চতুর্থ খণ্ড
কালের
অবস্থাবর্ণন − হরমোহন ও উইলিয়মের আগমন
(২৫/৬/৮৫)
জয়
জয়
রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ঘোর তমাচ্ছন্ন বিভীষিকাময়ী
রাতি ।
অবসানে মৃতপ্রায় সুন্দরী প্রকৃতি ॥ ১ ॥
সজীব হইয়া সঙ্গে সহচরীগণ ।
পিক পাখী নানা জাতি বিবিধ বরন ॥ ২ ॥
নীহারে ভূষিত অঙ্গ বৃক্ষলতাশ্রেণী ।
সুরভিকুসুমকুলশোভিতা ধরণী ॥ ৩ ॥
ফুল্লাননে ফুলমনে উঠে জাগরিয়ে ।
তমোহর প্রভাকর রবিরে দেখিয়ে ॥ ৪ ॥
সেইমত ধর্মদেবী কলির কলুষে ।
ম্রিয়মাণা শীর্ণকায়া বিমরষ বেশে ॥ ৫ ॥
আছিলেন এতদিন জাগিলা এখন ।
অঙ্গময় অলঙ্ক তা ভাব-আভরণ ॥ ৬ ॥
নিরখিয়া প্রভুদেবে প্রকটিত রবি ।
নয়ন-আনন্দকর মনোহর ছবি ॥ ৭ ॥
শুনহ কালের কথা তম হবে দূর ।
মহীয়ান মহৎ মহিমা শ্রীপ্রভুর ॥ ৮ ॥
হিন্দুয়ানী খ্রীষ্টানী মুসলমানী আর ।
এই তিন ধর্ম দেশে প্রধান সবার ॥ ৯ ॥
যখন আছিল বঙ্গ যবনাধিকারে ।
কলুষ-বাসনা-তৃপ্তি করিবার তরে ॥ ১০ ॥
যবন শমনসম ধরি তরবার ।
কত হিন্দুকুলে দিল কালিমা অপার ॥ ১১ ॥
যবন কঠোরহৃদি কুলিশের প্রায় ।
বেদের বদলে কল্মা প্রতাপে পড়ায় ॥ ১২ ॥
হিন্দুদের রীতিনীতি জাতি ধর্মে কুলে ।
কি করিল যবনেরা একমাত্র বলে ॥ ১৩ ॥
ইতিহাস ভাষাকথা সাক্ষ্য করে দান ।
বিশেষিয়া বলিতে পুঁথিতে নাহি স্থান ॥ ১৪ ॥
কণ্ঠাগতপ্রাণ
হিন্দুয়ানী সে সময় ।
হেনকালে গৌরচন্দ্র হইল উদয় ॥ ১৫ ॥
প্রাণ দিয়া হিন্দুধর্মে হন অন্তর্ধান ।
যবনের পরে দেশে ম্লেচ্ছ বলবান ॥ ১৬ ॥
ধন্যবাদ ম্লেচ্ছরাজ শত প্রণিপাত ।
হিন্দুধর্মে কুলে বলে নাহি দেন হাত ॥ ১৭ ॥
স্বভাব প্রবল কিন্তু না ছাড়ে কৌশল ।
করিবারে খ্রীষ্টিয়ানী রাজ্যেতে প্রবল ॥ ১৮ ॥
কত হিন্দু নব্যবয়ঃ জন্ম উচ্চ কুলে ।
কেহ বা কায়স্থ কেহ ব্রাহ্মণের ছেলে ॥ ১৯ ॥
জলাঞ্জলি দিয়া ধর্মে করে আলিঙ্গন ।
ম্লেচ্ছধর্ম হেতু মূলে কামিনী-কাঞ্চন ॥ ২০ ॥
এ হেন সময় প্রভুদেব-অবতারে ।
ধর্মমাত্রে যাবতীয় সবার উদ্ধারে ॥ ২১ ॥
প্রতিপন্ন কৈলা করি অগণ্য সাধন ।
ধর্মমাত্রে সব সত্য কেহ নহে ভ্রম ॥ ২২ ॥
যতবিধ আছে ধর্ম কালে বলবৎ ।
প্রত্যেকেই এক এক সুপ্রশস্ত পথ ॥ ২৩ ॥
স্বধর্মে সরলভাবে করিলে গমন ।
অবশ্য সময়ে হয় মানসপুরণ ॥ ২৪ ॥
নানা দেশে ইক্ষুগাছ নানা রূপে হয় ।
সকলের মিষ্ট রস তিক্ত কার নয় ॥ ২৫ ॥
তেন ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন দেশে ।
বরনে বিভিন্ন কিন্তু এক তার রসে ॥ ২৬ ॥
ধর্মসামঞ্জস্য ভাব এ হেন রকম ।
প্রভু-অবতারে এবে কেবল নূতন ॥ ২৭ ॥
এই ভাব কি প্রকারে দেশ জুড়ে রটে ।
বলিতে শকতি মোর বুদ্ধি নাহি ঘটে ॥ ২৮ ॥
বুঝি না কেমনে প্রভু কি করিলা কল ।
যাহাতে ভুবনে ভাব হয় সুপ্রবল ॥ ২৯ ॥
আপন আপন ধর্ম সবে এঁটে ধরে ।
প্রাণান্তেও পরধর্ম গ্রহণ না করে ॥ ৩০ ॥
হিন্দুধর্ম বঙ্গে এবে উঠে কি প্রকার ।
পুঁথিতে বলিতে উগ্র বাসনা আমার ॥ ৩১ ॥
জীর্ণ শীর্ণ হিন্দুধর্ম ছিল এতকাল ।
প্রভুর প্রভাবে এবে ঘুচিল জঞ্জাল ॥ ৩২ ॥
ধীরে ধীরে বহে অগ্রে ধীর সমীরণ ।
ক্রমশঃ তুমুল ঝঞ্চা বহিয়া পবন ॥ ৩৩ ॥
সেইমত আর্যধর্ম ছিল হীনবল ।
প্রভুর ইচ্ছায় হয় ক্রমশঃ প্রবল ॥ ৩৪ ॥
ইংরেজ-রাজের রাজ্যে ইংরেজী ধরনে ।
ধর্ম-আচরণে কিবা অশনে বসনে ॥ ৩৫ ॥
বাঙ্গালী নকল-কর্মে পটু বিলক্ষণ ।
অবিকল তাই করে ইংরেজ যেমন ॥ ৩৬ ॥
গীর্জার সাদৃশ্য রাখি ব্রাহ্মেরা বসান ।
সমাজমন্দির নামে প্রার্থনার স্থান ॥ ৩৭ ॥
কেশবের আধিপত্য ভারতে এখন ।
নানান প্রদেশে ব্রাহ্মমন্দির স্থাপন ॥ ৩৮ ॥
বক্তৃতায় বাখানিয়া উচ্চকণ্ঠে গায় ।
শান্তিনিকেতন ধর্ম কেবা নিবি আয় ॥ ৩৯ ॥
ইংরেজ-রাজের সভা করিয়া নকল ।
স্থানে স্থানে হরিসভা বাঙ্গালীসকল ॥ ৪০ ॥
বসাইতে লাগিল পরম অনুরাগে ।
যোগাইয়া ব্যয় তার যাহা কিছু লাগে ॥ ৪১ ॥
স্থানে স্থানে শ্রীপ্রভুর নিমন্ত্রণ তায় ।
যোগদানে দেন কৃপা প্রভুদেবরায় ॥ ৪২ ॥
রাধাকৃষ্ণনামে বসে চব্বিশ প্রহর ।
হেথা সেথা কাছে দূরে হয় নিরন্তর ॥ ৪৩ ॥
বাউলের দল হয় পাড়ায় পাড়ায় ।
সখে হয়ে মত্ত লোকে তত্ত্বগীত গায় ॥ ৪৪ ॥
ভারি মজা কর্তাভজা বাড়ে তেজে তেজে ।
প্রলোভনে অগণনে নানা জেতে মজে ॥ ৪৫ ॥
সতীমার দল পুষ্ট দিনে দিনে হয় ।
কৌল শাক্ত এত ভক্ত কোনকালে নয় ॥ ৪৬ ॥
তীর্থ যত জাগরিত অবতারকালে ।
অবিরাম চারিধাম যাত্রিগণ চলে ॥ ৪৭ ॥
বৈষ্ণব মহান্ত ভক্ত উন্নত সাধনে ।
কতই পরমহংস দণ্ডী স্থানে স্থানে ॥ ৪৮ ॥
যাত্রারূপে রামশক কালিয়দমন ।
কতই কতই স্থানে নাই নিরূপণ ॥ ৪৯ ॥
তা সবার মধ্যে দুই অতি শ্রেষ্ঠতর ।
সাধক ভক্তির রসে মত্ত নিরন্তর ॥ ৫০ ॥
প্রথমে গোবিন্দ উপাধিতে অধিকারী ।
বৈষ্ণব বংশেতে জন্ম ভক্তি তাঁর ভারী ॥ ৫১ ॥
দ্বিতীয় তাঁহার ছাত্র নীলকণ্ঠ নাম ।
বীরভূম বিভাগেতে জনমের স্থান ॥ ৫২ ॥
ব্রাহ্মণসন্তান ভক্তি ঘটে বিলক্ষণ ।
বড়ই সদয় তাঁরে প্রভু নারায়ণ ॥ ৫৩ ॥
তোলপাড় করে বঙ্গ কৃষ্ণলীলাগানে ।
আগোটা বঙ্গেতে নাম সকলেই জানে ॥ ৫৪ ॥
ইংরেজের থিয়েটার করিয়া নকল ।
বিনিমিয়া রঙ্গমঞ্চ বাঙ্গালীসকল ॥ ৫৫ ॥
আরম্ভিল অভিনয় ইংরেজী ডউলে ।
পুরুষ রমণীগণ একত্তরে মিলে ॥ ৫৬ ॥
রমণীরা বারাঙ্গনা অভিনেত্রীগণ ।
মিষ্ট গীতে মুগ্ধ করে মানুষের মন ॥ ৫৭ ॥
নূতন ধরন দেশে সকলের সাধ ।
দেখিয়া মিটায় চক্ষুকর্ণের বিবাদ ॥ ৫৮ ॥
নরনারী ছেলেবুড়া দেখিবারে যায় ।
সুন্দর চিত্রিত দৃশ্য সুদৃশ্য হারায় ॥ ৫৯ ॥
'সমাচারপত্র' তাহা সুপ্রচার করে ।
সুদূর হইতে লোক আসে দেখিবারে ॥ ৬০ ॥
চুটকি নাটক বহি দেশ রুচিমত ।
প্রথমে প্রথমে তাহা হয় অভিনীত ॥ ৬১ ॥
ধর্মের প্রসঙ্গে এবে সকলের সখ ।
রাখিতে না পারে মঞ্চ নাটকে আটক ॥ ৬২ ॥
কালেতে করিয়া লোক রুচির বিচার ।
ভক্তিরসের সুরসিক কবি নাট্যকার ॥ ৬৩ ॥
ভক্তিমাখা হরিকথা অভিনয় তরে ।
ভক্তিরসাত্মক গ্রন্থ পাঠ করে ঘরে ॥ ৬৭ ॥
পুরাণ ভারত রামায়ণ গ্রন্থ নানা ।
চৈতন্তচরিতামৃত এবে আলোচনা ॥ ৬৮ ॥
জীবের দুঃখেতে গোরা আকুল পরান ।
শোকাতুর পথে পথে কাঁদিয়া বেড়ান ॥ ৬৯ ॥
অলৌকিক জীবে দয়া স্বার্থশূন্য মনে ।
মানুষে সম্ভব নয় অবতার বিনে ॥ ৭০ ॥
চিত্রে পটু নাট্যকার অতি বুদ্ধিমান ।
গোউর-লীলার ছবি দেখিবারে পান ॥ ৭১ ॥
জন্মাবধি ভক্তিরসে হৃদিখানি ভরা ।
নাটকে আঁকিল গোরালীলার চেহারা ॥ ৭২ ॥
নাস্তিকের ভাবে ঢাকা ছিল নাট্যকার ।
চৈতন্য-চরিত-পাঠে ছুটিল আঁধার ॥ ৭৩ ॥
যদ্যপি জিজ্ঞাসা কথা কর হেথা মন ।
নাস্তিকের জন্মাবধি ভক্তি কি রকম ॥ ৭৪ ॥
যাঁহারে করিবে ভক্তি তিনি নাই ঘটে ।
শিরোহীনে শিরঃপীড়া কি প্রকার বটে ॥ ৭৫ ॥
এ কথার একমাত্র কেবল উত্তর ।
পাষাণে বদন বন্ধ যেমন নির্ঝর ॥ ৭৬ ॥
দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা মন পার করিবারে ।
মুক মুক্ত অকস্মাৎ কিসে একেবারে ॥ ৭৭ ॥
তদুত্তরে বলিবারে ভাষা মোর নাই ।
অবতারে অবতীর্ণ শ্রীপ্রভু গোসাঁই ॥ ৭৮ ॥
নাট্যকার ভক্ত তাঁর আপনার জন ।
সোনার অক্ষরে আছে লীলায় লিখন ॥ ৭৯ ॥
অতি গুপ্ত লীলাতত্ত্ব দুর্বোধ্যাতিশয় ।
ভাষা ভাসে আভাসেও বলিবার নয় ॥ ৮০ ॥
শূন্যে দুলে শূন্যে খেলে শূন্যে তার খানা ।
বোবা বলে কালা শুনে চক্ষে দেখে কানা ॥ ৮১ ॥
ঈশ্বরের
লীলাখেলা প্রত্যক্ষ যেমন ।
তেমনি প্রত্যক্ষ পুনঃ লীলায় গোপন ॥ ৮২ ॥
কারে কভু কি দশায় রাখেন ঈশ্বর ।
কেহ না জানিতে পারে তাহার খবর ॥ ৮৩ ॥
লীলা-ক্ষেত্রে চক্ষে যাহা মিলে দরশন ।
তাই মাত্র বলিবারে মানুষ সক্ষম ॥ ৮৪ ॥
অঙ্গার কিম্ভুতাকার কালির বরন ।
পরম উজ্জ্বল পরে আগুন যখন ॥ ৮৫ ॥
পুনশ্চ কুসুম-কলি গোপন পাতায় ।
রূপ-রস-গন্ধহীন সামান্যের ন্যায় ॥ ৮৬ ॥
পরদিন প্রাতে দিব্য সুন্দর চেহারা ।
সৌরভে বরনে রসে কায়াখানি ভরা ॥ ৮৭ ॥
মহাবলী বীর-ভক্ত প্রভুর আমার ।
শ্রীগিরিশ ঘোষ নামে এই নাট্যকার ॥ ৮৮ ॥
অপরূপ প্রভু যেন তেন ভক্তবর ।
রচিলা চৈতন্ত-লীলা বড়ই সুন্দর ॥ ৮৯ ॥
মুগ্ধকর গীতগুলি ভক্তি-প্রেমে ভরা ।
চিত্তহর অভিনয়ে শ্রোতা মাতোয়ারা ॥ ৯০ ॥
মঞ্চমধ্যে অভিনয় অবিকল হয় ।
অভিনয়ে অভিনয় না হয় প্রত্যয় ॥ ৯১ ॥
দেখিতে চৈতন্য-লীলা ব্যগ্র এত লোকে ।
পেটে না খাইয়া কড়ি দেখিবারে রাখে ॥ ৯২ ॥
ভক্তিমাখা লীলাগীত মঞ্চমাঝে গুনি ।
মত্ত-চিত্ত শ্রোতা যত দিবস যামিনী ॥ ৯৩ ॥
পুরুষ রমণী দোঁহে শুয়ে বিছানায় ।
গোউর-কথায় গোটা রজনী কাটায় ॥ ৯৪ ॥
বালক-বালিকাগণ পথে ঘাটে খেলে ।
চৈতন্যলীলার গীত গায় কুতুহলে ॥ ৯৫ ॥
মদ্যপানে মত্ত বেশ্যা নাগর সহিত ।
টপ্পার বদলে গায় গোউরের গীত ॥ ৯৬ ॥
দোকানে বণিক গায় জলযানে দাঁড়ী ।
দ্বারে দ্বারে ঘুরে গায় যতেক ভিখারী ॥ ৯৭ ॥
দূরদূরাঞ্চলে কথা এত রাষ্ট্র হয় ।
অনেকে দেখিতে আসে অর্থ করি ব্যয় ॥ ৯৮ ॥
গোউর-ভকতে উঠে আনন্দ অপার ।
শুনিয়া চৈতন্য-গীত মুখে যার তার ॥ ৯৯ ॥
ব্রজ বিদ্যারত্ব নামে ভক্ত একজন ।
নবদ্বীপে বাস জেতে গোস্বামী ব্রাহ্মণ ॥ ১০০ ॥
গোরা-ধ্যান গোরা-জ্ঞান গোরা-পদে মতি ।
গোউর-চরণ সেবে ঘরে দিবারাতি ॥ ১০১ ॥
মূরতি রাখিয়া ঘরে অতি ভক্তিভরে ।
মঞ্চে লীলা-অভিনয় শুনিলেন পরে ॥ ১০২ ॥
কহিল মথুরানাথে আপন নন্দনে ।
গোপ্য কথা সেই হেতু ডাকিয়া গোপনে ॥ ১০৩ ॥
সুখের বারতা কিবা পাই শুনিবারে ।
গৌরলীলা-অভিনয় মঞ্চের ভিতরে ॥ ১০৪ ॥
নিশ্চয় বুঝিবে মনে সন্দ নাহি তায় ।
পুনরায় গৌরচন্দ্র উদয় ধরায় ॥ ১০৫ ॥
সঙ্গে লয়ে সাঙ্গোপাঙ্গ যতেক তাঁহার ।
প্রচারিতে ভক্তিমূল লীলা আপনার ॥ ১০৬ ॥
বার্ধক্য প্রযুক্ত আমি যাইতে অক্ষম ।
জানিতে যথার্থ তত্ত্ব করহ গমন ॥ ১০৭ ॥
বিশ্বাস আশার ভরে মহাভক্তিমান ।
সকল সন্ধান দিয়া সন্তানে পাঠান ॥ ১০৮ ॥
জনক যেমন তাঁর তেমনি নন্দন ।
শহরে আসিয়া করে গোউরান্বেষণ ॥ ১০৯ ॥
সে তো পায় যে যা চায় সরল অন্তরে ।
সর্বাগ্রে গমন রণ মঞ্চের ভিতরে ॥ ১১০ ॥
অভিনয়ে শুনিয়া ভকতিমাখা গীত ।
ভক্তিমান ব্রাহ্মণ-সন্তান বিমোহিত ॥ ১১১ ॥
উথলে আনন্দে হিয়া পুলক অপার ।
দ্রুত ধায় দেখিবারে কেবা নাট্যকার ॥ ১১২ ॥
আত্মহারা গিরিশে করিয়া দরশন ।
বাসনা ধূলায় লুটে ধরিয়া চরণ ॥ ১১৩ ॥
শশব্যস্ত নাট্যকার কায়স্থের ছেলে ।
ধরিয়া দ্বিজের হাত উঠাইল তুলে ॥ ১১৪ ॥
আশিসিল হাত তুলি গিরিশে প্রচুর ।
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ তোর করুন গোউর ॥ ১১৫ ॥
কায়মনোবাক্যে আমি করি আশীর্বাদ ।
পাইবে পরমগুরু পূর্ণ হবে সাধ ॥ ১১৬ ॥
এইখানে এক কথা কর অবধান ।
থাকিতে নারিনু নাহি করিয়া বাখান ॥ ১১৭ ॥
বটেন গিরিশ ঘোষ কায়স্থ-নন্দন ।
ব্রাহ্মণে উচিত নয় পরশে চরণ ॥ ১১৮ ॥
বিশ্বাস-ভকতি চিত্তে এতেক তাঁহায় ।
না লইয়া পদধূলি থাকা নাহি যায় ॥ ১১৯ ॥
ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ ফলিল কিমতি ।
বড়ই সুন্দর ক্রমে শুনিবে ভারতী ॥ ১২০ ॥
দক্ষিণশহরে এবে লোক-সমাগম ।
পূর্বেকার চেয়ে বেশী কভু নহে কম ॥ ১২১ ॥
তুলনায় অতি অল্প অতিথি সন্ন্যাসী ।
নানাবিধ সম্প্রদায় স্বদেশীয় বেশী ॥ ১২২ ॥
পুরীর মহিমা সবে এ প্রদেশে জানে ।
অনেকের আশা আসে কালী-দরশনে ॥ ১২৩ ॥
কেমনে মহিমা-কথা স্বদেশে প্রচার ।
বলিবার কোন শক্তি নাহিক আমার ॥ ১২৪ ॥
এক সমাচার কহি কর অবধান ।
সাগরের দিকে কিসে তটিনীর টান ॥ ১২৫ ॥
একদিন কিবা ভাবে প্রভুদেবরায় ।
বলিলেন ভাবাবেশে সম্বোধিয়া যায় ॥ ১২৬ ॥
অনেকেই কয় মোরে আমি সেই জন ।
বুঝিতে না পারি কেন কহে এ রকম ॥ ১২৭ ॥
তাই যদি হই আমি কেন না হেথায় ।
সমাগমে তত লোক যেন নদীয়ায় ॥ ১২৮ ॥
কোথা থাকে রহে কোথা অশন শয়ন ।
গৌরচন্দ্র অবতারে হইল যেমন ॥ ১২৯ ॥
যেন কথা নহে দেরী তারপর দিনে ।
জলে স্থলে নানাদিকে যান-আরোহণে ॥ ১৩০ ॥
সঙ্গতিবিহীন দুঃখী কড়ি নাই গেঁটে ।
পায়েতে হাঁটিয়া পথ আসে ছুটে ছুটে ॥ ১৩১ ॥
লোকে হয় লোকারণ্য পুরীর মাঝারে ।
এমন বৃহৎ পুরী তাহে নাহি ধরে ॥ ১৩২ ॥
ক্রমান্বয়ে দিনত্রয় এইরূপে যায় ।
তখন হইয়া ত্রস্ত প্রভুদেব রায় ॥ ১৩৩ ॥
সম্বোধিয়া শ্যামামায় বলিলেন কথা ।
মা তুমি এখন দাও কমায়ে জনতা ॥ ১৩৪ ॥
ক্রমশঃ কমিল লোক নাহি রহে আর ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১৩৫ ॥
ইংরেজী শিক্ষার গুণে হিন্দুর যুবক ।
কিমত অবস্থাগত বলা আবশ্যক ॥ ১৩৬ ॥
আর্য-ধর্ম-কর্ম প্রায় কেহ নাহি মানে ।
দিবস-রজনী মত্ত ইন্দ্রিয়-সেবনে ॥ ১৩৭ ॥
মা-বাপে না পায় ভাত গায় উড়ে খড়ি ।
পরায় বামার অঙ্গে বারাণসী শাড়ি ॥ ১৩৮ ॥
জাতিগত আচার ব্যভার-বিসর্জন ।
পাকশালে কাজ করে অস্পৃশ্য যবন ॥ ১৩৯ ॥
ইংরেজের খায় খানা ইংরেজী হোটেলে ।
দেবদেবী গয়া গঙ্গা বিসর্জন জলে ॥ ১৪০ ॥
দোল-দুর্গোৎসবে নাই ব্রাহ্মণ-ভোজন ।
শ্বেতকায় সাহেবেরে করে নিমন্ত্রণ ॥ ১৪১ ॥
শাস্ত্রের প্রসঙ্গ কোথা কথা গেছে ভুলে ।
সায়েন্স-লজিকে মন নাটক-নভেলে ॥ ১৪২ ॥
ইংরেজী বহিতে যাহা লিখে শ্বেতকায় ।
তাহাই শ্রোতব্য পাঠ্য পুরাণের প্রায় ॥ ১৪৩ ॥
প্রভুর মহিমা কিবা কেমন কৌশল ।
কালের রুচিতে সভ্য সাহেবের দল ॥ ১৪৪ ॥
বুদ্ধিমান বিদ্যামান উচ্চমন যত ।
দেবভাষা-আলাপনে দিবারাতি রত ॥ ১৪৫ ॥
পুরাণে গীতায় বেদে পাইয়া আস্বাদ ।
ইংরেজী ভাষায় শাস্ত্র করে অনুবাদ ॥ ১৪৬ ॥
শাস্ত্রার্থে সুপথ পেয়ে সাধন-ভজন ।
ধ্যান-যোগ মূল থিয়োসফির চলন ॥ ১৪৭ ॥
আর্যশাস্ত্র মর্মব্যাখ্যা করে বক্তৃতায় ।
আসিয়া সাগরপারে এই বাঙ্গলায় ॥ ১৪৮ ॥
নাহি অঙ্গে হ্যাট কোট দেশের ধরন ।
নিরামিষ ভোজ্য পরে গেরুয়া বসন ॥ ১৪৯ ॥
মস্তক-মুণ্ডন পুনঃ টিকি দুলে তায় ।
পাদুকাবিহীন পায়ে পথে হেঁটে যায় ॥ ১৫০ ॥
গায় যীশু-গুণগীত অতি ভক্তিভরে ।
গৈরিক-বসনা মেম পাছু পাছু ফিরে ॥ ১৫১ ॥
নকলে নিপুণ বড় বাঙ্গালীর দল ।
যা করে ইংরেজ করে তাহাই নকল ॥ ১৫২ ॥
যা কহে সাহেব বুঝে বেদবাক্য প্রায় ।
তাই পড়ে অনুবাদ ইংরেজী ভাষায় ॥ ১৫৬ ॥
ভাবার্থে পাইয়া স্বাদ চেষ্টা করে পরে ।
অনুবাদ যার মূল গ্রন্থ পড়িবারে ॥ ১৫৭ ॥
নীরস বিশুষ্ক মাটি পাষাণের প্রায় ।
বাহ্যিকে উপরে, চক্ষে কে দেখিতে পায় ॥ ১৫৮ ॥
এই ধরা রসে ভরা ডগমগ রসে ।
কাণ্ড-শাখা-পত্র সহ তরুবরে পোষে ॥ ১৫৯ ॥
দিন-রাত্রি চলে রস বিশ্রাম কোথায় ।
গগনের সঙ্গে মিশা পাতায় পাতায় ॥ ১৬০ ॥
তেমতি বিভুর সৃষ্টি এই চরাচর ।
বাহ্যিক দর্শনে কিছু না মিলে খবর ॥ ১৬১ ॥
ঘটনা যখন ধ্রুব হেতু আছে তার ।
বিমানে চলিছে কল নহে দেখিবার ॥ ১৬২ ॥
অদৃশ্য বিমান পথে কার্য কিসে হয় ।
বুঝ মনে সাধ্য নাই দিতে পরিচয় ॥ ১৬৩ ॥
বাঙ্গালী ফিরিছে ঘরে স্বধর্মেতে মতি ।
শুন রামকৃষ্ণ-লীলা মধুর ভারতী ॥ ১৬৪ ॥
আঁখি খোলে লীলা শুনে প্রভুর আমার ।
সাহেবের দলে নাম ক্রমশঃ প্রচার ॥ ১৬৫ ॥
ইহার কিঞ্চিৎ আগে কেশবের সাথে ।
পাদরী সাহেব আসে প্রভুরে দেখিতে ॥ ১৬৬ ॥
ধর্ম-ব্যবসায়ী তিনি পণ্ডিতপ্রবর ।
প্রশান্ত-সাগর-পারে মারকিনে ঘর ॥ ১৬৮ ॥
এখানে পাদরী কত শহরের মাঝে ।
মিশনারী বিদ্যালয়ে শিক্ষকের কাজে ॥ ১৬৯ ॥
বিদিত প্রভুর নাম হেন সম্প্রদায় ।
সমাধিতে যাঁর নাহি বাহ রহে গায় ॥ ১৭০ ॥
ওয়ার্ডসওয়ার্থ নামে ভক্ত একজন ।
প্রাচীনকালের কবি বিলাতে জনম ॥ ১৭১ ॥
ঋষিসমতুল্য লোক উন্নত অবস্থা ।
তাঁহার কাব্যেতে আছে সমাধির কথা ॥ ১৭২ ॥
সমাধি কাহারে কয় কি তার লক্ষণ ।
কিমত অবস্থাপন্ন সমাধি যখন ॥ ১৭৩ ॥
দুর্বোধ্য চেহারা শিরে নাহি পায় স্থান ।
কে দেখেছে আকাশ-কুসুম সম নাম ॥ ১৭৪ ॥
উদয় হইত দশা শ্রীঅঙ্গে যীশুর ।
আর অবতার-কালে গৌরাঙ্গ প্রভুর ॥ ১৭৫ ॥
সঙ্গীবিত সেকালের কে আছে এখন ।
ভক্তের কর্তৃক বস্তু গ্রন্থেতে লিখন ॥ ১৭৬ ॥
ধন্য কাল ধন্য জীব প্রভু-অবতারে ।
ভাগ্যের ইয়ত্তা সীমা কে করিতে পারে ॥ ১৭৭ ॥
দেবেশ-লালসাবস্তু দেখিবারে পায় ।
অবহেলে সমুদিত শ্রীপ্রভুর গায় ॥ ১৭৮ ॥
কেবল সমাধি নয় আরও দশা নানা ।
পূর্বকৃত শাস্ত্র-গ্রন্থে নাই যাহা জানা ॥ ১৭৯ ॥
অনাদি পুরুষ প্রভু প্রসূতি সবার ।
কলা-অংশ মাত্র তাঁর যত অবতার ॥ ১৮০ ॥
ছাত্রগণে বুঝাইতে সমাধির ধারা ।
উপায়-স্বরূপ বলিতেন শিক্ষকেরা ॥ ১৮১ ॥
জনৈক পরমহংস দক্ষিণশহরে ।
সতত সমাধি হয় দেখ গিয়া তাঁরে ॥ ১৮২ ॥
সুসংবাদে নব্যবয়ঃ বিস্তর বিস্তর ।
প্রভু-দরশনে আসে দক্ষিণশহর ॥ ১৮৩ ॥
পরম সুন্দর ভক্তবর একজন ।
নব্যবয়দের সঙ্গে করে অধ্যয়ন ॥ ১৮৪ ॥
জুটিলেন এ সময় কায়স্থ-কুমার ।
নাম হরমোহন উপাধি মিত্র তাঁর ॥ ১৮৫ ॥
ছুটিতে লাগিল দেশে শ্রীপ্রভুর নাম ।
দরশনে দক্ষিণশহরে অবিরাম ॥ ১৮৬ ॥
ভাগ্যবান পুণ্যবান করয়ে মেলানি ।
বিচারবিহীনে কিবা দিবস যামিনী ॥ ১৮৭ ॥
শ্রীমন্দিরে অবিরত প্রভু ভগবান ।
সচকিত যাহে হয় জীবের কল্যাণ ॥ ১৮৮ ॥
সকলে সমান জাতি প্রভুর নিকটে ।
খুঁজে যাঁরা হরি-তত্ব হৃদি অকপটে ॥ ১৮৯ ॥
জাতি-ধর্ম-অবস্থার না করি বিচার ।
শ্রীপ্রভু দেখান তাঁরে তিনি যেন তাঁর ॥ ১৯০ ॥
ধার্মিক সাহেব এক আসে এ সময় ।
ভকতির কথা তাঁর কহিবার নয় ॥ ১৯১ ॥
শ্রীপ্রভুর পরিচয় করিয়া শ্রবণ ।
একান্ত বাসনা চিত্তে করে দরশন ॥ ১৯২ ॥
নাম উইলিয়ম পণ্ডিত বাইবেলে ।
ধীর নম্র বিনয়ী জন্ম উচ্চ কুলে ॥ ১৯৩ ॥
পুরীতে প্রবেশ করি পাদুকা খুলিয়া ।
মন্দিরের বহির্ভাগে রহে দাঁড়াইয়া ॥ ১৯৪ ॥
অতি
দীনতম ভাবে অন্তরেতে ভয় ।
শ্রীপ্রভুর দরশন যদি নাহি হয় ॥ ১৯৫ ॥
হেথা শ্রীমন্দিরে প্রভু সর্বতত্ববিৎ ।
চারিধারে ভকতনিকরে সুবেষ্টিত ॥ ১৯৬ ॥
কহিতেছিলেন তত্ত্ব স্বভাব যেমন ।
হঠাৎ হইল তাঁর সচঞ্চল মন ॥ ১৯৭ ॥
কটিতি বহিরভাগে বিদ্যুতের প্রায় ।
উপনীত দাঁড়াইয়া সাহেব যেখায় ॥ ১৯৮ ॥
পরশ করিয়া তায় পরম সাদরে ।
বসাইলা লয়ে গিয়া আপন মন্দিরে ॥ ১৯৯ ॥
আহ্লাদের সীমা নাই সাহেবের মনে ।
লক্ষণে ফুটিল ভাতি প্রফুল্ল বদনে ॥ ২০০ ॥
শ্রীপ্রভু পরশমণি পরশনে যাঁর ।
জীবের জীবত্ব নষ্ট লোচন আঁধার ॥ ২০১ ॥
রাষ্ট্র রামকৃষ্ণনাম শহরে বাহিরে ।
কতই যে আসে লোক সংখ্যা কেবা করে ॥ ২০২ ॥
পুরুষের কথা নাহি দিনেরেতে মেলা ।
কালীদরশন-ছলে আসে কুলবালা ॥ ২০৩ ॥
অন্তঃপুর-নিবাসিনী রহে কায়দায় ।
দিনকরে নাহি যারে দেখিবারে পায় ॥ ২০৪ ॥
শুন দিনেকের কথা সুন্দর ভারতী ।
একদিন পুরীমধ্যে কোন ভাগ্যবতী ॥ ২০৫ ॥
স্বামীর স্বভাব দোষে হয়ে ক্ষুত্রমনা ।
প্রতিবাসিনীরা সঙ্গে আছে বহুজনা ॥ ২০৬ ॥
প্রভু দরশনে আসা কেবল আশায় ।
হৃদয়-বেদনা যত শ্রীপদে জানায় ॥ ২০৭ ॥
প্রভুর স্বভাব যেন শৈশবের বটে ।
লজ্জা ভয় নাহি হয় তাঁহার নিকটে ॥ ২০৮ ॥
অকপটে কর কথা মনে যেন যার ।
কি পুরুষ কিবা নারী নাহিক বিচার ॥ ২০৯ ॥
সরলে সরল প্রভু হৃদয়-বিহারী ।
বড় বাঁকা যেখানে ভাবের ঘরে চুরি ॥ ২১০ ॥
ভাগ্যবতী পতিব্রতা সতী সুলোচনা ।
জানাইল শ্রীচরণে মনের বেদনা ॥ ২১১ ॥
বেশ্যামদে মত্ত পতি অতি কদাচার ।
স্বপথে সুমতি হবে কিমতে তাঁহার ॥ ২১২ ॥
ভক্তপ্রিয় প্রভুদেব করিলা উত্তর ।
পতির কারণ বাছা হবে না কাতর ॥ ২১৩ ॥
তিল অণু বিন্দু চিন্তা না রাখিও মনে ।
এ ঘরের লোক তেঁহ আসিবে এখানে ॥ ২১৪ ॥
যিনি এ সতীর পতি মহাভাগ্যবান ।
তাঁহার চরণে মোর অসংখ্য প্রণাম ॥ ২১৫ ॥
বারতা পাইবে পাছু উপস্থিতে নয় ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীত শাস্তির আলয় ॥ ২১৬ ॥
কলিকালে মনুষ্যের সচঞ্চল মন ।
সতত দোলায় দুই কামিনী-কাঞ্চন ॥ ২১৭ ॥
মত্ত খালি আত্মস্থখে স্বার্থপরতায় ।
পরমার্থে রতি-মতি মোটে না জুয়ায় ॥ ২১৮ ॥
প্রতিপত্তি অবিদ্যার হৃদয়মাঝারে ।
সাধন ভজন কর্ম সাধ্যাতীত নরে ॥ ২১৯ ॥
এ হেন জীবের পক্ষে মঙ্গল-নিধান ।
জীবহিতব্রত প্রভুদেব ভগবান ॥ ২২০ ॥
দেখ কি উপায় শিক্ষা দিলেন আসিয়া ।
তাঁহার রচিত লীলা মন্থন করিয়া ॥ ২২১ ॥
এত যে আসিছে লোক তাঁর বিজ্ঞমান ।
একমাত্র কারণ দেশেতে রাষ্ট্র নাম ॥ ২২২ ॥
বর্ণের ভিতরে ভগবান বর্ণময় ।
বর্ণ-সংযোজনে যাহা যাহা নাম হয় ॥ ২২৩ ॥
সকল কেবল তিনি বিভু পরমেশ ।
নামে ভগবানে নাই ইতর বিশেষ ॥ ২২৪ ॥
জ্ঞানযোগ কর্মযোগ শক্ত কলিকালে ।
দুর্বল কলির জীব নাহি আঁটে বলে ॥ ২২৫ ॥
নারদীয় ভক্তিযোগ কলিকালে সদ্ ।
পূর্বেকার নিয়ম আইন এবে রদ ॥ ২২৬ ॥
উপমায় বলিতেন প্রভু গুণমণি ।
এখন দেশের যেন কর্ত্রী-মহারানী ॥ ২২৭ ॥
এ সনে করিলা যাহা আইন কানুন ।
পর সনে রদ পুনঃ করেন নূতন ॥ ২২৮ ॥
ভক্তিসহ তন্ত্রমতে কর্মপ্রথা এবে ।
বেদ কি পুরাণ গ্রন্থ কানেতে শুনিবে ॥ ২২৯ ॥
রোগবিশেষেতে যেন আছে হেন ধারা ।
দ্বিবিধ ঔষধ ঠিক ব্যবহার করা ॥ ২৩০ ॥
কাহারে মাখিতে হয় অঙ্গের উপর ।
কাহারে সেবনে শ্রেয় পেটের ভিতর ॥ ২৩১ ॥
স্মরণ মনন সেবা নাম-সংকীর্তন ।
ঈশ্বরের পথে এই কালের নিয়ম ॥ ২৩২ ॥
সন্ধ্যার সময় প্রভু করতালি দিয়া ।
হরি হরি বলিতেন নাচিয়া নাচিয়া ॥ ২৩৩ ॥
কখন আদেশ উপস্থিত ভক্তদলে ।
'হরি হরি হরি বোল হরি হরি বোলে' ॥ ২৩৪ ॥
সবে মিলে একত্তরে করিতে নর্তন ।
মাঝারে রাখিয়া তাঁরে করিয়া বেষ্টন ॥ ২৩৫ ॥
সংসারী গৃহস্থ ভক্তে আদেশ কখন ।
চৈতন্যচরিতামৃত করিতে পঠন ॥ ২৩৬ ॥
নিত্য নিত্য সংকীর্তন যেন হয় ঘরে ।
ভক্তের ভোজনকর্ম ভক্তিসহকারে ॥ ২৩৭ ॥
নাম-মাহাত্মোর পক্ষে প্রভু ভগবান ।
গাইতেন এইসব নীচে লেখা গান ॥ ২৩৮ ॥
"নামের ভরসা কালী করি গো তোমার ।
কাজ কি আমার কোশাকুশি
দেঁতর হাসি লোকাচার
।
নামেতে কাল-পাশ কাটে,
জটে তা দিয়াছে রোটে,
আমরা ত সেই জটের মুটে
হ'য়েছি,
আর হব কার ॥
নামেতে যা হবার হবে, মিছা কেন মরি ভেবে,
একান্ত ক'রেছি শিরে
শিবের বচন সার ॥"
"হরি নাম লইতে অলস করো না,
যা হবার তাই হবে ।
দুঃখ পেরেছ না আর পাবে ।
ঐহিকের সুখ হ'ল না বলে কি
ঢেউ দেখে না ডুবাবে ॥"
নাম বীজ নাম হেতু নাম আদি গোড়া ।
কলিতে কিছুই নাই এই নাম ছাড়া ॥ ২৩৯ ॥
ভজ নাম পুজ নাম নাম কর সার ।
মধুর প্রভুর নামে মহিমা অপার ॥ ২৪০ ॥
নাম-রূপ মহাডিম্ব আদরে যে জন ।
ভক্তির উত্তাপ দিয়া রাখে অনুক্ষণ ॥ ২৪১ ॥
সময়ে ফুটিয়া ডিম্ব দেখিবারে পায় ।
শাবক-স্বরূপ ইষ্ট তাহে বাহিরায় ॥ ২৪২ ॥
হৃদয়ে ভরিয়া নাম রাখ সযতনে ।
কিবা কাজ নেতি-ধৌতি সাধন-ভজনে ॥ ২৪৩ ॥
নামেতে মগন রহ দিবা-বিভাবরী ।
পতিত-তারণ নাম পারের কাণ্ডারী ॥ ২৪৪ ॥
গাও গাও গাও নাম কেন কালনাশ ।
দেবদেবী যত কেহ স্বর্গপুরে বাস ॥ ২৪৫ ॥
ত্যজিয়া ইন্দ্রিয়-সুখ-সম্ভোগের কাম ।
চারিবর্ণে মূর্তিমান রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৪৬ ॥
গাও গাও গাও মেতে মিটুক জঞ্জাল ।
গায়রে অনন্তফণা মাতায়ে পাতাল ॥ ২৪৬ ॥
কুতূহলে প্রেমানন্দে গাও অবিরাম ।
সুধামাখা সুমধুর রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৪৭ ॥
গাও মণিমুক্তাভরা নিধি-অধীশ্বর ।
সঙ্গে ল'য়ে রাজ্যগত যত জলচর ॥ ২৪৮ ॥
ত্রিতাপ-সন্তাপ হর প্রেমাভক্তিধাম ।
চারি বর্ণ চারি বেদ রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৪৯ ॥
দীর্ঘকায় সমুদায় ব্যাপ্ত ত্রিভুবন ।
তুমি অতি দ্রুতগতি প্রকাণ্ড পবন ॥ ২৫০ ॥
গভীর নিঃস্বনে গেয়ে পুর মনস্কাম ।
মাতোয়ারা রসে-ভরা রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৫১ ॥
সুনীল-বসনা শূন্য সুবর্ণের খনি ।
জগত-লোচন তমোহর দিনমণি ॥ ২৫২ ॥
প্রফুল্ল
তারকারাজি শূন্যমাঝে ধাম ।
বিভেদি গগন গাও রামকৃষ্ণনাম ॥ ২৫৩ ॥
বসুমতী নিবসতি জড় কি চেতন ।
নর নারী আদি করি পশু পাখিগণ ॥ ২৫৪ ॥
গুল্ম-লতা-তরুরাজি যতেক ভূধর ।
গহন বিপিন নদী প্রান্তর কন্দর ॥ ২৫৫ ॥
সকলে অত্যুচ্চ স্বরে ভুলে সপ্তগ্রাম ।
নাচিয়া নাচিয়া গাও রামকৃষ্ণনাম॥ ২৫৬ ॥