশ্বাসের গন্ধহীন মনুষ্যনিচয় ॥ ৩২৬ ॥

নিবিড় তমসপূর্ণ দিক্‌দিগন্তর ।
তবু নাহি লয় কেহ আলোর খবর ॥ ৩২৭ ॥

অবিদ্যা-ঠুলিতে ঢাকা নয়ন দুখানি ।
অন্ধকারে ঘুরে ঘুরে নেচে টানে ঘানি ॥ ৩২৮ ॥

খোল খেয়ে খুব খুশী চিনি গেছে ভুলে ।
নমস্তে অবিদ্যাশক্তি ডুরি দেহ খুলে ॥ ৩২৯ ॥

আঁখি মিলে একবার করি দরশন ।
কেমনে করেন প্রভু মহাসংকীর্তন ॥ ৩৩০ ॥



ক্রমে ক্রমে গুজব পড়িল গ্রামে গ্রামে ।
অদ্ভুত মানুষ নাচে এক সংকীর্তনে ॥ ৩৩১ ॥

এই আছে এই নাই বিস্ময়-কথন ।
সুন্দর মধুর মুর্তি সুঠাম গড়ন ॥ ৩৩২ ॥

বার্তা পেয়ে দ্রুত ধেয়ে নরনারী ছুটে ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা অপরূপ মিঠে ॥ ৩৩৩ ॥

সে দেশে কীর্তনদল আছিল যেখানে ।
দলে দলে গেয়ে গেয়ে মিলে সংকীর্তনে ॥ ৩৩৪ ॥

রামকৃষ্ণনামে কিবা সৌরভ-শকতি ।
নিশ্চয় পাইবে শুন রামকৃষ্ণপুঁথি ॥ ৩৩৫ ॥

একেবারে বিকশিত হ'লে পদ্মবন ।
মরুৎ চৌদিকে করে সৌরভ বহন ॥ ৩৩৬ ॥

যোজন যোজন দূরস্থিত চাকে বাস ।
মধুলুব্ধ মধুপের অপার উল্লাস ॥ ৩৩৭ ॥

গন্ধ পেয়ে যেন গুন্ গুন্ রবে ছুটে ।
তেন কীর্তনের দল সংকীর্তনে জুটে ॥ ৩৩৮ ॥

প্রকাশ প্রচার কথা শুন অতঃপর ।
স্বকরে প্রকাশ যেন পায় দিবাকর ॥ ৩৩৯ ॥

প্রভুর প্রকাশ তেন নিজ কর-বলে ।
মহাতম হয় নাশ প্রকাশ শুনিলে ॥ ৩৪০ ॥

বিরলে বসিয়া মন শুন কান পাতি ।
শান্তির আলয় রামকৃষ্ণ লীলাগীতি ॥ ৩৪১ ॥


ধনঞ্জয় দে