তৃতীয় খণ্ড
পারায়ণপাঠ
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
প্রচার-প্রকাশ-কথা মধুর কথন ।
গাইলে গুনিলে করে তম-বিনাশন ॥ ১ ॥
একমনে শুন মন দুই কান পাতি ।
প্রীযদু মল্লিক নাম শহরে বসতি ॥ ২ ॥
বড় ভক্তিমতী ঘরে মাসীমাতা তাঁর ।
অনেক পূর্বেতে কহিয়াছি সমাচার ॥ ৩ ॥
ভগবৎপদে মতি রতি বিলক্ষণ ।
উদ্যান-ভবনে বসাইল পারায়ণ ॥ ৪ ॥
শুন মন পারায়ণ-পাঠ বলে কারে ।
গোটা ভাগবত সায় সপ্তাহ ভিতরে ॥ ৫ ॥
শেষ দিনে বহু কার্য পাঠ-সমাপন ।
ঠাকুরের ভোগরাগ পরে সংকীর্তন ॥ ৬ ॥
অত্যল্প সময় ইহা মোটে সাত দিন ।
সর্ব-অঙ্গে সাঙ্গ করা বড়ই কঠিন ॥ ৭ ॥
সপ্তম দিবসে শুন কি হয় ঘটন ।
একত্রিত নিমন্ত্রিত কত লোকজন ॥ ৮ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ ভক্ত তত্ত্বান্বেষী জনা ।
বিষয়ী বৈভবশালী কে করে গণনা ॥ ৯ ॥
হেনকালে শ্রীপ্রভুর হৈল আগমন ।
পাছু পাছু সঙ্গে আছে শাস্ত্রী নারায়ণ ॥ ১০ ॥
শাস্ত্রীর নাহিক আর কোন মন টোলে ।
পাইলে প্রভুর সঙ্গ লব যায় ভুলে ॥ ১১ ॥
পাঠক যেখানে পাঠ করে পারায়ণ ।
তাঁর সন্নিকটে শাস্ত্রী লইল আসন ॥ ১২ ॥
গোস্বামী ব্রাহ্মণ এক তাঁহার সমীপ ।
বেনিয়াটোলায় ঘর নাম নবদ্বীপ ॥ ১৩ ॥
বড়ই খিয়াতি তাঁর বৈষ্ণবসমাজে ।
সোনার গোউর ঘরে ভক্তিভরে পুজে ॥ ১৪ ॥
স্বতন্ত্র আসন শ্রীপ্রভুর কিছু দূরে ।
পরিচিত শত শত ব'সে চারি ধারে ॥ ১৫ ॥
অতি বুদ্ধি সুপণ্ডিত পাঠক ব্রাহ্মণ ।
সমাপন হেতু করে দ্রুত অধ্যয়ন ॥ ১৬ ॥
যুদ্ধপ্রিয় সমধারা পণ্ডিত ব্রাহ্মণে ।
পরস্পর দেখা শুনা হইলে দুজনে ॥ ১৭ ॥
একবার রণ বিনা নাহিক বিরাম ।
টিকি নাড়া পৈতা ছেঁড়া তুমুল সংগ্রাম ॥ ১৮ ॥
যেইখানে পাঠ করে পাঠক ব্রাহ্মণ ।
ল'য়ে তার কোন অংশ শাস্ত্রী নারায়ণ ॥ ১৯ ॥
জিজ্ঞাসিল পাঠকেরে ব্যাখ্যা করিবারে ।
কিবা সূক্ষ্ম শাস্ত্র-মর্ম তাহার ভিতরে ॥ ২০ ॥
পাঠক পণ্ডিতবর যথা অর্থ জানা ।
বিশেষিয়া করিলেন ভাবের বর্ণনা ॥ ২১ ॥
শাস্ত্রী কহে ইহা নয়, ফাঁকি ধ'রে কাটে ।
পাঠক বলেন, এই ঠিক ব্যাখ্যা বটে ॥ ২২ ॥
এই হয়, এই নয়, কহে পরস্পর ।
এইরূপে দুইজনে তুমুল সমর ॥ ২৩ ॥
গজ-কচ্ছপের যুদ্ধ পর্বত উপরে ।
হার মানে দোহাকার মহারণ হেরে ॥ ২৪ ॥
বাদ-প্রতিবাদে দোঁহে কেহ নহে কম ।
নবদ্বীপ দেখিলেন ব্যাপার বিষম ॥ ২৫ ॥
বহু কর্ম আছে বাকি শেষ দিন এবে ।
তর্কযুদ্ধে যায় কাল কেমনে কি হবে ॥ ২৬ ॥
এই যত ভাবিছেন মন উচাটন ।
অন্তরেতে জানিলেন প্রভু নারায়ণ ॥ ২৭ ॥
মহাকার্য হয় ক্ষতি এতেক দেখিয়া ।
শাস্ত্রীরে থামিতে কন হাত নাড়া দিয়া ॥ ২৮ ॥
অতিশয় মেতে গেছে শাস্ত্রী নারায়ণ ।
তবু নহে ক্ষান্ত যদি প্রভুর বারণ ॥ ২৯ ॥
না মানে নিষেধ শাস্ত্রী তেড়ে তর্ক করে ।
সেই হেতু নবদ্বীপ কহিল তাঁহারে ॥ ৩০ ॥
শুন শুন ওহে শাস্ত্রী পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ।
শুন কি পরমহংস মহাশয় কন ॥ ৩১ ॥
শাস্ত্রী কহে দেখিয়াছি তাঁহার নিষেধ ।
কিন্তু এ শাস্ত্রিক তর্ক না মানিব জেদ ॥ ৩২ ॥
বিশেষ মীমাংসা নাহি হয় যতক্ষণ ।
কোনমতে না শুনিব কোন নিবারণ ॥ ৩৩ ॥
হায় শাস্ত্র-অধ্যয়নে কোটি নমস্কার ।
যাহাতে বসায় ঘটে অবিদ্যা-বাজার ॥ ৩৪ ॥
হীন হেয় ছার যশোমানের বাসনা ।
অহঙ্কার দাম্ভিকতা পাণ্ডিত্যগরিমা ॥ ৩৫ ॥
মহান্ অনর্থকর প্রতি পদে পদে ।
নিবিড় তমসজাল জ্ঞানসূর্য রোধে ॥ ৩৬ ॥
যেই প্রভুদেবে শাস্ত্রী সর্বেশ্বর জানে ।
না মানে তাঁহার আজ্ঞা বিদ্যা-অভিমানে ॥ ৩৭ ॥
মদে পূর্ণ মত্ততর শাস্ত্রীরে দেখিয়া ।
অমনি উঠিলা প্রভু আসন ত্যজিয়া ॥ ৩৮ ॥
সন্নিকটে গিয়া তাঁর ধরিয়া বদন ।
বলিলেন শুন শুন শাস্ত্রী নারায়ণ ॥ ৩৯ ॥
ভীষ্মার্জুনে দুই জনে যখন সমর ।
পাণ্ডবের তখন সারথি চক্রধর ॥ ৪০ ॥
চক্রে যার গোটা সৃষ্টি চক্রবৎ ঘুরে ।
কিছু নাহি বলিলেন ভীষ্ম বীরবরে ॥ ৪১ ॥
মহাজ্ঞানী ভীষ্মদেব কৃষ্ণ ভাল জানে ।
যত তাঁর উপদেশ কেবল অর্জুনে ॥ ৪২ ॥
জলে যেন নির্বাপিত হয় হুতাশন ।
স্তব্ধীকৃত সেইমত শাস্ত্রী নারায়ণ ॥ ৪৩ ॥
বিদ্যা-অভিমান বক্তি এতেক প্রবল ।
একবার শ্রীপ্রভূর পরশে শীতল ॥ ৪৪ ॥
যুকতি পাইয়া এবে পাঠক ব্রাহ্মণ ।
দ্রুতগতি কৈলাসাঙ্গ পাঠ-পারায়ণ ॥ ৪৫ ॥
নগরকীর্তনারম্ভ হৈল তার পরে ।
সমবেত বৈষ্ণবেরা নৃত্য গীত করে ॥ ৪৬ ॥
খোল করতাল কিবা শিঙ্গার-নিনাদ ।
শুনিলে প্রভুর উঠে আনন্দ অগাধ ॥ ৪৭ ॥
তার সঙ্গে মহাশক্তি অঙ্গময় গেলে ।
মহালম্ফে মিলিলেন কীর্তনের দলে ॥ ৪৮ ॥
পবন যেমন শক্তিধর উপমায় ।
আপুনি নাচিয়া পরে সকলে নাচায় ॥ ৪৯ ॥
সেইরূপ প্রভুদেব শক্তিসঞ্চালনে ।
করিলেন মাতোয়ারা যত লোক জনে ॥ ৫০ ॥
তার সঙ্গে সবে নাচে হরি বোল ব'লে ।
নাচেন গোস্বামী নবদ্বীপ বাহু তুলে ॥ ৫১ ॥
গায়কের দল নাচে মুখে উচ্চৈঃস্বর ।
খোল বাজাইয়া নাচে খোল-বাদ্যকর ॥ ৫২ ॥
দর্শকেরা মাতোয়ারা নেচে নেচে উঠে ।
প্রেমাবেশে কেহ কেহ ধরাতলে লুটে ॥ ৫৩ ॥
গায় নাচে সকলেই ছিল যত জন ।
দাঁড়ায়ে আছেন মাত্র পাঠক ব্রাহ্মণ ॥ ৫৪ ॥
বিমোহিয়া স্তব্ধীভূত জড়ের আকারে ।
দেখে শুনে কিন্তু কিছু বুঝিতে না পারে ॥ ৫৫ ॥
বরাবর প্রতিজ্ঞা আছিল তাঁর মনে ।
প্রাণান্তে কখন নাহি নাচিবে কীর্তনে ॥ ৫৬ ॥
কিন্তু এবে নাচি নাচি যত করে মন ।
ততই করেন তিনি বেগ সংবরণ ॥ ৫৭ ॥
কারণ না বুঝে এই বেগ বেগে কার ।
বিষম প্রভুর বেগ প্রলয়ী জুয়ার ॥ ৫৮ ॥
ব্রহ্মাণ্ড প্রকাণ্ডাকার মাহিক গণন ।
কোটি ব্রহ্মা কোটি বিষ্ণু কোটি পঞ্চানন ॥ ৫৯ ॥
কোটি পূর্ণ কোটি চন্দ্র বিশাল চেহারা ।
কোটি দেব কোটি দেবী মহাশক্তি ভরা ॥ ৬০ ॥
তেজস্বী তপস্বী কোটি কোটি ঋষিগণ ।
তপস্যা-প্রভায় গায় অতুল বিক্রম ॥ ৬১ ॥
বেগের সঙ্কেতে সবে হ'য়ে বাহ্যাহারা ।
অবিরত নাচে ঘুরে লাটিমের পারা ॥ ৬২ ॥
এ বা কেবা শক্তিমান পাঠক ব্রাহ্মণ ।
প্রভুর এমন বেগ করে সংবরণ ॥ ৬৩ ॥
অদ্ভুত শকতি পঞ্চভূতে গড়া কায় ।
ভাগ্য মানি পদরজ পাইলে মাথায় ॥ ৬৪ ॥
জয় পাঠকের বেশে ব্রাহ্মণমুরতি ।
কেবা তুমি কি চিনিব আমি মুঢ়মতি ॥ ৬৫ ॥
কৃপায় মোচহ মম লোচন-আঁধার ।
দেখাও প্রভুর লীলা প্রকাশ-প্রচার ॥ ৬৬ ॥
শুন মন কি ঘটন হৈল হেনকালে ।
সমাধিস্থ প্রভুদেব ভাবের বিহ্বলে ॥ ৬৭ ॥
প্রফুল্ল মুখারবিন্দ আনন্দের ভরে ।
ভাবের উচ্ছ্বাস-ছটা খেলে তদুপরে ॥ ৬৮ ॥
শ্রীঅঙ্গ শিহরে কভু তাহায় কম্পন ।
কখন পুলক চোখে ধারা-বরিষণ ॥ ৬৯ ॥
কখন বা স্বেদজল অবিরল ঝরে ।
কখন অবশ অঙ্গ ঢলে ঢলে পড়ে ॥ ৭০ ॥
গোরাভক্ত নবদ্বীপ গোস্বামী ব্রাহ্মণ ।
বারে বারে বন্দী তাঁর দুখানি চরণ ॥ ৭১ ॥
কমলাসেবিত পদ প্রভুর ধরিয়া ।
প্রেমাবেশে ঢালে অশ্রু ঝরে গণ্ড দিয়া ॥ ৭২ ॥
বিষম কঠিন লোহা সুকঠিন কায় ।
সুতীক্ষ্ণ অসির ধার হাসিয়া উড়ায় ॥ ৭৩ ॥
সিদ্ধ বাক্য মহামন্ত্র, যে মন্ত্রের বলে ।
কঠোর কুলিশ যেবা সেও শুনে গলে ॥ ৭৪ ॥
তাও ঠেলে লোহা পায়, না হয় কোমল ।
কঠিনতা গুণ তায় এতই প্রবল ॥ ৭৫ ॥
কিন্তু যেন হেন লোহা কত শক্ত প্রাণ ।
আগুনের তেজে হয় ফেনের সমান ॥ ৭৬ ॥
শক্ত তেন জ্ঞানপন্থী পাঠক ব্রাহ্মণ ।
শ্রীপ্রভুর তেজ-বলে অকথ্য কথন ॥ ৭৭ ॥
দ্রবিয়া অবশ অঙ্গ ঢলে ঢলে পড়ে ।
জ্ঞানের কাঠিন্যভাব গেছে একেবারে ॥ ৭৮ ॥
ভয়লজ্জাহীন এবে নবদ্বীপে কয় ।
গোসাঁই বাধন তুমি প্রভুর তনয় ॥ ৭৯ ॥
জীবের মঙ্গল যদি তোমার কামনা ।
দেখাও পরমহংস বটে কোন জনা ॥ ৮০ ॥
কিরূপ স্বরূপ তাঁর কিরূপ চেহারা ।
আমি বৃদ্ধ অতিশয় দৃষ্টিশক্তিহারা ॥ ৮১ ॥
এতবলি যেমন বসিল দ্বিজবর ।
কুপাভরে কৃপাময় রূপার সাগর ॥ ৮২ ॥
দ্রুতগতি বায়ু যেন আর কেবা রাখে ।
দক্ষিণ চরণ দিলা ব্রাহ্মণের বুকে ॥ ৮৩ ॥
পরম সম্পদাস্পদ প্রভুর চরণ ।
পাইয়া তখনি উঠে পাঠক ব্রাহ্মণ ॥ ৮৪ ॥
সমুদিত চৈতন্য-দিনেশ সমুজ্জ্বল ।
রামকৃষ্ণ-স্তুতি গায় হইয়া বিহ্বল ॥ ৮৫ ॥
দেখ মন শ্রীপ্রভুর কৃপার চেহারা ।
হৃদয় আকাশে স্থির বিজলীর পারা ॥ ৮৬ ॥
করে করে সুধার কিরণ ক্ষরে তায় ।
সুশীতল সুখস্পর্শ জীবন জুড়ায় ॥ ৮৭ ॥
পরম আয়াস তবু অলস না আসে ।
মত্ত হ'য়ে মহানন্দে সিন্ধুনীরে ভাসে ॥ ৮৮ ॥
মহাবলে বলী এবে বৃদ্ধক ব্রাহ্মণ ।
সংকীর্তনে নৃত্য করে প্রকৃত যেমন ॥ ৮৯ ॥
রতিমদে মত্ত করী কমলের বনে ।
অতুল আনন্দময় অঙ্গ-সঞ্চালনে ॥ ৯০ ॥
প্রভুসনে সংকীর্তনে এত সুখ পায় ।
ইচ্ছা হয় যেন হেন কভু না ফুরায় ॥ ৯১ ॥
পারায়ণ-কার্য এবে নহে সমাপন ।
বুঝিয়া করিলা প্রভু শক্তি সংবরণ ॥ ৯২ ॥
প্রভু সংবরিলে শক্তি থামিল সকলে ।
কিন্তু উপভোগ্য সুখ হৃদিমাঝে খেলে ॥ ৯৩ ॥
সমভাবে তিল অণুকণা নহে কম ।
প্রভু-সঙ্গ-সুখ নহে কভু বিস্মরণ ॥ ৯৪ ॥
ক্রমশঃ মহিমা-কথা ছুটে দূরে পরে ।
প্রচার প্রকাশ শুন ভক্তিসহকারে ॥ ৯৫ ॥
বারুদের কারখানা মেগেজিন-ঘর ।
কোম্পানির
অধিকারে পুরীর উত্তর ॥ ৯৬ ॥
একচেটে ইংরাজের এই কারবার ।
শত শত শিখসৈন্য রক্ষা করে দ্বার ॥ ৯৭ ॥
শিখেরা নানক-পন্থী ধর্মে বড় টান ।
সাধুভক্ত পেলে করে অতুল সম্মান ॥ ৯৮ ॥
প্রভুর শুনিয়া নাম আসে দরশনে ।
কখন লইয়া তাঁয় যায় মেগেজিনে ॥ ৯৯ ॥
হৃদি বুঝি উপযুক্ত জ্ঞান উপদেশ ।
কৃপা করি শক্তিসহ দেন পরমেশ ॥ ১০০ ॥
শ্রীবদন-বিগলিত বাক্য সিদ্ধমন্ত্র ।
বেদাদি পুরাণ গীতা স্তবস্তুতি তন্ত্র ॥ ১০১ ॥
ঈশ্বরের প্রমুখাৎ ঐশ বিবরণ ।
শক্তিবলে মুর্তিমান যাবৎ বচনে ॥ ১০২ ॥
এতই হইত খুশী প্রভুর বচনে ।
শুনে দণ্ডবৎ লুটে যুগল চরণে ॥ ১০৩ ॥
দেখিত প্রভুরে যেন বিশ্বগুরু প্রায় ।
অটল বিশ্বাস করে প্রভুর কথায় ॥ ১০৪ ॥
বুঝেছ বুঝেছ মন বুঝেছ কি এবে ।
সব সম্প্রদায় কেন তুষ্ট প্রভুদেবে ॥ ১০৫ ॥
বিবিধ ধরমপন্থী যত সম্প্রদায় ।
যে যথায় বিদ্যমান দেখা শুনা যায় ॥ ১০৬ ॥
পার সবে নিজ নিজ বিস্তর বিস্তর ।
বা তাহার প্রিয়ভোজ্য পুষ্টিরুচিকর ॥ ১০৭ ॥
শুন মন খুলে বলি লীলার বারতা ।
সরল সরস বড় রামকৃষ্ণকথা ॥ ১০৮ ॥
ধরাধামে লীলার কারণ যতবার ।
যুগে যুগে অবতীর্ণ প্রভু অবতার ॥ ১০৯ ॥
ভিন্ন ভিন্ন ভাব তাঁর ভিন্ন ভিন্ন বারে ।
বিভিন্ন বিভিন্ন কর্ম বিভিন্ন আধারে ॥ ১১০ ॥
একরূপে করেছেন এক ভাব পুষ্ট ।
পূর্বকৃত ধর্ম বিধি সব করি নষ্ট ॥ ১১১ ॥
এবারে দেখহ মন সহ সৎদৃষ্টি ।
একাধারে প্রভুদেব সবার সমষ্টি ॥ ১১২ ॥
সব ধর্ম সব মত সমভাবে বহে ।
একরূপে বহুরূপ শ্রীপ্রভুর দেহে ॥ ১১৩ ॥
সোনা-রূপা-রত্ন-মণি-হীরক-আকর ।
একাধারে ধরে সব উদর-ভিতর ॥ ১১৪ ॥
যা আছে ভারতে লেখা আছে বিধিমতে ।
নামে মাত্র সত্তাহীন যা নাই ভারতে ॥ ১১৫ ॥
তেন অবতারাকর প্রভুগুণমণি ।
পুরুষ-আকার নিজে জগতজননী ॥ ১১৬ ॥
সেই হেতু মাতৃভাবে প্রভুদেবরায় ।
আগাগোড়া ভজিলেন পূজিলেন মায় ॥ ১১৭ ॥
বিশ্বমাতা প্রভু লক্ষ্য সবার উপর ।
নানা ভাবরূপে পায় নানা পয়োধর ॥ ১১৮ ॥
সমভাবে পায় পুষ্টি যতেক সন্তান ।
কিবা হিন্দু কি যবন কিবা খ্রীষ্টিয়ান ॥ ১১৯ ॥
জগতজননী, তাঁয় সকলে উদ্ভব ।
জীবশিক্ষা হেতু তাই শ্যামা শ্যামা রব ॥ ১২০ ॥
প্রভুর কর্মের মর্ম কে করে ঠিকানা ।
শিক্ষা দিলা করিবারে শক্তি-আরাধনা ॥ ১২১ ॥
অগণ্য সাধনা তাঁর অগণন ভাবে ।
যে মূর্তি যে ভঙ্গে সেই ভঙ্গে প্রভুদেবে ॥ ১২২ ॥
যে রূপে যে নামে যেবা ডাকে ভগবানে ।
প্রভু গিয়া যেন সাড়া তার কানে কানে ॥ ১২৩ ॥
প্রভুর নিকটে নাই কোনই বিচার ।
জাতিধর্মভেদহীন সব একাকার ॥ ১২৪ ॥
রেণুবৎ লোমকূপ অল্প আয়তন ।
যদি কেহ কহে তার মধ্যে ত্রিভুবন ॥ ১২৫ ॥
শ্রোতা যেন কি ব্যাপার না পায় ঠিকানা ।
আপনার খোলা চোখে দরশন বিনা ॥ ১২৬ ॥
সেইমত আগাগোড়া লীলা শ্রীপ্রভুর ।
অত্যাশ্চর্য অপরূপ সরল মধুর ॥ ১২৭ ॥
না দেখালে কি দেখিবে জীবে দিশাহারা ।
প্রভুতে যে বহে বিশ্বজননীর ধারা ॥ ১২৮ ॥
অবতার বেদাদি যতেক দেখা যায় ।
প্রভুদেব তা সবার সূচীপত্র প্রায় ॥ ১২৯ ॥
সব রূপ সব ভাব শ্রীঅঙ্গেতে গেলে ।
অবহেলে বুঝা যায় প্রভুবে দেখিলে ॥ ১৩০ ॥
প্রভুর একাকী যেবা পাইবে সন্ধান ।
সে বুঝে যশবতার বেদাদি পুরাণ ॥ ১৩১ ॥
তন্ত্র গীতা কোরান গস্পেল গ্রন্থ নানা ।
অল্পকালে অবহেলে গুরুশিক্ষা বিনা ॥ ১৩২ ॥
সাধন ভজন বিনা দূরসাধ্য ফল ।
বিনা চাষে পায় বসে সুপক্ক ফসল ॥ ১৩৩ ॥
আনন্দকানন ঘরে রসে ভরা ক্ষেত ।
বিশ্বমনোহর ফুল ফল সমবেত ॥ ১৩৪ ॥
ফাঁকি দিয়া ধর্ম-কর্মে অনর্থক শ্রম ।
লুটিবারে রত্নাগার চাও যদি মন ॥ ১৩৫ ॥
প্রকাশ প্রচার শুন কেমন প্রভুর ।
ভক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী শ্রুতিসুমধুর ॥ ১৩৬ ॥
সসঙ্গ নারায়ণ শাস্ত্রী প্রভু একদিন ।
মহাপ্রীতে উপনীত যথা মেগেজিন ॥ ১৩৭ ॥
আপনি হাজির প্রভু করি দরশন ।
মহোল্লাসে পদে লুটে শিখ সৈন্যগণ ॥ ১৩৮ ॥
বসায়ে আসনে তাঁর বসে চারিধারে ।
জাতিগত উচ্চমান ভক্তিভরে করে ॥ ১৩৯ ॥
দয়াল শ্রীপ্রভুদেব স্বভাব যেমন ।
মনোমত তত্ত্বকথা কৈল উত্থাপন ॥ ১৪০ ॥
ইন্দ্রিয়াদি মন প্রাণ এক সঙ্গে লৈয়া ।
শুনে যত শিখ-সৈন্য নীরব হইয়া ॥ ১৪১ ॥
সন্নিকটে সমাসীন শাস্ত্রী হেন কালে ।
বলিলেন জ্ঞানতত্ত্ব উপদেশছলে ॥ ১৪২ ॥
শুনিয়া সৈন্যের দল উন্মত্তের প্রায় ।
উঠাইয়া তরবারি কাটিবারে যায় ॥ ১৪৩ ॥
সংসারীর মুখে জ্ঞানতত্ত্বের ব্যাখ্যান ।
শুনাইলে শিখদলে বুঝে অপমান ॥ ১৪৪ ॥
শাস্ত্রীরে কহিল তুমি আসক্ত সংসারী ।
জ্ঞানকথা-উপদেশে নহ অধিকারী ॥ ১৪৫ ॥
শাস্ত্র ঠেলি কি কারণ কহ হেন কথা ।
শাস্ত্রের অমান্য দোষে লব আজি মাথা ॥ ১৪৬ ॥
ভাগবত-শাস্ত্র আর ভক্ত ভগবান ।
তিনে এক তুল্য বস্তু হিন্দুর গিয়ান ॥ ১৪৭ ॥
সেইমত ধর্মশাস্ত্র শিখের সমাজে ।
যাঁর শাস্ত্র তাঁর তুল্য, নিত্য, নিত্য পূজে ॥ ১৪৮ ॥
কোপাবিষ্ট শিখে দেখি প্রভুনারায়ণ ।
মিষ্টভাষে তুষ্ট কৈলা তাহাদের মন ॥ ১৪৯ ॥
প্রভুদেবে শিখসৈন্য কত দূর মানে ।
মিলে রামকৃষ্ণভক্তি চরিত-শ্রবণে ॥ ১৫০ ॥
একদিন সৈন্যগণ সমরের সাজ ।
সঙ্গে আছে সৈন্নাধ্যক্ষ কাপ্তেন ইংরাজ ॥ ১৫১ ॥
অশ্বপৃষ্ঠে আগে আগে পশ্চাৎ সেনানী ।
চলিতেছে গড়মুখে অতি দ্রুতগামী ॥ ১৫২ ॥
হেনকালে পথিমধ্যে মথুরের সনে ।
আসিছেন প্রভুদেব সুন্দর ফিটনে ॥ ১৫৩ ॥
দরশন করি তাঁর যতেক সেনানী ।
জয় গুরু সম্ভাাষিয়া লুটায় অবনী ॥ ১৫৪ ॥
ফেলিয়া বন্দুক শস্ত্র ধরা করতলে ।
সামরিক রীতি প্রথা একেবারে ঠেলে ॥ ১৫৫ ॥
অধ্যক্ষের আজ্ঞা বিনা বড় পরমাদ ।
অস্ত্রত্যাগ সেনানীর মহা-অপরাধ ॥ ১৫৬ ॥
দেখি সেনাপতি কহে সৈনিকের বলে ।
অনুমতি বিনা হেন কি হেতু করিলে ॥ ১৫৭ ॥
উত্তরে অধ্যক্ষে কহে যত সৈন্যগণে ।
আমাদের এই রীতি গুরু-দরশনে ॥ ১৫৮ ॥
নাহি করি কোন গ্রাহ্য থাক্ যাক্ প্রাণ ।
দেখিলে করিব আগে গুরুরে প্রণাম ॥ ১৫৯ ॥
আশিস করিলা প্রভু ডানি হাত তুলে ।
অস্ত্রত্যাগী ধরাশায়ী সৈনিকের দলে ॥ ১৬০ ॥
শ্রীপ্রভুর কৃপাদৃষ্টে মহিমা অপার ।
সেনাপতি পুনরুক্তি না করিল আর ॥ ১৬১ ॥
জগজনমোহনিয়া দয়াল ঠাকুর ।
প্রচার প্রকাশ গুন বড়ই মধুর ॥ ১৬২ ॥