চতুর্থ খণ্ড

দয়াময় রামকৃষ্ণ


কলি-কলুষ-নাশন,       মহা তম-বিনাশন,
        ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ-ধাম ।
দীনহীনহিতকারী,      ভব-জলধি-কাণ্ডারী,
        দয়াময় রামকৃষ্ণনাম ॥ ১ ॥

পুরুষ প্রধান প্রভু,          পরম ঈশ্বর বিভু,
        মায়াময় মায়ার অতীত ।
গুণাতীত গুণময়,       কার্য-কারণ-আলয়,
        মহৈশ্বর্য অঙ্গে বিরাজিত ॥ ২ ॥

একাধারে নানা মূর্তি,  নানা ভাবে পায় স্ফুর্তি,
        ভাবময় ভাবের সাগর ।
যত ভাব তত রূপ,          নরদেহে বিশ্বরূপ,
        অগণন রসের আকর ॥ ৩ ॥

চিন্ময় কোমল-অঙ্গ,          নরদেহে লীলারঙ্গ,
        সাঙ্গোপাঙ্গ-সঙ্গ-প্রিয় ভাব ।
দেশ-কাল-পাত্র ভেদে, নানা লীলা নানা স্বাদে,
        মহাশত্তি-সহ আবির্ভাব ॥ ৪ ॥

প্রভুদেব অবতারে,     জীবের শিক্ষার তরে,
        একাধারে সমষ্টি সবার ।
বিশ্ব-জননীর ন্যায়,      সকল প্রকাশ পায়,
        পূর্ণভাবে যত অবতার ॥ ৫ ॥

নানা দ্রব্যে এক সৃষ্টি,   গুণেতে নামের সৃষ্টি,
        হের দৃষ্টি করিয়া চালনা ।
গুণে কাজে যায় দেখা, শ্রীপ্রভুর অঙ্গে লেখা,
        নানা নাম অপার মহিমা ॥ ৬ ॥

নাম ভেদে নাহি ক্ষতি, যে নামে যাহার প্রীতি,
        রতি-সতি রাখি শ্রীচরণে ।
যখন যে ডাকে তাঁরে,  প্রকাশ্যে কিবা অন্তরে,
        উত্তর সে পায় সেইক্ষণে ॥ ৭ ॥

জ্ঞান কিবা ভক্তিপথে,   যার ইচ্ছা যেই মতে,
        পথে যেতে কারে নাহি মানা ।
প্রভু হলে অনুকূল,       অকূলেতে মিলে কূল,
        ধ্রুব মিটে মনের বাসনা ॥ ৮ ॥

দয়াল বঙ্কিম-আঁখি,      জীবের দুর্গতি দেখি,
        ধরাধামে করুণাবতার ।
বিশ্বাসবিহীন জনে,      মত্ত কামিনী-কাঞ্চনে,
        নিজগুণে করিতে নিস্তার ॥ ৯ ॥

নিশ্চয় তাহার ত্রাণ,    দেহেতে থাকিতে প্রাণ,
        একবার করিলে স্মরণ ।
যাহা না করিতে পারে,    তপ জপ শুদ্ধাচারে,
        অনাহারে সাধন-ভজন ॥ ১০ ॥

এক প্রভু নানা ভাবে,    কৃপা কৈল সর্বজীবে,
        শুন কই তাহার ভারতী ।
বিশ্ব-গুরু রূপ তাঁর,        হরিতে ভবের ভার,
        ধরিলেন বিবিধ মুরতি ॥ ১১ ॥

কহিতে কিবা আশ্চর্য,      বিবেক বিরাগৈশ্বর্য,
        কোটি সূর্য তেজে হারে তাঁয় ।
ক্ষীণপ্রভ হুতাশন,           কুঞ্চিত মলিনানন,
        মূর্তিমান জ্ঞানের প্রভায় ॥ ১২ ॥

কঠোর সাধনে মত্ত,        মন প্রাণ দেহ চিত্ত,
        ষোল আনা গত একবারে ।
পরমাত্মে নিত্য স্থিতি,    বাহ্যহারা দিবারাতি,
        পুত্তলির সমান আকারে ॥ ১৩ ॥

কভু ভক্তি স্ফুর্তি পায়,   যেন প্রভু গোরা রায়,
        আবেশে অবশ কলেবর ।
মধুর কান্তির রাশি,         জিনিয়া গগন-শণী,
        আস্যে হাসি এতই সুন্দর ॥ ১৪ ॥

কভু ভক্তি উদ্দীপনি,           মিষ্ট কণ্ঠে বীণা জিনি,
        কৃষ্ণকালীলীলাগীত গান ।
কি আনন্দ হৃদে খেলে,  গীতে নৃত্যে তালে তালে,
        তার সম কি তার সমান ॥ ১৫ ॥

কভু সহজের ন্যায়,        বালক-স্বভাব গায়,
        পরিধেয় অঙ্গের বসন ।
বগলে শ্রীঅঙ্গে নাই,      দিগম্বর শ্রীগোসাঁই,
        এখানে সেখানে বিচরণ ॥ ১৬ ॥

সারথি শ্রীকৃষ্ণ-বেশে,    হিত-উক্তি উপদেশে,
        যেন পাত্র সেইমত কন ।
বেদ বেদান্ত পুরাণ,      গীতাগাথা তত্ত্ব-জ্ঞান,
        সকলের সার বিবরণ ॥ ১৭ ॥

সামান্য সকল বাক্যে,   সুবোধ্য মূর্খের পক্ষে,
        ভাগবৎশক্তি সহকারে ।
হোক না অধমাধার,       শুনে ছুটে অন্ধকার,
        সদ্য সদ্য আলো খেলে ঘরে ॥ ১৮ ॥

দেখাইলা নিজ তেজে, সামান্য ভাণ্ডের মাঝে,
        ব্রহ্মাণ্ডের যতেক ব্যাপার ।
গুহ্যৃতত্ব সমবেত,     যা আছে শাস্ত্রে নিহিত,
        একাধারে যত অবতার ॥ ১৯ ॥

ক্রিয়া-করমের ফল,         সব গেল রসাতল,
        প্রবল এতই কৃপাকণা ।
ক্রিয়াকর্মাতীত তিনি,     প্রভু অখিলের স্বামী,
        বুঝে ভাল প্রভুভক্ত জনা ॥ ২০ ॥

বেদ-বিধানেতে রটে,  সুকাজে কুকাজ কাটে,
        কাজ না করিলে পরে নয় ।
মেঘে যেন মেঘ-ঠেলা,  তবে কিরণের মেলা,
        তমোনাশী শশীর উদয় ॥ ২১ ॥

কিন্তু এ কালের গতি,    সুকাজে কাহার মতি,
        জীবের দুর্গতি দুর্নিবার ।
কঠোর সাধন করে,    ফল দিলা জীবোদ্ধারে,
        কৃপাময় শ্রীপ্রভু আমার ॥ ২২ ॥

সম্বলবিহীন জনে,           দয়াময় ধরাধামে,
        দয়া লয়ে পড়িলেন দায় ।
দীন-সাজ অঙ্গে পরা,   দুয়ারে দুয়ারে ঘোরা,
        তবু কেহ নাহি চায় তাঁয় ॥ ২৩ ॥

অবিদ্যায় মত্ত হৃদি,         জীবকুল নিরবধি,
        কৃপা কিবা চিনিতে না পারে ।
এঁঠেলি ফণীর গায়,       যদ্যপি অমৃত পায়,
        তবু নাহি ত্যজে বিষধরে ॥ ২৪ ॥

হাস্যরস পরিহাসে,        প্রভু নন ন্যূন কিসে,
        রসময় রসিকপ্রবর ।
তার সঙ্গে সকৌতুকে,  আসক্তি প্রবল লোকে,
        দেন জ্ঞান ভক্তির খবর ॥ ২৫ ॥

ভিষুক্ প্রবীণ জ্ঞানে,         শর্করার আবরণে,
        শিশুর বদনে করে দান ।
প্রাণ-বিনাশক ব্যাধি,      তার মত মহৌষধি,
        তিক্ত কালকূটের সমান ॥ ২৬ ॥

কামিনী-কুহক বলে,        যতেক যুবকদলে,
        মোহজালে করে বিজড়িত ।
মোহিনী ছাঁদনি বাণী,   অঙ্গ-ভঙ্গিমা কাহিনী,
        প্রভুদেব সব সুবিদিত ॥ ২৭ ॥

নকল করিয়া তার,          হাবভাব সহকার,
        দেখিলে কখন নহে ভুলা ।
বুঝাতেন জীবগণে,   অবিদ্যা-শক্তি কেমনে,
        জীবসনে রঙ্গে করে খেলা ॥ ২৮ ॥

আভাস-প্রকাশে যার,    এক বেদ হৈল চার,
        দর্শন হইল গোটা ছয় ।
ক্ষান্ত তন্ত্র হারি মানি,        শরবৎ শূলপাণি,
        মহেশ্বর যিনি মৃত্যুঞ্জয় ॥ ২৯ ॥

যাহে নাহি তত্ত্বগাথা,    না হইতে হেন কথা,
        বিগলিত বদনে প্রভুর ।
যে ভাবে না হোক উক্ত,  তত্ত্বসার তাহে গুপ্ত,
        মূর্তিমান জ্ঞানের আঁকুর ॥ ৩০ ॥

শ্রবণ-বিবর দিয়া,        হৃদয়ে পড়িল গিয়া,
        বাক্য-বীজ কভু নষ্ট নয় ।
রামকৃষ্ণলীলাগীতি,         শ্রবণ মধুর অতি,
        শুদ্ধ জ্ঞান-ভক্তির আলয় ॥ ৩১ ॥

একাধারে নানা লোকে,  জাগাইতে জ্ঞানালোকে,
        প্রভুসম কে কোথা প্রবল ।
অপার মহিমা-কথা,        সাদৃশ্য অপরে কোথা,
        একা প্রভু দৃষ্টান্তের স্থল ॥ ৩২ ॥

বেদাপেক্ষা গুরুতর,         প্রতিবর্ণ প্রত্যক্ষর,
        যাহা ফুটে প্রভুর বদনে ।
শুনে কীট অতি তুচ্ছ,      সুমেরু সমান উচ্চ,
        গিরিবর লঙ্ঘে লম্ফদানে ॥ ৩৩ ॥

জীবের পরম আয়ু,        এক জল এক বায়ু,
        এক তবু অনন্ত প্রকার ।
স্থান কাল অনুসারে,       ভিন্ন ভিন্ন গুণ ধরে,
        পুষ্টি যাহে জগৎ-সংসার ॥ ৩৪ ॥

যাহার যেমন ধাত,       তার তেন তাত বাত,
        সকলেতে খাটে না সকল ।
কোনটি কাহার পক্ষে,  কাল থেকে করে রক্ষে,
        কার পক্ষে তাহাই গরল ॥ ৩৫ ॥

বিশ্বগুরু প্রভুদেবে,     লবে লোক তিন ভাবে,
        এক উপগুরুর সমান ।
পাল তুলে করুণার,         ভব-জলদি অপার,
        পারাপারে করিবে প্রয়াণ ॥ ৩৬ ॥

অপর শ্রেণীর যাঁরা,      শ্রেষ্ঠতর তেজে তাঁরা,
        দিক্‌হারা নাহি হবে আর ।
পথে যাবে মহা-তুষ্ট,      নিজ দেহ করি পুষ্ট,
        ভাব ল'য়ে প্রভুর আমার ॥ ৩৭ ॥

শ্রেষ্ঠতম ভাগ্যবান,       হৃদে যার পায় স্থান,
        ভগবান প্রভুরূপে হরি ।
ইষ্টজ্ঞানে ভজে পূজে,     অখিলের মহারাজে,
        সহ মাতা জগৎ-ঈশ্বরী ॥ ৩৮ ॥

আদি-অন্ত-লীলাপাঠে,     অবশ্য বসিবে ঘটে,
        শ্রীপ্রভুর স্বরূপ-বারতা ।
এক মনে শুন মন,           শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণায়ন,
        মহাতম-বিনাশন-কথা ॥ ৩৯ ॥