চতুর্থ খণ্ড
নবগোপাল ঘোষের বাড়িতে প্রভুর উৎসব
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বিশ্বগুরু যিনি।
জয় মাতা শ্যামাসুতা জগৎ জননী ॥
জয় জয় যাবতীয় ভক্ত দোঁহাকার ।
এ অধ্ম পদরজ মাগে সবাকার ॥
অদ্যাবধি ধরাধামে যত অবতার ।
প্রভু রামকৃষ্ণরায় সমষ্টি সবার ॥ ১ ॥
নানা ভাবে নানা মতে শিক্ষা নানা জনে ।
সব ধর্ম পথ মত তাঁহার বিধানে ॥ ২ ॥
ধর্ম-দ্বন্দ্ব নিবারণ ধর্মের সমতা ।
ধর্ম-সামঞ্জস্য ভাব ধর্মের একতা ॥ ৩ ॥
এই অভিনব পন্থা করিতে প্রচার ।
অবতীর্ণ ধরাধামে শ্রীপ্রভু আমার ॥ ৪ ॥
কৃষ্ণ-অবতারে কথা প্রকাশ গীতায় ।
যে রূপে যে ভজে তিনি তেন ভজে তায় ॥ ৫ ॥
কথায় কথিত মাত্র লইল তখন ।
করমেতে কিঞ্চিন্মাত্র নহে প্রদর্শন ॥ ৬ ॥
কারণ জিজ্ঞাসা মন যদি কর তার ।
শুন কহি অতিশয় গুহ্য সমাচার ॥ ৭ ॥
বার বার বলিলেন প্রভু নারায়ণ ।
সময় সাপেক্ষ কর্মে অতি প্রয়োজন ॥ ৮ ॥
যখন তখন কার্য হইবার নয় ।
কার্য তবে উপযুক্ত আসিলে সময় ॥ ৯ ॥
শাস্ত্রের প্রমাণ আর স্বরূপনির্ণয়ে ।
এক অবতারে কথা রাখেন বলিয়ে ॥ ১০ ॥
ভবিষ্যবাণীর ন্যায় পরের বারতা ।
ভাবী অবতরণের কারণের কথা ॥ ১১ ॥
পূর্বকথামত কর্ম করিয়া পশ্চাৎ ।
লীলার প্রমাণ দেন অখিলের নাথ ॥ ১২ ॥
বলবৎ এত ধর্ম ছিল না তখন ।
কৃষ্ণ-অবতারে যবে কথার পত্তন ॥ ১৩ ॥
পশ্চাতে বিবিধ ধর্ম নানা পথ মত ।
তুলিবে প্রবল ভাবে ঝড় বলবৎ ॥ ১৪ ॥
বুঝিয়া জানিয়া তত্ত্ব বিশেষ প্রকারে ।
আভাস দিলেন তার গীতার ভিতরে ॥ ১৫ ॥
দেখ এবে নানাবিধ ধর্ম সম্প্রদায় ।
সকলে আপন ধর্মে শ্রেষ্ঠতম গায় ॥ ১৬ ॥
মহান্ কলহ-দ্বন্দ্ব বাদ-প্রতিবাদ ।
তত্ত্ব-অন্বেষক জনে ঘোর পরমাদ ॥ ১৭ ॥
কেবা সত্য কেবা মিথ্যা যায় কোন্ পথে ।
সন্দেহ-আতুর চিন্তা দিবারাতি চিতে ॥ ১৮ ॥
সত্যপথ প্রদর্শিতে তত্ত্বান্বেষী জনে ।
আর ধর্মরাজ্যে ধর্ম-দ্বন্দ্ব-বিভঞ্জনে ॥ ১৯ ॥
কালমত প্রভু রামকৃষ্ণ অবতার ।
করিলেন সার্বভৌম মতের প্রচার ॥ ২০ ॥
সার্বভৌম মতে তার বিশ্ব-বেড়া বেড় ।
স্থানীয় জাতীয় নহে গোটা জগতের ॥ ২১ ॥
ধর্মমাত্রে সকলেই পথ বাস্তবিক ।
কোনটি অলীক নহে সকলেই ঠিক ॥ ২২ ॥
এই ধর্ম প্রচারিলা প্রভু নারায়ণ ।
কার্যেতে আচরি সহ সাধনভজন ॥ ২৩ ॥
যে যে রূপে ভাবে নামে আরাধেন তাঁয় ।
সেই রূপে ভাবে নামে সেই তাঁরে পায় ॥ ২৪ ॥
ভাবে রূপে নামে নানা বস্তুগত নয় ।
উপমা ধরিয়া তত্ত্ব দিলা পরিচয় ॥ ২৫ ॥
বাপি কূপ তড়াগাদি সাগর নিচয় ।
হ্রদ নদী খাল বিল সব জলাশয় ॥ ২৬ ॥
আকারে গঠনে নামে প্রভেদ কেবল ।
কিন্তু সকলের মধ্যে সেই এক জল ॥ ২৭ ॥
বালিশ শয্যার সজ্জা অপর উপমা ।
আকারে গঠনে বর্ণে বাস্তবিক নানা ॥ ২৮ ॥
ব্যবহার বিশেষেতে নাম স্বতন্তর ।
কিন্তু সেই এক তুলা সবার ভিতর ॥ ২৯ ॥
তেন এক ভগবান সকলের মাঝে ।
বিকাশে বিবিধ নাম নানাবিধ সাজে ॥ ৩০ ॥
যত ধর্ম তত পথ জগতে প্রকাশ ।
সকলেতে সেই এক বস্তুর বিকাশ ॥ ৩১ ॥
রামকৃষ্ণপন্থিগণে বুঝেন বারতা ।
লীলাধর্ম শ্রীপ্রভুর ধর্মের সমতা ॥ ৩২ ॥
এইখানে এক কথা কর অবধান ।
ধর্মমাত্রে ভেদ নাই সকলে সমান ॥ ৩৩ ॥
কিন্তু ভাব-বিশেষেতে আছয়ে পার্থক্য ।
ধর্মে এক কিন্তু ভাবে নাহি হয় ঐক্য ॥ ৩৪ ॥
প্রত্যেকের মধ্যে ভাবে আলাহিদা রয় ।
তাহাতে কখন কার ক্ষতি নাহি হয় ॥ ৩৫ ॥
বরঞ্চ পোষ্টাই করে প্রত্যেক ভাবীকে ।
গোপনে আপন ভাব যেবা করে রক্ষে ॥ ৩৬ ॥
বিশ্বগুরু শ্রীপ্রভুর উপমার কথা ।
পল্লীতে রাখালদের গোচারণ-প্রথা ॥ ৩৭ ॥
জল খাইবার বেলা গগনে যখন ।
নিজ নিজ গরু ছাড়ে রাখালের গণ ॥ ৩৮ ॥
ক্রমে পরে একত্তরে সকলেই জমে ।
বৃহৎ প্রান্তর মাঠ গোচারণ-ভূমে ॥ ৩৯ ॥
তখন পার্থক্য ভাব নাহি রহে আর ।
সব পাল সঙ্গে মিলে হয় একাকার ॥ ৪০ ॥
কিন্তু ঘরে ফিরিবারে সময় যখন ।
পৃথক করিয়া আনে নিজের গোধন ॥ ৪১ ॥
ধর্মমেলা যেইখানে সেথা একত্তরে ।
ভাবেতে পার্থক্য শ্রেয়ঃ আপনার ঘরে ॥ ৪২ ॥
এই ভাব-সমর্থনে শ্রী প্রভুর গীত ।
অবধান কর তত্ত্ব বুঝিবে নিশ্চিত ॥ ৪৩ ॥
প্রভুর অভয় পদ ধরিয়া অন্তরে ।
অটল অচল রহ আপনার ঘরে ॥ ৪৪ ॥
গীত
"আপনাতে আপনি থেক' মন যেও নাকো কার ঘরে,
যা চাবি তা বসে পাবি খোঁজ নিজ
অন্তঃপুরে ।
পরম ধন সে পরশমণি, যা চাবি তা দিতে পারে,
কত মণি পড়ে আছে আমার
চিন্তামণির নাচদুয়ারে ॥"
একেশ্বর যদবধি না হয় ধারণা ।
তদবধি তত্ত্ববোধে রহে মহা হানা ॥ ৪৫ ॥
সাধন-ভজন-কর্মে নাহি অধিকার ।
এক-জ্ঞান ভিন্ন রহে বহু-জ্ঞান যাঁর ॥ ৪৬ ॥
উপদেশে বলিলেন প্রভু ভগবান ।
সর্বাগ্রে আঁচলে বাঁধি অদ্বৈতগিয়ান ॥ ৪৭ ॥
পশ্চাতে করহ কর্ম যেন লয় মন ।
বে-তালে কখনও পদ হবে না পতন ॥ ৪৮ ॥
অদ্বৈতগিয়ান মানে এক-জ্ঞান সার ।
লক্ষ বুড়ি রকমারি বিকাশ তাহার ॥ ৪৯ ॥
ব্রজগোপিনীর বাক্যে বুঝহ বারতা ।
যাঁহা যাঁহা নেত্র পড়ে কৃষ্ণ ঘুরে সেথা ॥ ৫০ ॥
বেদান্তের বাক্যে আর ভাবে গোপিকার ।
ভিন্ন নাই উভয়েই একই প্রকার ॥ ৫১ ॥
নানা মতে পথে ঠিক একই প্রকৃতি ।
বিচ্ছেদ-যাতনাতুরা কহেন শ্রীমতী ॥ ৫২ ॥
আপনে শ্রীকৃষ্ণজ্ঞানে সহচরীগণে ।
কোথা চূড়া বাঁশি মোর ত্বরা দেহ এনে ॥ ৫৩ ॥
আর কথা বলিলেন প্রভু ভগবান ।
বহুজ্ঞান অজ্ঞান গিয়ান এক-জ্ঞান ॥ ৫৪ ॥
এক-জ্ঞান একেশ্বর অথিলের রাজ ।
নানা ভাবে নামে রূপে সর্বত্রে বিরাজ ॥ ৫৫ ॥
দেখাইলে প্রভুদেব দেখিবে সুস্পষ্ট ।
সকলের মূলে মোর প্রভু রামকৃষ্ণ ॥ ৫৬ ॥
একমাত্র বস্তু তিনি জগতে কেবল ।
সকলেতে তিনি আর তাঁহাতে সকল ॥ ৫৭ ॥
সকল ধর্মের ভাব আছে এ লীলায় ।
ধর্ম-দ্বেষী জনে তুষ্ট নন প্রভুরায় ॥ ৫৮ ॥
লীলা দেখিবারে সাধ যদি রহে মনে ।
যেরূপ যে নামে যেবা ভজে ভগবানে ॥ ৫৯ ॥
সাকারে কি নিরাকারে যেন রুচি তার ।
তে সবার পদে করি কোটি নমস্কার ॥ ৬০ ॥
শ্রদ্ধা ভক্তি ভালবাসা ভক্তি সহকারে ।
চলিলে বাসনা পূর্ণ হইবে অচিরে ॥ ৬১ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-কথা লীলার আকর ।
সকল লীলার তত্ত্ব ইহার ভিতর ॥ ৬২ ॥
যেইরূপ রত্নাকর জলধির মাঝ ।
যাবতীয় রত্নরাজি সবার বিরাজ ॥ ৬৩ ॥
কতিপয় ভক্ত-সঙ্গে লীলার আসরে ।
যাহা করিলেন প্রভু লীলা কই তারে ॥ ৬৪ ॥
শুন সেই লীলা-কাণ্ড প্রভুর আমার ।
ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ ভক্তির ভাণ্ডার ॥ ৬৫ ॥
বিবিধ প্রভুর ভাব এবার লীলায় ।
বিশেষিয়া বিবরণ বলা বড় দায় ॥ ৬৬ ॥
কেমনে কহিব খুঁজে নাহি পাই পথ ।
ভাবের স্বভাবে দেখি দুটি বলবৎ ॥ ৬৭ ॥
প্রথম প্রকাশ্যভাবে জীবের মতন ।
দীনহীন দ্বিজবেশে কঠোর সাধন ॥ ৬৮ ॥
সর্ব ঠাঁই শিক্ষাপ্রার্থী বিনীত-আচার ।
যারে তারে সকলেরে আগে নমস্কার ॥ ৬৯ ॥
সীমাহীন সহিষ্ণুতা অনন্তের চেয়ে ।
বসুন্ধরা লাজে মাটি তিতিক্ষা দেখিয়ে ॥ ৭০ ॥
একবারে আত্মসুখমাত্রে বিসর্জন ।
আজীবন প্রাণপণে সত্যের পালন ॥ ৭১ ॥
জননীর প্রতি ভক্তি অতুল জগতে ।
ত্যজি মান মান-দান শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতে ॥ ৭২ ॥
উচ্চ শ্রদ্ধা-প্রদর্শন সাধু-ভক্ত জনে ।
পদে পদে দয়া ক্ষমা বিচারবিহীনে ॥ ৭৩ ॥
পূর্ণাবতারের ভাবে রাজরাজেশ্বর ।
দাসী সম শক্তি-সঙ্গে সদা আজ্ঞাপর ॥ ৭৪ ॥
প্রতিবাক্যে প্রতিপদে মহৈশ্বর্য ফুটে ।
অবিদ্যা কম্পিতকায়া আসিতে নিকটে ॥ ৭৫ ॥
সরল শরণাপন্নে দয়ার নিধান ।
যে যা চায় তাই তায় তৎক্ষণে দান ॥ ৭৬ ॥
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর দুয়ারে প্রহরী ।
ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ যেথা ছড়াছড়ি ॥ ৭৭ ॥
ন্যায়বান দয়াবান রতন-আসনে ।
দেখি দূরে দাসে যাঁর কম্পমান যমে ॥ ৭৮ ॥
উচ্চতম তত্ত্বজ্ঞান সদা শ্রীবদনে ।
লোলুপ অর্জ্জন যার বর্ণেক-শ্রবণে ॥ ৭৯ ॥
গভীর সমাধিপর কথায় কথায় ।
বাহ্যহারা নাড়ী-ছাড়া জড় পারা রায় ॥ ৮০ ॥
শুনিয়াছি শ্রীবদনে প্রভু সেই ভাবে ।
খেলিতেন মীনবৎ সিন্ধুনীরে ডুবে ॥ ৮১ ॥
এ সকল সিন্ধু যেন খালি ভরা জলে ।
পরিপূর্ণ সেই সিন্ধু কারণ-সলিলে ॥ ৮২ ॥
অনন্ত শয্যায় যেখা ভাসে নারায়ণ ।
পদপ্রান্তে লক্ষ্মী করে চরণ সেবন ॥ ৮৩ ॥
ঈষৎ আমিত্ব তাঁর রহে এ সময়ে ।
পুনরাগমন হয় যাহার আশ্রয়ে ॥ ৮৪ ॥
যাবতীয় ভাবে রূপে প্রভু অলঙ্কৃত ।
প্রভুভক্ত বিনে নহে অপরে বিদিত ॥ ৮৫ ॥
প্রভুভক্ত সাঙ্গোপাঙ্গ পূজ্য সবাকার ।
যাঁহাদের সঙ্গে খেলা হৈল এইবার ॥ ৮৬ ॥
হেন প্রভুভক্তপদে রাখি রতি মতি ।
একমনে শুন মন রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ৮৭ ॥
বাদুড়বাগানে ঘর শ্রীনবগোপাল ।
প্রায় পঞ্চাশের কাছে স্বভাবে ছাবাল ॥ ৮৮ ॥
সরল অন্তর যেন সেই মত মন ।
সর্বদা সহাস্য মুখ তাহার লক্ষণ ॥ ৮৯ ॥
সোনার সংসার ঘরে ভার্যা গুণবতী ।
যাঁহার ভক্তির বলে পতির উন্নতি ॥ ৯০ ॥
শ্রীপ্রভুর মহোৎসব ভক্তের ভবনে ।
প্রায় প্রতি রবিবারে এখানে সেখানে ॥ ৯১ ॥
মহাভাগ্যবান তেঁহ জনম ধরায় ।
সভক্তে ভবনে যাঁর ভিক্ষা কৈলা রায় ॥ ৯২ ॥
গোপালের মনের সাধ হৈল এইবারে ।
করিবারে মহোৎসব আপনার ঘরে ॥ ৯৩ ॥
প্রভুর কৃপায় কিছু নাহি অনটন ।
টাকাকড়ি রাগ-ভক্তি সুসরল মন ॥ ৯৪ ॥
মনের বাসনা ব্যক্ত প্রভুর নিকটে ।
একদিন গোপাল কহিলা করপুটে ॥ ৯৫ ॥
আনন্দে মগন মন প্রভুদেব রায় ।
ভাল ভাল বলিয়া গোপালে দিলা সায় ॥ ৯৬ ॥
মহামহোৎসবপ্রিয় রাম ছিলা কাছে ।
শুনিয়া আনন্দে মত্ত ধিয়া ধিয়া নাচে ॥ ৯৭ ॥
উৎসবের দিন স্থির করিয়া তখন ।
ভক্তবর্গে চারিদিকে বারতা প্রেরণ ॥ ৯৮ ॥
এই মহোৎসবে যাহা করিলা গোসাঁই ।
এমন কোথাও আমি চক্ষে দেখি নাই ॥ ৯৯ ॥
কথা তার বলিবার শক্তি মম কিবা ।
বলিতে করিলে চেষ্টা আগে হই বোবা ॥ ১০০ ॥
বুদ্ধিহারা আঁকিবার প্রয়াস যখন ।
স্ব-অঙ্গে অঙ্গুলি হয় কাঠির মতন ॥ ১০১ ॥
লীলার মাহাত্ম্যখেলা অব্যক্ত ব্যাপার ।
নয়নের ভোগ্য যোগ্য নহে রসনার ॥ ১০২ ॥
ঘটনাতে বর্ণনীয় যত দূর হয় ।
একমনে শুন মন বলি পরিচয় ॥ ১০৩ ॥
গোপাল আনন্দভরে মনের মতন ।
মহোৎসব হেতু করে দ্রব্য আয়োজন ॥ ১০৪ ॥
পরিবারবর্গমধ্যে দেখে কেবা ধুম ।
রাত্রিতে কাহার চক্ষে নাহি আসে ঘুম ॥ ১০৫ ॥
প্রতিবাসী জনে জনে শুনিল সবাই ।
গোপালের আবাসেতে আসিবে গোসাঁই ॥ ১০৬ ॥
সচকিতে রহে সবে কুতুহল মনে ।
শ্রীপ্রভুর চরণারবিন্দ-দরশনে ॥ ১০৭ ॥
কি পুরুষ কিবা নারী হোক যে রকম ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে সকলের মন ॥ ১০৮ ॥
কি জানি কি মোহনত্ব শ্রীনামেতে রয় ।
শুনিলে শ্রবণে সাধ দরশনে হয় ॥ ১০৯ ॥
প্রভুদরশনে-সাধ নহে যে জনার ।
লইয়া মানব-জন্ম বৃথা জন্ম তার ॥ ১১০ ॥
নির্ধারিত দিন তবে আসিল যখন ।
বেলাবেলি ভক্তবর্গ দেন দরশন ॥ ১১১ ॥
মহা-উৎসবের ঠাঁই বাহির প্রাঙ্গণে ।
ভাগবত করে পাঠ জনেক ব্রাহ্মণে ॥ ১১২ ॥
শত শত জনে পরিপূর্ণ নিকেতন ।
ভাগবতলীলাপাঠ করেন শ্রবণ ॥ ১১৩ ॥
শ্রবণ কেবল নামে মন নাহি তায় ।
সবে ভাবে কতক্ষণে আসিবেন রায় ॥ ১১৪ ॥
কেহ কেহ পথপানে আছে নিরখিয়া ।
পরিহরি পাঠস্থান দ্বারে দাঁড়াইয়া ॥ ১১৫ ॥
প্রভু বিনা কারও না হয় মন স্থির ।
কি পুরুষ কিবা নারী সকলে অধীর ॥ ১১৬ ॥
মন মোহনিয়া হেন প্রভুর মতন ।
জগতে কোথাও নাহি হয় দরশন ॥ ১১৭ ॥
কিবা মোহনত্ব-শক্তি ভিতরে তাঁহার ।
তিল আধ তত্ত্বশক্তি নাহি বর্ণিবার ॥ ১১৮ ॥
গুণযুক্ত নামহীন সেই বস্তুখানি ।
আপনার কলেবরে ধরে দিনমণি ॥ ১১৯ ॥
নলিনী প্রভাবে যার হইয়া মোহিত ।
বিকাশি কেশর-দল হয় প্রফুল্লিত ॥ ১২০ ॥
গুণমণি গুণের ঠাকুর প্রভুরায় ।
গুণ করি খুন কৈলা যে দেখিল তাঁয় ॥ ১২১ ॥
মোহনত্ব-গুণ নহে কেবল শরীরে ।
নামেরও সহিত গুণ ছায়াবৎ ঘুরে ॥ ১২২ ॥
শ্রবণ-বিবরে নাম প্রবেশের দ্বার ।
পশিলে অন্তরে করে জোর অধিকার ॥ ১২৩ ॥
চক্ষু কিবা কর্ণ হোক যে পথে গমন ।
একমাত্র ধর্ম কর্ম চুরি-করা মন ॥ ১২৪ ॥
কানের দুয়ারে যেথা জোর সেথা ভারি ।
শতগুণে বৃদ্ধি গুণ মন করে চুরি ॥ ১২৫ ॥
ছাদের উপরে হেথা পথের দু-ধারে ।
নরনারী কত শত সংখ্যা কেবা করে ॥ ১২৬ ॥
দাঁড়াইয়া মহোৎসুকে কুতুহল মন ।
দেখিবারে প্রভুবরে পতিতপাবন ॥ ১২৭ ॥
ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু বিশ্বগুরু রায় ।
উপনীত হেনকালে হইলা তথায় ॥ ১২৮ ॥
ভাসিল আগোটা পল্লী আনন্দের নীরে ।
নয়ন আনন্দকর প্রভুবরে হেরে ॥ ১২৯ ॥
চকোর ভকতবৃন্দ পরম উল্লাসী ।
নেহারিয়া প্রভুদেবে অকলঙ্ক শশী ॥ ১৩০ ॥
কথক একাকী ধরি শতেকের বল ।
করিতে লাগিল পাঠশ্রবণমঙ্গল ॥ ১৩১ ॥
পাঠেতে তথাপি কারও নাহি বসে মন ।
পিপাসী নয়নে করে রায়ে নিরীক্ষণ ॥ ১৩২ ॥
শ্রীমুরতি-দরশনে সকলের তৃপ্তি ।
কথক করিল তবে পাঠের সমাপ্তি ॥ ১৩৩ ॥
বনয়ারি নামেতে বৈষ্ণব একজন ।
দলে দলে ধরিলেন মাথুর-কীর্তন ॥ ১৩৪ ॥
কীর্তনে আখর-যোগ শ্রীপ্রভুর ধারা ।
যাহা ক্রমে প্রভু হন নিজে মাতোয়ারা ॥ ১৩৫ ॥
ঘন
ঘন ভাবাবেশ সমাধি গভীর ।
ইন্দ্রিয়াদিসহ একেবারে স্থির ॥ ১৩৬ ॥
সংক্রামকতা-শক্তি এক প্রভুর আবেশে ।
ভক্ত অভিভূত সব রহে যাঁরা পাশে ॥ ১৩৭ ॥
ঘূর্ণিপাক জলের স্বভাব উপমায় ।
যে আসে সকাশে ধ্রুব তাহায় ঘুরায় ॥ ১৩৮ ॥
প্রভুর ভাবের বেগে হইয়া মগন ।
ভাবস্থ হৈলা তবে ভক্ত কয়জন ॥ ১৩৯ ॥
বিষম লাটুর ভাব উদয় প্রবল ।
নখ দিয়া বিদারণ করে বক্ষঃস্থল ॥ ১৪০ ॥
কৃষ্ণেতে মধুর ভাব দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
উপলক্ষ গুরু মোর আরাধ্য-চরণ ॥ ১৪১ ॥
সখী নামে জানা তিনি ভক্তের ভিতরে ।
মগন হইলা ভাবে কালিয়া-পাথারে ॥ ১৪২ ॥
অল্পবয়ঃ মণি গুপ্ত বালক বয়েস ।
বাহ্যহীনে শ্যামকুণ্ডে করিল প্রবেশ ॥ ১৪৩ ॥
আর কেহ কাঁদে কেহ ভাবোন্মত্তপ্রায় ।
তিলেকে তুমুল কাণ্ড ঘটাইল রায় ॥ ১৪৪ ॥
বুদ্ধিহারা দর্শকেরা করে নিরীক্ষণ ।
দাঁড়াইয়া জড়বৎ যষ্টির মতন ॥ ১৪৫ ॥
এখন প্রবল ভাব শ্রীঅঙ্গে প্রভুর ।
যাহাতে উঠিল কণ্ঠে শ্রুতিমোহ সুর ॥ ১৪৬ ॥
আপনার ভাবে নিজে হইয়া মোহিত ।
ধরিলেন একখানি কীর্তনের গীত ॥ ১৪৭ ॥
বড়ই মধুর প্রাণ-মাতানিয়া গান ।
একত্রে ভক্তেরা তাহে কৈল যোগদান ॥ ১৪৮ ॥
সঙ্গে পেয়ে সাঙ্গোপাঙ্গ আপনার ঠাঁই ।
অধিক প্রমত্ততর হইলা গোসাঁই ॥ ১৪৯ ॥
গীতের সহিত নৃত্য সিংহের বিক্রম ।
লম্ফে ধরা কম্পমান ভীষণ গর্জন ॥ ১৫০ ॥
তাহার মধ্যেতে কভু কলেবর স্থির ।
বাহিক-গিয়ানশূন্য সমাধি গভীর ॥ ১৫১ ॥
কভু কান্তিময় মুখ চন্দ্রিমার পারা ।
কখন নয়নে বহে বরিষার ধারা ॥ ১৫২ ॥
কখন সঘনে পাণি কাঁপে ঘনে ঘন ।
কখন খসিয়া পড়ে কটির বসন ॥ ১৫৩ ॥
স্বরের জড়তা কভু বাক্য নাহি ফুটে ।
কখন বা উচ্চরব রসনায় উঠে ॥ ১৫৪ ॥
কভু পুনঃ ভীম নৃত্য পূর্বের মতন ।
একাধারে নানাবিধ ভাব-প্রদর্শন ॥ ১৫৫ ॥
ভক্তগণ কি রকম এমন সময় ।
শুন মন যথাসাধ্য কহি পরিচয় ॥ ১৫৬ ॥
কেহ বা অচল-পদ বাহ্য নাহি গায় ।
কেহ বা অর্ধেক বাঁকা ধনুকের প্রায় ॥ ১৫৭ ॥
কেহ বা উন্মক্ত আঁখি স্থির আঁখি-তারা ।
দাঁড়াইয়া একধারে বুদ্ধিবলহারা ॥ ১৫৮ ॥
কেহ পাগলের পারা ভীম হাস্য করে ।
সরোদনে লুটে কেহ ধরার উপরে ॥ ১৫৯ ॥
নাচিয়া নাচিয়া কেহ বলে হরি হরি ।
কেহ শ্রীচরণতলে যায় গড়াগড়ি ॥ ১৬০ ॥
রঙ্গের তুফান বৃদ্ধি ক্রমশই পায় ।
লীলারঙ্গরসপ্রিয় প্রভুর ইচ্ছায় ॥ ১৬১ ॥
ভক্তগণ অনেকে অধীর-কলেবর ।
দলে দলে খালি পড়ে ভূমির উপর ॥ ১৬২ ॥
কদলীর ঝাড় যেইরূপ উপমায় ।
এক মুখে ধরাসাৎ হয় ঝঞ্ঝাবায় ॥ ১৬৩ ॥
প্রভুরায় কি করিলা শুন বিবরণ ।
যেখানে ভক্তের মালা ধুলায় পতন ॥ ১৬৪ ॥
প্রসারি দক্ষিণ পদ সেব্য কমলার ।
তদুপরি সমাধিস্থ হইলা আবার ॥ ১৬৫ ॥
প্রত্যাকৃতি ছবিখানি কি কহিব লিখে ।
যেমন দক্ষিণা-কালী মহেশ্বর বুকে ॥ ১৬৬ ॥
শ্রীঅঙ্গ পশ্চাতে হেলা পাছে পড়ে ছুঁয়ে ।
সেহেতু দু-জন ভক্ত ধরিলেন গিয়ে ॥ ১৬৭ ॥
এবে অপরূপ কিবা শ্রীমুখ প্রভুর ।
ঢলঢল ঝলমল যেমন মুকুর ॥ ১৬৮ ॥
কোমল
প্রশান্ত মূর্তি ধীরে ধীরে খেলে ।
নয়নের মনোলোভা দেখিলেই ভুলে ॥ ১৬৯ ॥
অন্তরালে ভক্তিমতী কুলবতীগণ ।
বারে বারে বন্দি আমি তাঁদের চরণ ॥ ১৭০ ॥
ভুবনমোহনরূপ নেহারি নয়নে ।
করিতে লাগিল শঙ্খ-নাদ ঘনে ঘনে ॥ ১৭১ ॥
বাহিরে কাঁসর-ঘণ্টা তার সঙ্গে বাজে ।
গোলোকের ছবি আজি অবনীর মাঝে ॥ ১৭২ ॥
ধন্য ধন্য নরসাজে লীলা ভাগবত ।
ধন্য ধন্য সাঙ্গোপাঙ্গ যতেক ভকত ॥ ১৭৩ ॥
ধন্য ধন্য জীবগণ কলিকাল ধন্য ।
যেই কালে রামকৃষ্ণরায় অবতীর্ণ ॥ ১৭৪ ॥
প্রভুর সমাধি-ভঙ্গ হৈলে ক্রমে ক্রমে ।
উপবিষ্ট হইলেন নিজের আসনে ॥ ১৭৫ ॥
প্রাঙ্গণে অত্যুচ্চাসন কোমল তেমন ।
কোমল কমলাদপি শ্রীঅঙ্গ যেমন ॥ ১৭৬ ॥
বসিয়া যখন প্রভু আসন-উপরে ।
শ্রীনবগোপাল তাঁয় পান দেখিবারে ॥ ১৭৭ ॥
মনোহর মূর্তিখানি আঁখি-বিমোহন ।
ঝলকে ঝলকে খেলে চাঁদের কিরণ ॥ ১৭৮ ॥
পরম সুন্দর রূপ ভুবনে অতুল ।
গোপাল দেখিয়া বুঝে নয়নের ভুল ॥ ১৭৯ ॥
সেইহেতু সকলের মুখপানে চায় ।
বিদ্যমান যাবতীয় আছিল সেথায় ॥ ১৮০ ॥
কাহারও বদনে নহে লাবণ্য তেমন ।
শ্রীমুখমণ্ডলে যাহা করে দরশন ॥ ১৮১ ॥
তথাপিও আঁখি ভ্রান্তি বিবেচনা করি ।
নয়নে সিঞ্চন করে সুশীতল বারি ॥ ১৮২ ॥
পাখালিয়া আঁথিদ্বয় হয় নিরীক্ষণ ।
শ্রীমুখমণ্ডলে ভাতি পূর্বের মতন ॥ ১৮৩ ॥
তখন হইয়া তেঁহ বিমুক্ত-সংশয় ।
সোদরে ডাকিয়া অতি ধীরে ধীরে কয় ॥ ১৮৪ ॥
বিস্ময়ে আবিষ্ট চিত্ত কর দরশন ।
প্রভুর মুখারিবিন্দে চাঁদের কিরণ ॥ ১৮৫ ॥
রূপচোরা ভক্তের ঠাকুর প্রভুরায় ।
ভক্তবিনা রূপ অন্যে দেখিতে না পায় ॥ ১৮৬ ॥
বার বার সহোদর চায় তাঁর পানে ।
দেখিতে না পায় রূপ প্রভুর বয়ানে ॥ ১৮৭ ॥
গোপালেরে কহিলেন সোদর তাঁহার ।
শ্রীবয়ানে কোনখানে রূপ চন্দ্রিমার ॥ ১৮৮ ॥
রূপ কি লাবণ্য ভাতি বদনমণ্ডলে ।
গন্ধ কি আভাস মোর নয়নে না মিলে ॥ ১৮৯ ॥
শুনি সোদরের কথা গোপাল তখন ।
প্রেমে করে দুনয়নে বারি বরিষণ ॥ ১৯০ ॥
ত্বরান্বিত অগ্রসর প্রভুর নিকটে ।
ধরিয়া যুগলপদ ধরাতলে লুটে ॥ ১৯১ ॥
প্রভুর স্বরূপ আজি করি দরশন ।
গোপাল বুঝিলা বেশ প্রভু কোন্ জন ॥ ১৯২ ॥
স্বার্থক জনম তাঁর ধরণীর তলে ।
ভক্তিমতিযুক্ত যেবা চরণকমলে ॥ ১৯৩ ॥
প্রহরেক প্রায় রাতি দেখিয়া এখন ।
ভোজনের কৈল ঠাই প্রভুর কারণ ॥ ১৯৪ ॥
সুন্দর দ্বিতলে এক ঘরের ভিতর ।
যেখানে করেন বাস মহিলা নিকর ॥ ১৯৫ ॥
এত কুলবতী আজি গোপালের ঘরে ।
সুবৃহৎ অন্তঃপুর তাহাতে না ধরে ॥ ১৯৬ ॥
প্রভুর দরশ-আশে গিয়াছে জুটিয়ে ।
আত্মীয়-কুটুম্বদের যাবতীয় মেয়ে ॥ ১৯৭ ॥
প্রভুর অন্তরে বহে কি ভাব কখন ।
নাহিক কাহার সাধ্য করে নিরূপণ ॥ ১৯৮ ॥
অন্তঃপুরে আজি ভাব দেখিবারে পাই ।
পদ পরশিতে কারে না দিলা গোসাঁই ॥ ১৯৯ ॥
যদি পরশন-আশে কেহ কাছে যায় ।
মা বলিয়া সমাধিস্থ তখনই রায় ॥ ২০০ ॥
গুটাইয়া পদদ্বয় কোলের ভিতরে ।
শঙ্কায় সান্নিধ্যে কেহ যাইতে না পারে ॥ ২০১ ॥
ব্যাপার দেখিয়া তবে গোপাল ঘরণী ।
প্রার্থনা করেন মনে জুড়ি দুই পাণি ॥ ২০২ ॥
কৃপাসিন্ধু দীনের ঠাকুর তুমি রায় ।
শ্রীচরণরেণু আজি কাঙ্গালিনী চায় ॥ ২০৩ ॥
ভক্তিমতী ভাগ্যবতী সরল-অন্তরা ।
পদরজ-হেতু ভক্তে দেখিয়া কাতরা ॥ ২০৪ ॥
অন্তরে
অন্তরে প্রভু দিলা তাঁরে সায় ।
গ্রহণ করহ রজ ইচ্ছা যেন যায় ॥ ২০৫ ॥
গৃহিণী আশ্বাস-বাক্য পাইয়া তখন ।
লইল চরণ-রজ ধরিয়া চরণ ॥ ২০৬ ॥
কিবা ভাগ্য গৃহিণীর পরিসীমা নাই ।
যাঁহারে এতেক কৃপা করিলা গোসাঁই ॥ ২০৭ ॥
শুন তার পরে কি হইল পরিচয় ।
রামকৃষ্ণ-লীলাগীতি শান্তির আলয় ॥ ২০৮ ॥
অটল বিশ্বাস-ভক্তি পাইয়া এখন ।
প্রকাশ্যে প্রার্থনা করে প্রভুর সদন ॥ ২০৯ ॥
পুরাইয়া দেহ সাধ বড় মনে মনে ।
নিজ হাতে দিব ভোজ্য তুলিয়া বদনে ॥ ২১০ ॥
বচনে উত্তর কিছু নাহি দিলা রায় ।
অন্তরে প্রদান কৈলা অনুমতি তাঁয় ॥ ২১১ ॥
তখন গৃহিণীদেবী মহানন্দমনে ।
স্বহস্তে তুলিয়া ভোজ্য দিলেন বদনে ॥ ২১২ ॥
পুলকে আকুল-চিত্ত চক্ষু ভাসে জলে ।
প্রভুদেবে জ্ঞান যেন পেটে-ধরা ছেলে ॥ ২১৩ ॥
ভক্তির মধুর তত্ত্ব কি কহিতে পারি ।
সামান্য মানুষ মুই নরবুদ্ধি ধরি ॥ ২১৪ ॥
ইচ্ছাময় সনাতন হরি তথা বশ ।
উদয় যেথায় ভক্তি-মাধুর্যের রস ॥ ২১৫ ॥
ঈশ্বরের ঈশ্বরত্ব একেবারে নাশ ।
যেখানে তাঁহার শুদ্ধাভক্তির বিকাশ ॥ ২১৬ ॥
ষড়ৈশ্বর্যবান বিষ্ণু ভক্তির নিকটে ।
জড়সড় আজ্ঞাপর সদা করপুটে ॥ ২১৭ ॥
ভক্তির মাধুর্য-রস আস্বাদন-হেতু ।
সর্বশক্তিমান সদা সশঙ্কিত ভীতু ॥ ২১৮ ॥
ভক্তির কোমল হাতে বাঁধা ভগবান ।
অখণ্ড সচ্চিদানন্দ শিশুর সমান ॥ ২১৯ ॥
বেদবিধি কর্মকাণ্ড কিছু নাহি রয় ।
ভক্তির সৌরভ যেথা অণুকণা বয় ॥ ২২০ ॥
গোপ-গোপী বিনা এই ভক্তির সন্ধান ।
সম্ভোগ সুদূর কারও নহে অনুমান ॥ ২২১ ॥
আজি সেই ভক্তিরস-আস্বাদের তরে ।
মূর্তিমান ভগবান গোপালের ঘরে ॥ ২২২ ॥
মানবিনী বেশে কেবা গোপাল-ঘরণী ।
সাধ্য নাই চিনি তাঁয় দৃষ্টিহীন আমি ॥ ২২৩ ॥
প্রভুভক্তপদে ভিক্ষা মাগি বারবার ।
রজ দিয়া কর মুক্ত লোচন-আঁধার ॥ ২২৪ ॥
একমাত্র শুদ্ধাভক্তি বলে যায় জানা ।
প্রভুর সমান প্রভু-ভক্তের মহিমা ॥ ২২৫ ॥
লীলা-গীতি ঈশ্বরের সে বুঝে কেবল ।
ভক্তপদরেণু যার সহায় সম্বল ॥ ২২৬ ॥
প্রেমাভক্তি শুদ্ধাভক্তি ভক্তে করি দান ।
ভক্তির আস্বাদে মত্ত হন ভগবান ॥ ২২৭ ॥
নিম্নতলে যেইখানে ভকতের দল ।
ভক্তির ঠাকুর হয়ে ভাবেতে বিহ্বল ॥ ২২৮ ॥
দেবেন্দ্র প্রভৃতি সাঙ্গ-অন্তরঙ্গে কন ।
ভক্তিমতী গোপালের গৃহিণী কেমন ॥ ২২৯ ॥
বলিবারে বিবরণ বিশেষ প্রকারে ।
বিহ্বল এতই মুখে বাক্য নাহি সরে ॥ ২৩০ ॥
রসনার দ্বারে পথ না পেয়ে তখন ।
অধরে নয়নে চিত্র কৈলা প্রদর্শন ॥ ২৩১ ॥
ভক্তি-সম্ভোগের তত্ত্ব নিগূঢ় বারতা ।
ভাষায় প্রকাশে তায় হেন শক্তি কোথা ॥ ২৩২ ॥
সম্ভোগীর বদনের হাবভাবে কয় ।
আভাস কেবলমাত্র পরিচয় নয় ॥ ২৩৩ ॥
তরঙ্গ কোথায় বল প্রকাশিতে পারে ।
কত বড় সিন্ধু কিংবা কি তার ভিতরে ॥ ২৩৪ ॥
এই ভক্তি ভক্তের হৃদয়ে করে বাস ।
ভক্তের যে জন ভক্ত মুই তাঁর দাস ॥ ২৩৫ ॥
শুনি গৃহিণীর ভক্তি প্রভুর বদনে ।
নমস্কার উদ্দেশে করেন ভক্তগণে ॥ ২৩৬ ॥
এখানে গোপাল দেখি রাতি উর্ধ্বতন ।
ভক্তদের করিলেন ভোজন-আসন ॥ ২৩৭ ॥
চর্ব চুষ্য লেহ্য পেয় চতুর্বিধ রসে ।
গোপাল করিল তুষ্ট ভক্তগণে শেষে ॥ ২৩৮ ॥
ত্রুটি নাই আয়োজনে বহু আমদানি ।
ভক্তিমতী লক্ষ্মীরূপে ঘরের গৃহিণী ॥ ২৩৯ ॥
আজিকার ভিক্ষা-লীলা এইখানে সায় ।
ভক্তিমানে শুনে কথা ভক্তিমানে গায় ॥ ২৪০ ॥
রামকৃষ্ণকথা অতি শ্রবণ-মঙ্গল ।
স-মনে শুনিলে ফুটে হৃদয়-কমল ॥ ২৪১ ॥