চতুর্থ খণ্ড

শশধর তর্কচুড়ামণি


জয় জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


এ সময়ে শহরেতে হয় উপনীত ।
বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ এক পরম পণ্ডিত ॥ ১ ॥

তর্কচূড়ামণি আখ্যা নাম শশধর ।
পবিত্র সদ্বংশোদ্ভব বঙ্গদেশে ঘর ॥ ২ ॥

খালি শাহপাঠী নন প্রবৃত্ত সাধনে ।
হীরকের খণ্ড যেন মণ্ডিত কাঞ্চনে ॥ ৩ ॥

মাঝারি বয়স সুশ্রী সুন্দর গড়ন ।
গলায় রুদ্রাক্ষ মালা শাক্তের লক্ষণ ॥ ৪ ॥

অন্তে বাহে সমধারা মাখা সরলতা ।
মানুষের মধ্যে যেন মানুষ-দেবতা ॥ ৫ ॥

তেজ ভারি নিষ্ঠাচারী আপন ধরমে ।
গা ফুটে লাবণ্য উঠে সৎশুদ্ধ গুণে ॥ ৬ ॥

বাক্য সুকৌশল অতি বল রসনায় ।
শাস্ত্রের করেন ব্যাখ্যা বিবিধ সভায় ॥ ৭ ॥

শ্রুতিরুচিকর কথা মিষ্টভাষ-গুণে ।
দেশেতে প্রচার নাম হয় অল্প দিনে ॥ ৮ ॥

সমাচার-পত্র এবে দেশের চলন ।
সুযশ গৌরব বুকে করিয়া ধারণ ॥ ৯ ॥

বহিয়া লইয়া যায় দূর দূর দেশে ।
পাইয়া বারতা লোক অগণন আসে ॥ ১০ ॥

আসিতে না পারে যারা অবস্থার আড়ে ।
বক্তৃতা বিক্রয় হয় কিনে ঘরে পড়ে ॥ ১১ ॥

প্রভুর নিকটে লোকজনে বার বার ।
বিদিত করায় পণ্ডিতের সমাচার ॥ ১২ ॥

আগাগোড়া শ্রীপ্রভুর স্বভাব-প্রকৃতি ।
ধার্মিক পণ্ডিত জনে দেখিতে পিরীতি ॥ ১৩ ॥

অমনি প্রার্থনা হয় মায়ের নিকটে ।
দেখিব তাহায় যার দশে যশ রটে ॥ ১৪ ॥

যখন বাসনা যাহা শ্রীপ্রভূর মনে ।
সকল কহেন তিনি মার সন্নিধানে ॥ ১৫ ॥

যিনি বিনে জগতে যাঁহার কেহ নাই ।
কালীনামে মহামত্ত প্রমত্ত গোসাঁই ॥ ১৬ ॥

কি কহিব লীলাতত্ব প্রভুর আমার ।
নিজে প্রভু সেই মাতা বিশ্বের আধার ॥ ১৭ ॥

নিজে সেই মহাসিন্ধু অপার জলধি ।
বিশ্বের সমান যাঁহে অবতার আদি ॥ ১৮ ॥

ক্ষণে উঠে ক্ষণে খেলে (ক্ষণে তারে কয়) ।
পুনরায় ক্ষণমধ্যে সেই জলে লয় ॥ ১৯ ॥

বাহ্যিক শ্রীপ্রভুদেব পুরুষ চেহারা ।
প্রকৃতি-স্বভাবে বহে জননীর-ধারা ॥ ২০ ॥

আত্মহারা হয় এই লীলা-দরশনে ।
গুপ্ত অবতারখেলা করেন গোপনে ॥ ২১ ॥

শিক্ষা দিলা জীবগণে বিশেষ করিয়া ।
ভজিবারে বিশ্বমায় আপনি ভজিয়া ॥ ২২ ॥

সকল কহেন প্রভু মায়ের নিকটে ।
সরল শিশুর সম হৃদি অকপটে ॥ ২৩ ॥

ভাষে ঘোষে সরলতা এতই প্রভুর ।
যখন প্রার্থনা যাহা তখনি মঞ্জুর ॥ ২৪ ॥



শশধরে দেখিবারে মায়ের ইচ্ছায় ।
ভক্তগণ-সহ যান প্রভুদেবরায় ॥ ২৫ ॥

কলিকাতা শহরেতে রহে শশধর ।
ঠন্‌ঠনিয়ায় যেথা ঈশানের ঘর ॥ ২৬ ॥

বরাবর চলিলেন ঈশানের ঘরে ।
ঈশান বিশ্বাসী বড় করুণা তাঁহারে ॥ ২৭ ॥

কেবা তিনি দেবশ্রেষ্ঠ কিবা তাঁরে বলি ।
ভবনে যাঁহার শ্রীপ্রভুর পদধূলি ॥ ২৮ ॥

যে সময় যেথা হয় শ্রীপ্রভুর পাট ।
তখনি তথায় বসে মানুষের হাট ॥ ২৯ ॥

ভাটপাড়ানিবাসী ব্রাহ্মণ কতিপয় ।
বার্তা পেয়ে যথাস্থানে উপনীত হয় ॥ ৩০ ॥

সংসার-আশ্রমে হয় উন্নতি কেমন ।
এই কথা ব্রাহ্মণেরা করে উত্থাপন ॥ ৩১ ॥

ঘটনা সহিত বলিলেন প্রভুরায় ।
সংসারেও সিদ্ধ লোক বহু দেখা যায় ॥ ৩২ ॥

প্রভুর বিরাম নাই অবিরত কন ।
লক্ষ্য করি শ্রোতাদের কিবা প্রয়োজন ॥ ৩৩ ॥



সকলে করিয়া তৃপ্ত ঈশানের ঘরে ।
উঠিলেন শশধরে দেখিবার তরে ॥ ৩৪ ॥

দ্বারে উপনীত গাড়ি যেথা শশধর ।
আগুয়ান আসে তেঁহ পাইয়া খবর ॥ ৩৫ ॥

নমস্কার করিয়া প্রভুরে ভক্তিভরে ।
বসাইলা যথাযোগ্য আসন-উপরে ॥ ৩৬ ॥

উদিল প্রভুর অঙ্গে আবেশের নেশা ।
মৃদু হাসি শশধরে করিলা জিজ্ঞাসা ॥ ৩৭ ॥

সরল শিশুর সম সরল কথায় ।
কিবা উপদেশ কথা কহ বক্তৃতায় ॥ ৩৮ ॥

উত্তর করিল তাঁয় তর্কচূড়ামণি ।
শাস্ত্রে আছে যেইমত তাই কহি আমি ॥ ৩৯ ॥

প্রভু বলিলেন তবে শাস্ত্রে কর্ম কয় ।
শাস্ত্রমত কর্মপ্রথা এ কালের নয় ॥ ৪০ ॥

ক্ষীণ মন স্বল্প আয়ু জীবের এখন ।
অতীব কঠিন করা কর্মের সাধন ॥ ৪১ ॥

কর্মক্ষম নহে জীব গায়ে নাহি বল ।
নারদীয় ভক্তিযোগ কলিতে কেবল ॥ ৪২ ॥

আগেকার জ্বরে ছিল ঔষধ যেমন ।
কবিরাজী মতে দশমূলের পাচন ॥ ৪৩ ॥

এবে ম্যালেরিয়া জ্বরে কি কাজ তাহাতে ।
ফিবারমিকিশ্চার চাই ডাক্তারের মতে ॥ ৪৪ ॥

একান্ত যদ্যপি কর্ম দিতে হয় সাধ ।
কমাইয়া কর্মে দিবে নেজা-মুড়া বাদ্‌ ॥ ৪৫ ॥

কর্মমধ্যে কিবা তত্ত্ব নিহিত গোপনে ।
কখন প্রবেশে নাই সংসারীর প্রাণে ॥ ৪৬ ॥

পাষাণের সম শক্ত সংসারীর প্রাণ ।
পরমার্থতত্বকথা নাহি পায় স্থান ॥ ৪৭ ॥

পাথরে পেরেক দিলে হয় যে প্রকার ।
অভেদ্য পাথরে মুড়ে পেরেকের ধার ॥ ৪৮ ॥

অস্ত্রাঘাতে কিবা ফল কুম্ভীরের গায় ।
গাত্রচর্ম সুকঠিন পাষাণের প্রায় ॥ ৪৯ ॥

সাধুহস্তস্থিত কমণ্ডলুর মতন ।
সংসারীর কভু নহে উন্নতি সাধন ॥ ৫০ ॥

ছড়াইয়া বেনাবনে মুকুতার দানা ।
আপনি পাইবে শিক্ষা পূরিবে কামনা ॥ ৫১ ॥

অনুর্বরা ক্ষেত্রে বীজ করিয়া বপন ।
অনভিজ্ঞ কৃষি-কাজে চাষারা যেমন ॥ ৫২ ॥

বিফলে সুফল শিক্ষা পরিণামে পায় ।
তেমতি তোমার কর্মে করিবে তোমায় ॥ ৫৩ ॥

এত বলি প্রভুদেব অখিলের রাজ ।
আত্মারূপে সর্ব ঘটে করেন বিরাজ ॥ ৫৪ ॥

কহিতে লাগিলা কথা করিয়া খোলসা ।
মনোভাব পণ্ডিতের উপস্থিত দশা ॥ ৫৫ ॥

উঠিলে গগনে আঁধি উগ্রতর বায় ।
কে অশ্বথ কেবা বট চেনা নাহি যায় ॥ ৫৬ ॥

তেন নব অনুরাগে তুমি নহ ক্ষম ।
বুঝিবারে ভক্তাভক্ত কেবা কোন্ জন ॥ ৫৭ ॥

সর্বজনে সমচক্ষে দেখ আপনার ।
প্রকৃত বিচারে শক্তি নাহিক তোমার ॥ ৫৮ ॥

বিশেষিয়া পরে পরে প্রভুদেব কন ।
কর্মযোগ কি প্রকার তার বিবরণ ॥ ৫৯ ॥

কেমন কঠিন পথ কোথা রোধে গতি ।
পরিণামে ফল কিবা উপমা-সংহতি ॥ ৬০ ॥

যতক্ষণ কর্মী নাহি সমাধিস্থ হয় ।
ততক্ষণ কর্ম কিন্তু সমাপন নয় ॥ ৬১ ॥

সমাধির কথা মুখে যেন উচ্চারণ ।
স্মরণ হইল সেই শান্তির আশ্রম ॥ ৬২ ॥

স্মরণে প্রত্যক্ষ ছবি সম্মুখে তখনি ।
সম্ভোগেতে সমাধিস্থ হইলা আপনি ॥ ৬৩ ॥

পশ্চাতে রাখিয়া জল পানের বাসনা ।
যা ধরিয়া পুনঃ পরে নিম্নভূমে নামা ॥ ৬৪ ॥

বাহ্যিক গিয়ান গেল একেবারে চলে ।
ফুটিল অতুল ভাতি বদনমণ্ডলে ॥ ৬৫ ॥

শ্রীপ্রভুর সমাধিস্থ মোহন মূরতি ।
দরশনে জীবগণে পায় পরাগতি ॥ ৬৬ ॥

পরশনে মিলে মুক্তি প্রেমাভক্তি আর ।
মনস্কাম সব পূর্ণ মনে যা যাহার ॥ ৬৭ ॥

কিছু পরে দেহপুরে ফিরিলা যখন ।
কহিলেন শশধরে করি সম্ভাষণ ॥ ৬৮ ॥

প্রয়োজন গায়ে বল তাহার কারণে ।
আরও হও অগ্রসর সাধন-ভজনে ॥ ৬৯ ॥

না উঠিয়া গাছে আগে করিয়াছ আশ ।
উচ্চ ডালে বড় ফল ধরিতে প্রয়াস ॥ ৭০ ॥

ব্যবহারে বুঝিয়াছি বিশেষ তোমার ।
উদ্দেশ্য কেবলমাত্র পর উপকার ॥ ৭১ ॥

এতেক বলিয়া নমস্কার সহকারে ।
প্রশংসিলা পণ্ডিত প্রবর শশধরে ॥ ৭২ ॥



হেনকালে ধর্মলিঙ্গধারী একজন ।
গেলাসে পানীয় জল কৈল আনয়ন ॥ ৭৩ ॥

আধার আধেয় দুই অতি পরিষ্কার ।
সে জন শ্রীপ্রভু কিন্তু কৈল অস্বীকার ॥ ৭৪ ॥

নিকটে নরেন্দ্রনাথ ভক্তের ঠাকুর ।
কি হেতু অগ্রাহ্য জল হইল প্রভুর ॥ ৭৫ ॥

মনে মনে নানা চিন্তা উদয় তাঁহার ।
কারণান্বেষণে পরে বুঝিল ব্যাপার ॥ ৭৬ ॥

প্রথমে যে আনে জল ধর্মলিঙ্গধারী ।
অপকর্মে দোষদুষ্ট আবিল আচারী ॥ ৭৭ ॥

কেমনে জানিলা প্রভু মাত্রৈক দর্শনে ।
শ্রীপ্রভু অন্তরযামী বুঝিলেন মনে ॥ ৭৮ ॥

জ্ঞানমার্গী শ্রীনরেন্দ্র অত্যুচ্চ আধার ।
প্রমাণবিহীনে কিছু করে না স্বীকার ॥ ৭৯ ॥

বিচার তাঁহার পথ বিচারেতে যায় ।
অবতার উপকথা হাসিয়া উড়ায় ॥ ৮০ ॥

তাই তাঁরে মধ্যে মধ্যে শ্রীপ্রভু দেখান ।
নরদেহে পরমেশ বিশ্বাসে প্রমাণ ॥ ৮১ ॥

জলপানে আজি যাহা হৈল সংঘটন ।
বেদ কেবল নরেন্দ্রের শিক্ষার কারণ ॥ ৮২ ॥

নরেন্দ্র নরেন্দ্র যদি প্রপূজ্য আমার ।
এখানে শ্রীপ্রভু প্রভু সৃষ্টির আধার ॥ ৮৩ ॥

পূর্ণব্রহ্ম সনাতন বিশ্বের গোসাঞি ।
কতই নরেন্দ্র তাঁর আছে ঠাঁই ঠাঁই ॥ ৮৪ ॥



পণ্ডিতে কহেন যদি পাণ্ডিত্যের সাথে ।
না থাকে বৈরাগ্য তবে কি ফল তাহাতে ॥ ৮৫ ॥

শাস্ত্রধর্ম বক্ততার নহে কোন হানি ।
আদেশ করেন যদি জগৎ-জননী ॥ ৮৬ ॥

মায়ের আজ্ঞায় কর্মে ব্রতী যেইজন ।
কে তাহারে পারে জয়ী হয় ত্রিভুবন ॥ ৮৭ ॥

বাগবাদিনীর কাছে তাঁহার কৃপায় ।
যদি কেহ অণুকণা কৃপাবল পায় ॥ ৮৮ ॥

অগাধ ভাণ্ডার তার বলে ভরা হিয়া ।
হারায় ধীরেন্দ্রবৃন্দে কীটাণু গণিয়া ॥ ৮৯ ॥

মেঘাচ্ছন্নময়ী রেতে দীপ যেইখানে ।
কোটি কোটি কীট তথা বিনা আবাহনে ॥ ৯০ ॥

আদেশানুসারে কর্ম করে যেইজন ।
শ্রোতার অভাব তাঁর না হয় কখন ॥ ৯১ ॥

অগণ্য অগণ্য লোক আপনারা আসে ।
মহাত্মার আকর্ষণী শক্তির বিকাশে ॥ ৯২ ॥

ছুটে যথা লৌহচূর্ণ নহে গণনায় ।
অটল অচল ভাবে চুম্বক যেথায় ॥ ৯৩ ॥

তাই কহি চাপরাস আছে কি তোমার ।
মায়ের আদেশ-শক্তি কর্মে অধিকার ॥ ৯৪ ॥

ত্রস্তচিত শশধর শুনিয়া শ্রীবাণী ।
আদেশ কিছুই নাই কহিলেন তিনি ॥ ৯৫ ॥

প্রভু বলিলেন তবে কর্মে কিবা ফল ।
যদি না মায়ের কাছে পাইয়াছ বল ॥ ৯৬ ॥

দেখহ গৌরাঙ্গদের নিজে অবতার ।
জীবেশিক্ষা দিতে শক্তি কতই তাঁহার ॥ ৯৭ ॥

যে কর্ম করিলা জন্ম লয়ে নদীয়ায় ।
এখন কি আছে তার সব লোপ প্রায় ॥ ৯৮ ॥

আদেশ অপ্রাপ্ত যিনি অন্তরে দুর্বল ।
তাঁহার কর্মের বল কি হইবে ফল ॥ ৯৯ ॥

কর্তব্য কহিতে তবে প্রভু ভগবান ।
আবেশে বিভোর হয়ে ধরিলেন গান ॥ ১০০ ॥



"ডুব্‌ ডুব্‌ ডুব্‌
        রূপসাগরে আমার মন ।
তলাতল পাতাল খুঁজলে
        পাবি রে প্রেম-রত্নধন ॥

খুঁজ্‌ খুঁজ্‌ খুঁজ্‌
        খুঁজ্‌লে পাবি হৃদয়মাঝে বৃন্দাবন ।
দীপ্‌ দীপ্‌ দীপ, জ্ঞানের বাতি
        হৃদে জ্বল্বে সর্বক্ষণ ॥

ডেং ডেং ডেং ডাঙ্গায় ডিঙ্গা
        চালায় বল সে কোন জন,
কবীর বলে শুন্‌ শুন্ শুন্‌
        ভাব গুরুর শ্রীচরণ ॥"



ডুবিতে না কর ভয় কহি বারে বারে ।
সচ্চিৎ-আনন্দরূপ অমৃতসাগরে ॥ ১০১ ॥

ডুবিলে যেমন জলে মরণ নিশ্চয় ।
এখানে সেরূপ নাই প্রাণনাশ ভয় ॥ ১০২ ॥

যত পার তত ডুব দেখ তলাতল ।
পাইবে রতন ধন পরম সম্বল ॥ ১০৩ ॥

অতুল আনন্দে পরে দেখা তাঁর সনে ।
হইবে বাসনা পূর্ণ কথোপকথনে ॥ ১০৪ ॥

আজ্ঞাদেশ হয় যদি ইচ্ছায় তাঁহার ।
তখন বলিতে তত্ত্ব পাবে অধিকার ॥ ১০৫ ॥

এত বলি কহিলেন প্রভুদেবরায় ।
চিদানন্দে যাইবার ত্রিবিধ উপায় ॥ ১০৬ ॥

জ্ঞানযোগ কর্মযোগ ভক্তিযোগ আর ।
এ যুগে প্রথমোদয় কঠিন ব্যাপার ॥ ১০৭ ॥

সাধিতে দুর্বল জীবে না হয় ক্ষমতা ।
নারদীয় ভক্তিযোগ কলিকালে প্রথা ॥ ১০৮ ॥

জুড়ি কর শশধর করে নিবেদন ।
কতদূর শ্রীপ্রভুর তীর্থপর্যটন ॥ ১০৯ ॥

প্রবেশিয়া পণ্ডিতের হৃদয়মাঝারে ।
প্রভু বলিলেন গিয়াছিনু কিছু দূরে ॥ ১১০ ॥

কিন্তু হৃদে ভক্তি বিনা তীর্থপর্যটন ।
সকল বিফল হয় বৃথা পণ্ডশ্রম ॥ ১১১ ॥

দেখ যেম্নি চিল শুক্‌নি অতি উচ্চে উড়ে ।
পাতিয়া নয়নদ্বয় সতত ভাগাড়ে ॥ ১১২ ॥

তেমনি আসক্ত চিত কামিনী-কাঞ্চনে ।
কি করিবে চারিধাম-তীর্থপর্যটনে ॥ ১১৩ ॥

যবে আমি কাশীধামে আশ্চর্য ব্যাপার ।
দেখিলাম গাছ ঘাস যত তথাকার ॥ ১১৪ ॥

আকারে বরনে গুণে সেই এক জাতি ।
এখানেতে যেইমত সেখানে তেমতি ॥ ১১৫ ॥

মন যেথা তথা তুমি বুঝহ বারতা ।
এখানে যাহার আছে তার আছে সেথা ॥ ১১৬ ॥

যখন তখন তত্ত্ব বুঝিবার নয় ।
উপলব্ধি হয় যবে সাপেক্ষ সময় ॥ ১১৭ ॥

হৃদয়ে ধৈরয ধরি হইবে থাকিতে ।
উতলা উচিত নয় উন্নতির পথে ॥ ১১৮ ॥

ত্রিবিধ ডাক্তার আছে শুন বিবরণ ।
অধম মধ্যম আর কেহ বা উত্তম ॥ ১১৯ ॥

অধম শ্রেণীর যিনি নাড়ি পরীক্ষিয়ে ।
ঔষধ লিখিয়া দেন রোগীর লাগিয়ে ॥ ১২০ ॥

ঔষধে অরুচি রোগী খাইতে না চায় ।
নাহি চেষ্টা ডাক্তারের রোগী যাতে খায় ॥ ১২১ ॥

সেইমত শিক্ষাদাতা ধর্মের বাজারে ।
কাজে কি হইল লক্ষ্য অধমে না করে ॥ ১২২ ॥

রোগীকে মধ্যম করে বহু অনুনয় ।
যাহাতে ঔষধ তার উদরস্থ হয় ॥ ১২৩ ॥

শিক্ষাদাতা দ্বিতীয় শ্রেণীর এক রকম ।
অধম অপেক্ষা করে কর্তব্যে যতন ॥ ১২৪ ॥

অত্যুচ্চ শ্রেণীর যিনি উত্তম আখ্যায় ।
বিফল যদ্যপি হয় সকল উপায় ॥ ১২৫ ॥

ছন্নমতি রোগীকে না করি পরিহার ।
প্রয়োগ করে বল যথাসাধ্য তাঁর ॥ ১২৬ ॥

বুকে দিয়া হাঁটুজাঁক ধরিয়া চিবুকে ।
উচিত ঔষধ দেন ঢুকাইয়া মুখে ॥ ১২৭ ॥

সেইমত শিক্ষাদাতা উচ্চতম যাঁরা ।
যদ্যপি দেখেন কারে রতিমতিহারা ॥ ১২৮ ॥

কথায় না দেন কান চলে নিজ মতে ।
সবলে ফিরায়ে দেন ঈশ্বরের পথে ॥ ১২৯ ॥

এই স্থলে শশধর তর্কচূড়ামণি ।
জিজ্ঞাসিল প্রভুদেবে জুড়ি দুই পাণি ॥ ১২৩ ॥

এমন শিক্ষক যদি রহে বর্তমানে ।
সময়সাপেক্ষ কাজে কহিলেন কেনে ॥ ১২৪ ॥

উত্তর করিলা তবে প্রভু গুণমণি ।
সময়সাপেক্ষ কথা অতি সত্য মানি ॥ ১২৫ ॥

শিক্ষকের শিরোমণি আছে হেন বটে ।
ঔষধ রোগীর যদি নাহি ঢুকে পেটে ॥ ১২৬ ॥

ভিষক উপায় তবে ভাবে নিজ মনে ।
উপযুক্ত পাত্র হেতু ঔষধসেবনে ॥ ১২৭ ॥

বিশেষিয়া এইখানে প্রভুদেব কন ।
যাহা আসে মন পাশে শিক্ষার কারণ ॥ ১২৮ ॥

সর্বাগ্রে জিজ্ঞাসা করি কথা অবস্থার ।
কর্তৃপক্ষ সাপেক্ষ কে আছয়ে তাহার ॥ ১২৯ ॥

নিরাশ্রয় ঋণগ্রস্ত রহে যেইজন ।
কখন না হয় তার ভগবানে মন ॥ ১৩০ ॥

আজি সমাপন কথা পণ্ডিতের সাথে ।
পরে কি হইল কথা কহিব পশ্চাতে ॥ ১৩১ ॥