তৃতীয় খণ্ড

রামের দীক্ষা ও সুরেন্দ্র মিত্রের আগমন


জয় প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


এখানে ভবনে রাম শ্রীমনোমোহন ।
চিরগ্রভু শ্রীপ্রভুরে করি দরশন ॥ ১ ॥

এতদূর মুগ্ধ মন চিন্তে নিরন্তর ।
কবে হবে রবিবার পাব অবসর ॥ ২ ॥

দক্ষিণশহরে যাব প্রভু-দরশনে ।
সাক্ষাৎ ত্রিতাপহর পতিতপাবনে ॥ ৩ ॥

এত শশব্যস্ত কেন বুঝেছ কি মন ।
অন্তরঙ্গ চিরসঙ্গ ভক্তের লক্ষণ ॥ ৪ ॥

একবার দরশনে মন-প্রাণ মজে ।
অপরূপ শ্রীপ্রভুর চরণপঙ্কজে ॥ ৫ ॥

বুঝে নাহি মজে, মজে কিসে বলা দায় ।
যে মজে সে মজে মাত্র দর্শন-আশায় ॥ ৬ ॥

রবিবার এলে পরে পেলে অবসর ।
দু'ভায়ে করিল যাত্রা দক্ষিণশহর ॥ ৭ ॥

সমাদর করি প্রভু ভাই দুই জনে ।
বলাইতে যান খাটে নিজের আসনে ॥ ৮ ॥

একদিন দরশনে এত ভক্তি উঠে ।
নীচাসনে বসিলেন না বসিয়া খাটে ॥ ৯ ॥

বলিলেন রামচন্দ্র কথায় কথায় ।
ঈশ্বর আছেন যদি থাকেন কোথায় ॥ ১০ ॥

রামের নাস্তিক ভাব চিতে গাঢ়তর ।
কিছুতে স্বীকার নহে আছেন ঈশ্বর ॥ ১১ ॥

রসায়নবিদ্যাবিৎ তর্কেতে আগুন ।
বিশেষ বুঝেন জড় দ্রব্যাদির গুণ ॥ ১২ ॥

নানা কথা শুনি প্রভু করিলা উত্তর ।
আছেন কি কহ কথা প্রত্যক্ষ ঈশ্বর ॥ ১৩ ॥

যদ্যপিহ নাহি পাও তাঁহারে দেখিতে ।
নাই তিনি ব'ল তুমি কোন্ যুক্তিমতে ॥ ১৪ ॥

নক্ষত্র না হয় দৃষ্ট দিনের বেলায় ।
আকাশে নক্ষত্র নাই কহা মহাদায় ॥ ১৫ ॥

নবনীত আছে কত দুধের ভিতরে ।
সবে জানে, যদি কথা নাহি ঢুকে শিরে ॥ ১৬ ॥

দুধ ল'য়ে কর ক্রিয়া রীতি যে রকম ।
অবশ্য দেখিতে পাবে সুন্দর মাধম ॥ ১৭ ॥

বিষে ঘেরা অঙ্গ গোটা সর্পের দংশনে ।
এক পলে উড়ে যেন মন্তরের গুণে ॥ ১৮ ॥

তেমনি প্রভুর বাক্য মন্ত্র-মহৌষধি ।
উড়ায় রামের চির-নাস্তিকতা-ব্যাধি ॥ ১৯ ॥

জানি না কি গুণ খেলে প্রভুর কথায় ।
উজানে আছিল রাম পড়িল ভাটায় ॥ ২০ ॥

আগেকার অপেক্ষা সহস্রগুণ তোড়ে ।
সিন্ধু-মুখে বড় টান যবে ফিরে ঘরে ॥ ২১ ॥

বিশ্বাস প্রভুর বাক্যে এতই প্রবল ।
ঈশ্বর দেখিতে রাম হইল পাগল ॥ ২২ ॥

পুনশ্চয় প্রভুদেবে ভক্ত রাম কয় ।
কিছু না দেখিতে পেলে না হয় প্রত্যয় ॥ ২৩ ॥

সত্য আপনার কথা আমাদের ভ্রম ।
কি করি উপায় নাই বলহীন মন ॥ ২৪ ॥

প্রভুর উত্তর রোগী সন্নিপাতে ঘেরা ।
খেয়ালে কতই কয় পাগলের পারা ॥ ২৫ ॥

খাইবারে চায় হাঁড়ি হাঁড়ি ডাল ভাত ।
কবিরাজ-কথায় না করে কর্ণপাত ॥ ২৬ ॥

যদ্যপি বিষম জ্বর আজ ফুটে গায় ।
কাল কুইনাইনের ব্যবস্থা কোথায় ॥ ২৭ ॥

জ্বরের জ্বালায় যদি রোগী চায় খেতে ।
কাজে পাকা কবিরাজ নাহি দেয় দিতে ॥ ২৮ ॥

দিন গতে রস পাক হইলেক পর ।
সে ব্যবস্থা নিজে করে আপুনি ডাক্তার ॥ ২৯ ॥

শুন মন এইখানে বলি এক কথা ।
প্রভুদেব দেখ কি রকম শিক্ষাদাতা ॥ ৩০ ॥

যে বিষয় ভালরূপে আছে যার জানা ।
তাহাতেই যেন তিনি শিক্ষার উপমা ॥ ৩১ ॥

রামচন্দ্র সুন্দর ডাক্তার একজন ।
বড় দক্ষ বুঝিবারে শাস্ত্র রসায়ন ॥ ৩২ ॥

তাই প্রভু লইলেন কথোপকথনে ।
ভৈষজ্য ভিষক রোগী উপমার স্থানে ॥ ৩৩ ॥

ত্বরায় পশিবে যায় শিক্ষার্থীর মন ।
সৃষ্টিছাড়া শিক্ষাদাতা প্রভু নারায়ণ ॥ ৩৪ ॥

শ্রীপ্রভুর কাছে আসে যত শাস্ত্রবিৎ ।
তাঁর জানা-শাস্ত্রে কণা তাঁহার সহিত ॥ ৩৫ ॥



রামের হৃদয়ে উঠে অশান্তি জঞ্জাল ।
সদা ভাবে কবে পাবে হরির নাগাল ॥ ৩৬ ॥

প্রভুদেবে দরশন করিবার আগে ।
আছিল অশান্তি বড় ত্রিতাপের লেগে ॥ ৩৭ ॥

সেই অশান্তির মূর্তি পুনঃ জাগরণ ।
সুখার্থে পূর্বেতে, এবে হরির কারণ ॥ ৩৮ ॥

হাতে পায়ে করে কাজ মন হরি খুঁজে ।
কাজেই চঞ্চল চিত্ত সংসারের কাজে ॥ ৩৯ ॥

দু'ভায়ের সমাবস্থা রহে একত্তর ।
সংসারের কার্যান্তে পাইলে অবসর ॥ ৪০ ॥

দারা কন্যা পরিবারে নাহি বলে মন ।
ছিল যেন দোহাকার পূর্বের মতন ॥ ৪১ ॥

পাইলে ছুটির দিন যান ছুটে ছুটে ।
পরাশান্তিদাতা প্রভুদেবের নিকটে ॥ ৪২ ॥

আনন্দ কতই তাঁর কাছে যতক্ষণ ।
বিষদ অশান্তি-বোধ আইলে ভবন ॥ ৪৩ ॥

ঘরে ঘরে কানাকানি করে মহাখেদ ।
প্রভুদরশনে নিবারণে করে জেদ ॥ ৪৪ ॥

একদিন শুন কিবা অবাক্ কাহিনী ।
মনোমোহনের এক পিসী ঠাকুরানী ॥ ৪৫ ॥

বুঝাইয়া নানামতে কহিল তাঁহারে ।
নিষেধি তোমার যেতে দক্ষিণশহরে ॥ ৪৬ ॥

এখন কথায় আর কার যায় কান ।
সময়ে হয়েছে হেথা শ্রীপ্রভুর টান ॥ ৪৭ ॥

এ টান বিষম টান বাধা নাহি মানে ।
সে বুঝেছে আঁতে আঁতে যে পড়েছে টানে ॥ ৪৮ ॥

পরদিনে শ্রীপ্রভুর দরশনে দেখে ।
ম্রিয়মাণ ভগবান বারিধারা চোখে ॥ ৪৯ ॥

ক্ষুব্ধপ্রাণে ভগবানে শ্রীমনোমোহন ।
কাতরে জিজ্ঞাসা করে কান্নার কারণ ॥ ৫০ ॥

জড়িত জড়িত ভাবে দয়ার সাগর ।
বলিলেন আর বাছা কি দিব উত্তর ॥ ৫১ ॥

প্রিয়তম ভক্ত কোন প্রাণের সমান ।
কখন কখন আসে মম বিদ্যমান ॥ ৫২ ॥

পিসী তার মহামার কত করে ঘরে ।
নিবারিতে ভক্তজনে হেথা আসিবারে ॥ ৫৩ ॥

তাই বাছা বড় দুঃখে ঝুরে দু'নয়ন ।
কি জানি যদি না আসে শুনিয়া বারণ ॥ ৫৪ ॥

ভক্তচূড়ামণি শুনি শ্রীবাণী প্রভুর ।
অন্তরে পাইল বড় যাতনা প্রচুর ॥ ৫৫ ॥

কথায় না খুলে কথা ভাবে মনে মনে ।
কি দয়া কাঁদেন প্রভু আমার কারণে ॥ ৫৬ ॥

বিশেষিয়া প্রাণপণে কর্তব্য প্রয়াস ।
বিকাইয়া শ্রীচরণে হ'তে হবে দাস ॥ ৫৭ ॥

সে দিন হইতে ভক্ত শ্রীমনোমোহন ।
বুঝিলেন বিধিমতে কে তাঁর আপন ॥ ৫৮ ॥

পরম আত্মীয় প্রভু এই মনে করি ।
ছিঁড়িতে লাগিল মনে সংসারের ডুরি ॥ ৫৯ ॥



এ দিকে পাগলসম ভক্ত দত্ত রাম ।
কোথায় কিরূপে মিলে হরির সন্ধান ॥ ৬০ ॥

সকাতরে একদিন প্রভুদেবে কম ।
সাক্ষাতে হরির কবে পাব দরশন ॥ ৬১ ॥

দেখ মন ধরা নাহি দিলে কিবা ঘটে ।
জলে আছে জল খায় পিপাসা না মিটে ॥ ৬২ ॥

সাধের গলার হার জড়ান গলায় ।
ভ্রমে বুলে ভূমণ্ডল খুঁজিয়া না পায় ॥ ৬৩ ॥

প্রভুদেব দেখি ভক্তে কাতর অন্তর ।
করিলেন শান্তিভরা করুণ উত্তর ॥ ৬৪ ॥

বড় বড় মাছে পূর্ণ সরসীর তীরে ।
মেছুয়াল যদি শুধু মাছ মাছ করে ॥ ৬৫ ॥

উচাটন মন যেন পাগলের পারা ।
তাহে না কখন হয় পনামাছ ধরা ॥ ৬৬ ॥

পনামাছ ধরিবার বাসনা হইলে ।
বসিতে হইবে তীরে চার জলে ফেলে ॥ ৬৭ ॥

দিন দিন কিছু দিন জলে দিলে চার ।
তবে না হইবে তথা মাছের সঞ্চার ॥ ৬৮ ॥

চারেতে বসিলে মাছ টোপ নাহি খায় ।
চারের চৌদিকে গন্ধে বেড়িয়া বেড়ায় ॥ ৬৯ ॥

কভু দেয় ফুট কভু পাক দিয়া বুলে ।
তা দেখিয়া চারে মাছ বুঝে মেছুয়ালে ॥ ৭০ ॥

একদৃষ্টে একমনে থাকে নিরখিয়া ।
ক্রম করি বড় ছিপ দু' হাতে ধরিয়া ॥ ৭১ ॥

সৌরভী সুন্দর টোপ গাঁথিয়া কাঁটায় ।
তবে কিছু পরে তার পনামাছ খায় ॥ ৭২ ॥

সেইরূপ সাধুবাক্যে করিয়া বিশ্বাস ।
প্রাণে গেঁথে নাম-টোপ করহ প্রয়াস ॥ ৭৩ ॥

হৃদি ভরা ধৈর্য ল'য়ে ভক্তি-চার দিবে ।
তবে না বৃহৎ মাছ শ্রীহরি ধরিবে ॥ ৭৪ ॥

এত শুনি প্রভুবাক্যে রাম মহামতি ।
চৈতন্যচরিতামৃত পড়ে নিতি নিতি ॥ ৭৫ ॥

পাঠ-সাঙ্গে করে হরি-সংকীর্তন ।
সব কাজে সঙ্গে দাদা শ্রীমনোমোহন ॥ ৭৬ ॥

চৈতন্তচরিত পাঠে হয় এই ফল ।
রাম দেখে শ্রীচৈতন্য প্রভু অবিকল ॥ ৭৭ ॥

সেকালে আছিল শ্রীচৈতন্য নাম রাষ্ট্র ।
এই অবতারে নাম প্রভু রামকৃষ্ণ ॥ ৭৮ ॥

বস্তুতে লীলাতে ভেদ না পড়ে নয়নে ।
আকারে প্রভেদ মাত্র আর ভেদ নামে ॥ ৭৯ ॥

চৈতন্যের নামে দেখে প্রভুর মুরতি ।
বার্তা না বুঝিতে পারে দত্ত মহামতি ॥ ৮০ ॥



আর দিন রামচন্দ্র শ্রীমনোমোহনে ।
ডাকিলেন দ্বারদেশে তাঁহার ভবনে ॥ ৮১ ॥

প্রভু-দরশনে যেতে দক্ষিণশহর ।
শুন মন কিবা কথা হৈল অতঃপর ॥ ৮২ ॥

মিত্রের ঘরণী বড় বিরক্ত তাঁহায় ।
নন্দিনীর জ্বর পীড়া ফুটিয়াছে গায় ॥ ৮৩ ॥

পতিরে নিষেধ তাই করে বারে বারে ।
যাইতে না পাবে আজি দক্ষিণশহরে ॥ ৮৪ ॥

বড়ই লাগিল কথা মিত্রের পরানে ।
বেদনায় বারিধারা ঝরে দু'নয়নে ॥ ৮৫ ॥

বেগবতী বলব্তী এতই তখন ।
বাহিরিল রমণীর না শুনি বারণ ॥ ৮৬ ॥

বরষার জলে ভরা তটিনীর প্রায় ।
বাঁধ ভেড়ি ভেঙ্গে চলে রাখা নাহি যায় ॥ ৮৭ ॥

তেমতি চলিল মিত্র সঙ্গে ভাই রাম ।
গোটা পথ চক্ষে জল ঝরে অবিরাম ॥ ৮৮ ॥

একাকী আমার নয় কেবল সংসারে ।
পতির দুর্গতি অতি প্রতি ঘরে ঘরে ॥ ৮৯ ॥

অবিদ্যারূপিণী নারী ধর্মমারা রীতি ।
শুধু খুঁজে আত্মসুখ থাক যাক্ পতি ॥ ৯০ ॥

প্রকৃতি স্বভাবে জাতি পিশাচী সমান ।
পতির শোণিতপানে পিপাসা মিটান ॥ ৯১ ॥

নাম সহধর্মিণী এমন রমণীর ।
জানি না কি গুণে কেবা করিল বাহির ॥ ৯২ ॥

ভরি ভরি ফাঁকি খাদে কথার গড়ন ।
বিনা বনিয়াদে করে দেউল রচন ॥ ৯৩ ॥

ধর্মনাশী কর্মনাশী কুহকের জোরে ।
গরল-আদানে হৃদিরত্নধন হরে ॥ ৯৪ ॥

চিরকাল তরে করে দাসী ব'লে দাস ।
শাবাশ মোহিনী তোরে শাবাশ শাবাশ ॥ ৯৫ ॥

কায়াগত মায়াশক্তি এত বহে জোর ।
পুরুষ পশুর প্রায় কুহকে বিভোর ॥ ৯৬ ॥

প্রার্থনা তা কর নারী মনে যেন শখ ।
পতির না হবে হরি পথের কণ্টক ॥ ৯৭ ॥

দেহ শক্তি প্রভুদেব বিপদ-বারণ ।
রমণীর হাতে যেন না হয় মরণ ॥ ৯৮ ॥

উভরিয়া দুই জনে শ্রীপ্রভু যথায় ।
বিষণ্ণবদন ভাবি দেখিল তাঁহায় ॥ ৯৯ ॥

অবিরল অশ্রুজল বক্ষ বিগলিয়া ।
রক্তিম নয়নন্বয় কাঁদিয়া কাঁদিয়া ॥ ১০০ ॥

করজোড়ে জিজ্ঞাসিল শ্রীমনোমোহন ।
কেন দেখি হেন প্রভু বিষণ্ণবদন ॥ ১০১ ॥

উত্তরিলা প্রভুদেব শোকার্ত বচনে ।
আর বাছা হেতু-কথা জিজ্ঞাসিছ কেনে ॥ ১০২ ॥

হরি-তত্ত্ব-পিয়াসী ভকত এক জন ।
আমার নিকটে আসে কখন কেমন ॥ ১০৩ ॥

যথা তথা মোর কথা ল'য়ে মত্ত থাকে ।
সে কারণে রমণী তাঁহারে ঘরে বকে ॥ ১০৪ ॥

কহিতে দুঃখের কথা ফেটে যায় ছাতি ।
ধরাধামে ধরনের বড়ই দুর্গতি ॥ ১০৬ ॥

ধর্মপথে পতি গেলে পত্নী দেয় হানা ।
অপরের কিবা দোষ যদি করে মানা ॥ ১০৭ ॥

পাছে বাছা রমণীর শুনে নিবারণ ।
তাই মনোবেদনার ঝুরে দু'নয়ন ॥ ১০৮ ॥

স্মরিরা প্রভুর মুর্তি দেখহ বুঝিয়া ।
কি করিলা প্রভুদেব আপনি কাঁদিয়া ॥ ১০৯ ॥

ধুয়াইলা একেবারে নয়নের জ্বলে ।
তত্ত্বের সংসারাসক্তি কূট হলাহলে ॥ ১১০ ॥

ভকত জীবন প্রভু ভক্তপ্রীতে প্রিয় ।
আত্মীয় অপেক্ষা তিনি পরম আত্মীয় ॥ ১১১ ॥

অকৃত্রিম স্নেহ বুঝে শ্রীমনোমোহন ।
ধরায় যদ্যপি কেহ আছয়ে আপন ॥ ১১২ ॥

মুখপানে চান যার মুখপানে চাই ।
ঠাকুর কেবল একা অন্য কেহ নাই ॥ ১১৩ ॥



চৈতন্য-চরিত-পাঠকালে ভক্ত রাম ।
শ্রীচৈতন্য প্রভুদেবে কৈলা অনুমান ॥ ১১৪ ॥

শুন মন অনুমান কিলের কারণ ।
বিশ্বাস গুলিয়া দেয় সন্দেহ পবন ॥ ১১৫ ॥

আন্দোলন মনে কথা হয় নিরন্তর ।
ভক্ত-ভগবানে গেলা বড়ই সুন্দর ॥ ১১৬ ॥

একদিন রামচন্দ্র দক্ষিণশহরে ।
তাঁরে বলিলেন প্রভু নাহি যাবে ঘরে ॥ ১১৭ ॥

আমার মন্দিরে রাতি করহ যাপন ।
ভক্তের পরমানন্দ শুনি শ্রীবচন ॥ ১১৮ ॥

দিনান্তে আইল সন্ধ্যা অন্ধকার সাজে ।
পুরীমধ্যে আরতির শাঁক ঘণ্টা বাজে ॥ ১১৯ ॥

আপন মন্দিরে হেথা প্রভু ভগবান ।
উপবিষ্ট একধারে ভক্তবর রাম ॥ ১২০ ॥

প্রভুর প্রশান্ত কায়া সুঠাম সুন্দর ।
একদৃষ্টে নিরীক্ষণ করে ভক্তবর ॥ ১২১ ॥

কিছু পরে বলিলেন শ্রীপ্রভু তাঁহারে ।
কিবা দেখিতেছ রাম এত লক্ষ্য ক'রে ॥ ১২২ ॥

দেখিতেছি আপনারে, রামের উত্তর ।
সুঠাম মোহন-যুতি পরম সুন্দর ॥ ১২৩ ॥

পুনশ্চ দ্বিতীয় প্রশ্ন হয় পরক্ষণে ।
আমারে দেখিয়া তুমি বুঝ কিবা মনে ॥ ১২৪ ॥

রাম বলিলেন প্রভু চৈতন্য আপনি ।
প্রভু বলিলেন হেন বলিত ব্রাহ্মণী ॥ ১২৫ ॥

শ্রীবাণী শুনিয়া রাম সে দিন হইতে ।
শ্রীপ্রভুর প্রতিরূপ পাইলা দেখিতে ॥ ১২৬ ॥

প্রতিরূপ কি প্রকার কিরূপ বুঝিলে ।
চাঁদ যেন সরসীর তরঙ্গিত জলে ॥ ১২৭ ॥

দেখি দেখি ধরি ধরি দেখা ধরা যায় ।
দিনরাতি যায় যেখা ধরার আশায় ॥ ১২৮ ॥

যাবতীয় আছে প্রাণী সৃষ্টির ভিতর ।
সকলে সমান চক্ষে দেখেন ঈশ্বর ॥ ১২৯ ॥

যদিও প্রাণীর মধ্যে ভক্তগণ তাঁর ।
তবু নহে প্রাণী তাঁরা স্বতন্ত্র প্রকার ॥ ১৩০ ॥

সমভাবে সকলেই সৃজিত পালিত ।
জীয়ন্তে ঘুমন্ত প্রাণী ভক্ত জাগরিত ॥ ১৩১ ॥

বিশেষ বুঝিতে সাধ যদি থাকে মন ।
ভাগবতলীলাগ্রন্থ করহ শ্রবণ ॥ ১৩২ ॥

ভক্তসঙ্গে খেলা তাঁর বড়ই মধুর ।
স-মনে শুনিলে হয় তম-ঘুম দূর ॥ ১৩৩ ॥

আগে ছিল যেই রাম এবে তাই ঠিক ।
প্রভেদ নাস্তিক আগে এখন আস্তিক ॥ ১৩৪ ॥

আস্তিকের মধ্যে দেখ আছে দু'প্রকার ।
কেহ কেহ নিরাকার কেহ বা সাকার ॥ ১৩৫ ॥

রামের সাকার ভাব এতই প্রবল ।
দিবাবিভাবরী হরি ধরিতে পাগল ॥ ১৩৬ ॥

হরিও তেমতি ধরা না দেন পাগলে ।
লুকান জলের মধ্যে ফুট দিয়া জলে ॥ ১৩৭ ॥

চারেতে প্রত্যক্ষ মাছ দেখে ভক্ত রাম ।
কিন্তু কোনমতে নাহি পুরে মনস্কাম ॥ ১৩৮ ॥

শুন মন একমনে মধ্যে কি ব্যাপার ।
গুরুস্থানে দীক্ষা বাকি অদ্যাপিহ তাঁর ॥ ১৩৯ ॥

রামের প্রতিক্ষা দীক্ষা নহে কার ঠাঁই ।
লইব যদ্যপি দেন আপনি গোসাঁই ॥ ১৪০ ॥

প্রভুর না ছিল রীতি দীক্ষা দিতে কারে ।
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু পড়িলেন ফেরে ॥ ১৪১ ॥

ভক্তের বাসনা যেন পুরাইতে তাই ।
আপন আইনে বন্ধ আপনি গোসাঁই ॥ ১৪২ ॥

দুকূল বজায় বিধি ভাবি নিজ মনে ।
ভক্ত রামে দীক্ষা দিলা স্বপনে স্বপনে ॥ ১৪৩ ॥

আনন্দের ওর নাই ভক্ত-চূড়ামণি ।
প্রভুরে বিদিত কৈল স্বপন-কাহিনী ॥ ১৪৪ ॥

বলিলেন রামে তব ভাগ্যসীমা নাই ।
স্বপ্নসিদ্ধ যেই জন মুক্তি তার ঠাঁই ॥ ১৪৫ ॥

নিতি নিতি যথাকালে আদেশানুসারে ।
স্বপ্নে প্রাপ্ত মন্ত্র রামচন্দ্র জপ করে ॥ ১৪৬ ॥

প্রভুর প্রকটকাল বসন্তের প্রায় ।
ভক্তি লোভে ভক্ত-অলি গুঞ্জরিয়া ধায় ॥ ১৪৭ ॥

ঝাঁকে ঝাঁকে চারিদিকে সৌরভ পাইয়া ।
শ্রীসুরেন্দ্র মিত্র এক জুটিল আসিয়া ॥ ১৪৮ ॥

জাতিতে কায়স্থ তেঁহ গোউর বরন ।
বয়সে ত্রিদশ বর্ষ কিংবা কিছু কম ॥ ১৪৯ ॥

বিশেষ সঙ্গতিপন্ন মুচ্ছুদ্দী অফিসে ।
তিন-চারি শত টাকা আয় মাসে মাসে ॥ ১৫০ ॥

মহাবলীয়ান তিনি বীরের আকৃতি ।
সুরাপানে সুরেন্দ্রের বড়ই পিরীতি ॥ ১৫১ ॥

সহজে প্রতীয়মান চেহারা দেখিলে ।
মুর্তিমতী সরলতা যেন তার খেলে ॥ ১৫২ ॥

বাহ্যেতে কর্কশ কিছু, হৃদয় কোমল ।
মদমত্ত মাতঙ্গের মত মনে বল ॥ ১৫৩ ॥

ধর্মপথে মতিহীন অপক্ক বয়েস ।
সাধুভক্তে নাই এবে ভক্তিমাত্র লেশ ॥ ১৫৪ ॥

কালের ধরন যেন সেইরূপ ধারা ।
তথাপি অহিন্দু-জ্ঞানে নাহি যেত ধরা ॥ ১৫৫ ॥

প্রভু-ভক্ত তাঁর কোন পরিচিত জন ।
প্রসঙ্গে প্রভুর কথা কৈল উত্থাপন ॥ ১৫৬ ॥

শুনিয়া পরমহংস শ্রীপ্রভুর নাম ।
শ্রীসুরেন্দ্র উপহাস করিয়া উড়ান ॥ ১৫৭ ॥

বন্ধু তার বার বার করিয়া মিনতি ।
বলিলেন একবার দেখিতে কি ক্ষতি ॥ ১৫৮ ॥

গেল ত জীবন গোটা বিবিধ খেয়ালে ।
তাহাতে না হয় আর এক দিন দিলে ॥ ১৫৯ ॥

নানা মতে বুঝাইয়া করিল সম্মত ।
যাইবার দিন বন্ধু করে নির্ধারিত ॥ ১৬০ ॥

সুরেন্দ্রের এ সময় অবস্থা কেমন ।
বিশেষিয়া বিবরিয়া বলি শুন মন ॥ ১৬১ ॥

প্রজ্বলিত মর্মান্তিক যাতনা অন্তরে ।
তাহার কারণ কিছু নারি কহিবারে ॥ ১৬২ ॥

জঠর-অনল-পাশে জীবের জনম ।
প্রাণান্তেও তাপের না থাকে কিছু কম ॥ ১৬৩ ॥

তার মধ্যে ছোট বড় রহে তুলনায় ।
সুরেন্দ্রের বড় দুঃখ প্রাণ যায় যায় ॥ ১৬৪ ॥

যাতনা হইতে পরিত্রাণের কারণ ।
বিষপানে প্রাণ নষ্ট করিয়াছে পণ ॥ ১৬৫ ॥

আয়োজন নানাবিধ ভিতরে ভিতরে ।
কেহ নাহি জানে কুড়ি কুড়ি লোক ঘরে ॥ ১৬৬ ॥

মরণ একান্ত পণ যায় যায় প্রাণ ।
এমন সময় হৈল শ্রীপ্রভুব টান ॥ ১৬৭ ॥



নির্ধারিত দিনে হেথা সঙ্গে বন্ধুবর ।
সুরেন্দ্র গমন করে দক্ষিণশহর ॥ ১৬৮ ॥

সাধুভক্তে ভক্তিহীন পথে করে মনে ।
ভূড়ি মেরে উড়াইবে প্রভু ভগবানে ॥ ১৬৯ ॥

উত্তরিল শুভক্ষণে নির্ভীক অন্তর ।
কল্পতরু বিশ্বগুরু প্রভুর গোচর ॥ ১৭০ ॥

প্রভুরে প্রণাম নাই বসিলেন গিয়া ।
শ্রীমন্দিরে একধারে বুক ফুলাইয়া ॥ ১৭১ ॥

ঈষৎ আবেশ অঙ্গে প্রভু নারায়ণ ।
নানাবিধ ঈশ্বরীয় ভক্তি-কথা কন ॥ ১৭২ ॥

মোহন মুরতি দেখি উক্তি শুনি তাঁর ।
ঘুরে গেল সুরেন্দ্রর মন আগেকার ॥ ১৭৩ ॥

আস্ফালনে উচ্চারণে শক্তি নাহি ঘটে ।
মন্ত্রমুগ্ধসর্প সম নিশ্চল নিকটে ॥ ১৭৪ ॥

সঠিকের ন্যায় জাদু জাদুকর খেলে ।
যে না দেখিয়াছে জাদু সে যেমন বলে ॥ ১৭৫ ॥

সকল ধরিয়া দিব জাদুর কৌশল ।
কিন্তু দেখে হয় যেন হারা বুদ্ধিবল ॥ ১৭৬ ॥

তেমতি সুরেন্দ্রচন্দ্র বিমুগ্ধ এখন ।
পুতুলের সম নাই বদনে বচন ॥ ১৭৭ ॥

সর্বঘটবার্তাবিৎ প্রভু পরমেশ ।
ক্রমশঃ কহেন কত উক্তি উপদেশ ॥ ১৭৮ ॥

এক উক্তি সুরেন্দ্রের বড় প্রাণে লাগে ।
জীবনের গোটা স্রোত ফিরে সেই দিকে ॥ ১৭৯ ॥

কিবা উপদেশ ফল কি ফলিল তায় ।
বুঝিলে চৈতন্য খেলে পাষাণের গায় ॥ ১৮০ ॥

এ তো ভক্ত আপনার হৃদয় উর্বরা ।
লীলার আসরে আছে শক্তি বন্ধ করা ॥ ১৮১ ॥

প্রশ্ন নাই কন প্রভু আপনার মনে ।
মানুষে বিড়াল ছানা নাহি হয় কেনে ॥ ১৮২ ॥

বিড়াল-শাবকে কিবা স্বভাব সুন্দর ।
মায়ের উপরে করে সম্পূর্ণ নির্ভর ॥ ১৮৩ ॥

ভালমন্দ স্থানাস্থান বিচারবিহীনে ।
সেখানে সে থাকে তার মা রাখে যেখানে ॥ ১৮৪ ॥

কিন্তু দেখি সকলের স্বেচ্ছাচার রীতি ।
বানর-শাবক সম স্বভাব প্রকৃতি ॥ ১৮৫ ॥

বানর-শাবকে রহে রীতি স্বতন্তর ।
সর্বদা স্বাধীন ভাব মায়ে নাই ভর ॥ ১৮৬ ॥

বড়ই পশিল উক্তি সুরেন্দ্রের প্রাণে ।
মা রাখে যেথার আমি রব সেইখানে ॥ ১৮৭ ॥

কেন বিষপানে প্রাণ দিব বিসর্জন ।
দেখি না মায়ের কাণ্ড রাখে কি রকম ॥ ১৮৮ ॥

অবসান সেই দিন সন্ধ্যাপ্রায় হয় ।
শহরে ফিরিতে হবে সুদূর আলয় ॥ ১৮৯ ॥

বন্ধুসহ শ্রীসুরেন্দ্র বিদায়ের কালে ।
পদধূলি ল'য়ে লুটে প্রভু-পদতলে ॥ ১৯০ ॥

পুনরায় এস বলি প্রভুদেব রায় ।
সেই দিনে দুইজনে দিলেন বিদায় ॥ ১৯১ ॥



বন্ধুসহ ঘরে গেল সুরেন্দ্র এখন ।
কিন্তু শ্রীপ্রভুর কাছে পাছু আছে মন ॥ ১৯২ ॥

আগাগোড়া দেখিতেছি শ্রীপ্রভুর রীতি ।
ভক্তমন চুরি করা স্বভাব প্রকৃতি ॥ ১৯৩ ॥

সুস্থির সুরেন্দ্র নয় কহে বন্ধুবরে ।
সত্বর যাইতে হবে দক্ষিণশহরে ॥ ১৯৪ ॥

প্রভুর প্রসঙ্গে মত্ত রহে নিরন্তর ।
শ্রীপ্রভু অন্তরযামী কহে বন্ধুবর ॥ ১৯৫ ॥

সকল বিদিত তাঁর যে যা ভাবে বলে ।
বাসনা যেমন যায় ঠিক তাই ফলে ॥ ১৯৬ ॥

পরীক্ষা করিয়া তত্ত্ব বুঝিবার তরে ।
প্রভুরে সুরেন্দ্র স্মরে আপনার ঘরে ॥ ১৯৭ ॥

কিছুক্ষণ পরে তিনি দেখিবারে পান ।
ভবনে হাজির তাঁর প্রভু ভগবান ॥ ১৯৮ ॥

এইরূপে তিনবার পরীক্ষার পর ।
সুরেন্দ্রের প্রভুপদে পড়িল নির্ভর ॥ ১৯৯ ॥

এখন তখন যান দক্ষিণশহরে ।
না দেখিয়া প্রভুদেবে থাকিতে না পারে ॥ ২০০ ॥

ক্রমে ক্রমে ভক্তবর গেল বড় মজে ।
সুধাভরা শ্রীপ্রভুর চরণপঙ্কজে ॥ ২০১ ॥

গেল পূর্বতন ভাব এখন উন্নতি ।
নিত্য পুজে ইষ্টদেবী কালীর মুরতি ॥ ২০২ ॥

মার নামে হৃদি ভরে ভক্তিভরে কাঁদে ।
পাইয়া পরম বস্তু প্রভুর প্রসাদে ॥ ২০৩ ॥

জন্ম জন্ম মাথা দিয়া করিলে ভজন ।
যেই মহাগোপ্য ভক্তি না হয় অর্জন ॥ ২০৪ ॥

দুই দিন এলে গেলে প্রভুর গোচর ।
তাই যেন প্রভুদেব না হন কাতর ॥ ২০৫ ॥

যারে যেন তিনি তাঁর আপনার জন ।
যেখানে সেখানে নহে ভক্তি-বিতরণ ॥ ২০৬ ॥

অগণন লোক যায় প্রভুর নিকটে ।
সকলের ভাগ্যে এই ভক্তি নাহি ঘটে ॥ ২০৭ ॥

যত্ন সহকারে মন রাখিবে স্মরণ ।
এই লীলা শ্রীপ্রভুর ভক্ত-সংজোটন ॥ ২০৮ ॥

শুনিয়াছি নিজে কানে কহিতে প্রভুরে ।
আমড়া নিকৃষ্ট জাতি ফলের ভিতরে ॥ ২০৯ ॥

সুমিষ্ট ফজলি আমে পরিণত তায় ।
তখনি অমনি হয় শ্যামার ইচ্ছায় ॥ ২১০ ॥

কিন্তু তাহে মায়ের কি আছে প্রয়োজন ।
ফজলি আমের কত রয়েছে কানন ॥ ২১১ ॥

বুঝ মন চিরকাল যে পায় সে পায় ।
নাম লেখা আছে তার প্রভুর খাতায় ॥ ২১২ ॥

সুরাসুর মধ্যে যেন দৃষ্টান্তের স্থল ।
সুরে সুধা অসুরে পাইল হলাহল ॥ ২১৩ ॥

জগাই মাধাই যথা চৈতন্যাবতারে ।
মহাপাপী দুই ভাই বিদিত সংসারে ॥ ২১৪ ॥

পাপিজ্ঞানে দুই জনে জানে যেই জন ।
সে জানে না সে বুঝে না চৈত্যচরণ ॥ ২১৫ ॥

লীলা দেখা আঁখি উন্মীলিত নহে এবে ।
দেখিয়াছে ভেসে নাহি দেখিয়াছে ডুবে ॥ ২১৬ ॥

জন্ম জন্ম প্রিয়ভক্ত ভাই দুইজন ।
জগাই-মাধাইরূপে এবারে জনম ॥ ২১৭ ॥

গোউর-নিতাই যেন, তাঁরা যেন তাঁরা ।
জগাই-মাধাই দুই ভক্তিপ্রেমে ভরা ॥ ২১৮ ॥

পাপাচার কিছুকাল লীলার আসরে ।
কাল যেন সেইমত জীব-শিক্ষা তরে ॥ ২১৯ ॥

ভকতে গোপনে হেন রাখে ভগবান ।
মায়া-অন্ধ জীবে দিতে শিক্ষার বিধান ॥ ২২০ ॥

ভক্ত বিনা অপরের সঙ্গে নহে খেলা ।
বড় সূক্ষ্ম নরলীলা নাহি যায় বলা ॥ ২২১ ॥

সম জাতি সঙ্গে মিল স্বভাবের রীতি ।
ভক্তি পেয়ে ভক্ত হয় ঈশ্বরের জাতি ॥ ২২২ ॥

ভাবাবেশে বলিতেন প্রভু নারায়ণ ।
ধরিলে ধরাই তারে নিজের বরন ॥ ২২৩ ॥

কাঁচপোকা ঠিক তার স্থল উপমার ।
ধরে যবে আরশলা বৃহত্তরাকার ॥ ২২৪ ॥

শিখিকণ্ঠ সম বর্ণ যে কাঁচের গায় ।
সেই বর্ণ আপনার ধৃতেরে ফলায় ॥ ২২৫ ॥

শাখা-প্রশাখাদি পত্র বৃক্ষের যেমন ।
ঈশ্বরের সম্বন্ধে তেমন ভক্তগণ ॥ ২২৬ ॥

যদি সবে নহে লগ্ন উপরে উপরে ।
হৃদয়ে সংযোগ আছে ভক্তিবহ তারে ॥ ২২৭ ॥

ভক্তি আছে যাঁর তিনি ঈশ্বরের জন ।
ঈশ্বরের যেবা তাঁর আছে ভক্তিধন ॥ ২২৮ ॥

ভক্তি যেথা তথা তাঁর চিরকাল বাস ।
কখন সুগুপ্তভাবে কখন প্রকাশ ॥ ২২৯ ॥

সেখানে নাহিক ভক্তি প্রভু যেথা বাঁকা ।
হৃদয়নিলয় শূন্য শূন্য সম ফাঁকা ॥ ২৩০ ॥

পুণ্যমূল ক্রিয়া-কর্ম-তপ-জপাচার ।
তাহাতেও হয় এক ভক্তির সঞ্চার ॥ ২৩১ ॥

সে ভক্তি বৈধেয় ভক্তি ভক্তি কহা যায় ।
স্বভাব স্বতন্ত্র নহে এ ভক্তির ন্যায় ॥ ২৩২ ॥

সাধারণ নাম ভক্তি ভক্তি ভিন্ন ভিন্ন ।
উভয় মিছরি শুড় মিষ্টিমধ্যে গণ্য ॥ ২৩৩ ॥

এ ভক্তি ভক্তের ভক্তি শুদ্ধা ভক্তি নাম ।
আগে হাতে শেষে তিনে এক পরিণাম ॥ ২৩৪ ॥

বিবিধ বিধানে নাই বিধি ছাড়া রীতি ।
কর্ম নহে শ্রীপ্রভুর চরণ-প্রসূতি ॥ ২৩৫ ॥

চাতকের প্রাপ্য যেন ফটিকের জল ।
শুদ্ধা ভক্তি পায় আত্মজনেরা কেবল ॥ ২৩৬ ॥

শ্রীপ্রভুর আত্মগণে ভক্ত বলা দায় ।
বলি কেন অল্প কথা নাহিক ভাষায় ॥ ২৩৭ ॥

আত্মগণে ভক্তে বহে প্রভেদ বিস্তর ।
যেমন নিকট আর অনেক অন্তর ॥ ২৩৮ ॥

কৃষ্ণ মূল গোপ গোপী অঙ্গ অবয়ব ।
আত্মগণ ব্রজবাসী ভকত উদ্ধব ॥ ২৩৯ ॥



এখানে সুরেন্দ্রচন্দ্রে আত্মগণ কই ।
যে আর থাকিতে নারে প্রভুদেব বই ॥ ২৪০ ॥

দরশনে লুব্ধ মন থাকে নিরন্তর ।
কখন প্রবল যেন দ্রুতগতি ঝড় ॥ ২৪১ ॥

আফিসে মুচ্ছুদ্দিগিরি কর্ম ছিল তাঁর ।
যাবতীয় তথ্য পরিদর্শনের ভার ॥ ২৪২ ॥

খাটেন আগোটা দিন একটানা মনে ।
তবু না ফুরার কাজ সিন্ধু-পরিমাণে ॥ ২৪৩ ॥

এখন কাজেতে নাই একটানা মন ।
মাঝে মাঝে শ্রীপ্রভুর হয় আকর্ষণ ॥ ২৪৪ ॥

স্মৃতিপথে মুরতি আইনে ক্ষণে ক্ষণে ।
সুস্থির থাকিতে নারে কাজের আসনে ॥ ২৪৫ ॥

একদিন শ্রীপ্রভুর দরশন লেগে ।
বড়ই চঞ্চল চিত্ত হইল আবেগে ॥ ২৪৬ ॥

আফিসে যে দিন কাজ গুরুতর হাতে ।
কি করেন রক্ষা নাই হইল যাইতে ॥ ২৪৭ ॥

কর্মদক্ষ হাত কর্মে হইল অচল ।
দরশনে ব্যাকুলতা এতই প্রবল ॥ ২৪৮ ॥

যা হবার হবে কর্ম করি পরিহার ।
দক্ষিণশহরমুখে হয় আগুসার ॥ ২৪৯ ॥

শ্রীমন্দিরে যাবা মাত্র দেখিবারে পান ।
কলিকাতা আসিতে সসজ্জ ভগবান ॥ ২৫০ ॥

বলিলেন ভাগ্যবান ভক্তে সম্বোধিয়া ।
যেতেছিনু কলিকাতা তোমার লাগিয়া ॥ ২৫১ ॥

প্রাতে হ'তে দেখিতে তোসার বড় সাধ ।
ভাল ভাল আসিয়াছ হইল আহ্লাদ ॥ ২৫২ ॥

সুধাংশুবদন ফুল্ল আনন্দের তরে ।
কররূপে অপার করুণারাজি ক্ষরে ॥ ২৫৩ ॥

বিশুদ্ধ প্রেমের বর্ণ মাখামাখি তার ।
ঝলকে ঝলকে ফুটে বদন-রেখায় ॥ ২৫৪ ॥

প্রেমে গলা প্রভু-মূর্তি এমন তরল ।
ঢল ঢল যেইমত কিরণের জল ॥ ২৫৫ ॥

ভকত-চকোর-জাতি চিত্ত মনোহর ।
মনোমোহনিয়া ঠাম পরম সুন্দর ॥ ২৫৬ ॥

বিভোরে সুরেন্দ্র দেখে মহাভাগ্যবান ।
প্রভু কি রূপের ছবি রূপের নিধান ॥ ২৫৭ ॥

ধন্য শ্রীসুরেন্দ্রচন্দ্র অন্তরঙ্গ জন ।
টল টল যাঁর ডাকে প্রভুর আসন ॥ ২৫৮ ॥

পদরজ দিয়া মোরে কর ক্ষমবান ।
মনেরে শুনাব রামকৃষ্ণ লীলাগান ॥ ২৫৯ ॥

অপার করুণাবলে সুরেন্দ্র এখন ।
পূজ্যতম প্রভুদেবে করে নিবেদন ॥ ২৬০ ॥

সুমিষ্ট বিনয়বাক্যে করজোড় করি ।
আপনারে যেতে হবে আমাদের বাড়ি ॥ ২৬১ ॥

গাড়ির মধ্যেতে লৈয়া ভব-কর্ণধার ।
চলিল সুরেন্দ্রচন্দ্র ঘরে আপনার ॥ ২৬২ ॥

বুঝ মন শ্রীসুরেন্দ্র বটে কোন ঘন ।
যাঁর প্রতি এত তুষ্ট প্রভু নারায়ণ ॥ ২৬৩ ॥

যদি সুরাপারী তবু ভক্তশিরোমনি ।
মিলিলে চরণ রেণু মহাভাগ্য গণি ॥ ২৬৪ ॥



শুন মন এক কথা কই এইখানে ।
প্রভু কি অভাপি তাঁরে সুরেন্দ্র না চিনে ॥ ২৬৫ ॥

যদি বল কি কারণে মজিয়াছে মন ।
চিরসঙ্গ অন্তরঙ্গ ভক্তের লক্ষণ ॥ ২৬৬ ॥

থাক বা না থাক ফল ফলে নাই আশা ।
গাছে থাকে বিহঙ্গম যাহে তার বাসা ॥ ২৬৭ ॥

শ্রীপ্রভুর সাঙ্গোপাঙ্গ পারিষদগণ ।
তাঁদের কখন নাই সাধন ভজন ॥ ২৬৮ ॥

বিধি কি অবিধি সত্যাসত্য পাপপুণ্য ।
হাসিয়া উড়ায় কভু নাহি করে গণ্য ॥ ২৬৯ ॥

ইচ্ছামত করে কর্ম বিচার না করি ।
ষোল আনা জানে ঘাটে বাঁধা আছে তরী ॥ ২৭০ ॥

সেই হেতু আত্মগণে বুঝা মহাভার ।
সাধারণ জন সম নরের আকার ॥ ২৭১ ॥

অন্য দিকে কই কথা শুন শুন মন ।
লোক ছাড়া লোক তারা সাঙ্গোপাঙ্গগণ ॥ ২৭২ ॥

মহাবীর বলীয়ান ধরা-জোড়া ছাতি ।
শ্রীপ্রভু হৃদয়রথে যাদের সারথি ॥ ২৭৩ ॥

তালে তালে নাচে তারা বেতালা না হয় ।
শ্রীহস্তে সংলগ্ন মুখরজ্জুসমুদয় ॥ ২৭৪ ॥

সতত রয়েছে টানা শ্রীপ্রভুর করে ।
পড়ি পড়ি করে কিন্তু পড়িয়া না পড়ে ॥ ২৭৫ ॥

শ্রীপ্রভুর কথিত উপমা শুন মন ।
পাড়াগেঁয়ে এক গ্রামে ব্রাহ্মণভোজন ॥ ২৭৬ ॥

গ্রামান্তরে নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণসকলে ।
যার লম্বা মাঠ পার সঙ্গে শিশু ছেলে ॥ ২৭৭ ॥

মাঠের আইল-পথ কাদা জলে ডুবা ।
শিশুর ধরিয়া হাত রক্ষা করে বাবা ॥ ২৭৮ ॥

সাবধানে যায় পিতা গায়ে আছে বল ।
কখন না পড়ে যদি অঙ্গ টল টল ॥ ২৭৯ ॥

বিটল অনেক ছেলে উপদ্রবী ধাত ।
তাহারা নিজেরা ধরে জনকের হাত ॥ ২৮০ ॥

বিষম পিছল পথ অল্প শক্তি গায় ।
দুটি পা না যেতে যেতে ছুঁয়ে পড়ে যায় ॥ ২৮১ ॥

বালকে ধরিলে পড়ে হয় এ রকম ।
বাপ যারে ধরে তার নাহিক পতন ॥ ২৮২ ॥

কুপণ সুপণ যাহা কর অনুমান ।
সর্ব ঠাঁই হাতে ধ'রে থাকে ভগবান ॥ ২৮৩ ॥

যাহার আশ্রয় তিনি তার কিবা ভয় ।
শুন মন ভক্ত-সংজোটন-পরিচয় ॥ ২৮৪ ॥



সাধুত্তম সাধুশ্রেষ্ঠ সুরেন্দ্র এবারে ।
সুরাপানাভ্যাস কিন্তু আদতে না ছাড়ে ॥ ২৮৫ ॥

শুন তাঁর সুরা-পান করিবার ধারা ।
পানমত্ততায় পায় বীরের চেহারা ॥ ২৮৬ ॥

মত্ততা প্রযুক্ত বল মনে গিরা ঝরে ।
কোথা শ্যামা মা মা বলি কাঁদে উচ্চৈঃস্বরে ॥ ২৮৭ ॥

বহিয়া সুন্দর গণ্ড পড়ে আঁখিনীর ।
শুনিলে পাষাণে জল তরলে বাহির ॥ ২৮৮ ॥

মত্ততার বেগ আগে কামিনী-কাঞ্চনে ।
এখন ফিরিল শ্যামা-মায়ের চরণে ॥ ২৮৯ ॥

হেন সুরাপানে দোষ বুঝি না কি ঘটে ।
নিন্দা অপবাদ মাত্র লোকাচারে রটে ॥ ২৯০ ॥

বন্ধু তার বার বার নানা জেদ করে ।
সুরাপান মহাদোষ পরিহার তরে ॥ ২৯১ ॥

এবে আর দেয় কান কে কার কথায় ।
অভ্যাস রয়েছে ঠিক স্বভাবের প্রায় ॥ ২৯২ ॥

একদিন মহাষ্টমী তরী-আরোহণে ।
সবান্ধবে আগমন প্রভু-দরশনে ॥ ২৯৩ ॥

যাইতে যাইতে পথিমধ্যে বন্ধু কয় ।
আর এই সুরাপান উচিত না হয় ॥ ২৯৪ ॥

স্বাস্থ্যের সম্বন্ধে ইহা অতি বিঘ্নকারী ।
সুরেন্দ্র বলেন সুরা ছাড়িতে না পারি ॥ ২৯৫ ॥

অকারণ কেন জেব কর বারে বারে ।
আমি নাহি খাই সুরা খেয়েছে আমারে ॥ ২৯৬ ॥

তবে এক সত্য কথা বলি তব ঠাঁই ।
তুমি না ভুলিবে কথা স্বেচ্ছায় গোসাঁই ॥ ২৯৭ ॥

আপনি বলেন যদি এমন বচন ।
অবশ্য ছাড়িব সুরা করিলাম পণ ॥ ২৯৮ ॥

সুরার প্রসঙ্গ তব উক্তিযোগ্য নয় ।
বারে বারে শ্রীসুরেন্দ্র বন্ধুবরে কয় ॥ ২৯৯ ॥

এত শুনি বন্ধুবর মনে মনে ভাবে ।
প্রভু যদি নাহি কন তবে কিবা হবে ॥ ৩০০ ॥

সর্বঘটবার্তাবিৎ শ্রীপ্রভু আপনি ।
বিধিমত পাকা জ্ঞানে আনিতেন তিনি ॥ ৩০১ ॥

একমনে ঘনে ঘনে প্রভুরে স্মরণ ।
করিতে লাগিল বন্ধু বন্ধুর কারণ ॥ ৩০২ ॥

এ হেন সুহৃদ বন্ধু কে পায় কাহাকে ।
বন্ধুর মঙ্গল আশে দীনবন্ধু ডাকে ॥ ৩০৩ ॥

পরম আত্মীয় ধরে বন্ধুর খিয়াতি ।
সম্পদের সহচর বিপদের সাথী ॥ ৩০৪ ॥

মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষা চিন্তা করে পলে পলে ।
যথাঘাটে তরণী লাগিল হেনকালে ॥ ৩০৫ ॥

প্রভুপদ বন্দিবারে শ্রীমন্দিরে যায় ।
শূন্য শ্রীমন্দির প্রভু নাহিক তথায় ॥ ৩০৬ ॥

শ্রীপ্রভুর মন্দিরের উত্তর অঞ্চলে ।
দেখিতে পাইল তাঁয় বকুলের তলে ॥ ৩০৭ ॥

প্রণতি করিয়া দোঁহে শ্রীপদে লুটায় ।
শ্রীঅঙ্গেতে ভাবাবেশ বাহ্য নাহি তায় ॥ ৩০৮ ॥

ভুবনে ব্যাপেছে মন অঙ্গগোটা স্থির ।
বদনে বিকাশে ভাব প্রশান্ত গম্ভীর ॥ ৩০৯ ॥

যেন দেখিছেন একমনে নিরখিয়া ।
জগতে যাবৎ জীব সকলের ক্রিয়া ॥ ৩১০ ॥

শ্রীঅঙ্গে আসিলে মন কিছুক্ষণ পরে ।
নেশায় বিভোর যেন ফিরিলা মন্দিরে ॥ ৩১১ ॥

অতি ধীর মন্দ মন্দ চরণ-চালনে ।
ছায়াবৎ পাছু যায় বন্ধু দুইজনে ॥ ৩১২ ॥

আপন আসনে বসি খাটের উপর ।
বাক্যগুলি বিজড়িত কাটা কাটা স্বর ॥ ৩১৩ ॥

আপনে আপন মনে কন ভগবান ।
ইহা অতি অকর্তব্য ইচ্ছামত পান ॥ ৩১৪ ॥

সাধনা-বিধিতে হেন আছয়ে নিয়ম ।
কিঞ্চিৎ খাইতে হয় কারণ-কারণ ॥ ৩১৫ ॥

কুলকুণ্ডলিনী তাঁরে দিবে অল্পমত ।
না টলিবে পদ নহে মন বিচলিত ॥ ৩১৬ ॥

কারণ-স্বরূপ পানে যে আনন্দ হয় ।
তাহাকে কারণানন্দ শাস্ত্রে হেন কয় ॥ ৩১৭ ॥

কারণ-আনন্দে উঠে ভজন আনন্দ ।
নীরবে দাঁড়ায়ে কথা শুনেন সুরেন্দ্র ॥ ৩১৮ ॥

সে দিন হইতে তেঁহ বুঝিল নিশ্চিত ।
জগতে যাবৎ সব শ্রীপ্রভু বিদিত ॥ ৩১৯ ॥

সকল জানেন প্রভু জগৎ-গোসাঁই ।
কাছে তাঁর লুকাবার কোন কিছু নাই ॥ ৩২০ ॥

প্রভু-অবতারে তাঁর যত ভক্ত জানি ।
সুরেন্দ্র তাঁদের মধ্যে সমুজ্জ্বল মণি ॥ ৩২১ ॥ 



এখানেতে দত্ত রাম নিরন্তর ঘুরে ।
প্রভুদত্ত মন্ত্র-ফাঁদে হরি ধরিবারে ॥ ৩২২ ॥

যতই করেন আশা ততই বিফল ।
বিফলানুসারে হৃদে অশান্তি প্রবল ॥ ৩২৩ ॥

অশনে শয়নে সুখ কিছু আর নাই ।
ভাবে কবে কিসে হরি-দরশন পাই ॥ ৩২৪ ॥

বড়ই ব্যাকুল প্রাণ এক দিন রাম ।
জনৈক বন্ধুর সঙ্গে স্থানান্তরে যান ॥ ৩২৫ ॥

দুঃখের কাহিনী পথে করে পরস্পর ।
হরি বিনা জীবদের দুর্গতি বিস্তর ॥ ৩২৬ ॥

সর্বদুঃখহর হরি কি প্রকারে মিলে ।
কোথা তাঁয় পাওয়া যায় কোন্‌খানে গেলে ॥ ৩২৭ ॥

হেনকালে শ্যামকায় সহাস্যবদন ।
আসিয়া পুরুষ এক দিল দরশন ॥ ৩২৮ ॥

কহিলা বচনে সুধাধারা মিশাইয়ে ।
কেন এত ব্যস্ত থাক কিছু দিন স'য়ে ॥ ৩২৯ ॥

কথা শুনি চমকিয়া রাম ভক্তবর ।
থামিল দেখিতে তাঁরে কে দিল উত্তর ॥ ৩৩০ ॥

সুহৃদ প্রাণের বন্ধু প্রাণের মতন ।
অশান্তি অনল হৃদে জলে বিলক্ষণ ॥ ৩৩১ ॥

বুঝিয়া ঢালিয়া দিল আশা-রূপ বারি ।
দেব কি মানব তাঁরে আঁখি ভ'রে হেরি ॥ ৩৩২ ॥

এত ভাবি যেমন ফিরিল পাছুপানে ।
অদৃশ্য পুরুষ আর নাহি কোনখানে ॥ ৩৩৩ ॥

শহরের রাজপথ প্রশস্ত যেমন ।
সরল অবক্রভাব সুদীর্ঘ তেমন ॥ ৩৩৪ ॥

যত দূর চলে দৃষ্টি দেখে দত্ত রাম ।
কোথাও পুরুষবরে দেখিতে না পান ॥ ৩৩৫ ॥

হাওয়ার মানুষ ধরি স্বাকার যেমন ।
চকিতে বিদ্যুাৎবৎ দিয়া দরশন ॥ ৩৩৬ ॥

বরষিয়া শান্তিবারি সুধা-ধারা প্রায় ।
পলকে আড়ালে পুনঃ মিলিল হাওয়ায় ॥ ৩৩৭ ॥

বিদূরিত মেঘদল হইলে আকাশে ।
পূর্ণ করে শশধর ফুট হেসে হেসে ॥ ৩৩৮ ॥

তেমতি রামের হৃদে হতাশের জাল ।
অশান্তির ঘোরঘটা বিষম জঞ্জাল ॥ ৩৩৯ ॥

তমস আঁধার বেড় কর-চোরা ফাঁদ ।
দূরে গিয়া বাহিরিল আনন্দের চাঁদ ॥ ৩৪০ ॥

পুলকে পূর্ণিত ভক্ত পাগলের পারা ।
চারে দেখি শ্যামকায় মীনের চেহারা ॥ ৩৪১ ॥

বিধিমতে বুঝিলেন নিশ্চয় শ্রীহরি ।
নানাভাবে রূপে গেলে পুনঃ পেলে ধরি ॥ ৩৪২ ॥

পরদিনে দরশনে দক্ষিণশহরে ।
বৃত্তান্ত বিদিত কৈল প্রভুর গোচরে ॥ ৩৪৩ ॥

মৃদু হাসি প্রভুদেব লীলার ঈশ্বর ।
কত কি দেখিবে বলি দিলেন উত্তর ॥ ৩৪৪ ॥

ভক্তসঙ্গে খেলা তাঁর মধুর কেমন ।
যদ্যপি দেখিতে সাধ হয় তোর মন ॥ ৩৪৫ ॥

লও তবে ভক্তিভরে গাও অবিরাম ।
আঁখি-তম-বিমোচন রামকৃষ্ণনাম ॥ ৩৪৬ ॥

নামেতে সকল মিলে নাম কর সার ।
মধুর প্রভুর নামে মহিমা অপার ॥ ৩৪৭ ॥