তৃতীয় খণ্ড

প্রভুদেবের সহিত শম্ভু মল্লিকের সংজোটন


জয় প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


মহালীলা শ্রীপ্রভুর অমৃত-কখন ।
ঐশ্বর্য যাবৎ এবে সব সঙ্গোপন ॥ ১ ॥

ব্যক্ত যাহা মহৈশ্বর্য হেন প্রকৃতির ।
ধরা বুঝা মানুষের অতীত বুদ্ধির ॥ ২ ॥

নিরক্ষর এবে কিন্তু সব শাস্ত্র জানা ।
যাবতীয় মতে পথে অসাধ্য সাধনা ॥ ৩ ॥

পুংদেহে প্রকৃতি ভাব বিধি বিপরীত ।
প্রবীণ বয়সে ভাসে বালক-চরিত ॥ ৪ ॥

জৈবধর্ম যাবতীয় অঙ্গে বিলিখন ।
যদিও ব্রহ্মজ্ঞ নিজে কারণ-কারণ ॥ ৫ ॥

এদিকে সংসারী পুরা সব বিদ্যমানে ।
মাতা দারা ভ্রাতুষ্পুত্র সোদর ভাগিনে ॥ ৬ ॥

পুত্র-কন্যারূপে ভক্ত হাজার হাজার ।
তথাপি সন্ন্যাসী ত্যাগী কল্পনার পার ॥ ৭ ॥

এক রূপে বিধিবদ্ধ সকল পালন ।
বার-তিথি ভালমন্দ সুক্ষণ কুক্ষণ ॥ ৮ ॥

অন্ত পক্ষে বিধিযুক্ত বিধির বিরোধ ।
অমা কি পূর্ণিমা শুভাশুভ নাহি বোধ ॥ ৯ ॥

শ্যামাগত মন-প্রাণ এদিকে আবার ।
তিল না দেখিলে মায়ে দুনিয়া আধার ॥ ১০ ॥

না জানে সকল, তিনি কেবল ছাওয়াল ।
এদিকেতে ভাবাতীত ছয়মাস কাল ॥ ১১ ॥

করু হাসে কভু কাঁধে কভু নাচে গায় ।
কখন বা ভূমিশয্যা কখন খট্টায় ॥ ১২ ॥

কখন বালক-ভাবে যুবক কখন ।
কখন পৌগণ্ডভাবে নানা আচরণ ॥ ১৩ ॥

কখন বা ত্রস্ত-চিত বালকের চেয়ে ।
কখন কেশরী ভীত বিক্রম দেখিয়ে ॥ ১৪ ॥

কভু গায় বেশভূষা কখন উলঙ্গ ।
কখন সভার মধ্যে কখন নিঃসঙ্গ ॥ ১৫ ॥

কথন বা দেহ ঘরে কখন বা নাই ।
কোথাকার কি ঠাকুর অপূর্ব গোসাঞি ॥ ১৬ ॥

অপরূপ শ্রীশ্রীদেব অতুল-প্রতিম ।
যাদৃশায় রামকৃষ্ণ তাদৃশায় নমঃ ॥ ১৭ ॥

ভক্তিভরে রাখি তাঁর পাদপদ্মে মতি ।
এক মনে শুন মন লীলার ভারতী ॥ ১৮ ॥



নানান ভাবের ভক্ত প্রভু অবতারে ।
কেহ কেহ চায় প্রভু একা ভোগিবারে ॥ ১৯ ॥

সহ ধন-জন-দারা-নন্দিনী-নন্দন ।
প্রকাশ-প্রচারে ইচ্ছা করে না কখন ॥ ২০ ॥

মথুর আছিল ভক্ত এ হেন প্রকার ।
মনোবাঞ্ছা প্রভুদেব পুরাইলা তাঁর ॥ ২১ ॥

চতুর্দশ-বর্ষ-ব্যাপী সেবিয়া প্রভুরে ।
মর্ত্যে রাখি পুণ্যতনু এবে কালীপুরে ॥ ২২ ॥

আর আর রূপ ভক্ত মধুকর জাতি ।
ফুলের সৌরভ-গন্ধ-প্রচার-প্রকৃতি ॥ ২৩ ॥

ক্রমে ক্রমে এ জাতির ভক্তগণ ফুটে ।
অপরূপ বিশ্বগন্ধ প্রভুর নিকটে ॥ ২৪ ॥

শ্রীশম্ভু মল্লিক নামে এক ভাগ্যবান ।
আসিয়া পড়িল এর প্রভু বিদ্যমান ॥ ২৫ ॥

সিন্দুরিয়াপটি পল্লী শহর ভিতর ।
সেইখানে মতিমান মল্লিকের ঘর ॥ ২৬ ॥

ভাগ্যবান যেন তেঁহ ধনবান তায় ।
আফিসে মুচ্ছুদ্দী কর্ম বহু টাকা আয় ॥ ২৭ ॥

নানাবিধ গুণরাজি হৃদয়ে বিরাজে ।
শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মার সুজন-সমাজে ॥ ২৮ ॥

উদার সরলাচার আর ভক্তিমান ।
স্বার্থশূন্যে দুঃখিগণে অকাতরে দান ॥ ২৯ ॥

ব্রাহ্মধর্ম প্রবর্তিত ধর্মপথে মতি ।
সরলতা ভাবে কিছু সাহেবী প্রকৃতি ॥ ৩০ ॥

পুরীর অনতিদূরে আছরে তাঁহার ।
দ্বিতল উত্থান বাটী অতি চমৎকার ॥ ৩১ ॥

শুভক্ষণে শ্রীপ্রভুর সঙ্গে পরিচয় ।
ঈশ্বর-সম্বন্ধে বহু কথাবার্তা হয় ॥ ৩২ ॥

মন মজানিয়া যেন ঠাকুর গোসাঞি ।
ভুবনে এমন আর কেহ কোথা নাই ॥ ৩৩ ॥

যেমন যাহার ভাব যে ভাবে যে তুই ।
যাহার যেমন রুচি যার যাহা মিষ্ট ॥ ৩৪ ॥

তাহাই প্রধান প্রভু করিয়া কৌশলে ।
আবদ্ধ করেন তাঁর স্নেহের শিকলে ॥ ৩৫ ॥

আস্বাদ পাইয়া শম্ভু প্রভুকে না ছাড়ে ।
বারবার দেখা শুনা ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ॥ ৩৬ ॥

প্রভুসঙ্গগুণ কিবা কহিতে না পারি ।
অবিদ্যানুরাগী আমি আবদ্ধ সংসারী ॥ ৩৭ ॥

আধ্যাত্মিকে সমুন্নত মল্লিক যখন ।
বুঝিতে পারিল মনে মনে বিলক্ষণ ॥ ৩৮ ॥

বিশ্বগুরু প্রভুদেব মনুষ্য আধারে ।
তাঁহারই কৃপার মাত্র মনোবাঞ্ছা পুরে ॥ ৩৯ ॥

বসাইয়া গুরুরূপে হৃদি-সিংহাসনে ।
নিযুক্ত হইল শম্ভু প্রভুর সেবনে ॥ ৪০ ॥

মল্লিক পণ্ডিত ভারি বহু আলোচনা ।
ইংরাজের বাইবেল ভালরূপে জানা ॥ ৪১ ॥

প্রভু তার বিপরীত পুরা নিরক্ষর ।
কি প্রকারে যাবতীয় শাস্ত্রের ভিতর ॥ ৪২ ॥

প্রবেশিয়া সারতত্ত্ব করিলা উদ্ধৃত ।
দেখিয়া শুনিয়া শম্ভু বিস্ময়ে স্তম্ভিত ॥ ৪৩ ॥

মানুষে না পারে ইহা অসম্ভব নয়ে ।
সে হেতু প্রভুতে শম্ভু গুরুজ্ঞান করে ॥ ৪৪ ॥

দিনেকে রহস্যচ্ছলে প্রভুদেবে বলে ।
তোমার মতন রথী না দেখি ভূতলে ॥ ৪৫ ॥

নাহি অস্ত্র-শস্ত্র নাহি চাল তরবার ।
তথাপিও তুমি শান্তিরাম সরদার ॥ ৪৬ ॥

কোনই সম্পর্ক নাই শাস্ত্রাদির সনে ।
সারতত্ত্ব তে সবার মথিলে কেমনে ॥ ৪৭ ॥



রজোগুণাত্মক শম্ভু কর্ম ভালবাসে ।
বাসনা কেবল কর্ম পরের হিতাশে ॥ ৪৮ ॥

আশ্রম-প্রতিষ্ঠ-ইচ্ছা একান্ত প্রবল ।
যেখানে রোগি-দুঃখি-অনাথসকল ॥ ৪৯ ॥

আসিয়া আশ্রয় পার কষ্ট হয় নাশ ।
প্রভুর নিকটে করে মানস প্রকাশ ॥ ৫০ ॥

প্রভুদেব বুঝাইয়া তদুত্তরে কন ।
তুমি কি ভাবিছ ধরা সরার মতন ॥ ৫১ ॥

কি করিবে জীবহিত কি শক্তি তোমার ।
যাঁর সৃষ্টি রক্ষা-কাজে তাঁর আছে ভার ॥ ৫২ ॥

তুমি তো সকল বুঝ কি কহিব আমি ।
কর্মকামী না হইয়া হও ভক্তিকামী ॥ ৫৩ ॥

যে কর্মে ঈশ্বরলাভ মন দেহ তার ।
বিশ্বাস-প্রত্যয় ভক্তি লাভের উপায় ॥ ৫৪ ॥

সর্বাগ্রে পরমেশ্বরে কর্তব্য দর্শন ।
পশ্চাৎ করিও কর্ম যদি হয় মন ॥ ৫৫ ॥

যদি গুরু কল্পতরু আপনি ঈশ্বর ।
আসিয়া প্রত্যক্ষ হন তোমার গোচর ॥ ৫৬ ॥

কি বস্তু চাহিবে তুমি তাঁহার সকাশে ।
ভক্তি না কি সেবাশ্রম পরদুঃখ-নাশে ॥ ৫৭ ॥

ঈশ-পাদ-পদ্মে ভক্তি-বিশ্বাস-প্রত্যয় ।
এই মাত্র সারবস্তু অন্য কিছু নয় ॥ ৫৮ ॥

ভাবের আশ্রয় ধর এ তিনের বলে ।
ভাবের অভাবে কভু বস্তু নাহি মিলে ॥ ৫৯ ॥

বিশেষিয়া বিমোহিতে মল্লিকের প্রাণ ।
ধরিলেন পিককণ্ঠে প্রসাদের গান ॥ ৬০ ॥

মন কর কি তত্ত্ব তাঁরে, উন্মুক্ত আঁধার ঘরে ।
সে যে ভাবের বিষয়, ভাব ব্যতীত
অভাবে কি ধরতে পারে ॥

অগ্রে শশী বশীভূত কর তোমার শক্তিসারে ।
তোর ঘরের ভিতর চোর কুঠরি,
ভোর হলে চোর পলাবেরে ॥

ষড়দর্শনে দর্শন মিলে না, আগম-নিগম-তন্ত্রসারে ।
সে যে ভক্তি রসের রসিক,
সদানন্দে বিরাজ করে পুরে ॥

সে ভাবলোভে পরম যোগী
যোগ করে যুগ-যুগান্তরে ।
কোলে সে ভাবের উদয়,
লয় সে যেন লোহাকে চুম্বক ধরে ॥

প্রসাদ বলে মাতৃভাবে আমি তত্ত্ব করি যাঁরে ।
সেটা চত্বরে কি ভাঙ্গর হাঁড়ি,
বুঝ না রে মন ঠারে ঠোরে ॥


ভাবরাজ্যেশ্বর প্রভু ভাবের গোসাঞি ।
সঙ্গীতে শম্ভুর ভাবে করিলা পোষ্টাই ॥ ৬১ ॥

অমোঘ বচনবীজ প্রভুর আমার ।
উচ্চ হৃদয়ক্ষেত্রে পশিয়া শ্রোতার ॥ ৬২ ॥

তুলিল অঙ্কুর তাহে সহ কচি পাতা ।
পরে পরিণত তাহে ভকতির লতা ॥ ৬৩ ॥

ক্ষেত্র মধ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রভুর আসন ।
আশ্রয়-স্বরূপ লতা ধরিল চরণ ॥ ৬৪ ॥

প্রভুর সোহাগে ক্রমে লতিকা অতুল ।
প্রসব করিল চিত্ত-বিনোদন ফুল ॥ ৬৫ ॥

সৌরভে হইয়া মত্ত মল্লিক ধীমান ।
একমাত্র প্রভুসে বা হইল ধ্যান জ্ঞান ॥ ৬৬ ॥

পরিচয়ে এক মনে শুন তুমি মন ।
রামকৃষ্ণ-গুণগাথা অমৃত-কথন ॥ ৬৭ ॥



এখানে দক্ষিণেশ্বরে যেখানে উদ্যান ।
শহর হইতে বহুদুর ব্যবধান ॥ ৬৮ ॥

মল্লিকের যাতায়াত ছিল অশ্বযানে ।
সম্ভ্রান্ত লোকের এই ধারা বর্তমানে ॥ ৬৯ ॥

পূর্বরীতি পরিত্যক্ত মল্লিক এখন ।
পদব্রজে প্রায় করে গমনাগমন ॥ ৭০ ॥

দিনেকে শম্ভুর কোন পরিচিত জনা ।
পথিমধ্যে কহে তাঁর একি বিবেচনা ॥ ৭১ ॥

পায়ে হেঁটে এত দূর কি হেতু গমন ।
আপদ-বিপদ পথে আছে বিলক্ষণ ॥ ৭২ ॥

আরক্ত বদনে শম্ভু কয় তদুত্তরে ।
লইয়া তাঁহার নাম এসেছি বাহিরে ॥ ৭৩ ॥

বিপদ-বারণ নামে করিলে আশ্রয় ।
অকুল পাথার তর বিপদ না হয় ॥ ৭৪ ॥

পথেতে বিশ্বাস-ভক্তি ভাগ্যবানে পার ।
পরমার্থশালী শম্ভু প্রভুর কৃপায় ॥ ৭৫ ॥

শ্রীপদ-সরোজে পেয়ে ভক্তির আস্বাদ ।
দিনে দিনে বৃদ্ধি প্রভু সেবনের সাধ ॥ ৭৬ ॥

প্রভুকে লইয়া যায় উদ্যান-ভবনে ।
বিধিমতে সেবে তাঁর পরম যতনে ॥ ৭৭ ॥

শুনিয়াছি যে প্রকার যতন সেবার ।
প্রভুতে ধারণা তিনি সর্ব সারাৎসার ॥ ৭৮ ॥

এত ধনী মানী তাহে সাহেবী ধরন ।
স্বহস্তে মুছায়ে দেয় প্রভুর খড়ম ॥ ৭৯ ॥

স্বতন্ত্র বাসন-পত্র প্রভুর কারণে ।
নিজে হাতে পরিষ্কার রাখে অনুক্ষণে ॥ ৮০ ॥

আলাহিদা পায়খানা অতি পরিষ্কার ।
যেমন শয্যার ঘর উদ্যানে তাহার ॥ ৮১ ॥

যোগায় সেখানে জল আপনার হাতে ।
কখন না হয় আজ্ঞা অন্য জনে দিতে ॥ ৮২ ॥

সুমিষ্ট সুমিষ্ট ফল দুর্লভ বাজারে ।
তাই থাকে নানাবিধ সংগৃহীত ঘরে ॥ ৮৩ ॥

কতই যতন তাঁর প্রভুর উপর ।
সুন্দর কাহিনী কথা শুন অতঃপর ॥ ৮৪ ॥

একদিন প্রভুদেব অসুস্থ শরীর ।
অক্ষম না হয় শক্তি যাইতে বাহির ॥ ৮৫ ॥

মল্লিক অজ্ঞাত-বার্তা প্রভু কি কারণ ।
উদ্যান-ভবনে নাহি দেন দরশন ॥ ৮৬ ॥

প্রভু-সেবা অভিলাষী থাকিতে না পারে ।
অন্বেষণে উপনীত প্রভুর মন্দিরে ॥ ৮৭ ॥

ভক্তপ্রিয় প্রভুদেব ভকতপরান ।
শম্ভুকে দেখিয়া তাঁর টুটিল ব্যারাম ॥ ৮৮ ॥

তখনি উঠিয়া প্রভু মল্লিকের সনে ।
ধীরে ধীরে আগমন করিলা উদ্যানে ॥ ৮৯ ॥

সুমিষ্ট বেদানা ছিল মল্লিকের ঘরে ।
আপুনি ছাড়িয়ে দেন শ্রীপ্রভুর করে ॥ ৯০ ॥

খাইলেন প্রভুদেব যত ইচ্ছা তাঁর ।
অবশিষ্ট আলাহিদা বহে একধার ॥ ৯১ ॥

ঈশ্বর প্রসঙ্গ পরে হয় দুই জনে ।
প্রভু কন হিয়া মন ভক্তবর শুনে ॥ ৯২ ॥

পরে প্রভু বলিলেন নাই সুস্থকায় ।
আজিকার পরিচ্ছেদ এইখানে সায় ॥ ৯৩ ॥

ইতি উতি চায় শম্ভু দেখিল বেদানা ।
সঙ্গে কিছু লইবারে করিল প্রার্থনা ॥ ৯৪ ॥

আপনার জন্য আনা বেদানাসকল ।
কারে দিব কি হইবে হেন মিঠা ফল ॥ ৯৫ ॥

ভক্তবৎসল বুঝি অন্তর তাঁহার ।
লইলেন দুটি দুই হাতে আপনার ॥ ৯৬ ॥

বাহিরেতে আসিলেন ফটকাভিমুখে ।
পশ্চাৎ থাকিয়া শম্ভু দাঁড়াইয়া দেখে ॥ ৯৭ ॥

যে উদ্যানে শ্রীপ্রভুর সকলই জানা ।
উচ্চ নীচ স্থান কোথা ভালরূপে চেনা ॥ ৯৮ ॥

আনাগোনা ন্যূনপক্ষে দিনে দুইবার ।
তথায় ঘটিল এক আশ্চর্য ব্যাপার ॥ ৯৯ ॥

সদর দুয়ার আর চক্ষে নাহি পড়ে ।
এখানে সেখানে প্রভু ঘুরে চারিধারে ॥ ১০০ ॥

মল্লিক বুঝিতে নারে ইহার কারণ ।
ঘটনা যাবৎ কিন্তু করে নিরীক্ষণ ॥ ১০১ ॥

মনে মনে নানা চিন্তা হয় সমুদিত ।
অবশেষে শ্রীপ্রভুর কাছে উপনীত ॥ ১০২ ॥

দেখিলেন দিশাহারা পথিকের প্রায় ।
কিংবা যেন হর লোকে সিদ্ধির নেশায় ॥ ১০৩ ॥

সশঙ্কিত-চিত শম্ভু ধরি পরমেশে ।
ধীরে ধীরে ফিরাইল উদ্যান-আবাসে ॥ ১০৪ ॥

মল্লিক লইলে পরে হাতের বেগানা ।
তখন সহজাবস্থা আসিল ঠিকানা ॥ ১০৫ ॥

ত্রস্ত ব্যস্ত শম্ভু করে প্রভুকে জিজ্ঞাসা ।
আচম্বিতে কি কারণ হৈল হেন দশা ॥ ১০৬ ॥

উত্তর করিলা তাঁর প্রভু পরমেশ ।
গাঠরি না বাঁধে পাখী আর দরবেশ ॥ ১০৭ ॥

ত্যাগী দরবেশ জনে যদি ছাঁদা বাঁধে ।
নিশ্চয় পড়িতে হয় তাকে যেন ফাঁদে ॥ ১০৮ ॥

তিয়াগীর পক্ষে নহে কোনই সম্বল ।
ভ্রান্তে কি অভ্রান্তে দুয়ে সমরূপ ফল ॥ ১০৯ ॥

সম্বল থাকিলে পরে হয় লক্ষ্যহারা ।
বদ্ধদৃষ্টি ঘানিঘরে বলদের পারা ॥ ১১০ ॥



শুন মন শ্রীপ্রভুর ত্যাগের বারতা ।
এ নহে বিষয় কিংবা বিষয়ীর কথা ॥ ১১১ ॥

বিষয়ে আবদ্ধ বুদ্ধি তার কিবা বল ।
মমতা আসক্তি মাত্র যাহার সম্বল ॥ ১১২ ॥

বিষয়ে আবদ্ধ বুদ্ধি শুন কারে বুঝি ।
কামিনী কাঞ্চন যার এই দুটি পুঁজি ॥ ১১৩ ॥

নরে যেন জ্বারে চিন্তা আতপ বসনে ।
কি থাকে অপক্ক বাঁশে যদি ধরে ঘুণে ॥ ১১৪ ॥

সম্বলে তেমতি জ্বারে তিয়াগীর মন ।
গাঁঠরি বন্ধন নয় মনের বন্ধন ॥ ১১৫ ॥

উপার কেবল মন মনোমত হোলে ।
হরির চরণ-রত্ন যার বলে মিলে ॥ ১১৬ ॥

মনের প্রকৃতি মন কি কব তোমায় ।
মনে মুক্ত মনে বন্ধ মনের মায়ায় ॥ ১১৭ ॥

আখির উপরে কত না হয় দর্শন ।
একবার যদি কিছু নাহি বলে মন ॥ ১১৮ ॥

আছে যদি বলে তবে রক্ষা নাই আর ।
তখনি বিমানে রচে বিচিত্র সংসার ॥ ১১৯ ॥

সঙ্কল্প-বিকল্প লক্ষ পলকে পলকে ।
ঘুরার আগোটা বিশ্ব ঘুরুনিয়া পাকে ॥ ১২০ ॥

দৃষ্টির গোচর নহে যেমন পবন ।
কে জানে কোথায় থাকে কোথায় ভবন ॥ ১২১ ॥

কিন্তু যবে সঞ্চালন হয় নিজ বলে ।
উপাড়িয়া গিরি শির ফেলে ভূমিতলে ॥ ১২২ ॥

মনেতে বহিলে মন বাসনা-পবন ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদিগণে করে আন্দোলন ॥ ১২৩ ॥

মন যত ল'য়ে যায় যেথা ইচ্ছা তার ।
সুপথ কুপথ কিবা না করি বিচার ॥ ১২৪ ॥

সম্বল-আসক্ত মনে সুপথ না জানে ।
সতত কুপথে গতি অবিস্তার মনে ॥ ১২৫ ॥

আন পথে আগমনে আন কর্মফল ।
শেষে তুলে কর্মফলে মহা দাবানল ॥ ১২৬ ॥

বীজের বালির মত ক্ষুদ্র-আয়তন ।
প্রান্তরে পড়িলে পরে হয় তার বন ॥ ১২৭ ॥

সেই মত তিয়াগীর খালি মন-ক্ষেতে ।
অণুমাত্র আশ-বীজ যদি যায় পুঁতে ॥ ১২৮ ॥

কর্মফলে ক্রমে ক্ষেতে বন হ'য়ে যায় ।
প্রভুর আসন-হেতু স্থান নাহি পায় ॥ ১২৯ ॥

হারায়ে অমূল্য নিধি তুল্য যার নাই ।
সম্বলেতে নিঃসম্বল গেঁঠে বাঁধা ছাই ॥ ১৩০ ॥

তিলমাত্র তিয়াগীর গেঁঠে বাঁধা মানা ।
মনে যেন কোনমতে না উঠে বাসনা ॥ ১৩১ ॥

সত্য বটে বাসনা-বর্জিত নাহি মন ।
কর্ম করে দেহ-পুরে রহে যতক্ষণ ॥ ১৩২ ॥

কি কর্ম কর্তব্য শুন কর্মের বিধান ।
জীবের শিক্ষায় যা বলিলা ভগবান ॥ ১৩৩ ॥

তিয়াগী ঈশ্বরচিন্তা করিবে সর্বদা ।
তবে দেহ আছে তার আছে তৃষ্ণা-ক্ষুধা ॥ ১৩৪ ॥

কলিকালে অন্নগত জীবের পরান ।
অবশ্য করিতে হবে অন্নের সন্ধান ॥ ১৩৫ ॥

যে দ্বারে ভরিবে পেট সেই ঠাই রবে ।
সম্বলের হেতু নাহি দ্বারান্তরে যাবে ॥ ১৩৬ ॥

করিবে আপন কর্ম সাধন-ভজন ।
দিবারাতি যেন তার মগ্ন থাকে মন ॥ ১৩৭ ॥

কম্পাসের কাঁটা সম সতত উত্তরে ।
বিনাশে উল্লাস তবু তিল নাহি সরে ॥ ১৩৮ ॥

মনের সহস্র ধারা রোধিবে যতনে ।
কিংবা না দোলায় তার বাসনা-পবনে ॥ ১৩৯ ॥

বিষয়ে আসক্তি-হীন যে জন তিয়াগী ।
সম্বলে সে জন হয় কর্মফল-ভোগী ॥ ১৪০ ॥

প্রভুর সম্বলে দেখ কিরূপ চেহারা ।
সঙ্গলে করিল তাঁয় দৃষ্টিশক্তি-হারা ॥ ১৪১ ॥

পরিত্যক্ত হ'লে পরে হাতের বেদানা ।
তবে না আসিল দেহে বাহ্যিক ঠিকানা ॥ ১৪২ ॥

কায়মনোবাক্যে খেলে ত্যাগের মুরতি ।
শুন মন শ্রীপ্রভুর লীলার ভারতী ॥ ১৪৩ ॥

যে না বুঝে নিজ মন সে বুঝিবে কিসে ।
কি খেলিলা প্রভুদেব অবতারবেশে ॥ ১৪৪ ॥

বুঝিতে না পেলে ত্যাগ তাঁহার কৃপায় ।
ত্যাগের বরন ধর্ম বুঝা নাহি যায় ॥ ১৪৫ ॥

লীলা দরশনে যদি সাধ হয় মন ।
সর্বাগ্রে শ্রীপদে কর সর্বস্ব অর্পণ ॥ ১৪৬ ॥

যে জন তিয়াগী তিনি সর্বস্বাধিকারী ।
সম্বলেতে নিঃসম্বল পথের ভিখারী ॥ ১৪৭ ॥

ঘটস্থিত বল-বুদ্ধি যতেক শত্রুর ।
সহযোগে চালনার চলে যতদূর ॥ ১৪৮ ॥

সকল প্রয়োগ করি বায় বুঝিবারে ।
কি কহিলা প্রভুদেব কি মর্ম ভিতরে ॥ ১৪৯ ॥

গাঁঠরি বন্ধনে হয় দৃষ্টিহীন আঁখি ।
এ কিরূপ অপরূপ না শুনি না দেখি ॥ ১৫০ ॥

সেদিন না কহি কিছু অধিক তাঁহায় ।
আশ্চর্য হইয়া দিল প্রভুকে বিদায় ॥ ১৫১ ॥

নিঃসম্বলে লঘুদেহ গোলযোগ নাই ।
পথে পথে পুরীমধ্যে ফিরিলা গোসাঁই ॥ ১৫২ ॥

শুন মন কি হইল পশ্চাৎ বারতা ।
মহালীলা শ্রীদেবের সুমধুর কথা ॥ ১৫৩ ॥ 



অন্য একদিন প্রভু পেটের পীড়ায় ।
বড়ই কাতর শুয়ে আছেন শয্যায় ॥ ১৫৪ ॥

শুনে শম্ভু উদ্যান-ভবনে ল'য়ে গেল ।
সরিষা-প্রমাণ মাত্র অহিফেন দিল ॥ ১৫৫ ॥

উপশম হয় পীড়া আফিং খাইয়ে ।
নিতি নিতি তাই খান উদ্যানে আসিয়ে ॥ ১৫৬ ॥

মল্লিক শ্রীপ্রভুদেবে করে নিবেদন ।
নির্দিষ্ট সময়ে নিত্য কর্তব্য সেবন ॥ ১৫৭ ॥

সেহেতু কিঞ্চিৎ রাখ আপনার ঠাঁই ।
লইতে স্বীকৃত নাহি হইলা গোসাঞি ॥ ১৫৮ ॥

এখানে সেবন হয় তার নাহি হানি ।
গাাঠরি বাধিয়া নিতে নাহি পারি আমি ॥ ১৫৯ ॥

সঙ্গেতে সম্বল করে হতবুদ্ধি বল ।
হোক না ঔষধ তবু ইহাও সম্বল ॥ ১৬০ ॥

তবে যবি পাঠাইয়া দেহ মোর ঠাঁই ।
তাহাতে আপত্তি মোর কিছুমাত্র নাই ॥ ১৬১ ॥

শম্ভু শিহরাঙ্গ শুনি ত্যাগের কাহিনী ।
এ যে সুবিষম ত্যাগ কখন না শুনি ॥ ১৬২ ॥

ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়ালোপ ছাঁদা যদি থাকে ।
শম্ভুর বাসনা পুনঃ পরীক্ষায় দেখে ॥ ১৬৩ ॥

এতেক ভাবিয়া শ্রীপ্রভুর অগোচরে ।
আফিং লইয়া কিছু পাতার ভিতরে ॥ ১৬৪ ॥

লুকায়ে রাখিল তাঁর পকেট-ভিতর ।
প্রভুদেব জ্ঞাত নহে কোনই খবর ॥ ১৬৫ ॥

স্বস্থানে গমন-কালে পূর্বের মতন ।
ফটক-দ্বারের নাহি পান অন্বেষণ ॥ ১৬৬ ॥

উদ্যান-মাঝারে হেথা সেথা ভ্রাম্যমাণ ।
দূরে থাকি দেখে শম্ভু শূন্য-বুদ্ধি-জ্ঞান ॥ ১৬৭ ॥

নাহি কথা, গিয়া তথা প্রভুর নিকটে ।
লইল যা রেখেছিল জামার পকেটে ॥ ১৬৮ ॥

অমনি ঘুচিল গোল সব পরিষ্কার ।
প্রত্যেক ইন্দ্রিয় করে কার্য আপনার ॥ ১৬৯ ॥

বিষম তিয়াগী প্রভু, লিপ্ত গন্ধ যেথা ।
অহংকার আমি-বুদ্ধি সম্বল-মমতা ॥ ১৭০ ॥

তথা নাই শ্রীগোসাঞি বিরাগ প্রবল ।
মূর্তিমান তিয়াগীর আদর্শের স্থল ॥ ১৭১ ॥

কায়মনোবাক্যে ত্যাগ যে ত্যাগের নাম ।
জানি না শুনি না হেন কোথা বিদ্যমান ॥ ১৭২ ॥

ঠাকুরের ত্যাগ দেখি বলবুদ্ধি ছাড়ে ।
মহেশের পুঁজি যাঁড় তাও শূন্যে উড়ে ॥ ১৭৩ ॥

কায়মনোবাক্যে ত্যাগ ত্যাগের মরম ।
নরবুদ্ধি-পার বুঝা বড়ই বিষম ॥ ১৭৪ ॥

ঠাকুরের তিয়াগের পাইয়া আভাস ।
শ্রীপদে শম্ভুর হৈল অটল বিশ্বাস ॥ ১৭৫ ॥



বুঝ এই কলিকাল নরনারীগণ ।
বিষয়ে আবদ্ধ বুদ্ধি চিনে মাত্র ধন ॥ ১৭৬ ॥

বিষয়-সম্পত্তি আসবাব মাল-চিজ ।
চাকি ফাঁকি রূপা সোনা অবিস্তার বীজ ॥ ১৭৭ ॥

মাতৃপয়োধরছিন্নমুখ শিশু ছেলে ।
পাইলে মোহিনী মুদ্রা মায়ে যার ভুলে ॥ ১৭৮ ॥

কোলশয্যা দুগ্ধপোষ্য সন্তান-রতন ।
তখনি অমনি দেয় যদি পার ধন ॥ ১৭৯ ॥

সতীত্বে বিদায় দেয় কুলবতী হেসে ।
মহারঙ্গময়ী অর্থ কাঞ্চনের আশে ॥ ১৮০ ॥

শোণিতে পালিত পুত্র অর্থের কারণ ।
শাণিত অসিতে করে পিতারে নিধন ॥ ১৮১ ॥

দ্বিজস্ব দেবস্ব চুরি চিরকালই হয় ।
ধনের সহিত ধর্মরত্ন বিনিময় ॥ ১৮২ ॥

কাঞ্চনের যেন কথা তেন কামিনীর ।
ত্রিপুর জুড়িয়া যার বিক্রম জাহির ॥ ১৮৩ ॥

ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশের বুদ্ধি যেথা দুলে ।
জীবের দূরের কথা তারে রাখ ঠেলে ॥ ১৮৪ ॥

এ বারতা ভক্ত শম্ভু বিশেষ বিদিত ।
দেখিল প্রভুকে দুয়ে আসক্ত-রহিত ॥ ১৮৫ ॥

বিষম বিরাগ তাঁর কামিনী-কাঞ্চনে ।
একে দুয়ে নহে তিনে কায়বাক্যমনে ॥ ১৮৬ ॥

পাইয়া নির্মল আঁখি হৈল স্থির জ্ঞান ।
নরতনু প্রভুদেব পুরুষপ্রধান ॥ ১৮৭ ॥

আফিস-মহলে শম্ভু গণ্যমান্য জনা ।
স্বার্থশূন্যে ভূরি দাানে সাধারণে জানা ॥ ১৮৮ ॥

বচনে বিশ্বাসাদর সকলেই করে ।
কিবা ধনী মানী গুণী শহর-ভিতরে ॥ ১৮৯ ॥

পাইলেই একত্তরে দুই-দশ জন ।
কথায় কথায় করে কথা-আন্দোলন ॥ ১৯০ ॥

বিনয়-আগ্রহ শ্রদ্ধা ভক্তি-সহকারে ।
মূর্তিমান বিশ্বগুরু মনুষ্য-আধারে ॥ ১৯১ ॥

কুতুহলাবিষ্ট শুনি শম্ভুর বচন ।
দরশনে শ্রীপ্রভুর আসে লোকজন ॥ ১৯২ ॥



ভক্তিমান যেইমত মল্লিক আপুনি ।
অনুরূপ ভক্তিমতী তাহার ঘরণী ॥ ১৯৩ ॥

এখন দক্ষিণেশ্বরে মাতাঠাকুরানী ।
নহবতে বাস যেখা প্রভুর জননী ॥ ১৯৫ ॥

মল্লিক-গৃহিণী তাঁয় ল'য়ে গিয়া ঘরে ।
পূজা করে পাদপদ্ম ষোড়শোপচারে ॥ ১৯৬ ॥

ঈশ্বরের কৃপা-দৃষ্টি পড়ে যেইখানে ।
রক্ত-মাংস কিবা ভক্তি উপজে পাষাণে ॥ ১৯৭ ॥

হায় প্রভু মম ভাগ্যে কেন এ প্রকার ।
যেমন আপুনি তেন পোষ্য পরিবার ॥ ১৯৮ ॥

ভক্তি-ভক্তে পরাঙ্মুখ এ কি কর্মফল ।
সাগরে নামিনু তবু না পাইনু জল ॥ ১৯৯ ॥

শ্রীপাদ-পরেশ স্পর্শ কৈনু বার বার ।
তথাপি কালিমা-বর্ণ গেল না আমার ॥ ২০০ ॥

ভক্তিপ্রার্থী যতদিন ভক্তি না পাইব ।
দুয়ারে তোমার প্রভু পড়িয়া থাকিব ॥ ২০১ ॥



নহবত ঘরখানি অল্প-পরিসর ।
দুজনের পক্ষে বাস অতি কষ্টকর ॥ ২০২ ॥

ভক্তবর সেই হেতু মায়ের কারণ ।
প্রস্তুত করিল এক স্বতন্ত্র ভবন ॥ ২০৩ ॥

যেমন এ মহালীলা লীলার প্রধান ।
আপুনি স্বয়ং খোদ নিজে অধিষ্ঠান ॥ ২০৪ ॥

অংশ নহে কলা নহে পুরা ষোল আনা ।
শাস্ত্রের বাক্যের পার অজ্ঞাত ঠিকানা ॥ ২০৫ ॥

সেই মত ভক্ত সাথী বীর বলবান ।
কোরান-পুরাণ-তন্ত্রে মিলে না সন্ধান ॥ ২০৬ ॥

মহা মহা দিগ্বিজয়ী সমর-কুশল ।
বিবেক-বিশ্বাস-ভক্তি-জ্ঞান-সমুজ্জ্বল ॥ ২০৭ ॥

শাস্ত্রজ্ঞান তত্ত্ববোধ আধ্যাত্মিকোন্নতি ।
ধিয়ান সমাধিরসজ্ঞত্ব গুরু প্রীতি ॥ ২০৮ ॥

কাম-লোভ আন্‌-চর্চা দ্বেষ-নিন্দা-শূন্য ।
নানাবিধ গুণশর হৃদিতুণে পূর্ণ ॥ ২০৯ ॥

বর্তমানে এই ভক্ত শম্ভু নামধারী ।
মহালীলা-সাগরের প্রধান ডুবুরী ॥ ২১০ ॥

বলিহারি তলস্পর্শী দিব্য চক্ষুষ্মান ।
কেমনে পাইল খুঁজে মায়ের সন্ধান ॥ ২১১ ॥

স্বতই আপুনি যাতা মায়া-আবরণে ।
যোগী যতি তপস্বীরা না পায় সাধনে ॥ ২১২ ॥

লীলার প্রাঙ্গণে এবে শরীর ধারণ ।
মায়ার উপরে মায়া মহা আবরণ ॥ ২১৩ ॥

তদুপরি সংগোপিত প্রভুর দ্বারায় ।
অদ্যাবধি কোন প্রাণী তত্ত্ব নাহি পায় ॥ ২১৪ ॥

মথুর এমন ভক্ত সেবক-অধীপ ।
চতুর্দশ বর্ষাধিক প্রভুর সমীপ ॥ ২১৫ ॥

দিনে রেতে খেতে শুতে সঙ্গে নিরন্তর ।
সেও না পাইল তিল মায়ের খবর ॥ ২১৬ ॥

নববিনির্মিত এই ভবন যেথায় ।
পুরীর সান্নিধ্যে স্থান লাগালাগি প্রায় ॥ ২১৭ ॥

বাস উপযোগী যাহা যাহা প্রয়োজন ।
স্বচক্ষে দেখিয়া শম্ভু করে আয়োজন ॥ ২১৮ ॥

শুভদিনে শ্রীশ্রীমায়ে তথা ল'য়ে গেল ।
কার্যের সাহায্যে এক দাসী নিয়োজিল ॥ ২১৯ ॥

সতর্কে সযত্নে সন্ধা তত্ত্বাবধারণ ।
কখন মায়ের হয় কিবা প্রয়োজন ॥ ২২০ ॥

দিনমানে শ্রীপ্রভুরও গমন তথায় ।
মন্দিরে ফিরেন পুনঃ সন্ধ্যার বেলায় ॥ ২২১ ॥



এইরূপে এইখানে বিগত বৎসর ।
পেটের পীড়ার মাতা হইলা কাতর ॥ ২২২ ॥

চিকিৎসায় কথঞ্চিৎ হৈল উপশম ।
পিত্রালয়ে রোগারোগ্যে প্রতি আগমন ॥ ২২৩ ॥

দেশের উন্মুক্ত বায়ু মিঠানিয়া জল ।
এসব পীড়ার পক্ষে পরম মঙ্গল ॥ ২২৪ ॥

কুগ্রহের ফেরে হেখা ঘটে বিপরীত ।
শয্যাশায়ী মাতা পীড়া এতই বর্ধিত ॥ ২২৫ ॥

উৎকট অবস্থাপন্ন প্রাণের সন্দেহ ।
শরীর কঙ্কালসার অবসন্ন দেহ ॥ ২২৭ ॥

এখন জীবিত নাই জনক তাঁহার ।
আত্মীয় এমন নাই যত্ন লইবার ॥ ২২৮ ॥

জননী অবস্থাহীনা রোজা আনিবারে ।
ছোট ছোট ভাইগুলি যথাসাধ্য করে ॥ ২২৯ ॥

দেশের হাতুড়ে রোজা না পায় নাগাল ।
শেষেতে বাড়িয়া উঠে দারুণ জঞ্জাল ॥ ২৩০ ॥

সর্বৈব প্রকারে হ'য়ে নিরুপায় হেথা ।
সিংহবাহিনীর মাড়ে হত্যা দিলা মাতা ॥ ২৩১ ॥

সত্বরেই গ্রাম্যদেবী প্রসন্না হইয়ে ।
ব্যাধিনিবারণৌষধি দিলা নির্দেশিয়ে ॥ ২৩২ ॥

আরোগ্য হইল মাতা ঔষধসেবনে ।
সবলাঙ্গ পুষ্টদেহ হয় দিনে দিনে ॥ ২৩৩ ॥

এখানের গ্রাম্যদেবী সিংহবাহিনীকে ।
জানিত না আদতেই নিকটস্থ লোকে ॥ ২৩৪ ॥

যে অবধি শ্রীশ্রীমার বিয়াধি আরাম ।
গ্রাম-গ্রামান্তরেতে জাহির হৈল নাম ॥ ২৩৫ ॥

এবে দূরান্তর থেকে আসে লোকজন ।
পূজা কিংবা মানসিক শোধের কারণ ॥ ২৩৬ ॥

পুজা মানসিকে লোকে পায় মহা ঋদ্ধি ।
সর্পবিষ-বিনাশনে দেবিকা-প্রসিদ্ধি ॥ ২৩৭ ॥

মাড়ের মৃত্তিকা কিংবা তাঁর স্নানজল ।
সেবনে সাপের বিধে নিশ্চয় মঙ্গল ॥ ২৩৮ ॥

দংশিত প্রাণীর দেহে জীবন থাকিতে ।
মাটি কিংবা স্নানজল যদি পারে দিতে ॥ ২৩৯ ॥

নিশ্চয় আরোগ্য-লাভ অপূর্ব ব্যাপার ।
ঝাড় ঝুঁক জড়ি রোজা নহে দরকার ॥ ২৪০ ॥

কি আশ্চর্য এইখানে এত বিষধর ।
মনে হয় স্থান যেন বাসুকি-নগর ॥ ২৪১ ॥

লোকের কল্যাণহেতু তাই শ্রীমাতা ।
ঘুমন্ত দেবীকে এবে করিলা জাগ্রতা ॥ ২৪২ ॥

প্রভু জাগাইলা কালী দক্ষিণশহরে ।
এখানে জাগায় মাতা গ্রাম্যদেবিকারে ॥ ২৪৩ ॥

যেমন ঠাকুরদেব তেন ঠাকুরানী ।
এক বস্তু ভিন্ন তত্ত্ব বিচিত্র কাহিনী ॥ ২৪৪ ॥



গদাই পরাণ যার বসতি স্বদেশে ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে ছুটে ছুটে আসে ॥ ২৪৫ ॥

গদা'য়ের আগেকার ভোজ্য প্রীতিকর ।
গোপনে বাঁধিয়া আনে বস্ত্রের ভিতর ॥ ২৪৬ ॥

সরু চিঁড়া চাল ভাজা ফুল ফুলা মুড়ি ।
ভেলা ভেলা ভিঁড়া গুড় কুমড়ার বড়ি ॥ ২৪৭ ॥

ঘরের গাভীর দুধে ভেলা চাঁছি পাতে ।
খানাকুলে খইমোয়া সুমিষ্ট খাইতে ॥ ২৪৮ ॥

দেশের লোকের মুখে ভাগিনা হৃদয় ।
সাংসারিক সমাচার পান পরিচয় ॥ ২৪৯ ॥

কথায় কথায় তিনি শুনিলেন পরে ।
এক বড় মকদ্দমা বাধিয়াছে ঘরে ॥ ২৫০ ॥

তাহার উপরে পুনঃ পাইল লিখন ।
লেখা তায় বিবাদের যত বিবরণ ॥ ২৫১ ॥

তে কারণে প্রভুদেবে কহে বারে বারে ।
অনুমতি দিতে তায় যাইবারে ঘরে ॥ ২৫২ ॥

কোনমতে শ্রীপ্রভুর মত নাহি হয় ।
দিন দিন তত জেদ করেন হৃদয় ॥ ২৫৩ ॥

বিষন্নবদন হৃদু কহে আর বার ।
কি কারণ অন্য মত কহ সমাচার ॥ ২৫৪ ॥

বুঝাইয়া প্রভুদেব বলিলেন তাঁরে ।
জানিতে পারিবে হেতু কিছুদিন পরে ॥ ২৫৫ ॥

নিষেধ না শুনি হৃদু ছুটির কারণ ।
পুরীর অধ্যক্ষে গিয়া কৈল নিবেদন ॥ ২৫৬ ॥

মনোমত পেয়ে ছুটি গোপনে গোপনে ।
ঘরে ল'য়ে যেতে হাটে নানা দ্রব্য কিনে ॥ ২৫৭ ॥

বাঁধিয়া প্রকাণ্ড বস্তা রাখে একধারে ।
শ্রীপ্রভুর একসঙ্গে শুয়ে যেই ঘরে ॥ ২৫৮ ॥

মধুর প্রভুর লীলা তমোবিনাশন ।
শুন কি হইল পরে আশ্চর্য ঘটন ॥ ২৫৯ ॥



সেই দিন প্রভুদেব সুরধুনীতটে ।
দিন যায় প্রায় সূর্য বসে গিয়া পাটে ॥ ২৬০ ॥

সিন্দুরনির্মিত ভাতি রক্তিম বরন ।
মেঘতলে রেখে চলে অগতলোচন ॥ ২৬১ ॥

কনকবরনকান্তি প্রতিবিম্বে খেলে ।
ভেঙ্গে ভেঙ্গে ভাঁটাধরা গঙ্গার সলিলে ॥ ২৬২ ॥

একমনে তার পানে চেয়ে ভগবান ।
দাঁড়ায়ে আছেন যেন পুতুল-সমান ॥ ২৬৩ ॥

আচম্বিতে কিবা ভাব মনের ভিতরে ।
সন্ধ্যা এবে আইলেন আইর মন্দিরে ॥ ২৬৪ ॥

কোনদিকে কোন লক্ষ্য না করিয়া আর ।
নহবতে যেইখানে বসতি তাঁহার ॥ ২৬৫ ॥

জননীর শ্রীচরণে সর্বাগ্রে প্রণাম ।
পরে বসিলেন পাশে প্রভু গুণধাম ॥ ২৬৬ ॥

সদেশেতে প্রতিবাসী আছে যত জন ।
তাঁদের সম্বন্ধে হয় কথোপকথন ॥ ২৬৭ ॥

কার ঘরে ধন কত কার কটি ছেলে ।
স্বভাব কেমন কার কার কিসে চলে ॥ ২৬৮ ॥

কথায় কথায় রাতি প্রহরেক প্রায় ।
শ্রীপ্রভুর খাবার সময় ব'য়ে যায় ॥ ২৬৯ ॥

নিজের মন্দিরে আসি খাইবার তরে ।
মামা মামা বলি হৃদু ডাকাডাকি করে ॥ ২৭০ ॥

মত্ততর মার সঙ্গে কথোপকথনে ।
যাই যাই এইবার ফুটে শ্রীবদনে ॥ ২৭১ ॥

যাইতে না হয় মন জননীরে ছেড়ে ।
কিছুক্ষণ গৌণে পুনঃ হৃদু ডাকে তাঁরে ॥ ২৭২ ॥

বলিলেন প্রভুদেব উত্তর-বচনে ।
অগ্রভাগ রাখি মোর খাও দুইজনে ॥ ২৭৩ ॥

দায়ে পোয়ে এত কথা ফুরাতে না চায় ।
এখন এগার বাজে দুপ্রহর প্রায় ॥ ২৭৪ ॥

তখন গুয়ায়ে যায় প্রণমিয়া তাঁরে ।
ফিরিলেন প্রভুদেব আপন মন্দিরে ॥ ২৭৫ ॥



এখানে শয্যায় আছে ভাগিনা হৃদয় ।
এপাশ ওপাশ করে ঘুম নাহি হয় ॥ ২৭৬ ॥

গত উচ্চে উঠে রাতি তত উচাটন ।
কে যেন শয্যায় তাঁয় করিছে পীড়ন ॥ ২৭৭ ॥

অস্থির পরাণ কয় প্রভুপরমেশে ।
ও গো মামা আর না যাওয়া হ'ল দেশে ॥ ২৭৮ ॥

দড়ি দিয়া বাঁধিয়াছি গাঁঠরি যেমন ।
কে যেন তেমতি মোরে করিছে বন্ধন ॥ ২৭৯ ॥

প্রভুদেব কহিলেন উত্তরে তাঁহারে ।
কিনিয়াছ কত দ্রব্য ল'য়ে যেতে ঘরে ॥ ২৮০ ॥

না যাইলে হবে নষ্ট একি বিবেচনা ।
তাহার উপরে বাধিয়াছে মকদ্দমা ॥ ২৮১ ॥

হৃদয় পুনশ্চ কয় আমি নাহি যাব ।
গাঁঠরি বেঁধেছি নিজে এখনি খুলিব ॥ ২৮২ ॥

এত বলি কৈল মুক্ত বস্তার বন্ধন ।
তবে না হইল তাঁর সুস্থির জীবন ॥ ২৮৩ ॥

বলে বাঁচিলাম এবে গাঁঠরি খুলিয়া ।
তখনি ঘুমায় হৃদু নাক ডাকাইয়া ॥ ২৮৪ ॥

সুষুপ্তি-সঞ্চার যেন কষ্ট-অবসানে ।
নিদ্রাগত সেই মত হৃদয় ভাগিনে ॥ ২৮৫ ॥

আরে মন যেই মন মন বলি যারে ।
অলক্ষ্যেতে করে বাস জীবের শরীরে ॥ ২৮৬ ॥

ধরিবারে গেলে পরে নাহি যায় ধরা ।
কে জানে কিরূপ তার কেমন চেহারা ॥ ২৮৭ ॥

কুসুমের মধ্যে যেন সৌরভের বাস ।
কর্মগুণে দেখি দেহে তাহার প্রকাশ ॥ ২৮৮ ॥

স্বপ্ন হতে অতি সূক্ষ্ম সুস্বপ্ন গঠন ।
অশরীরী নাহি মিলে চক্ষে দরশন ॥ ২৮৯ ॥

শক্তিময় হেন শক্তি আর কার আছে ।
জগৎ ব্রহ্মাণ্ড যাঁর ইশারায় নাচে ॥ ২৯০ ॥

বেদিয়ার ডুরিবদ্ধ বানরের প্রায় ।
বিচিত্র করম কিবা কব তুলনায় ॥ ২৯১ ॥

এ হেন মনের মধ্যে বল চলে যাঁর ।
তিনি সর্বশক্তিমান্ শ্রীপ্রভু আমার ॥ ২৯২ ॥

তাঁহার ইচ্ছায় মন শক্তি তাঁর লৈয়া ।
জীবেরে করায় কর্ম নাকে দড়ি দিয়া ॥ ২৯৩ ॥

কি কব প্রভুর লীলা কি শকতি আছে ।
ঘরে ভড় বেঁধে বস্তা পরে খুলে বাঁচে ॥ ২৯৪ ॥

যোগনিদ্রা শ্রীপ্রভুর রাতি যতক্ষণ ।
শয্যায় নিদ্রায় জয় ঘোর অচেতন ॥ ২৯৫ ॥



আইর আছিল ধারা সকলের আগে ।
প্রত্যুষের পূর্বে নিতি উঠিতেন জেগে ॥ ২৯৬ ॥

ভাগ্যবতী কালীর মা দাসী একজন ।
দুয়ারে বারাণ্ডায় সে করিত শয়ন ॥ ২৯৭ ॥

জাগায়ে দিতেন আগে উঠিয়া আপনি ।
আজ না উঠেন আর আই ঠাকুরানী ॥ ২৯৮ ॥

দিনকর সমুদিত আলোক দেখিয়া ।
আপনি উঠিল দাসী চমক খাইয়া ॥ ২৯৯ ॥

আইর দরজা বন্ধ দ্বারে দেয় ঠেলা ।
ভিতরে হাঁস্ক্বলে বন্ধ নাহি যায় খোলা ॥ ৩০০ ॥

অচেতন আই আর কেবা দিবে সাড়া ।
শুনিতে পাইল দাসী গলা ঘড়ঘড়া ॥ ৩০১ ॥

ব্যাকুল হইয়া তবে ডাকয়ে সঘনে ।
আসে হৃদু রামলাল বিবরণ শুনে ॥ ৩০২ ॥

আই আই বলি ডাকে কথা নাহি আর ।
কৌশল করিয়া কৈল বিমুক্ত দুয়ার ॥ ৩০৩ ॥

রেখে আই অচেতন শয্যার উপরে ।
ফেনার মতন গাঁজ মুখের দুধার ॥ ৩০৪ ॥

তখনি আনিল রোজা এঁড়েদহে বাড়ি ।
হাত টিপে কহে গেছে দেহ ছেড়ে নাড়ী ॥ ৩০৫ ॥

এইরূপ ক্রমান্বয়ে দুই দিন চলে ।
তৃতীয়ে তীরস্থ কৈল বকুলের তলে ॥ ৩০৬ ॥

সন্ধ্যা প্রায় সমাগতা দিবসের শেষে ।
উঠে দ্বিতীয়ার চাঁদ পশ্চিম আকাশে ॥ ৩০৭ ॥

বারশ বিরাশী সাল এবে গণনায় ।
শুভক্ষণ শুরুপক্ষ ফাল্গুন মাহায় ॥ ৩০৮ ॥

সম্মুখে রাখিয়া পুত্ররত্ন গদাধর ।
ত্যজিলেন রত্নগর্ভা আই কলেবর ॥ ৩০৯ ॥

যে তিথি নক্ষত্রে পক্ষে যেই শুভ মাসে ।
ভূভারহরণ প্রভুদেব পরদেশে ॥ ৩১০ ॥

প্রসবিলা ধরাতলে উদরে দরিয়া ।
ঠিক সেই শুভযোগে ছাড়িলেন কায়া ॥ ৩১১ ॥

কিবা যোগাযোগ কিছু বুঝিতে না পারি ।
হীন ক্ষীণ সুমলিন নরবুদ্ধি ধরি ॥ ৩১২ ॥

ভবের কাণ্ডারী প্রভুদেশ নারায়ণ ।
কি করিলা সর্বশেষে শুন বিবরণ ॥ ৩১৩ ॥

বড়ই সুমিষ্ট কথা অমৃতলহরী ।
ভব-সিন্ধু তরিবার ঘাটে বাঁধা তরী ॥ ৩১৪ ॥

ভ্রাতৃপুত্র রামলালে শ্রীআজ্ঞা প্রভুর ।
সত্বর আনিতে শ্বেত-চন্দন প্রচুর ॥ ৩১৫ ॥

প্রফুল্ল করবী শ্বেত, শ্বেত-কুন্দ ফুল ।
যোগাইল রামলাল পরাণ আকুল ॥ ৩১৬ ॥

গঙ্গাজলে পাখালিয়া আইর চরণ ।
মাখাইয়া দিলা প্রভু যাবৎ চন্দন ॥ ৩১৭ ॥

রোদন করেন ফুল সমর্পিয়া পায় ।
এইরূপ সকরুণে সম্ভাষিয়া মায় ॥ ৩১৮ ॥

"যে দেহ হইতে মম দেহের প্রকাশ ।
আজ দেখি মা গো সেই দেহের বিনাশ" ॥ ৩১৯ ॥

গৃহী যত একত্রিত ছিল সে সময় ।
অগ্নিক্রিয়া করিবারে প্রভুদেবে কয় ॥ ৩২০ ॥

শ্রীপ্রভু বলেন কর্ম এ নহে আমার ।
অধিকারী ভ্রাতৃপুত্র তাহে দিনু ভার ॥ ৩২১ ॥

লইয়া চলিল দেহ কান্দুড়িয়াগণে ।
সঙ্গে রামলাল এ'ড়েদহের শ্মশানে ॥ ৩২২ ॥

এখানে শ্রী প্রভুদেব রাখিলা জ্বালিয়া ।
তুষের আগুন তার খুঁটে লোহা দিয়া ॥ ৩২৩ ॥

নিমপাতাসহ ঘট পাত্রে ভিজা ডাল ।
তার সঙ্গে কাঁচা গুড় তিন মুঠা চাল ॥ ৩২৪ ॥

কান্দুড়িয়াদের যাহা মঙ্গল আচার ।
তিল মাত্র নাহি ত্রুটি সকল যোগাড় ॥ ৩২৫ ॥

পরে প্রেততর্পণের বিধি পরদিনে ।
প্রভুর কর্তব্য ইহা কহে সর্বজনে ॥ ৩২৬ ॥

শ্রীপ্রভু বলেন আমি কহিয়াছি আগে ।
এ কর্মে এ দেহ কোন কাজে নাহি লাগে ॥ ৩২৭ ॥

তথাপিহ জেদ তাঁরে করে লোকজন ।
শুনহ কেমন প্রভু করিলা তর্পণ ॥ ৩২৮ ॥

অমানীর মানদাতা প্রভু ভগবান ।
চলিলেন সবাকার রক্ষা করি মান ॥ ৩২৯ ॥

পাছু অগণন লোক দেখিবারে চলে ।
নামিলেন ধীরে ধীরে গঙ্গার সলিলে ॥ ৩৩০ ॥

জল লইবার কালে অঞ্জলি করিয়া ।
দেখয়ে দর্শকবর্গ অবাক হইয়া ॥ ৩৩১ ॥

ততক্ষণ বদ্ধাঞ্জলি যতক্ষণ জলে ।
ছড়ায়ে আঙ্গুল যায় উপরে আনিলে ॥ ৩৩২ ॥

আঙ্গুল কাঠির মত ক্রমশঃ বিস্তার ।
এক বিন্দু জল নাহি থাকে মধ্যে তার ॥ ৩৩৩ ॥

শুনিলে প্রভুর কথা লোকে লাগে ধাঁধা ।
কায়মনোবাক্য যাঁর একতানে বাঁধা ॥ ৩৩৪ ॥

মানুষের মনে মন দুই মন উঠে ।
এক মন তুলে কথা অন্য মন কাটে ॥ ৩৩৫ ॥

এক মনে দুই মন হয় কি প্রকার ।
উপমার বীণাযন্ত্রে তারের ঝঙ্কার ॥ ৩৩৬ ॥

শক্তির সঞ্চার তারে থাকে যতক্ষণ ।
এক তার বোধে বহু তারের মতন ॥ ৩৩৭ ॥

মনের এহেন রূপ যে সময় হয় ।
সন্দেহ তাহার নাম কোন স্থলে কয় ॥ ৩৩৮ ॥

হিতাহিত-শক্তি বলে অবস্থাবিশেষে ।
কখন কখন তায় বুঝি নামে ভাবে ॥ ৩৩৯ ॥

এক মন নানারূপে ধরে নানা নাম ।
স্কুলে বলে সমষ্টিরে অনিশ্চিত জ্ঞান ॥ ৩৪০ ॥

পিশাচস্বভাব মন নানা মায়া ধ'রে ।
নাচায় বৃহৎ কারা বিবিধ প্রকারে ॥ ৩৪১ ॥

শ্রীপ্রভুর মনে নাই এ মনের রীতি ।
কায়মনোবাক্য তিন একসঙ্গে স্থিতি ॥ ৩৪২ ॥

স্বভাবতঃ স্থিরবুদ্ধি সুনিশ্চিত জ্ঞান ।
কায়া করে তাই যাহা বাক্যের বিধান ॥ ৩৪৩ ॥

সরলে সরল যায় সহজেই বুঝা ।
অসরল তর্ক যার তার পক্ষে বোঝা ॥ ৩৪৪ ॥

ছাড়ি কূট তর্কবৃদ্ধি সুসরলে মন ।
শুন রামকৃষ্ণকথা মঙ্গল-কথন ॥ ৩৪৫ ॥

প্রভু রামকৃষ্ণ-লীলা কে দেখাবে এঁকে ।
হাতে দিলে টাকা যেন হাত যায় বেঁকে ॥ ৩৪৬ ॥

সেই ধারা শ্রীপ্রভুর তর্পণের কালে ।
অবশেষে সমাধিস্থ গঙ্গার সলিলে ॥ ৩৪৭ ॥

হৃদয় আনিল কূলে ধরিয়া তাঁহায় ।
প্রহরেক গেলে পরে ভাব ভেঙ্গে যায় ॥ ৩৪৮ ॥

শ্রীপ্রভুর পথে রাখি ষোল আনা মতি ।
ধীরে ধীরে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৩৪৯ ॥

প্রেম ভক্তি জ্ঞান মুক্তি ইহার ভিতর ।
রামকৃষ্ণ লীলাগীতি রতন-আকর ॥ ৩৫০ ॥