চতুর্থ খণ্ড
গৃহী
ও সন্ন্যাসী বিবিধ ভক্তের মিলন
[কালী মুখুয্যে, বিহারী, হরিপদ, হুট্কো-গোপাল, তেজচন্দ্র,
প্রমথ, পল্টন্ট, বিনোদ, সোম, যজ্ঞেশ্বর, ক্ষীরোদ, সুবোধ, চুনিলাল, নবগোপাল
কবিরাজ, তারক ঘোষাল, ছোট নরেন্দ্র, উপেন্দ্র, কিশোরী গুপ্ত, হারাণ, গোলাপ
সিং]
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
শ্রীপ্রভুর অবতারে মহিমা অপার ।
সুমূর্খ পামরে শক্তি নাহি বর্ণিবার ॥ ১ ॥
সার্বভৌম ভাব তাঁর বিশ্বগুরুবেশ ।
সর্বত্রে সমানভাবে করুণা অশেষ ॥ ২ ॥
এবারে তারক ব্রহ্ম রামকৃষ্ণনাম ।
পশ্চাতে লীলায় পাবে ইহার প্রমাণ ॥ ৩ ॥
মূর্তিমান রামকৃষ্ণ নামের কৃপায় ।
গুরুরূপে এই নাম ব্যাপিবে ধরায় ॥ ৪ ॥
প্রভুর পূজায় মত্ত হবে ঘরে ঘরে ।
ত্রাণের কারণ ভবজলধির নীরে ॥ ৫ ॥
বিনা রামকৃষ্ণনাম অনন্য-উপায় ।
প্রত্যক্ষ বুঝিবে তত্ত্ব পশ্চাৎ লীলায় ॥ ৬ ॥
বেগবতী যবে নদী বরিষার কালে ।
কত শত তৃণ কুটি ভেসে যায় জলে ॥ ৭ ॥
ভাসিয়া যাইতে নিজে তৃণ ভাল পারে ।
কিন্তু যদি ক্ষুদ্র পাখী তাহার উপরে ॥ ৮ ॥
আসিয়া আশ্রয় লয় বসিয়া তাহায় ।
অক্ষম ধরিতে ভার দু'য়ে ডুবে যায় ॥ ৯ ॥
সেই মত সাধু ভক্ত সিদ্ধ যেই জন ।
আপনি ভাসিয়া চলে তৃণের মতন ॥ ১০ ॥
অপরে লইয়া পৃষ্ঠে যাইতে না পারে ।
সিন্ধুমুখে বেগবতী তটিনীর নীরে ॥ ১১ ॥
কিন্তু বাহাদুরে মাজ দীর্ঘে প্রস্থে বড় ।
প্রতি পরমাণু গায়ে সবল সুদৃঢ় ॥ ১২ ॥
নদীর স্রোতেতে যায় ভাসিয়া যখন ।
তাহাতে আশ্রয় যদি লহে লোক-জন ॥ ১৩ ॥
অনায়াসে বহে ভার যায় অবহেলে ।
দ্রুতগতি তটিনীর বেগবতী জলে ॥ ১৪ ॥
সেইরূপ ভগবান যবে অবতারে ।
পদতরী দিয়া ভবসিন্ধু-পারাপারে ॥ ১৫ ॥
কতই লইয়া যান সংখ্যা নাহি তার ।
লাঘব করিয়া গুরু ধরণীর ভার ॥ ১৬ ॥
এবে অবতার প্রভু বিশ্বশুরু নিজে ।
সর্বশক্তিমান বিভু দীনতার সাজে ॥ ১৭ ॥
অপার করুণারাজি শ্রীঅঙ্গেতে ভরা ।
নিঃশব্দে লইয়া যান সসাগরা ধরা ॥ ১৮ ॥
এখন প্রত্যক্ষ চক্ষে নাহি যায় দেখা ।
লীলার ভিতরে কিন্তু স্পষ্টাক্ষরে লেখা ॥ ১৯ ॥
বিধিমতে সময়ে পাইবে সমাচার ।
রামকৃষ্ণ-লীলা ইহা লীলার ভাণ্ডার ॥ ২০ ॥
রাম, কৃষ্ণ কিংবা অন্য অন্য অবতারে ।
হাঁক ডাক বাজে ঢাক বিষম সমরে ॥ ২১ ॥
এবে তবে শব্দহীনে প্রভুর গমন ।
কি কারণে জিজ্ঞাসিতে পার তুমি মন ॥ ২২ ॥
শুনহ কারণ তবে তোমারে শুনাই ।
গুপ্ত অবতার প্রভু জগৎ-গোসাঁই ॥ ২৩ ॥
গতিশব্দ নাহি থাকে বৃহৎ জাহাজে ।
যখন চলিয়া যায় দরিয়ার মাঝে ॥ ২৪ ॥
ছুটিল রেলের গাড়ি কত শব্দ তায় ।
ধরা ঘুরে গোটা ধরা কে জানিতে পায় ॥ ২৫ ॥
আপনি অলক্ষ্যে থাকি প্রভু নারায়ণ ।
ভক্তের দ্বারায় পরে উদ্দেশ্য-সাধন ॥ ২৬ ॥
ক্রমে পরে পরিচয় পাবে তুমি তার ।
ধৈরযের কর্ম ইহা নহে উতলার ॥ ২৭ ॥
যে যে ভক্তে সঙ্গে লয়ে কার্যের সাধন ।
হইতেছে তাহাদের ক্রমে সংজোটন ॥ ২৮ ॥
সংজোটন-লীলা যদি হৃদে পায় ঠাঁই ।
তখন বুঝিবে কিবা খেলিলা গোসাঁই ॥ ২৯ ॥
লীলা-দরশন-হেতু দৃশ্য ভক্তগণ ।
বদনদর্শনোপায় দর্পণ যেমন ॥ ৩০ ॥
হেন প্রভু-ভক্ত-পদে রাখি রতি মতি ।
শুন সংজোটন-লীলা মধুর ভারতী ॥ ৩১ ॥
প্রভুর প্রকট-কাল বসন্তের ন্যায় ।
ভক্তি-প্রেম ফুলকুল সৌরভ ছুটায় ॥ ৩২ ॥
পেয়ে গন্ধ অন্ধ হয়ে মত্ততর মন ।
যূথে যূথে ভক্ত অলি দিল দরশন ॥ ৩৩ ॥
জুটিল মুখুয্যে কালী মুখুয্যে বিহারী ।
নবীন যুবকদ্বয় উভয়ে সংসারী ॥ ৩৪ ॥
কৃষ্ণকায় হরিপদ জাতিতে ব্রাহ্মণ ।
ইজারা আছিল যাঁর প্রভুর চরণ ॥ ৩৫ ॥
পদ যদি সেবে পদ প্রভু তুষ্ট তায় ।
কেহ নহে হেন পটু চরণসেবায় ॥ ৩৬ ॥
বয়সে বালক পূর্ণ সরল গড়ন ।
হরিণের সম দুটি সুন্দর নয়ন ॥ ৩৭ ॥
জুটিল গোপাল হুট্কো মহাভাগ্যবান ।
কৃষ্ণ বর্ণ আর এক তেজচন্দ্র নাম ॥ ৩৮ ॥
আইল প্রমথচন্দ্র অতি চমৎকার ।
বালক বয়েস তাঁর বাপ মাজিস্টর ॥ ৩৯ ॥
গণ্য মান্য জানা নাম হেমচন্দ্র কর ।
শ্রদ্ধা ভক্তি ছিল বহু প্রভুর উপর ॥ ৪০ ॥
বালক বিনোদ সোম দেখা দিল আসি ।
বলরাম বসুর নিকট প্রতিবাসী ॥ ৪১ ॥
বয়েস তাঁহার
নহে উনিশের পার ।
উচ্চপদে অভিষিক্ত জনক তাঁহার ॥ ৪২ ॥
দমদমার মাস্টার জুটিল
যজ্ঞেশ্বর ।
বাঁকুড়া জেলার মধ্যে কাকিটায় ঘর ॥ ৪৩ ॥
ক্ষীরোদ সুবোধ দুটি অতি শিশু
ছেলে ।
শুনিয়া প্রভুর নাম আসে হেনকালে ॥ ৪৪ ॥
ক্ষীরোদ সংসারী পরে বল নাহি বেশী ।
সুবোধের খোকা নাম কুমার-সন্ন্যাসী ॥ ৪৫ ॥
যে সব ভক্তের নাম হয় এই স্থলে ।
ভাগ্যবান সবে প্রায় কায়স্থের ছেলে ॥ ৪৬ ॥
জুটিলেন ভাগ্যবান বসু চুনিলাল ।
তার
পাছে কবিরাজ শ্রীনবগোপাল ॥ ৪৭ ॥
উভয়ে বয়েস প্রাপ্ত উভয়ে সংসারী ।
নন্দন-নন্দিনী
ঘরে শহরেতে বাড়ি ॥ ৪৮ ॥
বিদেশে প্রভুর নাম করিয়া শ্রবণ ।
জুটিলেন যুবা এক
ব্রাহ্মণ-নন্দন ॥ ৪৯ ॥
বাল্যাবধি ধর্মপথে আন্তরিক টান ।
কৃতদার তারক ঘোষাল তাঁর
নাম ॥ ৫০ ॥
জনক তাঁহার শ্রীপ্রভুর পরিচিত ।
শ্যামাভক্ত দ্বিজবর ভকত-পণ্ডিত ॥ ৫১ ॥
বৈরাগ্য প্রবল বড় তারকের মনে ।
দিনে দিনে বৃদ্ধি পায় প্রভুর সদনে ॥ ৫২ ॥
ঝটিতি
কাটিয়া যত সংসারবন্ধন ।
পশ্চাতে করিলা তেঁহ সন্ন্যাস গ্রহণ ॥ ৫৩ ॥
জুটিয়া নরেন্দ্র-ছোট এবে দিল দেখা ।
কায়স্থ-কুমার অঙ্গে সরলতামাখা ॥ ৫৪ ॥
গড়নে
সরল যেন অন্তরে সরল ।
ভিতরের ভাব বাহে ব্যক্ত সমুজ্জ্বল ॥ ৫৫ ॥
স্বতই প্রভুর
প্রতি ভক্তি হৃদে ভরা ।
প্রভুর সকাশে হয় বড়ই পিয়ারা ॥ ৫৬ ॥
শ্রীপ্রভুর সাঙ্গোপাঙ্গগণাদি
নিকর ।
ভক্ত-আখ্যা যাঁহাদের পুঁথির ভিতর ॥ ৫৭ ॥
দুই চারি উচ্চবয়ঃ প্রবীণ আকার ।
অবশিষ্ট অল্পবয়ঃ বালক কুমার ॥ ৫৮ ॥
কি হেতু এমন যদি জিজ্ঞাসিলে মন ।
ভিতরে সুন্দর তত্ত্ব শুন বিবরণ ॥ ৫৯ ॥
ভয়ানক কাল যবে প্রভু অবতার ।
ধরাধামে অবিদ্যার পূর্ণ অধিকার ॥ ৬০ ॥
তমাচ্ছন্ন দিশি পথ নাহি যায় দেখা ।
ধর্মের আলোক যেন বিজলীর রেখা ॥ ৬১ ॥
বিভীষিকাময়ী ধরা ঘেরা অবিদ্যায় ।
সভয়-অন্তর ভক্ত আসিতে না চায় ॥ ৬২ ॥
তাই প্রভু সর্ব অগ্রে আপনি আসরে ।
প্রভু-প্রিয়ভক্তগণ ক্রমে পরে পরে ॥ ৬৩ ॥
যদি প্রভু বিশ্বপতি সৃষ্টির কারণ ।
যদি
এই ভক্তবর্গ অন্তরঙ্গগণ ॥ ৬৪ ॥
তবে আসিবারে কেন সভয় অন্তর ।
জিজ্ঞাসিলে যদি তবে শুনহ উত্তর ॥ ৬৫ ॥
ধরায় সংসারাশ্রম সুবিষম ঠাঁই ।
ত্রিতাপ-অনলে তপ্ত লোহার কড়াই ॥ ৬৬ ॥
ভীষণ প্রবেশদ্বার কেবল যাতনা ।
তদুপরি শারীরিক রোগের তাড়না ॥ ৬৭ ॥
বিমল ভক্তের দেহ পবিত্র আধার ।
কি কারণে রোগ শোক তাপের সঞ্চার ॥ ৬৮ ॥
উত্তর-বহ্নির কাছে যেবা আগুয়ান ।
কোথায় কে পায় বল তাপের এড়ান ॥ ৬৯ ॥
বলিতেন প্রভুদেব বিধির বিধাতা ।
পাঁচভূতে এই দেহ রহে জোড়া গাঁথা ॥ ৭০ ॥
পঞ্চভূতময়
দেহ ফাঁদ সুবিষম ।
দেহ ধরি নিজে ব্রহ্মা করেন রোদন ॥ ৭১ ॥
হেন ধর্মযুক্ত দেহ
করিলে আশ্রয় ।
অনিবার্য রোগ শোক কর দিতে হয় ॥ ৭২ ॥
দেহের যে ধর্ম তাহা সর্বত্রে
সমান ।
দেহধারী যদি বিভু না যান এড়ান ॥ ৭৩ ॥
পাপময় ধরাপুরীমধ্যে ভক্তগণ ।
পাপমতি জীব সঙ্গে সদা বিচরণ ॥ ৭৪ ॥
সংসারীর পাপ-অন্ন করিয়া আহার ।
ভক্তের দেহেতে তাই তাপের সঞ্চার ॥ ৭৫ ॥
পারার স্বভাব পাপে, যদি পড়ে পেটে ।
ছাপা নাহি রহে দেহে রোগরূপে ফুটে ॥ ৭৬ ॥
ভক্তগণ সঙ্গে বিভু কেন আগুসার ।
উদ্দেশ্য করিতে লঘু ধরণীর ভার ॥ ৭৭ ॥
পাপ লয়ে অন্তরঙ্গগণ পারিষদ ।
পদে পদে প্রত্যেকের বিবিধ বিপদ ॥ ৭৮ ॥
লীলার ভিতরে আর দ্বিতীয় কারণ ।
অল্পবয়ঃ বালক কি হেতু ভক্তগণ ॥ ৭৯ ॥
শুন কই খুলে বলি লীলাতত্ব সার ।
ভক্ত-সংজোটন-কাণ্ড অমৃত
ভাণ্ডার ॥ ৮০ ॥
এখন কলির লোক করে মনে মনে ।
কামিনী-কাঞ্চনভোগ করিয়া যৌবনে ॥ ৮১ ॥
উপযুক্ত যবে পুত্র বার্ধক্যদশায় ।
বিষয়-সম্পত্তি আদি ভার দিয়া তায় ॥ ৮২ ॥
বন্দোবস্ত পোষ্যদের করি বিলক্ষণ ।
নিশ্চিন্ত হইয়া শেষে সাধন-ভজন ॥ ৮৩ ॥
সংসারীর আন্ বুদ্ধি বিধি-বিড়ম্বনা ।
যা হবার নহে করে তাহার বাসনা ॥ ৮৪ ॥
সবার প্রত্যক্ষ দেখা আছে চিরকাল ।
হাতে না মাখিয়া তেল ভাঙ্গিলে কাঁঠাল ॥ ৮৫ ॥
ফলেতে বিস্তর আঠা লাগে গোটা হাতে ।
অজ্ঞানে করিয়া কর্ম জঞ্জাল পশ্চাতে ॥ ৮৬ ॥
সেইমত জ্ঞান ভক্তি না করি অর্জন ।
বাহিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যেই জন ॥ ৮৭ ॥
সংসারে প্রবেশ করে মায়ার আঠায় ।
সুনিশ্চিত জড়ীভূত আপনা মজায় ॥ ৮৮ ॥
সংসার-সমরক্ষেত্রে ঢুকে যেই জনা ।
আগমনিগম তার দুই চাই জানা ॥ ৮৯ ॥
নিগমে অবিজ্ঞ জনে সংসারেতে আসা ।
ধ্রুব অভিমন্যুর মত হয় তার দশা ॥ ৯০ ॥
সেই হেতু বলিতেন প্রভু পরমেশ ।
সংসার বুঝহ অগ্রে পশ্চাৎ প্রবেশ ॥ ৯১ ॥
বালকের খেলা যথা ইহার উপমা ।
লুকোচুরি নামে যাহা সাধারণে জানা ॥ ৯২ ॥
বুড়ীকে ছুঁইয়া অগ্রে যেথা ইচ্ছা রয় ।
ছু'ইলেও তারে চোর চোর নাহি হয় ॥ ৯৩ ॥
সেইমত ভগবানে করি পরশন ।
সংসারে যেখানে যেবা করে বিচরণ ॥ ৯৪ ॥
নির্ভয় হৃদয় তার ধরা বেড়া ছাতি ।
ছুইলেও অবিদ্যায় নাহি হয় ক্ষতি ॥ ৯৫ ॥
বুঝ কেন বালক প্রভুর ভক্তগণ ।
বাল্যাবধি স্বভাবতঃ ভগবানে মন ॥ ৯৬ ॥
ভক্তে আচরিয়া ধর্ম শিক্ষা দিলা জীবে ।
ধর্ম-আচরণ-কর্ম শৈশবে শৈশবে ॥ ৯৭ ॥
বয়স্কে না হয় ধর্ম-সাধনা সংসারে ।
গলায় উঠিলে কাঁঠি পাখী নাহি পড়ে ॥ ৯৮ ॥
সহজে সুন্দর কার্য হয় বাল্যকালে ।
উপমা তাহার ননী তুলিলে সকালে ॥ ৯৯ ॥
যেমন সুন্দর উঠে মিঠা তার তায় ।
তেমন না হয় দুগ্ধ মথিলে বেলায় ॥ ১০০ ॥
বার্ধক্যে না হয় মোটে সাধনভজন ।
যখন হাজার ভাগ এক ফোঁটা মন ॥ ১০১ ॥
সকালে করিতে কর্ম শিখাবার তরে ।
বালক লইয়া লীলা প্রভু অবতারে ॥ ১০২ ॥
প্রবীণ বয়স তবে যাঁরা দুই চারি ।
কারণ তাঁহার তাঁরা প্রভুর ভাণ্ডারী॥ ১০৩ ॥
সুন্দর বালক এক জুটে এই কালে ।
উপেন্দ্র মুখুয্যে দুঃখী ব্রাহ্মণের ছেলে ॥ ১০৪ ॥
অর্থ-আশে আসা শুনি প্রভু ভগবান ।
সময়ে করিলা তার পূর্ণ মনস্কাম ॥ ১০৫ ॥
জুটিল কিশোরী এবে মাস্টারের ভাই ।
বহুরঙ্গ তার সঙ্গে করিলা গোসাঁই ॥ ১০৬ ॥
আর এক যুবাবয়ঃ জুটে এই কালে ।
উপাধি তাঁহার দাস কৈবর্তের ছেলে ॥ ১০৭ ॥
কুলের তিলক গর্ব অতি ভক্তিমান ।
চিরভক্ত প্রভুর হারাণচন্দ্র নাম ॥ ১০৮ ॥
জনেক ব্রাহ্মণী জুটিলেন এ সময় ।
মহাভক্ত শ্রীপ্রভুর শুন পরিচয় ॥ ১০৯ ॥
অপার ভকতি ঘটে অবাক্ কাহিনী ।
ব্রাহ্মণীর বেশে এক দেবী ঠাকুরানী ॥ ১১০ ॥
বয়স চল্লিশ প্রায় দোহারা গড়ন ।
সংসারী যদিও তবু স্বতোন্নত মন ॥ ১১১ ॥
পরলোকে বহুকাল গিয়াছেন স্বামী ।
কোলে দিয়া ব্রাহ্মণীর একটি নন্দিনী ॥ ১১২ ॥
রাজরানী সেই কন্যা ঘরণী রাজার ।
সন্তান-সন্ততি এবে সোনার সংসার ॥ ১১৩ ॥
ব্রাহ্মণী থাকেন প্রায় নন্দিনীর ঘরে ।
জামাই মায়ের মত সমাদর করে ॥ ১১৪ ॥
পরম আনন্দে কাল কাটান ব্রাহ্মণী ।
কিছুই অভাব নাই দুধে ভাতে চিনি ॥ ১১৫ ॥
চিরভক্ত শ্রীপ্রভুর ব্রাহ্মণী এখন ।
লীলায় সময় পূর্ণ হইল প্রয়োজন ॥ ১১৬ ॥
সংজোটন এখানে কেমনে হয় তাঁর ।
গাইলে শুনিলে কাটে বন্ধন মায়ার ॥ ১১৭ ॥
একমাত্র দুহিতাই ব্রাহ্মণীর ধন ।
আর কেহ নাই তার সংসার-বন্ধন ॥ ১১৮ ॥
প্রভুর দেখিয়া কার্য হয় বুদ্ধিহারা ।
রাজরানী নন্দিনী হঠাৎ গেল মারা ॥ ১১৯ ॥
কি হইল ব্রাহ্মণীর ভেবে দেখ মন ।
দুনিয়া আঁধার দিনে করে নিরীক্ষণ ॥ ১২০ ॥
লোকের সান্ত্বনা হৃদে নাহি পায় স্থল ।
দাবানলে কি করিবে এক বিন্দু জল ॥ ১২১ ॥
আখিবারি অনিবার দুনয়নে ঝরে ।
উন্মাদিনী সম ধারা দুহিতার তরে ॥ ১২২ ॥
ছাড়িয়া জামাতালয় আসিলেন ফিরে ।
বাগবাজারেতে তাঁর আপনার ঘরে ॥ ১২৩ ॥
যেখানে করেন বাস মহাভাগ্যবান ।
পরম বৈষ্ণব ভক্ত বসু বলরাম ॥ ১২৪ ॥
যোগীন-মাতার যেইখানে পিত্রালয় ।
পরস্পর প্রতিবাসী আছে পরিচয় ॥ ১২৫ ॥
ব্রাহ্মণীর শোকাতুরা দেখিয়া অবস্থা ।
সান্ত্বনার হেতু কয় ধরমের কথা ॥ ১২৬ ॥
এখানে ধর্মের কথা নাহি অন্য আর ।
একমাত্র শ্রীপ্রভুর মহামহিমার ॥ ১২৭ ॥
পূর্বাবধি মহন্নাম ছিল সংগোপনে ।
ব্রাহ্মণীর হৃদয়ের অতি গুপ্ত স্থানে ॥ ১২৮ ॥
ঢাকা ছিল মাত্র মহামোহে গৃহিতার ।
মেঘের আড়ালে যেন অঙ্গ চন্দ্রিমার ॥ ১২৯ ॥
উড়িল সে ঘন মেঘ দুহিতার কায়া ।
এখন কিঞ্চিং আছে একটুকু ছায়া ॥ ১৩০ ॥
বসিল সতেজে নাম প্রাণের ভিতর ।
দরশনে চলিলেন দক্ষিণশহর ॥ ১৩১ ॥
মহাভক্ত শ্রীপ্রভুর ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
সময় আগত যেন পথ-পানে চেয়ে ॥ ১৩২ ॥
আছেন শ্রীপ্রভুদেব তাঁহার কারণ ।
সুমধুর কথা অতি ভক্ত-সংজোটন ॥ ১৩৩ ॥
গুণমণি মন্দিরের বাহিরে বেড়ান ।
যে পথে ব্রাহ্মণী আসে আকুল পরান ॥ ১৩৪ ॥
ক্রমাগত বিলাপ করিয়া দুহিতার ।
মরিয়া গিয়াছে চণ্ডী কে আছে আমার ॥ ১৩৫ ॥
শুনিয়া বিলাপ বাক্য প্রভু গুণধর ।
হাসিয়া নাচিয়া কৈলা তাঁহারে উত্তর ॥ ১৩৬ ॥
আপনার বলিতে জগতে নাহি যার ।
তাঁহার আছেন হরি পারের কাণ্ডার ॥ ১৩৭ ॥
সর্পবিষে যেন রোগী গেছে ঢলে পড়ে ।
হঠাৎ জাগিয়া উঠে মন্তরের জোরে ॥ ১৩৮ ॥
সেইমত শোক-বিষে জ্বারা তনুখানি ।
ব্রাহ্মণী চমক্ অঙ্গ শুনিয়া শ্রীবাণী ॥ ১৩৯ ॥
ছুটিল শোকের জ্বালা শীতল অন্তরে ।
পাছু পাছু প্রবেশিল প্রভুর মন্দিরে ॥ ১৪০ ॥
বুঝিয়া ভক্তের দশা প্রভু ভগবান ।
ভাবেতে বিভোর অঙ্গ ধরিলেন গান ॥ ১৪১ ॥
"আপনাতে আপনি থেক মন
যেও নাকো কারো ঘরে ।
যা চাবি তা বসে পাবি,
খোঁজ নিজ
অন্তঃপুরে ॥
পরম-ধন ঐ পরশ মণি,
যা চাবি তা দিতে পারে ।
কত মণি পড়ে আছে,
চিন্তামণির নাচ-দুয়ারে ॥"
গীতের মাধুরী আর মর্মার্থ ইহার ।
শোকাতুরা ব্রাহ্মণীর হৃদয়মাঝার ॥ ১৪২ ॥
তখনি বসিল এঁটে খুলে সাত তালা ।
তাড়াইয়া দুহিতার বিরহের জ্বালা ॥ ১৪৩ ॥
পাতালে মাটির নীচে লৌহময় ঘর ।
স্বপনেও যেথা নাই আলোর খবর ॥ ১৪৪ ॥
যেখানে কখন নাই পবন সঞ্চার ।
আধার আধার মাত্র নিবিড় আঁধার ॥ ১৪৫ ॥
দৈব ঘটনায় যদি সেইখানে হয় ।
জগৎ-লোচন সূর্যদেবের উদয় ॥ ১৪৬ ॥
তখনি পালায় তমঃ নাহি রহে আর ।
আলোকিত দশভিত যা ছিল আঁধার ॥ ১৪৭ ॥
তেমতি করিল হেথা গীতে শ্রীপ্রভুর ।
মায়াঢাকা ব্রাহ্মণীর অন্তরের পুর ॥ ১৪৮ ॥
ব্রাহ্মণী প্রার্থনা করে শ্রীপ্রভুর ঠাঁই ।
যেমন মায়ার বাড়ি আর নাহি খাই ॥ ১৪৯ ॥
ভক্তি দিয়া কর রক্ষা আকুলা অধমে ।
হইনু শরণাপন্ন অভয়-চরণে ॥ ১৫০ ॥
ভক্তির প্রার্থনা শুনি প্রভু ভগবান ।
গাইতে লাগিলা গীত ভক্তির আখ্যান ॥ ১৫১ ॥
এইখানে এক কথা শুন বলি মন ।
প্রভুর নিকটে এল গেল অগণন ॥ ১৫২ ॥
কিন্তু কেহ করিল না ভক্তির প্রার্থনা ।
নিজের কেবল তাঁর আপ্তগণ বিনা ॥ ১৫৩ ॥
প্রভুর গণের মধ্যে ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
ভক্তির কুঠরি তাঁর দিলেন খুলিয়ে ॥ ১৫৪ ॥
লীলায় এতেক কাল ছিল তালা আঁটা ।
এবারে ঘুচিল মায়া-জঞ্জালের লেঠা ॥ ১৫৫ ॥
আস্বাদ পাইয়া তাঁর চরণ-সরোজে ।
আসে যায় রহে মার কাছে মাঝে মাঝে ॥ ১৫৬ ॥
যোগীন-মায়ের মত মায়ের পিয়ারা ।
মার কাছে দোঁহে জয়া বিজয়ার পারা ॥ ১৫৭ ॥
মার আর প্রভুর চরণে গত মন ।
বারে বারে বন্দি দুই ভক্তের চরণ ॥ ১৫৮ ॥
ব্রাহ্মণীর পদদ্বয়ে অসংখ্য প্রণাম ।
প্রভুর সংসারে তাঁর গোলাপ-মা নাম ॥ ১৫৯ ॥
মার আর শ্রীপ্রভুর সেবা-ভক্তি আশা ।
সেবা-হেতু দোঁহাকার ধরাধামে আসা ॥ ১৬০ ॥
পশ্চাতে যতেক লীলা কৈলা গুণমণি ।
সেবা লয়ে সব ঠাঁই আছেন ব্রাহ্মণী ॥ ১৬১ ॥
পরে পরে পাইবে যতেক সমাচার ।
ভক্ত-সংজোটন-কাণ্ড ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ১৬২ ॥
এখানে নরেন্দ্রনাথ ভক্তের প্রধান ।
শিরোমণি শ্রীপ্রভুর তাঁর বড় টান ॥ ১৬৩ ॥
টানের স্বভাব কিবা কহিবার নয় ।
শুনহ সংক্ষেপে কিছু কিছু পরিচয় ॥ ১৬৪ ॥
একদিন প্রভুদেব সুরধুনী-তটে ।
বিমরষ চাঁদনির অত্যন্ত নিকটে ॥ ১৬৫ ॥
দাঁড়ায়ে আছেন গঙ্গাপানে লক্ষ্য করি ।
এমন সময় ঘাটে লাগে এক তরী ॥ ১৬৬ ॥
সকৌতুকে সতৃষ্ণনয়নে প্রভুরায় ।
নেহারেন তরীযোগে কে আসে হেথায় ॥ ১৬৭ ॥
তরীতে নরেন্দ্রনাথ জীবন প্রভুর ।
দেখিয়া আনন্দে নৃত্য করেন ঠাকুর ॥ ১৬৮ ॥
বিমরষ অশান্তি সকল দূরীভূত ।
প্রফুল্ল শ্রীমুখ ফুল্ল-কমলের মত ॥ ১৬৯ ॥
ইহার পশ্চাতে যদি জাহ্নবীর জলে ।
জলযান পানসি কি তরণী দেখিলে ॥ ১৭০ ॥
বলিতেন প্রভুদেব এই অনুমানে ।
নরেন্দ্র ইহাতে বুঝি আসিছে এখানে ॥ ১৭১ ॥
প্রাণাধিক ভালবাসা অসীম মমতা ।
নরেন্দ্রের প্রতি যেন হেন নহে কোথা ॥ ১৭২ ॥
নরেন্দ্রে মমতা স্নেহ করে যেই জন ।
বড়ই সদয় তারে প্রভু নারায়ণ ॥ ১৭৩ ॥
হতাদর কিংবা নিন্দাবাদ যেবা করে ।
শ্রীপ্রভুর বিড়ম্বনা তাহার উপরে ॥ ১৭৪ ॥
কপালের ফের শুন এক বিবরণ ।
জনাইয়ের প্রাণকৃষ্ণ মুখুয্যে ব্রাহ্মণ ॥ ১৭৫ ॥
উচ্চপদে অভিষিক্ত বসতি শহরে ।
শ্রীপ্রভুর অন্ন-ভিক্ষা হৈল যার ঘরে ॥ ১৭৬ ॥
অহংকারে এইবার পড়িল প্রমাদে ।
প্রভুর নিকটে নরেন্দ্রের নিন্দাবাদে ॥ ১৭৭ ॥
শুনিয়া বিষাদে ফাটে শ্রীপ্রভুর বুক ।
দেখিতে না চান আর মুখুয্যের মুখ ॥ ১৭৮ ॥
দূরদৃষ্ট প্রাণকৃষ্ণ মহাভাগ্যবান ।
ভক্ত-অপরাধ দোষে না পায় এড়ান ॥ ১৭৯ ॥
বজরা সাজায়ে আম সুপক্ক ফজলি ।
ব্রাহ্মণ প্রভুর কাছে পাঠাইল ডালি ॥ ১৮০ ॥
প্রভুর নয়নে ডালি বিষের মতন ।
ফিরাইয়া দিলা তাহা আইল যেমন ॥ ১৮১ ॥
পরমাদে প্রাণকৃষ্ণ তাড়াতাড়ি ছুটে ।
দক্ষিণশহরে শ্রীপ্রভুর সন্নিকটে ॥ ১৮২ ॥
উতরিয়া পুরীমধ্যে প্রাণ কাঁপে ডরে ।
প্রভুর মন্দিরে আর প্রবেশিতে নারে ॥ ১৮৩ ॥
বিচারিয়া মনে মনে ভাবিয়া উপায় ।
পুরীর খাজাঞ্চি যেবা তার কাছে যায় ॥ ১৮৪ ॥
কাকুতি সহিত কহে যতেক ঘটনা ।
অসন্তুষ্ট প্রভুদেব সেহেতু ভাবনা ॥ ১৮৫ ॥
জমিদার প্রাণকৃষ্ণ লোক জানা নাম ।
খাজাঞ্চি করিল তাঁর বিশেষ সম্মান ॥ ১৮৬ ॥
মধ্যস্থ স্বরূপ গিয়া শ্রীপ্রভুর কাছে ।
নিবেদিন প্রাণকৃষ্ণ কৃপাদৃষ্টি যাচে ॥ ১৮৭ ॥
আবেদনে শ্রীপ্রভুর অঙ্গে জ্বালাতন ।
অপরাধ কোনমতে না হয় ভঞ্জন ॥ ১৮৮ ॥
বাহুল্যে বাখান করে আগোটা পুরাণ ।
চিরকাল ভক্তের কেবল ভগবান ॥ ১৮৯ ॥
প্রত্যক্ষ প্রমাণ আজি শ্রীপ্রভুর কাজে ।
ভক্তাবমাননা তাঁর বাজ সম বাজে ॥ ১৯০ ॥
প্রিয় যেবা শ্রীপ্রভুর নিন্দাবাদ তাঁর ।
নরেন্দ্র মাথার মণি প্রভুর আমার ॥ ১৯১ ॥
নরেন্দ্রের প্রভুদেব প্রভুর নরেন্দ্র ।
দুঁহু জনে পরস্পর বিচিত্র সম্বন্ধ ॥ ১৯২ ॥
প্রভুদেবে সম্মানসূচক সম্ভাষণ ।
করিলে নরেন্দ্র তাঁর তুষ্ট নহে মন ॥ ১৯৩ ॥
বলিতেন প্রভুদেব পরম ঈশ্বর ।
নরেন্দ্রের দেহে মোর শ্বশুরের ঘর ॥ ১৯৪ ॥
যেই পাত্রে রহে জল পদ-প্রক্ষালনে ।
নরেন্দ্র ছুঁইলে তাহা কোন প্রয়োজনে ॥ ১৯৫ ॥
শ্রীপ্রভুর ব্যবহার নাহি হয় আর ।
বুঝ মন কি সম্বন্ধ আছিল দোঁহার ॥ ১৯৬ ॥
অতি উচ্চ বস্তু তেঁহ কি বুঝিব তাঁয় ।
ধরিয়া সংসারী বুদ্ধি সতত মাথায় ॥ ১৯৭ ॥
যোগীন্দ্র দেবেন্দ্রাদির নরেন্দ্র দেবতা ।
নরেন্দ্রে নরেন্দ্র নাম অতি ক্ষুদ্র কথা ॥ ১৯৮ ॥
বিশ্বজন-পূজনীয় প্রভুভক্তগণ ।
পদরজ তাঁহাদের করিয়া ধারণ ॥ ১৯৯ ॥
গাইতে যখন লীলা লইয়াছি ব্রতী ।
শুন কই নরেন্দ্রের স্বরূপ ভারতী॥ ২০০ ॥
এক দিন বলিছেন প্রভু বাঁকা-আঁখি ।
নরেন্দ্র লীলায় আনা প্রয়োজন দেখি ॥ ২০১ ॥
হৃষ্টমনে অন্বেষণে নিজে আমি যাই ।
সপ্তর্ষিমণ্ডলে (?) তার যোগাসন ঠাঁই ॥ ২০২ ॥
দেখিলাম সমাধিস্থ মুখে ভাতি খেলে ।
মনখানি একেবারে সর্ব উচ্চে তুলে ॥ ২০৩ ॥
কাছে গিয়া বার বার করি আবাহন ।
কোনমতে নিম্নদেশে নাহি নামে মন ॥ ২০৪ ॥
তথাপি না ছাড়ি তায় ডাকি উচ্চৈঃস্বরে ।
নিরখিল একবার পলকের তরে ॥ ২০৫ ॥
গম্ভীর প্রশান্ত ভাব ভুবনে অতুল ।
রক্তিম বিশাল আঁখি যেন জবাফুল ॥ ২০৬ ॥
সমাধি প্রবল সাধ শান্তির আশ্রম ।
পূর্ববৎ পুনরায় ধিয়ানে মগন ॥ ২০৭ ॥
অতি প্রয়োজন তাঁয় ধরার আসরে ।
তাই তীক্ষ্ণ আকর্ষণ করিলাম পরে ॥ ২০৮ ॥
শক্তিমান যোগেশ্বর মহাতেজ গায় ।
আংশিক কেবলমাত্র আসিল ধরায় ॥ ২০৯ ॥
সেই অল্প অংশে এই নরেন্দ্র মূরতি ।
আসিলে আগোটা হত টলমল ক্ষিতি ॥ ২১০ ॥
নরেন্দ্রের মত হেন প্রকাণ্ড আধার ।
আসে নাই আসিবে না কভু পরে আর ॥ ২১১ ॥
তেজঃপুঞ্জকলেবর শক্তি রাশি রাশি ।
বিবেক বিরাগে ভরা প্রেমিক সন্ন্যাসী ॥ ২১২ ॥
বড়ই সুখের দিন নরেন্দ্র রাখাল ।
ভিক্ষায় মাগিয়া অন্ন কাটাইবে কাল ॥ ২১৩ ॥
নরেন্দ্রের কলেবরে সন্ন্যাসীর বেশ ।
দেখিতে বড়ই তুষ্ট প্রভু পরমেশ ॥ ২১৪ ॥
নরেন্দ্র ছিলেন যবে কেশবের দলে ।
নব-বৃন্দাবন বহি অভিনয়কালে ॥ ২১৫ ॥
সন্ন্যাসীর অভিনয়ে ভার ছিল তার ।
শুনিয়া অপারানন্দ প্রভুর আমার ॥ ২১৬ ॥
ভক্তগণে বলিলেন আনন্দ-অন্তর ।
অভিনয়-দরশনে চলহ সত্বর ॥ ২১৭ ॥
রঙ্গালয়ে যথাক্ষণে গমন হরিষে ।
দেখিবারে প্রিয়বরে সন্ন্যাসীর বেশে ॥ ২১৮ ॥
আসরেতে উপনীত নরেন্দ্র যখন ।
অঙ্গে সন্ন্যাসীর সাজ অতি সুশোভন ॥ ২১৯ ॥
সন্তোষের নাহি সীমা প্রভু ভগবান ।
লোকের দ্বারায় তাঁরে বলিয়া পাঠান ॥ ২২০ ॥
ত্বরান্বিতে তাঁহার সকাশে যেন আসে ।
নয়নরঞ্জন সাজ সন্ন্যসীর বেশে ॥ ২২১ ॥
শুনিয়া প্রভুর আজ্ঞা সজ্জা সহ গায় ।
আইল নরেন্দ্রনাথ শ্রীপ্রভু যেথায় ॥ ২২২ ॥
শ্রীবদনে মৃদু হাসি অপরূপ খেলে ।
নরেন্দ্রে করেন প্রীতি প্রেমের বিহ্বলে ॥ ২২৩ ॥
সুন্দর সন্ন্যাস-সাব্জ অঙ্গ আভরণ ।
ধর দেহে আর নাহি কর বিমোচন ॥ ২২৪ ॥
বলিয়াছি বার বার শ্রীপ্রভুর ধারা ।
যাঁহার যেমন ভাব তাই রক্ষা করা ॥ ২২৫ ॥
ত্যাগী অনাসক্ত ভাব পোঁতা যাঁর ঘটে ।
প্রখর ত্যাগের তত্ত্ব তাঁহার নিকটে ॥ ২২৬ ॥
কাহার কি রসে হয় ভাব পুষ্টিকর ।
বুঝিতে সুপটু প্রভু রসের সাগর ॥ ২২৭ ॥
বাল্যকথা বলিয়াছি নরেন্দ্রের আগে ।
জন্মাবধি সাধ ত্যাগ বিবেক বিরাগে ॥ ২২৮ ॥
বিষয় ত্যাগের ভাব তাঁহার আধারে ।
প্রকৃতির প্রকৃতি যাহাতে শূন্যে উড়ে ॥ ২২৯ ॥
অষ্টাঙ্গে অপার বল বলময় মন ।
মূর্তিমান জঠরে বিরাজে হুতাশন ॥ ২৩০ ॥
মহাবলী পাকস্থলী এত শক্তি ধরে ।
সৃষ্টি-বিনাশক পাপে পরিপাক করে ॥ ২৩১ ॥
পাপেতে অর্জিত অর্থ করি বিনিময় ।
ভোজ্যদ্রব্য যদি তাহে কেহ করি ক্রয় ॥ ২৩২ ॥
প্রভুর নিকটে দেয় পাঠাইয়া ডালি ।
যতনে শ্রীপ্রভুদেব বাঁধিয়া পুটুলি ॥ ২৩৩ ॥
প্রেরণ করেন সব নরেন্দ্রের কাছে ।
পরিপাক করিবার শক্তি যাঁর আছে ॥ ২৩৪ ॥
হিন্দুমতে যেই দ্রব্য খাইতে বারণ ।
নরেন্দ্র প্রত্যহ তাহা করেন ভক্ষণ ॥ ২৩৫ ॥
একদিন একজন প্রভুর নিকটে ।
নরেন্দ্রের অনাচার-কথা গিয়া রটে ॥ ২৩৬ ॥
উত্তর তাহার কৈলা প্রভু গুণমণি ।
নরেন্দ্রের ইহাতে হবে না কোন হানি ॥ ২৩৭ ॥
নরেন্দ্রের সংসারের অবস্থা এমন ।
অর্থাভাবে অতি কষ্ট পায় পোষ্যগণ ॥ ২৩৮ ॥
উপার্জনে যদি চেষ্টা করেন নরেন্দ্র ।
মঙ্গল দূরের কথা তাহে বাড়ে মন্দ ॥ ২৩৯ ॥
অখিলের পতি প্রভুদেব ভগবান ।
নরেন্দ্র নিজের তাঁর পরান-সমান ॥ ২৪০ ॥
সেহেতু দিনেক কেহ প্রভুর নিকট ।
জানাইল নরেন্দ্রের অবস্থা-সঙ্কট ॥ ২৪১ ॥
অর্থাভাবে অতিশয় কষ্ট প্রতিদিন ।
নিরানন্দ মগ্ন সদা বদন মলিন ॥ ২৪২ ॥
তদুত্তরে প্রভুদেব বলিলেন তায় ।
মৃগেন্দ্র যদ্যপি নিত্য খাইবারে পায় ॥ ২৪৩ ॥
প্রবল প্রতাপে তার পরমাদ গণি ।
উলট্ পালট্ হবে গোটা অরণ্যানী ॥ ২৪৪ ॥
নরেন্দ্রের কলেবরে অপার শকতি ।
উদরে যদ্যপি অল্প পায় নিতি নিতি ॥ ২৪৫ ॥
ধরাতলে অবহেলে করিবে প্রচার ।
নিজের ইচ্ছায় ভাব ছত্রিশ প্রকার ॥ ২৪৬ ॥
আয়ত্তে রাখিতে অশ্বে অতি বলবান ।
মুখে যেন রহে জোড়া কাঁটার লাগাম ॥ ২৪৭ ॥
সেইমত নরেন্দ্রের অর্থাভাব ঘরে ।
আটকে রাখিতে তাঁয় সীমার ভিতরে ॥ ২৪৮ ॥
দিনেক প্রভুর কাছে বিষণ্ণ হইয়া ।
অর্থাভাব শ্রীনরেন্দ্র জানাইল গিয়া ॥ ২৪৯ ॥
উত্তরে কহেন প্রভু মলিন বদন ।
টাকা কিংবা ছেলে হবে ইহার কারণ ॥ ২৫০ ॥
প্রার্থনা কাহারও জন্যে মায়ের নিকটে ।
কহিতে না পারি মুখে বাক্য নাহি ফুটে ॥ ২৫১ ॥
প্রত্যুত্তরে প্রভুদেবে শ্রীনরেন্দ্র কন ।
নৈকট্য সম্বন্ধে তেজ গায়ে বিলক্ষণ ॥ ২৫২ ॥
পাদপদ্মে মগ্ন মন প্রেম সহকারে ।
কৃষ্ণ করিলেন পণ পাণ্ডব-সমরে ॥ ২৫৩ ॥
থাকিব সারথি-বেশে অর্জুনের রথে ।
কিন্তু কভু ধরিব না ধনুর্বাণ হাতে ॥ ২৫৪ ॥
জগতের সখা কৃষ্ণ কহিলে এমন ।
ক্রোধান্বিত-কলেবর রক্তিম-লোচন ॥ ২৫৫ ॥
প্রতিপণ করি ভীষ্ম তেজঃপুঞ্জ-তনু ।
সমরে বাঁশরীধরে ধরাইল ধনু ॥ ২৫৬ ॥
সেইমত প্রতিপণ করিনু হেথায় ।
কালীরে কহাব আমি তোমার দ্বারায় ॥ ২৫৭ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু নারায়ণ ।
ভক্তের নিকটে তাঁর নাহি রহে পণ ॥ ২৫৮ ॥
মৌন রহি কিছুক্ষণ বলিলেন পরে ।
ঝটিতি প্রবেশ কর কালীর মন্দিরে ॥ ২৫৯ ॥
মনের বাসনা যাহা জানাও তাঁহায় ।
অবশ্য হইবে পূর্ণ কালীর কৃপায় ॥ ২৬০ ॥
চলিলা নরেন্দ্রনাথ শুনিয়া শ্রীবাণী ।
যে মন্দিরে বিরাজেন জগৎ-জননী ॥ ২৬১ ॥
নিরখিয়া মায়ে দুঃখ ভুলিয়া সকল ।
ঢালিতে লাগিলা খালি দুনয়নে জল ॥ ২৬২ ॥
পশ্চাতে প্রার্থনা কৈলা অনুরাগভরে ।
বিবেক বৈরাগ্য মাতা ভিক্ষা দেহ মোরে ॥ ২৬৩ ॥
অশ্রুজলে মাথা আঁখি ফিরিলা সত্বর ।
তমোহর বিশ্বগুরু প্রভুর গোচর ॥ ২৬৪ ॥
কি মাগিলে প্রভুদেব জিজ্ঞাসিলে পরে ।
হৃদয়ে উচ্ছ্বাস ভরা বাক্য নাহি সরে ॥ ২৬৫ ॥
গদগদম্বরে কন প্রেমিক সন্ন্যাসী ।
বিবেক বৈরাগ্যদ্বয় যাহা ভালবাসি ॥ ২৬৬ ॥
বড় খুশী প্রভুদেব শুনিয়া উত্তর ।
করিতে লাগিল নৃত্য আনন্দ-অন্তর ॥ ২৬৭ ॥
যেন ভোলা যোগেশ্বর বাঘাম্বরধারী ।
ত্যাগ-যোগ-তত্ত্ব-তোষ চিতাস্থলচারী ॥ ২৬৮ ॥
ত্যাগী জনে বড় তুষ্ট প্রভু গুণধর ।
প্রাণের অধিক তাঁরে মমতা আদর ॥ ২৬৯ ॥
কহিতে ত্যাগের কথা খুশী প্রভুরায় ।
ত্যাগ-উপদেশ উক্তি কথায় কথায় ॥ ২৭০ ॥
বিশেষে সংসারী দ্বারা সংসার আশ্রমে ।
মহোল্লাসে করে বাস ত্রাস নাহি মনে ॥ ২৭১ ॥
সঙ্গে লয়ে সর্বদাই দিবা-বিভাবরী ।
কামিনী-কাঞ্চনদ্বয় কাল-বিষধরী ॥ ২৭২ ॥
কামিনী-কাঞ্চনে খালি সংসার-আশ্রম ।
তিয়াগিয়া দূরে থাক সংসারে কেমন ॥ ২৭৩ ॥
জিজ্ঞাসিলে যদি কথা শুন সবিশেষ ।
উপায়-বিধান কিবা দিলা পরমেশ ॥ ২৭৪ ॥
অবিদ্যা লইয়া বাস সংসারের মাঝে ।
সাবধান যেন তাহে মন নাহি মজে ॥ ২৭৫ ॥
শ্রীগুরু-চরণে মগ্ন রাখি মনখানি ।
হাতে-পায়ে কর কর্ম হইবে না হানি ॥ ২৭৬ ॥
বিষয়ে ইন্দ্রিয়-যোগ ইন্দ্রিয়েতে মন ।
কর্ম হয় এই তিনে হইলে মিলন ॥ ২৭৭ ॥
বিষয় হইতে মন রাখিয়া পৃথক্ ।
কেমনে হইবে কর্মী কর্মেতে পারক ॥ ২৭৮ ॥
ইহার উত্তরে প্রভু দিলা দেখাইয়ে ।
চিড়া কুটে আটপিঠে ছুতরের মেয়ে ॥ ২৭৯ ॥
বাম হাতে ভাজে ধান খোলার উননে ।
দক্ষিণে করিছে কাজ ভয়ঙ্কর স্থানে ॥ ২৮০ ॥
পদে পদে যেইখানে আশঙ্কার লেঠা ।
গড়ের ভিতরে যেথা চিড়া যায় কুটা ॥ ২৮১ ॥
ধান চিড়ে তুলে পাড়ে যথাস্থানে রাখে ।
দুগ্ধপোষ্য ছাওয়ালেরে মাই দেয় মুখে ॥ ২৮২ ॥
বুকের মাঝেতে ছেলে কোলের শয্যায় ।
কাঁদিলে করিতে শান্ত কোলেতে নাচায় ॥ ২৮৩ ॥
সম্মুখে দণ্ডায়মান খদ্দেরনিচয় ।
চিড়ার হিসাব সব সেই সঙ্গে হয় ॥ ২৮৪ ॥
বলিহারি বাহাদুরি অভ্যাস কেমন ।
একসঙ্গে নানা কর্ম করে একজন ॥ ২৮৫ ॥
মনখানি কিছু কিছু সকল বিভাগে ।
গড়ের ভিতরে কিন্তু অধিকাংশ জাগে ॥ ২৮৬ ॥
পদে পদে যেই স্থলে আশঙ্কার লেঠা ।
পড়িলে মুণ্ডলি হাতে হাত যাবে কাটা ॥ ২৮৭ ॥
সেইমত সংসারীর অতি প্রয়োজন ।
শ্রীগুরুচরণে রাখি অধিকাংশ মন ॥ ২৮৮ ॥
অতি অল্পমাত্র রবে সংসারের কাজে ।
তাও যেন অবিদ্যায় কখন না মজে ॥ ২৮৯ ॥
সংসারী সতর্কভাবে রবে নিরবধি ।
মায়া মোহে মনে রক্ষা শ্রীপ্রভুর বিধি ॥ ২৯০ ॥
সংসারীর প্রাণাপেক্ষা প্রিয় টাকাকড়ি ।
বিষয়-সম্পত্তি মান কুমার-কুমারী ॥ ২৯১ ॥
দিবারাত্রি থাকি লিপ্ত সংসর্গে সবার ।
মায়ামোহ নষ্ট করা কঠিন ব্যাপার ॥ ২৯২ ॥
উপায়-বিধানে উক্তি বড়ই সুন্দর ।
শুন কই দিলা যাহা শ্রীপ্রভু ঈশ্বর ॥ ২৯৩ ॥
ধনাঢ্য লোকের ঘরে দাসীর মতন ।
যাহাকে অনেক কর্মে ভার সমর্পণ ॥ ২৯৪ ॥
হাটে বাটে যায় কিনে যাহা দরকার ।
লালে পালে মুনিবের কুমারী-কুমার ॥ ২৯৯ ॥
মায়ের মতন ঠিক যতনের ভরে ।
মল-মূত্র-পরিষ্কারে ঘৃণা নাহি করে ॥ ৩০০ ॥
কিন্তু জানে মনে মনে এই টাকাকড়ি ।
প্রাসাদের তুল্যমূল্য বালাখানা বাড়ি ॥ ৩০১ ॥
নন্দন-নন্দিনীগুলি দ্রব্য রাশি রাশি ।
তার নয় মুনিবের সে কেবল দাসী ॥ ৩০২ ॥
তেমতি সংসারী রবে সংসার আশ্রমে ।
ধনীর দাসীর মত নিরাসক্ত মনে ॥ ৩০৩ ॥
বিশেষিয়া বিচারিয়া যুক্তি করি সার ।
মালিক ঈশ্বর খালি কর্মে তার ভার ॥ ৩০৪ ॥
ত্যাগাভ্যাস সংসারীর অতি প্রয়োজন ।
আসক্তির ফাঁদে যেন নাহি পড়ে মন ॥ ৩০৫ ॥
ত্যাগাভ্যাসে একমাত্র বিচার সহায় ।
বিবেক-বিচার-বুদ্ধি অতি স্ফূর্তি পায় ॥ ৩০৬ ॥
বিবেক প্রশান্তভাবে পাইলে সুপথ ।
তখন স্বতন্ত্র দুটি হয় সদসৎ ॥ ৩০৭ ॥
বিবেক করিলে নিজ কার্য-সমাপন ।
বৈরাগ্য আসিয়া সঙ্গে হয় সম্মিলন ॥ ৩০৮ ॥
দ্রুতগতি পবন যেমন গিয়া জুটে ।
প্রজ্বলিত দীপ্তিমান বহ্নির নিকটে ॥ ৩০৯ ॥
বিবেক-বৈরাগ্য যবে হৃদে বলবৎ ।
তিয়াগ তখন পায় নিজ কর্মে পথ ॥ ৩১০ ॥
তস্কর রিপুর গণ চর অবিদ্যার ।
প্রবেশিতে নাহি পারে হৃদয়ের দ্বার ॥ ৩১১ ॥
যায় জ্বালা ত্রিতাপের বাবড়া-অনল ।
দ্বেষ-হিংসা-মদাদির ভীষণ গরল ॥ ৩১২ ॥
ইন্দ্রিয়ের সুখ-সেব্য কর্মের প্রয়াস ।
কনক-লতার ক্রমে অবিদ্যার ফাঁস ॥ ৩১৩ ॥
ধীর স্থির চিরশান্তি অবিরত খেলে ।
তাপহর তিয়াগের বিশ্বজয়ী বলে ॥ ৩১৪ ॥
ব্যাপিয়া ভুবন গোটা মন ধরে কায়া ।
সর্বভূতে সমজ্ঞান সর্বজীবে দয়া ॥ ৩১৫ ॥
ঐকান্তিক দৃঢ়ভক্তি শ্রীগুরুচরণে ।
ইহাই কেবলমাত্র তিয়াগের মানে ॥ ৩১৬ ॥
শিক্ষা দিতে জীবগণে ত্যাগের মরম ।
অবতারে নরেন্দ্রের ধরায় জনম ॥ ৩১৭ ॥
বিষম তিয়াগ তাঁর ঈশ্বরের তরে ।
ক্রমশঃ কহিব কথা পুঁথির ভিতরে ॥ ৩১৮ ॥
জলন্ত বিশ্বাস ত্যাগে পায় দীপ্তিমান ।
আলো করি হৃদয়ের অতি গুপ্তস্থান ॥ ৩১৯ ॥
বিশ্বাসেতে অন্ধকার-সন্দ-বিমোচন ।
বিভুর মোহন মূর্তি প্রত্যক্ষ তখন ॥ ৩২০ ॥
ঘৃণা-লজ্জা-ভয় লয় হয় সেইক্ষণে ।
সঙ্গে লয়ে অহঙ্কার অরাতি ভীষণে ॥ ৩৩০ ॥
একেবারে নহে নষ্ট শুন পরিচয় ।
কিছু কিছু থাকে দেহ যতক্ষণ রয় ॥ ৩৩১ ॥
আগুনেতে ভস্মীভূত রজ্জুর মতন ।
আকারেতে রহে মাত্র না চলে বন্ধন ॥ ৩৩২ ॥
অহঙ্কার যতটুকু রহে বর্তমান ।
তখন তাহার হয় পাকা আমি নাম ॥ ৩৩৩ ॥
পাকা আমি দাস আমি প্রভুর আমার ।
কাঁচা আমি — আমি আমি মদ অহঙ্কার ॥ ৩৩৪ ॥
বড়ই সুন্দর দাস আমির চেহারা ।
বহে আমি কিন্তু আমি জীবন্তেতে মরা ॥ ৩৩৫ ॥
মরা বটে কিন্তু তার গায় এত বল ।
লোমে লোমে তুলে বাঁধে অটল অচল ॥ ৩৩৬ ॥
শুষে জল জলধির কেবল গণ্ড যে ।
কিংবা হয় লক্ষে পার চক্ষুর নিমিষে ॥ ৩৩৭ ॥
নাসার নিঃশ্বাসে রোধে পবনের গতি ।
চরণে চাপিয়া করে টলমল ক্ষিতি ॥ ৩৩৮ ॥
বিদারিয়া ধরাখণ্ডে অনন্তে কাঁপায় ।
হাতে ধরি দিনকরে বগলে ঢাকায় ॥ ৩৩৯ ॥
জলে স্থলে আকাশের শূন্যমাঝে তুলে ।
ঘটায় প্রলয়কাণ্ড প্রকৃতির কোলে ॥ ৩৪০ ॥
বিনাশে বিধির বিধি বিধি বিপর্যয় ।
প্রভুর কর্মেতে যদি প্রয়োজন হয় ॥ ৩৪১ ॥
পাকা আমি দাস আমি কাজে কাজে লাগে ।
কাঁচাটি যেমন শূন্য অঙ্কের বাঁদিগে ॥ ৩৪২ ॥
প্রথমের এত বল ভয়ে কাঁপে ধরা ।
দ্বিতীয় মদেতে পূর্ণ কাজে কিন্তু মরা ॥ ৩৪৩ ॥
আমি অনর্থের মূল আবরে নয়ন ।
মুক্তির পথের কাঁটা বিষম বন্ধন ॥ ৩৪৪ ॥
তিয়াগিলে খালি আমি সব লেঠা যায় ।
মায়া-মুগ্ধ জীবে আমি ছাড়িতে না চায় ॥ ৩৪৫ ॥
এই আমি অহঙ্কার-ভ্রম-বিমোচনে ।
কি করিলা প্রভুদেব শুন সাবধানে ॥ ৩৪৬ ॥
সাধনভজনকালে যৌবন দশায় ।
পুরীমধ্যে দুপুরে যতেক লোক খায় ॥ ৩৪৭ ॥
সবার উচ্ছিষ্ট পাতা মাথায় তুলিয়া ।
দিন দিন গঙ্গাকূলে দিতেন ফেলিয়া ॥ ৩৪৮ ॥
ইহাতেও কর্ম তাঁর নহে সমাধান ।
অবশেষে করিতেন পরিষ্কার স্থান ॥ ৩৪৯ ॥
উচ্ছিষ্টভোজন-পাত্র সাধু-মহান্তের ।
মার্জনে সাধনা কর্ম করিলেন ঢের ॥ ৩৫০ ॥
পাইখানা পরিষ্কার করিলা আপনি ।
শ্রীকরকমলে নিজে ধরিয়া মার্জনী ॥ ৩৫১ ॥
ভাল-মন্দ উচ্চ-নীচ বিচার বিহনে ।
সর্ব অগ্রে নমস্কার প্রতি জনে জনে ॥ ৩৫২ ॥
সরল শিশুর ভাব লইয়া আপনি ।
চলিছেন শ্রীবদনে তুহু তুহু ধ্বনি ॥ ৩৫৩ ॥
প্রত্যক্ষ জননী তাঁর কল্পনার নয় ।
লীলাপাঠে বিশেষিয়া পাবে পরিচয় ॥ ৩৫৪ ॥
কালীর সঙ্গেতে তাঁর সম্পর্ক এমন ।
দুগ্ধপোষ্য শিশু যেন মায়ের সদন ॥ ৩৫৫ ॥
কালী সকলের মূল সৃষ্টি প্রসবিনী ।
তাঁহার সকলে তিনি জগৎ-জননী ॥ ৩৫৬ ॥
মঙ্গলরূপিণী আদ্যাশক্তির ইচ্ছায় ।
হইতেছে সব
কার্য যা হয় যেথায় ॥ ৩৫৭ ॥
মানুষ চামের থলি থলির আধারে ।
পাইয়া শক্তির শক্তি তবে
কার্য করে ॥ ৩৫৮ ॥
কুমোরের জোরে তার চাকের মতন ।
ঘুরে গড়ে রকমারি মাটির বাসন ॥ ৩৫৯ ॥
কালীর রাজ্যেতে নাহি অমঙ্গল ঘটে ।
অহঙ্কারে জীব-বুদ্ধি ভাল-মন্দ রটে ॥ ৩৬০ ॥
বড়ই বিচিত্র কথা কখন না শুনি ।
নন্দনের মন্দ ইচ্ছা করেন জননী ॥ ৩৬১ ॥
যদ্যপিহ কদাচার সন্তান-সন্ততি ।
মঙ্গলকামনা মার খালি দিবারাতি ॥ ৩৬২ ॥
প্রকৃত জননী কালী কিছু কম নয় ।
জীবের ইহাতে নাই তিলার্ধ প্রত্যয় ॥ ৩৬৩ ॥
বিশ্বাস-ভক্তির তত্ত্ব দিতে জীবগণে ।
কি লীলা করিলা প্রভু শুন এক মনে ॥ ৩৬৪ ॥
শ্রবণ-কীর্তনে লীলা করিলে মন্থন ।
পাইবে ঔষধি ভব-ব্যাধি বিনাশন ॥ ৩৬৫ ॥
একদিন প্রভুর নিকটে কোন জন ।
কথায় কথায় করি কথা উত্থাপন ॥ ৩৬৬ ॥
বলিলেন বিশ্বমাতা করুণায় ভরা ।
জীবের সুখের জন্য সৃষ্টিখানি গড়া ॥ ৩৬৭ ॥
তদুত্তরে বলিলেন প্রভুদেবরায় ।
মায়ের কর্তব্য কর্ম দয়া কিবা তায় ॥ ৩৬৮ ॥
আপনার ছেলেপুলে পালেন জননী ।
ইহাতে করুণাময়ী কি প্রকারে তিনি ॥ ৩৬৯ ॥
বেদবাক্য অল্প কথা বহু মানে তায় ।
তেমতি বৃহৎ অর্থ শ্রীবাক্যে হেথায় ॥ ৩৭০ ॥
বিশেষিয়া প্রভুদেব কন এইখানে ।
মা তোমার তুমি মার সন্দ তায় কেনে ॥ ৩৭১ ॥
ছেলের কল্যাণ চিন্তা আপন ইচ্ছায় ।
বলিতে না হয় কিছু নিজে করে যায় ॥ ৩৭২ ॥
জননীরে তিয়াগিয়া কিংবা রাখি দূরে ।
জীবের দুর্গতি মাত্র শুদ্ধ অহংকারে ॥ ৩৭৩ ॥
অতি হীনবল জীব সঙ্কীর্ণ-আধার ।
শক্তি নাই শ্রীপ্রভুর বাক্য বুঝিবার ॥ ৩৭৪ ॥
সেইহেতু বিশ্বগুরু প্রভু নারায়ণ ।
কাজে কিবা দেখাইলা শুন বিবরণ ॥ ৩৭৫ ॥
কি সুন্দর শ্রীপ্রভুর শিখাবার ধারা ।
স-মনে শুনিলে যায় অহংকার মারা ॥ ৩৭৬ ॥
কালীর উপরে হয় বিশ্বাস তখন ।
প্রত্যক্ষ উদরে-ধরা মায়ের মতন ॥ ৩৭৭ ॥
আছিল কুক্কুরী এক পুরীর ভিতরে ।
বড় প্রিয় শ্রীপ্রভুর দণ্ডবৎ তারে ॥ ৩৭৮ ॥
তদুপরি প্রভুদেব বড়ই সদয় ।
শিকায় হাঁড়িতে লুচি থাকিত সঞ্চয় ॥ ৩৭৯ ॥
শুন কি হইল পরে সুন্দর ঘটনা ।
কুক্কুরী প্রসব করি এক গণ্ডা ছানা ॥ ৩৮০ ॥
কালবশে সুকঠিন রোগের সঞ্চার ।
লোকান্তরে গেল দেহ করি পরিহার ॥ ৩৮১ ॥
অনাথ শাবকগুলি মায়ের বিহনে ।
অনাহারে এক ঠাঁই রহে রেতে দিনে ॥ ৩৮২ ॥
এক দিন সেই দিকে প্রভুদেবরায় ।
করিছেন আগমন আপন ইচ্ছায় ॥ ৩৮৩ ॥
নিরখি অনাথনাথে শাবকসকলে ।
ছুটিয়া আসিয়া লুটে শ্রীচরণতলে ॥ ৩৮৪ ॥
কাঁইকুই মুখে শব্দ অব্যক্ত ভাষায় ।
জঠর-যাতনা যেন শ্রীপদে জানায় ॥ ৩৮৫ ॥
তুষিয়া আশ্বাস-বাক্যে শাবক নিকরে ।
ধীরে ধীরে ফিরিলেন আপন মন্দিরে ॥ ৩৮৬ ॥
কিছুক্ষণ পরে তার কোন এক জন ।
প্রভুর নিকটে কহে সবিস্ময় মন ॥ ৩৮৭ ॥
কুক্কুরী মরিয়া গেছে প্রসবিয়া ছানা ।
আজি কিন্তু দেখি এক অদ্ভুত ঘটনা ॥ ৩৮৮ ॥
অপর কুক্কুরী এক তাহার মতন ।
তেমতি চেহারা মুখ তেমতি বরন ॥ ৩৮৯ ॥
আসিয়াছে কোথা হতে না জানি সন্ধান ।
শাবকেরা করিতেছে দুগ্ধ তার পান ॥ ৩৯০ ॥
শুনিয়া বড়ই তুষ্ট প্রভুদেবরায় ।
বলিলেন সব হয় শ্যামার ইচ্ছায় ॥ ৩৯১ ॥
জগতের যেখানেতে যতবিধ প্রাণী ।
সকলে সমানচক্ষে দেখেন জননী ॥ ৩৯২ ॥
কালের সৃষ্টির আগে কালীর খাতায় ।
বিধিমত আছে লেখা প্রত্যেক পাতায় ॥ ৩৯৩ ॥
যতেক ঘটনাবলী হয় সৃষ্টিতলে ।
ভূত বর্তমান কিবা ভবিষ্যৎ কালে ॥ ৩৯৪ ॥
সকলের মূল কালী জননী সবার ।
মঙ্গলরূপিণী মূর্তি সৃষ্টির আধার ॥ ৩৯৫ ॥
এমন আনন্দময়ী মায়ের চেহারা ।
দেখিতে না পায় জীবে পথে দিশাহারা ॥ ৩৯৬ ॥
দ্বিতীয় নাহিক হেতু এক হেতু তার ।
হীন অহংকার বুদ্ধি লোচন আঁধার ॥ ৩৯৭ ॥
অহংকার কর নষ্ট জগৎ-জননী ।
সম্বল কেবলমাত্র চরণ দুখানি ॥ ৩৯৮ ॥
সহজে না ছাড়ে জীবে অহংকার আমি ।
প্রভুর বচনে শুন তাহার কাহিনী ॥ ৩৯৯ ॥
হীন হেয় পশু-জন্ম প্রাণীর ভিতরে ।
সেও নাহি ত্যজে আমি, আমি আমি করে ॥ ৪০০ ॥
দৃষ্টান্তে বাছুর যেন হইয়া প্রসব ।
জনমিবা মাত্র করে হাম্বা হাম্বা রব ॥ ৪০১ ॥
বয়স হইলে বৃদ্ধি যৌবন-দশায় ।
ভয়াবহ কাজে করে নিযুক্ত চাষায় ॥ ৪০২ ॥
দিন রাত্রি খাটায় গলায় দিয়া রশি ।
ভোজ্যদ্রব্য চুনি খড় ঘাস খোল ভুসি ॥ ৪০৩ ॥
বার্ধক্যেও সেই শ্রম চলে অবিরাম ।
যতক্ষণ আছে প্রাণ না পায় ছাড়ান ॥ ৪০৪ ॥
দুরবস্থা একশেষ প্রায় প্রাণনাশ ।
আমিত্ব না যায় তবু দেহে করে বাস ॥ ৪০৫ ॥
মরিলে চামার তার চর্মখানি তুলে ।
সতেজ চুনের জল কষে দেয় ফেলে ॥ ৪০৬ ॥
পাকিয়া উঠিলে খাল তুলে পুনরায় ।
প্রখর সূর্যের তাপে সময়ে শুকায় ॥ ৪০৭ ॥
বিশুষ্ক নীরস যবে হয় একবারে ।
ধারাল বাদারি দিয়া খণ্ড খণ্ড করে ॥ ৪০৮ ॥
সবল আঘাতে চর্ম করি পরিসর ।
ছাউনি করিয়া বাঁধে ঢাকের উপর ॥ ৪০৯ ॥
ঢাকের বেতের কাঠি তাহার দ্বারায় ।
পিটিয়া যখন ঢাক বাজনা বাজায় ॥ ৪১০ ॥
তখন না যায় আমি আমি তায় থাকে ।
আঘাতে আঘাতে বাদ্য হাম্ হাম্ ডাকে ॥ ৪১১ ॥
তবে যবে চর্মকার লয়ে দু'ড়ি আঁত ।
পাক দিয়া করে দড়ি কহে যারে তাঁত ॥ ৪১২ ॥
সেই অতি শক্ত তাঁত ধুনুরী যখন ।
নিজে যন্ত্রে জ্যার মত করি সংযোজন ॥ ৪১৩ ॥
তদুপরি মুদার প্রহারে মুহুর্মুহুঃ ।
তখন ছাড়িয়া আমি বলে তুঁহু তুঁহু ॥ ৪১৪ ॥
ঈশ্বরের অনুগ্রহে আমি যায় যার ।
তথাপিহ দেহ-পাত্রে গন্ধ থাকে তার ॥ ৪১৫ ॥
যে প্রকার উপমায় রশুনের বাটি ।
শতবার ধৌত তবু নাহি হয় খাঁটি ॥ ৪১৬ ॥
হাজার মরিলে আমি নিশানা না মুছে ।
ছাড়িলে তালের বাল্ক দাগ থাকে গাছে ॥ ৪১৭ ॥
দেহেতে থাকিতে হেন আমিত্বের বাসা ।
কাহারও কিছুই নাই কল্যাণের আশা ॥ ৪১৮ ॥
বিধিমতে দেখাইলা প্রভুদেবরায় ।
শুন রামকৃষ্ণ-লীলা অকিঞ্চনে গায় ॥ ৪১৯ ॥