তৃতীয় খণ্ড

ডাকাত বাবার কথা


জয় জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


রামকৃষ্ণ কথা অতি শ্রবণমঙ্গল ।
ত্রিতাপ-তাপিত চিত শুনিলে শীতল ॥ ১ ॥

শ্রীগুরুমাতার কথা শ্রীপ্রভুর সনে ।
অবহেলে ভক্তি মিলে শুনে মাত্র কানে ॥ ২ ॥

যেমন শ্রীপ্রভুদেব তেমনি জননী ।
স্নেহময়ী দয়াময়ী মঙ্গলরূপিণী ॥ ৩ ॥

অন্য অন্য অবতারে গুপ্তে যেন বাস ।
প্রভু-অবতারে মাতা বড়ই প্রকাশ ॥ ৪ ॥

ফলবতী লতা যেন নত ফলভরে ।
স্নেহেতে জননী তেন জীবের উপরে ॥ ৫ ॥

বাসনা পূরাতে মাতা প্রভুর সমান ।
উপমার শত শত আছে উপাখ্যান ॥ ৬ ॥

গাইলে শুনিলে উঠে আনন্দ অপার ।
শুনহ নূতন কথা ডাকাত বাবার ॥ ৭ ॥

সুন্দর বারতা যেই মন দিয়া শুনে ।
নিশ্চয় পাইবে ভক্তি মায়ের চরণে ॥ ৮ ॥

কথার ভিতরে আছে এতদূর বল ।
শুনে উপজিবে হৃদে ভকতি অচল ॥ ৯ ॥

শুনিয়া সুন্দর কথা রে চঞ্চল মন ।
টুটাইয়া দেহ মোর ভবের বন্ধন ॥ ১০ ॥

পাড়াগায়ে মেয়েদের এই রীতি চলে ।
গঙ্গাস্নানে আসে কোন শুভযোগ হ'লে ॥ ১১ ॥

বল বেঁধে প্রতিবাসী পাড়ার পাড়ার ।
ব্রাহ্মণ কায়স্থ তেলী কামার কুমার ॥ ১২ ॥

একবার আসিবেন অনেক রমণী ।
শুনিলেন কানে কথা মাতাঠাকুরানী ॥ ১৩ ॥

তখনি বলিলা মাতা সবা সন্নিধানে ।
সঙ্গে ল'য়ে যাও যদি যাই গঙ্গাস্নানে ॥ ১৪ ॥

ভাল বলি দিল সায় যতেক রমণী ।
শুন কি হইল পরে পথে  র কাহিনী ॥ ১৫ ॥

জগমাতা শ্যামাসুতা প্রভু-অবতার ।
আদ্যাশক্তি মহামায়া ব্রাহ্মণের ঘর ॥ ১৬ ॥

অপরূপ নরলীলা কে বুঝিতে পারে ।
দেবতার লাগে ধাঁধা কি বুঝিবে নরে ॥ ১৭ ॥

কে দেখিতে পারে প্রভু নাহি দেখাইলে ।
কিবা আঁকা লেখা আছে রাঙ্গা পদতলে ॥ ১৮ ॥

রক্তিম চরণ কথা শুনেছি পুরাণে ।
মা যদি সামান্যা তবে রাঙ্গাপদ কেনে ॥ ১৯ ॥



বাহির হইলা মাতা নারীগণসাথে ।
অপরূপ খেলা এক করিলেন পথে ॥ ২০ ॥

শ্রীকামারপুকুরের বহু পূর্বদিকে ।
উতরিতে গঙ্গাতীর তিন দিন লাগে ॥ ২১ ॥

মেয়েদের পক্ষে চ'লে আসা গঙ্গাতট ।
বড়ই বিষম কষ্ট বিষম সঙ্কট ॥ ২২ ॥

চলিতে অভ্যাস নাহি কিছু দূরে গেলে ।
বিষম যাতনা পায় যায় তার ফুলে ॥ ২৩ ॥

বিশেষতঃ জননীর চরণ কোমল ।
কোমলতে পরাভব মানে শতদল ॥ ২৪ ॥

প্রথম দিবসে মাতা সঙ্গীদের সনে ।
চলিয়া পাইলা ব্যথা কোমল চরণে ॥ ২৫ ॥

দ্বিতীয় দিবসে আর না চলে চরণ ।
তফাত হইয়া তাই পড়ে সঙ্গিগণ ॥ ২৬ ॥

সঙ্গীদের মধ্যে বহু আপনা আপনি ।
মধ্যম ভাসুরসুতা লক্ষ্মীঠাকুরানী ॥ ২৭ ॥

প্রভুর শ্রীমুখে কহা কাহিনী তাঁহার ।
মানবিনী-বেশে শীতলার অবতার ॥ ২৮ ॥

লক্ষ্মীও তাঁদের সঙ্গে হয়ে একত্রিতা ।
চলে গেছে মনে নাই মা গেলেন কোথা ॥ ২৯ ॥

সামান্য তফাত নয় গেছে বহুদূর ।
এখানে জননী একা চিন্তায় আতুর ॥ ৩০ ॥

চলিতে অশক্ত পথ না পান নাগাল ।
ক্রমশঃ হইল প্রায় বিগত বিকাল ॥ ৩১ ॥

আগতা যামিনী দেখি চিন্তান্বিতা মাতা ।
কেহ নাহি সঙ্গে একাকিনী যাব কোথা ॥ ৩২ ॥

বিষম প্রান্তর কেহ নাহিক কোথায় ।
সন্দ পথ বীরে ভয় দিনের বেলায় ॥ ৩৩ ॥

ভয়ে জননীর বারি ঝরে দুনয়নে ।
হেনকালে সঙ্গে জুটে অন্য দুই জনে ॥ ৩৪ ॥

স্ত্রী-পুরুষ দু'ই তারা ছিল অন্যস্থানে ।
এখন যেতেছে ফিরে নিজের ভবনে ॥ ৩৫ ॥

পুরুষ প্রকাণ্ডকার ভীষণ গড়ন ।
ডাকাতের সমাকৃতি ভয় দরশন ॥ ৩৬ ॥

মাথায় বাবুরি চুল গোঁফ ঝুল্পি কাটা ।
বরন বিকট কাল হাতে ধরা সোঁটা ॥ ৩৭ ॥

বৃহৎ রূপার বালা পরা দুই হাতে ।
সালুর উড়ানি লম্বা পাগ বাঁধা মাথে ॥ ৩৮ ॥

দ্রুতপদ-সঞ্চালনে সঙ্গেতে রমণী ।
জুটিয়া পড়িল যথা মাতা একাকিনী ॥ ৩৯ ॥

সভয় অন্তর মাতা কান্দিয়া কান্দিয়া ।
বলিলেন দু'হে পিতা মাতা সম্বোধিয়া ॥ ৪০ ॥

রক্ষা কর তোমা দোঁহে আমি একাকিনী ।
পাছু ফেলে গেছে চলে যতেক সঙ্গিনী ॥ ৪১ ॥

স্নেহময়ীরূপা দাতা স্নেহেতে গঠিত ।
মুখে বারে স্নেহ-মাখা বাণী সেইমত ॥ ৪২ ॥

এত মিঠে কথা মার যে শুনে যে কালে ।
হোক না পাষাণহৃদি তখনিই গলে ॥ ৪৩ ॥

তদুপরি ভয়াতুরা আঁখিভরা জল ।
বদনে বিষাদ মাখা পরান বিকল ॥ ৪৪ ॥

জানি না দেখিয়া স্থির কে থাকিতে পারে ।
এমন কঠিন কেবা ভুবন ভিতরে ॥ ৪৫ ॥



এত মিঠে স্মৃতি মার হেরিলে নয়নে ।
মনে হয় আর কেহ নাহি মাতা বিনে ॥ ৪৬ ॥

হইয়া মায়ের ছেলে মার কাছে রব ।
সুখ দুখে সমভাবে মায়ে নিরখিব ॥ ৪৭ ॥

ভোগিব অসহ্য কষ্ট মায়ের কারণে ।
দিতে হয় দিব ছেড়ে তাঁর তরে প্রাণে ॥ ৪৮ ॥

দেখ মন আমি এত হীনবলাকার ।
নাই শক্তি পঞ্চ সের তুলিতে আমার ॥ ৪৯ ॥

কিন্তু যদি প্রয়োজন হয় মার হেতু ।
সাগরে বাঁধিতে পারি পাষাণের সেতু ॥ ৫০ ॥

বিভীষণ চক্র করি চক্রপাণি হাতে ।
পুরন্দর বজ্রসহ চড়ি ঐরাবতে ॥ ৫১ ॥

মহেশ পিনাকপাণি সুবিষম শূল ।
দেখিয়া যাঁহার ভয়ে ত্রিলোক আকুল ॥ ৫২ ॥

কালাগ্নি সমান বাণ আপন আপন ।
ল'য়ে যদি একত্রিত হয় দেবগণ ॥ ৫৩ ॥

যক্ষ রক্ষ নাগ আদি কিন্নরনিচয় ।
একপক্ষে সকলেই প্রতিবাদী হয় ॥ ৫৪ ॥

কাক লক্ষ সম গণি খেদাইতে পারি ।
অভয় মুরতি মার একবার স্মরি ॥ ৫৫ ॥

প্রান্তরে কাঁদেন মাতা প'ড়ে একাকিনী ।
যে দিন শুনেহি আমি এহেন কাহিনী ॥ ৫৬ ॥

সে দিন হইতে মোর গিয়াছে পিরীতি ।
কিবা ব্রহ্মা বিষ্ণু কিবা মহেশের প্রতি ॥ ৫৭ ॥

হয় তাঁরা হীনবল দুর্বল আকার ।
নচেৎ হয়েছে মাতা দেবত্ব সবার ॥ ৫৮ ॥

কিংবা সবে নিদ্রাগত নয় নাহি প্রাণ ।
নষ্টবল নিপতিত আছে মাত্র নাম ॥ ৫৯ ॥

ধন্যরে দেবত্বগিরি কি আছে দেবত্বে ।
জানিতে নারিল মাতা কাঁদিছেন পথে ॥ ৬০ ॥

কাজ নাই দেবত্বতে কিবা প্রয়োজন ।
মনে যেন জাগে মার অভয়চরণ ॥ ৬১ ॥

কি কাজ জানিতে যাতা জগৎ ঈশ্বরী ।
হর্ত্রী কর্ত্রী বিধায়িত্রী ব্রহ্মাণ্ড-উদরী ॥ ৬২ ॥

সৃজিকা পালিকা মহাশক্তির আধার ।
শ্যামা-সীতা রাধা সতী উমা অবতার ॥ ৬৩ ॥

করগত যড়ৈশ্বর্য সাধন সিদ্ধাই ।
হেন জ্ঞানে আরাধনে যেমন না চাই ॥ ৬৪ ॥

মায়ে রবে মাতা জ্ঞান কিছু না বিচারি ।
সামান্য সরল সাদা ব্রাহ্মণঝিয়ারী ॥ ৬৫ ॥

কি কাল পরমতত্ত্বে, ঈশ ঈশী দেখা ।
থাক মহা-আবরণে যেন আছে ঢাকা ॥ ৬৬ ॥

ভগবানে অন্বেষণে নাহি প্রয়োজন ।
থাকে যেন প্রভু আর মার পদে মন ॥ ৬৭ ॥

প্রভুর প্রসঙ্গ চেয়ে কিবা মিষ্টতর ।
শুনহ বারতা কিবা হৈল অতঃপর ॥ ৬৮ ॥

জননীর পয়োধর যোগেতে যেমন ।
পুষ্টিকর মুষ্টিযোগ দুধ-সঞ্চালন ॥ ৬৯ ॥

তেমনি মায়ের শ্রীবদন-বিনিঃসৃত ।
স্নেহপরিপূর্ণ বাণী জিনিয়া অমৃত ॥ ৭০ ॥

পিতামাতা সম্বোধন স্ত্রী-পুরুধ দোঁহে ।
শুনিয়া বাৎসল্য রলে মগ্ন হয় মোহে ॥ ৭১ ॥

মোহ ব'লে মোহ নয় আশ্চর্য কথন ।
ক্ষীরসম ঘন নহে দুধের মতন ॥ ৭২ ॥



দেখিয়া মাগীর হৃদি যায় উথলিয়ে ।
সঠিক গিয়ান যেন পেটেধরা মেয়ে ॥ ৭৩ ॥

আছিলেন এত দিন শ্বশুরের ঘরে ।
অকস্মাৎ আজ দেখা প্রান্তর-অন্তরে ॥ ৭৪ ॥

ভীতচিত দেখি মায়ে আশ্বাসিয়া কয় ।
আমরা রয়েছি মাগো কি তোমার ভয় ॥ ৭৫ ॥

নাহি জানি কিবা নাম জুটে কোথা হ'তে ।
নিজে মার মুখে শুনা বাগ্‌দী তারা জেতে ॥ ৭৬ ॥

লক্ষ লক্ষ দণ্ডবৎ চরণে তাঁদের ।
জাতির খাতির নয় নহে বিচারের ॥ ৭৭ ॥

মায়ে যারা বাসে যার পদে যার মন ।
হোক না চণ্ডাল সেই মুকুটি ব্রাহ্মণ ॥ ৭৮ ॥

জনমিয়া দ্বিজকুলে যদি দ্বেষী হয় ।
চণ্ডাল অধিক ছোট হেন মনে লয় ॥ ৭৯ ॥

কিবা উচ্চ জাতি দুঁহে কি বলিব বল ।
উচ্চতার উপমায় তাঁহারা কেবল ॥ ৮০ ॥

আশ্বাসিয়া জননীরে চলে গুটি গুটি ।
অধিক অন্তরে নয় নিকটেতে চটি ॥ ৮১ ॥

পান্থশালা নানান্তরে চটি বলে যায় ।
উতরিলা তথা ঠিক সন্ধ্যার বেলায় ॥ ৮২ ॥

বাগদিনী পাগলিনী আনন্দের ভরে ।
সেবা-শুশ্রূষার হেতু মহাযত্ন করে ॥ ৮৩ ॥

মা যে ব্রাহ্মণের মেয়ে তারা ছোট জেতে ।
এ গিয়ান মোটে নাই এত গেছে মেতে ॥ ৮৪ ॥

খেতে এনে দেয় যাহা ভাল কিছু পায় ।
বিচারবিহীন যেন মারে করে ছায় ॥ ৮৫ ॥

মাতাও গেছেন ভুলে জাতির বিচার ।
স্নেহভরে দেয় তাঁর করেন আহার ॥ ৮৬ ॥

ধন্যরে ভক্তের ভাব ভক্তির মহিমা ।
বলিতে না পাই খুঁজে কিছুই উপমা ॥ ৮৭ ॥

ব্রহ্মসনাতনী যিনি সর্বসারাৎসারা ।
তপে জপে যজ্ঞে যাঁরে না পায় কিনারা ॥ ৮৮ ॥

তন্ত্র বেদ ক্লান্তকার স্বরূপ গাইয়ে ।
আজ তিনি ভক্তিবশে বাগদীর মেয়ে ॥ ৮৯ ॥

মায়ের ধরিয়া নাম ডাকে বাগদ্বিনী ।
ঠিক ডাকে ডাকে যেন গরভধারিণী ॥ ৯০ ॥

বসনে বিছানা করি ঘরের ভিতরে ।
শুয়াইয়া রাখে মায় নিজে একধারে ॥ ৯১ ॥

মিন্সে মহারথী প্রায় বীরের আকার ।
হাতে সোঁটা রাত্রি গোটা রক্ষা করে দ্বার ॥ ৯২ ॥

মাঝে মাঝে আশ্বাসিয়া কহে জননীরে ।
কি ভয় ঘুমাও মাগো আমি আছি দ্বারে ॥ ৯৩ ॥



রাতি গেলে উবা এলে উঠায় মাতায় ।
স্ত্রী-পুরুষে সঙ্গে ল'য়ে পথে চলে যায় ॥ ৯৪ ॥

কহে মায় বার বার মোরা সঙ্গে যাব ।
যথায় সঙ্গিনী সব জুটাইয়া দিব ॥ ৯৫ ॥

যদি তে-সবার সঙ্গে দেখা নাহি গাই ।
দক্ষিণশহর যাব কোন চিন্তা নাই ॥ ৯৬ ॥

মায়ের কোমল অঙ্গ কোমল চরণ ।
পথশ্রমে অতিক্রান্ত বিশুষ্ক বদন ॥ ৯৭ ॥

দুই চারি পাঁচ গণ্ড বেলা হ'লে গায় ।
রৌদ্রতাপে আরও মুখ শুকাইয়া যায় ॥ ৯৮ ॥

নেহারি বসায় তাঁয় ছায়ায় বৃক্ষের ।
জলপান করিবার বেলা হ'ল ঢের ॥ ৯৯ ॥

এই বলি বিকলপরাণা বাগদিনী ।
মিন্সেরে কহিল কিছু এনে দেহ কিনি ॥ ১০০ ॥

যোগায় শীতল জল করি অন্বেষণ ।
শ্রমদূরে পরে পুনঃ পথে আগমন ॥ ১০১ ॥

পথশ্রমে ফাঁকি দিতে কহে বাগদিনী ।
মিন্সে বলি সম্ভাষিয়া আপনার স্বামী ॥ ১০২ ॥

কহিল গাইতে গান শুনাইতে মায় ।
সে অতি সুমিষ্টকণ্ঠ মিঠা গান গায় ॥ ১০৩ ॥

কালিয়দমনদলে বাসদেবি করে ।
তত্ত্বকথাগীত গায় অনুরাগভরে ॥ ১০৪ ॥

তার মধ্যে এক গান গায় যতগুলি ।
মায়ের শ্রীমুখে শুনা শুন শুন বলি ॥ ১০৫ ॥

"কেন কাঁদে প্রাণ তারই তরে ।
সে যে নহে অন্তরঙ্গ, ভুল করে যে ভঙ্গ,
সাধুর ঘরে যেন চোরে চুরি করে ॥"


গাইল অনেক গীত তার মধ্যে কেনে ।
কেবল এ এক গান লাগে মার প্রাণে ॥ ১০৬ ॥

তাই আজি তক মনে গাঁথা আছে তাঁর ।
ভেবে মন দেখ গীতে কি আছে ব্যাপার ॥ ১০৭ ॥

হৃদয় প্রকাশে মিন্সে গেয়ে এই গান ।
কার জন্যে কেন তার কেঁদে উঠে প্রাণ ॥ ১০৮ ॥

বহু দুঃখে কহে তারে অন্তরঙ্গ নয় ।
কেন না ভাসায় জলে কুল করি ক্ষয় ॥ ১০৯ ॥

বড়ই নিদ্বয় করি হৃদিশান্তি চুরি ।
যে চায় কাঁদায় তায় দিবাবিভাবরী ॥ ১১০ ॥

কেবা সে নিদয় হেগা সাধু কোন জন ।
মরি শুরু প্রভুদেবে ভেবে দেখ মন ॥ ১১১ ॥

যখন গেয়েছে গীত কিবা ভাব মনে ।
ব্যথিত ব্যতীত ব্যাথা অন্যে নাহি জানে ॥ ১১২ ॥

গীতছলে বলিয়াছে মরণের ব্যাথা ।
কোমলপরানা মার মনে তাই গাঁথা ॥ ১১৩ ॥

জন্ম জন্ম মহাভক্ত মার এই দোঁহে ।
ধরিয়াছে নরদেহ বাগদীর গৃহে ॥ ১১৪ ॥

পদরজ দোঁহাকার আশ করে দীনে ।
থাকে যেন মতি রতি মায়ের চরণে ॥ ১১৫ ॥

ভগবানে ভক্ত বড় মিষ্টতম খেলা ।
হৃদে ফুটে যদি মুখে নাহি যায় বলা ॥ ১১৬ ॥

জগৎ-জননী যিনি বিশ্বের ঈশ্বরী ।
ব্রহ্মাণ্ডমোহিনী মায়া যাঁর সহচরী ॥ ১১৭ ॥

বালিকার খেলা-ডালি সম সৃষ্টি যাঁর ।
বুঝিতে যাহারে লাগে মহেশে আঁধার ॥ ১১৮ ॥

ভক্তসঙ্গে তাঁর খেলা এহেন রকন ।
মানুষ থাকুক দূরে ব্রহ্মাদির ভ্রম ॥ ১১৯ ॥



স্ত্রীপুরুষে মাগী-মিন্সে সঙ্গে ল'য়ে যায় ।
চক্ষে দেখে আপনার বালিকার প্রায় ॥ ১২০ ॥

জানিতে না পারে মাতা বটে কোন জন ।
লোহা সম টানে প্রাণে চুম্বকে যেমন ॥ ১২১ ॥

ধরি ধরি করে কিন্তু ধরিতে না পারে ।
মহা-আবরণ মায়া ঢাকে রবি-করে ॥ ১২২ ॥

ভাগ্যবান ভাগ্যবতী জনম ধরায় ।
যায় আয় ঘন ঘন মার পানে চায় ॥ ১২৩ ॥

বসায় ছায়ায় শুষ্ক হইলে বন্ধন ।
যে কোন প্রকারে পারে করে দূর শ্রম ॥ ১২৪ ॥

পূর্বকার দিন মত সেদিন কাটিল ।
প্রত্যুষে উঠিয়া পথে পুনশ্চ চলিল ॥ ১২৫ ॥

দশমীতে বিজয়ার প্রতিমা-বদন ।
বিষম বিষাদমাখা করি নিরীক্ষণ ॥ ১২৬ ॥

জনমন মগ্ন যেন হয় মহাক্লেশে ।
তেমতি দেখিয়া যায় দু'হু মাগী মিন্সে ॥ ১২৭ ॥

স্ত্রীপুরুষে ভাসে কেন নিরানন্দ-নীরে ।
মায়ের বা কেন হেন বিষাদ অন্তরে ॥ ১২৮ ॥

ভিতরে ইহার আছে ব্যাপার সুন্দর ।
শুন কি হইল পরে পথের খবর ॥ ১২৯ ॥

নানা মঠ নানা গ্রাম পার হয়ে গেলে ।
বৈদ্যবাটী-সন্নিকটে সঙ্গিগণে মিলে ॥ ১৩০ ॥

মিলিলা জননী হারা সঙ্গিদের সাথে ।
দেখি দোঁহাকার যেন বাজ পড়ে মাথে ॥ ১৩১ ॥

ছাড়িয়া যাইবে মাতা বড় দুঃখ হৃদে ।
অবিরল আঁখিজল স্ত্রীপুরুষে কাঁদে ॥ ১৩২ ॥

কোথা হ'তে এত স্নেহ এল দু'জনার ।
ধরায় ধরিয়া দেহ খেলা কি মজার ॥ ১৩৩ ॥

দুই দিন দেখা মাত্র হ'লে পরস্পরে ।
নাম নাহি থাকে মনে কিছুদিন পরে ॥ ১৩৪ ॥

এ কেমন সংমিলন জননীর সনে ।
জন্ম পরিচিত বোধ বারেক দর্শনে ॥ ১৩৫ ॥

পরিচিত মিথ্যা নয় কথা সত্য বটে ।
আছিল গোপনে কলি এবে গেল ফুটে ॥ ১৩৬ ॥

পাতালপরশ যে প্রকার প্রস্রবণ ।
দৈব ঘটনায় থাকে আবদ্ধ বদন ॥ ১৩৭ ॥

আইলে সময় তার আবরণ গেলে ।
ভিতরের যত জোর একেবারে খুলে ॥ ১৩৮ ॥

সেইমত স্নেহভক্তি ছিল আবরণে ।
মুক্তদ্বার দোঁহাকার মার দরশনে ॥ ১৩৯ ॥



জর জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ।
চতুর্বিধ-মুক্তি-ভক্তি-চৈতন্যদায়িনী ॥ ১৪০ ॥

ব্রহ্মসনাতনী গোটা সৃষ্টির আধার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪১ ॥

লজ্জাপটাবৃতা মাতা ব্রাহ্মণঝিয়ারী ।
বিশ্বকর্ত্রী জগদ্ধাত্রী পরম-ঈশ্বরী ॥ ১৪২ ॥

দেহে ভরা মঙ্গলরূপিণী অবতার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪৩ ॥

যতনে গোপন আরক্তিম পদতল ।
ভক্তজন আকিঞ্চন লালসার স্থল ॥ ১৪৪ ॥

পরমসম্পদপদ রতন-আগার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪৫ ॥

রামকৃষ্ণলীলা-পুষ্টকারিণী জননী ।
রক্ষাকর্ত্রী জাগয়িত্রী কুলকুণ্ডলিনী ॥ ১৪৬ ॥

সিদ্ধিশাস্তিস্বরূপিণী করুণা অপার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪৭ ॥

রতিমতিহীন জনে সুমতিদায়িনী ।
সৃষ্টিছাড়া কৃপাদৃষ্টি দুর্গতিনাশিনী ॥ ১৪৮ ॥

কায়মনোবাক্যে পতি সেধাভক্তি যাঁর ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৪৯ ॥

পবিত্রমূরতি সতী পতিতপাবনী ।
জীবের রক্ষার হেতু শিক্ষাবিধায়িনী ॥ ১৫০ ॥

লজ্জাশীলা কুলবালা ধরম-আচার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৫১ ॥

জয় নারীরূপধরা ত্রিলোকপালিকা ।
ভক্তগতমনপ্রাণ ব্রাহ্মণবালিকা ॥ ১৫২ ॥

আত্ম কেবা পর কেবা নাহিক বিচার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৫৩ ॥

দীনদয়াময়ীরূপা করুণারূপিণী ।
তন্ত্রমন্ত্রবেদাতীত চরণ দুখানি ॥ ১৫৪ ॥

ঠিক পাড়াগেঁয়ে মেয়ে জননী আমার ।
দেহি রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ১৫৫ ॥



বাগ্‌দিনী বিষাদিনী আকুলপরান ।
মায়ের কারণে কিনে আনে জলপান ॥ ১৫৬ ॥

মটরের শুঁটিসহ ধরিয়া আঁচল ।
বেঁধে দেয় সযতনে চক্ষে ঝরে জল ॥ ১৫৭ ॥

মাতাও কাঁদেন তেন দোঁহামুখ চেয়ে ।
বিষম রগড় কাণ্ড পথে দাঁড়াইয়ে ॥ ১৫৮ ॥

মাগীরে দিলেন মাতা নিজের বসন ।
অবাক হইয়া রঙ্গ দেখে সঙ্গিগণ ॥ ১৫৯ ॥

সান্ত্বনাস্বরূপ কথা বলিলা দোঁহারে ।
যেখা হয়ে যাও যদি দক্ষিণশহরে ॥ ১৬০ ॥

মিষ্টভাবে করি তুই দোঁহাকার মন ।
দক্ষিণশহরপথে করিলা গমন ॥ ১৬১ ॥

মিন্সে মাগী কেবা দু'হে কিছু নাহি জানি ।
কন্যারূপে কৃপা যাবে করিলা জননী ॥ ১৬২ ॥

মহাপ্রিয় ভক্ত পূর্বে বরদান ছিল ।
কন্যা হ'য়ে ভাই মাতা সাধ মিটাইল ॥ ১৬৩ ॥

কোন্ ভক্ত কিবা রূপে আছে কোনখানে ।
গুপ্ত প্রভু-অবতারে সাধ্য কার চিনে ॥ ১৬৪ ॥

ভক্তগণ গুপ্ত এত চেনা মহাদায় ।
খনিমধ্যে মণি যেন কাদা মাখা গায় ॥ ১৬৫ ॥

প্রভুসনে মার লীলা মধুর ভারতী ।
সবিশ্বাসে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১৬৬ ॥