তৃতীয় খণ্ড
মনোমোহন ও রামের মিলন
জয়
প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
দিনকর-কর যেন বরন-আকর ।
অগণ্য বরন আছে তাহার ভিতর ॥ ১ ॥
আঁখি মিলে গেলে পরে দেখিবার তরে ।
প্রখর করের তেজে দৃষ্টিশক্তি হরে ॥ ২ ॥
তবে বর্ণাকর সূর্য জানা যায় কিসে ।
চারুতনু রামধনু যখন বিকাশে ॥ ৩ ॥
তেমতি বিভুর কারা মহাজ্যোতিষ্মান ।
আঁখিতে না পারে নরে করিতে সন্ধান ॥ ৪ ॥
বর্তমান অপরূপ গুণ কিবা তাঁয় ।
যতদিন নরদেহে না আসে ধরায় ॥ ৫ ॥
পঞ্চভূতে গড়া দেহ পঞ্চভূত নয় ।
প্রতিবিম্বে খেলে যাহে গুণসমূদয় ॥ ৬ ॥
রূপে গুণে ষড়ৈশ্বর্যবান ভগবান ।
একা ভাগবত লীলা দেখিবার স্থান ॥ ৭ ॥
অপরূপ রূপ-গুণ ভুবনমোহন ।
দেখিবার সাধ যদি থাকে তোর মন ॥ ৮ ॥
একমনে-শ্রবণ করহ দিবারাতি ।
সৎদৃষ্টি জন্মে যায় রামকৃষ্ণপুঁথি ॥ ৯ ॥
ষড়ৈশ্বর্যবান প্রভু রাজরাজেশ্বর ।
কখন একাকী নহে সঙ্গে সহচর ॥ ১০ ॥
নানা বেশে পারিষদ সাঙ্গোপাঙ্গগণ ।
সম সময়েতে লয় ধরায় জনম ॥ ১১ ॥
আপনি যেমন গুপ্ত সেইমত তাঁরা ।
শোক-দুঃখে পরিপূর্ণ নরের চেহারা ॥ ১২ ॥
পরিব্যাপ্ত নানা স্থানে নানান রকমে ।
সময় হইলে পরে এক ঠাঁই জমে ॥ ১৩ ॥
শ্রীমনোমোহন মিত্র কোন্নগরে ঘর ।
কার্যহেতু বাসাবাটী শহর ভিতর ॥ ১৪ ॥
ভক্তবর শ্রীপ্রভুর আত্মগণ তিনি ।
রত্নগর্ভা ভক্তিমতী তেমতি জননী ॥ ১৫ ॥
ভগিনীগণের মধ্যে সেজ যিনি তাঁর ।
ভক্তির গুণের কথা নহে বলিবার ॥ ১৬ ॥
সময়ে বলিব পরে পাবে পরিচয় ।
ধৈরযের কথা এ তো উতলার নয় ॥ ১৭ ॥
একদিন নিদ্রাযোগে শ্রীমনোমোহন ।
পরিবারসহশয্যা দেখেন স্বপন ॥ ১৮ ॥
অকূল পাথার জল
ভীষণ তুফান ।
কুটি ছিলে দুটি হয় এত তার টান ॥ ১৯ ॥
বানবেগে জলস্রোত অতি খরতর ।
ভাসে তাহে গাছ লতা অট্টালিকা ঘর ॥ ২০ ॥
ক্ষুদ্রতম বৃহত্তম জীব নানাজাতি ।
নিজে ভাসে তার মধ্যে আশ্রয়সংহতি ॥ ২১ ॥
কিছুদূরে গিয়া পরে দেখিবারে পান ।
জলের উপরে আগে অপূর্ব সোপান ॥ ২২ ॥
দুফালিয়া যায় জল তার অধোভাগে ।
এত টান ব্রহ্মবান কোন্ খানে লাগে ॥ ২৩ ॥
ভয়ঙ্কর স্থান হৈল পলকেতে পার ।
সে টান সোপান পারে কিছু নাই আর ॥ ২৪ ॥
সুস্থির গম্ভীর জল ঢল ঢল করে ।
হেনকালে পুত্র-কন্যা-দারা মনে পড়ে ॥ ২৫ ॥
কোথা পুত্র কোথা কন্যা উচ্চনাথে ডাকে ।
তখন কোথায় কেবা সাড়া দিবে কাকে ॥ ২৬ ॥
আকুল পরান শুনে কেহ কহে তাঁয় ।
অমিয়বরষী বাণী তুচ্ছ তুলনায় ॥ ২৭ ॥
বিশ্বাসভরসাভরা শুনে মন ভুলে ।
নাহি তব পুত্র-কন্যা ডুবে গেছে জলে ॥ ২৮ ॥
কেবল তোমার নয় গেছে পরিবার ।
ডুবেছে আগোটা বিশ্ব যাবৎ সংসার ॥ ২৯ ॥
উত্তরে কহেন মিত্র আমি কিবা করি ।
গেছে যদি লবে তবে আমি সুদ্ধ মরি ॥ ৩০ ॥
এত শুনি দৈববাণী কহে পুনর্বার ।
কি হেতু করিবে তুমি প্রাণ-পরিহার ॥ ৩১ ॥
সংসার কেবল মাত্র জলে ডুবে গেছে ।
ঠাকুরের ভক্ত যত সবে বেঁচে আছে ॥ ৩২ ॥
বিরাজেন ভক্তসহ যথা নারায়ণ ।
তোমার তাঁদের সঙ্গে হবে সম্মিলন ॥ ৩৩ ॥
অনতিবিলম্বে কাল সামান্য তফাত ।
হেনকালে গায়ে পড়ে তাঁর স্ত্রীর হাত ॥ ৩৪ ॥
তাহে সুখস্বপ্ন ভঙ্গ হইল তাঁহার ।
কে তুমি বলিয়া স্ত্রীকে করেন চীৎকার ॥ ৩৫ ॥
গভীর নিশীথে পেয়ে নন্দনের ধ্বনি ।
চমকিয়া উঠিলেন মিত্রের জননী ॥ ৩৬ ॥
ত্বরা করি আইলেন বেগার নন্দন ।
জিজ্ঞাসিলা পুত্রে বাপ হেন কি কারণ ॥ ৩৭ ॥
শ্রীমনোমোহন কন কে তোমরা হেথা ।
জননী কহেন পুত্রে আমি তব মাতা ॥ ৩৮ ॥
চারি ধারে স্তব্ধপ্রাণ যত পরিবার ।
অকস্মাৎ কেন হেন কহ সমাচার ॥ ৩৯ ॥
পুনশ্চয় পুত্র কয় কে আমার আছে ।
পুত্র-কন্যা-পরিবার জলে ডুবে গেছে ॥ ৪০ ॥
সব গেছে আছে ভক্তসহ ভগবান ।
কোথায় কেমনে পাই তাঁহার সন্ধান ॥ ৪১ ॥
গেলে দুই তিন ঘণ্টা তবে হয় ভোর ।
তখন না ছুটে তার স্বপনের ঘোর ॥ ৪২ ॥
দিন এলে বেলা হ'লে সুস্থির হৃদয় ।
স্বপনে অলীক জ্ঞান না হয় প্রত্যয় ॥ ৪৩ ॥
স্বপন-বারতা কহে যার তার ঠাঁই ।
শুনিলেন শেষে রাম মাসী-পুত্র ভাই ॥ ৪৪ ॥
রাম দত্ত আত্মগণ ভক্ত শ্রীপ্রভুর ।
শুন ভক্ত-সংজোটন কাণ্ড সুমধুর ॥ ৪৫ ॥
নবীন বয়েস রাম গোউর বরন ।
লম্বে
প্রস্থে চারুদৃষ্টি সুন্দর গড়ন ॥ ৪৬ ॥
প্রিয়দরশন ঠাম সরল হৃদয় ।
রসায়নশাস্ত্রে দক্ষ বিদ্যা-পরিচয় ॥ ৪৭ ॥
মেডিকেল কলেজে শহরে এইখানে ।
উচ্চপদে অভিষিক্ত বিদ্যাবল-গুণে ॥ ৪৮ ॥
জড়বস্তু সংযোগ-বিয়োগ-কর্ম করি ।
অন্তরেতে হইয়াছে নাস্তিকতা ভারি ॥ ৪৯ ॥
বিভুর অস্তিত্ব কথা না হয় বিশ্বাস ।
বড় তর্কপ্রিয় তর্কে পরম উল্লাস ॥ ৫০ ॥
তর্কেতে করেন তিনি হরির সন্ধান ।
তর্কাতীত হরি জড়ে খুঁজে নাহি পান ॥ ৫১ ॥
একদিন নিদ্রাযোগে দেখেন স্বপন ।
একমাত্র নন্দিনীর হ'য়েছে মরণ ॥ ৫২ ॥
হৃদয় হতেছে দগ্ধ এতই সন্তাপ ।
স্বপনেতে শোকাতুর বিবিধ বিলাপ ॥ ৫৩ ॥
মাথার বালিশ আর্দ্র নয়নের নীরে ।
আর্তনাদে ঘন ঘন করাঘাত শিরে ॥ ৫৪ ॥
এমন সময় ভঙ্গ হইল স্বপন ।
জাগিয়াও তবু রাম করেন রোদন ॥ ৫৫ ॥
নিরীক্ষণ নন্দিনীরে করেন নিকটে ।
তথাপিও স্বপ্নস্মৃতি আদতে না ছুটে ॥ ৫৬ ॥
কিছুকাল পরে মনে হইল উদয় ।
স্বপ্নতত্ত্ব সত্য যদি যথার্থই হয় ॥ ৫৭ ॥
তবে কি হইবে মম কি হইবে গতি ।
আত্মরক্ষাহেতু চিন্তা হয় দিবারাতি ॥ ৫৮ ॥
একদিন ক্ষুন্ন মন হৃদি-ভাবান্তরে ।
বেড়িয়া বেড়ান রাত্রে ছাদের উপরে ॥ ৫৯ ॥
উর্ধ্ব মুখে নীলাকাশ করি দরশন ।
অন্তরে উঠিল নব ভাবের গড়ন ॥ ৬০ ॥
উদাস উল্লাস মন চলে যায় কোথা ।
কিছু না পারেন তার বুঝিতে বারতা ॥ ৬১ ॥
বড়ই অশান্ত হৃদি সদা ক্ষুণ্ণ মন ।
শাস্ত্রবিৎ ধীর জনে করি আবাহন ॥ ৬২ ॥
শান্তিদাতা আছে কোথা শাস্তি মিলে কিসে ।
পথহেতু ভক্তি-ভরে তাঁহারে জিজ্ঞাসে ॥ ৬৩ ॥
প্রশ্ন শুনে স্তব্ধ প্রাণে কহে ধীরবর ।
কহিতে না পারি কিছু ইহার উত্তর ॥ ৬৪ ॥
শাস্ত্র কহে কর কর্ম সফল হইলে ।
পশ্চাৎ তাহার ফল শান্তি তবে মিলে ॥ ৬৫ ॥
কর্মের বিধান-শাস্ত্রে বস্তু নাহি তায় ।
শুনিয়া রামের প্রাণ শুকাইয়া যায় ॥ ৬৬ ॥
রামের বাসনা বড় মাছ ধরিবারে ।
কার্যহেতু জাল ছিপ কিছু নাহি নেড়ে ॥ ৬৭ ॥
যন্ত্র ধরা বাড়া কথা না ছুঁইবে জল ।
অনায়াসে চান ব'সে সুপক্ক ফসল ॥ ৬৮ ॥
শ্রীমনোমোহন সনে হ'য়ে একত্তর ।
শান্তির উপায় চিন্তা করে নিরন্তর ॥ ৬৯ ॥
শ্রীমনোমোহন বড় রাম জন্মে পাছে ।
দুই ভায়ে বড় ভাব ঘর কাছে কাছে ॥ ৭০ ॥
বিশেষ এখন মিলে গেল দুই ভাই ।
ইনিও যা চান ঠিক উনি চান তাই ॥ ৭১ ॥
ভক্ত-ভগবানে খেলা অকথ্য কথন ।
যোল আনা মন দিয়া শুন শুন মন ॥ ৭২ ॥
বলিয়া শুনাব কত বলিব কেমনে ।
ভেঙ্গে বুঝ কোটি কোটি এক কথা শুনে ॥ ৭৩ ॥
ঘুম পাড়াইয়া ঘুম কেমনে ভাঙান ।
কোথা অশ্ব কোথা মুখ কোথায় লাগাম ॥ ৭৪ ॥
কোথা পৃষ্ঠে অশ্বারোহী কোথা তাঁর হাত ।
বিমানে অদ্ভূত কর্ম শূন্যে করাঘাত ॥ ৭৫ ॥
যন্ত্রণায় ঊর্ধ্ব মুখে ছুটে অশ্ববর ।
প্রভু-রামকৃষ্ণ-লীলা বড়ই সুন্দর ॥ ৭৬ ॥
শ্রীমনোমোহন রামে নানাদিকে ছুটে ।
শান্তির আস্পদ কোথা কি প্রকারে জুটে ॥ ৭৭ ॥
এ সময় 'সুলভসংবাদ' পত্রিকায় ।
শ্রীকেশব প্রভুমূর্তি আঁকিয়া তাহায় ॥ ৭৮ ॥
দিয়াছেন ছাপাইয়া গুণগাথা লিখি ।
দেখিয়া পড়িয়া দুইজনে ভারি সুখী ॥ ৭৯ ॥
পরস্পর যুক্তি স্থির কৈল নিরজনে ।
চল যাব দক্ষিণশহর-দরশনে ॥ ৮০ ॥
সংসার-অশান্তি-তাপে তাপিত জীবন ।
সাধু-সঙ্গে তত্ত্বজ্ঞান মনে আকিঞ্চন ॥ ৮১ ॥
সেইহেতু দুইজনে দরশনে যান ।
চির শান্তিদাতা যেথা কল্যাণনিধান ॥ ৮২ ॥
উতরিয়া যথাস্থানে করে অন্বেষণ ।
কোথায় পরমহংস সাধু একজন ॥ ৮৩ ॥
লোকে দেখাইল পথ প্রভুর মন্দির ।
দ্বারদেশে এসে দোঁহে হইল হাজির ॥ ৮৪ ॥
আছিল কপাট বদ্ধ মন্দিরের দ্বারে ।
ঈষৎ আঘাত তায় ধীরে ধীরে করে ॥ ৮৫ ॥
মুক্ত দ্বার তখনি পরশ মাত্র তায় ।
আপনি করিয়া দিলা প্রভুদেব রায় ॥ ৮৬ ॥
যেন প্রত্যাশায় কত কপাটের ধারে ।
বসিয়াছিলেন প্রভু তাঁহাদের তরে ॥ ৮৭ ॥
যেখিবারে ভক্তদ্বয় বহুদিন ছাড়া ।
ভব-সিন্ধু-তরঙ্গে ত্রাসিত আশাহারা ॥ ৮৮ ॥
অন্তরে অপার সুখ প্রভু ভগবান ।
দেখিতে দেখিতে দুই ভক্তের বয়ান ॥ ৮৯ ॥
সোহাগে সম্ভাষ কত কতই আদর ।
বসাইলা আপনার খাটের উপর ॥ ৯০ ॥
ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর বিশ্ব ডরে দাপে ।
বসিতে সে বিছানায় খর থর কাঁপে ॥ ৯১ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গ পারিষদ আত্মগণ তাঁর ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি শ্রীপ্রভুর আপনার ॥ ৯২ ॥
ছাড়িবার নহে কেহ কারে নাহি ছাড়ে ।
বাহ্যে ছাড়াছাড়ি বোধ লীলার আসরে ॥ ৯৩ ॥
প্রভু যে পরমহংস যাঁর অন্বেষণে ।
এসেছেন দুই ভাই এখন না চিনে ॥ ৯৪ ॥
তাঁহাদের মনে মনে জানা চিরকাল ।
সন্ন্যাসী পরমহংস পরা বাঘছাল ॥ ৯৫ ॥
ভস্মমাখা গোটা অঙ্গ কাছে ধুনি জ্বলে ।
সম্মুখে চিমটা গাড়া বাস বৃক্ষমূলে ॥ ৯৬ ॥
মাথায় জড়ান জটা রুক্ষ কেশভার ।
গাঁজায় ধুয়ায় করে দুনিয়া আঁধার ॥ ৯৭ ॥
প্রভুর শ্রীঅঙ্গ সাধা লক্ষণবিহীন ।
আচারেতে সুধীন অপেক্ষা কত দীন ॥ ৯৮ ॥
পরিধান লালপেড়ে সুতার কাপড় ।
সুন্দর সুঠামে নাই কোন আড়ম্বর ॥ ৯৯ ॥
পরে পরিচয়ে বুঝিলেন দুইজনে ।
ইনি তিনি আসিয়াছি যার অন্বেষণে ॥ ১০০ ॥
অন্তর বুঝিয়া তবে প্রভুদেব কন ।
ভাগিনে হৃদয়ানন্দে করি সম্বোধন ॥ ১০১ ॥
জ্বরের পীড়ায় নীচে ছিল শয্যাগত ।
ওরে হৃদু এরা নহে ব্রাহ্মদলভুক্ত ॥ ১০২ ॥
শ্রীমনোমোহন কন প্রভু সন্নিকটে ।
বাল্যাবধি ব্রাহ্মধর্ম বুঝি সত্য বটে ॥ ১০৩ ॥
সমাজেতে যাওয়া আসা আছয়ে আমার ।
এত শুনি প্রভুদেব কন পুনর্বার ॥ ১০৪ ॥
যাহা যাও যাহা বুঝ ধর্মের বারতা ।
তুমি নহ ব্রাহ্মদের এই মোর কথা ॥ ১০৫ ॥
এত বলি কহিতে লাগিলা উপদেশ ।
অন্তর্যামী ভক্ত-প্রাণ প্রভু পরমেশ ॥ ১০৬ ॥
কল্পতরু বিশ্বগুরু অখিলের স্বামী ।
সাকার সম্বন্ধে উক্তি ভক্তি-প্রসবিনী ॥ ১০৭ ॥
শোলার গঠিত আতা করি দরশন ।
সত্যের গাছের আতা করে উদ্দীপন ॥ ১০৮ ॥
সেইরূপ দেবদেবীমূর্তি-দরশনে ।
লীলারূপ কিবা কার সব পড়ে মনে ॥ ১০৯ ॥
লীলাময় লীলারূপ বিভু ভগবান ।
সকল সম্ভবে কেন সর্বশক্তিমান ॥ ১১০ ॥
দু'ভায়ে গলিয়ে গেছে প্রভুর কথায় ।
সুমধুর মিষ্টভাষী প্রভুদেব রায় ॥ ১১১ ॥
শ্রীবাণীতে সুধাধারা এত বহে জোর ।
শুনিলে তরলে গলে অশনি কঠোর ॥ ১১২ ॥
এ তো চিরভক্ত তাঁর ধাত বাঁধা তায় ।
ঈষৎ আভাসে সুধাস্রোতে ভেসে যায় ॥ ১১৩ ॥
অপরূপ নরলীলা নরদেহ ধরি ।
না পারি বলিতে নাহি দেখাইতে পারি ॥ ১১৪ ॥
বড়ই সহজ নৈলে দেখা বুঝা ভার ।
হাতে আছে হাতে নাই আশ্চর্য ব্যাপার ॥ ১১৫ ॥
ভক্ত বিনা খেলা কার না পড়ে নয়নে ।
চুম্বক কেবলমাত্র লোহা পেলে টানে ॥ ১১৬ ॥
স্বচ্ছ নিয়মল ভক্ত চিতের উপর ।
প্রতিভাত করে মাত্র চন্দ্রমার কর ॥ ১১৭ ॥
ভক্তের মিলন হৃদি যদি দেখা যায় ।
তথাপি দর্পণ-তুল্য ধূলারাশি গায় ॥ ১১৮ ॥
পরিষ্কারে নহে কষ্ট হয় অনায়াসে ।
ধীর মন্দ সমীরণ সামান্য বাতাসে ॥ ১১৯ ॥
ভাগবতলীলামধ্যে শুন কথা তার ।
প্রভু জিজ্ঞাসিলা রামে তুমি না ডাক্তার ॥ ১২০ ॥
নীচে শয্যাগত জ্বরে ভাগিনা হৃদয় ।
দেখাইয়া তাঁরে বলিলেন লীলাময় ॥ ১২১ ॥
নাড়ী টিপে দেখ দেখি আছে কি রকম ।
পরীক্ষা করিয়া ভক্ত রাম দত্ত কন ॥ ১২২ ॥
গুণী জানে সুগম্ভীর আপ্যায়িত স্বরে ।
এখন নাহিক জ্বর জ্বর গেছে ছেড়ে ॥ ১২৩ ॥
অপূর্ব মধুর খেলা ভক্ত-ভগবানে ।
দয়া কর প্রভু যেন দেখি রেতেদিনে ॥ ১২৪ ॥
সামান্য ঘটনা কথা অনতিবিস্তর ।
তবু তার ভাসে কত সাগর সাগর ॥ ১২৫ ॥
ভাসে বেদ বেদান্ত তন্ত্রাদি গীতা সার ।
ব্যসের পুরাণ ভাসে ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১২৬ ॥
ভাসে ব্রহ্মা ভাসে বিষ্ণু ভাসে মহেশ্বর ।
স্বজন-পালন-লয় শক্তির আকর ॥ ১২৭ ॥
ভাসিছে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীগণ ।
রাজর্ষি দেবর্ষি ভাসে তৃণের মতন ॥ ১২৮ ॥
কোথা ভাসে কিসে ভাসে ভাসে কি প্রকার ।
আঁকিয়া দেখাতে শক্তি নাহিক আমার ॥ ১২৯ ॥
প্রভু-ভক্ত পদরজ সার কর মন ।
ইনিও দেখিতে
পাবে মনের মতন ॥ ১৩০ ॥
যদি বল এ দর্শন স্বপনের দেখা ।
পড়িলে প্রভুর কুঁদে না থাকিবে বাঁকা ॥ ১৩১ ॥
শুন লীলা মনোযোগে প্রভুদেব কন ।
তুমি রাম দেহ-তত্ত্ব জান বিলক্ষণ ॥ ১৩২ ॥
বল দেখি বুঝাইয়া এবার আমারে ।
যা খাই কোথায় যায় উদর-ভিতরে ॥ ১৩৩ ॥
এত শুনি পাকস্থলী উদরে যেখানে ।
দেখাইল রাম প্রভু-অঙ্গ পরশনে ॥ ১৩৪ ॥
উপরের মধ্যভাগে পাকস্থলী-স্থান ।
শুনিয়া বিস্ময়ে কন প্রভু ভগবান ॥ ১৩৫ ॥
দেখ মম পাকস্থলী নহে মধ্যস্থানে ।
উদরের অধোদেশে সবাকার বামে ॥ ১৩৬ ॥
হাত দিয়া কর লক্ষ্য আমি খাই জল ।
হইবে প্রতীয়মান কথা অবিকল ॥ ১৩৭ ॥
যা বলিল প্রভুদেব তাই দেখে রাম ।
বাম ভাগে চলে যত প্রভু খান ॥ ১৩৮ ॥
দেখিয়া বিস্ময়ে ভরে শ্রীরামের মন ।
সৃষ্টিছাড়া শ্রীপ্রভুর দেহের গঠন ॥ ১৩৯ ॥
প্রায়াগত দেখি সন্ধ্যা কহে দুই জনে ।
ফিরিবারে ঘরে কিন্তু মন নাহি মানে ॥ ১৪০ ॥
প্রভুর মূরতি দেখি কথা শুনি তাঁর ।
উভয়ের মহানন্দ নহে বর্ণিবার ॥ ১৪১ ॥
সমস্ত অশান্তি যত ছিল এ জীবনে ।
দূরীভূত একেবারে প্রভু-দরশনে ॥ ১৪২ ॥
বিদায় মাগিতে প্রভু বলিলেন দুয়ে ।
যাবে যদি ঘরে আজি কিছু যাও খেয়ে ॥ ১৪৩ ॥
দুই ভায়ে মণ্ডাসহ ঠাণ্ডাজল খান ।
সম্মুখে দণ্ডায়মান প্রভু ভগবান ॥ ১৪৪ ॥
চিরকাল ভক্তের ঠাকুর প্রভুরায় ।
মহাসুখ দেখিয়া ভকতদ্বয় খায় ॥ ১৪৫ ॥
বিদায়ের কালে হয়ে লয় পদধূলি ।
বিদায় সে দিন হয় পুনঃ এস বলি ॥ ১৪৬ ॥
অন্তরীক্ষে উভয়ের চুরি করি মন ।
শুন রালকৃষ্ণ লীলা অমৃত-কখন ॥ ১৪৭ ॥
ঘরে যেতে গোটা পথে কহে পরস্পর ।
প্রভু কি দয়াল সাধু স্বভাব সুন্দর ॥ ১৪৮ ॥
হৃদিতত্ত্ববিৎ তেঁহ অপূর্ব কাহিনী ।
মুর্তি যেন রসনায় তেন মিঠা বাণী ॥ ১৪৯ ॥
আমি যে ডাক্তার তিনি জানিলেন কিসে ।
বলিলেন রাম দত্ত বিস্ময় বিশেষে ॥ ১৫০ ॥
দ্বিতীয় আশ্চর্য কথা দেহের গড়ন ।
সাধারণ যেন তাঁর স্বতন্ত্র রকম ॥ ১৫১ ॥
প্রিয়দরশন কিবা তৃতীয় সংবাদ ।
দেখিলে জনমে কত অন্তরে আহলাদ ॥ ১৫২ ॥
জন্মজন্মাজিত তাপ হরে একবারে ।
কি জানি কি আছে তাঁর মূর্তির ভিতরে ॥ ১৫৩ ॥
এইবারে পাইয়াছি যেন সাধ মনে ।
ত্রিতাপসন্তাপহর বিপদবারণে ॥ ১৫৪ ॥
মিত্রের জননী ঘরে মহা ভক্তিমতী ।
আগাগোড়া শুনিলেন প্রভুর ভারতী ॥ ১৫৫ ॥
উদ্দেশে প্রণতি করি কহিল নন্দনে ।
এ নহে অপর কেহ ভগবান বিনে ॥ ১৫৬ ॥
জন্মজন্মার্জিত পুণ্যে পেলে দরশন ।
নরদেহধারী হরি পতিতপাবন ॥ ১৫৭ ॥
বারুদে প্রস্তুত বোম ল'য়ে শত দরে ।
কারিগর সেইরূপ লঙ্কাগড় গড়ে ॥ ১৫৮ ॥
এক বোমে দিলে অগ্নি সব বোমে পায় ।
সুকৌশলী-কারিগর এমন সাজায় ॥ ১৫৯ ॥
সেই মত ভক্তগোষ্টিমধ্যে একজন ।
পরশিলে একদিন পতিতপাবন ॥ ১৬০ ॥
সংযোগে সংযোগে ছুটে আগুনের কণা ।
জাগায় আগোটা গোষ্টিমধ্যে যত জনা ॥ ১৬১ ॥
অন্তরঙ্গ আত্মগণ গুন্তির ভিতরে ।
এতেক কোথাও নহি প্রভু-অবতারে ॥ ১৬২ ॥
যত দেখি আছে লগ্ন এ দুয়ের সাথে ।
নিকট সম্বন্ধ সব তর তম জেতে ॥ ১৬৩ ॥
আত্মবন্ধু অধিকাংশ শ্রীপ্রভুর দাস ।
ভক্ত-সংজোটন কাণ্ডে ক্রমশঃ প্রকাশ ॥ ১৬৪ ॥
পূজ্যতম ভক্তদ্বয়ে করিয়া প্রণতি ।
শুন মন সুমধুর রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১৬৫ ॥
ইহার কিঞ্চিৎ আগে জুটেছে হেথায় ।
কনৌজ ব্রাহ্মণ বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ॥ ১৬৬ ॥
মহাভক্ত শঙ্করের জনক তাঁহার ।
ইংরেজ রাজের ফৌজে পদ সুবাদার ॥ ১৬৭ ॥
যুদ্ধবিদ্যা বিশারদ সুবিখ্যাত জনা ।
পাঁচশত টাকা মাসে মাসে মাহিয়ানা ॥ ১৬৮ ॥
মহেশে
অপার ভক্তি হেন নাহি শুনি ।
দেহে সমরের কাজ মনে শূলপাণি ॥ ১৬৯ ॥
একে খোলা তরবারি শিব অন্ত হাতে ।
যুদ্ধেরও সময় পূজা করে বিধিমতে ॥ ১৭০ ॥
নিত্যকর্ম শিবপূজা নহে যতক্ষণ ।
এক ফোঁটা জল নাহি করেন গ্রহণ ॥ ১৭১ ॥
বদনেতে বিশ্বনাথ নাম অবিরাম ।
তাই রাখে নন্দনের বিশ্বনাথ নাম ॥ ১৭২ ॥
ভক্তিমার্গী বিশ্বনাথ আচারী ব্রাহ্মণ ।
বাল্যাবধি জনকের স্বভাবে গড়ন ॥ ১৭৩ ॥
ভাগবত বেদ গীতা বেদান্তাদি শাস্ত্র ।
ছত্রে ছত্রে বর্ণে বর্ণে সকল কণ্ঠস্থ ॥ ১৭৪ ॥
ডুবুরিতে অবিকল ডুবে যে প্রকারে ।
অগম দরিয়া সিন্ধু জলের ভিতরে ॥ ১৭৫ ॥
উদ্ধৃত করিতে রত্ন-মুকুতা-নিকর ।
উপাধ্যায় তেন ডুবে শাস্ত্রের ভিতর ॥ ১৭৬ ॥
যতদূর সাধ্য তার যতন বিশেষে ।
শাস্ত্রে ব্যক্ত সত্য-তত্ত্ব জ্ঞানরত্ব আশে ॥ ১৭৭ ॥
তত্ত্বলাভে কর্মোপায় বিচারিয়া মনে ।
আরম্ভন হঠযোগ সাধন-ভজনে ॥ ১৭৮ ॥
ধর্ম-কর্ম-আচরণে রহে অবিরত ।
স্নানের সময় মন্ত্র পাঠ করে কত ॥ ১৭৯ ॥
নিয়মিত নিত্যকর্ম কর্মে মহাতেজা ।
আপুনি নিজেই করে ঠাকুরের পূজা ॥ ১৮০ ॥
সুমধুর স্তুতিপাঠ শ্রুতিমুগ্ধকর ।
কর্পূরের আরাত্রিক অতীব সুন্দর ॥ ১৮১ ॥
নয়নের ভাব কিবা পুজার সময় ।
বোলতার দংশনে যেইমত হয় ॥ ১৮২ ॥
নিজে যেন ভক্তিমান সেইমত দারা ।
হাঁড়িখানি যেই মত তার কত সরা ॥ ১৮৩ ॥
শুন কথা ভক্তিমতী ছিল কত দূর ।
গোপাল নামেতে পূজে আলাদা ঠাকুর ॥ ১৮৪ ॥
সেবা পূজা নিজে করে পরমানুরাগে ।
বানায় সুন্দর ভোগ যেন মনে লাগে ॥ ১৮৫ ॥
নিতি নিতি গীতাপাঠ গোপালের কাছে ।
আচারে স্বামীর মত শুদ্ধাশুদ্ধ বাছে ॥ ১৮৬ ॥
গৃহকর্মে সুনিপুণা এদিকে যেমন ।
নানারূপ সূপকর্মে বুদ্ধি বিলক্ষণ ॥ ১৮৭ ॥
মহাভক্ত উপাধ্যায় বহু ভক্তি তাঁর ।
চালায় ভক্তির ভাবে বিদ্যার সংসার ॥ ১৮৮ ॥
জননীরে করে ভক্তি দেবীর মতন ।
নিজে নীচে জননীর উচ্চেতে আসন ॥ ১৮৯ ॥
সমাসনে কখন না বসে ভক্তবর ।
এতই আছিল ভক্তি মায়ের উপর ॥ ১৯০ ॥
পিতার মতন শিবে মায়ের বিশ্বাস ।
সেই হেতু মাঝে মাঝে হয় কাশীবাস ॥ ১৯১ ॥
কাশীবাসে জননীর যখন গমন ।
তিন গণ্ডা দ্বাস দাসী সেবার কারণ ॥ ১৯২ ॥
সঙ্গে দিয়া পাঠাইয়া দেন উপাধ্যায় ।
মাতৃভক্তি-প্রাবল্যের বেগ প্রেরণায় ॥ ১৯৩ ॥
ছেলেপুলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় তার ভারি ।
নেপালরাজের ঘরে সম্বল চাকরি ॥ ১৯৪ ॥
শহরের সন্নিকটে কাঠের আড়তে ।
রাজা দিয়া ভার
পাঠাইল বিশ্বনাথে ॥ ১৯৫ ॥
অতিশয় শ্রম তায় করি দিবারাতি ।
আয় বৃদ্ধি সহ তায় করিল
উন্নতি ॥ ১৯৬ ॥
বিপুল প্রশংসা পায় রাজদরবারে ।
বার বার পুরস্কার মাহিয়ানা বাড়ে ॥ ১৯৭ ॥
প্রভু সঙ্গে সংমিলন হয় কি প্রকার ।
শুন ভক্ত সংজোটন অপূর্ব লীলার ॥ ১৯৮ ॥
উপাধ্যায় একদিন দেখেন স্বপন ।
কে এক পুরুষ তাঁরে করে আবাহন ॥ ১৯৯ ॥
তত্ত্বজ্ঞান
লইবারে কন বারে বারে ।
সুন্দর শ্রীমুখে কথা সুধা যেন ঝরে ॥ ২০০ ॥
হঠাৎ ভাঙ্গিল ঘুম
উঠিল চমকি ।
ভাবে ঘোর নিশাকালে কি স্বপন দেখি ॥ ২০১ ॥
অবিরত চিন্তাতুর ব্যাকুলিত
মন ।
স্বপন-কাহিনী হয় সর্বদা স্মরণ ॥ ২০২ ॥
দৈবযোগে একদিন দক্ষিণশহরে ।
উপনীত
উপাধ্যায় প্রভুর গোচরে ॥ ২০৩ ॥
স্বপ্নদৃষ্ট মহাজন দেখামাত্র চিনে ।
বারে বারে
বিলুণ্ঠিত প্রভুর চরণে ॥ ২০৪ ॥
বাসনা-অতীত জ্ঞান-তত্ত্ব তেহ পায় ।
শ্রীপ্রভুদেবের
সাদা সরল কথায় ॥ ২০৫ ॥
বেদপাঠী বিশ্বনাথ দেখে কুতুহলে ।
বেদবাক্যে প্রভুবাক্যে
সমভাবে মিলে ॥ ২০৬ ॥
অতীব আশ্চর্য বোধ হইল কেমন ।
প্রভুদরশনে আসে যখন তখন ॥ ২০৭ ॥
এইরূপে উপাধ্যায় কিছু দিন কাটে ।
একবার পড়িলেন দারুণ সঙ্কটে ॥ ২০৮ ॥
কি সঙ্কট কিবা
বলে পাইল উদ্ধার ।
পশ্চাৎ কহিব মন পাবে সমাচার ॥ ২০৯ ॥
রামকৃষ্ণ লীলা কিবা কহিবারে
পারি ।
অপার ভবাব্ধিজলে তরিবার তরী ॥ ২১০ ॥