চতুর্থ খণ্ড

প্রভুর সহিত রাখালের মিলন


জয় প্রভু রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


অখিলের অধিপতি পরম ঈশ্বর ।
লীলাহেতু ধরায় ধরিয়া কলেবর ॥ ১ ॥

দীন-দুঃখী দ্বিজবেশ শুপ্ত সাজ গায় ।
কৈবর্তের পুরীমধ্যে প্রভুদেবরায় ॥ ২ ॥

সুন্দর সাকার লীলা অমৃত কথন ।
যোল আনা মন দিয়া শুন শুন মন ॥ ৩ ॥

সংসারের দুঃখে শোকে পেতে দিয়া ছাতি ।
ত্রিতাপ-সন্তাপহর মধুর ভারতী ॥ ৪ ॥

লীলা মানে খেলা তাঁর একাকী না হয় ।
সঙ্গে থাকে সাঙ্গোপাঙ্গ স্বগণনিচয় ॥ ৫ ॥

নিত্যাসদ্ধ নিত্যযুক্ত পারিষদগণ ।
ঈশ্বরকোটির তাঁরা প্রভুর বচন ॥ ৬ ॥

তাঁহাদের মধ্যে দেখি দুই শ্রেণীভুক্ত ।
তিয়াগী সন্ন্যাসী কেহ কেহ বা গৃহস্থ ॥ ৭ ॥

হইলে সংসারী তবু গুণ নাহি ছুটে ।
গোলাপ গোলাপ যদি কাঁটাবনে ফুটে ॥ ৮ ॥

অন্যবিধ জীবকোটি ভক্তগণ তাঁর ।
কেহ বা তিয়াগী কেহ করেন সংসার ॥ ৯ ॥

সামান্য জীবের মত নহে গণনায় ।
দেবদেবী সশরীরে আগত লীলায় ॥ ১০ ॥

তাঁদিকে লইয়া যাহা খেলিলা গোসাঁই ।
সেই ভাগবত খেলা লীলা নামে গাই ॥ ১১ ॥

ভক্তসঙ্গে খেলিতে বড়ই প্রীতি মনে ।
অবতারে শুধু খেলা ভকতের সনে ॥ ১২ ॥

লীলাস্বাদে মত্ত যেবা ভ্রমে লীলাস্থলী ।
তিনি তাঁর আপ্তজন ভক্ত তাঁরে বলি ॥ ১৩ ॥

স্বভাবতঃ যুক্ত আঁথি লীলা দেখিবারে ।
লীলাময় শ্রীপ্রভুর লীলার আসরে ॥ ১৪ ॥

আপ্তজন ভক্তগণ শুন পরিচয় ।
যাঁরা আছে তাঁরা আছে নূতন না হয় ॥ ১৫ ॥

ভিতরেতে সেই বস্তু একই প্রকৃতি ।
অবতারভেদে মাত্র বিভিন্ন মুরতি ॥ ১৬ ॥

প্রভুর বচনে শুন তাহার প্রমাণ ।
ভাবাবেশে একদিন কন ভগবান ॥ ১৭ ॥

আমড়া নিকৃষ্ট জাতি ফলের ভিতরে ।
সুমিষ্ট ফজলি তারে পারি করিবারে ॥ ১৮ ॥

কি হেতু করিব তাহা কিবা প্রয়োজন ।
ফজলি আমের মোর রয়েছে কানন ॥ ১৯ ॥

অবতারে শুদ্ধ তাঁর ভক্তসনে খেলা ।
সিন্ধুর যেমন রঙ্গ লয়ে ঊর্মিমালা ॥ ২০ ॥

বদ্ধজীবসঙ্গে রঙ্গে নহে কোন কালে ।
যে না জানে খেলা তার সঙ্গে কেবা খেলে ॥ ২১ ॥

চিরকাল বিদিত ভক্তের ভগবান ।
ভক্তিগ্রন্থে তাই থাকে ভক্তের আখ্যান ॥ ২২ ॥

লোকে প্রায় লীলাবৃষ্টি-শক্তিবিরহিত ।
তাই কহে গ্রন্থে কেন ভক্তের চরিত ॥ ২৩ ॥

ভক্তের কথায় তাঁর মহিমা অপার ।
না বুঝিয়া লোকে তাই কহে অনন্ত আর ॥ ২৪ ॥

দেখিতে শকতি নাই দৃষ্টি নাহি চলে ।
ফল ফুল গুঁড়ি ছাড়া গাছ কোন্ কালে ॥ ২৫ ॥

ভক্তগণ-মধ্যে তাঁর সতত বিহার ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি শ্রীঅঙ্গের আপনার ॥ ২৬ ॥

শ্রীপ্রভুর যত রঙ্গ তাঁহাদের সনে ।
ভক্তে দিলে বাদ লীলা হইবে কেমনে ॥ ২৭ ॥

কেবল সুতায় ফুল করি পরিহার ।
কখন কে গাঁথে কিসে কুসুমের হার ॥ ২৮ ॥

এ লীলায় গুপ্ত ভক্ত প্রথম আসরে ।
শশিকলাসম বৃদ্ধি সঙ্গ পেয়ে পরে ॥ ২৯ ॥

কেমনে গোপন পরে কেমনে প্রকাশ ।
দৃষ্টিহীনে কখনই না মিলে আভাস ॥ ৩০ ॥

শ্রবণ কীর্তনে লীলা যত মাখামাখি ।
পূতচিত সুনিশ্চিত তবে খুলে আঁখি ॥ ৩১ ॥

ক্রমে পরে দরশন মিলয়ে লীলার ।
প্রাণসম ভক্তসনে সম্বন্ধ কি তাঁর ॥ ৩২ ॥

বড় দুঃখ ভোগে ভক্ত কথা সত্য অতি ।
সন্দ যদি হয় তবে শুনহ ভারতী ॥ ৩৩ ॥

স্বতন্ত্র প্রকৃতি তাঁর ভক্তে যাহা পায় ।
প্রভুসনে রঙ্গভূমে আসিয়া ধরায় ॥ ৩৪ ॥

জীবশিক্ষা একমাত্র তাহার কারণ ।
নাহি হরি যথা আছে কামিনী-কাঞ্চন ॥ ৩৫ ॥

নাহি হরি তথা সুখ-সম্পদ যেখানে ।
নাম কি আভাস গন্ধ তিল-পরিমাণে ॥ ৩৬ ॥

এ ঘরের উল্টা রীতি নীতি প্রতিকূল ।
অগ্রভাগ সর্ব নীচে ঊর্ধ্বদেশে মূল ॥ ৩৭ ॥

যতই উত্তরমুখে করিবে চয়ন ।
ততই দক্ষিণ দূর বিধির বিধান ॥ ৩৮ ॥

ইন্দ্রিয়ের প্রীতিকর সুখ যারে জানি ।
কোথা তায় সুখ সে তো গরলের খনি ॥ ৩৯ ॥

জিনিস কি চিনি চিনি রসনার আশ ।
উদরে কৃমির হেতু তিক্তে হয় নাশ ॥ ৪০ ॥

সম্পদে বিপদ বড় বিপদেতে হিত ।
ভকতে রাখেন প্রভু বিপদে বেষ্টিত ॥ ৪১ ॥

বিপদের হেতু কোথা বিপদে কি আনে ।
হইয়া প্রভুর দাস এ বিপদ কেনে ॥ ৪২ ॥

মনে প্রাণে বুঝে যেবা মহাভাগ্যবান ।
বিপদ সম্পদ তাঁর প্রাণের আরাম ॥ ৪৩ ॥

বিবেক-বিরাগ-মূল জ্ঞানের আকর ।
প্রেমভক্তি পায় দ্রুতি পরম সুন্দর ॥ ৪৪ ॥

দুঃখ সুখে দুঃখ সুখ স্বভাবের ধারা ।
ভক্তের দুঃখেতে ধরে স্বতন্ত্র চেহারা ॥ ৪৫ ॥

শরতে জলদজালে ভীষণ গর্জন ।
পরিণামে পুষ্টিকর বারি-বরিষণ ॥ ৪৬ ॥

অনুপম পরিমল বিপদের সাথী ।
অনুরাগে চারিদিকে ছুটে দ্রুতগতি ॥ ৪৭ ॥

চন্দনের সৌরভ যেমন বৃদ্ধি পায় ।
সবলে পিষিলে তারে কঠোর শিলায় ॥ ৪৮ ॥

কলঙ্ক-কালিমা চিহ্ন ভকতের গায় ।
সত্যই কতই স্থানে স্থানে দেখা যায় ॥ ৪৯ ॥

তাহার কারণ আছে শুন খুলে বলি ।
তাতে বাতে ফুটে ভক্ত-কুসুমের কলি ॥ ৫০ ॥

অভক্তে কুকর্ম করে নরকে পয়ান ।
ভকতে তাহাতে পড়ে বেদান্ত পুরাণ ॥ ৫১ ॥

ফুটে আঁখি নিরমল শতগুণবলে ।
বিবেক-বিরাগ-বৃদ্ধি প্রতি পলে পলে ॥ ৫২ ॥

কর্মস্মৃতি দ্রুতগতি বিরাগের বাটে ।
তুরঙ্গম যেইরূপ কষাঘাতে ছুটে ॥ ৫৩ ॥

মনোরথে প্রভুদেব যাঁহার সারথি ।
শত জনমের পথে এক পলে গতি ॥ ৫৪ ॥

এইরূপ খেলা তাঁর ভকতের সনে ।
একই উদ্দেশ্য জীব-শিক্ষার কারণে ॥ ৫৫ ॥

ভক্তসনে খেলা দেখা অতি প্রয়োজন ।
করিবারে শ্রীপ্রভুর লীলা-আস্বাদন ॥ ৫৬ ॥

লবে ভক্তপদধূলি শিরে আপনার ।
কার্যাকার্য কিছু তাঁর না করি বিচার ॥ ৫৭ ॥



প্রভুর পাইয়া তত্ত্ব শ্রীমনোমোহন ।
প্রভু-দরশনে করে সর্বদা গমন ॥ ৫৮ ॥

সঙ্গে লয়ে পরিবার নন্দন-নন্দিনী ।
যতগুলি ভক্তিমতী তাঁহার ভগিনী ॥ ৫৯ ॥

রত্নগর্ভা জননী ভগ্নিপতিগণ ।
অন্ত কত প্রতিবাসী আত্মীয়-স্বজন ॥ ৬০ ॥

এইবারে তৃতীয় ভগিনীপতি যান ।
প্রভুর মানসপুত্র শ্রীরাখাল নাম ॥ ৬১ ॥

চৌদ্দ কি পনর বর্ষ বয়ঃক্রম তাঁর ।
বিষয়-সম্পত্তি ঘরে বাপ জমিদার ॥ ৬২ ॥

দোহারা গড়নখানি সরল মধুর ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেতে বহু সাদৃশ্য প্রভুর ॥ ৬৩ ॥

হারা ছেলে পুনরায় ফিরে এল ঘর ।
মহোল্লাসে ভাসে যেন পিতার অন্তর ॥ ৬৪ ॥

তাঁহারে দেখিয়া তেন প্রভুর আমার ।
উথলে আনন্দ হৃদে নাহি ধরে আর ॥ ৬৫ ॥

সম্বরেন সুখবেগ নিজে প্রভুরায় ।
একবারে ধরা কারে না দেন লীলায় ॥ ৬৬ ॥

লুকোচুরি খেলা কত হয় কি কারণ ।
বুঝেছ কি হেতু কিছু দৃষ্টিহীন মন ॥ ৬৭ ॥

এখন যদ্যপি আছ দৃষ্টিপথে কানা ।
একত্রে দুহাতে ধর দাড়িম্বের দানা ॥ ৬৮ ॥

ধীরে ধীরে দন্তের পেষণে খাও কারে ।
কারে কর উদরস্থ গিলে একবারে ॥ ৬৯ ॥

তবে না বুঝিবে মর্ম প্রভু কি কারণে ।
সহজে না যেন ধরা প্রথমে প্রথমে ॥ ৭০ ॥

শ্রীমনোমোহনে কন শ্রীপ্রভু আমার ।
দেখ এই রাখালের সুন্দর আধার ॥ ৭১ ॥

এখন শ্রীরাখালের বিদ্যার্জনকাল ।
লেখা-পড়া ছিল তার বড়ই জঞ্জাল ॥ ৭২ ॥

যা কিছু সামান্য যত্ন বিদ্যাভ্যালে ছিল ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে সেটুকুও গেল ॥ ৭৩ ॥

বিদ্যালয়ে নাহি মন যাওয়া মাত্র নামে ।
সে কেবল একমাত্র পিতার শাসনে ॥ ৭৪ ॥

কোন দিন বিদ্যালয়ে ছুটি পেলে পর ।
পুনরায় ফিরে নাহি যাইতেন ঘর ॥ ৭৫ ॥

বরাবর আসিতেন দক্ষিণশহরে ।
থাকিতেন দুই-তিন দিন একবারে ॥ ৭৬ ॥

হেন আচরণে ঘরে জনক তাঁহার ।
দেখা পেলে করিতেন কত তিরস্কার ॥ ৭৭ ॥

আটকে রাখেন তাঁয় আপনার ঘরে ।
আসিতে না পান যেন দক্ষিণশহরে ॥ ৭৮ ॥

হেথা অতি বিষাদিত প্রভু গুণমণি ।
রাখালের তরে চিন্তা দিবস-যামিনী ॥ ৭৯ ॥

উঠিল প্রবল টান সে টানের জোরে ।
বেগে গিয়া ঢুকিতেন কালীর মন্দিরে ॥ ৮০ ॥

প্রার্থনা হইত কত বারি দুনয়নে ।
বিদরে হৃদয় মা গো রাখাল-বিহনে ॥ ৮১ ॥

ভক্ত-প্রাণ ভক্ত-প্রিয় প্রভু ভগবান ।
সন্দেহ-মোচনে কব বহুল প্রমাণ ॥ ৮২ ॥

স্বার্থশূন্য প্রভুদেব কোন স্বার্থ নাই ।
ভক্ত-হেতু স্বার্থপর সর্বদা গোসাঁই ॥ ৮৩ ॥

যবে যা প্রার্থনা প্রভু করেন শ্যামায় ।
তখনি পূরণ হয় তাঁহার ইচ্ছায় ॥ ৮৪ ॥

শ্যামায় তাঁহায় মন কোন ভেদ নাই ।
একরূপে শ্যামারূপ অপরে গোসাঁই ॥ ৮৫ ॥

মনে প্রাণে ভাবে অঙ্গে দোঁহে ঠিক একা ।
দোঁহার মধ্যেতে দোঁহে পরস্পর ঢাকা ॥ ৮৬ ॥

দেখিতে যদ্যপি সাধ হয় তোর মন ।
সরলে স্মরহ প্রভু তম-বিমোচন ॥ ৮৭ ॥

শ্রীপ্রভুর ইচ্ছা যেন কি কল-কৌশলে ।
আনিয়া দিলেন কালী তাঁহার রাখালে ॥ ৮৮ ॥

স-মনে শুনিলে ঘুচে লোচন-আঁধার ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীত অমৃত ভাণ্ডার ॥ ৮৯ ॥



রাখালের জনকের বহুজমিজমা ।
বিষয় সম্বন্ধে এক উঠে মকদ্দমা ॥ ৯০ ॥

অতিশয় বিপদ হইলে পরাজয় ।
দিবানিশি ভেবে সারা অন্তরেতে ভয় ॥ ৯১ ॥

মিছিলের অবস্থার বড়ই দুর্দশা ।
পরপক্ষ বলবান্‌ নাহি জয়-আশা ॥ ৯২ ॥

কেহ নাহি কয় তাঁয় জিনিলে মিছিল ।
বড় বড় বিধিবিৎ কৌন্সলী উকিল ॥ ৯৩ ॥

অন্য চিন্তা নাই এই চিন্তা নিরন্তর ।
তন্ময়ত্ব তাহে নাই ঘরের খবর ॥ ৯৪ ॥

এ সময় অবসর পাইল রাখাল ।
পিতার জঞ্জালে তাঁর ঘুচিল জঞ্জাল ॥ ৯৫ ॥

প্রভুর নিকটে তবে থাকেন এখন ।
দেখিয়াও পিতা নাহি করেন বারণ ॥ ৯৬ ॥

প্রভুর ইচ্ছায় কিবা হইল এমনি ।
জিনিবার নহে যাহা জিনিলেন তিনি ॥ ৯৭ ॥

মনে মনে বুঝিলেন জয়ের কারণ ।
সাধুর নিকটে যায় তাঁহার নন্দন ॥ ৯৮ ॥

সাধুর কৃপায় এই মকদ্দমা জিত ।
ষোল আনা পাকা জ্ঞানে ধারণা নিশ্চিত ॥ ৯৯ ॥

ঘুচিল পূর্বের ভাব মঙ্গল-লক্ষণ ।
রাখালে এখন নাই কোন নিবারণ ॥ ১০০ ॥

অবাধে কাটান কাল প্রভুর গোচরে ।
কর্ম তাঁর প্রভুসেবা ভক্তি-সহকারে ॥ ১০১ ॥

তদুপরি শ্রীপ্রভুর বাৎসল্য-সঞ্চার ।
সম্বোধিয়া ডাকিতেন 'গোপাল আমার' ॥ ১০২ ॥

রাখাল-বিহনে যেন গাভী বৎসহারা ।
হইল রাখাল দুটি নয়নের তারা ॥ ১০৩ ॥

গোপাল গোপাল বলি কতই আদর ।
আলিঙ্গন বসাইয়া কোলের উপর ॥ ১০৪ ॥

ভাবেতে কখন প্রভু এতই উন্মত্ত ।
কাঁধেতে করিয়া তায় করিতেন নৃত্য ॥ ১০৫ ॥

মরি কি মধুর খেলা কি কহিতে পারি ।
সাঙ্গোপাঙ্গ সহ লীলা নরদেহ ধরি ॥ ১০৬ ॥

নূতন সম্পর্ক নয় আপ্তগণ সনে ।
চিরকাল বাঁধা না চিনালে কেবা চিনে ॥ ১০৭ ॥

হীন হেয় জীববুদ্ধি বড় পরমাদ ।
বুঝে না বীজের মধ্যে ফলের আস্বাদ ॥ ১০৮ ॥

আছে হেন বহু বুদ্ধি সৃষ্টির ভিতরে ।
পূর্ব-জন্ম পর-জন্ম স্বীকার না করে ॥ ১০৯ ॥

হায় কি বিষম বুদ্ধি যার বিবেচনা ।
কারণ বিহনে হয় কর্মের সূচনা ॥ ১১০ ॥

বিনা কর্মে ফল হয় কি প্রকারে ভাবে ।
মন-নাশ কর্ম-নাশ দেহের বিনাশে ॥ ১১১ ॥

ভাল মন্দ যার যাহা সঙ্গে সঙ্গে রয় ।
হোক না দেহের লক্ষ লক্ষ বার লয় ॥ ১১২ ॥

দেহান্তরে গুণান্তর কহে আহাম্মক ।
এখানেতে টক যেবা সেখানেও টক ॥ ১১৩ ॥

স্বভাবে স্বভাব থাকে স্বভাবের প্রথা ।
বীজের ভিতর যেন ফল ফুল পাতা ॥ ১১৪ ॥

সম্পর্কে সমানভাবে বাঁধা চিরকাল ।
এখন রাখাল যিনি পূর্বেও রাখাল ॥ ১১৫ ॥

ভবিষ্যতে তিনিই রাখাল পুনঃ পরে ।
রাখালের রাখালত্ব কিসেও না মরে ॥ ১১৬ ॥

প্রভুর গোপাল তাঁর গুণান্তর নাই ।
গোসাঁইর শ্রীরাখাল তাঁহার গোসাঁই ॥ ১১৭ ॥



ধীর নম্র বিনয়ী সংসারী ভক্তবর ।
বিভূষিত সর্বগুণে গুণের সাগর ॥ ১১৮ ॥

আস্যে মৃদু মন্দ হাস্য খেলে অবিরাম ।
মিতব্যয়ী সন্তোষ-অন্তর বলরাম ॥ ১১৯ ॥

গোপনে গোপনে আনে প্রভু ভগবানে ।
মহাপুণ্যময় তীর্থ নিজ নিকেতনে ॥ ১২০ ॥

ভবনে মহিমা কিবা না যায় বর্ণন ।
গৌর অবতারে যেন শ্রীবাস-প্রাঙ্গণ ॥ ১২১ ॥

জগন্নাথ প্রতিমূর্তি প্রতিষ্ঠিত ঘরে ।
ভোগ-রাগ নিতি নিতি অতি প্রীতিভরে ॥ ১২২ ॥

সেই মহাপ্রসাদে প্রভুর সেবা হয় ।
শ্রীপ্রভুর অন্ন-ভিক্ষা যথা তথা নয় ॥ ১২৩ ॥

ভাগ্যধর বলরাম যাঁর এই বাড়ি ।
তিনি একজন গোটা প্রভুর ভাণ্ডারী ॥ ১২৪ ॥

নহে অপরের কথা প্রভুর বচন ।
এখানে ভাণ্ডারী তাঁর মোটে কয় জন ॥ ১২৫ ॥

মথুর বিশ্বাস অগ্রে সবার প্রধান ।
দ্বিতীয় যে জন এই বসু বলরাম ॥ ১২৬ ॥

তৃতীয় বেনিয়া জেতে সদ্‌গুণ অধিক ।
খ্যাতনামা মহাদাতা শ্রীশম্ভু মল্লিক ॥ ১২৭ ॥

চতুর্থ সুরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র মহাশয় ।
আগাগোড়া লীলাপাঠে পাবে পরিচয় ॥ ১২৮ ॥

বলরাম জন্ম জন্ম ভক্ত অবতারে ।
অন্ন ভিক্ষা শ্রীপ্রভুর তাই তার ঘরে ॥ ১২৯ ॥

প্রভুর গমনে বহু আড়ম্বর তথা ।
অন্ন ব্যঞ্জনাদি রাঁধে ভামিনীর মাতা ॥ ১৩০ ॥

মহাভাগ্যবতী এই ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
বড় খুশী প্রভুদেব তাঁর রান্না খেয়ে ॥ ১৩১ ॥

বহু তুষ্ট প্রভুদেব ভক্ত বলরামে ।
ভোজনে নানান রঙ্গ হয় তাঁর সনে ॥ ১৩২ ॥

একদিন সংগোপনে বলরামে কন ।
অন্যে দিতে দ্রব্য যদি আনে কোন জন ॥ ১৩৩ ॥

সেই দ্রব্য দেয় যদি খাইতে আমারে ।
কখন না পারি তাহা স্পর্শ করিবারে ॥ ১৩৪ ॥

আমার কারণ যাহা আমাকেই দিবে ।
ঠাকুরের ভোজ্যদ্রব্য স্বতন্ত্র রাখিবে ॥ ১৩৫ ॥

শ্রীপ্রভুর শ্রীবচন সত্য কত দূর ।
দেখিবারে কুতূহল হইল বসুর ॥ ১৩৬ ॥

পরদিনে শ্রীপ্রভুর মিষ্টান্নের খালে ।
ঠাকুরের ভোজ্য যত নিজে হাতে তুলে ॥ ১৩৭ ॥

মিশাইয়া দিল লক্ষ্য রাখি বিলক্ষণ ।
বাসনা দেখিতে প্রভু বাছেন কেমন ॥ ১৩৮ ॥

অন্তঃপুরে শ্রীপ্রভুর ভোজনের স্থান ।
সদর মহলে হেথা প্রভু ভগবান ॥ ১৩৯ ॥

সেবাহেতু শ্রীপ্রভুরে ডাকে যথাকালে ।
জানা নাই কিবা রঙ্গ মিষ্টান্নের থালে ॥ ১৪০ ॥

ঠাকুরের ভোজ্যে লক্ষ্য বিশেষ করিয়া ।
সম্মুখেতে বলরাম আছে দাঁড়াইয়া ॥ ১৪১ ॥

অবাক কাহিনী তেঁহ দেখিল সাক্ষাৎ ।
ঠাকুরের ভোজ্য তাঁর না পড়িল হাত ॥ ১৪২ ॥

যদিও প্রভুর ভোজ্য সঙ্গে মিশামিশি ।
সামান্য মিষ্টান্ন তাঁর নয় খুব বেশী ॥ ১৪৩ ॥

বড়ই আশ্চর্য কার্য দেখিতে শুনিতে ।
ভোজন দূরের কথা না ঠেকিল হাতে ॥ ১৪৪ ॥

যে ভাজ্য নিজের তাঁর তাঁর নামে আনা ।
প্রত্যেকের লয়ে প্রায় দুই-এক দানা ॥ ১৪৫ ॥

খাইলেন প্রভুদেব ভরিল উদর ।
বুদ্ধিহারা বলরাম দেখিয়া রগড় ॥ ১৪৬ ॥

শুন মন খুলে বলি লীলার বারতা ।
সুমিষ্ট হইতে মিষ্ট রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ১৪৭ ॥

চিত্ত তাঁর বিশ্বব্যাপী দর্পণের প্রায় ।
প্রতিবিম্বে তাহে সব যা হয় যথায় ॥ ১৪৮ ॥

শ্রবণবিবর ব্যাপ্ত সকল ভুবন ।
কার্যে বাঁধা একসঙ্গে কায় বাক্য মন ॥ ১৪৯ ॥

বিরাজিত সৎবুদ্ধি মূর্তিমান জ্ঞান ।
কায়া করে তাই যাহা মনের বিধান ॥ ১৫০ ॥

আর এক শ্রীপ্রভুর শ্রীঅঙ্গের ধারা ।
দেখিতে প্রাকৃত বাহ্যে পঞ্চভূতে গড়া ॥ ১৫১ ॥

তা নয় চিন্ময় মোর শ্রীপ্রভুর তনু ।
অনুক্ষণ সচেতন প্রতি পরমাণু ॥ ১৫২ ॥

বার বার দেখিয়াছি প্রভুদেবরায় ।
গাঢ়তর নিদ্রাগত আছেন শয্যায় ॥ ১৫৩ ॥

এমন সময় যদি অস্পর্শীয় জন ।
গমন করিত কাছে ছুইতে চরণ ॥ ১৫৪ ॥

প্রসারিত মাত্র হাত পরশের আগে ।
শশব্যস্ত প্রভুদেব উঠিতেন জেগে ॥ ১৫৫ ॥

চাক্ষুষ দর্শকে এই হয় অনুমান ।
প্রতি লোমকূপ তাঁর যেন চক্ষুষ্মান ॥ ১৫৬ ॥



বলরামে একদিন কন ভগবান ।
দেখ গো রাখাল নামে অতি ভক্তিমান ॥ ১৫৭ ॥

পেয়েছি বালক এক সুন্দর প্রকৃতি ।
শ্রীমনোমোহন মিত্র তার ভগ্নীপতি ॥ ১৫৮ ॥

যাও যদি একবার দেখে এস তাঁয় ।
কাঁসারিপাড়ার কাছে থাকে সিমলায় ॥ ১৫৯ ॥

মহাভক্ত বলরাম স্থির-বুদ্ধি তাঁর ।
প্রতি বর্ণে শ্রীপ্রভুর বুঝে আছে সার ॥ ১৬০ ॥

যতনে পালন শ্রীবচন যথাকালে ।
যথা আজ্ঞা চলিলেন দেখিতে রাখালে ॥ ১৬১ ॥

পরস্পর দেখাশুনা মন-আকর্ষণ ।
শুভক্ষণে দু'হু জনে হইল মিলন ॥ ১৬২ ॥

নিকট সম্বন্ধে দোঁহে ভিতরে ভিতরে ।
দিন দিন যায় যত ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ॥ ১৬৩ ॥

ভক্তপ্রিয় বলরাম বৈষ্ণব-আচারী ।
ভক্ত জনে পাইলেই যত্ন বাড়াবাড়ি ॥ ১৬৪ ॥

তাঁহার প্রকৃত ভাব নাই অহঙ্কার ।
মাৎসর্যবিহীন চিত্ত যদি জমিদার ॥ ১৬৫ ॥

সাধারণ রীতি ছাড়া সদা দীন মন ।
সুপ্রশস্ত সুন্দর দ্বিতল নিকেতন ॥ ১৬৬ ॥

কত ভক্ত আসে যায় তাঁহার ভবনে ।
যত্নবান সর্বদা সাদর-সম্ভাষণে ॥ ১৬৭ ॥

অতি পরিমিতব্যয়ী বুদ্ধিতে না আসে ।
হিসাব দেখিয়া লোকে ব্যয়কুণ্ঠ ঘোষে ॥ ১৬৮ ॥

সাদরে রাখেন তিনি রাখালে ভবনে ।
সৌভাগ্যবানের ঘরে রাখাল যে দিনে ॥ ১৬৯ ॥



প্রচারে উঠিল এক অভিনব ধারা ।
ভক্তের ভবনে শ্রীপ্রভুর ভিক্ষা করা ॥ ১৭০ ॥

কোন নির্ধারিত দিনে সহ ভক্তগণ ।
মহোৎসব নৃত্য গীত হরিসংকীর্তন ॥ ১৭১ ॥

জনায়ের প্রাণকৃষ্ণ শহরেতে বাড়ি ।
বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ তেহ পরম আচারী ॥ ১৭২ ॥

ব্রাহ্মণের রীতি নীতি সব আছে তাঁয় ।
দ্বিতীয় তাঁহার মত মেলা মহাদায় ॥ ১৭৩ ॥

সময়ে সময়ে প্রায় এখন তখন ।
তাঁহার ভবনে শ্রীপ্রভুর নিমন্ত্রণ ॥ ১৭৪ ॥

ভোজনের পরিপাটি হেন নাহি শুনি ।
সন্তুষ্ট যাহাতে অতি অখিলের স্বামী ॥ ১৭৫ ॥

ভক্তিভরে দ্বিজবর আতপ তন্ডুল ।
অতি মিহি অন্ন তাঁর যেন জুঁই ফুল ॥ ১৭৬ ॥

আনাতেন দেশ থেকে করিয়া যোগাড় ।
স্বদেশে সঙ্গতি খুব নিজে জমিদার ॥ ১৭৭ ॥

তণ্ডুলের রূপ গুণ না যায় বর্ণন ।
জনমে সুন্দর অল্প করিলে রন্ধন ॥ ১৭৮ ॥

আলো করে গোটা ঘর যথা রাখা যায় ।
আমোদিত চারিদিক গন্ধ হেন তায় ॥ ১৭৯ ॥

ফল ফুল পাল মূলে সাত্ত্বিক ব্যঞ্জন ।
বিবিধ আস্বাদযুক্ত বিবিধ রকম ॥ ১৮০ ॥

দধি-দুগ্ধ-ঘৃতাদিতে যা হয় তৈয়ার ।
যতনে ব্রাহ্মণ করে সকল যোগাড় ॥ ১৮১ ॥

শুদ্ধাচারে অন্তঃপুরে বাড়ির মেয়েরা ।
স্বহস্তে রন্ধন করে আপনারা তাঁরা ॥ ১৮২ ॥

দু'ইতে না দেয় কারে অপর মানুষে ।
কলঙ্ক যাদের হাত কখন আমিষে ॥ ১৮৩ ॥

স্বধর্মে আচারী যেবা তাঁরে ভগবান ।
দেখিলাম বরাবর বড় কৃপাবান ॥ ১৮৪ ॥

শত ছিদ্র বর্তমান যদি অন্য দিকে ।
তথাপি করুণা তাঁর রাশি রাশি তাঁকে ॥ ১৮৫ ॥

ধর্মপক্ষে তিলাদপি রহে যার টান ।
প্রভুর নয়নে লাগে গিরি-পরিমাণ ॥ ১৮৬ ॥

নিরবধি কৃপানিধি মূরতি প্রভুর ।
চিন্তা কিসে জীবের হইবে তম দূর ॥ ১৮৭ ॥

দিনে রেতে জীবহিতে ব্রতী প্রভুবর ।
ঈশ্বরের পথে কিসে হবে অগ্রসর ॥ ১৮৮ ॥

করুণায় প্রভুদেব সহায় কেমন ।
পিতৃবলে বালকের বক্ষে আরোহণ ॥ ১৮৯ ॥

দুর্বল শিশুর সাধ মাত্র উঠে গাছে ।
বাপ দেন পাছা ঠেলা দাঁড়াইয়া নীচে ॥ ১৯০ ॥

সৎপথে সদাচারে অল্পমতি যাঁর ।
দ্রুতগতি পূর্ণমতি কৃপায় তাঁহার ॥ ১৯১ ॥

তপে জপে যজ্ঞে কিবা সাধন-ভজনে ।
কীর্তনে মননে কিবা পূজা আরাধনে ॥ ১৯২ ॥

স্বধর্ম-আচারে কিবা বিবেক-বিরাগে ।
সৎশাস্ত্র-পাঠে কিবা ভক্তি-অনুরাগে ॥ ১৯৩ ॥

জ্ঞান কিবা ভক্তিযোগে যে যথায় রয় ।
সকলে আছেন প্রভু, প্রভু সর্বময় ॥ ১৯৪ ॥

এখানে স্বধর্মাচারে পবিত্র ব্রাহ্মণ ।
তাই তাঁর ঘরে শ্রীপ্রভুর আগমন ॥ ১৯৫ ॥

প্রভুর দয়ার্দ্র হৃদে করুণা কেবল ।
তিলবৎ কর্মে দেন তালবৎ ফল ॥ ১৯৬ ॥

শুদ্ধসত্ত্বময় প্রভু অখিল-ঈশ্বরে ।
তুহিলেন দ্বিজবর ভিক্ষা দিয়া ঘরে ॥ ১৯৭ ॥

শত শত দণ্ডবৎ ব্রাহ্মণের পায় ।
শুন রামকৃষ্ণ কথা অকিঞ্চনে গায় ॥ ১৯৮ ॥