চতুর্থ খণ্ড
জনৈকা স্ত্রীলোকের বাঞ্ছাপূরণ
জয়
জয়
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় শ্যামাসুতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ভীম-দরশন ভব অকূল পাথার ।
ত্রিতাপ বাড়বানল জ্বলে অনিবার ॥ ১ ॥
নিবিড় আঁধারময় দৃষ্টি নাহি চলে ।
আতঙ্ক
ভরঙ্গাকুল অকূল সলিলে ॥ ২ ॥
পারাপারে যাইবারে অনন্যসম্বল ।
একমাত্র শ্রীপ্রভুর
চরণ কেবল ॥ ৩ ॥
আর পন্থা দেখাইলা প্রভু গুণমণি ।
যদ্যপি করেন কৃপা জগৎ-জননী ॥ ৪ ॥
অবতারে মাতৃরূপে ভকত-বৎসলা ।
শ্যামাসুতা গুরুমাতা ব্রাহ্মণের বালা ॥ ৫ ॥
ভবব্যাধি-মহৌষধি করুণা তাঁহার ।
কৃপাদৃষ্টে ইষ্টসিদ্ধি নষ্ট ভব-ভার ॥ ৬ ॥
কহি
শুন সমাচার সাধ্য যতদূর ।
মহৎ মহিমা মার লীলা সুমধুর ॥ ৭ ॥
যেই বস্তু প্রভু সেই বস্তু মাতা ।
বিশ্বাসে রাখিও হৃদে অতি গুহ্য কথা ॥ ৮ ॥
একমাত্র কেবল প্রভেদ দৃষ্ট হয় ।
শ্রীপ্রভু সহজ যত মাতা তত নয় ॥ ৯ ॥
অপার করুণা বিনা কার সাধ্য ধরে ।
সেই আদ্যা মহাশক্তি মানবী আকারে ॥ ১০ ॥
অদ্যাপিহ প্রভুভক্ত অনেকের ভ্রম ।
যেমন শ্রীপ্রভুদেব মাতা তেন নন ॥ ১১ ॥
বলিলে না চলে কথা বলা মহাদায় ।
হৃদয়ে সন্দেহ মাত্র মায়ের মায়ায় ॥ ১২ ॥
রবির কিরণ কোথা মেঘজালে ঢাকে ।
কোথা বা উজ্জ্বলতম প্রবল আলোকে ॥ ১৩ ॥
অপার মহিমা-তত্ত্ব প্রত্যক্ষ যে সব ।
অন্তরে বাহিরে সদা হয় অনুভব ॥ ১৪ ॥
যুক্তি-তর্ক-কূটবুদ্ধি বিচারের পার ।
রসনায় নাহি পায় বাক্য বলিবার ॥ ১৫ ॥
গুরুমাতা বলিলে কি বুঝ তুমি মন ।
শুন শ্রীপ্রভুর সঙ্গে সম্বন্ধ কেমন ॥ ১৬ ॥
এক
বস্তু দুই রূপে ভিন্ন ভিন্ন দেহ ।
একাত্মা অভেদ নিত্য নাহিক সন্দেহ ॥ ১৭ ॥
প্রভু পিতা একরূপে মাতা অনুরূপ ।
স্বতন্ত্র আকার দুয়ে একের স্বরূপ ॥ ১৮ ॥
ভিতরেতে মিশামিশি যেন দুধে দুধে ।
ভেদ-বুদ্ধি ঘটে যার সেই পড়ে ফাঁদে ॥ ১৯ ॥
লীলায় অধিক বাদে তাহি যায় চেনা ।
আবরণ তুলে দেখ বুটের দুদানা ॥ ২০ ॥
একে হয়ে দুই ঠাঁই বিন্দু নহে দূর ।
সৃজিয়াছে মায়াশক্তি সৃষ্টির অঙ্কুর ॥ ২১ ॥
মায়াপারে একবস্তু দুটি ছটি নাই ।
গুরুমাতা সেই যিনি জগৎ-গোসাঁই ॥ ২২ ॥
প্রত্যক্ষ ঘটনা কথা শুন অতঃপর ।
আদ্যাশক্তি গুরুমাতা তাহার খবর ॥ ২৩ ॥
পুরীতে পুজারীবেশে কালীর সেবায় ।
নিয়োজিত যে সময় প্রভুদেবরায় ॥ ২৪ ॥
ভক্তিভরা আরাধনে তেমন পাষাণ ।
হইত চৈতন্তময়ী মায়ের সমান ॥ ২৫ ॥
প্রমাণে দেখিতে তুলা লইয়া নাসায় ।
ধরিতে ছলিত মন্দ নিঃশ্বাসের বায় ॥ ২৬ ॥
সেই প্রভু সেই ভাবে ভক্তিসহকারে ।
অঙ্গহীন কিছু নাই ষোড়শোপচারে ॥ ২৭ ॥
সাধনার নানাবিধ দ্রব্য যতগুলা ।
বেশ-ভূষা গোমুখাদি রুদ্রাক্ষের মালা ॥ ২৮ ॥
রজতকাঞ্চনময় অলঙ্কারদাম ।
শেষে লিখে বিল্বপত্রে রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৯ ॥
এইসব দ্রব্যচয় করি এক ঠাঁই ।
মায়ের চরণে দিলা অঞ্জলি গোসাঁই ॥ ৩০ ॥
হেন পূজা শ্রীপ্রভুর নীরবে লইলা ।
শ্যামাসুতা গুরুমাতা ব্রাহ্মণের বালা ॥ ৩১ ॥
কি বুঝ কি বুঝ মন শ্যামাসুতা মাকে ।
বিল্বপত্রে প্রভুদেব নিজ নাম লিখে ॥ ৩২ ॥
সমর্পণ করিয়া পুজিলা যাঁর পায় ।
কি গিয়ান কর মন হেন গুরুমায় ॥ ৩৩ ॥
লইতে প্রভুর পূজা সাধ্য হেন কার ।
বিনা সেই আদ্যাশক্তি সৃষ্টির আধার ॥ ৩৪ ॥
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ।
এইবারে অবতারে ব্রাহ্মণনন্দিনী ॥ ৩৫ ॥
নিস্তারিণী বিপদবারিণী দুঃখহারা ।
হৃদয়বাসিনী হৃদি করুণায় ভরা ॥ ৩৬ ॥
চৈতন্তরূপিণী শিব-সিদ্ধি-প্রদায়িনী ।
কালাকাল-শূন্যা পূর্ণা জগত-ব্যাপিনী ॥ ৩৭ ॥
চৈতন্দ্রদায়িনী তন্ত্রমন্ত্রদেবাতীতা ।
মায়াস্বরূপিণী মহামায়ী মায়াবৃতা ॥ ৩৮ ॥
অনন্তরূপিণী তারা মহাশক্তিমতী ।
পিতামাতা দুই মাতা পুরুষ-প্রকৃতি ॥ ৩৯ ॥
মহালীলাবতী সতী সৃষ্টি-প্রসবিনী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥ ৪০ ॥
সন্তানে করহ রুপা করি শক্তিদান ।
মনেরে শুনাব রামকৃষ্ণ-লীলাগান ॥ ৪১ ॥
শুন গুন মন আজিকার ঘটনায় ।
আসিল রমণী এক শ্রীপ্রভু যেথায় ॥ ৪২ ॥
বিষণ্ণবদনা শোকে আকুল পরান ।
প্রভুদেবে সাধুভক্ত সন্ন্যাসী গিয়ান ॥ ৪৩ ॥
জনৈক আত্মীয় তার ভাবভ্রষ্ট হয়ে ।
সতভই ভ্রাম্যমাণ কুকাজে মাতিয়ে ॥ ৪৪ ॥
সুভাবে আনিতে সেই কদাচারী জনে ।
কিঞ্চিৎ ঔষধ মাগে শ্রীপ্রভুর স্থানে ॥ ৪৫ ॥
সাধু কি সন্ন্যাসী ভক্ত ব্রহ্মচারী জনা ।
সকলের মহৌষধি আছে কত জানা ॥ ৪৬ ॥
দৈবশক্তিযুক্ত এই সাধারণী মত ।
দ্রষ্ট-নষ্ট-ব্যাধিগ্রস্ত-আরোগ্যর পথ ॥ ৪৭ ॥
প্রভুর নিকটে করি ঔষধের আশ ।
মনের বাসনা নারী করিল প্রকাশ ॥ ৪৮ ॥
শোকসন্তাপিত তেঁহ সরল-হৃদয়া ।
কৃপাময় শ্রীপ্রভুর উপজিল দয়া ॥ ৪৯ ॥
রঙ্গ করিবার তরে দেখাইলা তায় ।
নিকটে মন্দির মার বসতি যেথায় ॥ ৫০ ॥
দেখিতে পাইবে তথা নারী এক জনা ।
মনোমত মন্ত্রৌষধি আছে তাঁর জানা ॥ ৫১ ॥
পুরিবে বাসনা গিয়া জানাও তাঁহারে ।
আমি কিবা জানি তিনি আমার উপরে ॥ ৫২ ॥
শশব্যস্ত শোকগ্রস্ত চলিল রমণী ।
বিরাজেন যেইখানে জগৎ-জননী ॥ ৫৩ ॥
জীবে কি বুঝিবে লীলা অতি দুরগম ।
দিনমানে দরশনে দেবগণে ভ্রম ॥ ৫৪ ॥
লীলায় আঁধার বড় চেনা নাহি যায় ।
জীবেরে প্রচ্ছন্ন রাখে মোহিয়া মায়ায় ॥ ৫৫ ॥
শ্রীমন্দিরে উতরিয়া দেখিবারে পায় ।
জগত-জননী মাতা বসিয়া পূজায় ॥ ৫৬ ॥
প্রণমিয়া কহে তাঁয় যতেক খবর ।
প্রভুদেব পাঠাইলা তাঁহার গোচর ॥ ৫৭ ॥
রঙ্গ বুঝি শ্রীপ্রভুর বলিলা জননী ।
তিনি ঔষধজ্ঞ আমি কিছু নাহি জানি ॥ ৫৮ ॥
ত্বরা করি যাও ফিরি সান্নিধ্যে তাঁহার ।
পাইবে ঔষধ হবে রূপার সঞ্চার ॥ ৫৯ ॥
আজ্ঞামাত্র যায় নারী প্রভুর গোচরে ।
জননী কহিলা যাহা জানাইল তাঁরে ॥ ৬০ ॥
শুনিয়া মধুর আস্যে হাস্য সুমধুর ।
রঙ্গের তরঙ্গ বড় উঠিল প্রভুর ॥ ৬১ ॥
বিধিমতে বুঝাইয়া রমণীরে কন ।
বাসনা পুরিবে তথা হেথা অকারণ ॥ ৬২ ॥
যথা কথা ত্বরান্বিতা চলিলা রমণী ।
শ্রীমন্দিরে যেইখানে জগৎ-জননী ॥ ৬৩ ॥
বারত্রয় এইরূপে ফিরাফিরি পর ।
মায়ের হইল কৃপা নারীর উপর ॥ ৬৪ ॥
বিল্বপত্র দিয়া মাতা বলিলেন তাঁরে ।
বাসনা পুরিবে এই লয়ে যাও ঘরে ॥ ৬৫ ॥
দেবের দুর্লভ ধন লইয়া যতনে ।
আবাসে চলিল নারী আনন্দিত মনে ॥ ৬৬ ॥
মার সঙ্গে রঙ্গকথা বুঝ মনে মনে ।
রামকৃষ্ণলীলাকথা অমৃতকথন ॥ ৬৭ ॥