তৃতীয় খণ্ড
কেশবের শক্তিরূপ-দর্শন
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
রত্নাকর লীলাগীতি জলধির প্রায় ।
মথিলে চৈতন্য মিলে সন্দ নাহি তায় ॥ ১ ॥
যার জোরে মায়াঘোর হয় বিমোচন ।
হেলার টুটিয়া যায় অবিদ্যা-বন্ধন ॥ ২ ॥
শ্রীপ্রভুর শিখাবার কেমন কৌশল ।
শুনিলে উপজে ভক্তি শ্রীপথে কেবল ॥ ৩ ॥
বিশ্বগুরু প্রভু নিজে সবার উপরে ।
এ গিয়ান সবিশ্বাসে ঘটে বসে জোরে ॥ ৪ ॥
কই কথা শুন মন হইয়া নীরব ।
প্রভুর লীলায় নাই কোন অসম্ভব ॥ ৫ ॥
রূপহীন গুণময় ব্রহ্ম নিরাকার ।
এই জ্ঞান কেশবের ছিল আগেকার ॥ ৬ ॥
এখন নূতন তিনি প্রভুর কৃপায় ।
মহাবলে বলীয়ান উন্মত্তের প্রায় ॥ ৭ ॥
নয়ন-দুয়ার দুটি যুক্ত সমুজ্জ্বল ।
দেখেন মায়ের রূপ হইয়া বিহ্বল ॥ ৮ ॥
বদনে আনন্দময়ী বাক্য অনিবার ।
মহানন্দ অন্তরেতে আনন্দবাজার ॥ ৯ ॥
যখাদৃষ্ট মা'র রূপ কন শিষ্যগণে ।
সমাজমন্দির যথা প্রার্থনার স্থানে ॥ ১০ ॥
যে না দেখিয়াছে মার রূপের গঠন ।
আজি তক নহে তাঁর ব্রহ্ম-দরশন ॥ ১১ ॥
দেখ কি রূপের ছবি মায়ের চেহারা ।
দেখিয়া করিল মোরে পাগলের পারা ॥ ১২ ॥
বিশ্ব কিবা আলোময় রূপের কিরণে ।
যেমন রূপেতে রূপ সেই মত নামে ॥ ১৩ ॥
ভবনে ভবনে হবে মায়ের গমন ।
কান্তিরূপে যাবে ব্যাপি গোটা ত্রিভুবন ॥ ১৪ ॥
ইংরেজী পুস্তক পাঠ অনর্থের মূলে ।
বিশুদ্ধ হৃদয়-ভাব পতিত অকূলে ॥ ১৫ ॥
বরাভয়দাত্রী মাতা দিবেন কিনারা ।
সময়ে আনন্দরূপ ধরিবেন ধরা ॥ ১৬ ॥
না হয় না হোক আজি দশদিন পরে ।
রটিবে মায়ের নাম জগৎ-ভিতরে ॥ ১৭ ॥
দ্বেষপূর্ণ সম্প্রদায়ী ভাব অগণন ।
আনন্দময়ীর নামে হইবে নিধন ॥ ১৮ ॥
আর নাহি পুজ কারে পুজ সনাতনী ।
ভক্তি-প্রেম-জ্ঞান-দাত্রী জগতজননী ॥ ১৯ ॥
শুষ্ক পত্র কেবল কুড়ান ছিল মোর ।
মায়ের প্রসাবে আজি আনন্দে বিভোর ॥ ২০ ॥
শক্তি বলে শক্তি পেয়ে পাইনু সুপথ ।
মেতেছি যেমন মাতা মাতাও জগৎ ॥ ২১ ॥
হাবুডুবু খাই ভক্তি-রসের বন্যায় ।
এত দিন হেন দিন আছিল কোথায় ॥ ২২ ॥
সাধ যদি মৃত্যুকালে দেখিবারে পাই ।
ভেসে যায় বিশ্ব যেন নিজে ভেসে যাই ॥ ২৩ ॥
এস মা এস মা গুপ্ত না থাকিও আর ।
রূপেতে করহ যুক্ত লোচন-আঁধার ॥ ২৪ ॥
একবার আসিয়া দাঁড়াও মাঝখানে ।
মাব'লে ছাওয়ালে যত নাচি চারি পানে১
॥ ২৫ ॥
ভক্তিভরে মার নামে মত্ত অনুরাগে ।
ব্রাহ্মমধ্যে কভু নাহি ছিল এর আগে ॥ ২৬ ॥
ব্রাহ্মধর্ম শুদ্ধ ধর্ম কঠোর প্রকৃতি ।
বিবেক বৈরাগ্য মানে জ্ঞানপূর্ণ নীতি ॥ ২৭ ॥
ইন্দ্রিয়নিগ্রহ মানে জিতেন্দ্রিয়াচার ।
মানে শুরু-কায়া-পুণ্য জাতি একাকার ॥ ২৮ ॥
কেবল বিশুদ্ধ তর্কে ধর্মের গঠন ।
যে পারে করিতে তর্ক সেই এক জন ॥ ২৯ ॥
অনুরাগে যেন রীতি সাধন ভজনে ।
নির্ধারিত তিন স্থান কোণে মনে বনে ॥ ৩০ ॥
এ নহে সেরূপ ধারা সাহেবানি রঙ্গ ।
চান বা না চান বস্তু কথার তরঙ্গ ॥ ৩১ ॥
বস্তুগত প্রাণ নয় প্রাণেতে বৈভব ।
একা এবে বস্তুপ্রার্থী কেবল কেশব ॥ ৩২ ॥
তাঁর সঙ্গে আছে আর দুই দশ জন ।
এখন কলিকাবস্থা সৌরভ গোপন ॥ ৩৩ ॥
প্রফুল্লিত শ্রীকেশব সুগন্ধ প্রচুর ।
ভক্তিপুরে এইবারে কৃপার প্রভুর ॥ ৩৪ ॥
শুষ্ক শাখা ধরা ছিল দুই হাতে তাঁর ।
প্রভুর কুপায় হৈল রসের সঞ্চার ॥ ৩৫ ॥
কিবা রস কিবা মুল কিবা কান্তি তাঁর ।
উচ্চতম ভক্তিতত্ত্ব মন্দিরেতে গায় ॥ ৩৬ ॥
আঁখিতে তাঁহার দেখা কল্পনার নয় ।
বুদ্ধিদোষে আধ্যাত্মিকে শিষ্যগণে লয় ॥ ৩৭ ॥
অরূপ-অগুণ-ভাবে রূপ গুণ ফের ।
বড়ই গোলের কথা ব্রহ্মজ্ঞানীদের ॥ ৩৮ ॥
বাহ্যু দৃষ্টি হৃদয়-নিলয় নহে খোলা ।
নমস্য তথাপি কেন কেশবের চেলা ॥ ৩৯ ॥
কেশব দেশেতে এবে অগ্রগণ্য জন ।
সুন্দর স্বভাব-সহ বিদ্যা-আভরণ ॥ ৪০ ॥
জমাট পশার ভারি কোম্পানির ঘরে ।
বড়লোকে নতশির তাঁহার গোচরে ॥ ৪১ ॥
দেখ মন শ্রীপ্রভুর প্রচারের ধারা ।
নুয়াইয়া কি প্রকার সর্ব-উচ্চ চূড়া ॥ ৪২ ॥
নহে সাধারণ কথা কেশবের প্রায় ।
সমস্বরে ভারতে সুখ্যাতি যাঁর গায় ॥ ৪৩ ॥
সে লুটায় শ্রীপ্রভুর ধরিয়া চরণ ।
নিরক্ষর দীনসাজ দরিদ্র ব্রাহ্মণ ॥ ৪৪ ॥
শ্রীকেশব তত্ত্বান্বেষী সৎপথে মতি ।
অন্বেষণ করে সহ সরল প্রকৃতি ॥ ৪৫ ॥
যেই বস্তু সর্বশ্রেষ্ঠ আছিল গিয়ান ।
ভিখারীর সম যার জন্য ভ্রাম্যমাণ ॥ ৪৭ ॥
তার চেয়ে কত শত উচ্চ বস্তু হেরে ।
ছড়াছড়ি যায় পায় প্রভুর দুয়ারে ॥ ৪৮ ॥
আকাশকুসুম যেন শুধুমাত্র নামে ।
শক্তি ছাড়া ব্রহ্ম নাই ব্রহ্মের বিধানে ॥ ৪৯ ॥
নূতন শখের ব্রহ্ম মনুষের গড়া ।
যা নাই ডাকিলে তার কেবা দিবে সাড়া ॥ ৫০ ॥
চলে গেল এত কাল বৃথায় কাটিয়া ।
ফেলিরা নজর শুরু দাঁড় টানা দিয়া ॥ ৫১ ॥
শিক্ষাপথে গুরুত্বপা নহে যতক্ষণ ।
কার সাধ্য সত্যবস্তু করে উপার্জন ॥ ৫২ ॥
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর কৃপা করুণায় ।
এখন কেশবচন্দ্র ঠিক পথে যায় ॥ ৫৩ ॥
দেখিবারে পায় যার না জানিত কথা ।
উপাস্য ব্রহ্মের ছবি শক্তির বারতা ॥ ৫৪ ॥
প্রত্যেক দেবতা মাতা মনোহরা ঠাম ।
তিনে এক ভক্তিগ্রন্থ ভক্ত ভগবান ॥ ৫৫ ॥
নির্মল ভক্তির রস চু'লে ছুটে গাদ ।
তিক্ত কটূ তুলনায় সুধার আস্বাদ ॥ ৫৬ ॥
কেশব নানান বস্তু দেখিয়া এখন ।
ধরণী লুটায় ধরি প্রভুর চরণ ॥ ৫৭ ॥
চরণে পতিত দেখি সর্ব-উচ্চ চূড়া ।
স্থানে স্থানে রাষ্ট্র কথা প'ড়ে গেল সাড়া ॥ ৫৮ ॥
কাতারে কাতারে আসে দেখিবার তরে ।
মুক্তিদাতা কৃপাসিন্ধু দক্ষিণশহরে ॥ ৫৯ ॥
প্রভুর দীনতা ভক্তিভাব দরশনে ।
বড়ই লেগেছে মিষ্টি কেশবের প্রাণে ॥ ৬০ ॥
সেই ভাব শিষ্যগণে শিখাবার তরে ।
পাঠান ভিখারী-বেশে দুয়ারে দুয়ারে ॥ ৬১ ॥
কভু শিষ্যে সমাবৃত হইয়া আপনে ।
খোল করতাল যেন বাজে সঙ্কীর্তনে ॥ ৬২ ॥
সেই ভক্তি ধারা ধরি পথে পথে গান ।
ভক্তিপ্রেমদায়িনী আনন্দময়ী নাম ॥ ৬৩ ॥
দেখ দৃশ্য বড়লোক কেশবের পারা ।
সুদৃশ্য যতেক শিষ্য সুন্দর চেহারা ॥ ৬৪ ॥
মাতোয়ারা ভক্তি ভরে শক্তিগুণ গায় ।
যেই আসে কাছে নামে তাহারে মাতায় ॥ ৬৫ ॥
ব্রাহ্মধর্মে হিংসা-দ্বেষ করে যেই জনা ।
আজন্ম হৃদয়ে রাখে অকপট ঘৃণা ॥ ৬৬ ॥
সেও শুনে এসে মিশে কেশবের কাছে ।
কুতূহলী করতালি মা বলিয়া নাচে ॥ ৬৭ ॥
কেশব পাইয়া ভক্তি-রসের সন্ধান ।
মরুতে তুলিল ভাল তাহার তুফান ॥ ৬৮ ॥
যেই বন্ধ ছিল শুষ্ক রসবিরহিত ।
প্রভুর কৃপায় তারে হেরে মঞ্জরিত ॥ ৬৯ ॥
উল্লসিত শ্রীকেশব হ'য়ে মত্ততর ।
ভক্তিভরে
যাইতেন দক্ষিণশহর ॥ ৭০ ॥
রসের আকর প্রভুদেব দরশনে ।
ভক্তি মিলে কেশবের অনুরাগ শুনে ॥ ৭১ ॥
চরণে তাঁহার মোর অসংখ্য প্রণাম ।
মাগি যেন জাগে হৃদে রামকৃষ্ণনাম ॥ ৭২ ॥
কি ছিল কেশব এবে হইল কেমন ।
গুরু বিনা জীবের দুর্গতি দেখ মন ॥ ৭৩ ॥
সদ্গুরু শ্রীহরি বিনা অন্য কেহ নয় ।
শ্রীগুরু চৈতন্যদাতা সর্ব শাস্ত্রে কয় ॥ ৭৪ ॥
চেতন-মুকতি ভক্তি করতলে যাঁর ।
তিনিই আপুনি ভবসিন্ধু-কর্ণধার ॥ ৭৫ ॥
হরি গুরু বিনা ঠিক পথে ল'য়ে যেতে ।
কেবা এত শক্তিমান আছেন জগতে ॥ ৭৬ ॥
মানুষ গুরুর কথা রাখ বহু দূরে ।
জানি না দেবতা গুরু কি করিতে পারে ॥ ৭৫ ॥
দুর্গম হৃদয়পুরে চৈতন্য-আগার ।
বিশ্বজয়ী সপ্তরথী রক্ষা করে দ্বার ॥ ৭৬ ॥
সর্দার জনেক তার চেলা ছয়জন ।
চেলার কতই চেলা না যায় গণন ॥ ৭৭ ॥
এক এক জন তার এত শক্তিধর ।
শমনের সম লাগে পবনের ডর ॥ ৭৮ ॥
উড়ায় ধূলার প্রায় শতশৃঙ্গধারী ।
পাতাল-পরশি-ভিত্তি হিমালয়-গিরি ॥ ৭৯ ॥
সামান্য ধানের ক্ষেত বানায় সাগরে ।
শুষিয়া যতেক জল নাসিকার দ্বারে ॥ ৮০ ॥
নখে চিরে খণ্ড করে অখণ্ড ধরণী ।
ধরায় যে ধরে তার দেখে কাঁপে প্রাণী ॥ ৮১ ॥
চন্দ্র-সূর্য-তারাসহ জ্যোতিষ্কমণ্ডল ।
পলকে নিবায়ে করে আঁধার প্রবল ॥ ৮২ ॥
বিভীষিকা কত শত নাহি যায় বলা ।
ভীষণা রাক্ষসীদ্বয় পথে করে খেলা ॥ ৮৩ ॥
মনমুগ্ধ কান্তি ছটা এত অঙ্গে ঝরে ।
হোক্ না বিরাগী যাত্রী তবু কাবু করে ॥ ৮৪ ॥
এ হেন দুর্গম পথ এড়াইলে পর ।
লক্ষ্যে আসে দেশ এক পরম সুন্দর ॥ ৮৫ ॥
অনন্ত বসন্ত-ঋতু তথা বর্তমান ।
তার পারে নিকেতন রতনে নির্মাণ ॥ ৮৬ ॥
একমাত্র দ্বার তার একমাত্র বাট ।
ফণীর আকার পেঁচে আবদ্ধ কপাট ॥ ৮৭ ॥
বিধির বিধানে নাই কোনই বিধান ।
যে বিধান বলে মিলে পেঁচের সন্ধান ॥ ৮৮ ॥
যাঁহার শকতি মধ্যে সেই তালা খোলে ।
তিনি শ্রীচৈতন্যদাতা গুরু তাঁরে বলে ॥ ৮৯ ॥
সেই গুরু নররূপে ঠাকুর আমার ।
পরম দয়াল ভবসিন্ধু কর্ণধার ॥ ৯০ ॥
ব্রাহ্মধর্ম বক্তা-শ্রেষ্ঠ কেশব এখন ।
যেখানে ধর্মের সভা তথা নিমন্ত্রণ ॥ ৯১ ॥
মন প্রাণ তুলে উচ্চরবে মেতে গায় ।
ভক্তিতত্ত্ব প্রাপ্ত যাহা প্রভুর কৃপায় ॥ ৯২ ॥
শক্তিমাখা সিদ্ধবাক্য প্রভুর নিকটে ।
শুনিয়া যেমন জোরে বসিয়াছে ঘটে ॥ ৯৩ ॥
সেইমত সভাস্থলে মহাবলে গায় ।
সভ্য মহাশোভাময় ভাবের ছটায় ॥ ৯৪ ॥
সাজান প্রভুর ভাব বাক্য অলঙ্কারে ।
যে শুনে তাহার মন হরে একবারে ॥ ৯৫ ॥
যাঁর ভাবে জন্মে ভাব তাঁহার মুরতি ।
আবির্ভাব হয় হৃদে ভাবের প্রকৃতি ॥ ৯৬ ॥
সেই হেতু ভক্তিগ্রন্থে ভক্তে করে জ্ঞান ।
যার ভক্তি গ্রন্থে লেখা সে তাঁর সমান ॥ ৯৭ ॥
ভক্তিমান শ্রীকেশব বক্তৃতার কালে ।
দেখেন প্রভুর মূর্তি মনে নেচে খেলে ॥ ৯৮ ॥
সবার গোচরে কহে আনন্দ অন্তর ।
বস্তু সাধ যার যাও দক্ষিণশহর ॥ ৯৯ ॥
পরম সুন্দর সাধু আছে সেইখানে ।
উচ্চজ্ঞান-ভক্তি মিলে তাঁর দরশনে ॥ ১০০ ॥
পুণ্য-দরশন হেন না মিলে কোথায় ।
মহাভার খেলে অঙ্গে গৌরাঙ্গের প্রায় ॥ ১০১ ॥
দরশনে কিবা ফল বলিবারে নারি ।
দুস্তর
ভবান্ধি-জলে তরিবার তরী ॥ ১০২ ॥
হুতাশের আশারূপ দুর্বলের বল ।
দীন-হীন-দুঃখী জনে উপায় সম্বল ॥ ১০৩ ॥
আধারে পথিক পক্ষে কর চন্দ্রমার ।
যষ্টিসম দৃষ্টিহীনে বাট খুঁজিবার ॥ ১০৪ ॥
নানান ভাবের ভাবী বুঝান না যায় ।
কভু জ্ঞানী ঋষি কভু ভক্তিভাব গায় ॥ ১০৫ ॥
বিবিধ সাকার ভাব ভাব নিরাকার ।
একাধারে সন্নিবেশ আশ্চর্য ব্যাপার ॥ ১০৬ ॥
মণি অলঙ্কার বাল্য-ভাব-সর্বোপরি ।
ভাবের আধার হেন কখন না হেরি ॥ ১০৭ ॥
রটে নানা গুণকথা কব আমি কটি ।
প্রচারে কেশব দিল দামামায় কাটি ॥ ১০৮ ॥
পরিপাটি কহে যেন লিখে তেন চোটে ।
সমাচার-পত্রিকায় দেশে দেশে ছুটে ॥ ১০৯ ॥
হেন ভাবে লেখা বার্তা বোধ হয় দেখে ।
প্রভু-দরশনে যেন জগজনে ডাকে ॥ ১১০ ॥
কেশব মহান কলিকাতা হেন ঠাঁই ।
আছে যত বড়লোক সকলের চাঁই ॥ ১১১ ॥
নহে বড় অর্থবলে বিদ্যাবল এত ।
হোক না ধনেশ তবু তাঁর কাছে নত ॥ ১১২ ॥
সারগ্রাহী গুণগ্রাহী বিদ্বান যেমন ।
পরমার্থ-অনুরক্ত বীর একজন ॥ ১১৩ ॥
এত গুণে রূপে অঙ্গ বিভূষিত তাঁর ।
কথায় কাটিতে কথা সাধ্য নহে কার ॥ ১১৪ ॥
প্রতিদ্বন্দ্বী কেবা ঠেলে কলমে কলম ।
এতদূর কেশবের আসর গরম ॥ ১১৫ ॥
বিশ্বাস কথায় লোক এত করে তাঁর ।
না বুঝিলে তবু বুঝে বাক্যে আছে সার ॥ ১১৬ ॥
কেশবের হাতে মুখে পাইয়া খবর ।
দলে দলে আসে লোক দক্ষিণশহর ॥ ১১৭ ॥
ব্রাহ্মধর্ম সমুজ্জ্বল করিয়া কেশব ।
সাধিল অসাধ্য কর্ম নরে অসম্ভব ॥ ১১৮ ॥
দেশের অবস্থা এবে ধর্মের বাজারে ।
যা চলে ভাবিলে নাহি রক্ত চলে শিরে ॥ ১১৯ ॥
এক ছত্রে ইংরেজের দেশে অধিকার ।
কৌশলে কৌশলে করে কার্য আপনার ॥ ১২০ ॥
রাজনীতি সুকৌশল এ জাতির ন্যায় ।
কোনকালে ধরাতলে দেখা নাই যায় ॥ ১২১ ॥
অতি তিক্ত
কালমেঘ শর্করাবরণে ।
ভিষক যেমন দেয় শিশুর বদনে ॥ ১২২ ॥
সেইমত রাজধর্ম দশ্যে পাকা
ফল ।
হিন্দুধাতে করে যেন শোণিতে গরল ॥ ১২৩ ॥
কামিনীকাঞ্চনমিশ্র প্রলোভন চারে ।
চঞ্চল দেবের মন জীবে রাখ' দূরে ॥ ১২৪ ॥
তাই দিয়া প্রচার করেন খ্রীষ্টিয়ানি ।
মজাইয়া কত হিন্দু সংখ্যা নাহি জানি ॥ ১২৫ ॥
গলদেশে ডুরিলগ্ন মর্কটের প্রায় ।
দুটা
কলা কিংবা দুটা শশার আশায় ॥ ১২৬ ॥
বেদিয়ার পাছু ছুটে আনন্দ অন্তর ।
পিতা পিতামহ
যার বাঁধিল সাগর ॥ ১২৭ ॥
সেইমত মান খ্যাতি কাঞ্চনেতে ভুলি ।
হৃদিরত্ব জাতিধর্মে
দিয়া জলাঞ্জলি ॥ ১২৮ ॥
ক্ষিপ্তপ্রায় গোটা জাতি ইংরেজের পাছে ।
যেমন নাচিতে বলে
সেইরূপ নাচে ॥ ১২৯ ॥
হাবভাব সাহেবের করিতে নকল ।
অভ্যাসে হয়েছে পটু বাঙ্গালী সকল ॥ ১৩০ ॥
যা বলে ইংরেজ-তাই মনের মতন ।
তুলনায় অতি ছার বেদের বচন ॥ ১৩১ ॥
ধর্মের প্রসঙ্গ যদি ইংরেজী ভাষায় ।
সভামধ্যে বক্তৃতায় নাহি বলা যায় ॥ ১৩২ ॥
তবে সে প্রসঙ্গে কার না থাকে আদর ।
দেশেতে বসেছে হেন বিদেশী রগড় ॥ ১৩৩ ॥
আদি হিন্দু রীতি নীতি নিতে নাহি চায় ।
পরিত্যক্ত এ বাজারে গরলের প্রায় ॥ ১৩৪ ॥
জাতি-ভ্রষ্ট ধর্মভ্রষ্ট হিন্দুর সন্তানে ।
ভুলাইয়া ধীরে ধীরে আনিত ভবনে ॥ ১৩৫ ॥
প্রিয়কর রুচিকর যাহা প্রয়োজন ।
একা ব্রাহ্মধর্ম দেয় সব সরঞ্জাম ॥ ১৩৬ ॥
অভিনব ব্রাহ্মধর্ম সুদৃশ্য চেহারা ।
ভিতরে কালিমাবর্ণ উপরেতে গোরা ॥ ১৩৭ ॥
নানাদিক আলোময় জ্যোতি ঝরে তেজে ।
সগুণ ব্রহ্মের ভাব যাবনিক সাজে ॥ ১৩৮ ॥
বেদান্ত হিন্দুর বস্তু ছায়া আছে তার ।
খাদ্যাখাদ্য জাতি ভেদে নাহিক বিচার ॥ ১৩৯ ॥
অনেক লাগিল ভাল নব্য সভ্যদলে ।
আহার ঔষধ দুই এক পানে ফলে ॥ ১৪০ ॥
ভুরি ভুরি সমাজমন্দিরে এসে জুটে ।
বক্তৃতায় যেইখানে ব্রহ্মডিম্ব ফাটে ॥ ১৪১ ॥
কাল-পাত্র ভেদে হয় ধর্মের গড়ন ।
এ সময় ব্রাহ্মধর্ম অতি প্রয়োজন ॥ ১৪২ ॥
কালত্রয় ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান ।
প্রত্যক্ষ যাঁহার তিনি সর্বশক্তিমান ॥ ১৪৩ ॥
কল্যাণনিধান হরি পতিতপাবন ।
সময়ে উচিত যাহা করেন সৃজন ॥ ১৪৪ ॥
অন্য দিকে বৈজ্ঞানিক আর একদল ।
ঝড়ের প্রভাব বুঝে সৃষ্ট্যুৎপত্তি বল ॥ ১৪৫ ॥
স্বতঃসিদ্ধ শক্তিযুক্ত মূলভূতগণ ।
এই জ্ঞানে নাহি মানে বিভুর সৃজন ॥ ১৪৬ ॥
ভীষণ রাক্ষস প্রায় নাস্তিক আখ্যায় ।
নাম শুনি শরীরের শোণিত শুকায় ॥ ১৪৭ ॥
মানে না বিশ্বের রাজা পরম ঈশ্বর ।
মাথা নুয়াইয়া নাহি দিতে চায় কর ॥ ১৪৮ ॥
বাগ্মিবর ধীরবর পণ্ডিতপ্রধান ।
নানাবলে শক্তিমান কেশব ধীমান ॥ ১৪৯ ॥
দেখায়
বিদ্যার ছটা তাঁদের উপরে ।
সুযুক্তি সিদ্ধান্ত শাস্ত্রতর্ক সহকারে ॥ ১৫০ ॥
রোধিল প্রলয়ঙ্করী নাস্তিকের ধারা ।
ল'য়ে যে লইতে চায় গোটা বসুন্ধরা ॥ ১৫১ ॥
ব্রাহ্মধর্ম এ সময় হইয়া প্রবল ।
দেশের পক্ষেতে কৈল অপার মঙ্গল ॥ ১৫২ ॥
জয় জয় ব্রাহ্মধর্ম উচ্চমর্মে গতি ।
জয় জয় শ্রীকেশব সুযোগ্য সারথি ॥ ১৫৩ ॥
জয় জয় ব্রহ্মজ্ঞানী সহনেতা তাঁর ।
অধম পামর করে সবে নমস্কার ॥ ১৫৪ ॥
সশিষ্যে সপরিবারে কেশব এক্ষণে ।
দক্ষিণশহরে যান প্রভু-দরশনে ॥ ১৫৫ ॥
দেখা-শুনা ঘন ঘন ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ।
প্রভু না খাওয়ায়ে কিছু নাহি দেন ছেড়ে ॥ ১৫৬ ॥
সুধারস শান্তিরস শান্তিহেতু ঘটে ।
পুষ্টিহেতু মিষ্টিভরা রসগোল্লা পেটে ॥ ১৫৭ ॥
পেয়েছে না পাবে দিন এ হেন রকম ।
কেশব প্রভুরে করে ঘরে নিমন্ত্রণ ॥ ১৫৮ ॥
বলিহারি কলিকাল কালের প্রধান ।
সত্যও না পায় এর মহিমা-সন্ধান ॥ ১৫৯ ॥
কৃপার নিধান প্রভু কৃপার সাগর ।
বারে বারে অবতীর্ণ ধরি কলেবর ॥ ১৬০ ॥
সাধনে লোকের নাহি হয় প্রয়োজন ।
আবাসে বসিয়া হয় হরি দরশন ॥ ১৬১ ॥
কেশব মজিল বড় শ্রীপ্রভুর পায় ।
ইচ্ছা যেন গেতে শুতে ছাড়িতে না চায় ॥ ১৬২ ॥
ব্রাহ্মধর্মে যোগ দিয়া প্রভু ভগবান ।
তুলিলেন তাহে এক সুমধুর তান ॥ ১৬৩ ॥
করিবারে ইহারে অধিক মিষ্টতর ।
শুন রামকৃষ্ণলীলা বড়ই সুন্দর ॥ ১৬৪ ॥
১
এইভাব গুরুবর কেশবচন্দ্রের কৃত
'জীবনবেদ' হইতে পাইয়াছি (৩৯-৪৬ পৃষ্ঠা) ।