তৃতীয় খণ্ড

কুমার সন্ন্যাসী যোগীন্দ্র ও বহু অন্তরঙ্গের আগমন
(বহিরঙ্গের আগমন ও হৃদয়ের বিদায়)

(উপেন্দ্র মজুমদার, নবাই চৈতন্য, ভবনাথ, লাট্টু, হরিশ, কেদার, মহিম, প্রাণকৃষ্ণ, গোপালের মা, দুর্গাচরণ, সুরেশ দত্ত, হৃদয়ের বিদায়, যোগীন-মা, গৌর-মা)

জয় প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


শ্রবণকীর্তনানন্দ প্রভুর ভারতী ।
স-মনে শুনিলে মিলে বন্ধনে মুকতি ॥ ১ ॥

মনোযোগসহ মন করিয়া শ্রবণ ।
টুটাইয়া দেহ মোর মায়ার বন্ধন ॥ ২ ॥

সমাচারপত্রিকায় মহিমা প্রভুর ।
লিখেন কেশবচন্দ্র সাধ্য যত দূর ॥ ৩ ॥

সুন্দর বর্ণনাসহ মনোমুগ্ধকর ।
ছটি পায়ে কেশবের লক্ষ কোটি গড় ॥ ৪ ॥

তিনিই কেবল মূল ভক্ত-সংজোটনে ।
ভক্তি মিলে কেশবের মুরতি-স্মরণে ॥ ৫ ॥

সারগ্রাহী গুণগ্রাহী সূক্ষ্ম দৃষ্টি তার ।
বহিরঙ্গে কেশবের মত মেলা দায় ॥ ৬ ॥

লীলা কব তুলনা বাসনা মম নয় ।
ন্যূন নহে পূজনীয় গোস্বামী বিজয় ॥ ৭ ॥

ভাবি প্রস্ফুটিত ফুলে সৌরভ গোপন ।
তেমতি বিজয় এবে কলিকা নূতন ॥ ৮ ॥

পরিচয় হইয়াছে শ্রীপ্রভুর সাথে ।
বড় সংকীর্তন-প্রিয় প্রভুর কৃপাতে ॥ ৯ ॥

মনে রেখ ব্রাহ্ম তিনি কেশবের দলে ।
সাকারে বেজার তাই কালি দিল কুলে ॥ ১০ ॥

খুলে কথা কব পরে যতেক তাঁহার ।
এবে তিনি ডেলা সোনা বাটের আকার ॥ ১১ ॥

মনোহর অলঙ্কার সুন্দর সজ্জিত ।
মণি মুক্তা-মরকতে করিয়া ভূষিত ॥ ১২ ॥

গঠিলা কেমনে তাঁরে প্রভু কারিগর ।
দেখিবে চতুর্থ খণ্ড পুঁথির ভিতর ॥ ১৩ ॥

পুড়ন পিটন এবে গড়নের কথা ।
ঘুচে যায় শুনিলে মনের মলিনতা ॥ ১৪ ॥



এখন কেশব ব্রাহ্মধর্মে রথী একা ।
গগন উপরে উড়ে যশের পতাকা ॥ ১৫ ॥

দেশ জুড়ে সকলেই নাম-গুণ গায় ।
বড় খুশী তাঁহার লিখিত পত্রিকায় ॥ ১৬ ॥

মনোযোগে ছেলে বুড়ো ঘরে ঘরে পড়ে ।
পত্রপাঠে ভক্ত এক আইলা আসরে ॥ ১৭ ॥

দক্ষিণশহরে ঘর ব্রাহ্মণ-কুমার ।
ষোড়শ-বৎসর বয়ঃ বাপ জমিদার ॥ ১৮ ॥

মুখখানি হাসিমাখা সরল গঠন ।
প্রফুল্ল বদনে শোভে সুন্দর নয়ন ॥ ১৯ ॥

নিরখি না হেন আঁখি লোকের ভিতরে ।
দেখিলে দেখিতে ইচ্ছা দিবারাতি করে ॥ ২০ ॥

কান দিকে যেই প্রান্ত ঊর্ধ্বে তার টান ।
ধনুকের মত করে ভুরুর সন্ধান ॥ ২১ ॥

সেই পথে চলে অশ্রু ঝরে যবে তাঁর ।
নিম্নগা জলের নাম জলেতে ভাসায় ॥ ২২ ॥

পরিচয়ে নিত্যযুক্ত লজ্জা আবরণ ।
ঈশ্বরকোটির থাকে প্রভুর বচন ॥ ২৩ ॥

একমাত্র লোকলজ্জা সাজের ভিতর ।
রিপুগণ গায়ে যেন মৃত বিষধর ॥ ২৪ ॥

কিংবা যেন টল-মূল বৃদ্ধের দশন ।
আদি নহে কাল যার নিশ্চয় পতন ॥ ২৫ ॥

শৈশবে শিশুর সঙ্গে খেলা যে সময় ।
শিশুর মতন খেলা প্রীতিকর নয় ॥ ২৬ ॥

ভেঙ্গে দিয়া খেলাশাল সঙ্গী পরিহরি ।
ক্ষুণ্ণ-মনে একপ্রান্তে দাঁড়াতেন ফিরি ॥ ২৭ ॥

কেন হেন সঙ্গিগণ জিজ্ঞাসিলে পরে ।
বলিতেন মুখ ভারি যত সহচরে ॥ ২৮ ॥

আমার খেলুনি আছে, আছে খেলা-ঘর ।
সে নয় এখানে আছে আছে সহচর ॥ ২৯ ॥

স্বতন্তর আছে কোথা দেখি দেখি বলি ।
দেখিতে দেখিতে যেন পুনরায় ভুলি ॥ ৩০ ॥

সুন্দর বড়ই তারা সকলেই ভাল ।
লতায় লতায় ঘর ফুলে ফুলে আলো ॥ ৩১ ॥

সে খেলা সে বেশ খেলা নয় হেন রীতি ।
সেথা বাই তোরা নোস খেলিবার সাথী ॥ ৩২ ॥

বলিতে দেখিতে হেন জাগিয়া স্বপন ।
নিজ মনে পথে পথে ঘরে আগমন ॥ ৩৩ ॥

শৈশব বয়স পরে কিছু বড় হ'লে ।
পাঠশিক্ষা-হেতু পিতা দিলা পাঠশালে ॥ ৩৪ ॥

তখন রজনীযোগে প্রায় প্রতি নিশি ।
শুইবার ঘরে তাঁর জ্বলে জ্যোতিঃরাশি ॥ ৩৫ ॥

গোটা ঘর জ্যোতির্ময় জ্যোতির ছটায় ।
ঘরে কোনখানে কিবা সব দেখা যায় ॥ ৩৬ ॥

এখন যোড়শ বর্ষ মাত্র বয়ঃক্রম ।
লেখা-পড়া শিখিবারে নাহি তত মন ॥ ৩৭ ॥

স্বভাবতঃ কামিনীতে অতিশয় ঘৃণা ।
ধর্মতত্ত্ব ব্যক্ত যাহে তাই পড়া শুনা ॥ ৩৮ ॥

আজি কালি কেশবচন্দ্রের পত্রিকায় ।
আগাগোড়া থাকে ভরা ধর্মের কথায় ॥ ৩৯ ॥

সে হেতু আদরে পত্রপাঠ নিতি নিতি ।
বারে বারে চোখে পড়ে প্রভুর ভারতী ॥ ৪০ ॥

প্রভুর দর্শন-আশে লোলুপ হইয়া ।
পুরীতে আসেন ঘরে কিছু না কহিয়া ॥ ৪১ ॥

সভয়-অন্তর একা লজ্জা তাঁর খেলে ।
সঙ্গে নাই দাস-দাসী ধনাঢ্যের ছেলে ॥ ৪২ ॥

মন্দির বাহিরে হয় প্রভুর তল্লাস ।
প্রবেশিতে ভিতরে অন্তরে আসে ত্রাস ॥ ৪৩ ॥

অচেনা শ্রীপ্রভুদেব মূর্তি নাই চেনা ।
কে পরমহংস কিছু না পান ঠিকানা ॥ ৪৪ ॥ 



এইরূপে যাতায়াত হয় বারে বারে ।
দরশনে একদিন সুযোগ মন্দিরে ॥ ৪৫ ॥

ঘরভরা লোক দূরে ঠিক করা ভার ।
গঙ্গাপানে মন্দিরের বিমুক্ত দুয়ার ॥ ৪৬ ॥

তফাতে দাঁড়ায়ে পথে হৈল অনুমান ।
এখানে আছেন যাঁর এতই সন্ধান ॥ ৪৭ ॥

কিবা ঈশ্বরীয় কথা হয় আলোচনা ।
দুই কান পাতি রহে যদি যায় শুনা ॥ ৪৮ ॥

হেনকালে অকস্মাৎ কোন এক জন ।
লয়ে গেল শ্রীমন্দিরে যথা নারায়ণ ॥ ৪৯ ॥

শ্রীমন্দিরে আজি ব্রাহ্মগণের বাজার ।
নাম জয়গোপাল উপাধি সেন তাঁর ॥ ৫০ ॥

আর আর সম্ভ্রান্ত অনেক লোক সাথে ।
এসেছেন পূজ্যতম প্রভুরে দেখিতে ॥ ৫১ ॥

কথোপকথন শেষ কাল ফিরিবার ।
বিদায়ান্তে প্রভুদেবে করে নমস্কার ॥ ৫২ ॥

একে একে যতগুলি সব গেল সরে ।
ব্রাহ্মণকুমার দেখে বসে একধারে ॥ ৫৩ ॥

যোগীন্দ্র ইহার নাম মহাভাগ্যবান ।
ধনাঢ্য নবীনচন্দ্র রায়ের সন্তান ॥ ৫৪ ॥

যোগীন্দ্র যেমন নাম তেন গুণযুক্ত ।
তেন মিতা যোগসিদ্ধ যেন নিত্যযুক্ত ॥ ৫৫ ॥

'আগে ফল পরে ফুল ফলে যে প্রকার ।'
সেইমত প্রভুভক্ত অঙ্গ যাঁরা তাঁর ॥ ৫৬ ॥

জৈব রূপে শৈব ভাব বৈভব গোপন ।
মহাধাঁধা অন্ধে লাগে বন্ধ যেই জন ॥ ৫৭ ॥

অগুদ্ধি জীবের বুদ্ধি কুঞ্চিত মলিনে ।
বংশ সম ঘুণে জয়া কামিনী-কাঞ্চনে ॥ ৫৮ ॥

হৃদয় প্রত্যয়হীন ক্ষীণ মন্দ গতি ।
উপহাস-যত্ন যার কৃষ্ণলীলাগীতি ॥ ৫৯ ॥

স্ব স্ব জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ মানে অন্যে করে ঘৃণা ।
ধর্ম-আচরণ ভান যশের বাসনা ॥ ৬০ ॥

পরছিদ্র অন্বেষক পরনিন্দাপর ।
ধীনমতি নাই শক্তি দেখে নিজ ঘর ॥ ৬১ ॥

বুঝে না বুদ্ধির দোষে বিধির লিখন ।
সুধার আস্বাদ-হেতু বিষের জনম ॥ ৬২ ॥

নিজের যেমন তেন অপরের জ্ঞান ।
মত-ভেদ মাত্র পথে সকলে সমান ॥ ৬৩ ॥

এ গিয়ান ঘটে কভু নাহি খেলে তার ।
বিক্ ধিক্ জীববুদ্ধি কেবল ঘৃণার ॥ ৬৪ ॥

হীন হেয় যে জীবের বুদ্ধি এইরূপ ।
কেমনে সম্ভব দেখে প্রভুর স্বরূপ ॥ ৬৫ ॥

ভক্তগণ অঙ্গ তাঁর জীবের আধারে ।
নিত্যযুক্ত নিত্যসিদ্ধ মুক্তি দিতে পারে ॥ ৬৬ ॥

নবীনে প্রবীণ-বুদ্ধি না শিখে পণ্ডিত ।
বুঝিবে শুনহ রামকৃষ্ণলীলাগীত ॥ ৬৭ ॥

বড় খুশী প্রভু দেখি ব্রাহ্মণ কুমার ।
জিজ্ঞাসিলা কোথা ঘর কেবা পিতা তাঁর ॥ ৬৮ ॥

পরিচয়ে শ্রীপ্রভু অধিক আনন্দিত ।
বালকের পিতা তাঁর খুব পরিচিত ॥ ৬৯ ॥

সোহাগে ধরিয়া হাত পুনশ্চ জিজ্ঞাসা ।
কি মনে করিয়া আল এইখানে আসা ॥ ৭০ ॥

আমারে দেখিরা ধনে কি হয় তোমার ।
হৃদয়ে প্রত্যয় কিথা কহ সমাচার ॥ ৭১ ॥

সরলে যোগীন্দ্র কৈল উত্তর প্রদান ।
অন্য কেহ নই তুমি নিজে ভগবান ॥ ৭২ ॥

শুন ঘন অল্পবয়ঃ বালকের কথা ।
কেমনে বুঝিলা বল নিগুঢ় বারতা ॥ ৭৩ ॥

কেমনে চিনিলা তাঁরে কি দেখিলা তাঁর ।
মহাগুণ আবরণ নরসাজ গায় ॥ ৭৪ ॥

মূর্খ আমি শাস্ত্র-গ্রন্থে বুদ্ধি বড় আন ।
শক্তি নাই দিতে অল্প লীলার প্রমাণ ॥ ৭৫ ॥

জানি রামকৃষ্ণ প্রভু ঠাকুর আমার ।
এ লীলায় প্রমাণেতে শ্রীবাক্য তাঁহার ॥ ৭৬ ॥

তন্ত্রগীতাবেদাপেক্ষা বহু গুরুতর ।
শ্রীবদন-বিগলিত যে কোন অক্ষর ॥ ৭৭ ॥

ফি বাক্যের প্রতিবর্ণ সিন্ধুর মতন ।
কে লবে কতই তার এত রত্ন ধন ॥ ৭৮ ॥

প্রমাণেতে শুন তবে প্রভুর বচন ।
একবার দরশনে চিনে কোন্ জন ॥ ৭৯ ॥

ঈশ্বরকোটীর থাকে অঙ্গের মতন ।
নিত্যশুদ্ধ নিতাযুক্ত নিত্য-সচেতন ॥ ৮০ ॥

যেথা সেথা সঙ্গে সঙ্গে কভু নহে ছাড়া ।
তাঁরাই দেখিবামাত্র ঠিক পান ধরা ॥ ৮১ ॥

বুঝ তবে এবে কেবা ব্রাহ্মণ-কুমার ।
চিনিলেন কিবা বলে প্রভু অবতার ॥ ৮২ ॥

পুনরায় প্রভুরায় পুছিলেন তারে ।
কেহ নাহি কহে হেন দক্ষিণশহরে ॥ ৮৩ ॥

কেমনে চিনিলে বা কি বুঝিলে প্রমাণ ।
কি হেতু আমারে তুমি কহ ভগবান ॥ ৮৪ ॥

শুন মন বালকের উত্তরের ছটা ।
লীলাগ্রন্থ পাতা মাত্র নাহি যার ঘাঁটা ॥ ৮৫ ॥

তথাপিহ লীলা যত বিধিমত জানা ।
স্মৃতিপথে যুথে যুথে করে আনাগোনা ॥ ৮৬ ॥

যোগীন্দ্র কহেন কথা কৃষ্ণ-অবতারে ।
জনম যখন হয় কংস-কারাগারে ॥ ৮৭ ॥

চারিধারে নিযুক্ত প্রহরী অগণন ।
তাহাদের মধ্যে ভক্ত দুই এক জন ॥ ৮৮ ॥

ভক্তিবলে জনম জানিয়া শ্রীকৃষ্ণের ।
চুপে চুপে জাগে অন্য নাহি পায় টের ॥ ৮৯ ॥

কেমনে পাইবে টের আঙুর নিদ্রায় ।
বিশ্বজনবিমোহিনী মায়ার মায়ায় ॥ ৯০ ॥

জেগে আছে দ্বারিদ্বয়ে তাহার কারণ ।
করিবারে আঁখিভরে কৃষ্ণ দরশন ॥ ৯১ ॥

বিলক্ষণ জানে বসুদেব পিতা তাঁর ।
যাবে চলে কৃষ্ণ কোলে যমুনার পার ॥ ৯২ ॥

সেইমত লোক যত দক্ষিণশহরে ।
দেখিবে কেমনে আছে মায়াতম ঘোরে ॥ ৯৩ ॥

জাগন্ত দু-এক জন দেখিবারে পায় ।
পুরীতে বিরাজে নিজে রামকৃষ্ণরায় ॥ ৯৪ ॥

কেবা এ যোগীন্দ্র পরে পাইবে বারতা ।
প্রথম দর্শনে আজি এইতক কথা ॥ ৯৫ ॥



সন্দহীন প্রভুলীলা সন্দে-গড়া মন ।
বিশ্বাসনাশক সন্দ তিমির-বরন ॥ ৯৬ ॥

এখানের লোক কেন না পায় সন্ধান ।
প্রভুর শ্রীবাক্যে শুন তাহার প্রমাণ ॥ ৯৭ ॥

একদিন বহু ভক্ত শ্রীপ্রভু যেথায় ।
উঠিল এ কথা সেথা কথায় কথায় ॥ ৯৮ ॥

জিজ্ঞাসিল প্রভুদেবে কোন ভক্তোত্তম ।
দক্ষিণশহরে লোক কেন এ রকম ॥ ৯৯ ॥

দূর-দূরান্তর হতে হাজার হাজার ।
আসিয়া পুরার আশা সাধ যেন যার ॥ ১০০ ॥

মৃদু হাসি প্রভুদেব উত্তরিলা তাঁরে ।
দেখ না গাভীর দশা গঙ্গার গহ্বরে ॥ ১০১ ॥

দড়িতে রয়েছে বাঁধা খোঁটায় নিকটে ।
পিপাসার প্রাণ যায় ছাতি যায় ফেটে ॥ ১০২ ॥

অতি সন্নিকটে জল স্রোত বয়ে যায় ।
যেতে নারে ছোট দড়ি আবদ্ধ গলায় ॥ ১০৩ ॥

দূরে যারা আছে ছাড়া আসে পালে পালে ।
পিপাসা মিটায় মুখ ডুবাইয়া জলে ॥ ১০৪ ॥

এখানে আটক লোক যদিও নিকটে ।
মোহিনী মায়ার বদ্ধ বলে নাহি আঁটে ॥ ১০৫ ॥

রামকৃষ্ণলীলাগীতি বড়ই মধুর ।
যতই শুনিবে তত তাপ হবে দূর ॥ ১০৬ ॥

ভক্তবর রাম আর শ্রীমনোমোহনে ।
মত্তবৎ ধরা পেয়ে প্রভু-নারায়ণে ॥ ১০৭ ॥

কলিতে অবাক্‌ কথা দীন-বেশ গায় ।
নর-সাজে বিরাজেন প্রভুদেবরায় ॥ ১০৮ ॥

সাজের বাঁধনি কিবা বিহীন লক্ষণ ।
পাঁশেতে পাবক ঢাকা নরে নারায়ণ ॥ ১০৯ ॥

আত্মহর রঙ্গ দেখি কহে দুই ভাই ।
আমাদের প্রভুদেব জগৎগোসাঁই ॥ ১১০ ॥

কে শুনে কাহার কথা বড়ই জঞ্জাল ।
বিশ্বাসবিহীন ধরা ঘোর কলিকাল ॥ ১১১ ॥

এতই কূপেতে মগ্ন মানুষের মন ।
কৃষ্ণ মিলে লক্ষে কথা কহে একজন ॥ ১১২ ॥

কাজেই রামের কথা কানে নাহি ঢুকে ।
বরঞ্চ পাগল বলি গালি দেয় লোকে ॥ ১১৩ ॥

নর-বেশ নারায়ণ চেনা অতি ভার ।
প্রভুর বচনে শুন প্রমাণ তাহার ॥ ১১৪ ॥

রাম-অবতারে রাম যবে যান বনে ।
চিনিতে পারিল মাত্র মুনি সাত জনে ॥ ১১৫ ॥

পূর্ণব্রহ্ম সনাতন পুরুষ প্রধান ।
অবতীর্ণ ধরাতলে সীতাপতি রাম ॥ ১১৬ ॥

অপরে যতেক যত বুঝে বিলক্ষণ ।
দশরথ-সুত রাম নৃপতি নন্দন ॥ ১১৭ ॥

চির-চেনা না হইলে চেনা মহাযায় ।
নরদেহে সর্বেশ্বর বিহরে ধরায় ॥ ১১৮ ॥

ক্ষুদ্রতম আকারেতে বালির মতন ।
উপমায় ঠিক যেন বীজের গড়ন ॥ ১১৯ ॥

গোপনে নিহিত থাকে নাহি যায় দেখা ।
প্রকাও প্রকাণ্ড কাণ্ড অগণন শাখা ॥ ১২০ ॥

কত শত পত্র ফুল সৌরভ অতুল ।
নানারস-সমবেত সুন্দর মুকুল ॥ ১২১ ॥

নানাবিধ গুণ নানা বর্ণের চেহারা ।
কত কোটি কোটি ফল মিষ্ট রসে ভরা ॥ ১২২ ॥

এইমত ঋণ শক্তি ক্ষুদ্র তন্ন ধরে ।
বৃক্ষের সম্পত্তি যেন বীজের ভিতরে ॥ ১২৩ ॥

সত্যকথা অনায়াসে নহে দরশন ।
জীবে না বুঝিতে পারে শ্রীপ্রভু কেমন ॥ ১২৪ ॥

তথাপিহ ভক্ত রাম কন বারে বারে ।
জানা পরিচিত কিবা চোখে দেখে যারে ॥ ১২৫ ॥

অগণ্য লোকের মধ্যে অতি অল্প প্রায় ।
শুনে আসে প্রভুপাশে রামের কথায় ॥ ১২৬ ॥

আসে যাঁরা তার মধ্যে দ্বিবিধ প্রকার ।
প্রথম প্রভুর যাঁরা ভক্ত আপনার ॥ ১২৭ ॥

লীলার প্রথমকালে তফাতে তফাতে ।
প্রভুর নামের বীজ পোঁতা হৃদি-ক্ষেতে ॥ ১২৮ ॥

দ্বিতীয় মুমুক্ষু যার মুক্তি আকিঞ্চন ।
পূর্বজন্মে করিয়াছে সাধন-ভজন ॥ ১২৯ ॥

সমাপন এইবারে দড়ি যাবে কেটে ।
শুনিয়া প্রভুর নাম কাছে আসে ছুটে ॥ ১৩০ ॥

কেবা কিবা নিজ মনে বুঝে লহ মন ।
আমার উদ্দেশ্য ইহা ভক্ত-সংজোটন ॥ ১৩১ ॥



আইলা রামের মামা-শ্বশুর সম্পর্কে ।
উপেন্দ্র মজুমদার দণ্ডবৎ তাঁকে ॥ ১৩২ ॥

ধীর নম্র বিনয়ী বদনে মাখা রস ।
শ্রবণে করেন কাজ রসনা অবশ ॥ ১৩৩ ॥

দায়ে যদি কন কথা ফাঁকে না বেরায় ।
অধরে ফুটিয়া ভাবা অধরে মিশায় ॥ ১৩৪ ॥



কাছে কোন্নগরে মনোমোহনের ঘর ।
সেখানেও এ সময় লাগিল রগড় ॥ ১৩৫ ॥

বহু দিন আগে হতে এই গণ্ডগ্রামে ।
বাতায়াত শ্রীপ্রভুর অনেকেই জানে ॥ ১৩৬ ॥

প্রকট সমর শুনে জুটে ভক্তগণ ।
নবাইচৈতন্য এক আইল এখন ॥ ১৩৭ ॥

বয়স অধিক ধর্ম-উপার্জনে আঠা ।
সজ্জন সংসারী মনোমোহনের জ্যেঠা ॥ ১৩৮ ॥



জুটিলেন ভবনাথ পরম সুন্দর ।
বরাহনগর কাছে গঙ্গাতীরে ঘর ॥ ১৩৯ ॥

নবীন বয়স তেহ ব্রাহ্মণের ছেলে ।
উচ্চবিদ্যালয়ে পাঠ হয় এই কালে ॥ ১৪০ ॥

আত্মবন্ধু প্রতিবাসী করে উপহাস ।
শুনিয়া প্রভুর পদে তাঁহার বিশ্বাস ॥ ১৪১ ॥

দক্ষিণশহর সম সন্নিকট গ্রামে ।
সকলেই প্রায় প্রভুদেবে নাহি চিনে ॥ ১৪২ ॥

শুনিয়াছে নাম যারা বুঝে অবিকল ।
প্রভুদেব এক জনা উন্মাদ পাগল ॥ ১৪৩ ॥

বিফল হইল জন্ম কপালের ফেরে ।
বহুভাগ্যে জন্ম যদি প্রভু-অবতারে ॥ ১৪৪ ॥

কর্মফলে বিড়ম্বনা এ কি পরমাদ ।
সাধ নাই দেখিবারে অকলঙ্ক চাঁদ ॥ ১৪৫ ॥

চির-হৃদিতম যাঁর দরশনে হরে ।
ভবের বন্ধন গোটা কাটে একেবারে ॥ ১৪৬ ॥

জন্ম-জন্মার্জিত বিষময় কর্মফল ।
এক নমস্কারে তারে দেয় রসাতল ॥ ১৪৭ ॥

অগতির মিলে গতি মুক্তি এক পলে ।
অমৃত লহর রঙ্গ উজায় গরলে ॥ ১৪৮ ॥

দরশনে নমস্কারে যাঁরে এতদূর ।
বুঝ মন কিবা প্রভু দয়াল ঠাকুর ॥ ১৪৯ ॥

অনায়াসে হেসে হেসে ভবসিন্ধু পার ।
মানুষ-বুদ্ধিতে বড় লাগিল বেজার ॥ ১৫০ ॥

শাবাশ মানুষ-বুদ্ধি কি কহিব তারে ।
বলিহারী দাঁড়ী দেহ-তরীর উপরে ॥ ১৫১ ॥

স্বভাব পাথার-পথে দিবারাতি গতি ।
উড়ায়ে প্রলোভী পাল অবিদ্যার স্মৃতি ॥ ১৫২ ॥

স্মৃতি অতি বেগবতী শূন্য পথে উড়ে ।
কামিনী-কাঞ্চন-আশা-পবনের জোরে ॥ ১৫৩ ॥

যতক্ষণ অকূলে নাহিক ডুবে তরী ।
তাহার কি ক্ষতি মন ধোপাঘরে চুরি ॥ ১৫৪ ॥

অন্যে পরে ডুবাইতে জনম তাহার ।
সতত নীরবে করে কার্য আপনার ॥ ১৫৫ ॥

যতদিন অবিদিত থাকে তার বল ।
জীবের আদতে নাই তিলেক মঙ্গল ॥ ১৫৬ ॥

সাধনা-সাগর-ছেঁচা দুর্লভ রতন ।
জন্ম-জয়া-পাপ-তাপ-কলুষ-নাশন ॥ ১৫৭ ॥

জীবে যুক্তি দরশনে পরশনে যাঁর ।
অঙ্গহীনে দুঃখী দীনে দয়াল আচার ॥ ১৫৮ ॥

জীবের কল্যাণ-ব্রতে ব্রতী অনুক্ষণ ।
বিষবৎ আত্মসুখে দিয়া বিসর্জন ॥ ১৫৯ ॥

পতিত-পাবন-ভাব অগতির গতি ।
দয়াময় কায়াখানি দয়ার মূরতি ॥ ১৬০ ॥

স্থিতি গতি কর্মে মতি দয়ায় যাঁহার ।
দয়া বিনা দেহে কিছু নাহি অন্য আর ॥ ১৬১ ॥

শিবময় সনাতন পুরুষপ্রধানে ।
বৃদ্ধি-ঘোষে নাহি দিল দেখিতে নয়নে ॥ ১৬২ ॥

হেন বুদ্ধি হতে মুক্ত কর প্রভুবর ।
দীনবন্ধু দীননাথ দয়ার সাগর ॥ ১৬৩ ॥

পুনঃ এই বুদ্ধি লয়ে নরের উন্নতি ।
বিমানে উড়ায়ে রথ শূন্যে করে স্থিতি ॥ ১৬৪ ॥

বুদ্ধি-বলে পলে চলে যোজনের পথ ।
রাখে হাতে পঞ্চভূতে লিখাইয়া খৎ ॥ ১৬৫ ॥

ধরণীর দুই প্রান্তে বসি দুই জনে ।
পরস্পর কর কথা কত রেতে দিনে ॥ ১৬৬ ॥

অলঙ্ঘ্য সাগর-পারে করে অধিকার ।
জলের উপরে নীচে বিপণি বাজার ॥ ১৬৭ ॥

নানাবিধ ভাবা নানা শাস্ত্র-আলাপনা ।
দেশ-বিদেশেতে বেড়ে যশের ঘোষণা ॥ ১৬৮ ॥

নৃপতি মুকুটসহ স্বর্ণ-সিংহাসন ।
কোষাগার পূর্ণ নানা নিধি-রত্ন-ধন ॥ ১৬৯ ॥

নাম-দাপে কাঁপে যম তালপত্র প্রায় ।
কথায় মানুষে মারে বাঁচার কথায় ॥ ১৭০ ॥

বৃহত্তম-কার পণ্ড কথা শুনে চলে ।
বাঘে মৃগে এক সঙ্গে মহারঙ্গে খেলে ॥ ১৭১ ॥

কুরূপে সুরূপ মিলে অঙ্গ অঙ্গহীনে ।
বোবা যেবা কর কথা কালা শুনে কানে ॥ ১৭২ ॥

বৃদ্ধিতে কতই করে কহা মহাযায় ।
বিধির বিধান-লিপি সাগরে ডুবায় ॥ ১৭৩ ॥

ছার মান-খ্যাতি-ধনে প্রলোভিত করি ।
ডুবায় অকূল জলে মানুষের তরী ॥ ১৭৪ ॥

হেন বুদ্ধি হতে রক্ষা কর ভগবান ।
দুর্গতি-তারক প্রভু কল্যাণনিধান ॥ ১৭৫ ॥

এইখানে মন যদি প্রশ্ন কর মোরে ।
কি লয়ে চলিবে জীব বুদ্ধিবল ছেড়ে ॥ ১৭৬ ॥

শুন তবে কই কথা কথার উত্তর ।
অবিদ্যা-তোষিণী বুদ্ধি পায়ে তার গড় ॥ ১৭৭ ॥

ধন মান-যশ-আশা যে বুদ্ধিতে আনে ।
অবিদ্যা-তোষিণী বুদ্ধি তাহারে বাখানে ॥ ১৭৮ ॥

মহান্ ইহার শক্তি সৃষ্টির ভিতরে ।
ভগবান বিনা ইহা সব দিতে পারে ॥ ১৭৯ ॥

উজ্জ্বল ঐশ্বর্যে মুগ্ধ করে ত্রিভুবন ।
সৎপথ অন্তরালে রাখি আচ্ছাদন ॥ ১৮০ ॥

সদসৎ দুই এক বুদ্ধির ভিতর ।
সৎবুদ্ধি নাম যার পরম সুন্দর ॥ ১৮১ ॥

অসতে অবিদ্যা তুষ্ট করে দিবারাতি ।
সতে সদা জ্বালে হৃদে অনুরাগ-বাতি ॥ ১৮২ ॥

মহান্ আনন্দময় পরম ঈশ্বর ।
একমাত্র এই সৎ-বুদ্ধির গোচর ॥ ১৮৩ ॥

সৎবুদ্ধি বিনা পথে রক্ষা আশা নাই ।
মাগিয়া চাহিয়া লহ শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ॥ ১৮৪ ॥

এক বুদ্ধি কিসে হয় দ্বিবিধ প্রকার ।
জিজ্ঞাসিলে মন যদি শুন সমাচার ॥ ১৮৫ ॥

ফটিকের ধর্ম নষ্ট ধরা-পরশনে ।
পুনশ্চ ফটিক হয় ভাস্করের টানে ॥ ১৮৬ ॥

ধরায় কি শূন্যে দেখ সেই এক জল ।
গুণে ভিন্ন হেথা সেথা সমল বিমল ॥ ১৮৭ ॥

প্রভু-ভক্ত ভবনাথ সৎবুদ্ধিগুণে ।
পরের ব্যঙ্গোক্তি কানে আদতে না শুনে ॥ ১৮৮ ॥

থাকে আপনার ভাবে না হয় চঞ্চল ।
ভক্তের চরিত-কথা শ্রবণমঙ্গল ॥ ১৮৯ ॥



যেইখানে ভক্ত রাম ভকতির খনি ।
উঠিল তাহাতে এক সমুজ্জ্বল মণি ॥ ১৯০ ॥

প্রভুভক্ত-চূড়ামণি হিন্দুস্থানী জেতে ।
প্রবল অটল দাস্যভক্তিভাব চিতে ॥ ১৯১ ॥

ভৃত্যবেশে রামাবাসে কাদামাখা গায় ।
গুপ্ত ছিল এত দিন প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১৯২ ॥

চিরভক্ত শ্রীপ্রভুর অনাসক্ত জনা ।
দুঃখী তবু অবিদ্যায় অতিশয় ঘৃণা ॥ ১৯৩ ॥

উপরে ইক্ষুর মত কর্কশ আকার ।
ভিতরে মধুর ভক্তিরসের সঞ্চার ॥ ১৯৪ ॥

খর্বাকৃতি পুষ্টকায় বীর বলবান ।
সবল সকল শিরা লাটু তাঁর নাম ॥ ১৯৫ ॥

শ্রীপ্রভুর দাস সেবা-ভকতি অন্তরে ।
দাস্যভাবে হনু যথা রাম অবতারে ॥ ১৯৬ ॥

নিরক্ষর লাট্টু ভাই নাই বর্ণবোধ ।
বাগ্‌বাদিনীর সঙ্গে বিষম বিরোধ ॥ ১৯৭ ॥



কাজ কিবা বিদ্যাদেবী তোমার প্রসাদে ।
যদ্যপি তাহার রামকৃষ্ণভক্তি বাধে ॥ ১৯৮ ॥

নিরাপদে রাখ রুধে তোমার দুয়ার ।
রামকৃষ্ণনামে হব ভবসিন্ধু পার ॥ ১৯৯ ॥

বিদ্যার ছলনা কথা শুন শুন মন ।
বিদ্যাপক্ষে কি কহিলা প্রভু নারায়ণ ॥ ২০০ ॥

বিদ্যার আকার কিবা বিদ্যা বলে কারে ।
শুনিলে চলন্ত নাড়ী সঙ্গে সঙ্গে ছাড়ে ॥ ২০১ ॥

একদিন ভক্তবর্গে ঘেরা প্রভুরায় ।
উঠিল বিদ্যার কথা কথায় কথায় ॥ ২০২ ॥

বলিলেন প্রভু ভক্তগণে শুনাইয়া ।
দেখ আমি একদিন মায়ের দেখিয়া ॥ ২০৩ ॥

বলিলাম লোকজনে কহে পরম্পর ।
বিদ্যাবলহীন আমি মুর্খ নিরক্ষর ॥ ২০৪ ॥

জননী এতেক শুনি দেখাইলা মোরে ।
তখনি চকিতে ত্বরা তিলের ভিতরে ॥ ২০৫ ॥

দাঁড়াইয়া একধারে মৃদু মন্দ হাসি ।
পর্বত-প্রমাণ কত ওঁচলার রাশি ॥ ২০৬ ॥

অঙ্গুলি-চালনে মাতা কহিলেন পরে ।
এসব বিদ্যার রাশি বিদ্যা বলে এরে ॥ ২০৭ ॥

এই জঞ্জালের রাশি বিদ্যা নামে জানা ।
নিতে হয় নাও তুমি নাহি মোর মানা ॥ ২০৮ ॥

দেখিয়া বিদ্যার দশা কহিনু তখন ।
এমন বিদ্যায় মা গো নাহি প্রয়োজন ॥ ২০৯ ॥

মরম বুঝিয়া তাই শ্রীপ্রভু আপনে ।
বলিতেন প্রায় অধিকাংশ ভক্তগণে ॥ ২১০ ॥

বিদ্যা-আলাপনে মনে বড় লাগে ধাঁধা ।
রঙ্গিল না করি তায় শুদ্ধ রাখ সাদা ॥ ২১১ ॥

মহাবিদ্যাপথে বিদ্যা বড়ই ভীষণ ।
দুর্গম কণ্টকময় কেতকীর বন ॥ ২১২ ॥

বিদ্যার্জনে যদি গুরু না থাকেন মূলে ।
সে বিদ্যা বিষের গাছ বিষফল ফলে ॥ ২১৩ ॥

অবিদ্যার প্রতিমূর্তি তারে দণ্ডবৎ ।
মোহিয়া খুলিয়া দেয় নরকের পথ ॥ ২১৪ ॥

উপমায় বলিতেন প্রভু-নারায়ণ ।
ভাল মন্দ কিসে শুন বিদ্যা-উপার্জন ॥ ২১৫ ॥

"কেহ বিদ্যা শিখে লিখে বেদান্ত পুরাণ ।
কেহ করে জালখত নরক-সোপান" ॥ ২১৬ ॥

একরূপ বটে বস্তু ভাবে ফলে ফল ।
অমৃত কাহার পক্ষে কাহার গরল ॥ ২১৭ ॥

মান খ্যাতি প্রতিপত্তি গোড়ায় যাহার ।
যতগুলি জীব-বুদ্ধি তাহার পোদ্দার ॥ ২১৮ ॥

সত্ত্বভাব পরিহরি তমে করে হুঁশ ।
চিবায় চাউল ফেলে খোসা ভুসি তুঁষ ॥ ২১৯ ॥

অবিদ্যা-মূলক বিদ্যা পথে যেতে মানা ।
লীলাকথা শুনে মনে করহ ধারণা ॥ ২২০ ॥

মহান্ ঐশ্বর্যশালী লক্ষ্মী সরস্বতী ।
কভু করে মুক্ত পথ কভু রোষে গতি ॥ ২২১ ॥

বিষ্ণু মহেশ্বর ব্রহ্মা চতুর-আনন ।
আগোটা তেত্রিশ কোটা দেবদেবীগণ ॥ ২২২ ॥

অপার ক্ষমতা শক্তি প্রত্যেকের প্রায় ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ২২৩ ॥

ঐশ্বর্যে তোমার কিছু প্রয়োজন নাই ।
মাগ রামকৃষ্ণভক্তি সবাকার ঠাঁই ॥ ২২৪ ॥

প্রভুপদে ভক্তি রতি যাহে নাহি মিলে ।
দূরে করি নমস্কার রাখ তায় ঠেলে ॥ ২২৫ ॥

হোক্ ব্রহ্মা প্রজাপতি সৃষ্টিশক্তি যাঁর ।
হোক্ বিষ্ণু যাঁর কাছে পালনের ভার ॥ ২২৬ ॥

হোউক পিনাকপাণি যোগী ত্রিপুরারি ।
পরম নির্বাণদাতা ত্রিলোকসংহারী ॥ ২২৭ ॥

হোক্ না দেবেশ ইন্দ্র ত্রিদশ-ঈশ্বর ।
যে হয় সে হয় হোক্ কারে নাহি ডর ॥ ২২৮ ॥

সর্বেশ্বর প্রভু নিজে ঠাকুর আমার ।
এবারে আপনি খোদে নহে অবতার ॥ ২২৯ ॥

প্রভুর ওধারে আর নাহি কোন গ্রাম ।
অন্ত্যলীলামধ্যে পাবে ইহার প্রমাণ ॥ ২৩০ ॥

বিভূতিতে গিয়ান করিবে তুচ্ছ ছার ।
একা রামকৃষ্ণভক্তি সকলের সার ॥ ২৩১ ॥

বিভূতি বিরোধী বড় প্রভুভক্তিপথে ।
সর্বদা স্মরণ করি রাখিবে তফাতে ॥ ২৩২ ॥

লীলার শুনহ মন তাহার প্রমাণ ।
অমৃত-ভাণ্ডার রামকৃষ্ণ-লীলা গান ॥ ২৩৩ ॥



অতি ভক্তিমতী যদু মল্লিকের মাসী ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে বড়ই পিয়াসী ॥ ২৩৪ ॥

উদ্যান-ভবনে তাই যখন তখন ।
সভা করি প্রভুদেবে করে নিমন্ত্রণ ॥ ২৩৫ ॥

আজি সভামধ্যে প্রভু অখিলের পতি ।
উপনীত উপাধ্যায় কাপ্তেন-সংহতি ॥ ২৩৬ ॥

দর্শকগণের মধ্যে দুই শ্রেষ্ঠতর ।
প্রথম যে জন তেঁহ ধনের ঈশ্বর ॥ ২৩৭ ॥

বিদ্যাবল তত নহে যত তাঁর ধন ।
যতীন্দ্র ঠাকুর নাম পিরালী ব্রাহ্মণ ॥ ২৩৮ ॥

মহারাজ প্রাপ্ত আখ্যা কোম্পানির ঘরে ।
অতুলসম্মান খ্যাতি সাহেবেরা করে ॥ ২৩৯ ॥

পূর্বজন্মার্জিত পুণ্যে বহু ভাগ্যবান ।
অন্নাভাবী দীনদুঃখিগণে অন্নদান ॥ ২৪০ ॥

তাঁর ধনে অন্ন পুষ্টি পায় কত প্রাণী ।
তাই ঘরে অচঞ্চলা লক্ষ্মী ঠাকুরানী ॥ ২৪১ ॥

শুনিয়াছি শ্রীবদনে প্রভুর বচন ।
যাঁহার শক্তিতে বহু লোকের পোষণ ॥ ২৪২ ॥

ঈশ্বরের বহুশক্তি বর্তমান তাঁর ।
সামান্য জীবের মধ্যে নহে গণনায় ॥ ২৪৩ ॥

ভাগ্যবলে অবহেলে ঠাকুরে আমার ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন সেব্য কমলার ॥ ২৪৪ ॥

হরিহরবিধিপূজ্য সাধনের ধন ।
হেলায় শ্রদ্ধায় কিবা কৈল দরশন ॥ ২৪৫ ॥

প্রকৃতি সুলভে প্রভু দীনহীনাচার ।
নেহারিয়া মহারাজে অগ্রে নমস্কার ॥ ২৪৬ ॥

উচ্চ মান চান রাজা ঠাকুর পিরালী ।
মান-খ্যাতি কর্ণমূলে মানের কাঙ্গালী ॥ ২৪৭ ॥

সে মান না পেয়ে হেথা শ্রীপ্রভুর স্থানে ।
পরম সুন্দর প্রভু লাগিল না মনে ॥ ২৪৮ ॥

ধনবান মহারাজ ভক্তি নাই তাঁর ।
লক্ষ্মীর কৃপায় বদ্ধ ভক্তির দুয়ার ॥ ২৪৯ ॥

ধনে রাজসিক ভাব ঐশ্বর্য উজ্জ্বল ।
নয়নে সুধার রীতি উদরে গরল ॥ ২৫০ ॥

কামিনীর সহোদরা ভীষণা কাঞ্চন ।
ছুঁইলে জারিয়া তুলে মানুষের মন ॥ ২৫১ ॥

ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষে যেইজন ভুলে ।
ভক্তির প্রসাদ তাঁয় কখন না মিলে ॥ ২৫২ ॥



অন্য জন কৃষ্ণদাস পাল জেতে চাষা ।
বড়ই বুঝেন তিনি ইংরেজের ভাষা ॥ ২৫৩ ॥

সূক্ষ্মবুদ্ধি সুনিপুণ রাজনীতিজ্ঞানে ।
বড় বড় সাহেবেরা অতিশয় মানে ॥ ২৫৪ ॥

হিন্দুপেটরিয়ট-পত্র করেন প্রকাশ ।
চোটে লেখা দেখে লাগে লাটের তরাস ॥ ২৫৫ ॥

লাটের কাটেন কথা খুঁট ধরি তায় ।
প্রশংসাভাজন তাই যথায় তথায় ॥ ২৫৬ ॥

কোথাও নাহিক ভয় লিখে বলে তেড়ে ।
অভিমানে ভরা হৃদি বিদ্যা-অহঙ্কারে ॥ ২৫৭ ॥

গর্বখর্বকারী প্রভু সর্বশক্তিমান ।
শুন রামকৃষ্ণকথা অমৃত-সমান ॥ ২৫৮ ॥

সভাস্থ সকলে বলিলেন প্রভুবরে ।
ঈশ্বরীয় কথা কিছু কহিবার তরে ॥ ২৫৯ ॥

স্থান পাত্র বিশেষ বুঝিয়া পরমেশ ।
বলিলেন বিবেক-বৈরাগ্য উপদেশ ॥ ২৬০ ॥

ধন মান বিদ্যা আদি বিষতুল্য যাতে ।
বিষম অনর্থকরী ঈশ্বরের পথে ॥ ২৬১ ॥

তীব্র বিরাগের কথা সৃষ্টি উড়ে শেষে ।
ধূলা বালি কুটি যেন কুলার বাতাসে ॥ ২৬২ ॥

একা ভগবান বিনা সকলি অসার ।
বিষয়বৃদ্ধিতে কথা নহে পশিবার ॥ ২৬৩ ॥

পঙ্কিল বিষয়বৃদ্ধি বড়ই সমল ।
কাদার গাদায় ঘোলা স্বল্প মাত্র জল ॥ ২৬৪ ॥

প্রখর যদিও বিবেকের কর ধরে ।
ঘোলা জলে প্রতিবিম্ব কখন না পড়ে ॥ ২৬৫ ॥

লইলা এমন বুদ্ধি গর্ব করে নয় ।
ধিক্ ধিক্ জীববৃদ্ধি পায়ে তার গড় ॥ ২৬৬ ॥

এই বৃদ্ধিযুক্ত পাল এত গরীয়ান ।
সভায় করিতে রক্ষা নিজের সম্মান ॥ ২৬৭ ॥

আগুয়ান হইলেন সাধ্য যতদূর ।
প্রতিবাদে বৈরাগ্যের কথা শ্রীপ্রভুর ॥ ২৬৮ ॥

সভায় পালের পোর গরম আসন ।
মনে জানে আপনারে অতি বিচক্ষণ ॥ ২৬৯ ॥

দম্ভসহ প্রতিবাদ উত্থাপন করে ।
পাতিয়া কথার জাল সভার ভিতরে ॥ ২৭০ ॥

বৈরাগ্য ভীষণ বড় উন্নতির পথে ।
পথের ভিখারী করে নাহি দেয় খেতে ॥ ২৭১ ॥

বৈরাগ্য বৈরাগ্য করি ভারতের জাতি ।
ধনরাজ্যচ্যুত খায় ইংরেজের লাথি ॥ ২৭২ ॥

স্বাধীনতা-সংরক্ষণে বিহীন বিক্রম ।
এ দেশের দুর্দশার ইহাই কারণ ॥ ২৭৩ ॥

জন্মভূমি-রক্ষা আর পর উপকার ।
নরের কর্তব্য কর্ম এই ধর্ম সার ॥ ২৭৪ ॥

বৈরাগ্যের যত বল সে সকল জানি ।
নামান্তরে কহে এরে দুঃখের জননী ॥ ২৭৫ ॥

অতি হীন পরাধীন যে বিরাগে আনে ।
যতনে অর্জনে তার উপদেশ কেনে ॥ ২৭৬ ॥

শুনিয়া পালের কথা প্রভু গুণধর ।
অমৃত-বরণী বাণী তবু শক্তিধর ॥ ২৭৭ ॥

তুলনায় কিবা তেজ ইন্দ্র অস্ত্র ধরে ।
দুর্ভেদ্য জীবের বুদ্ধি পলে ভেদ করে ॥ ২৭৮ ॥

হেন বাক্যসহকারে কৃষ্ণদাসে কন ।
হীনবুদ্ধি তাই কহ বৈরাগ্যে এমন ॥ ২৭৯ ॥

বেদান্ত পুরাণ গীতা উচ্চে গায় যারে ।
দেবতাদুর্লভ তুচ্ছ তোমার গোচরে ॥ ২৮০ ॥

যার বলে হরি মিলে তাহে নাহি সার ।
তোমার গিয়ান এই কি বুদ্ধি তোমার ॥ ২৮১ ॥

পুনরায় বলিলেন প্রভু নারারণ ।
পর-উপকার কিবা কর আস্ফালন ॥ ২৮২ ॥

কহ যারে উপকার বিধিমতে জানি ।
কিঞ্চিৎ একত্র অর্থ দুর্ভিক্ষনাশিনী ॥ ২৮৩ ॥

অথবা করিলে যাহে মন্দ গন্ধ হরে ।
এই পর-উপকার তোমার বিচারে ॥ ২৮৪ ॥

মানি কিছু পরিমাণে কিঞ্চিৎ মঙ্গল ।
মিছা ছেঁচা না ঝরিলে আকাশের জল ॥ ২৮৫ ॥

সৃষ্টিনাশা অনাবৃষ্টি হরির ইচ্ছায় ।
দেশ জুড়ে লোক মরে পেটের জ্বালায় ॥ ২৮৬ ॥

লয়ে বস্তা দশ চাল দিবে কার মুখে ।
সিন্ধুমুখী স্রোত কি বালির বাঁধে টেকে ॥ ২৮৭ ॥

কতই ঔষধালয় রহে বিশ্বমান ।
তথাপিহ জ্বরে কেন শূন্য করে গ্রাম ॥ ২৮৮ ॥

টাকায় ঔষধে কাজ কতটুকু করে ।
বাঁচায় কাহার সাধ্য হরি যদি মারে ॥ ২৮৯ ॥

গর্ব করে অহঙ্কারে জীব ক্ষুদ্রপ্রাণ ।
তিন কাজে মানুষের হাসে ভগবান ॥ ২৯০ ॥

প্রথম সোদরগণে হাতে মাপদড়ি ।
বিভাগে মাপিয়া নিতে ভিটা বাড়ি ॥ ২৯১ ॥

এ বলে এধার লব ও বলে এধার ।
ভগবান তখন হাসেন একবার ॥ ২৯২ ॥

দ্বিতীয় রাজায় যবে রাজ্য করি জয় ।
মহাদম্ভসহ ফিরে আপন আলয় ॥ ২৯৩ ॥

বাজায়ে দুন্দুভি ভেরি আনন্দ লক্ষণ ।
ভগবান আর বার হাসেন তখন ॥ ২৯৪ ॥

তৃতীয় অসাধ্য রোগে রোগী নাড়ীছাড়া ।
প্রায় কণ্ঠাগত প্রাণ দেহে নাহি সাড়া ॥ ২৯৫ ॥

উঠেছে কপালে ভাতিহীন চক্ষুদ্বয় ।
দেহ-বাড়ি পরিহরি চলিলেই হয় ॥ ২৯৬ ॥

তবু বাঁচাইতে কবিরাজে বড়ি মাড়ে ।
বচনে ভরসাভরা দম্ভসহকারে ॥ ২৯৭ ॥

হীনবুদ্ধি মানুষের করি দরশন ।
ভগবান আর বার হাসেন তখন ॥ ২৯৮ ॥

মানিনু না হয় আমি তোমার কথায় ।
হয় কিছু উপকার ঔষধ টাকায় ॥ ২৯৯ ॥

ক'টির করিবে হিত কোটি কোটি যেথা ।
সামান্য মানুষ তুমি কি আছে ক্ষমতা ॥ ৩০০ ॥

গঙ্গায় জনমে এত কাঁকড়ার ছানা ।
কেহ নহে ক্ষমবান করিতে গণনা ॥ ৩০১ ॥

তেন ক্ষুদ্র তুমি এক সৃষ্টির ভিতর ।
হিতের কি কথা কহ করিয়া গুমর ॥ ৩০২ ॥

মানুষ কেবল নয় একমাত্র প্রাণী ।
পশু পাখী কীট কত সংখ্যা নাহি জানি ॥ ৩০৩ ॥

বিশাল ব্রহ্মাণ্ড মধ্যে কাতারে কাতারে ।
দৃশ্যাদৃশ্যভাবে যারা বিচরণ করে ॥ ৩০৪ ॥

ভাবিলে ঘটেতে বুদ্ধি নাহি থাকে আর ।
কহু তবে কিবা হিত করিবে কাহার ॥ ৩০৫ ॥

শ্রীপ্রভুর উত্তরের পাইয়া আভাস ।
পালের বদনে আর নাহি ফুটে ভাব ॥ ৩০৬ ॥

কার কাছে কাঁচা কথা কহিনু এমন ।
বুঝিয়া পরানে বড় পাইল সরম ॥ ৩০৭ ॥

মহাভাগ্যবান তাঁরে করি নমস্কার ।
যে কোন কারণে হোক ঠাকুরে আমার ॥ ৩০৮ ॥

দীনবন্ধু দীনত্রাতা পতিতপাবন ।
হেলায় শ্রদ্ধার কিবা কৈল দরশন ॥ ৩০৯ ॥

বিদ্যায় যদ্যপি নাহি অনুরাগ আনে ।
বুঝ মন কিবা কাজ সে বিদ্যা-অর্জনে ॥ ৩১০ ॥

বর্ণবোধহীন লাট্টু অনুরাগে ভরা ।
ভক্তিবলে কথা কয় নয় শাস্ত্র-ছাড়া ॥ ৩১১ ॥

ভকতি কেবল একা সকলের সার ।
রামকৃষ্ণলীলাগীতি ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৩১২ ॥



সেবক হরিশ্চন্দ্র জুটে এ সময় ।
প্রভু-ভক্ত নিত্যযুক্ত এই পরিচয় ॥ ৩১৩ ॥

কৃতদার ভক্তিমতী ঘরে নারী তাঁর ।
নবীন বয়স নহে পঁচিশের পার ॥ ৩১৪ ॥

তিরস্কার করি তেহ নবীন যৌবনে ।
হইল শরণাপন্ন প্রভুর চরণে ॥ ৩১৫ ॥

কেমনে মিটিল সাধ কব পরে পরে ।
এখন কেবলমাত্র আইল আসরে ॥ ৩১৬ ॥

সরলস্বভাব সদা ভগবানে মন ।
অধম পামরে বন্দে তাঁহার চরণ ॥ ৩১৭ ॥ 



বলিয়াছি ব্রাহ্মধর্ম বড়ই প্রবল ।
কেশবের বক্তৃতায় বিশেষ উজ্জ্বল ॥ ৩১৮ ॥

দেশ জুড়ে বাড়ে দল বক্তৃতার চোটে ।
বক্তৃতা-বিমুগ্ধ বঙ্গ বহু লোক জুটে ॥ ৩১৯ ॥

হরিপদলুব্ধ যাঁরা শ্রীগুরুবিহনে ।
নিজের গন্তব্য-পথ কিছুই না চিনে ॥ ৩২০ ॥

আসিয়া মিশেন এই ব্রাহ্মদের দলে ।
আশায় ভরসা করি যদি কিছু মিলে ॥ ৩২১ ॥

ভুলে থাকে ব্যাপার দেখিয়া তথাকার ।
ভাবে বুঝি এই পথ ঘরে যাইবার ॥ ৩২২ ॥

কারে কোন্ পথে লয়ে যান ভগবান ।
তাঁহার গোচর জীবে না জানে সন্ধান ॥ ৩২৩ ॥

অনুরাগে যেই দিকে তাড়া করে ঠেলে ।
হোক না নিবিড় বন তাহে পথ মিলে ॥ ৩২৪ ॥

লীলা কথা শুন মন বুঝহ লক্ষণ ।
অন্ধের নয়ন এই ভক্ত সংজোটন ॥ ৩২৫ ॥

ইদানীং ব্রাহ্মধর্ম নামে যাহা জানা ।
বুঝিতে না পারি তার ভাবের ঠিকানা ॥ ৩২৬ ॥

আমি না বুঝিতে পারি অতি ক্ষুদ্র প্রাণী ।
এ পক্ষে কহিলা কিবা শ্রীপ্রভু আপনি ॥ ৩২৭ ॥

মন দিয়া শুন মন বুঝহ বারতা ।
রামকৃষ্ণপুঁথি নহে বিবাদের কথা ॥ ৩২৮ ॥

বিবাদ-ভঞ্জনে শ্রীপ্রভুর আগমন ।
সব ধর্ম অতি সত্য প্রভুর বচন ॥ ৩২৯ ॥

ধর্মমধ্যে ব্রাহ্মধর্ম নেজা-মুড়া ছাড়া ।
বিচিত্র দেউল শূন্যে ভিত্তিহীনে গড়া ॥ ৩৩০ ॥

দুই রূপে ঈশ্বর সাকার নিরাকার ।
এ দুয়ের উর্ধ্বে আছে তৃতীয় প্রকার ॥ ৩৩১ ॥

জীবের নাহিক শক্তি তথা যাইবারে ।
বলিলেন এই কথা প্রভু বারে বারে ॥ ৩৩২ ॥

সাকার ও নিরাকার জ্ঞাতব্য জীবের ।
একে ছাড়ি অন্যে ধরা অদৃষ্টের ফের ॥ ৩৩৩ ॥

দ্বিতলে যাইতে যেন উপায় সোপান ।
নিরাকারে সেইমত সাকার-বিধান ॥ ৩৩৪ ॥

প্রভুত্বত্ত উপমাতে ধানুকী যেমন ।
কলাগাছে করে লক্ষ্য প্রথম প্রথম ॥ ৩৩৫ ॥

স্থূলেতে বসিলে লক্ষ্য স্বপ্নে যার পরে ।
টাকা-সিকি বিন্দুবৎ দাগের উপরে ॥ ৩৩৬ ॥

ধানুকী হইলে পাকা শেষ পরিণাম ।
না পায় সন্ধান কোথা করিবে সন্ধান ॥ ৩৩৭ ॥

নিরাকার নামান্তরে মহান আকার ।
আদি-মধ্য-অন্তহীন বৃহৎ ব্যাপার ॥ ৩৩৮ ॥

ভাষা থাকে ভাসা ভাসা ভাষায় কি রটে ।
স্বরাট হইতে কথা গমন বিরাটে ॥ ৩৩৯ ॥

বিরাটে অপার কাণ্ড মনের বিনাশ ।
সিন্ধুজলে ডুবে যেন অনন্ত আকাশ ॥ ৩৪০ ॥

ব্রহ্মজ্ঞান কিবা বস্তু বলিবার নয় ।
প্রভুর বচনে শুন তার পরিচয় ॥ ৩৪১ ॥

কোন এক ব্রহ্মজ্ঞানী দিবস বিশেষে ।
উপনীত বিশ্বগুরু প্রভুর সকাশে ॥ ৩৪২ ॥

পেটভরা কথা পুঁজি বহু আড়ম্বরে ।
পাড়িল ব্রহ্মের কথা তর্কসহকারে ॥ ৩৪৩ ॥

হৃদয় বুঝিয়া তাঁর প্রভুর উত্তর ।
নিত্যলীলা ছয়ে সেই পরম ঈশ্বর ॥ ৩৪৪ ॥

অব্যক্ত সচ্চিদানন্দ নিত্য নাম যাঁর ।
তুলনায় তুচ্ছ সিন্ধু অকূল পাথার ॥ ৩৪৫ ॥

কূল কি কিনারা চোখে কোথাও না পাই ।
পড়িলে তাহাতে শুধু হাবুডুবু খাই ॥ ৩৪৬ ॥

লীলার ভিতরে যেই লীলাময় হরি ।
পাইলে তাঁহারে তবে কুল লাভ করি ॥ ৩৪৭ ॥

এই ধরি বুঝ মন কিবা ব্রহ্মজ্ঞান ।
কথায় কিছুই নাহি হয় অনুমান ॥ ৩৪৮ ॥

ব্রহ্মজ্ঞান কিবা বস্তু বাক্যেতে না আসে ।
গেলে ব্রহ্মসিন্ধুকূলে নাহি ফিরে দেশে ॥ ৩৪৯ ॥

নুনের মানুষ যেন প্রভুর বচন ।
সিন্ধুজল মাপিবারে করিলে গমন ॥ ৩৫০ ॥

ভবনে ফিরিতে শক্তি নাহি থাকে গায় ।
গলে হয় জলবৎ সুশীতল বায় ॥ ৩৫১ ॥

ব্রহ্ম আর ব্রহ্মজ্ঞান একই বারতা ।
সিন্ধুতে মিশিলে বিন্দু সত্ত্ব থাকে কোথা ॥ ৩৫২ ॥

সেই হেতু বলিতেন প্রভু ভগবান ।
উচ্ছিষ্ট বেদাদি গীতা যাবৎ পুরাণ ॥ ৩৫৩ ॥

কেন না ইহারা সব মুখ-বিগলিত ।
মহাজ্ঞানী ভক্ত শুক ব্যাস বিরচিত ॥ ৩৫৪ ॥

ব্রহ্ম-বস্তু উচ্ছিষ্ট করিতে কেহ নারে ।
কে কবে যে যায় আর নাহি ফিরে ঘরে ॥ ৩৫৫ ॥

গুরুর ইচ্ছায় যেই জন ফিরে আসে ।
ব্রহ্ম কি যদ্যপি কেহ তাঁহারে জিজ্ঞাসে ॥ ৩৫৬ ॥

কহিতে না পারে কিছু কহে অবিকল ।
জলময় একাকার জল আর জল ॥ ৩৫৭ ॥



অন্য এক ব্রহ্মজ্ঞানী স্বভাব সুন্দর ।
পর-উপকার-ব্রতে মতি উগ্রতর ॥ ৩৫৮ ॥

বঙ্গদেশে বরিশালে বসতি তাঁহার ।
উপাধিতে দত্ত, নাম অশ্বিনীকুমার ॥ ৩৫৯ ॥

প্রভুদেবে শ্রদ্ধাভক্তি যথাসাধ্য করে ।
একদিন তাঁর কাছে দক্ষিণশহরে ॥ ৩৬০ ॥

জিজ্ঞাসিল প্রাণে মনে উঠিল যেমন ।
ব্রাহ্মধর্মে হিন্দুধর্মে ভেদ কি রকম ॥ ৩৬১ ॥

উত্তর করিলা তাঁয় উপমা-সংহতি ।
দেখেছ সানাই বাঁশি বাজাবার রীতি ॥ ৩৬২ ॥

দু'জন সানাইয়ার বসে এক ঠাঁই ।
দুয়ের হাতেতে ধরা দুখানি সানাই ॥ ৩৬৩ ॥

একজনে পোঁ ধরিয়া সুর দিতে হয় ।
অপরে বাজায় রাগরাগিণীনিচয় ॥ ৩৬৪ ॥

পোঁ ধরা এ ব্রাহ্মধর্ম এক সুর তায় ।
হিন্দুয়ানি নানা রাগরাগিণী বাজায় ॥ ৩৬৫ ॥

বেদবাক্যাধিক উচ্চ প্রভুর বচন ।
সর্বশেষ কি কহিলা শুন শুন মন ॥ ৩৬৬ ॥

ঠিক এই শ্রীবচন প্রভুর আমার ।
"যতবিধ আছে ধর্ম সবে নমস্কার ॥ ৩৬৭ ॥

ইদানীং ব্রাহ্মধর্ম যাহা ছড়াছড়ি ।
ইহাকেও বার বার নমস্কার করি" ॥ ৩৬৮ ॥

বিশ্বগুরু প্রভু যারে দিলেন সম্মান ।
পামরের নম্য করি সহস্র প্রণাম ॥ ৩৬৯ ॥

ব্রাহ্মধর্মে আর যত ব্রহ্মজ্ঞানিগণে ।
অসংখ্য প্রার্থনা মোর কৃপার কারণে ॥ ৩৭০ ॥

গললগ্ন-কৃতবাসে এ অধম যাচে ।
দেহ রামকৃষ্ণ-ভক্তি যাহা কিছু আছে ॥ ৩৭১ ॥



ফুলের অকালে যেন মধুপের কুল ।
দিবানিশি উপবাসী ক্ষুধায় আকুল ॥ ৩৭২ ॥

গুনগুন রবে কাঁদি স্বভাব যেমন ।
মোদক-আলয়ে করে মধু অন্বেষণ ॥ ৩৭৩ ॥

সেইমত শ্রীপ্রভুর বহু আত্মগণে ।
মধুর আস্বাদ সাধ সংগোপন প্রাণে ॥ ৩৭৪ ॥

অ্যাবধি ফাঁকে ফাঁকে নহে দরশন ।
মধুভরা পদ্মন্বয় প্রভুর চরণ ॥ ৩৭৫ ॥

মধুর আশার মিশেছেন ব্রাহ্মদলে ।
শ্রীপ্রভুর উক্তি যথা শ্রীকেশব বলে ॥ ৩৭৬ ॥

ব্রাহ্মদলে পথহারা প্রভুর ভকত ।
কেমনে পাইলা তাঁরা গন্তব্য সুপথ ॥ ৩৭৭ ॥

যত্নসহকারে মন শুনহ বারতা ।
সুধার ভাণ্ডার এই রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ৩৭৮ ॥

কেশবের বক্তৃতা অপর কিছু নয় ।
ব্রাহ্ম-পরিচ্ছদে তাঁর উক্তি কতিপয় ॥ ৩৭৯ ॥

অন্য সাজে যদি উক্তি কার্য করে ভাল ।
নিবিড় আঁধারে যথা চিকুরের আলো ॥ ৩৮০ ॥

দেখা যায় সুপথ কুপথ ডাঙ্গা জল ।
পথহারা পথিকের পরমমঙ্গল ॥ ৩৮১ ॥

প্রভুর শক্তিতে শ্রীকেশব শক্তিধর ।
উপমায় ঠিক যেন আতশীপাথর ॥ ৩৮২ ॥

পাবক-উদ্ভব-গুণ যাহা লক্ষ্য হয় ।
ভাস্করের শক্তি তাহা পাথরের নয় ॥ ৩৮৩ ॥

প্রভুর আতশী তিনি ধরিয়া তাঁহারে ।
প্রেমিক ভকত এক আইলা আসরে ॥ ৩৮৪ ॥

অদ্যাবধি ব্রাহ্মধর্মে ছিল তাঁর টান ।
পণ্ডিত বয়স বেশী ব্রাহ্মণ-সন্তান ॥ ৩৮৫ ॥

রসাল বয়ানখানি পরান উদ্বাস ।
হুগলির কাছে হালিশহরেতে বাস ॥ ৩৮৬ ॥

কোম্পানির ঘরে কাজ বালক অবধি ।
নাম শ্রীকেদারচন্দ্র, চাটুয্যে উপাধি ॥ ৩৮৭ ॥

শতদরে মাহিয়ানা শ্যামল বরন ।
রক্ত-পদ্ম সম দুটি রক্তিম নয়ন ॥ ৩৮৮ ॥

হেলে দুলে করে খেলা প্রভুদেবে হেরে ।
ভাসমান অশ্রুনীরে আঁখির আধারে ॥ ৩৮৯ ॥

উড়ে গেল ব্রাহ্মভাব ভাব নিরাকার ।
প্রভুপাশে মাগে ভিক্ষা পদ সেবিবার ॥ ৩৯০ ॥

প্রভু প্রভু বলে ধরে চরণ ছাঁদিয়া ।
দর দর আঁখিজল গণ্ড বিগলিয়া ॥ ৩৯১ ॥

বেদনা বলিতে ইচ্ছা শ্রীপ্রভুর পার ।
ভাব-বেগে কণ্ঠরোধ কথা না বেরায় ॥ ৩৯২ ॥

জন্ম জন্ম প্রভুভক্ত বহুদিন ছাড়া ।
হৃদিখানি প্রস্রবণ ভক্তিপ্রেমে ভরা ॥ ৩৯৩ ॥

না ছিল আবদ্ধ গতি লীলার প্রথমে ।
মুক্তমুখ এবে বেগে ঝরে দুনয়নে ॥ ৩৯৪ ॥

একবার দরশনে এইতক কথা ।
পশ্চাৎ কহিব ক্রমে পরের বারতা ॥ ৩৯৫ ॥



অন্তরঙ্গ আত্মগণ জুটিবার কালে ।
বহিরঙ্গ কত শত আসে দলে দলে ॥ ৩৯৬ ॥

নানাবিধ ধর্মপন্থী কাছে দূরে ঘর ।
নাম ধাম তাঁহাদের বিশেষ খবর ॥ ৩৯৭ ॥

কি খেলা খেলিলা প্রভু তাঁহাদের সাথে ।
অবিদিত তেকারণ নারিনু কহিতে ॥ ৩৯৮ ॥

প্রধান প্রধান যাঁরা বিশেষতঃ জানা ।
কতই প্রভুর কাছে কৈল আনাগোনা ॥ ৩৯৯ ॥

তথাপি না দিলা ধরা প্রভু নারায়ণ ।
সাধ্যমত কহি কথা শুন বিবরণ ॥ ৪০০ ॥

ব্রাহ্মণ জনৈক যুবা বিদ্যাবল ধরে ।
ভাগ্যবন্ত ধনবান ঘর কাশীপুরে ॥ ৪০১ ॥

বরানগরের কাছে সন্নিকটবর্তী ।
নাম তাঁর শ্রীমহিমচন্দ্র চক্রবর্তী ॥ ৪০২ ॥

গন্যমান্য লোকে করে অতুল সম্মান ।
বড়ই বেদান্তবাদী জ্ঞানমার্গে টান ॥ ৪০৩ ॥

সাকারে বিকার ধাত নাড়ী নাহি চলে ।
আগোটা ব্রহ্মাণ্ড-সৃষ্টি মায়া ছায়া বলে ॥ ৪০৪ ॥

মায়া যেবা ছায়া কিবা মিথ্যা ইহা নয় ।
প্রতিবাদ কৈলে যদি শুন পরিচয় ॥ ৪০৫ ॥

অব্যক্তরূপিণী মায়া কহা নাহি যায় ।
ঈশ্বরের শক্তি থাকে ঈশ্বরের গায় ॥ ৪০৬ ॥

কাজে দুই বস্তুগত দুয়ে এক কায়া ।
কে পারে বাছিতে পরমেশ কেবা মায়া ॥ ৪০৭ ॥

সৃজন-পালন কালে লীলার ভিতর ।
কার্যগত দেখা যায় যেন স্বতন্তর ॥ ৪০৮ ॥

শববৎ পরমেশ নিশ্চল আড়ালে ।
শক্তি তাঁর সৃষ্টি-স্থিতি-লয় লয়ে খেলে ॥ ৪০৯ ॥

যে শক্তিতে তুমি আমি শিব বিষ্ণু ধাতা ।
তাহারে অলীক কহা পাগলের কথা ॥ ৪১০ ॥

নামে দুটি বস্তুগত সেই কলেবর ।
তরঙ্গ সলিল দুই একই সাগর ॥ ৪১১ ॥

তুমিতো তোমার পুঁজি অগ্রে দেখ চেয়ে ।
তুমি হইয়াছ তুমি কি শকতি লয়ে ॥ ৪১২ ॥

মন-মূল-পঞ্চেন্দ্রিয় জ্ঞানের কারণ ।
বিবেক বৈরাগ্য গড়ে বুদ্ধিবৃত্তিগণ ॥ ৪১৩ ॥

এই সব সমবেত যুক্তি কৈলে ঠিক ।
ইন্দ্রিয়গোচর সৃষ্টি যাবৎ অলীক ॥ ৪১৪ ॥

মিথ্যা যদি তুমি আমি যাবৎ সংসার ।
মিথ্যা যে তোমার সত্য কি প্রমাণ তার ॥ ৪১৫ ॥

তুমি যদি ভ্রান্তিমূল মায়ায় জনম ।
ভুলগাছে সত্যফল কথা কি রকম ॥ ৪১৬ ॥

দ্বিতীয় বক্তব্য অতি সত্য মানি মন ।
বস্তুর সত্তাতে হয় ছায়ার জনম ॥ ৪১৭ ॥

বস্তু যদি হয় সত্য তোমার বিচারে ।
ছায়া তবে মিথ্যা বস্তু কহ কি প্রকারে ॥ ৪১৮ ॥

নয়নেতে দেখি ছায়া দুই অবিকল ।
বসিলে শীতলতলে অঙ্গ সুশীতল ॥ ৪১৯ ॥

সেইতো ইন্দ্রিয় পুঁজি দেখি শুনি তার ।
বস্তুরে বুঝিলে সত্য অলীক ছায়ায় ॥ ৪২০ ॥

বস্তু যদি হয় বস্তু তোমার বিচারে ।
অলীক ছায়ার সত্তা হইতে না পারে ॥ ৪২১ ॥

আকারমাত্রেই যাঁর অলীক গিয়ান ।
উপহাস তথায় সাকার ভগবান ॥ ৪২২ ॥



এ নহে মোদের কার্য ঘরে চল মন ।
শুন রামকৃষ্ণকথা অমৃতকথন ॥ ৪২৩ ॥

রাষ্ট্র রামকৃষ্ণনাম প্রায় প্রতি স্থানে ।
সাধু-ভক্ত-সমাগম বিশেষ যেখানে ॥ ৪২৪ ॥

দেবভাষা-বিশারদ পণ্ডিতপ্রবর ।
মহিম পাইয়া এবে প্রভুর খবর ॥ ৪২৫ ॥

সযতনে জুটিলেন শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ।
দক্ষিণশহরে যেথা বিরাজে গোসাঁই ॥ ৪২৬ ॥

কল্পতরুরূপ প্রভু শ্রীমন্দিরে বসে ।
তথায় তাহাই পায় যে আশে যে আসে ॥ ৪২৭ ॥

জ্ঞান-মার্গী শ্রীমহিম বীরের মতন ।
চান কর্ম জপ-তপ সাধন-ভজন ॥ ৪২৮ ॥

যোগ অনুরাগপর বাসনা অন্তরে ।
সন্ন্যাসীর রীতি যথা ঘরবাড়ি ছেড়ে ॥ ৪২৯ ॥

তীর্থপর্যটন-ব্রত সাধু সহবাস ।
স্বধর্মে সংযত মন সংসারে উদাস ॥ ৪৩০ ॥

বরাবর দেখিতেছি শ্রীপ্রভুর যারা ।
যাহার যেমন ভাব তাই রক্ষা করা ॥ ৪৩১ ॥

সেইহেতু কল্পতরু নামে তাঁরে জানি ।
বিশ্বরূপ বিশ্বভাবে সম্পূর্ণ আপনি ॥ ৪৩২ ॥

বিশ্বস্বামী অন্তর্যামী সকল তাঁহায় ।
ক্ষীরভয়া অগণন পয়োবর গায় ॥ ৪৩৩ ॥

অন্তরে জননী-ভাব পুরুষ আকার ।
কখন করেন নাই ভাব নষ্ট কার ॥ ৪৩৪ ॥

ভাব যেন তেন লাভ প্রভুর গোচরে ।
মহিম এখন মাত্র আইলা আসরে ॥ ৪৩৫ ॥

পরে যা হইল কথা পরে কব মন ।
কৃতবার শ্রীমহিম শুদ্ধাত্মা ব্রাহ্মণ ॥ ৪৩৬ ॥



জনৈক অদ্বৈতবাদী জনায়েতে ধাম ।
প্রাণকৃষ্ণ মুখুয্যে যে মহাত্মার নাম ॥ ৪৩৭ ॥

অতিশুদ্ধ নিষ্ঠাচারী পবিত্র ব্রাহ্মণ ।
জমিদার ঘরে বহু টাকাকড়ি ধন ॥ ৪৩৮ ॥

উপনীত এ সময় প্রভুর গোচর ।
কিরূপে কি আশে কথা শুন অতঃপর ॥ ৪৩৯ ॥

ভক্তবর বলরাম বৈষ্ণব-চরিত ।
প্রাণকৃষ্ণ মুখুয্যের পূর্বপরিচিত ॥ ৪৪০ ॥

একদিন দেখা শুনা হয় পরস্পর ।
কথায় কথার উঠে প্রভুর খবর ॥ ৪৪১ ॥

প্রীতিভরে সবিস্ময়ে বলরাম কন ।
অতীব আশ্চর্য সাধু পুণ্যদরশন ॥ ৪৪২ ॥

ভক্তিপ্রেমে ঢলঢল শ্রীমুরতিখানি ।
বিষম বৈরাগ্য কভু না ছোন কামিনী ॥ ৪৪৩ ॥

দ্বিতীয় আশ্চর্য যদি টাকা হাতে ঠেকে ।
তখনি অমনি হাত যায় এঁকেবেঁকে ॥ ৪৪৪ ॥

সঞ্চয় দূরের কথা পরশে এমন ।
কোথাও না দেখি শুনি সাধু এ রকম ॥ ৪৪৫ ॥

প্রাণকৃষ্ণ বিস্ময়ে আবিষ্ট কথা শুনে ।
বসু-সনে চলিলেন প্রভু-দরশনে ॥ ৪৪৬ ॥

দক্ষিণশহরে যেথা করুণা-আলয় ।
জাদু দেখিবার আশ তত্ত্ব-আশে নয় ॥ ৪৪৭ ॥

গুণগ্রাহী প্রভুদেব স্বভাবে যেমন ।
মোহিলা অজ্ঞাতসারে মুখুয্যের মন ॥ ৪৪৮ ॥

ক্রমে পরে বার বার যত যাতায়াত ।
শ্রীপ্রভু আপনে তত রাখেন তফাত ॥ ৪৪৯ ॥

জানিতে না দেন তিনি তিনি কি রকম ।
মেঘের আড়ালে যেন চাঁদের কিরণ ॥ ৪৫০ ॥

প্রভুদেবে মুখুজ্যের হইল ধারণা ।
প্রেমভক্তিপথে সিদ্ধ সাধু একজনা ॥ ৪৫১ ॥

জ্ঞানমার্গে জানা শুনা কিছু নাহি তাঁর ।
বিয়াতে হয়েছে নষ্ট জ্ঞানে অধিকার ॥ ৪৫২ ॥

সংসারীর নাহি হয় অদ্বৈতগিয়ান ।
তাই প্রভুদেব নীচে তিনি আগুয়ান ॥ ৪৫৩ ॥

ভক্তি হতে জ্ঞান বড় বুঝে প্রাণকৃষ্ণ ।
দ্বৈতজ্ঞান অদ্বৈতের অনেক নিকৃষ্ট ॥ ৪৫৪ ॥

নিজে বড় জ্ঞান-পন্থী ধারণা অন্তরে ।
কল্পতরুমূলে তাই দিন দিন বাড়ে ॥ ৪৫৫ ॥

স্বভাবরক্ষণে বড় শ্রীপ্রভু প্রবীণ ।
মুখুয্যেরে প্রভুদেব কন একদিন ॥ ৪৫৬ ॥

বড়ই কঠিন এই অদ্বৈতগিয়ান ।
জীবে না সহজে পায় ইহার সন্ধান ॥ ৪৫৭ ॥

অতি কষ্টে যদি কেহ পশিবারে পারে ।
সে কেবল একজন কোটির ভিতরে ॥ ৪৫৮ ॥

দেখিয়াছি নেংটা সাধু তোতাপুরী নাম ।
জ্ঞানমার্গে বহুদূর বটে আগুয়ান ॥ ৪৫৯ ॥

একবার এই জ্ঞানে অধিকার হলে ।
আঁচলে বাঁধিয়া যাও যথা ইচ্ছা চলে ॥ ৪৬০ ॥

তালে তালে পড়ে পদ বেতালা না হয় ।
অদ্বৈতজ্ঞানের এই সার পরিচয় ॥ ৪৬১ ॥

জ্ঞানের প্রাধান্যকথা প্রভুর বধনে ।
যত শুনে প্রাণকৃষ্ণ তত ফুলে প্রাণে ॥ ৪৬২ ॥

অভিমান আটক রাখিল একধারে ।
জানি-জানে প্রাণকৃষ্ণ পড়িলেন ফেরে ॥ ৪৬৩ ॥



আইলা এখন এক দেবীঠাকুরানী ।
প্রবীণা বয়স বেশী বৃদ্ধক-ব্রাহ্মণী ॥ ৪৬৪ ॥

গোপাল-জননীসম হৃষ্টপুষ্টকায় ।
দরশনে উদ্দীপন করে যশোদায় ॥ ৪৬৫ ॥

শুদ্ধাত্মা পবিত্রাচারে জীবন-যাপন ।
দিনে মাত্র একবার সাত্ত্বিক ভোজন ॥ ৪৬৬ ॥

ত্যাগি-সন্ন্যাসিনী-ধারা মোহছাড়া প্রাণ ।
গৃহীর গায়ের গন্ধ নরকসমান ॥ ৪৬৭ ॥

বালিকা বিধবা তিনি হরিপদে আশ ।
অঙ্গরাগবিবর্জিতা গঙ্গাকুলে বাস ॥ ৪৬৮ ॥

পটলডাঙ্গায় এক মহাপুণ্যবান ।
ধনেশ্বর ধার্মিক গোবিন্দ দত্ত নাম ॥ ৪৬৯ ॥

কামারহাটিতে তাঁর আছে দেবালয় ।
মাথায় বালিশ যেন শিরে গঙ্গা বয় ॥ ৪৭০ ॥

ব্রাহ্মণীর বসতির স্থান এইখানে ।
দিনে রেতে খেতে শুতে ডাকে ভগবানে ॥ ৪৭১ ॥

বিগত কদিন এবে সুদিন উদয় ।
প্রভুর হইল তাঁরে টান এ সময় ॥ ৪৭২ ॥

গুনিয়া প্রভুর নাম লোকপরস্পর ।
দরশনে আসিলেন দক্ষিণশহর ॥ ৪৭৩ ॥

সাধু-দরশন-আশ অন্য হেতু নয় ।
পরে কি হইল শুন বলি পরিচয় ॥ ৪৭৪ ॥

আপনার প্রিয়ভক্ত দেখি ভগবান ।
অন্তরে উঠেছে তাঁর সুখের তুফান ॥ ৪৭৫ ॥

আধরে শ্রীকরে ধরি মিষ্টান্ন সন্দেশ ।
বৃদ্ধারে খাইতে দিলা প্রভু পরমেশ ॥ ৪৭৬ ॥

শ্রীপ্রভুর পরিচয়ে বুঝেছে ব্রাহ্মণী ।
কৈবর্তের ব্রাহ্মণ শ্রীপ্রভু গুণমণি ॥ ৪৭৭ ॥

প্রভুদত্ত মিষ্টান্ন সন্দেশ তে কারণে ।
না খেয়ে অপরে দিল গোপনে গোপনে ॥ ৪৭৮ ॥

জানিয়াও প্রভু কিছু না কহিলা তাঁয় ।
সে দিনে ব্রাহ্মণী নিজ নিকেতনে যায় ॥ ৪৭৯ ॥

বহুকাল হইতে আছিল তাঁর ধারা ।
পূর্ণমনোযোগসহ মালাজপ করা ॥ ৪৮০ ॥

প্রভুরে দেখিয়া এবে মালাজপকালে ।
পড়িল বড়ই এক নূতন জঞ্জালে ॥ ৪৮১ ॥

জপে আর তিল মাত্র নাহি বসে মন ।
প্রভুর মূরতি হয় সতত স্মরণ ॥ ৪৮২ ॥

তত ইচ্ছা নাহি আসে শ্রীপ্রভুর কাছে ।
তথাপি থাকিতে নারে এলে তবে বাঁচে ॥ ৪৮৩ ॥

এইরূপে যাতায়াত হয় বার বার ।
ক্রমশঃ হইতে থাকে স্নেহের সঞ্চার ॥ ৪৮৪ ॥

কেবা ভক্তিমতী এই ব্রাহ্মণীর বেশ ।
সমাচার সময়ে পাইবে সবিশেষ ॥ ৪৮৫ ॥

বুঝিবে মানবী নয় দেবীর উপর ।
লীলায় ভক্তের নর-নারী কলেবর ॥ ৪৮৬ ॥



গুরু হতে লঘু কিসে অতি গুরুতর ।
ক্ষুদ্রাকার শিলা কিসে শৈলের উপর ॥ ৪৮৭ ॥

বলীর অপেক্ষা বলী বলহীন কিসে ।
কিসে হারে অহঙ্কারী দীনের সকাশে ॥ ৪৮৮ ॥

প্রভুর অপেক্ষা কিসে দাস বলবান ।
উন্নতের চেয়ে কিসে পতিতের মান ॥ ৪৮৯ ॥

দেখিবার বাসনা যদ্যপি থাকে মন ।
আইল ভকত এক কর দরশন ॥ ৪৯০ ॥

কৃষ্ণবর্ণ সে পুরুষ মাংস নাহি গায় ।
আছে খালি অস্থিগুলি সব গণা যায় ॥ ৪৯১ ॥

স্বভাবেতে যুক্তকর ধীর ধীর চলা ।
বক্র দেহ মাখাখানি মাটিপানে হেলা ॥ ৪৯২ ॥

আঁখি দুটি পরিপাটি অতি দীপ্তিমান ।
দৃষ্টিশক্তি পায় স্ফূর্তি শিখার সমান ॥ ৪৯৩ ॥

মূর্তিমান বহ্নি যেন ছাই মাখা গায় ।
উত্তপ্ত সমস্ত গাত্র কাছে ঘেঁষা দায় ॥ ৪৯৪ ॥

অঙ্গরাগে উদাসীন রুক্ষ চুল শিরে ।
লজ্জা-আবরণ বান তাঁহার বিচারে ॥ ৪৯৫ ॥

সাধ্বী সতী ভক্তিমতী পরমা সুন্দরী ।
বহুদূরে আছে ঘরে গুণবতী নারী ॥ ৪৯৬ ॥

বঙ্গদেশে দেওভোগ গ্রামে জন্মস্থান ।
নারায়ণগঞ্জ তার অতি সন্নিধান ॥ ৪৯৭ ॥

অর্জন-আশায় এই শহরেতে আসা ।
চিকিৎসক তিনি নিজে ঔষধ-ব্যবসা ॥ ৪৯৮ ॥

মাসে মাসে অল্প আয় অতি কষ্টে চলে ।
জমাজমি বড় কম স্বদেশ অঞ্চলে ॥ ৪৯৯ ॥

কোনমতে মন্দ পথে নহে রোজগার ।
যদি নাশে উপবাসে তথাপি স্বীকার ॥ ৫০০ ॥

স্বভাবতঃ মনোন্নত টলাতে না পারে ।
অবস্থার সঙ্গে দ্বন্দ্ব দিবারাতি করে ॥ ৫০১ ॥

নাম দুর্গাচরণ উপাধি নাগ তাঁর ।
কায়স্থ-কূলের আলো গোটা বাঙ্গলার ॥ ৫০২ ॥

চিরভক্ত শ্রীপ্রভুর অতি আত্মজন ।
বারে বারে বন্দি তাঁর দুখানি চরণ ॥ ৫০৩ ॥

কেমনে মিলন হয় শ্রীপ্রভুর সনে ।
প্রভুপদে মজে মন ভারতী-শ্রবণে ॥ ৫০৪ ॥



ব্রহ্মজ্ঞানী বন্ধু এক শহরে বসতি ।
ধীমান সদ্‌গুণবান ধর্মে বড় মতি ॥ ৫০৫ ॥

সাকারের প্রতিবাদী সাকার না মানে ।
ব্রাহ্মদলভুক্ত তেঁহ কেশবের সনে ॥ ৫০৬ ॥

তীব্র ব্রহ্মজ্ঞানে ভরা হৃদয়-নিলয় ।
নর-গুরু কোনমতে করে না প্রত্যয় ॥ ৫০৭ ॥

এক ব্রহ্ম বিশ্ব-গুরু তাঁহার গিয়ান ।
শ্রীসুরেশচন্দ্র দত্ত মহাত্মার নাম ॥ ৫০৮ ॥

আজিতক সুরেশের নহে দরশন ।
মধুর মুরতি মোর প্রভুর কেমন ॥ ৫০৯ ॥

নাম লীলাস্থান মাত্র কানে আছে শুনা ।
এইবারে দেখিবারে হইল বাসনা ॥ ৫১০ ॥

এখন ধর্মের ঢাকে ধর্মের বাজারে ।
বেজেছে প্রভুর নাম অতি উচ্চৈঃস্বরে ॥ ৫১১ ॥

পরস্পরে পরামর্শ করি দুই জনে ।
দক্ষিণশহরে চলে প্রভু-দরশনে ॥ ৫১২ ॥

হেথা শ্রীমন্দিরমধ্যে প্রভু নারায়ণ ।
হাজরার সঙ্গে হয় কথোপকথন ॥ ৫১৩ ॥

এমন সময় ভক্তদ্বয় উপনীত ।
দেখিয়া অন্তরে প্রভু অতি আনন্দিত ॥ ৫১৪ ॥

সমাদরে বসাইয়া নীচের আসনে ।
পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন দুইজনে ॥ ৫১৫ ॥

প্রথম দর্শনে মন এইতক কথা ।
পশ্চাৎ পাইবে যত অপর বারতা ॥ ৫১৬ ॥



হৃদয়ের সম ভাগ্যধর আছে কেবা ।
অদ্যাপিহ করিছেন শ্রীপ্রভুর সেবা ॥ ৫১৭ ॥

অনুরাগ তত নাই পূর্বের মতন ।
তুলনায় অধিকাংশ ঔদাস্য এখন ॥ ৫১৮ ॥

কাঞ্চনে প্রয়াস বড় হইল তাঁহার ।
লোভেতে করিল নষ্ট যত সদাচার ॥ ৫১৯ ॥

কবে কিবা করিলেন তাহার ভারতী ।
বলিবারে গেলে পরে বেড়ে যায় পুঁথি ॥ ৫২০ ॥

সঙ্কেতেতে এই মাত্র বুঝে লও মন ।
হৃদুরে করিল কাবু কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৫২১ ॥

নিবারণে প্রভুদেব কহিলে তাঁহারে ।
কটূক্তি করিত কত তখনি প্রভুরে ॥ ৫২২ ॥

কটূক্তি হৃদয়ের মুখে এত বাড়াবাড়ি ।
শুনিয়া ঝরিত তাঁর শ্রীনয়নে বারি ॥ ৫২৩ ॥

কাঁদিতে কাঁদিতে হয় ভাবাবেশ গায় ।
সেই ভাবে বলিতেন সম্বোধিয়া মায় ॥ ৫২৪ ॥

"ক্ষমা কর ওমা কালী বালকহৃদ্বয় ।
মোরে বড় ভালবাসে তাই হেন কয়" ॥ ৫২৫ ॥

যতই করেন ক্ষমা ক্ষমার সাগর ।
হৃদয় ততই রুষে প্রভুর উপর ॥ ৫২৬ ॥

একদিন এত গালি হৃদয়ের মুখে ।
শুনিলে হউক শত্রু কানে নাহি ঢুকে ॥ ৫২৭ ॥

কাঁদিতে লাগিলা প্রভু স্ত্রীলোকের প্রায় ।
সকরুণে এইমত সম্ভাষিয়া মায় ॥ ৫২৮ ॥

"পিতা গেল মাতা গেল গেল সহোদর ।
সহিনু পাইনু কষ্ট দুস্তর দুস্তর ॥ ৫২৯ ॥

তরিলাম সকলেতে তোমার ইচ্ছায় ।
এইবার হৃদয়ের হাতে প্রাণ যায়" ॥ ৫৩০ ॥

ভাগ্যবান যেন হৃদু তেন দুরদৃষ্ট ।
এত সেবা করি পরে দিল এত কষ্ট ॥ ৫৩১ ॥

এখন দক্ষিণেশ্বরে মাতাঠাকুরানী ।
যে ঘরে থাকিত আই সেই ঘরে তিনি ॥ ৫৩২ ॥

মায়ের বসতি হেন নিস্তব্ধ ধরনে ।
ঘরেতে আছেন মাতা সাধ্য কার জানে ॥ ৫৩৩ ॥

ছ মাস যদ্যপি তথা কেহ করে বাস ।
তথাপিহ না পাইবে তাঁহার তল্লাস ॥ ৫৩৪ ॥

মায়ের প্রকৃতি ঠিক প্রকৃতির ছাড়া ।
বিশ্বকারিগর বিধি নয় তার গড়া ॥ ৫৩৫ ॥

মায়েতে মায়ের ধারা সহ্য অতিশয় ।
যেন মায়ে বহু দুঃখ দিয়াছে হৃদয় ॥ ৫৩৬ ॥

একদিন মিষ্টভাবে বিনয় করিয়া ।
জলয়ে কহেন প্রভু মায়ে দেখাইয়া ॥ ৫৩৭ ॥

উনি যদি হন রুষ্ট রক্ষা নাহি আর ।
সাবধানে কর কর্ম মিনতি আমার ॥ ৫৩৮ ॥

কেবা শুনে কার কথা হয়েছে সময় ।
আপন স্বভাবে কর্ম করেন হৃদয় ॥ ৫৩৯ ॥

কত সহিবেন এত তাড়না প্রবল ।
স্বকর্মে হৃদয় পরে পায় প্রতিফল ॥ ৫৪০ ॥

একদিন মহাঘটা পুরীর ভিতরে ।
শ্যামাপূজা সেই দিন বহু আড়ম্বরে ॥ ৫৪১ ॥

পুরী-স্বামী এ সময় মথুর-নন্দন ।
ত্রৈলোক্য তাঁহার নাম বাবু এক জন ॥ ৫৪২ ॥

ভক্তিপথে বাপ যেন গন্ধ নাই তার ।
কালের ঢং এর বুঝা বিলাসি-আচার ॥ ৫৪৩ ॥

পুজাদিনে পুরীমধ্যে সঙ্গে লোকজন ।
দাসদাসী পরিবার নন্দিনী-নন্দন ॥ ৫৪৪ ॥

এখন হৃদয় ব্রতী চামার সেবায় ।
লজ্জীভূত পুজোপকরণ সমুদায় ॥ ৫৪৫ ॥

সমুখে যোগান সব আছে খালে খালে ।
পূজা-সেবা-হেতু হৃদু বলে যথাকালে ॥ ৫৪৬ ॥

দশমবর্ষীয়া এক ত্রৈলোক্যের মেয়ে ।
পূজা দেখিবারে আসে পুলকিত হয়ে ॥ ৫৪৭ ॥

নানাবিদ অলঙ্কারে অঙ্গ সুশোভন ।
পরিধান ঘোর লাল চেলির বসন ॥ ৫৪৮ ॥

পরমা সুন্দরী বালা মনোহরা ছবি ।
দেখিলেই বোধ হয় যেন বনদেবী ॥ ৫৪৯ ॥

মন্দির-দুয়ারে যবে হৈল আগুসার ।
হৃদয় করিতেছিল পূজার যোগাড় ॥ ৫৫০ ॥

জানি না কি ভাবে তারে করি দরশন ।
হৃদয় লইয়া দুই কুসুম-চন্দন ॥ ৫৫১ ॥

অর্পণ করিল সেই বালিকার পায় ।
পায়েতে চন্দন মাথা বালা ঘরে যায় ॥ ৫৫২ ॥

জননী দেখিয়া তার দু'পারে চন্দন ।
কি লেগেছে কি হয়েছে জিজ্ঞাসে কারণ ॥ ৫৫৩ ॥

কন্যার বচনে শুনি সঠিক কাহিনী ।
বুকে করাঘাত করে কান্দিয়া জননী ॥ ৫৫৪ ॥

একি অমঙ্গল কথা হইয়া ব্রাহ্মণ ।
বালিকার পায়ে দিল কুসুম-চন্দন ॥ ৫৫৫ ॥

পশ্চাৎ ত্রৈলোক্যনাথ পাইয়া খবর ।
ক্রোধে অঙ্গ জ্ঞানশূন্য কাঁপে কলেবর ॥ ৫৫৬ ॥

দ্বারবানে সেইক্ষণে হুকুম জাহির ।
হৃদয়ে করিয়া দিতে পুরীর বাহির ॥ ৫৫৭ ॥

আরও শুনি সেই সঙ্গে ক্রোধান্ধ হইয়া ।
বলিয়াছিলেন প্রভুদেবে উদ্দেশিয়া ॥ ৫৫৮ ॥

কেমনে হইবে তাঁর থাকা এইখানে ।
যথা আজ্ঞা কহে দ্বারী প্রভুনারায়ণে ॥ ৫৫৯ ॥

অমনি উঠিলা প্রভু আর কেবা রাখে ।
এক বস্ত্র পরিধান ফটকাভিমুখে ॥ ৫৬০ ॥

সাধের বেটুয়া খলি তাও সঙ্গে নয় ।
পথে যেতে ত্রৈলোক্যের সঙ্গে দেখা হয় ॥ ৫৬১ ॥

ফিরায় ত্রৈলোক্য তাঁর আপন মন্দিরে ।
বিনয়-নম্রতা-শ্রদ্ধা-ভক্তিসহকারে ॥ ৫৬২ ॥

আপনি যাবেন কোথা কহে পরমেশে ।
হৃদয় গিয়াছে যাক আপনার দোষে ॥ ৫৬৩ ॥

পরে বহু সকাতরে করে নিবেদন ।
অমঙ্গল বালিকার না হয় যেমন ॥ ৫৬৪ ॥

মঙ্গলনিধান প্রভু দিলেন অভয় ।
অমঙ্গল কিবা কথা মঙ্গল নিশ্চয় ॥ ৫৬৫ ॥

ঈশ্বরের লীলা-খেলা কি বলিব মন ।
যে হৃদয় শ্রীপ্রভুর আত্মীয়-স্বজন ॥ ৫৬৬ ॥

বাল্যাবধি এক সঙ্গে স্বদেশে বিদেশে ।
পরমসুহৃদ-সখা-বন্ধু-নির্বিশেষে ॥ ৫৬৭ ॥

কাটাইল এতদিন প্রভুর সেবায় ।
আজি কিবা কর্ম-ফলে তাঁহার বিদায় ॥ ৫৬৮ ॥

লীলা-মর্ম বলিবারে হই অতি ভীতু ।
সার অর্থ লীলা তাঁর জীব শিক্ষা-হেতু ॥ ৫৬৯ ॥

হৃদয়ের দুই পায়ে করিয়া প্রণতি ।
ভক্তিসহকারে শুন রামকৃষ্ণপুঁথি ॥ ৫৭০ ॥



সমাগত ভক্ত যত সবে গেছে মজে ।
মধুভরা শ্রীপ্রভুর চরণ-পঙ্কজে ॥ ৫৭১ ॥

পুরী থেকে হৃদয়ের হইলে বিদায় ।
রহিল হরিশ লাটু প্রভুর সেবায় ॥ ৫৭২ ॥

দিনে রেতে থাকে সাথে সেবে সযতনে ।
এমন সুন্দর সেবা হৃদুও না জানে ॥ ৫৭৩ ॥

যোত্রাপন্ন ভক্ত যাঁরা দেন সরঞ্জাম ।
শ্রীপ্রভুর সেবাহেতু যাহা প্রয়োজন ॥ ৫৭৪ ॥

বিশেষ সুরেন্দ্র মিত্র আর দত্ত রাম ।
কখন কি লাগে রাখে সর্বদা সন্ধান ॥ ৫৭৫ ॥

ব্যয়কুণ্ঠ বলরাম অপবাদ আছে ।
তিনিও যতনে রন এ দুয়ের পাছে ॥ ৫৭৬ ॥



প্রভু যে আপনি নিজে রাজরাজেশ্বর ।
ভক্ত রামে বলরামে পেয়েছে খবর ॥ ৫৭৭ ॥

সেই হতে আত্মবন্ধু আছে যে যেখানে ।
সকলে লইয়া যান প্রভু-দরশনে ॥ ৫৭৮ ॥

একদিন বলরাম করিবে গমন ।
সুন্দর আত্মীয়া এক দিল দরশন ॥ ৫৭৯ ॥

আপনা আপনি মধ্যে সন্নিকটে বাড়ি ।
দশে জানা পিতা তাঁর করেন ডাক্তারি ॥ ৫৮০ ॥

জমিদার পতি তাঁর খড়দায় ঘর ।
বেশ্যা-সুরা-প্রিয় স্ত্রীরে করে না আদর ॥ ৫৮১ ॥

তেকারণ হয় বাস পিতার ভবনে ।
অন্তরে অপার ছাপ বহে রেতে দিনে ॥ ৫৮২ ॥

বসু-বাসে শ্রীপ্রভুর পাইয়া সন্ধান ।
দক্ষিণশহরে আজি দরশনে যান ॥ ৫৮৩ ॥

কিবা গুণ আছে লগ্ন প্রভু-দ্বরশনে ।
কে বুঝিবে শ্রীপ্রভুর চিরভক্ত বিনে ॥ ৫৮৪ ॥

ভব-জ্বালাপরিপূর্ণ যত ছিল ঘটে ।
একবার দরশনে সব গেল ছুটে ॥ ৫৮৫ ॥

হৃদি থলি হইল খালি তুম্বীর মতন ।
কৃপা করি দিলা প্রভু শুদ্ধাভক্তি-ধন ॥ ৫৮৬ ॥

স্বভাবতঃ শাস্তিমূর্তি অতুল ভুবনে ।
নিকটে কহিলে কথা নাহি ঢুকে কানে ॥ ৫৮৭ ॥

মাটিতে না পায় টের পা পাতিলে তার ।
গুণের আধার কত না আসে কথায় ॥ ৫৮৮ ॥

একে তাঁর স্বভাবতঃ স্বভাব এমন ।
সোনায় সোহাগা-যোগ প্রভু-দরশন ॥ ৫৮৯ ॥

শ্রীপ্রভুর দরশন শুধু একা নয় ।
মাতার সঙ্গেতে এই সঙ্গে পরিচয় ॥ ৫৯০ ॥

গাছের তলায় দুয়ে একবারে পান ।
ভক্তিমতী যোগীন-মা এ দেবীর নাম ॥ ৫৯১ ॥

প্রভু আর মার পথে সমর্পিয়া মন ।
আজিকার মত ফিরে পিতার ভবন ॥ ৫৯২ ॥

ভক্তির আস্বাদ পেয়ে থাকিতে না পারে ।
সুযোগ পাইলে যান প্রভুর গোচরে ॥ ৫৯৩ ॥

করেন মায়ের সেবা পরম যতনে ।
ভক্তি কৃপা সিদ্ধি বৃদ্ধি হয় দিনে দিনে ॥ ৫৯৪ ॥

সাধন-ভজন যেবা উপযুক্ত তাঁর ।
পূজা-জপ-ধ্যান-ক্রিয়া নৈষ্ঠিক আচার ॥ ৫৯৫ ॥

প্রভুদেব এক দিন কৃপা-সহকারে ।
বুঝাইয়া বিধিমত দিলেন তাহারে ॥ ৫৯৬ ॥

পুরাতন কায়া গেল নূতন এখন ।
কভু জপে রত কভু ধিয়ানে মগন ॥ ৫৯৭ ॥

ভক্তিমতী আছে যত প্রভু-অবতারে ।
কাহারও নাহিক ঠাঁই ইঁহার উপরে ॥ ৫৯৮ ॥

একদিন প্রভুদেব তাঁরে উল্লেখিয়া ।
বলিলেন অন্তে যত ভক্তে সম্বোধিয়া ॥ ৫৯৯ ॥

"অতিশয় ভক্তিমতী সুন্দর আধার ।
ফুটিবে কতই ফুল হৃদয়ে তাঁহার" ॥ ৬০০ ॥

অদ্ভুত ধিয়ান তাঁর সমাধির মত ।
একেবারে বাহিক গিয়ান বিরহিত ॥ ৬০১ ॥

লীলা বুঝা শক্তি ঘটে ফুটে বিলক্ষণ ।
অন্তর্দৃষ্টিসহ সদা উচ্চে থাকে মন ॥ ৬০২ ॥

এত ভক্তি ঠিক যেন গড়া ভক্তি-ছাঁচে ।
মাইর চরণোদক অভাগিয়া যাচে ॥ ৬০৩ ॥



একেবারে গেল উড়ে আগেকার ধারা ।
দেখে শুনে বলরাম হয় বুদ্ধি-হারা ॥ ৬০৪ ॥

মনে ভাবে সৃষ্টিছাড়া প্রভু-নারায়ণ ।
আশ্চর্য যা শুনি তাহা করি দরশন ॥ ৬০৫ ॥

একবার দরশনে পরশনে যাঁর ।
বিশুদ্ধ ভকতি হয় হৃদয়ে সঞ্চার ॥ ৬০৬ ॥

অতিশয় বৃদ্ধ পিতা বাস বৃন্দাবনে ।
চলিলেন বলরাম আনিতে এখানে ॥ ৬০৭ ॥

মনে মনে বড় সাধ দেখাবেন তাঁয় ।
মনোহর কল্পতরু প্রভুদেবরায় ॥ ৬০৮ ॥

বৃন্দাবনে হাজির হইয়া গিয়া কয় ।
আঙ্গোপান্ত শ্রীপ্রভুর যত পরিচয় ॥ ৬০৯ ॥

দৈবের ঘটনা কার সাধ্য বলে উঠে ।
ভক্তিমতী নারী এক এই কুঞ্জে জুটে ॥ ৬১০ ॥

কৃষ্ণভক্তি অনুরাগ এত ঘটে তাঁর ।
কলিতে না শুনি কথা এ হেন প্রকার ॥ ৬১১ ॥

বয়সে নবীনা তিনি ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
সন্ন্যাসিনীসম বেশ কৃষ্ণের লাগিয়ে ॥ ৬১২ ॥

বসুর নিকটে শুনি প্রভুর কাহিনী ।
তাঁহারে দেখিতে নেচে উঠে সন্ন্যাসিনী ॥ ৬১৩ ॥

শ্রীপ্রভুর নামে কি মোহন শক্তি আছে ।
নহে যেবা পরিচিত সেও শুনে নাচে ॥ ৬১৪ ॥

অতি দুরদৃষ্ট যেবা আবদ্ধ অশুচি ।
তাহার কেবল নামে নাহি হয় রুচি ॥ ৬১৫ ॥

বদ্ধজীব তারে বলে যুক্তি নাহি চায় ।
সতত প্রমত্তচিত অবিদ্যা-সেবায় ॥ ৬১৬ ॥

নয়নাবরণ চোখে বাঁধা আছে ঠুলি ।
সময়ে দিবেন প্রভু অবশ্যই খুলি ॥ ৬১৭ ॥

অহেতুক কৃপাসিন্ধু প্রভু দয়াধাম ।
জীবদুঃখে দুঃখী তাঁর নাহিক আরাম ॥ ৬১৮ ॥

নানামতে রূপা দিতে করেন উপায় ।
নিজ করমের ফলে জীবে নাহি চায় ॥ ৬১৯ ॥

অবিদ্যার ধনে খেলে আনন্দ অন্তর ।
হায় জীববুদ্ধি তার পায়ে করি গড় ॥ ৬২০ ॥

আবার এমন দেখি মনুষ্য-আকারে ।
শুনিয়া প্রভুর নাম মুগ্ধ হয়ে পড়ে ॥ ৬২১ ॥

ভূলোকের এরা নন, গোলোকের জাতি ।
রামকৃষ্ণ-অবতারে শ্রীপ্রভুর সাথী ॥ ৬২২ ॥



সন্ন্যাসিনী অনুরাগে খেপার সমান ।
সন্ন্যাস-আশ্রমে তাঁর গৌরদাসী নাম ॥ ৬২৩ ॥

প্রভু-অবতারে পরে ভক্তেরা সকলে ।
সম্বোধনে ডাকে তাঁয় গৌর-মাতা বোলে ॥ ৬২৪ ॥

সঙ্গে পিতা গৌরমাতা ভক্ত বলরাম ।
উতরিলা ত্বরা করি কলিকাতা ধাম ॥ ৬২৫ ॥

বসুর আছিল এই রীতি বরাবর ।
যেই দিনে যাইতেন দক্ষিণশহর ॥ ৬২৬ ॥

মেয়েছেলে গোষ্ঠিবর্গ প্রতিবাসী যত ।
বিচারবিহীনে সঙ্গে অনেকে থাকিত ॥ ৬২৭ ॥

আজি তরীযোগে হয় তাঁহার গমন ।
বিরাজেন যেথা প্রভু ভক্তের জীবন ॥ ৬২৮ ॥

ঘোমটার মধ্যে ঢাকা যতেক রমণী ।
প্রভুদেবে বন্দে সব লুটায়ে অবনী ॥ ৬২৯ ॥

প্রভুর নিকটে নাই কিছু অবিদিত ।
হাজার না থাক কেহ যত আবরিত ॥ ৬৩০ ॥

কার শক্তি তাঁর কাছে রাখে কিছু ঢাকি ।
ঘটে ঘটে স্থিত যাঁর সৃষ্টিময় আঁখি ॥ ৬৩১ ॥

অসীম গভীর জলে সাগর-ভিতরে ।
সুনীল গগনভেদী শৃঙ্গী গিরিবরে ॥ ৬৩২ ॥

পাতালে মেদিনীগর্ভে কিবা ভিন্ন লোকে ।
বিন্দুপরিমিত তনু যে যেথায় থাকে ॥ ৬৩৩ ॥

সকলে দেখেন প্রভু মুদিয়া নয়ন ।
ভূতপতি মায়াধীশ সৃষ্টির কারণ ॥ ৬৩৪ ॥

বিশ্বাধার বিশ্বাধেয় জগৎগোসাঁই ।
চরাচরব্যাপ্ত স্থূলদৃষ্টে এক ঠাঁই ॥ ৬৩৫ ॥

যতগুলি ভক্তনারী বসে একধারে ।
বসনে বদন গুপ্ত স্বভাবানুসারে ॥ ৬৩৬ ॥

আকার কি হৃদি-ভাব কি প্রকার কার ।
প্রভুদেব সুবিদিত সব সমাচার ॥ ৬৩৭ ॥

অঙ্গুলি-নির্দেশে দেখাইয়া গৌরমায় ।
বলরামে পুছিলেন প্রভুদেবরায় ॥ ৬৩৮ ॥

কেবা এই ভক্তিমতী কহ পরিচয় ।
গুপ্ত উপযুক্ত মুখ ইহার তো নয় ॥ ৬৩৯ ॥

লজ্জা-ঘৃণা-ভয়হারা ঘর-বাড়ি-ছাড়া ।
কৃষ্ণ-হেতু বিদেশিনী অনুরাগে ভরা ॥ ৬৪০ ॥

হবিসহযোগে যেন জ্বলন্ত পাবক ।
শতাধিক পরিমাণে হয় উদ্দীপক ॥ ৬৪১ ॥

সেইমত গৌরমার অনুরাগাগুনে ।
বহু গুণে কৈল বুদ্ধি প্রভুর বচনে ॥ ৬৪২ ॥

সেই কালে সঙ্গে জুটে উচ্ছ্বাস-পবন ।
উড়াইল একদিকে মুখের বসন ॥ ৬৪৩ ॥

ভক্ত ভগবানে আছে স্বতন্তর ভাষ ।
তাহে সন্ন্যাসিনী করে বেদনা প্রকাশ ॥ ৬৪৪ ॥

প্রভুদেব শান্ত কৈলা শান্তি-বারি দিয়া ।
দেখে ভক্ত বলরাম অবাক হইয়া ॥ ৬৪৫ ॥

সুখ্যাতি শুনিয়া তাঁর শ্রীপ্রভুর স্থানে ।
বলরাম রাখে তাঁর নিজ নিকেতনে ॥ ৬৪৬ ॥

পরম যতনে মনে মনে এই জ্ঞান ।
মানবী কখন নয় দেবীর সমান ॥ ৬৪৭ ॥

এই সব ভক্ত লৈয়া প্রভু গুণমণি ।
কেমনে করিলা লীলা তাহার কাহিনী ॥ ৬৪৮ ॥

যথাশক্তি পরে পরে কব সমাচার ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-পুঁথি ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৬৪৯ ॥


        তৃতীয় খণ্ড সমাপ্ত


থাকে — শ্রেণীভুক্ত ।