চতুর্থ খণ্ড
সিঁতির ব্রাহ্ম সমাজে প্রভুর গমন
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
বেণীপাল ভাগ্যবান্, জনগণে খ্যাত নাম,
পল্লীগ্রাম সিঁতিতে বসতি ।
সুন্দর আবাস-গৃহ, ব্রাহ্মদল-ভুক্ত তেঁহ,
প্রভুপদে বড়ই পিরীতি ॥ ১ ॥
বর্ষে বর্ষে দুইবার, ব্রাহ্মোৎসব ঘরে তাঁর,
বহু ভক্ত করে নিমন্ত্রণ ।
আজি উৎসবের দিনে, সমাগত বহু জনে,
পরিপূর্ণ উদ্যান ভবন ॥ ২ ॥
ব্রাহ্মগণ শহরের, উৎসবে মিশেছে ঢের,
টের করা সহজে না যায় ।
সকলের মুখপাত, শাস্ত্রপাঠী শিবনাথ,
বিদ্যাবল বহু ধরে গায় ॥ ৩ ॥
সদবুদ্ধি সত্ত্বগুণে, প্রভুদেবে বড় মানে,
গুণগ্রাহী যুবক সজ্জন ।
স্বভাবতঃ তত্ত্বান্বেষী, সরল সুমিষ্টভাষী,
সৎপথে সদা বিচারণ ॥ ৪ ॥
উদার
সরল-চিত্ত,
ব্রহ্মগুণগানে মত্ত,
দিবারাত্র উন্মত্তের প্রায় ।
সঙ্গে ব্রাহ্মভ্রাতাগণ, উৎকণ্ঠিত প্রাণ-মন,
উপবিষ্ট আছেন সভায় ॥ ৫ ॥
ফটিক পিয়াস রাখি, যেমন চাতক পাখী,
ঘন ঘন ঘন-পানে চায় ।
তেমতি ভক্তের পাঁতি, নিরখে নয়ন পাতি,
যে পথে আসিবে প্রভুরায় ॥ ৬ ॥
পান করি কথামৃত, জুড়াবে ভূষিত চিত,
এই সাধ বলবৎ মনে ।
নিমন্ত্রণ আছে তাঁর, এই শুভ সমাচার,
সকলেই শুনিয়াছে কানে ॥ ৭ ॥
আশা সন্দ হেলে দুলে, সকল অন্তরে খেলে,
ক্ষণে ফুল ক্ষণে ক্ষুন্ন ধারা ।
এমন সময় তবে, শুনিতে পাইল সবে,
ফটকেতে শকটের সাড়া ॥ ৮ ॥
শকট হইতে নামি, দেখা দিলা গুণমণি,
বিশ্বস্বামী প্রভু গুণধাম ।
নয়ন-আনন্দকর,
কি মূরতি মনোহর,
হেরিলে হরয়ে মন-প্রাণ ॥ ৯ ॥
নয়নের প্রিয় রূপ, রূপহীনে অপরূপ,
স্বরূপ তুলনা তিনি নিজে ।
নাহি আর উপমায়, চাঁদই চাঁদের প্রায়,
সরোজত্ব কেবল সরোজে ॥ ১০ ॥
আঁখির লালসা ঠাম, নিরখিয়া মূর্তিমান,
বিদ্যমান যে ছিল তথায় ।
ত্বরান্বিতে চারিধারে, বন্দিয়া বেষ্টন করে,
ভক্তিভরে নমিয়া তাঁহায় ॥ ১১ ॥
প্রতি-অভ্যর্থনাদানে, প্রভুদেব জনে জনে,
পরিতোষ করেন সকলে ।
ঘর-বার পরিপূর্ণ, চারিদিকে
লোকাকীর্ণ,
জনতার কথা কেবা বলে ॥ ১২ ॥
প্রভুর মহিমাভরে, আনন্দ উথলি পড়ে,
আনন্দ-আধার তনুখানি ।
দুহাস্য-সহকারে, আসন গ্রহণ পরে,
করিলেন অখিলের স্বামী ॥ ১৩ ॥
রূপের ঠাকুরে দেখি, সেখানে যতেক আঁখি,
একবারে হয়ে বিমোহন ।
নিরখে শ্রীপ্রভুরায়, বিভোর চকোর ন্যায়,
নিশিনাথে করি দরশন ॥ ১৪ ॥
রূপের রসের খনি, অতুল শ্রীমুখখানি,
অন্যে কোথা শ্রীবয়ান বই ।
দেখিনু যা কর খাঁটি, মটা মেঠো মূর্খ বটি,
বাতিকে বাতুল কিন্তু নই ॥ ১৫ ॥
বহু ভক্ত সমাগমে, একত্রিত এক স্থানে,
নিরীক্ষণে লীলার ঈশ্বর ।
আনন্দে উতলা চিতে, সম্বোধিয়া শিবনাথে,
করিলেন পরম আদর ॥ ১৬ ॥
অমৃতবরর্ষী ভাষ, শ্রীমুখে মধুর হাস,
সম্ভাষে রসের ঢলাঢলি ।
রঙ্গসহ প্রভু কন, দেখিয়া ভক্তের গণ,
অন্তরে অপার কুতূহলী ॥ ১৭ ॥
গাঁজাখোরে গাঁজাখোরে, জুটে যদি একত্তরে,
পরস্পরে তুষ্ট যে রকম ।
তেমতি ভক্তের ধারা, পায় প্রীতি হৃদিভরা,
ভক্তসঙ্গে হইলে মিলন ॥ ১৮ ॥
সংসারে নিমগ্ন মন, দেখি যদি কোন জন,
পুরীমধ্যে দক্ষিণশহরে ।
দেখিতে তাহারে বলি, পুরীর মন্দিরগুলি,
উদ্দীপনা করিবার তরে ॥ ১৯ ॥
বদ্ধজীব সংসারীরা, কামিনী-কাঞ্চনে যারা,
সারা জ্বারা আসক্তির বিষে ।
তাদিকে লইতে নাম, বলিলে না পাতে কান,
কথার মধ্যেতে নাহি পশে ॥ ২০ ॥
গৌর নিতাই তাই, নদীয়ায় দুই ভাই,
যুকতি করিয়া সংগোপনে ।
হরিনাম লওয়াইতে, বিষয়ে প্রমত্ত চিতে,
প্রলোভন দিলা হরিনামে ॥ ২১ ॥
মাগুর মাছের ঝোল,
যুবতী মেয়ের কোল,
বল হরি হরি হরি বোল ।
সুন্দর বিধান জারি, দেখে সবে বলে হরি,
আর নাহি করে কোন গোল ॥ ২২ ॥
নামের মাহাত্ম্যজোরে, ক্রমশঃ বুঝিল পরে,
ঝোল কথা নয়নের বারি ।
যুবতীর কোল হেথা, ভূমেতে লুটায়ে মাথা,
তাহার উপরে গড়াগড়ি ॥ ২৩ ॥
নামের মাহাত্মারাশি, চৈতন্য জানেন বেশী,
বলিতেন প্রচারের কালে ।
হরিনাম যেই জন, মুখে করে উচ্চারণ,
সময়ে তাহার ফল ফলে ॥ ২৪ ॥
বীজ তোলা ছিল ঘরে, তাহার অনেক পরে,
ভূমিসাৎ হইলে ভবন ।
পেয়ে উপযুক্ত স্থল, খাঁটি মাটি তাপ জল,
বীজ করে অঙ্কুর-উদ্গম ॥ ২৫ ॥
পরে বৃক্ষে পরিণত, শাখাপ্রশাখাদি কত,
অতুল্য মুকুল-সহ ফল ।
হরিনামে তেন হয়, সদ্যাঙ্কুর যদি নয়,
কালে ফলে না হয় বিফল ॥ ২৬ ॥
ভক্তি-তত্ত্ব বিশেষিয়া, কন প্রভু বিবরিয়া,
মুগ্ধ মন ব্রাহ্ম-ভক্তগণে ।
ভক্তির লক্ষণ রীতি, এক ভক্তি তিন জাতি,
ভিন্ন করে সত্ব রজঃ তমে ॥ ২৭ ॥
সত্ত্বগুণে অতি গুপ্ত, বাহ্যে নাহি কিছু ব্যক্ত,
কর্মমালা গোপনে গোপনে ।
রজে আড়ম্বর মেলা, ছটার ঘটার খেলা,
জরাবরি ভারি তমোগুণে ॥ ২৮ ॥
তমেতে যদ্যপি জোর, ফিরাইয়া দিলে মোড়,
বেওজর ঈশ্বর সে পায় ।
জলন্ত বিশ্বাস তার, তাই করে বলাচার,
অপর নাহিক ভাবে তাঁয় ॥ ২৯ ॥
ভক্তের ঈশ্বর-লাভ শুনিয়া বর্ণনা ।
প্রভুদেবে প্রশ্ন করে ভক্ত এক জনা ॥ ৩০ ॥
সুমধুর শ্রীবচনে বিমুগ্ধ অন্তর ।
সাকার কি নিরাকার পরম ঈশ্বর ॥ ৩১ ॥
উত্তর-বচনে প্রভু কন তাঁর প্রতি ।
অপরূপ ঈশ্বরের নাহি হয় ইতি ॥ ৩২ ॥
জ্ঞানী যাঁরা যাঁহাদের প্রকৃত গিয়ান ।
আমি ও জগৎ মিথ্যা স্বপ্নের সমান ॥ ৩৩ ॥
জ্ঞান যেথা কিছু নাই একা ব্রহ্ম বিনে ।
ভগবান নিরাকার হন সেইখানে ॥ ৩৪ ॥
যেথা ভক্তে জানে আমি বস্তু স্বতন্তর ।
পৃথক্ জগৎ এই বিশ্বচরাচর ॥ ৩৫ ॥
সর্বশক্তিমান সেথা ভক্তের জীবন ।
সাকার হইয়া ভক্তে দেন দরশন ॥ ৩৬ ॥
বেদান্তবাদীরা যত জ্ঞানীর প্রকৃতি ।
বিচার-সম্বলে পথে করে নেতি নেতি ॥ ৩৭ ॥
বিচার-সহায়ে হয় জ্ঞান বলবৎ ।
আমিও যেমন মিথ্যা তেমতি জগৎ ॥ ৩৮ ॥
সাকার যেখানে সেথা যুক্তি-তর্ক রোধে ।
ব্রহ্মবস্তু-উপলব্ধি সে কেবল বোধে ॥ ৩৯ ॥
কোন্খানে নিরাকার সাকার কোথায় ।
বিবরিয়া প্রভুদেব কন উপমায় ॥ ৪০ ॥
বুঝহ সচ্চিদানন্দ জলধি অপার ।
কূল কি কিনারা সীমা কিছু নাহি তাঁর ॥ ৪১ ॥
সে জলের কোন অংশ ভক্তি-হিম পেয়ে ।
বরফ হইয়া যায় জমাট বাঁধিয়ে ॥ ৪২ ॥
জমাট বরফখণ্ড সাকার ধারণ ।
ভক্তজনগণে যাহা করে দরশন ॥ ৪৩ ॥
ভক্তির প্রকৃতিমধ্যে শীতলতা-গুণ ।
যাহাতে অখণ্ড হন সরূপ-সগুণ ॥ ৪৪ ॥
জ্ঞানেতে সূর্যের তেজ মহাতাপ তায় ।
জমাট বরফরূপ সাকার গলায় ॥ ৪৫ ॥
তখন ঈশ্বর ব্যক্ত আর নাহি রয় ।
রূপ গুণ হারাইয়া জলে হন লয় ॥ ৪৬ ॥
এমত প্রত্যক্ষ দৃষ্ট করে যেই জন ।
বলিতে না পারে কিবা করে দরশন ॥ ৪৭ ॥
কি বলিবে কে বলিবে দর্শন চেহারা ।
যে বলিবে সেই নাই তিনি আমি-হারা ॥ ৪৮ ॥
জীবে হয় আমি-হারা তার বিবরণ ।
উপমা সহিত প্রভু এইবারে কন ॥ ৪৯ ॥
অবিরত একমাত্র বিচারের জোরে ।
'আমি' টামি নাহি থাকে 'আমি' যায় উড়ে ॥ ৫০ ॥
এইখানে প্রভুর উপমা বড় খাসা ।
পিঁয়াজে পিয়াজ নাই ছাড়াইলে খোসা ॥ ৫১ ॥
পঞ্চভূতে গড়া এই শরীরধারণ ।
উপরে বিচিত্র চারু চর্ম-আবরণ ॥ ৫২ ॥
উন্মোচন কর যদি এই চর্মখানা ।
নীচে মাংস শিরা রক্ত দেখে লাগে ঘৃণা ॥ ৫৩ ॥
মাংস-অংশ দিলে বাদ কিবা রহে আর ।
নানাবিধ গঠনের কাঠামের হাড় ॥ ৫৪ ॥
মাঝে মাঝে তার মধ্যে বিবিধ কুঠরি ।
কাহে পিত্ত কাহে মূত্র কাহে নাড়ী-ভুঁড়ি ॥ ৫৫ ॥
একে একে এই সবে করিলে বাহির ।
কোথায় বা আমি আর কোথায় শরীর ॥ ৫৬ ॥
আমাকে খুঁজিতে গেলে শরীরের মাঝে ।
দেহ যায় আমি কোথা নাহি পাই খুঁজে ॥ ৫৭ ॥
অতুল উপমা-কথা 'আমি'-নিরূপণে ।
যদি কেহ ভক্তিভরে একমনে শুনে ॥ ৫৮ ॥
কথার মাহাত্ম্যগুণে হইবে তাহার ।
শুদ্ধচিত্ত পাশমুক্ত মায়ায় নিস্তার ॥ ৫৯ ॥
কথার প্রসঙ্গে প্রভু ক্রমে ক্রমে কন ।
আমি-হারা যেই জন তার বিবরণ ॥ ৬০ ॥
আমি হারাইয়া কিবা দেখে জ্ঞানী জনা ।
কেহ না করিতে পারে তাহার বর্ণনা ॥ ৬১ ॥
যে কহিবে সেই নাই গিয়াছেন গলে ।
নুনের পুতুল সম সাগরের জলে ॥ ৬২ ॥
পরে প্রভু কন পূর্ণ-জ্ঞানের লক্ষণ ।
হইলে গিয়ান পূর্ণ রহে না বচন ॥ ৬৩ ॥
আমি-রূপ নুনের পুতুল পূর্বাকারে ।
নামিয়া সচ্চিদানন্দ-সাগরের নীরে ॥ ৬৪ ॥
দ্রবিয়া হইয়া জ্বল জলে যবে মিশে ।
জলে গুনে ভিন্ন ভেদ রহে আর কিসে ॥ ৬৫ ॥
চাষা যবে ক্ষেতে আনে পুকুরের জল ।
নালায় জলের শব্দ করে কলকল ॥ ৬৬ ॥
ক্ষেত নালা পূর্ণ হলে পুকুরের সনে ।
কলরব সব নষ্ট পূর্ণতার গুণে ॥ ৬৭ ॥
আমির সম্বন্ধে কথা কন প্রভুরায় ।
হাজার বিচার কর আমি নাহি যায় ॥ ৬৮ ॥
তোমার আমার পক্ষে সেই সে কারণে ।
দাস আমি হওয়া শ্রেয়ঃ ভক্ত-অভিমানে ॥ ৬৯ ॥
ভক্তের সগুণ ব্রহ্ম স্বতন্তর দুয়ে ।
ভক্তজনে দেন দেখা আকার ধরিয়ে ॥ ৭০ ॥
সগুণে প্রার্থনা চলে তাঁহার গোচরে ।
নিরগুণে ব্যক্তি নাই কি কহিবে কারে ॥ ৭১ ॥
সমাজ-মন্দিরে কর যাঁহাকে প্রার্থনা ।
তিনিই সগুণ ব্রহ্ম এই নামে জানা ॥ ৭২ ॥
এত বলি প্রভুদেব ব্রাহ্মদের দলে ।
তাঁদের গন্তব্য পথ কন খুলে খুলে ॥ ৭৩ ॥
জগতের গুরু প্রভু অতি দয়াময় ।
যে আসে সকাশে তারে বড়ই সদয় ॥ ৭৪ ॥
জ্ঞানী কি বেদান্তবাদী যেন প্রকৃতির ।
তোমরা সেরূপ নহ ভকত জাতির ॥ ৭৫ ॥
নাহি ক্ষতি সাকার না লাগে যদি মনে ।
শুন তবে এক কথা কই এইখানে ॥ ৭৬ ॥
সৃষ্টি-স্থিতি-লয়কারী সর্বশক্তিমান ।
এমন ঈশ্বর তিনি রহে যদি জ্ঞান ॥ ৭৭ ॥
প্রার্থনা করিলে তাঁরে করেন শ্রবণ ।
সর্বগুণে বিভূষিত ব্যক্তির মতন ॥ ৭৮ ॥
উদ্দেশ্যসাধনে ইহা যথেষ্ট প্রচুর ।
পরম দয়াল তিনি ভক্তির ঠাকুর ॥ ৭৯ ॥
যেবা যায় ভক্তি-পথ করিয়া আশ্রয় ।
সহজে ঈশ্বরলাভ তাহার নিশ্চয় ॥ ৮০ ॥
একজন ব্রাহ্মভক্ত পুছে হেনকালে ।
সত্যই কি ঈশ্বরের দরশন মিলে ॥ ৮১ ॥
যদ্যপি সাক্ষাৎকার হয় তাঁর সনে ।
আমরা দেখিতে তবে নাহি পাই কেনে ॥ ৮২ ॥
সায় দিয়া ব্রাহ্মভক্তে কন প্রভুরায় ।
সাধক সত্যই তারে দেখিবারে পায় ॥ ৮৩ ॥
কুতূহলী প্রশ্নকর্তা পুনঃ প্রশ্ন করে ।
কি করিলে তবে তাঁয় দেখা যেতে পারে ॥ ৮৪ ॥
প্রত্যুত্তর কি সুন্দর প্রভুর তাহায় ।
রোদন কেবলমাত্র দরশনোপায় ॥ ৮৫ ॥
ধনের জনের জন্য কাঁদে লোক-জনে ।
কে কোথায় কাঁদে দেখ হরির কারণে ॥ ৮৬ ॥
শিশু ছেলে চুষি লয়ে খেলে যতক্ষণ ।
মা করেন রান্না-বান্না ঘরের করম ॥ ৮৭ ॥
চুষিতে অখুশী যবে দূরে ছুঁড়ে তায় ।
মায়ের কারণ শিশু ধূলাতে লুটায় ॥ ৮৮ ॥
তখনি জননী ছুটে আসে যেথা ছেলে ।
মুছায়ে বদনখানি তুলে করে কোলে ॥ ৮৯ ॥
সেইমত ধন-জন-কামিনী-কাঞ্চন ।
বিষয় পিয়াস-আশা দিয়া বিসর্জন ॥ ৯০ ॥
যে জন রোদন করে তাঁহার কারণে ।
সেই জন সুনিশ্চয় পায় ভগবানে ॥ ৯১ ॥
প্রভুদেবে আর প্রশ্ন করে ভক্তবর ।
ঈশ্বরে লইয়া কেন এত মতান্তর ॥ ৯২ ॥
নানা মত নানা তর্ক নানান বিচার ।
কেহ বা সাকার কহে কেহ নিরাকার ॥ ৯৩ ॥
সাকারবাদীর মধ্যে আশ্চর্য কখন ।
ভিন্ন ভিন্ন রূপ কহে ভিন্ন ভিন্ন জন ॥ ৯৪ ॥
যে রূপে যে ভাবে তাঁরে প্রভুর উত্তর ।
সেরূপ সে মনে মনে করে নিরন্তর ॥ ৯৫ ॥
হইলে ঈশ্বর-লাভ ঈশ্বর আপনি ।
বুঝাইয়া দেন ভক্তে কি প্রকার তিনি ॥ ৯৬ ॥
কখন গেলে না তুমি সে পাড়ার ধারে ।
কেমনে তাঁহার তত্ত্ব বুঝাব তোমারে ॥ ৯৭ ॥
শুন এক গল্প কথা অতি মনোরম ।
মলত্যাগে কোন স্থানে যায় কোন জন ॥ ৯৮ ॥
দেখিল তথায় গাছে এক জানোয়ার ।
সুন্দর রক্তের মত লাল বর্ণ তার ॥ ৯৯ ॥
সবিস্ময় মন তেঁহ অন্য জনে কয় ।
সে বলিল সাদা সেটি লালবর্ণ নয় ॥ ১০০ ॥
বর্ণের বিবাদে দোঁহে লাল সাদা বলে ।
তৃতীয় জনৈক তথা জুটে হেনকালে ॥ ১০১ ॥
তার দেখা নীলবর্ণ জানোয়ার গাছে ।
উচ্চরবে কহে নীল, লাল সাদা মিছে ॥ ১০২ ॥
চতুর্থ পঞ্চম পরে উপনীত হয় ।
বেগুনে সবুজ বর্ণ তারা দোঁহে কয় ॥ ১০৩ ॥
পরস্পর মতান্তরে মহা গণ্ডগোলে ।
সকলেই উপনীত হইল তরুতলে ॥ ১০৪ ॥
দৈবযোগে সর্বজনে দেখিবারে পায় ।
জনৈক মানুষ সেই গাছের তলায় ॥ ১০৫ ॥
তত্ত্ব জানিবারে তারে করিল জিজ্ঞাসা ।
সে কহে আমার এই তরুতলে বাসা ॥ ১০৬ ॥
জানোয়ার কি প্রকার কিবা বর্ণ তার ।
বিশেষিয়া জানি আমি সব সমাচার ॥ ১০৭ ॥
যেবা যাহা বাখানিছ সব সত্য বটে ।
বেগুনে সবুজ সাদা লাল নীল মেটে ॥ ১০৮ ॥
বহুরূপী জানোয়ার বরনের খাঁই ।
ক্ষণে ক্ষণে ভিন্ন বর্ণ কভু কিছু নাই ॥ ১০৯ ॥
ঈশ্বরের চিন্তা যেবা দিবানিশি করে ।
স্বরূপ-বারতা তাঁর সে জানিতে পারে ॥ ১১০ ॥
ভাল
জানে সেইজন ঈশ্বর কেমন ।
নানা রূপে ভাবে যাঁরে দেন দরশন ॥ ১১১ ॥
অপরে জানিবে কিসে সত্য সমাচার ।
তাহাদের তর্ক দ্বন্দ্ব গণ্ডগোল সার ॥ ১১২ ॥
বলিতেন মহাভক্ত কবীর আপনি ।
নিরাকার পিতা তাঁর সাকার জননী ॥ ১১৩ ॥
সকলে বিদিত কথা লিখিত পুরাণে ।
রাম-রূপ ধরি কৃষ্ণ তুষে হনুমানে ॥ ১১৪ ॥
যে রূপ দেখিতে ভক্ত করয়ে কামনা ।
সে রূপ ধরেন তিনি রূপ তাঁর নানা ॥ ১১৫ ॥
বেদান্তের অনুসারে বিচার যেথায় ।
রূপ-গুণ নাহি রহে সব উড়ে যায় ॥ ১১৬ ॥
বিচারের পরিণাম এক ব্রহ্ম ঠিক ।
নাম-রূপযুক্ত এই জগৎ অলীক ॥ ১১৭ ॥
ভক্ত-অভিমান মনে রহে যতক্ষণ ।
ততক্ষণ ঈশ্বরের রূপ-দরশন ॥ ১১৮ ॥
উপলব্ধি হয় বটে বিচারের মুখে ।
ভক্ত-অভিমান ভক্তে দূরে কিছু রাখে ॥ ১১৯ ॥
কালী কিংবা কৃষ্ণ-রূপ চৌদ্দ পোয়া কেনে ।
দূরে তাই ক্ষুদ্র বোধ এই তার মানে ॥ ১২০ ॥
অন্তরে দেখায় সূর্যে থালার মতন ।
নিকটে যদ্যপি গিয়া কর দরশন ॥ ১২১ ॥
তখন দেখিবে হেন প্রকাণ্ড তাহায় ।
ধারণা করিতে শক্তি না রবে মাথায় ॥ ১২২ ॥
কালরূপ শ্যামরূপ শ্যাম বর্ণ কেনে ।
দূরত্ববশতঃ সেও অন্য নাহি মানে ॥ ১২৩ ॥
যেইরূপ দূরস্থিত দীঘির সলিল ।
কোখাও দেখায় কালো কোথাও বা নীল ॥ ১২৪ ॥
তুলিলে অঞ্জলিমধ্যে দেখিবারে পাই ।
অতি স্বচ্ছ নিরমল কোন বর্ণ নাই ॥ ১২৫ ॥
সেই সে কারণ এক দূর ব্যবধান ।
আকাশের নীলবর্ণ দৃশ্যমান ॥ ১২৬ ॥
প্রভুদেব এইখানে কন তত্ত্বসার ।
নিরগুণ ব্রহ্ম যেথা বেদান্ত-বিচার ॥ ১২৭ ॥
বলিবারে ব্রহ্মতত্ব বাক্য হয় রোধ ।
সমাধিস্থ জন তাঁরে বোধে করে বোধ ॥ ১২৮ ॥
তুমি সত্য যতক্ষণ জ্ঞান বলবৎ ।
নিশ্চয় বুঝিবে সত্য তেমতি জগৎ ॥ ১২৯ ॥
তার সঙ্গে ঈশ্বরের সত্য নানা রূপ ।
এও সত্য তাঁরে জানা ব্যক্তির স্বরূপ ॥ ১৩০ ॥
উপদেশে প্রভুদেব কন এইখানে ।
ভাগ্যবান পুণ্যবান ব্রাহ্মভক্তগণে ॥ ১৩১ ॥
ভক্তিপথ তোমাদের প্রশস্ত কেবল ।
যেই পথাশ্রয়ে ধ্রুব অচিরে মঙ্গল ॥ ১৩২ ॥
কি ফল জানিতে চেষ্টা অনন্ত ঈশ্বরে ।
পাদপদ্মে সঁপ মন ভক্তি সহকারে ॥ ১৩৩ ॥
এক ঘটি জলে যদি তৃষ্ণা দূরে যায় ।
পুকুরেতে কত জল কি ফল মাপায় ॥ ১৩৪ ॥
অর্ধেক বোতলে যদি কাৎ হও ভূমে ।
কত মণ আছে মদ শুড়ীর দোকানে ॥ ১৩৫ ॥
এ হিসাব করিবার কিবা প্রয়োজন ।
তুষ্ট থাক লয়ে তুমি নিজের মতন ॥ ১৩৬ ॥
জ্ঞানপথ কলিকালে কঠিনাতিশয় ।
দুর্বল জীবের পক্ষে গন্তব্যের নয় ॥ ১৩৭ ॥
বিষয়বুদ্ধির লেশ থাকিলে কিঞ্চিৎ ।
নাহি হয় সে গিয়ান বুঝিতে নিশ্চিত ॥ ১৩৮ ॥
কখন কেমন দশা হয় ব্রহ্মজ্ঞানে ।
বেদে আছে বিবরণ বিশেষ রকমে ॥ ১৩৯ ॥
শুন কই সাত ভূমি বেদের বচন ।
যে যে স্থলে কালে কালে বিচরয়ে মন ॥ ১৪০ ॥
লিঙ্গ গুহ্য নাভি এই তিনের ভিতরে ।
সংসারী লোকের মন অবিরত ঘুরে ॥ ১৪১ ॥
দিবানিশি চিন্তা যেথা কামিনী-কাঞ্চন ।
তিনের উপরে আর নাহি উঠে মন ॥ ১৪২ ॥
হৃদয় চতুর্থ ভূমি মন সেথা যার ।
করে জ্যোতিঃ দরশন অতি চমৎকার ॥ ১৪৩ ॥
প্রথম চৈতন্যোদয় হয় এই ঠাঁই ।
সংসারে নীচের দিকে মন নামে নাই ॥ ১৪৪ ॥
মনের পঞ্চম ভূমি কণ্ঠ যারে কয় ।
সেখানে মনের মধ্যে অবিদ্যা না রয় ॥ ১৪৫ ॥
অতিপ্রিয় ঈশ্বরীয় শ্রবণ কীর্তন ।
আন কথা লাগে কানে বাজের মতন ॥ ১৪৬ ॥
ষষ্ঠ ভূমি কপালে যখন মন যার ।
ঈশ্বরের রূপ তেঁহ দেখে অনিবার ॥ ১৪৭ ॥
নিরুপম রূপে মুগ্ধ উন্মত্তের ন্যায় ।
প্রেমভরে পরশিয়া আলিঙ্গিতে যায় ॥ ১৪৮ ॥
ধরিতে ছুঁইতে কিন্তু না পারে তখন ।
তফাতে আটক রাখে এক আবরণ ॥ ১৪৮ ॥
কাঁচ-ব্যবধানে যেন লণ্ঠনের গায় ।
প্রজ্বলিত মধ্যে আলো ছোঁয়া নাহি যায় ॥ ১৪৯ ॥
হেন অবস্থায় যারে তুলে ভগবান ।
তথাপি তাহার কিছু রহে 'আমি'-জ্ঞান ॥ ১৫০ ॥
শিরোদেশ শেষ ভূমি সপ্তম আখ্যায় ।
এখানে উঠিলে বাহ্যু একেবারে যায় ॥ ১৫১ ॥
আদতে হুঁশের লেশ গন্ধ নাহি থাকে ।
গড়িয়া পড়িয়া যায় দুধ দিলে মুখে ॥ ১৫২ ॥
গভীর সমাধিযুক্ত এই ঠাঁই মন ।
প্রত্যক্ষ ব্রহ্মের রূপ করে দরশন ॥ ১৫৩ ॥
সমাধিস্থ অবস্থাতে অবিরত যোগ ।
একুশ দিনের বেশী নাহি হয় ভোগ ॥ ১৫৪ ॥
কহিনু জ্ঞানীর পথ কঠিনাতিশয় ।
তোমাদের ভক্তিপথ জ্ঞানমার্গ নয় ॥ ১৫৫ ॥
ভক্তিভরে কর ভক্তিপথে বিচরণ ।
এ পথ যেমন ভাল সহজ তেমন ॥ ১৫৬ ॥
পূজা জপ বিষয়াদি কর্মাবলী যত ।
সমাধিস্থ হইলে সকল হয় হত ॥ ১৫৭ ॥
করমের আড়ম্বর প্রথমে প্রথমে ।
সেদিকে এগুবে যত তত কর্ম কমে ॥ ১৫৮ ॥
অপর কর্মের কথা রাখ বহুদূরে ।
লীলা-গুণগান তাঁর তাও বন্ধ করে ॥ ১৫৯ ॥
দ্বিতীয় খণ্ডের কথা স্মর তুমি মন ।
আই করিলেন যবে দেহবিসর্জন ॥ ১৬০ ॥
তর্পণ করিতে প্রভু যান গঙ্গা-জলে ।
অঞ্জলি না হয় বদ্ধ জল পড়ে গলে ॥ ১৬১ ॥
হইলে ঈশ্বর-লাভ কর্মকাণ্ড নাশ ।
উপমা ধরিয়া তত্ত্ব করিতে প্রকাশ ॥ ১৬২ ॥
তর্পণের কথা তাঁর করিয়া স্মরণ ।
ব্রাহ্ম ভক্তগণে আজি করেন বর্ণন ॥ ১৬৩ ॥
ব্যাপার দেখিয়া তবে মহাচিন্তা জুটে ।
অঞ্জলিতে জলবিন্দু কেন নাহি উঠে ॥ ১৬৪ ॥
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত সেথা দাদা হলধারী ।
ভীতচিত্তে কারণ জিজ্ঞাসা তাঁয় করি ॥ ১৬৫ ॥
বৃত্তান্ত গুনিয়া তবে হলধারী কয় ।
ইহাই গলিত হস্ত শাস্ত্রের নির্ণয় ॥ ১৬৬ ॥
হইলে ঈশ্বরলাভ দরশনে তাঁর ।
তর্পণাদি কর্মকাণ্ড নাহি রহে আর ॥ ১৬৭ ॥
কর্মনাশ বিধানে কি যুক্তিমত নয় ।
স্বভাবতঃ কর্মনাশ আপনিই হয় ॥ ১৬৮ ॥
প্রয়াস করিলে পরে কর্ম করিবারে ।
অকর্মণ্য অঙ্গ কর্ম করিতে না পারে ॥ ১৬৯ ॥
বাখানিতে সারতত্ত্ব ধারণা-কারণ ।
উপমায় দেন প্রভু ব্রাহ্মণ-ভোজন ॥ ১৭০ ॥
হইচই কলরব প্রথমে প্রথমে ।
সম্মুখে পড়িলে পাতা বহু গোল কমে ॥ ১৭১ ॥
লুচি আন লুচি আন শব্দ তুলে খালি ।
ভোজন-লালসালুব্ধ ব্রাহ্মণমণ্ডলী ॥ ১৭২ ॥
লুচিগোছা তরকারি পাতায় যখন ।
পূর্বেকার কলরব বারো আনা কম ॥ ১৭৩ ॥
গোল কই পেলে দই প্রায় হয় চুপ ।
মুখেতে কেবল শব্দ রহে সুপ্ সুপ্ ॥ ১৭৪ ॥
ভোজন হইলে সাঙ্গ গলায় গলায় ।
একবার রবহীন বেহুঁশ নিদ্রায় ॥ ১৭৫ ॥
গৃহস্থের বধূ আর দ্বিতীয় উপমা ।
গর্ভবতী হইলে যখন যায় জানা ॥ ১৭৬ ॥
শাশুড়ীর মহানন্দ অন্তরের মাঝ ।
বধূর কমিয়া দেয় সংসারের কাজ ॥ ১৭৭ ॥
দশমাস পরিপূর্ণ হইল যখন ।
প্রায় নাহি রহে কর্ম যে থাকে সে কম ॥ ১৭৮ ॥
প্রসব হইলে কর্ম বন্ধ একেবারে ।
এক কর্ম কোলে ছেলে নাড়াচাড়া করে ॥ ১৭৯ ॥
দুর্বোধ্য নিগূঢ় তত্ত্বে সরল উপমা ।
কোথাও এমন আর নাহি যায় শুনা ॥ ১৮০ ॥
শ্রীবদনে বিগলিত হইল যেমতি ।
চির-অন্ধ জনে শুনে পায় আঁখিভাতি ॥ ১৮১ ॥
শুন রামকৃষ্ণ-পুঁথি মহিমা প্রভুর ।
নিশ্চয় হইবে তব চিরতমঃ দূর ॥ ১৮২ ॥
ক্রমে পরে ব্রাহ্মগণে কন প্রভুবর ।
দেহ নাহি রহে প্রায় সমাধির পর ॥ ১৮৩ ॥
কেহ কেহ দেহ-রক্ষা করেন কখন ।
উপমায় নারদাদি ঋষিরা যেমন ॥ ১৮৪ ॥
আর গৌরাঙ্গের মত অবতারগণে ।
সে কেবল একমাত্র জীবের কল্যাণে ॥ ১৮৫ ॥
স্বার্থশূন্য এইসব মহাপুরুষেরা ।
জীবের মঙ্গল-হেতু আত্মমুখহারা ॥ ১৮৬ ॥
দয়ায় পূরিত হিয়া সতত অস্থির ।
জীব-দুঃখ-বিনাশনে রাখেন শরীর ॥ ১৮৭ ॥
হইলে খনন কূপ কোন কোন জনে ।
রাখেন কোদাল ঝুড়ি পরম যতনে ॥ ১৮৮ ॥
লোক-উপকার মনে উদ্দেশ্য একক ।
যদ্যপি কখন কার হয় আবশ্যক ॥ ১৮৯ ॥
সামান্য আধার যার দুর্বলাতিশয় ।
লোকে শিক্ষা দিতে করে ভয়ঙ্কর ভয় ॥ ১৯০ ॥
যেমন হাবাতে কাঠ স্রোতের মাঝারে ।
আপনি কেবলমাত্র ভেসে যেতে পারে ॥ ১৯১ ॥
লঘুকায় পাখী যদি এসে বসে তায় ।
অক্ষম ধরিতে ভার জলে ডুবে যায় ॥ ১৯২ ॥
কিন্তু নারদাদি ঋষি মহাবলবান ।
ঠিক যেন বাহাদুরী কাঠের সমান ॥ ১৯৩ ॥
সহজে ভাসিয়া যায় স্রোতের মাঝারে ।
ধরিয়া অসংখ্য প্রাণী পিঠের উপরে ॥ ১৯৪ ॥
চলিত প্রসঙ্গ সাঙ্গ করিয়া এখন ।
ব্রাহ্মগণে উপদেশ প্রভুদেব কন ॥ ১৯৫ ॥
সম্বোধিয়া শিবনাথে শুদ্ধ-আত্ম জনা ।
প্রার্থনায় কেন কর ঐশ্বর্য বর্ণনা ॥ ১৯৬ ॥
মহৈশ্বর্যেশ্বর তিনি অখিলের স্বামী ।
লক্ষ্মী যাঁর পদ-সেবা করেন আপনি ॥ ১৯৭ ॥
অনন্ত তাঁহার সৃষ্টি ঐশ্বর্য অপার ।
তিল আধ বলিবারে শক্তি আছে কার ॥ ১৯৮ ॥
পরম আনন্দ হয় দেখিলে তাঁহায় ।
সেই সে কারণে মাত্র ভক্তে তাঁরে চায় ॥ ১৯৯ ॥
কত তাঁর ঘর-বাড়ি কত ধন-জন ।
ঐশ্বর্য গণনে নাহি কোন প্রয়োজন ॥ ২০০ ॥
নরেন্দ্রে
দেখিলে আমি সব ভুলে যাই ।
কার ছেলে কোখা বাড়ি কটি তার ভাই ॥ ২০১ ॥
কিবা কার্য করে বাপ কি তার ব্যবসা ।
ভ্রান্তেও কখন কিছু না হয় জিজ্ঞাসা ॥ ২০২ ॥
তাই বলি একেবারে দিয়া প্রাণ-মন ।
তাঁহার মাধুর্য-রস কর আস্বাদন ॥ ২০৩ ॥
তবে আর এক কথা কই এইখানে ।
একবার ঈশ্বরের রূপ-দরশনে ॥ ২০৪ ॥
অনুক্ষণ মনে মনে বাড়য়ে লালসা ।
অপরূপ লীলা তাঁর দেখিবার আশা ॥ ২০৫ ॥
রাবণবধের পর রাম পরমেশ ।
রাক্ষস-পুরীতে যবে করেন প্রবেশ ॥ ২০৬ ॥
রাবণ-জননী বৃদ্ধা নিকষা তখন ।
প্রাণভয়ে দ্রুতপদে করে পলায়ন ॥ ২০৭ ॥
নিরখি লক্ষ্মণ জিজ্ঞাসা করিল রামে ।
নিকষা সভয়ে এত ধায় কি কারণে ॥ ২০৮ ॥
পুত্রপৌত্রশোকাতুরা বৃদ্ধদশা তায় ।
তবু এত প্রাণভয় ছুটিয়া পলায় ॥ ২০৯ ॥
আশ্বাসে
বৃদ্ধারে করি অভয় প্রদান ।
কারণ জিজ্ঞাসা কৈলা রঘুপতি রাম ॥ ২১০ ॥
সবিশেষ কহে বুড়ী জুড়ি দুই কর ।
দুর্বাদলশ্যামবর্ণ রামের গোচর ॥ ২১১ ॥
শুন শুন ওহে রাম রঘুকুলমণি ।
এতদিন ছিনু বেঁচে মহাভাগ্য গণি ॥ ২১২ ॥
যাহাতে এতেক লীলা দেখিনু তোমার ।
আরো দেখিবার তরে সাধ বাঁচিবার ॥ ২১৩ ॥
লীলা-দরশন-সাধ প্রাণে গুরুতর ।
সেই সে কারণে করি মরণের ডর ॥ ২১৪ ॥
মধুর প্রভুর কথা উক্ত রসভাষে ।
শুনিয়া সকল লোকে মহানন্দে হাসে ॥ ২১৫ ॥
সম্বোধিয়া শিবনাথে কন রসময় ।
তোমারে দেখিতে ইচ্ছা অতিশয় হয় ॥ ২১৬ ॥
শুদ্ধাত্মা দেখিলে হেন হয় অনুভব ।
পূর্ব জনমের যেন বন্ধু তারা সব ॥ ২১৭ ॥
পূর্ব জনমের কথা করিয়া শ্রবণ ।
প্রভুদেবে প্রশ্ন করে ভক্ত একজন ॥ ২১৮ ॥
আনন্দে উথলা হৃদি সীমা নাহি তার ।
আপনি কি পূর্বজন্ম করেন স্বীকার ॥ ২১৯ ॥
তত্ত্ব-পিপাসুর প্রতি প্রভুর উত্তর ।
হাঁগো আমি শুনিয়াছি আছে জন্মান্তর ॥ ২২০ ॥
ঈশ্বরের কার্যকাণ্ড অনন্ত অপার ।
সামান্য বুদ্ধিতে শক্তি নহে বুঝিবার ॥ ২২১ ॥
জন্মান্তর স্বীকার করেন মহাজনে ।
তাহে আমি অবিশ্বাস করিব কেমনে ॥ ২২২ ॥
ঈশ্বরের লীলাকাণ্ড অবোধ্য কেমন ।
এই কথা-সমর্থনে প্রভুদেব কন ॥ ২২৩ ॥
তনুত্যাগে যবে ভীষ্ম শরশয্যা-বেশে ।
সকৃষ্ণ পাণ্ডবগণ দাঁড়াইয়া পাশে ॥ ২২৪ ॥
পাণ্ডবেরা বুদ্ধিহারা করে নিরীক্ষণ ।
পিতামহ করিছেন অশ্রু-বিসর্জন ॥ ২২৫ ॥
অর্জুন কহেন কৃষ্ণে এ কি চমৎকার ।
কহ কৃষ্ণ সমাচার শুনিব ইহার ॥ ২২৬ ॥
বীরশ্রেষ্ঠ ভীমবল ভীষ্মদেব যিনি ।
ধর্মপর সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় জ্ঞানী ॥ ২২৭ ॥
অষ্টবসুদের মধ্যে বসু একজন ।
আয়ুঃশেষে মায়াবশে করেন রোদন ॥ ২২৮ ॥
সেই কথা ভীষ্মে গিয়া কন চক্রধর ।
ভীষ্মদেব করিলেন তাহার উত্তর ॥ ২২৯ ॥
তুমি ভাল জান কৃষ্ণ আমি নহি ভীতু ।
চক্ষে জল নহে মম তনুত্যাগ হেতু ॥ ২৩০ ॥
তবে যবে দেখি ভাবি ওহে চক্রপাণি ।
তুমি হরি ভগবান অখিলের স্বামী ॥ ২৩১ ॥
মঙ্গল-কামনা সদা পাণ্ডবের তরে ।
সারথির বেশে রহ রথের উপরে ॥ ২৩২ ॥
তথাপিহ তাহাদের দেখিবারে পাই ।
অগণ্য বিপদ তার শেষ অন্ত নাই ॥ ২৩৩ ॥
তখন আমার মনে এই স্থির হয় ।
তোমার লীলার মর্ম বুঝিবার নয় ॥ ২৩৪ ॥
অবোধ্য তোমার লীলা তুমি যেন হরি ।
এই দুঃখে দুনয়নে বহে মোর বারি ॥ ২৩৫ ॥
উর্ধ্বগতি দেখি রাতি প্রহরেক প্রায় ।
আজিকার কথা সাঙ্গ কৈলা প্রভুরায় ॥ ২৩৬ ॥
সমাজ-ভবনে হৈল ভজনার কাল ।
বাজিয়া উঠিল বাদ্য খোল করতাল ॥ ২৩৭ ॥
পুণ্যবান ভাগ্যবান ব্রাহ্মভক্তগণ ।
জনে জনে বন্দি আমি সবার চরণ ॥ ২৩৮ ॥
লইয়া শ্রীপ্রভুদেবে বেড়িয়া আদরে ।
আনন্দে হইয়া মত্ত সঙ্কীর্তন করে ॥ ২৩৯ ॥
হরিবোল উঠে রোল ভেদিয়া ভবন ।
বড় খুশী প্রতিবাসী গ্রামবাসী জন ॥ ২৪০ ॥
দলে দলে সংজোটন উদ্যান-মাঝারে ।
বৃহৎ উদ্যানবাটী তাহে নাহি ধরে ॥ ২৪১ ॥
ভক্তসহ ভগবানে করি দরশন ।
সকলে হইল মহা আনন্দে মগন ॥ ২৪২ ॥
প্রভুর কৃপায় মুক্ত ভবের বন্ধনে ।
দরশনে কি ফলিল তারা নাহি জানে ॥ ২৪৩ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলাকথা অমৃত-লহরী ।
শুনিলে সহজে যায় ভবসিন্ধু তরি ॥ ২৪৪ ॥