তৃতীয় খণ্ড

বলরামের প্রভুদর্শনে গমন
(নটবর গোস্বামী, প্রতাপ হাজরা, দীননাথ বসু, হরিনাথ, গঙ্গাদর, গিরিশ্চন্দ্র)


জয় প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


শুন মন লীলাগীতি অতি সুললিত ।
দেশেতে ইংরাজি ভাষা এবে প্রচলিত ॥ ১ ॥

এবে সুশিক্ষিত যত বঙ্গ-যুবাদল ।
একমাত্র গণ্যমান্য সম্মানের স্থল ॥ ২ ॥

রাজদ্বারে সমাদরে উচ্চপদ পান ।
শিক্ষা বিনা ভিক্ষা মিলে নাহি হেন স্থান ॥ ৩ ॥

বক্তৃতা হইলে পরে ইংরাজি ভাষায় ।
বেদবাক্যাধিক বুঝে লোক সমুদায় ॥ ৪ ॥

যতক্ষণ গীতা নাহি যায় ভাষান্তরে ।
ততক্ষণ সভ্যদলে আদর না করে ॥ ৫ ॥

ছেড়ে গেছে আগেকার বাঙ্গালীর রীতি ।
চলা বলা খেলা সজ্জা সাহেবী প্রকৃতি ॥ ৬ ॥

ভজনা-প্রণালী তাও হয়েছে নকল ।
মন্ত্র লওয়া নাই এবে বক্তৃতা কেবল ॥ ৭ ॥

এই সম্প্রাদায়ভুক্ত কেশব এখন ।
বিশ্বাস তাঁহার বাক্যে করে বহু জন ॥ ৮ ॥

নব্য বঙ্গ-যুবাদলে প্রভুর প্রচার ।
একা মাত্র শ্রীকেশব মূলাধার তার ॥ ৯ ॥

নমস্কার কোটি কোটি কেশবের পায় ।
দুই পথে ধরিলেন প্রচার উপায় ॥ ১০ ॥

প্রধান বক্তৃতা তাঁর মহা সভাস্থলে ।
অর সমাচারপত্র ছুটে মফঃস্বলে ॥ ১১ ॥

কানে কানে মুখে মুখে যায় সমাচার ।
চারিদিকে আসে লোক হাজার হাজার ॥ ১২ ॥



সাধনভজন যবে পাগলের প্রায় ।
পুরীমধ্যে শাঁখ ঘণ্টা বাজিলে সন্ধ্যায় ॥ ১৩ ॥

ছাদের উপরে উঠি প্রভু ভগবান ।
দুনয়নে বারি-ধারা ব্যাকুলিত প্রাণ ॥ ১৪ ॥

ডাকিতেন অন্তরঙ্গ আত্মসঙ্গগণে ।
কে কোথায় আছ এস আমি এইখানে ॥ ১৫ ॥

এতদিন খবর না ছিল কোথাকার ।
একে একে জুটিতে লাগিল এইবার ॥ ১৬ ॥

মনোহর ভক্তবর বসু বলরাম ।
শহর অঞ্চলে বাগবাজারেতে ধাম ॥ ১৭ ॥

বৈষ্ণব-আচার-বংশে জনম তাঁহার ।
পিতা পিতামহগণ বৈষ্ণব-আচার ॥ ১৮ ॥

এখন চল্লিশ পার তাঁর বয়ঃক্রম ।
সরল আকৃতি অতি পাতলা গড়ন ॥ ১৯ ॥

গউর বরন অঙ্গ অকুঞ্চিত ঠাম ।
সুন্দর বক্ষেতে দুলে দাঁড়ি লম্বমান ॥ ২০ ॥

বাঙ্গালীর রীতি ছাড়া উচ্চ পাগ শিরে ।
বিনয়েতে সদা নত ভূমির উপরে ॥ ২১ ॥

হাসিমাথা ধীরি কথা কভু উচ্চ নয় ।
নানা গুণে অলঙ্কৃত হৃদয়-নিলয় ॥ ২২ ॥

ঘটে কত ভক্তিভরা নহে বলিবার ।
আপনি যেমন তিনি তেন পরিবার ॥ ২৩ ॥

কুমারকুমারীগণ গড়া সম ছাঁচে ।
ছোট বড় তর তম সাধ্য কার বাছে ॥ ২৪ ॥

ভক্তবর সাধু নামে ছোট সহোদর ।
শিশু ভ্রাতৃ পুত্র ভক্ত পরম সুন্দর ॥ ২৫ ॥

এইমত হয় তাঁর যারে দেন হরি ।
ভক্তিমান ভক্তিমতী শ্বশুর শাশুড়ী ॥ ২৬ ॥

তিনটি শ্যালকমধ্যে অনুজ যে জন ।
এবে তাঁর পনেরর মধ্যে বয়াক্রম ॥ ২৭ ॥

সুন্দর গড়ন হাসি সর্বদা বয়ানে ।
কৃষ্ণপদে রতি মতি অতুল ভুবনে ॥ ২৮ ॥

স্বভাব-সুলভ কিবা আঁখি ঠেরে কথা ।
পশ্চাতে সময়ে পাবে তাঁহার বারতা ॥ ২৯ ॥

শুনে রাগ মাত্র বাবুরাম নাম তাঁর ।
কৃপায় যাঁহার হয় ভক্তির সঞ্চার ॥ ৩০ ॥

ভক্তের বাজার ঠিক বস্তুর ভবন ।
শান্তিময় বৃহৎ দ্বিতল নিকেতন ॥ ৩১ ॥

লক্ষ্মী বিরাজিত গুপ্তভাবে সর্বদায় ।
ভারি ভারি জমিদারি আছে উড়িষ্যায় ॥ ৩২ ॥

রাজসিক-ভাবশূন্য যদি ধনপতি ।
নানাবিধ তীর্থমধ্যে বড়ই খিয়াতি ॥ ৩৩ ॥

মনোহর আশ্রম আছয়ে স্থানে স্থানে ।
বিশেষ পুরুষোত্তমে কাশী বৃন্দাবনে ॥ ৩৪ ॥

অতিশয় বৃদ্ধ পিতা কৃষ্ণ পদে অংশ ।
এখন তাঁহার হয় বৃন্দাবনে বাস ॥ ৩৫ ॥

প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ মূর্তি স্থানে স্থানে ।
বিশেষে মাহেশে কথা সকলেই জানে ॥ ৩৬ ॥

মাহেশের রথ বড় প্রসিদ্ধ এ দেশে ।
গণনায় হানি পায় কত লোক আসে ॥ ৩৭ ॥

এখানে স্বতন্ত্র মূর্তি আপনার ঘরে ।
দিন দিন ভোগরাগ নানা উপচারে ॥ ৩৮ ॥

ভাত খিচুরান্ন ভোগ ব্রাহ্মণেতে রাঁধে ।
কত ভক্ত তৃপ্তি পায় তাঁহার প্রসাদে ॥ ৩৯ ॥

সন্ধ্যাকালে নিতি নিতি হরি-সংকীর্তন ।
ভবনে ভক্তের কত নিত্য সমাগম ॥ ৪০ ॥

শ্রীপ্রভুর লীলামধ্যে যত ভক্তে জানি ।
ভক্ত বলরামে এক অগ্রগণ্য মানি ॥ ৪১ ॥

ভক্তমধ্যে যদ্যপিহ ছোট বড় নাই ।
বেশী কৃপা যেইখানে তাঁরে বড় গাই ॥ ৪২ ॥

এক গাছে যেন লক্ষ লক্ষ ফল ধরে ।
সকলে না হয় বিক্রী একরূপ দরে ॥ ৪৩ ॥

যে যেমন সুরসাল সেমত যে গণ্য ।
লীলাহাটে ভক্তদের এই তারতম্য ॥ ৪৪ ॥



বক্তৃতায় পত্রিকায় উচ্চে বাঁধি তান ।
প্রভুর মাহাত্মা কথা শ্রীকেশব গান ॥ ৪৫ ॥

বলরাম উড়িষ্যায় রন এ সময় ।
সমাচারপত্র পাঠে অপার বিস্ময় ॥ ৪৬ ॥

শ্রীপ্রভুর চিরপ্রিয় ভক্ত বলরাম ।
যেমন ঢুকিল কানে শ্রীপ্রভুর নাম ॥ ৪৭ ॥

পরান অস্থির প্রায় প্রভু-দরশনে ।
কলিকাতা কবে যাব ভাবে রেতে দিনে ॥ ৪৮ ॥

বিষম বন্ধনে তথা তালুকের ভার ।
যাই যাই করিতে সপ্তাহ দশ পার ॥ ৪৯ ॥

ইতিমধ্যে শুন কিবা হইল ঘটন ।
বসু বাসে বাস রামদয়াল ব্রাহ্মণ ॥ ৫০ ॥

অল্পবয়ঃ নিষ্ঠাচারী সরল উদার ।
হরি-পথে রতি মতি বিলক্ষণ তাঁর ॥ ৫১ ॥

কেশবের সমাজেতে মাঝে মাঝে গতি ।
শুনিয়া প্রভুর তথা মাহাত্ম্য-ভারতী ॥ ৫২ ॥

যান তিনি দরশনে দক্ষিণশহরে ।
বিকাইল প্রভু-পার একদিন হেরে ॥ ৫৩ ॥

আনন্দের প্রতিমূর্তি প্রভুর আমার ।
দেখিয়াই বলরামে দিল সমাচার ॥ ৫৪ ॥

ছিল তপ্ত বসু ভক্ত কেশবের বোলে ।
পত্রে তার ব্রাহ্মণ আগুন দিল জ্বেলে ॥ ৫৫ ॥

কোথায় বিষয়কর্ম করি পরিহার ।
উত্তরিল কলিকাতা আবাসে তাঁহার ॥ ৫৬ ॥

দয়ালের মুখে শুনি মাহাত্ম্য প্রভুর ।
দরশনে ব্যাকুলতা বাড়িল বসুর ॥ ৫৭ ॥

উঠে পড়ে বলরাম চলে পর দিনে ।
দক্ষিণশহরে প্রভু বিরাজে যেখানে ॥ ৫৮ ॥

সেইদিনে শ্রীমন্দিরে ভকতের মেলা ।
গিয়াছেন শ্রীকেশব সঙ্গে বত চেলা ॥ ৫৯ ॥

নানাবিধ ঈশ্বরীয় কথোপকথন ।
ছুটে মুক্ত-দুখে আনন্দের প্রস্রবণ ॥ ৬০ ॥

একধারে উপবিষ্ট ভক্ত বলরাম ।
মহানন্দে ইন্দ্রিয়ের পিপাসা মিটান ॥ ৬১ ॥

অন্তর-বারতাবিৎ শ্রীপ্রভু আমার ।
জিজ্ঞাসিলা তারে কিবা জিজ্ঞাস্য তোমার ॥ ৬২ ॥

বলরাম বলিলেন এক নিবেদন ।
দেখুন আমার পিতা পিতামহগণ ॥ ৬৩ ॥

ভকত-স্বভাব সবে বৈষ্ণব-আচারী ।
কাটিলা জীবন শুধু হরি হরি করি ॥ ৬৪ ॥

অদ্যাবধি আমিও তাঁদের পিছু যাই ।
কিন্তু হরি কেহ কেন দেখিতে না পাই ॥ ৬৫ ॥

প্রভুদেব করিলেন তাহার উত্তর ।
ধন-পুত্রে যেইরূপ করহ কদর ॥ ৬৬ ॥

সেইমত প্রিয়ভাব হরিতে কি আছে ।
থাকিলে অবশ্য হরি আসিতেন কাছে ॥ ৬৭ ॥

অতুল টানের কিবা কথা পরিপাটী ।
শ্রবণমাত্রেই ভক্ত বুঝিলেন ত্রুটি ॥ ৬৮ ॥

কেমনে হরিতে হয় মমতা-সঞ্চার ।
শ্রীপ্রভু আপনি তার করিলা যোগাড় ॥ ৬৯ ॥

লীলায় বুঝিবে তত্ত্ব কহা অকারণ ।
শ্রবণ করিয়া লীলা কর দরশন ॥ ৭০ ॥

প্রভুসনে আর কথা নহে সেই দিনে ।
গোলযোগ হেতু বহু লোক-সমাগমে ॥ ৭১ ॥ 



দলে দলে এসেছেন কেশব সজ্জন ।
আজি তাঁর মুড়ি-ভোজনের নিমন্ত্রণ ॥ ৭২ ॥

দক্ষিণশহরে মুড়ি বড়ই খিয়াতি ।
মুড়িতে শ্রীকেশবের বড়ই পিরীতি ॥ ৭৩ ॥

কেমনে খাইলা মুড়ি শুন শুন মন ।
প্রথমে প্রাঙ্গণে পাতা পড়ে অগণন ॥ ৭৪ ॥

বসিল যতেক লোক আছিল তথায় ।
সর্বাগ্রে পড়িল মুড়ি পাতায় পাতায় ॥ ৭৫ ॥

বড় বড় কাঁচা লঙ্কা লবণ সহিতে ।
কুচিকরা নারিকেল আধা তার সাথে ॥ ৭৬ ॥

ঘিয়ে মাখা তার পর কলাইর ভাজা ।
মিষ্টিমুখ-হেতু পড়ে চৌকনিয়া গজা ॥ ৭৭ ॥

মুড়ি নহে শেষ লুচি গরম গরম ।
আলো করি গোটা পুরী দিল দরশন ॥ ৭৮ ॥

পাছু ছুটে তরকারি ডাল্‌নার আকার ।
দুটি কি তিনটি নহে বিবিধ প্রকার ॥ ৭৯ ॥

নাহি পায় ঠাঁই পাতে বৃহদায়তন ।
পড়িল বেগুন ভাজা ডঙ্গার মতন ॥ ৮০ ॥

মুড়ি থেকে বোঝায়ের হ'য়েছে পত্তন ।
পূর্ণ পেট আর নহে গলাধঃকরণ ॥ ৮১ ॥

রঙ্গসহ শ্রীকেশব প্রভুদেবে কয় ।
বড়ই সুন্দর মুড়ি খেনু মহাশয় ॥ ৮২ ॥

আর কেন যথেষ্ট হয়েছে এইবারে ।
রুদ্ধ পথ নাহি ফাঁক পেট গেছে ভ'রে ॥ ৮৩ ॥

প্রভুদেব বলিলেন হাসিয়ে হাসিয়ে ।
যা হয়েছে টুকু টুকু সব যাও খেয়ে ॥ ৮৪ ॥

দেখিতে দেখিতে এল চাটনি সুন্দর ।
প্রশস্ত করিতে পথ গলার ভিতর ॥ ৮৫ ॥

সঙ্গে সঙ্গে খবাদই পাতা চিনি দিয়ে ।
এতই পড়িল যেন বান যায় ব'য়ে ॥ ৮৬ ॥

তদুপরি বড় মণ্ডা দীর্ঘে প্রস্থে ভারি ।
দধিসিন্ধুমধ্যে যেন সন্দেশের গিরি ॥ ৮৭ ॥

কে আর করিতে পারে কতই ভোজন ।
খুরি-ভরা ক্ষীর দিয়া কার্য-সমাপন ॥ ৮৮ ॥

বহু দ্রব্য-আয়োজন অধিক অধিক ।
শুনেছি যোগাড়দাতা শ্রীযদু মল্লিক ॥ ৮৯ ॥

ভোজন-সমাপ্তে রাতি ক্রমে বেড়ে যায় ।
ঘরে ফিরিবারে মাগে প্রভুর বিদায় ॥ ৯০ ॥

বলিলেন প্রভু তাঁর সস্নেহ বচনে ।
ঘরে কেন যাবে আজি থাক এইখানে ॥ ৯১ ॥

করজোড়ে কেশব কহেন দীনতায় ।
সত্বর আসিব দরশনে পুনরায় ॥ ৯২ ॥

সহাস্যে করিয়া রঙ্গ প্রভু কন পরে ।
আঁইষ-চুবড়ি রেখে আসিয়াছ ঘরে ॥ ৯৩ ॥

নিদ্রা নাহি হবে হেখা দূরে রাখি তায় ।
মেছুনীর গল্প প্রভু কন উপমায় ॥ ৯৪ ॥

গুণদর যেন তেন সুরসিকবর ।
সর্বরস সুবিদিত রসের সাগর ॥ ৯৫ ॥

কিসে গলে কার প্রাণ কিসে শিক্ষা কার ।
বুঝিতে বড়ই পটু শ্রীপ্রভু আমার ॥ ৯৬ ॥

রসে ভরা প্রভুবাক্য তবু এত জোর ।
দেখি জড়সড় লাজে অশনি কঠোর ॥ ৯৭ ॥

বড় প্রাণে সাধ আঁকি শ্রীবাক্য কেষন ।
কি করি তুলিতে খুঁজে না পাই বরন ॥ ৯৮ ॥

সঙ্কেতেতে কই বাক্য ঠিক ডিম্ব-পারা ।
ভাঙ্গিয়া প্রসবে কাল জীবন্ত চেহারা ॥ ৯৯ ॥

শ্রীবাক্য সেরূপ নহে যেন শুনা যায় ।
হাওয়ায় হইয়া যেন হাওয়ার মিশায় ॥ ১০০ ॥

শুন মেছুনীর কথা প্রভুর উত্তর ।
রামকৃষ্ণ-লীলাগীতি স্বতই সুন্দর ॥ ১০১ ॥

শহর-অন্তরে জলা প্রান্তরের ধারে ।
মোছো-মেছুনীরা তথা বহু বাস করে ॥ ১০২ ॥

মেছো-মরদেরা মাছ ধরে রাত্রিকালে ।
মেছুনীরা একত্তরে সকালে সকালে ॥ ১০৩ ॥

শহরেতে আসে মাছ-বিক্রয়-কারণ ।
দিনান্তে কর্মান্তে করে ভবনে গমন ॥ ১০৪ ॥

একদিন দৈবযোগে পথে অকস্মাৎ ।
মুষলধারায় মেঘ ফুটে বৃষ্টিপাত ॥ ১০৫ ॥

সেখানে আশ্রয়হেতু নাহি অন্য স্থান ।
দুই ধারে শতদরে ফুলের বাগান ॥ ১০৬ ॥

মনোহর বাসাবাটী বাগিচা-ভিতরে ।
উদ্যান-রক্ষক মালী যত্নে রক্ষা করে ॥ ১০৭ ॥

কি করে মেছুনীদল প্রবেশিলা তার ।
প্রহরেক রাতি তবে বৃষ্টি ছেড়ে যায় ॥ ১০৮ ॥

তথা হ'তে বহুদূর তাহাদের ঘর ।
চক্ষে নাহি আসে বাট আঁধার প্রান্তর ॥ ১০৯ ॥

হেথা কি ঘটিল কথা শুন শুন বলি ।
ঠাণ্ডা বায়ে ফুটে যত কুসুমের কলি ॥ ১১০ ॥

উদ্যান চৌদিকে গাছ হাজার হাজার ।
মাতিয়া সকলে করে সৌরভ বিস্তার ॥ ১১১ ॥

আঁষটেগন্ধে মেছুনীর জন্মযাত বাঁধা ।
অষ্ট অঙ্গে আঁষটেগন্ধ যেন মৎস্যগন্ধা ॥ ১১২ ॥

বুঝে আঁইষের গন্ধ এত পরিমাণে ।
পারিজাত কুজাত দুর্গন্ধ তার সনে ॥ ১১৩ ॥

ফুলের সৌরভে আর নিদ্রা নাহি হয় ।
জঞ্জালে পড়িল বড় মেছুনীনিচয় ॥ ১১৪ ॥

মাছের বজরা ছিল তাহাদের কাছে ।
বাতাসে শুকায়ে তার গন্ধ ক'মে গেছে ॥ ১১৫ ॥

বুদ্ধি করি তাড়াতাড়ি ছড়াইয়া জল ।
আঁইষের গন্ধ কিছু করিল প্রবল ॥ ১১৬ ॥

মেছুনীরা বজরায় মুখ চাপা দিতে ।
তবে না হইয়া সুস্থ নিদ্রা যায় রেতে ॥ ১১৭ ॥

সেইমত তোমাদের আঁইষ-চুবড়ি ।
ঘরে রেখে এসে গোল করিয়াছ ভারি ॥ ১১৮ ॥

এখানে ফুটেছে গাছে বিবিধ কুসুম ।
সৌরভ-সুগন্ধে রেতে নাহি হবে ঘুম ॥ ১১৯ ॥

কামিনীর গন্ধ বিনা নিদ্রা হবে কেনে ।
শ্রীকেশব সলজ্জবদন কথা শুনে ॥ ১২০ ॥

এগুতে পেছুতে দুয়ে হৈল মহাদায় ।
এস এস বলি প্রভু দিলেন বিদায় ॥ ১২১ ॥



আগাগোড়া শ্রীপ্রভুর দেখিয়া ব্যাপার ।
ফিরিল সে দিনে বসু আপন আগার ॥ ১২২ ॥

অন্তরঙ্গ-ভক্ত-মধ্যে প্রধান লক্ষণ ।
একবার শ্রীপ্রভুর পেলে দরশন ॥ ১২৩ ॥

নয়নমোহনরূপ দেখিবারে পায় ।
কি জানি কি খেলে রূপ শ্রীপ্রভুর গায় ॥ ১২৪ ॥

সচঞ্চল প্রাণ প্রায় হ'য়ে নিজে হারা ।
তাঁর কথা তাঁর মূর্তি মনে তোলাপাড়া ॥ ১২৫ ॥

দর্শন-শ্রবণ-পথে যতেক গোচর ।
নিজ ভাবে বলরাম ভাবে নিরস্তর ॥ ১২৬ ॥

শ্রীপ্রভুর দরশনে নাহি মিটে আশা ।
যত দেখে দেখিবার ততই পিপাসা ॥ ১২৭ ॥

কত অন্তরঙ্গ শুন ভক্ত বলরাম ।
প্রভুর শ্রীবাক্যে আছে তাহার প্রমাণ ॥ ১২৮ ॥

একদিন গঙ্গাকূলে করেন ভাবনা ।
নদীয়ায় গৌরচন্দ্র অবতার কি না ॥ ১২৯ ॥

সত্য যদি অবশ্যই পাব দরশন ।
বলেছি অনেক আগে করহ স্মরণ ॥ ১৩০ ॥

ভাবিতে ভাবিতে হেন পঞ্চবটতলে ।
উঠিল কীর্তন-রোল গঙ্গার সলিলে ॥ ১৩১ ॥

শব্দ ধরি দেখিলেন প্রভুদেব চেয়ে ।
উঠে কীর্তনিয়া দল জল দুফালিয়ে ॥ ১৩২ ॥

পরে দরশনে প্রভু জগতগোসাঁই ।
প্রত্যক্ষে পাইলা দুই গোউর নিতাই ॥ ১৩৩ ॥

উন্মত্ত হইয়া নৃত্য করে দুই জনে ।
মাতোয়ারা সঙ্গে যারা নাচে সংকীর্তনে ॥ ১৩৪ ॥

যত লোক সংকীর্তনে ছিল বিদ্যমান ।
তার মধ্যে একজন ভক্ত বলরাম ॥ ১৩৫ ॥

স্বতন্ত্র আধার তাঁর ছিল নদেপুরে ।
এইবারে বলরাম প্রভু-অবতারে ॥ ১৩৬ ॥

অভ্যন্তরে এক বস্তু স্বতন্ত্র চেহারা ।
এ তত্ত্ব বিদিত নহে কেহ প্রভু ছাড়া ॥ ১৩৭ ॥

বলিতেন প্রভু চক্ষু জানালার প্রায় ।
এই দ্বারে যে ভিতরে তারে দেখা যায় ॥ ১৩৮ ॥

কথাটি সহজ দেখা কঠিন ব্যাপার ।
কে তিনি এ দরশনে অধিকার যাঁর ॥ ১৩৯ ॥

প্রভুর নিকটে তাই তাঁর আত্মগণ ।
নূতন হইয়া হয় বহু পুরাতন ॥ ১৪০ ॥

লীলাগীতি একমনে কর অবধান ।
ভক্তসনে সম্মিলনে পাইবে প্রমাণ ॥ ১৪১ ॥

কিবা শক্তি কব আমি প্রভুলীলা খুলে ।
যতই না কই কুটি সিন্ধুর সলিলে ॥ ১৪২ ॥

তাল দেখাইয়া বল কে বুঝিতে পারে ।
প্রকাণ্ড আকার গোল ধরা কিবা ধরে ॥ ১৪৩ ॥



মহাভক্ত বলরাম বৈষ্ণব লক্ষণে ।
প্রভু-অবতারে নয় অবতার ক্রমে ॥ ১৪৪ ॥

গোষ্ঠিবর্গ সবে ভক্ত কলমির ঢাক ।
বহু লতা সমাবৃত তিল নাহি ফাঁক ॥ ১৪৫ ॥

পাড়া জুড়ে আছে বেড়ে গায়ে গায়ে গাঁথা ।
ভক্ত বলরাম তার মধ্যে মূললতা ॥ ১৪৬ ॥

সতেজ সবল শক্ত সুকোমল প্রাণ ।
প্রথমে দিলেন প্রভু তারে ধরি টান ॥ ১৪৭ ॥

তার টানে গোটা চাক কিরূপ প্রকারে ।
ধীরে ধীরে যায় চ'লে প্রভুর গোচরে ॥ ১৪৮ ॥

পরে পরে কব মন ব্যস্ত ভাল নয় ।
পীযূষ-ভাণ্ডার সংজোটন-পরিচয় ॥ ১৪৯ ॥

প্রভুরে বড়ই মিষ্টি লেগেছে বস্তুর ।
এক দরশনে শুন কাণ্ড কতদূর ॥ ১৫০ ॥

ভাবে কত করিয়াছি তীর্থেতে পয়ান ।
দেখিয়াছি শত শত সাধকপ্রধান ॥ ১৫১ ॥

যোগী ত্যাগী জটাধারী মহাস্ত সজ্জন ।
শৈব শাক্ত বৈদান্তিক বৈষ্ণব-লক্ষণ ॥ ১৫২ ॥

শুনেছি ঈশ্বরকথা বিস্তর বিস্তর ।
কিন্তু কোথা না দেখিনু এমন সুন্দর ॥ ১৫৩ ॥

যেমন মুরতিখানি স্বভাব তেমন ।
ভক্তিমাখা উক্তি মুখে সুধা-বরিষণ ॥ ১৫৪ ॥

সঙ্গীতে বাঁশরী কণ্ঠ অতি মিষ্টি গান ।
শুনে প্রাণ ফুলে ধরে আনন্দে উজান ॥ ১৫৫ ॥

মহাজ্ঞানে বাল্যভাব অঙ্গ-আভরণ ।
রস-ভাবে কেবা দোষে কিছু নহে কম ॥ ১৫৬ ॥

ভক্তসেবা বিলক্ষণ ভক্তির সহিতে ।
পুলক পিরীতি অতি ত্যাগ রাগ চিতে ॥ ১৫৭ ॥

কান চক্ষু উভয়ের রুচি প্রীতিকর ।
রয়েছেন এত কাছে কে জানে খবর ॥ ১৫৮ ॥

পুনরায় যাব তাঁরে করিতে প্রণতি ।
পোহাইলে একবার আজিকার রাতি ॥ ১৫৯ ॥



পরদিনে দ্বিতীয় দর্শনে ভক্তবর ।
উপনীত হইলেন প্রভুর গোচর ॥ ১৬০ ॥

পরম পুলক ছবি প্রভুদেবে হেরে ।
প্রভুও তেমতি খুশী ভিতরে ভিতরে ॥ ১৬১ ॥

উপরেতে বাহ্যভাব ভিতরে তা নয় ।
লীলা কিনা তাই প্রভু লন পরিচয় ॥ ১৬২ ॥

কিবা নাম কোথা বাস কিবা হেতু আসা ।
নন্দন নন্দিনী কিবা বিষয়-ব্যবসা ॥ ১৬৩ ॥

গম্ভীর বয়ানে নহে হাস্যসহকারে ।
জেনে যে জিজ্ঞাসা ইহা সাধ্য কার ধরে ॥ ১৬৪ ॥

বড়ই মজার কথা বুঝেছ কি মন ।
কথায় কি আছে চিত্র কর দরশন ॥ ১৬৫ ॥

সাজা এ বড়ই মজা বুঝা যদি যার ।
মিষ্টিমাখা চিড়া-দই ক্ষুধার বেলায় ॥ ১৬৬ ॥

দু'চারি কথান্তে হেন কথোপকথন ।
যেন দোঁহে যুগান্তর পরিচিত জন ॥ ১৬৭ ॥

ঘনীভূত ঘনিষ্ঠতা আত্মীয়তা-ভরা ।
শুনিয়া বসুর নাই সুখের কিনারা ॥ ১৬৮ ॥

কি যে সুখ প্রভুসঙ্গে কথোপকথনে ।
বলিবার নহে তাহা যে জানে সে জানে ॥ ১৬৯ ॥

যবে যার হয় কথা শ্রীপ্রভুর সাথে ।
সে যেন গগনচাঁদ ধরা পায় হাতে ॥ ১৭০ ॥

সীমা ফেঁড়ে উঠে তেড়ে আনন্দ-লহরী ।
কি জানি কি ছিল তাঁর কথায় মাধুরী ॥ ১৭১ ॥

কি দিয়া গঠিত কিবা থাকে তাঁর মাঝে ।
গালি দিলে তবু যেন বীণা বাণী বাজে ॥ ১৭২ ॥

সদানন্দময় প্রভু সদানন্দে স্থিতি ।
যা কিছু জনমে তাঁয় আনন্দ-মুরতি ॥ ১৭৩ ॥

শ্রুতিরুচিকর এত কি কহিব তোরে ।
দেহ যদি যার তবু স্মৃতি নাহি ছাড়ে ॥ ১৭৪ ॥

অমিয়-মিশান হাসি শ্রীবদনে ভাতে ।
স্বভাব-সুলভ বাল্যভাবের সহিতে ॥ ১৭৫ ॥

বলিলেন বলরামে বালকের পারা ।
তোমার ভবনে আছে অনেক ভাণ্ডারা ॥ ১৭৬ ॥

দিবে কিছু পাঠাইয়া খাইবারে মন ।
সুখে ভাসে বলরাম গুনিয়া বচন ॥ ১৭৭ ॥

উঠে পড়ে আনিবারে লইয়া বিদায় ।
ত্বরাত্বরি চ'ড়ে গাড়ি বসু ঘরে যায় ॥ ১৭৮ ॥

নানাবিধ খাদ্যদ্রব্য প্রভুর কারণ ।
পর দিনে বলরাম করে আয়োজন ॥ ১৭৯ ॥

বিবিধ মশলা মিষ্টি বেদানা মিছরি ।
নানাবিধ ডাল ঘৃত লবণাদি করি ॥ ১৮০ ॥

সাজাইয়া মনোমত ডালি সযতনে ।
চলিলেন বলরাম প্রভু দরশনে ॥ ১৮১ ॥

পরিমাণে প্রতি দ্রব্য প্রচুর ডালায় ।
একমাস গেলে তবু যেন না ফুরায় ॥ ১৮৪ ॥

ডালি দেখি বড় খুশী শ্রীপ্রভু আপনি ।
ধন্য ধন্য বলরাম ভক্ত-চূড়ামণি ॥ ১৮৫ ॥

প্রভুর ভাণ্ডারী এক ভক্ত বলরাম ।
মাসে মাসে এক ডালি প্রভুরে পাঠান ॥ ১৮৬ ॥



দক্ষিণশহরে এবে প্রতিদিন প্রায় ।
অগণন লোকজন আসে আর যায় ॥ ১৮৭ ॥

বিশেষতঃ রবিবারে হয় মহামেলা ।
প্রাতঃকাল হইতে নাগাদ সন্ধ্যাবেলা ॥ ১৮৮ ॥

নানা প্রকারের লোক না যায় বাখানি ।
সম্ভ্রান্তবংশজ সবে ধনী মানী গুণী ॥ ১৮৯ ॥

দীনদুঃখী তার যধ্যে তত্ত্ব-লাভে মন ।
গুজব শুনিয়া করে দেখিতে গমন ॥ ১৯০ ॥

বিবিধবাসনাযুক্ত আসে ঝাঁকে ঝাঁকে ।
এত লোক কহা দায় কে দেখে কাহাকে ॥ ১৯১ ॥

আলস্যবিহীন প্রভু আপন আসনে ।
গোটা দিন মহামত্ত ঈশ্বরীয় গানে ॥ ১৯২ ॥

যা যাহার শুনিবার মনে মনে মন ।
ভাবে প্রকাশিয়া নাহি করে নিবেদন ॥ ১৯৩ ॥

বুঝিবারে প্রভুর ঐশ্বর্য কতদূর ।
যার যেন তার কথা প্রচুর প্রচুর ॥ ১৯৪ ॥

আপনা আপনি কন প্রভু গুণমণি ।
সর্বঘটবার্তাবিৎ অখিলের স্বামী ॥ ১৯৫ ॥

এক এক বাক্যে তাঁর এত অর্থ থাকে ।
তাহার উত্তর তাই বুঝে প্রতিলোকে ॥ ১৯৬ ॥

ঠিক যেন ভিষকের ঔষধের খোলে ।
যে ব্যাধির যে ঔষধ তাহাতেই মিলে ॥ ১৯৭ ॥

এর মধ্যে সকলেই বাহিরের পাখী ।
সন্ধ্যা এলে চলে যায় দিনমানে থাকি ॥ ১৯৮ ॥

বাকি থাকে দুই এক কল্পতরু-তলে ।
গাছ দেখে মহাতুষ্ট আশা নাই ফলে ॥ ১৯৯ ॥



এ সময়ে এসেছে গোস্বামী নটবর ।
দেশে শ্যামবাজারে যাঁহার হয় ঘর ॥ ২০০ ॥

সসঙ্গ প্রতাপচন্দ্র উপাধি হাজরা ।
বিশ্বাসবিহীন হৃদি ডাঙ্গাজমি পারা ॥ ২০১ ॥

হৃদুর স্বদেশী দোঁহে কাছে কাছে ঘর ।
পরিচিত বিশেষ গোস্বামী নটবর ॥ ২০২ ॥

প্রভুর আনন্দ বড় দেখিয়া তাঁহায় ।
রাখেন আপন কাছে না যেন বিদায় ॥ ২০৩ ॥



প্রভুর সেবায় এবে ভাগিনা হৃদয় ।
বড়ই শিথিল আগেকার মত নয় ॥ ২০৪ ॥

অর্থলোভে হইয়াছে লোভীর আচার ।
পুজা না পাইলে করে শাস্তি যার তার ॥ ২০৫ ॥

লইয়া শ্রীপ্রভুদেবে পাণ্ডাগিরি করে ।
বিনা তঙ্কে প্রবেশিতে না দেয় মন্দিরে ॥ ২০৬ ॥

জানিতে পারিলে প্রভু করেন বারণ ।
তদুত্তরে কহে কটু অপ্রিয় বচন ॥ ২০৭ ॥

হৃদয় প্রথরমুখ হৈল অতিশয় ।
রতি মতি উগ্রতর শ্রীপ্রভুর ভয় ॥ ২০৮ ॥

কভু কভু কটু ভাষে এতই প্রবল ।
শুনেছি ঝরিত বেয়ে শ্রীনয়নে জল ॥ ২০৯ ॥

পাছে অশ্রু-বিসর্জনে অমঙ্গল ঘটে ।
বলিতেন সকাতরে মায়ের নিকটে ॥ ২১০ ॥

যে মা তাঁর মন প্রাণ ধন ধ্যান জ্ঞান ।
সম্বল সহায় এক আশ্রয়ের স্থান ॥ ২১১ ॥

দেখ মা দেখ মা হৃদু অজ্ঞানের প্রায় ।
রেগো না রেগো না তুমি তাহার কথায় ॥ ২১২ ॥

এতই করেছে সেবা মানুষে না পারে ।
যতই না কয় কটু ক্ষমা কর তারে ॥ ২১৩ ॥

বহুদিন পূর্ব হ'তে প্রভু নারায়ণ ।
হৃদয়েরে করেছেন জড় অচেতন ॥ ২১৪ ॥

বহু পূর্বে কহিয়াছি ইহার বারতা ।
শুন এই পুনঃ রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা ॥ ২১৫ ॥



একদিন প্রভু অগ্রে কিঞ্চিৎ তফাৎ ।
পঞ্চবট অভিমুখে হৃদয় পশ্চাৎ ॥ ২১৬ ॥

আঁখি পালটিয়া শুদু দেখিলেন পরে ।
জ্যোতির্ময় প্রভু অঙ্গ চলে শূন্যভরে ॥ ২১৭ ॥

নিজেকেও পরে তেঁহ দেখিবারে পায় ।
দেবাংশসম্ভূত অনুরূপ কান্তি গায় ॥ ২১৮ ॥

দরশনে কি হইল হৃদয়ের মন ।
করী যেন মত্ত দেখি কমলের বন ॥ ২১৯ ॥

লম্ফ ঝম্প মাতোয়ারা মহাবল গায় ।
লাফে লাফে পর-চাপে ধরণী কাঁপায় ॥ ২২০ ॥

উচ্চরোলে বারে বারে করে সেইক্ষণ ।
ওগো মামা তুমি যেমন আমিও তেমন ॥ ২২১ ॥

গলা ফেটে শব্দ উঠে এত উচ্চনাদ ।
প্রভু দেখিলেন হৃদু করিল প্রমাদ ॥ ২২২ ॥

পুনরার প্রভুদেব নিজমূর্তি ধরি ।
হৃদরে কহেন কথা ফুকুরি ফুকুরি ॥ ২২৩ ॥

ওরে হৃদু কেন হেন কহ কি কারণ ।
হৃদু বলে তুমি যেন আমিও তেমন ॥ ২২৪ ॥

পুনশ্চয় প্রভুদেব বলিলেন তারে ।
থাম হৃদু কিবা কথা কহু তুমি কারে ॥ ২২৫ ॥

পুরীমধ্যে করি বাস গরীব ব্রাহ্মণ ।
স্বপ্ন বলে তুমি যেন আমিও তেমন ॥ ২২৬ ॥

হৃদয়ে করিতে শান্ত চেষ্টা বারে বারে ।
হৃদু তত উগ্রতর উচ্চনাদ ছাড়ে ॥ ২২৭ ॥

তখন হইয়া ক্রুদ্ধ বলিলেন তায় ।
রাখিতে নারিলি অতি অল্প শক্তি গায় ॥ ২২৮ ॥

এত বলি জড়াইয়া কোমরে কাপড় ।
হৃদয়ের সন্নিকট হইয়া সত্বর ॥ ২২৯ ॥

দুই হাতে সাপুটিয়া তাহায় ধরিয়া ।
বলিলেন থাক তুমি জড়বৎ হৈয়া ॥ ২৩০ ॥

সে অবধি হৃদয়ের স্বতন্ত্র প্রকৃতি ।
কামিনী-কাঞ্চনে মন ধায় দিবারাতি ॥ ২৩১ ॥

যে সকল কার্য প্রভু কৈলা লীলাকালে ।
নিগূঢ় মরম তার সাধ্য কার বলে ॥ ২৩২ ॥

তিনিই জানেন তাঁর কার্যের কারণ ।
তদুপরি হস্তক্ষেপ করে মূঢ় জন ॥ ২৩৩ ॥

শিবময় নাম তাঁর পরম উজ্জ্বল ।
কার্যের মরম কিসে জীবের মঙ্গল ॥ ২৩৪ ॥

জীব-শিক্ষা হেতু মাত্র রীতি ভিন্ন ভিন্ন ।
রুষ্ট তুষ্ট উভয়েই একরূপ গণ্য ॥ ২৩৫ ॥

হৃদয়ের পক্ষে রুষ্ট তুষ্ট কিছু নাই ।
সেবায় সন্তুষ্ট যার জগৎগোসাঁই ॥ ২৩৬ ॥

প্রভুর নিজের হৃদু ছোটখাট নয় ।
দেব-আদি সর্ব পূজ্য বুঝিবে নিশ্চয় ॥ ২৩৭ ॥



হৃদয় আত্মীয় কত কত সন্নিধান ।
প্রভুর শ্রীবাক্যে শুন তাহার প্রমাণ ॥ ২৩৮ ॥

দীননাথ বসু বাগবাজারে বসতি ।
প্রভুদেবে সাধুজ্ঞানে করিত ভকতি ॥ ২৩৯ ॥

ত্রুটি নাই কোন অংশে পূজা সমাদরে ।
ল'য়ে যায় প্রভুদেবে বারে বারে ঘরে ॥ ২৪০ ॥

শ্রীপ্রভু যথায় যেন আছয়ে ব্যাপার ।
সমারোহ সমাগমে লোকের বাজার ॥ ২৪১ ॥

মিষ্টিমাখা কথাগুলি সকলের ভাল ।
যতদূর ছটা ছুটে ততদূর আলো ॥ ২৪২ ॥

শুনিলে আনন্দে হৃদি-তন্ত্রী উঠে নেচে ।
বিশেষ যতেক লোক ব'সে শুনে কাছে ॥ ২৪৩ ॥

হৃদয় সর্বদা সঙ্গে গমন যেখানে ।
সবে শুনে তাঁর কথা হৃদয় না শুনে ॥ ২৪৪ ॥

বারে বারে হৃদয়ের দেখি আচরণ ।
একদিন প্রভুদেবে কহে কোন জন ॥ ২৪৫ ॥

মহাশয় কথার ভিতরে আপনার ।
কি এমন আছে শক্তি নহে বর্ণিবার ॥ ২৪৬ ॥

যে আসে সে শুনে ব'সে হয়ে আত্মহারা ।
বসন্তে নবীন ফুলে যেমন ভ্রমরা ॥ ২৪৭ ॥

কিন্তু যিনি সঙ্গেতে আসেন আপনার ।
তাঁহার প্রকৃতি দেখি স্বতন্ত্র প্রকার ॥ ২৪৮ ॥

সুন্দর প্রসঙ্গে হেন নাহি পশে মন ।
বুঝিতে না পারি কিছু ইহার কারণ ॥ ২৪৯ ॥

পরম রসিক প্রভু রসের সাগর ।
করিলেন রসে ভরা সুন্দর উত্তর ॥ ২৫০ ॥

দেখিয়াছ বাজিকর বাজি যাহা করে ।
মেয়ে ছেলে আট দশ থাকে একত্তরে ॥ ২৫১ ॥

দুই তিন জনে খেলে বাজি হয় যথা ।
বাকিদের মধ্যে কেহ সারে ছেঁড়া কাঁথা ॥ ২৫২ ॥

কেহ বা কাহার দেখে মাথায় উকুন ।
কেহ গৃহান্তরে যায় আনিতে আগুন ॥ ২৫৩ ॥

এমন সুন্দর বাজি না দেখে নয়নে ।
যাহাতে রয়েছে মুগ্ধ শত শত জনে ॥ ২৫৮ ॥

বাজী দেখিবারে তারা নাহি হয় রাজি ।
মনে জানে কি দেখিব এ ঘরের বাজি ॥ ২৫৯ ॥

সেইমত হৃদু নিজে বুঝে মনে মনে ।
দেখা আছে সব বাজি যা খেলি যেখানে ॥ ২৬০ ॥

এই কথা ধরি নিজ মনে বুঝ মন ।
হৃদর প্রভুর কত আত্মীয়-স্বজন ॥ ২৬১ ॥

তাঁর পক্ষে রুষ্ট তুষ্ট কাটে একধারে ।
হৃদয় ঘরের লোক জন্ম জন্ম ঘরে ॥ ২৬২ ॥



তবে এ লীলার কাণ্ড লীলার বারতা ।
তুষ্টেতে বুঝিবে তুষ্ট রুষ্টে আছে ব্যথা ॥ ২৬৩ ॥

একে সুখ আরে কষ্ট জানা জগজনে ।
হৃদয়ে হইলা রুষ্ট জীবের কল্যাণে ॥ ২৬৪ ॥

জীবের মঙ্গলহেতু জীব-শিক্ষাতরে ।
বুঝাইলা এত বড় সেও যায় পড়ে ॥ ২৬৫ ॥

রামকৃষ্ণপন্থী মধ্যে এ ভয় বিষম ।
রাখ প্রভু নাহি কর হৃদুর মতন ॥ ২৬৬ ॥

হৃদরে পাড়িয়া বুঝাইলা সবাকারে ।
বধুর শিক্ষার যেন গিন্নী ঝিয়ে মারে ॥ ২৬৭ ॥

ভক্ত দিয়া কভু হয় শিক্ষার বিধান ।
কখন দেখান শিক্ষা নিজে ভগবান ॥ ২৬৮ ॥

শুন শুন মন তার বলি পরিচয় ।
স-মনে শুনিলে ঘুচে কামিনীর ভয় ॥ ২৬৯ ॥



একদিন প্রভুদেব সুরধুনীতীরে ।
হঠাৎ উঠিল কথা মনের ভিতরে ॥ ২৭০ ॥

দেখিনু আজন্ম গোটা কামিনী কুৎসিত ।
সত্যই হয়েছি তবে কামরিপুজিৎ ॥ ২৭১ ॥

যেমন উদয় মনে আত্ম-অভিমান ।
অমনি বিন্ধিল অঙ্গে মদনের বাণ ॥ ২৭২ ॥

সন্ধান সুতীক্ষ্ণ এত কাঁপিল শরীর ।
আত্মহারা লজ্জাহারা পরাণ অস্থির ॥ ২৭৩ ॥

প্রভুর শ্রীমুখে শুনা বলিবারে ডরি ।
এড়ান না পেত এলে অতিবৃদ্ধ নারী ॥ ২৭৪ ॥

মা মা বলি কাঁদে প্রভু অতি উচ্চৈঃস্বরে ।
ছুটিয়া পশিলা আসি আপন মন্দিরে ॥ ২৭৫ ॥

তাড়াতাড়ি করিলেন আবদ্ধ দুয়ার ।
প্রবেশিতে সাধ্য যেন নাহি থাকে কার ॥ ২৭৬ ॥

অবিরত দিনত্রয় কেবল রোদন ।
তবে না শ্রীঅঙ্গ হ'তে ছুটিল মদন ॥ ২৭৭ ॥

এই দেখ দিনত্রয় কি যাতনা তাঁর ।
কার লাগি কি কারণ বুঝহ ব্যাপার ॥ ২৭৮ ॥

লীলায় লইয়া ভক্ত নিজে ভগবান ।
করায়ে করিয়ে দেন শিক্ষার বিধান ॥ ২৭৯ ॥

যাহোক তাহোক হৃদু প্রভুর স্বজন ।
বারে বারে বন্দি তাঁর দুখানি চরণ ॥ ২৮০ ॥



মহাসাধু দীননাথ বসু মহাশয় ।
শ্রীপ্রভুর শ্রীচরণে লইল আশ্রয় ॥ ২৮১ ॥

বাগবাজারের মধ্যে এই মতিমান ।
যখন তখন ঘরে প্রভুরে আনান ॥ ২৮২ ॥

প্রভুভক্ত-রত্নখনি যেন এক ঠাঁই ।
শহরে কোথায় হেন দেখিতে না পাই ॥ ২৮৩ ॥

একদিন শ্রীপ্রভুর হবে আগমন ।
প্রত্যাশায় আছে ব'সে কত লোকজন ॥ ২৮৪ ॥

প্রাচীন নবীন যুবা ছেলে দলে দলে ।
লোকারণ্য পরিপূর্ণ সদরমহলে ॥ ২৮৫ ॥

অন্তঃপুরে সেইমত মহিলা-বাজার ।
আত্মবন্ধু প্রতিবাসী নানান পাড়ার ॥ ২৮৬ ॥

তার মধ্যে কত লোক আছে দাঁড়াইয়ে ।
দ্বারদেশে অনিমিষে পথপানে চেয়ে ॥ ২৮৭ ॥

নিদাঘে তৃষায় যেন পরান বিকল ।
ফটিক আশায় থাকে চাতকের দল ॥ ২৮৮ ॥

হেনকালে শ্রীপ্রভুর হয় আগমন ।
আনন্দ ধ্বনিতে ভরে বসু নিকেতন ॥ ২৮৯ ॥

গাড়ির ভিতরে হেথা প্রভুদেব রায় ।
নাই প্রায় বাহ্যজ্ঞান ভাবাবেশ গায় ॥ ২৯০ ॥

কটিতে শিখিল বাস অচল শরীর ।
যতনে হৃদয় ধরি করিল বাহির ॥ ২৯১ ॥

মরি কি সুন্দর ছবি মুরতি মোহন ।
ভাবের লাবণ্য কান্তি অঙ্গে সুশোভন ॥ ২৯২ ॥

অস্থি মাংসে গড়া দেহ আনন্দের ভরে ।
এতই কোমল যেন ঢলে ঢলে পড়ে ॥ ২৯৩ ॥

কৃপার আধার তনু-পুরে নাই মন ।
বিশ্বহিতধ্যানে মগ্ন জীবের কারণ ॥ ২৯৪ ॥

উদিলে গগনে চাদ কৌমুদী-ছটায় ।
আধার নাশিয়া করে উজ্জ্বল ধরায় ॥ ২৯৫ ॥

তেমতি আনন্দময় প্রভু নারায়ণ ।
প্রফুল্লিত করিলেন সকলের মন ॥ ২৯৬ ॥

যথাযোগ্য আসনে বসিলা প্রভুবর ।
চারিধারে লোক যেন তারকানিকর ॥ ২৯৭ ॥

বাহ্যিকচেতনযুক্ত হইলে শ্রীঅঙ্গ ।
তুলিলেন প্রভুদেব ঈশ্বর-প্রসঙ্গ ॥ ২৯৮ ॥

হিতকর উপদেশ উক্তি সাথে সাথে ।
কখন উন্মত্ত শ্যামা-বিষয়ক গীতে ॥ ২৯৯ ॥

একে তো সুঠাম প্রভু জন-মনোহর ।
দেখিলে না চায় আঁখি ফিরিবারে ঘর ॥ ৩০০ ॥

তদুপরি মিঠা স্বর বাঁশির উপরে ।
ভক্তিপ্রেমময় গীতে ভক্তি প্রেম ঝরে ॥ ৩০১ ॥

অপূর্ব মধুর দৃশ্য ভুবন-মোহন ।
দেখে শুনে ভাগ্যবানে আনন্দে মগন ॥ ৩০২ ॥

কৃপাসিন্ধু শ্রীপ্রভুর যথা অধিষ্ঠান ।
কি উঠে তথায় এক অপরূপ টান ॥ ৩০৩ ॥

স্রোত বেয়ে ধায় লোক সে টানের জোরে ।
তটিনীর গতি যেন অকূল সাগরে ॥ ৩০৪ ॥



আজিকার স্রোতে আসি হইল উদয় ।
মহাবলীয়ান শ্রীপ্রভুর ভক্তত্রয় ॥ ৩০৫ ॥

প্রথম শ্রীহরিনাথ ব্রাহ্মণ-কুমার ।
বয়স বিশের মধ্যে নহে কৃতদার ॥ ৩০৬ ॥

বিবেকবিরাগযুক্ত শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ।
প্রখর ত্যাগের বীজ অন্তরে নিহিত ॥ ৩০৭ ॥

দ্বিতীয় প্রহলাদপ্রায় বালক সুন্দর ।
ঘটক-উপাধিযুক্ত নাম গঙ্গাধর ॥ ৩০৮ ॥

বয়স দ্বাদশ বর্ষ ব্রহ্মচর্য করে ।
রুক্ষ রুক্ষ কেশগুচ্ছ শিরের উপরে ॥ ৩০৯ ॥

সংসারের হাবভাবে অতি ঘৃণ্য জ্ঞান ।
অল্প উমেরে এত উদাস পরান ॥ ৩১০ ॥

তৃতীয় যে জন তাঁর সব বিপরীত ।
দেশে দেশে জানা নাম সবে পরিচিত ॥ ৩১১ ॥

নানারঙ্গে গোলেলাল ধরাবেরা ছাতি ।
নির্ভয় হৃদয়ালয় ভৈরব প্রকৃতি ॥ ৩১২ ॥

নাটক-লেখক কবিকুলচূড়ামণি ।
শহরেতে রঙ্গালয়ে শিক্ষাদাতা তিনি ॥ ৩১৩ ॥

বিদ্যাবল যত তার চেয়ে বুদ্ধিবল ।
নঙ্গর ফেলিলে ঘাটে নাহি মিলে তল ॥ ৩১৪ ॥

কাছে না আসিতে পারে বৃহস্পতি ডরে ।
কঠিন তাঁহার তর্কে মেদিনী বিদরে ॥ ৩১৫ ॥

কিন্তু সরলতা হৃবে এতই প্রবল ।
কঠোর তার্কিকে করে পলকে তরল ॥ ৩১৬ ॥

শ্যামবর্ণ পুষ্টকায় দোহারা গড়ন ।
জেয়াদা বয়েস নহে চল্লিশের কম ॥ ৩১৭ ॥

এমন সুন্দর কাট তাঁহার বদনে ।
শতবর্ষ বাঁচিলেও বুড়াতে না জানে ॥ ৩১৮ ॥

রেতেদিনে মদ্যযপানে বড়ই সন্তোষ ।
হাটে বাটে রটা নাম শ্রীগিরিশ ঘোষ ॥ ৩১৯ ॥

সূর্য প্রায় যায় মেখে রেখে লাল রেখা ।
হেনকালে প্রভুর নিকটে দিল দেখা ॥ ৩২০ ॥

তার কিছু আগে হ'তে প্রভু গুণধাম ।
সমাধিস্থ মোটে নাই বাহ্যিক গিয়ান ॥ ৩২১ ॥

আত্মগণ প্রিয়ভক্ত আসিবার পূর্বে ।
প্রায় প্রভু থাকিতেন মহাভাবে ডুবে ॥ ৩২২ ॥

এই ভাব শ্রীপ্রভুর ছিল পূর্বাপর ।
রামকৃষ্ণলীলাগীতি স্বতই সুন্দর ॥ ৩২৩ ॥

ধূসরবরনা সন্ধ্যা আগত হইলে ।
শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে বাতি দিল জ্বেলে ॥ ৩২৪ ॥

সন্ধ্যা-আরতির কাল যত সন্নিধান ।
ততই শ্রীঅঙ্গে আসে বাহ্যিক গিয়ান ॥ ৩২৫ ॥

এ সময়ে অধিকাংশ হুঁশ থাকে গায় ।
এধারা প্রভুর বরাবর দেখা যায় ॥ ৩২৬ ॥

দিনেরেতে মহাভাব অঙ্গে যাঁর ডাকে ।
সন্ধ্যায় নিশ্চয় অঙ্গে কেন নাহি থাকে ॥ ৩২৭ ॥

কারণ বুঝিতে যদি পারে ঠিক ঠিক ।
তখনি নাস্তিক হয় প্রকৃত আস্তিক ॥ ৩২৮ ॥

যেবা নিরাকারবাদী নাচে কুতুহলে ।
পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়া পুজে ক্ষুদ্রতনু শিলে ॥ ৩২৯ ॥

সাকার যাহার প্রাণ হাতে চাঁদ পায় ।
শ্রীপ্রভুর পদতলে অবনী লুটায় ॥ ৩৩০ ॥

আজ সন্ধ্যাকালে যবে অবস্থা এমন ।
ধীরে ধীরে বলিলেন প্রভুনারায়ণ ॥ ৩৩১ ॥

"দিনমান এবে কিবা হইয়াছে রাতি ।"
ঠিক নাই সম্মুখেতে জ্বলিতেছে বাতি ॥ ৩৩২ ॥

বসিয়া শুনিল কথা প্রভু বিদ্যমান ।
শ্রীগিরিশচন্দ্র ঘোষ তার্কিক-প্রধান ॥ ৩৩৩ ॥

মনে মনে আপনার বুঝিলেন সার ।
এ এক বুজরুকি বটে নূতন প্রকার ॥ ৩৩৪ ॥

হন্দ মন্দ সাধু এই ঘোর কলিকালে ।
ঠিক নাই সন্ধ্যাকাল কাছে বাতি জ্বলে ॥ ৩৩৫ ॥

পূর্ণ অবহেলা-ভাব প্রভুর উপরে ।
পয়ান করিলা ত্বরা আপনার ঘরে ॥ ৩৩৬ ॥

যত যিনি সমিধান বলিষ্ঠ যে যত ।
তাঁর সঙ্গে শ্রীপ্রভুর খেলা সেইমত ॥ ৩৩৭ ॥

খাইলে বৃহৎ মাছ শীঘ্র কেবা তুলে ।
গায় আছে বহু বল দিনভোর খেলে ॥ ৩৩৮ ॥

বীরভক্ত শ্রীগিরিশ চুনাপুঁটি নয় ।
প্রথম দর্শনে এইতক পরিচয় ॥ ৩৩৯ ॥



এখানে বেদজ্ঞ বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ।
মাঝে মাঝে দক্ষিণশহরে আসে যায় ॥ ৩৪০ ॥

শ্রীপ্রভুর মোহন মুরতি দরশনে ।
জ্ঞানগর্ভ সুধাভরা বচন-শ্রবণে ॥ ৩৪১ ॥

কতক ভুলেছে মন অধিকাংশ বাকি ।
আজিতক প্রভু-পদে নহে মাখামাখি ॥ ৩৪২ ॥

কেমন খেলিয়ে তাঁর সঙ্গে নারায়ণ ।
করিলেন অধিকাংশ আকর্ষণ মন ॥ ৩৪৩ ॥

ঘুচে শমনের ভয় শুনিলে ভারতী ।
ভব-ব্যাধি মহৌষধি লীলাগুণ-গীতি ॥ ৩৪৪ ॥

কাঠের আড়তে কাল উপাধ্যায় কাটে ।
মাসবৃত্তি খাইতে মাখিতে নাই আঁটে ॥ ৩৪৫ ॥

বিষম বিপদে তেঁহ পড়ে একবার ।
কি কারণ কি বিপদ শুন সমাচার ॥ ৩৪৫ ॥

ব্যবসার যত কাঠ রহে গঙ্গাকূলে ।
ভারী ভারী দামী সব ভেসে যায় জলে ॥ ৩৪৬ ॥

একবার দুইবার নহে বারে বারে ।
ব্যবসায় লোকসান বহু টাকা পড়ে ॥ ৩৪৭ ॥

পুরাতে শকতি নাই সামান্য বেতন ।
ডরে না পাঠায় বার্তা নৃপতি-সদন ॥ ৩৪৮ ॥

সশঙ্কিত চিতে চুপে চুপে কাটে কাল ।
হেনকালে গোয়েন্দায় তুলিল জঞ্জাল ॥ ৩৪৯ ॥

গোপনে খবর দিল নৃপতির কাছে ।
লুকাইয়া বিশ্বনাথ বহু কাঠ বেচে ॥ ৩৫০ ॥

তত্ত্ব পেয়ে গরজিয়া উঠে মহারাজে ।
হুজুরে হাজির জন্য পত্র দিল ভেজে ॥ ৩৫১ ॥

পেশ করিবার তরে হিসাব-নিকাশ ।
পত্র পেয়ে বিশ্বনাথ পায় বড় ত্রাস ॥ ৩৫২ ॥

বহু টাকা লোকসান জানে উপাধ্যায় ।
কি করিবে কি হইবে ভাবিছে উপায় ॥ ৩৫৩ ॥

নেপালের অধিপতি আপুনি স্বাধীন ।
স্বেচ্ছায় সকল কর্ম আজ্ঞাই আইন ॥ ৩৫৪ ॥

কাষ্ঠ নষ্টে রুষ্ট হয়ে যত-আজা দিবে ।
জান বাচ্ছা এক ঠাঁই সকলে গাড়িবে ॥ ৩৫৫ ॥

বিপদে ভরসা প্রভু ভূষি সারোদ্ধার ।
স্বরণ করিতে থাকে তাঁরে বার বার ॥ ৩৫৬ ॥

বিপদভজন প্রভু দুর্বলের আশা ।
স্বরণে দিলেন মনে নিস্তার ভরসা ॥ ৩৫৭ ॥

প্রভুর গোচরে উপনীত ক্ষুন্নমন ।
বয়ান যেগিয়া প্রভু পুছিলা কারণ ॥ ৩৬৮ ॥

আদ্যোপান্ত নিবেদন করে উপাধ্যায় ।
অভয়-প্রদানে প্রভু দিলেন বিদায় ॥ ৩৬৯ ॥

প্রভুর আশ্বাস-বাক্য মহাবলে ভরা ।
পলের ভিতরে মিলে অকূলে কিনারা ॥ ৩৭০ ॥

তরীরূপে খেলে বাক্য জলধি-মাঝার ।
তখনি তরায় তুলে কে ডুবায় আর ॥ ৩৭১ ॥

প্রভুর অভয়-পথে করিয়া নির্ভর ।
উপাধ্যায় করে যাত্রা নেপালনগর ॥ ৩৭২ ॥

হুজুরে হাজির হয়ে দরবারে কয় ।
আদ্যোপাত্ত সঠিক বৃত্তান্ত সমুদয় ॥ ৩৭৩ ॥



এক প্রভু নানারূপ নানা ঘটে খেলে ।
অনায়াসে দেখা যায় প্রভুরে দেখিলে ॥ ৩৭৪ ॥

একরূপে নৃপতি অপরে মন্ত্রিবর ।
কোথাও পেয়াদারূপে কোথা বা তস্কর ॥ ৩৭৫ ॥

মহা-জাদুকর প্রভু খেলা তাঁর কাণ্ড ।
এক হয়ে হইয়াছে অখিল ব্রহ্মাণ্ড ॥ ৩৭৬ ॥

তিনি ব্রহ্মা তিনি বিষ্ণু তিনি মহেশ্বর ।
দেবতা কিন্নর যক্ষ রক্ষ নাগ নর ॥ ৩৭৬ ॥

তিনি জগতের বীজ বীজাধার তিনি ।
স্থাবর প্রদয় গুণ অগণন প্রাণী ॥ ৩৭৭ ॥

সন্ধ্যারণে নিজে তিনি পূর্ণ-শশধর ।
তিনিই গ্রহাদি তারা উজ্জ্বল ভাস্কর ॥ ৩৭৮ ॥

তিনি তরু তিনি কাণ্ড অধোদেশে মূল ।
তিনিই প্রশাখা শাখা তিনি ফল ফুল ॥ ৩৭৯ ॥

অটল অচল তিনি তিনি নদ নদী ।
তিনিই প্রকাণ্ডকায় অপার জলধি ॥ ৩৮০ ॥

স্বররূপ শব্দরূপ রূপ-রসাকৃতি ।
মন প্রাণ বায়ু রূপ বিরাট মূরতি ॥ ৩৮১ ॥

কালরূপে সেই একা ব্যাপ্ত চিরকাল ।
প্রখর মধ্যাহ্নে সেই সকাল বিকাল ॥ ৩৮২ ॥

তিনি জ্যোতি তিনি অন্ধকারময়ী রাতি ।
আদি-মধ্য-অন্তহীন অবিরাম গতি ॥ ৩৮৩ ॥

নিরাকার মহাকার ধীর চুপু চলে ।
সৃষ্টি স্থিতি লয় যায় বিশ্ববৎ খেলে ॥ ৩৮৪ ॥

লীলাকারী হরি সেই লীলার ঈশ্বর ।
কভু নররূপ কভু ব্রহ্ম-পরাৎপর ॥ ৩৮৫ ॥

একমাত্র তিনি বস্তু তিনি বলি যাঁরে ।
সর্বময় সর্বরূপ রূপারূপ ধরে ॥ ৩৮৬ ॥

সেই তিনি কোন্ জন শুন শুন মন ।
এই রামকৃষ্ণ মোর পতিত-পাবন ॥ ৩৮৭ ॥

দরিদ্র ব্রাহ্মণবেশে লীলার আসরে ।
কৈবর্তের দেবালয়ে দক্ষিণশহরে ॥ ৩৮৮ ॥

শুন কথা সবিশ্বাসে যাহা আমি কই ।
বেসাত ভবের হাটে খেপা বোকা নই ॥ ৩৮৯ ॥

গিনি কিনি সোনা চিনি দড় পরীক্ষায় ।
মূর্খ বটি কান কাঠি ঠকাতে যে চায় ॥ ৩৯০ ॥

নন্দন-নন্দনীসহ প্রিয়তমা দারা ।
অন্নাভাবে রোগে যদি হই প্রাণে সারা ॥ ৩৯১ ॥

যদ্যপি সহিতে হয় তাদের বিচ্ছেদ ।
রোদনে আগোটা দিন যদি করি খেদ ॥ ৩৯২ ॥

সংসারের সুখ যদি সব হয় দূর ।
তবু কব পূর্ণব্রহ্ম আমার ঠাকুর ॥ ৩৯৩ ॥

জেদের ব্যাপার নয় সত্য এই কথা ।
তাড়না করিলে পরে তবু পিতা পিতা ॥ ৩৯৪ ॥

যে যা তারে তাই কয় জলে বলে জল ।
আকাশে আকাশ বলে অনবে অনল ॥ ৩৯৫ ॥

সেই বস্তু প্রভুদেব জগৎগোসাঁই ।
যাহার ওধারে আর কোন গ্রাম নাই ॥ ৩৯৬ ॥

নানা রূপে সবঘটে করেন বিরাজ ।
শুন বিশ্বনাথে কি করিল মহারাজ ॥ ৩৯৭ ॥



সত্য এজাহারে তুষ্ট হইয়া নৃপতি ।
সদয় হইল বড় বিশ্বনাথ প্রতি ॥ ৩৯৮ ॥

চৌগুণ বেতনবৃদ্ধি করিয়া তাঁহায় ।
রাজপ্রতিনিধি পরে বাঙ্গালা পাঠায় ॥ ৩৯৮ ॥

কাপ্তেন উপাধি দিল উচ্চমান সনে ।
প্রভুভক্তে সকলে কাপ্তেন নামে জানে ॥ ৩৯৯ ॥

খালাসে উল্লাস বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ।
উদ্দেশিয়া প্রভুপদ ধরণী লুটায় ॥ ৪০০ ॥

এমন সঙ্কটে যুক্ত তাহার উপরে ।
অর্থোন্ননি রাজপ্রীতি পদসহকারে ॥ ৪০১ ॥

আশাতীত মঙ্গলের কারণ কেবল ।
প্রভুর করুণা আর আশিসের ফল ॥ ৪০২ ॥

কাপ্তেনের এই জ্ঞান ধরিয়া মুরতি ।
মনে মনে নাচিতে লাগিল দিবারাতি ॥ ৪০৩ ॥

বিপদভঞ্জন প্রভু অনাথের ত্রাতা ।
বিশ্বনাথ বিলক্ষণ বুঝিল বারতা ॥ ৪০৪ ॥

কলিকাতা আসা মাত্র সবার প্রথম ।
অগ্র কর্ম শ্রীপ্রভুর চরণ-বন্দন ॥ ৪০৫ ॥

অন্তরে আনন্দ কত ফুটে না কথায় ।
কণ্ঠবোধ শ্রীপ্রভুর চরণে লুটায় ॥ ৪০৬ ॥

ধারা বেরে দুই চোথে আনন্দের জল ।
ভিজাইল শ্রীপ্রভুর চরণকমল ॥ ৪০৭ ॥

আঁখিবারি এক ফোঁটা শ্রীপ্রভুর পায় ।
ফেলিলে কি ধন মিলে বলা নাহি যায় ॥ ৪০৮ ॥

জানিবার ইচ্ছা যদি থাকে তোর মন ।
রামকৃষ্ণলীলাগীতি করহ শ্রবণ ॥ ৪০৯ ॥

বেদপাঠী বিশ্বনাথ সাধারণ নয় ।
বিদ্যাাগুণ-গরিমার বহু পরিচয় ॥ ৪১০ ॥

বেদমধ্যে বর্ণে বর্ণে পাতায় পাতায় ।
সাধু ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী আছে যে যথায় ॥ ৪১১ ॥

জ্ঞানার্জন-উপায়-বিধান জানা যেটি ।
সাব্যসত্ত্বে কোনমতে নাহি ছিল ত্রুটি ॥ ৪১২ ॥

সকল বিফল গেল দীর্ঘকাল কেটে ।
এখন বাসনা পূর্ণ প্রভুর নিকটে ॥ ৪১৩ ॥

শ্রীপ্রভুর বরশনে দেখে দিনে দিনে ।
জগতে না মিলে যাহা মিলে শ্রীচরণে ॥ ৪১৪ ॥

পরম সম্পদাস্পদ চরণ দুখানি ।
ছড়াছড়ি আছে কাছে নানা রত্নমণি ॥ ৪১৫ ॥

রামের সহিত একদিন আলাপন ।
দক্ষিণশহরে নানা কথোপকথন ॥ ৪১৬ ॥

ভক্তবর ধীরবর বুঝিয়া বারতা ।
ভক্ত রাম জিজ্ঞাসিল শ্রীপ্রভুর কথা ॥ ৪১৭ ॥

আপনি বুঝেন কিবা প্রভুর সম্বন্ধে ।
শুনি ভক্ত উপাধ্যায় ফুলিল আনন্দে ॥ ৪১৮ ॥

প্রসারিয়া দুই হাত করেন উত্তর ।
যদ্যপিহ থাকে কেহ দুনিয়া ভিতর ॥ ৪১৯ ॥

তবে দেখি এই একা শ্রীপ্রভু কেবল ।
অপর যেখানে যত সকলে পাগল ॥ ৪২০ ॥

প্রসন্ন হইয়া প্রভু সদয় হইলে ।
বেদে যা না মিলে তাহা এ'র কাছে মিলে ॥ ৪২১ ॥

এখন কাপ্তেন গেছে অতিশয় মজে ।
মধুভরা শ্রীপ্রভুর চরণ-পঙ্কজে ॥ ৪২২ ॥

অবসর পাইলেই আসে দরশনে ।
কখন লইয়া যায় আপন ভবনে ॥ ৪২৩ ॥

ভক্তিভরে প্রভুবরে করায় ভোজন ।
গৃহিণী আপুনি করে স্বহস্তে রন্ধন ॥ ৪২৪ ॥

ঘৃতপক্ক ভোজ্যসহ নানা তরকারি ।
প্রসিদ্ধ তাঁহার হাতে পাঁঠার চচ্চড়ি ॥ ৪২৫ ॥

ভক্তির ফোড়ন তাই শ্রীপ্রভুর মিষ্ট ।
প্রভুদেব কাপ্তেনের সেবায় সন্তুষ্ট ॥ ৪২৬ ॥

যাহাতে না হয় কর লক্ষ্য সেইখানে ।
আঁচানর আয়োজন ভোজন যেখানে ॥ ৪২৭ ॥

দুইজনে স্ত্রী-পুরুষে ভোজনের পর ।
শ্রীঅঙ্গে ব্যজন করে আনন্দ অন্তর ॥ ৪২৮ ॥

একদিন মলত্যাগে গিয়া পাইখানা ।
ভাবস্থ ঠাকুর নাই বাহ্যিক ঠিকানা ॥ ৪২৯ ॥

কাপ্তেন জানিয়া তবে দ্রুত তথা যায় ।
যথা উপযুক্ত স্থানে প্রভুকে বসায় ॥ ৪৩০ ॥

মনে নাই কোন ঘৃণা আচারী ব্রাহ্মণ ।
অপরূপ প্রভুপদে ভক্তি আচরণ ॥ ৪৩১ ॥

মানামান নাই গ্রাহ্য প্রভুর সেবায় ।
শ্রীপদে এতেক মত্ত ভক্ত উপাধ্যায় ॥ ৪৩২ ॥

কেও-কেটা নয় বড় কাপ্তেন এখন ।
রাজদরবারে পায় উত্তম আসন ॥ ৪৩৩ ॥

মান্যগণ্য মধ্যে নাই মান্যের অবধি ।
বাঙ্গালায় নেপালের রাজ-প্রতিনিধি ॥ ৪৩৪ ॥

এখানে রাজার কাজে যাবতীয় ভার ।
ইংরেজ লাটের সঙ্গে করে দরবার ॥ ৪৩৫ ॥

সেজন কি হেতু হেথা শ্রীচরণে লুটে ।
বিচারিয়া দেখ যদি ভক্তি থাকে ঘটে ॥ ৪৩৬ ॥

জনাকীর্ণ রাজপথে প্রভুকে দেখিলে ।
দণ্ডবৎ প্রণিপাত লুটে পদতলে ॥ ৪৩৭ ॥

শিরে ছত্র শ্রীপ্রভুর নিজে হাতে ধরে ।
ভক্তির কাহিনী কথা কব পরে পরে ॥ ৪৩৮ ॥



হাতে না পাইয়া হরি ভক্তবর রাম ।
বড়ই অধীর চিত্ত অশান্তি পরান ॥ ৪৩৯ ॥

হাহাকার অবিরাম হৃদয়মাঝারে ।
কহিল দুঃখের কথা প্রভুর গোচরে ॥ ৪৪০ ॥

উত্তরে কহেন তাঁরে প্রভু গুণমণি ।
সকল হরির ইচ্ছা কি কহিব আমি ॥ ৪৪১ ॥

বিষম সঙ্কট রোগে স্বপ্ন নাড়ী বহে ।
ভিষক হতাশ বোল যদি তায় কহে ॥ ৪৪২ ॥

শুনিয়া রোগীর যেন বাকি নাড়ী যায় ।
তেমনি হইলা রাম প্রভুর কথায় ॥ ৪৪৩ ॥

অবশ কম্পিত জিহ্বা না হয় চালন ।
অতিকষ্টে কহে রোগী চরম বচন ॥ ৪৪৪ ॥

সেইরূপ প্রভু পরে দত্ত ভক্তবর ।
করিতে লাগিল অতি জড়সড় স্বর ॥ ৪৪৫ ॥

অনাথ-আশ্রয় প্রভু দুর্বলের বল ।
দরিদ্র কাঙ্গালে পথে সহায় সম্বল ॥ ৪৪৬ ॥

হতাশের আশারূপ পিপাসীর বারি ।
কাণা খোঁড়া পতিতের পারের কাণ্ডারী ॥ ৪৪৭ ॥

এই জ্ঞানে এত দিন করি যাতায়াত ।
এখন কি হেতু শিরে হেন ব্রজ্রাঘাত ॥ ৪৪৮ ॥

অধিক কর্কশে প্রভু কন পুনরায় ।
ইচ্ছা হয় এস নয় না এস হেথায় ॥ ৪৪৯ ॥

হইয়াছে এতখানি বয়স আমার ।
লই নাই কার কিছু খাই নাই কার ॥ ৪৫০ ॥

শুনে শিহরাঙ্গ রাম উঠে কাঁপি কাঁপি ।
রুষ্ট বাক্য শ্রীপ্রভুর বাজে বজ্রাদপি ॥ ৪৫১ ॥

বাহিরে আসিয়া মনে করে বারে বারে ।
ধরণী বিদীর্ণ হও প্রবেশি ভিতরে ॥ ৪৫২ ॥

সন্নিকটে সুরধুনী ভাবে আর বার ।
সলিলে ডুবিব প্রাণ রাখিব না আর ॥ ৪৫৩ ॥

প্রাণবিসর্জনে রাম যুক্তি করি স্থির ।
ঘরে না ফিরিয়া রহে মন্দির বাহির ॥ ৪৫৪ ॥

সময় বিগতে প্রাণে আইল মমতা ।
মনে পড়ে স্বপ্নে প্রাপ্ত মন্তরের কথা ॥ ৪৫৫ ॥

বিচারিরা নিজ মনে করিলেন সার ।
মরি তো মরিব মন্ত্র দেখি একবার ॥ ৪৫৬ ॥

ভাগ্যবান স্বপ্নে মন্ত্র পায় যেই জন ।
অপর কাহার নয় প্রভুর বচন ॥ ৪৫৭ ॥

এত ভাবি জপিতে লাগিল প্রাণপণে ।
মরণপ্রতিজ্ঞ রাম মন্ত্র-সংগোপনে ॥ ৪৫৮ ॥

অতিশয় ঘোর নিশি নিশীথের কাল ।
চুপ ধরা গায়ে পরা আঁধারের জাল ॥ ৪৫৯ ॥

ঘুমন্ত জীবন্ত যত প্রাণান্তের প্রায় ।
কলনাদী কাছে গঙ্গা শব্দ নাহি তায় ॥ ৪৬০ ॥

সলিল-শয্যায় যেন ঘুমে অচেতন ।
পান্থশালে পরিশ্রান্ত পথিক যেমন ॥ ৪৬১ ॥

চিরকাল চলা বায়ু মহানিদ্রা যায় ।
সুকোমল সুশীতল গাছের পাতায় ॥ ৪৬২ ॥

গম্ভীর নীরব ভাব জড় কি চেতনে ।
শান্তিময়ী সুষুপ্তি বিরাজ সর্বস্থানে ॥ ৪৬৩ ॥

শান্তি নাই তাঁহে যিনি শাস্তির আকর ।
সর্বশান্তিদাতা প্রভু পরম ঈশ্বর ॥ ৪৬৪ ॥

দুগ্ধফেননিভ শয্যা প্রভুর আমার ।
ছটফট গোটা রাতি নিদ্রা নাহি আর ॥ ৪৬৫ ॥

মুহুর্মুহুঃ সচঞ্চল উচাটন মন ।
সিদ্ধমন্ত্র শ্রীরামের জপের কারণ ॥ ৪৬৬ ॥

থাকিতে না পারি আর হইলা বাহির ।
একবারে রাম যেথা তথায় হাজির ॥ ৪৬৭ ॥

বিষাদ-আশঙ্কা-নাশ ভরসায় ভরা ।
শ্রীপ্রভুর সুমধুর বাক্যের চেহারা ॥ ৪৬৮ ॥

তাহে বলিলেন রামে আপনার ঘরে ।
কিছু দিন ঈশ্বরের ভক্ত সেবিবারে ॥ ৪৬৯ ॥

সাধনাস্বরূপ ভক্ত-সেবা-আচরণ ।
আত্মগণ পক্ষে লাগে বিষম-বন্ধন ॥ ৪৭০ ॥

ভক্ত-সেবা একি বাবা ভাবে দত্ত রাম ।
এ আবার কিবা জ্বালা দিলা ভগবান ॥ ৪৭১ ॥

অর্থব্যয় অতিশয় জঞ্জাল দারুণ ।
যা হোক করিতে হবে প্রভুর হুকুম ॥ ৪৭২ ॥

অর্থাসক্তি বড়ই বিপত্তি ভক্ত জনে ।
ঈশ্বরে না হয় মতি যদি ইহা টানে ॥ ৪৭৩ ॥

তাই ভক্ত-সেবা-বিধি দিলা ভগবান ।
আসক্তি হইতে রামে করিবারে ত্রাণ ॥ ৪৭৪ ॥

সংসারীর বেশে রাম ছেলেপুলে বাড়ি ।
শরীর-শোণিত বুঝে এক কড়া কড়ি ॥ ৪৭৫ ॥

শুন মন কেমনে আসক্তি কৈলা দূর ।
ভবের কাণ্ডারী প্রভু দয়াল ঠাকুর ॥ ৪৭৬ ॥



প্রভু-ভক্তে প্রভু-ভক্তে পরস্পর টান ।
সে কি টান অন্যে কেহ জানে না সন্ধান ॥ ৪৭৭ ॥

সব যার রামকৃষ্ণ একমাত্র পুঁজি ।
সেই রামকৃষ্ণভক্ত ভক্তে তাঁরে রাজী ॥ ৪৭৮ ॥

সম্প্রদায়িভাবহীন সব ধর্ম মানে ।
যে পথে যে যায় তার বাঁকা নহে মনে ॥ ৪৭৯ ॥

সশঙ্কিতচিত যেথা কামিনী-কাঞ্চন ।
রামকৃষ্ণ-পন্থীদের বিশেষ লক্ষণ ॥ ৪৮০ ॥

এবে ধর্মসম্প্রদায়ের ভক্ত যাঁরা জানা ।
এক ধর্মপন্থী করে অন্য জনে ঘৃণা ॥ ৪৮১ ॥

সর্বশ্রেষ্ঠ তাঁর ধর্ম এই মনে করে ।
তুষ কুটি মাটি যাহা অপরে আচরে ॥ ৪৮২ ॥

বিপরীত ধর্মভাব সেই সে কারণ ।
রামকৃষ্ণপন্থী সঙ্গে না হয় মিলন ॥ ৪৮৩ ॥

অন্য সম্প্রদায়ে ভক্ত যাঁরা পরিচিত ।
রামের না হয় মেল তাঁদের সহিত ॥ ৪৮৪ ॥

খুঁজিয়া না পান ভক্ত সেবার কারণ ।
বাহিরের কার সঙ্গে নাহি লাগে মন ॥ ৪৮৫ ॥

ভাবি প্রস্ফুটিত ভক্তি প্রভুর চরণে ।
সামান্য আভাস বাহ্যে সব সংগোপনে ॥ ৪৮৬ ॥

হেন জন দরশনে মনোমত হয় ।
আদর করিয়া রাম আনেন আলয় ॥ ৪৮৭ ॥

সেই সঙ্গে প্রভুদেবে করি নিমন্ত্রণ ।
মহৎ উৎসব করে সহ সংকীর্তন ॥ ৪৮৮ ॥

মহোৎসবে পেয়ে রাম পরম পিরীতি ।
সেবা সহ সংকীর্তন করে নিতি নিতি ॥ ৪৮৯ ॥

ভকত-সেবায় বাড়ে দিন দিন টান ।
টাকায় না থাকে আর টাকার গিয়ান ॥ ৪৯০ ॥

চাকিরে দেখিল ফাঁকি ব্যবহারে ফল ।
দুই হাতে ব্যয় যেন পুকুরের জল ॥ ৪৯১ ॥

ভক্ত-সেবা এই শুরু রামের আগারে ।
বিস্তর হইল কথা কব পরে পরে ॥ ৪৯২ ॥



ভক্ত-সেবা ছিল এক মহা অন্তরাল ।
গেল সরে এইবার ফুটিবার কাল ॥ ৪৯৩ ॥

এখন শ্রীপ্রভুদেব ধরা দিলা তাঁরে ।
শুন কথা একদিন দক্ষিণশহরে ॥ ৪৯৪ ॥

একাধারে শ্রীমন্দিরে রাম সমাসীন ।
আর কত তত্ত্ব-লুব্ধ নবীন প্রাচীন ॥ ৪৯৫ ॥

ভক্তিমাখা হিত-উক্তি ফুটে শ্রীবদনে ।
সুবোধ্য অবোধ্য তত্ত্ব বলিবার গুণে ॥ ৪৯৬ ॥

মুগ্ধমনে সবে শুনে দিন গেল কেটে ।
ঘুরে ঘুরে দিবাকর প্রায় বসে পাটে ॥ ৪৯৭ ॥

গোধুলি ধূসর-বাসে ঢাকে দিবাকর ।
কে লয় এখন আর কালের খবর ॥ ৪৯৮ ॥

ভেবে হবে যেগ মন কি ছিল কথায় ।
প্রবণবিমুগ্ধ বাণী শুনিলে ভুলায় ॥ ৪৯৯ ॥

এল রাতি উর্ধ্বগতি হইল প্রহর ।
তখন ভাঙ্গিলা প্রভু আপনি আসর ॥ ৫০০ ॥

মেঘাচ্ছন্নহেতু অন্ধকারময় নিশি ।
আগে অরণ্য তারা নিশামাণি শশী ॥ ৫০১ ॥

ক্রমে ক্রমে লোকধন লইয়া বিদায় ।
যে দিকে যাহার ঘর সে দিকে সে যায় ॥ ৫০২ ॥

মন্দির জনতাশূন্য সব অন্তর্ধান ।
এই এক ভক্ত সঙ্গে কাছে আছে রাম ॥ ৫০৩ ॥

তিনিও অভয়পদে লইয়া বিদায় ।
আইলা বাহিরে মন্দিরের বারাণ্ডায় ॥ ৫০৪ ॥

প্রেমের যেমন রীতি পাছু চায় যেতে ।
রাম দেখিলেন প্রভু আসেন পশ্চাতে ॥ ৫০৫ ॥

পরম পুলকচিতে ফিরে আসি রাম ।
যুগলচরণে পুনঃ করিল প্রণাম ॥ ৫০৬ ॥

ধরি কল্পতরুরূপ প্রভু ভগবান ।
বলিলেন ভক্ত রামে কিবা চাও রাম ॥ ৫০৭ ॥

রূপেতে কি ফুটে রূপ কিরূপ কথায় ।
কিছুই আভাস তার কহা নাহি যায় ॥ ৫০৮ ॥

নন-বিমোহন ইষ্টরূপ তার খেলে ।
মোহিত ইন্দ্রিয় এত লুটে পদতলে ॥ ৫০৯ ॥

সুন্দর সুঠামে নাই রূপের ঠিকানা ।
সতত বিভোরে হেরে আঁখির কামনা ॥ ৫১০ ॥

সঙ্গে ল'য়ে যোলআনা মনখানি তা্র ।
যেন আঁখি-আবরণে আঁখি না ঢাকায় ॥ ৫১১ ॥

(কিবা চাও) বাক্যমধ্যে কিরূপ বাহির ।
নাশিল পশিয়া হবে আঁধার তিমির ॥ ৫১২ ॥

নূতন নয়ন দিয়া দেখাইলা রামে ।
বাক্য ধরে তত তেজ যত রূপ ঠামে ॥ ৫১৩ ॥

শ্রুতিপ্রীতিরুচিকর একই অধিক ।
বীণা বেণু তুলনায় যেন ধিক্‌ ধিক্‌ ॥ ৫১৪ ॥

শুন শ্রুতি মুগ্ধ অতি মিনতি প্রচুর ।
সদা যেন বাজে তাহে শ্রীবাণী প্রভুর ॥ ৫১৫ ॥

বিহ্বলে দেবেন রাম সৌভাগ্যে সুদিন ।
নাম-কাঁটা ভক্তি-টোলে ধরা দিলা মীন ॥ ৫১৬ ॥

আগে যেই আজ সেই প্রভুর মূরতি ।
তবু তাতে কিবা এক অভিনব ভাতি ॥ ৫১৭ ॥

যাহার প্রভাবে দেখি মনে বলে রাম ।
তুমি সেই বিশ্বশুরু হরি ভগবান ॥ ৫১৮ ॥

তোমার কারণে ফিরি তোমার নিকটে ।
কাঁধেতে কুড়ালি বন বেড়ানু হাঁকুটে ॥ ৫১৯ ॥

কি আর চাহিব প্রভু কহে ভক্ত রাম ।
আপুনি বলিয়া দেন করুণানিধান ॥ ৫২০ ॥

বলিলেন প্রভুদেব মৃদুমন্দ স্বরে ।
আমার প্রদত্ত মন্ত্র মোরে দেহ ফিরে ॥ ৫২১ ॥

সাধন-ভজন-জপে নাহি প্রয়োজন ।
সকল হইল আজ ক্রিয়া-সমাপন ॥ ৫২২ ॥

শুনি ভক্তচূড়ামণি ধরণী লুটায় ।
প্রত্যার্পণ কৈল মন্ত্র শ্রীপ্রভুর পায় ॥ ৫২৩ ॥

পদতলে বিলুপ্তিত ভকতের মাথা ।
দেখিয়া শ্রীপ্রভুদেবে পরম দেবতা ॥ ৫২৪ ॥

মহাভাবাবেশ গায় নাহিক চেতন ।
লুইলেন তালুদেশে দক্ষিণ চরণ ॥ ৫২৫ ॥

হেনভাবে কতক্ষণ গত হ'লে পর ।
আইল বাহ্যিক জ্ঞান শ্রীঅঙ্গ-উপর ॥ ৫২৬ ॥

সরাইয়া শ্রীচরণ কহেন ভক্তবরে ।
মিটাও দর্শন-সাধ দেখিয়া আমারে ॥ ৫২৭ ॥

আর এক কথা যবে আসিবে এখানে ।
এক পয়সার কিছু দ্রব্য এন কিনে ॥ ৫২৮ ॥



দুর্বোধ্য সাধনাতীত ব্যাপ্ত সর্বস্থান ।
বিশ্বাধার বিশ্বাধেয় সর্বশক্তিমান ॥ ৫২৯ ॥

সৃষ্টি-স্থিতি-লয় শক্তি ইশারায় যাঁর ।
অগণ্য ব্রহ্মাও নিত্য মাঠ খেলিবার ॥ ৫৩০ ॥

হাজার হাজার ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর ।
ভৃত্যবেশে যুক্তকর থাকে নিরন্তর ॥ ৫৩১ ॥

লীলা নিত্যে দুয়ে যিনি সদা বিদ্যমান ।
অনাদি অনন্ত পরা পুরুষপ্রধান ॥ ৫৩২ ॥

মনাদি ইন্দ্রিয় যত সকলের পার ।
তিল শক্তি নাহি গায় তিল বুঝিবার ॥ ৫৩৩ ॥

লীলাশক্তি সঙ্গে সদা ক্রীড়া নিরন্তর ।
যত কিছু সৃষ্টিমধ্যে যাঁহার ভিতর ॥ ৫৩৪ ॥

জড় কি চেতন যত তাঁর মধ্যে খেলে ।
জলচর বিচরণ যেন করে জলে ॥ ৫৩৫ ॥

কোনকালে কার সত্তা থাকে না সে বিনে ।
এতদূর মাখামাখি কায়-বাক্য-মনে ॥ ৫৩৬ ॥

হাতে ধ'রে নিয়ে ঘুরে সঙ্গে হাসে কাঁদে ।
স্বাধীনে স্বাধীন বন্দী যদি কেহ বাদে ॥ ৫৩৭ ॥

ধ'রে আছে কিন্তু তাঁরে ধরিবারে গেলে ।
খুঁজিয়া না পাওয়া যায় কোথা যায় চলে ॥ ৫৩৮ ॥

দুনিয়া খুঁজিলে নাহি মিলে দরশন ।
যেমন সহজ পুনঃ দুর্লভ তেমন ॥ ৫৩৯ ॥

শুনিতে বড়ই সোজা অনায়াসে মিলে ।
ছাঁচায় ছাঁচায় জল বরিষার কালে ॥ ৫৪০ ॥

নিশ্ছিদ্র হইলে পাত্র জল ধরে তায় ।
সছিদ্রে এদিকে ঢুকে ওদিকে বেরায় ॥ ৫৪১ ॥

সোজা কথা ভগবান অবতার-কালে ।
সমভাবে দেখে শুনে মানুষসকলে ॥ ৫৪২ ॥

ভ্রান্ত কথা ইহা লীলা কর দরশন ।
সূক্ষ্মেতে যেমন দূর স্থলেতে তেমন ॥ ৫৪৩ ॥

নর-রূপে বড় ফের গুপ্ত সাজ গায় ।
ভোজের যাদুর সম জিয়াদা ভুলায় ॥ ৫৪৪ ॥

'এও বটে ওও বটে' শুন শুন মন ।
হাজার না থাক চাঁদে মেঘ-আবরণ ॥ ৫৪৫ ॥

মেঘভেদী কর ঢাকা কখন না পড়ে ।
নানা দিকে নানা ভাবে ধারা বেয়ে ঝরে ॥ ৫৪৬ ॥

তেমতি যদিও প্রভু মায়ার ভিতর ।
তবু অঙ্গে ফুটে কোটি চন্দ্রিমার কর ॥ ৫৪৭ ॥

হীনমতি মন তুমি কব কি আখ্যান ।
দুর্বলের বেশে প্রভু সর্বশক্তিমান ॥ ৫৪৮ ॥

অবিদ্যারূপিণী মায়া কামিনী-কাঞ্চনে ।
আধিপত্য দিবারাত্র করে জগজনে ॥ ৫৪৯ ॥

দেব কি কিন্নরজাতি কেহ নাহি ছাড়া ।
সকলে ঘুরায় দুয়ে লাটিমের পারা ॥ ৫৫০ ॥

এমন মায়ার বল হত যাঁর জোরে ।
তাঁহার অপেক্ষা বলী বল তুমি কারে ॥ ৫৫১ ॥

সর্বশক্তিমান প্রভু দীনের চেহারা ।
কৃপা করি ভক্ত রামে আজ দিলা ধরা ॥ ৫৫২ ॥

ভক্ত-সংজোটন-লীলাকাও বলিহারী ।
সংসার-জলধি-পারে যাইবার তরী ॥ ৫৫৩ ॥