তৃতীয় খণ্ড

মাইকেল মধুসূদনের প্রভু-দর্শনে গমন


শুনিলে পবিত্রচিত,       রামকৃষ্ণলীলাগীত,
        সুললিত সুধার সমান ।
সহজে সরস হয়,        যে ছিল বিশুষ্কময়,
        রসে ভরে আচোট পাষাণ ॥ ১ ॥

মহিমামাহাত্ম্যভরা,      দৃষ্টিহীন দিশাহারা,
        পথছাড়া কুকর্মকারণে ।
অকূল ভবাব্ধিজলে,       নিরন্তর ঘুরে বুলে,
        অবহেলে পথ পায় শুনে ॥ ২ ॥

প্রভুর প্রচার-গতি,       ধীরমন্দ মন্দ অতি,
        বসন্ত অনিল সম গেলে ।
উজ্জ্বলত্বে দৃষ্টিহর,          শরতের দিনকর,
        যত কর মেঘের আড়ালে ॥ ৩ ॥

মাঝে মাঝে মেঘ-ছায়া, আবরে দিনেশকারা,
        কিন্তু কান্তি ক্ষরে মধ্যে তার ।
কখন বা ফুটে ভাতি,     আঁধার বিনাশবাতি,
        সেইরূপ প্রভুর প্রচার ॥ ৪ ॥

নানা ভাব এ লীলার,     প্রকাণ্ড বিস্তারাকার,
        বালিময় মরুর মাঝারে ।
তৃষিত পথিকদল,      বালি খুঁড়ে তুলে ফল,
        রাশি জল তাহার ভিতরে ॥ ৫ ॥

বালির ভিতরে ঢাকা,  দূরে থেকে নহে দেখা,
        অল্প রেখা ফলের লক্ষণ ।
অত্যন্ত নিকটে গেলে, তবে না দৃষ্টিতে মেলে,
        কচি পাতা ক্ষুদ্র আয়তন ॥ ৬ ॥

লীলা তেমতি প্রভুর,      দূরে থেকে বহু দূর,
        বাহ্যদৃশ্যে মরুর চেহারা ।
স্থান যেন আঠাকাঠা, নাহি মিলে এক ফোঁটা,
        দেখে শুনে লাগে দিশাহারা ॥ ৭ ॥

কিন্তু শ্রীচরণতলে,      দেখ যদি আখি মিলে,
        বিশ্বখণ্ড সম আয়তন ।
দেখিবে অগণ্য ফল,    মধ্যে তৃষ্ণাবারি জল,
        দরশনে জুড়ায় জীবন ॥ ৮ ॥

প্রচারকৌশলকল,         বনে যেন দাবানল,
        মূল কোথা সর্বাগ্রে দেখ না ।
বায়ুভরে কাঠে কাঠে,     ঘষাঘষি হ'য়ে উঠে,
        একমাত্র আগুণের কণা ॥ ৯ ॥

শ্রীমধুসূদন নাম,        হিন্দু, এবে খ্রীষ্টিয়ান,
        মাইকেল উপাধি তাঁহার ।
সরল আধারখানি,            বঙ্গকবিচূড়ামণি,
        বিদ্যাবল গায়ে অলঙ্কার ॥ ১০ ॥

প্রথমে যৌবনকালে,    উষ্ণ শোণিতের বলে,
        ধর্ম ঠেলে ধর্মান্তরে যায় ।
বাহ্যিক চটকে ভুলে,   মিলিল খ্রীষ্টিয়ানদলে,
        রূপমুগ্ধ পতঙ্গের প্রায় ॥ ১১ ॥

এবে পূর্ণ কলিকাল,     ধর্মরাজ্যে গোলমাল,
        আলুথালু আচার নিয়ম ।
আর্য-শিক্ষানীতি কোথা,     বিপর্যয় পূর্বপ্রথা,
        বিজাতীয় ধরম করম ॥ ১২ ॥

হানে যত খ্রীষ্টিয়ান,    চোখে প্রলোভন-বাণ,
        হিন্দুয়ানি জ্বর-জ্বরকায় ।
বাজায়ে দুন্দুভি ভেরি,     বড় বড় মিশনারি,
        হাটে বাটে যীশুগুণ গায় ॥ ১৩ ॥

কহে যার স্বর্গে বাস,      করিবার অভিলাষ,
        বিশ্বাস কেবল কর তাঁরে ।
বারে বারে করি মানা,    পুতুলের আরাধনা,
        মিথ্যা কেন করি পড় ফেরে ॥ ১৪ ॥

হেথা যত ব্রাহ্মগণ,     মহাদম্ভে আস্ফালন,
        সমর্থন নিজ ধর্মে করে ।
বাখানে পামর অন্ধে,    অথণ্ড সচ্চিদানন্দে,
        পরিণত করয়ে সাকারে ॥ ১৫ ॥

যদি কার থাকে মন,  যেতে শান্তি-নিকেতন,
        পরিহর ভেদাদি বিচার ।
যত পুরুষ রমণী,      সম্পর্কে ভাই ভগিনী,
        এক ব্রহ্ম তাঁর পরিবার ॥ ১৬ ॥

এদিকে হিন্দু-সন্তান,   সাকার যাদের প্রাণ,
        সেবাভক্তি-আচরণে মন ।
কেহ কহে ভজ কৃষ্ণ,      সনাতন সর্বশ্রেষ্ঠ,
        কষ্ট যাবে জুড়াবে জীবন ॥ ১৭ ॥

কেহ বলে ভজ যায়, অনাদ্যাশক্তি শ্যামায়,
        ভক্তিযুক্তিশান্তিপ্রদায়িনী ।
সকলের মূলাধার,       এ বিচিত্র সৃষ্টি যাঁর,
        দয়াময়ী জগতজননী ॥ ১৮ ॥

কেহ কয় ভক্তিভাবে,   ভজ বিশ্বগুরু শিবে,
        কেহ কয় ভজ গজানন ।
কেহ দিবাকরে কয়,       সকল মঙ্গলালয়,
        রোগশোকতাপনিবারণ ॥ ১৯ ॥

কেহ কহে ভজ রাম,      নবদূর্বাদলশ্যাম,
        গুণধাম অগতির গতি ।
অপার তাঁর মহিমা, পদস্পর্শে কাষ্ঠ সোনা,
        মানবিনী পাষাণ-মুরতি ॥ ২০ ॥

কেহ উন্মত্তের পারা, বলে ভাই ভজ গোরা,
        সঙ্গে ভাই নিত্যানন্দ তাঁর ।
দয়াময় দুই ভায়ে,   প্রেম দেন মার খেয়ে,
        ভাল মন্দ না করি বিচার ॥ ২১ ॥

বৈদান্তিকগণ হেথা,    মায়া শুনে নাড়ে মাথা,
        জ্ঞানমার্গী বিশুল্কহৃদয় ।
আকার দেখিলে পরে, মায়া মায়া ডাক ছাড়ে,
        অবিরাম নেতি নেতি কয় ॥ ২২ ॥

এইরূপে সম্প্রদায়,    নিজ নিজ মতে গায়,
        সর্বশ্রেষ্ঠ সকলের সার ।
শুনে হয় জ্ঞানহারা,        হরিপদলুব্ধ যারা,
        ভেবে সারা পাগল-আকার ॥ ২৩ ॥

ভাবে কোন্ পথে গেলে,   হৃদ্বয়রতন মিলে,
        কে হেন সুহৃদ পাই কারে ।
ঝটিকা কুয়াশা ঠেলে, দেন ঠিক পথে তুলে,
        কূলহীন ভীষণ পাথারে ॥ ২৪ ॥

এমন বিপ্লবকালে,        অবতীর্ণ ধরাতলে,
        প্রভুদেব নররূপ ধরি ।
জঞ্জাল করিলা দূর,      মহিমা কি শ্রীপ্রভুর,
        সর্বধর্ম সমন্বয় করি ॥ ২৫ ॥

অগণ্য সাধন-মত,       ভিন্নাকার ভিন্ন পথ,
        দেখাইলা আচরি আপনে ।
স্বধর্মে সরলভাবে,     যে পথিক হবে যাবে,
        সে পাবে নিশ্চয় ভগবানে ॥ ২৬ ॥

সাকারে নাহিক খাদ, সাকারে না দিল বাদ,
        সাকার সে সবাকার মূল ।
ভিত্তি বনিয়াদ ছাড়ি,     বল কি সম্বল করি,
        রাগ ধরি প্রকাণ্ড দেউল ॥ ২৭ ॥ 

বুঝিতে নারিনু মন,      ধর্ম ছাড়া কি রকম,
        নিজ ধর্ম কেন দেয় ফেলে ।
পূর্বাপর দেখা যায়,     সব ছেলে পুষ্টি পায়,
        আপনার জননীর কোলে ॥ ২৮ ॥

মার চেয়ে যার টান,   সে ডাকিনী মূর্তিমান,
        মার ধার সে কিছু না ধারে ।
পুষ্টি কোন উপাদানে,      গর্ভধারিণী জানে,
        অন্য জনে বুঝিতে না পারে ॥ ২৯ ॥

সব ধর্ম মার প্রায়,        কৃপাব্তী নিজছায়,
        কাক ধর্ম ধর্মে নাহি খেলে ।
ধর্ম নিত্য বিদ্যমান,       নামান্তরে ভগবান,
        নাহি পোষে অপরের ছেলে ॥ ৩০ ॥

সব ধর্ম একরূপ,       কিন্তু ভাবে নানারূপ,
        এক হ'য়ে স্বতন্ত্র আকার ।
ধর্মে ধর্ম সদা তুষ্ট,      ধর্মত্যাগে ধর্ম রুষ্ট,
        ধর্মতত্ত্ব করহ বিচার ॥ ৩১ ॥

বিমাতা অপর ধর্ম,     দেখিতে নহে দুষ্কর্ম,
        মর্মামর্ম বুঝ বিলক্ষণ ।
যাহে তুমি পুষ্টি পাবে,   অপর হইতে লবে,
        সার যাহা করহ গ্রহণ ॥ ৩২ ॥

অঙ্কুর উদ্‌গম-আশে, বীজ দিলে ভরা চাষে,
        গুপ্তভাবে মাটির ভিতর ।
কিমাশ্চর্য অদ্ভুত,       ঘেরে তারে পঞ্চভূত,
        ওতপ্রোতভাবে নিরন্তর ॥ ৩৩ ॥

বীজ থাকে নিজে খাঁটি, ন হি হয় জল মাটি,
        তেজের সঙ্গেতে নাহি মিশে ।
কখন নহে বাতাস,       কখন নহে আকাশ,
        সকলের সার মাত্র চুষে ॥ ৩৪ ॥

যে সব উপাদানে,      প্রফুল্ল অঙ্কুরোদ্‌গমে,
        উপযুক্ত সহায়তা করে ।
নিজদেহ পুষ্টিকারী,        তাহাই গ্রহণ করি,
        বাদ বাকি ফেলে দেয় ছুঁড়ে ॥ ৩৫ ॥

বাণিজ্যেতে দেশান্তরে, যেতে কেবা মানা করে,
        অর্জন করিতে রত্নধন ।
ল'য়ে মাল ডিঙ্গা ভরা,        চতুর বণিক যারা,
        ত্বরা ফিরে আপন ভবন ॥ ৩৬ ॥

নামে উঠে প্রেমরাশি,      স্বর্গাদপি গরীয়সী,
        জননী ও জনমের স্থান ।
হৃদয় উথলে পড়ে,      বারেক স্মরণে যাঁরে,
        ছাড়ি তাঁরে কি আছে কল্যাণ ॥ ৩৭ ॥

নামে মাত্র প্রাণ গলে,    দরশনে কিবা ফলে,
        সম্ভোগে উদর কিবা সুখ ।
কাঠতুলি কালিভরা,    তাই দিরা সে চেহারা,
        আঁকিতে নারিনু রৈল দুখ ॥ ৩৮ ॥

প্রভুদেব অবতারে,          নিজধর্ম পরিহারে,
        কি বলিলা শুন শুন মন ।
বুঝিয়া আপন ভ্রান্তি,   হৃদে নাই কোন শাস্তি,
        মাইকেল শ্রীমধুসূদন ॥ ৩৯ ॥

শুনিয়া প্রভুর নাম,            দয়াময় গুণধাম,
        আসিলেন কাতর অন্তরে ।
হৃদয়ে ভরসা করি,      মিলে যদি শান্তিবারি,
        তপ্ত চিত জুড়াবার তরে ॥ ৪০ ॥

আপন মন্দিরে হেথা,    শাস্ত্রী সঙ্গে তত্ত্বকথা,
        কহিছেন প্রভু নারায়ণ ।
উপনীত হেনকালে,    আশা ভয় হৃদে খেলে,
        মাইকেল শ্রীমধুসূদন ॥ ৪১ ॥

কর জুড়ি নম্রভাবে,       নিবেদিল প্রভুদেবে,
        কহিবারে হিত-উপদেশ ।
শুনিয়া বিনয়-উক্তি,       সকাতর শ্রদ্ধাভক্তি,
        কৃপাময় প্রভু পরমেশ ॥ ৪২ ॥

দেখ প্রভুদেব হেথা,      বলিবারে যান কথা,
        শ্রীবদনে নাহি পান বাট ।
কত চেষ্টা বারে বারে,   কে যেন রসনা ধ'রে,
        বন্ধ করে অধর কপাট ॥ ৪৩ ॥

নীরবে ক্ষণেক গেলে,     বলিলেন মাইকেলে,
        তত্ত্বকথা বলিবারে মন ।
কিন্তু তত্ত্ব নাহি জানি,   অধরে না আসে বাণী,
        মা আমারে করে নিবারণ ॥ ৪৪ ॥

শুনি শাস্ত্রী বীরবর,          প্রসারিয়া দুই কর,
        জিজ্ঞাসিল শ্রীমধুসূদনে ।
আপনি পণ্ডিতজন,           বুঝ ধর্ম বিলক্ষণ,
        স্বধর্ম তিয়াগ কৈলে কেনে ॥ ৪৫ ॥

অনুতাপ সহকারে,      মাইকেল কড়জোড়ে,
        করিলেন উত্তর তাঁহায় ।
বলিতে দলিছে প্রাণ,     কেন হৈনু খ্রীষ্টিয়ান,
        সুদ্ধমাত্র পেটের জ্বালায় ॥ ৪৬ ॥

সামান্য পেটের তরে,    যে জন স্বধর্ম ছাড়ে,
        তারে কোথা প্রভুর করুণা ।
জগতজননী তাঁর,           সব ধর্ম সৃষ্টি যার,
        তিনি তাঁরে করিলেন মানা ॥ ৪৭ ॥

অপার রূপার সিন্ধু,          দীননাথ দীনবন্ধু,
        শিবময় মঙ্গলনিধান ।
দীন দুঃধী দ্বিজসাজ,      পতিত-উদ্ধার কাজ,
        অযাচকে যেচে যার দান ॥ ৪৮ ॥

তাঁর ঠাঁই শুদ্ধ করে,     ভিখারী বিমুখে ফেরে,
        নাহি দেখি না করি শ্রবণ ।
এই মাত্র এক জনা,     মা যারে করিল মানা,
        মাইকেল শ্রীমধুসূদন ॥ ৪৯ ॥

রামকৃষ্ণলীলাগীতি,        ভক্তিগ্রন্থ শাস্ত্র নীতি,
        যাবতীয় ইহার ভিতরে ।
পাবে তা যা অন্বেষণ,     এবে তুমি দেখ মন,
        কি ফল স্বধর্ম-পরিহারে ॥ ৫০ ॥