চতুর্থ খণ্ড
শ্রীদেবেন্দ্রের গৃহে প্রভুর উৎসব
জয়
জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥
ভক্তি-বিবর্জিত স্থল,
এবে এই ধরাতল,
ধরাতল যেন রসাতলে ।
বিবেকী বিরাগী ভক্ত, বিশ্বাসে ঈশ্বরাসক্ত,
কোটিতে জনেক নাহি মিলে ॥ ১ ॥
ধনধান্যে রত্বে ভরা, হাহাকার বসুন্ধরা,
দিশাহারা যত জীবগণ ।
মত্তচিত্ত নিরবধি, দ্বেষ-হিংসা পূর্ণ-হৃদি,
কামিনী-কাঞ্চনময় মন ॥ ২ ॥
নিকেতন দেহ পুরে, বন্ধ মন লিঙ্গোদরে,
নাহি উঠে নাভির উপর ।
আত্মসুখে অতিপ্রিয়, শ্রেয়োজ্ঞান যেবা হেয়,
নারকীয় রুচি প্রীতিকর ॥ ৩ ॥
হেনকালে কি বিচিত্র, প্রভুসঙ্গে
প্রভুভক্ত,
নরদেহ করিলা ধারণ ।
দিগ্ দিগন্তর থেকে, ক্রমে ক্রমে একে একে,
লীলাসরে দিলা দরশন ॥ ৪ ॥
প্রভু-ভক্ত যাঁরা যাঁরা, সকলেই বর্ণ-চোরা,
চেনা ধরা বড়ই বিষম ।
ছদ্মবেশে নরতনু, ভিতরে গোপন ভানু,
মায়ায় বরন আবরণ ॥ ৫ ॥
স্বতন্তর প্রকৃতিতে, মিলে না জীবের সাথে,
কর্মে ভাসে তাহার লক্ষণ ।
সাধ যদি দেখিবারে, লীলাগীতি ধীরে ধীরে,
ভক্তিভরে কর আন্দোলন ॥ ৬ ॥
প্রভু-পদে অনুরক্ত, দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ভক্ত,
অন্তরঙ্গ প্রভুর আমার ।
সখীভাব বলবতী, শ্রীকৃষ্ণের বুঝেন পতি,
ভারতী শুনহ চমৎকার ॥ ৭ ॥
স্বভাব সংরক্ষণ করা, প্রভুর প্রকৃতি-ধারা,
আগাগোড়া প্রত্যক্ষ লীলায় ।
তেই দেবেন্দ্রের সনে, সঙ্কেতে নয়ন-কোণে,
রসভাষ কথায় কথায় ॥ ৮ ॥
কিবা রঙ্গ মধুরের, জীবে নাহি জানে টের,
সে ভাব দুর্বোধ্য অতিশয় ।
সুগোপ্য কাহিনী তার, শক্তি নাহি বুঝিবার,
রিপুগ্রস্ত অন্তরাতিশয় ॥ ৯ ॥
গোপীভাব বুঝা শক্ত, গোপীগণে ভাব গুপ্ত,
গোপী-অঙ্গ রঙ্গ-স্থল তার ।
যেমন দামিনী-দ্যুতি, মেঘমধ্যে অবস্থিতি,
খেলে দুলে মেঘের সঞ্চার ॥ ১০ ॥
রহস্য কি বুঝা যায়, ব্রজগোপী নরকায়,
লয়ে শিরে ভাবের পশরা ।
অবতীর্ণ প্রভুসনে, লীলাঙ্গনে ধরাধামে,
কৃষ্ণ-প্রেমে চিত্ত মাতোয়ারা ॥ ১১ ॥
অধমে সদয় হয়ে, চরণে আশ্রয় দিয়ে,
লইয়া গেলেন যেই জন ।
যেইখানে গুণমণি, অনন্ত অখিলস্বামী,
এই সেই দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ॥ ১২ ॥
করুণা করিয়া যাঁর, হইবেন
কর্ণধার,
ধ্রুব তাঁর কৃষ্ণদরশন ।
অকুতঃসাহস প্রাণে, সাক্ষ্য দিব জনে জনে,
প্রভুদেবে করিয়া স্মরণ ॥ ১৩ ॥
লীলার ভারতীগুণে, সহজে বুঝিবে মনে,
দেবেন্দ্র আরাধ্য দেবতার ।
যশোদার নীলমণি, বৃন্দাবনচন্দ্র যিনি,
পরম হৃদয়-বন্ধু তার ॥ ১৪ ॥
ব্রাহ্মণ অযোত্রমান, দাস্যবৃত্তে গুজরান,
আয়ের অধিক প্রায় ব্যয় ।
দুঃখসুখে কাটে দিন, কখন ছাড়ে না ঋণ,
খরচে কাতর কিন্তু নয় ॥ ১৫ ॥
অভাবে আটক নয়, নানা কাজে নানা ব্যয়,
এবে সাধ অন্তরে উদ্ভব ।
আয়ে হোক হোক ঋণে, সভক্তে প্রভুরে এনে,
ভবনে করেন মহোৎসব ॥ ১৬ ॥
শ্রীচরণে জুড়ি কর, নিবেদিলা
ভক্তবর,
পুরাইতে মনের বাসনা ।
শুনি কন বিশ্বস্বামী, গরীব
ব্রাহ্মণ তুমি,
তোমারে একাজে করি মানা ॥ ১৭ ॥
বাক্যে মাত্র নিবারণ, কিন্তু যাহে হয় মন,
লক্ষণ প্রকাশে হাস্যাননে ।
ঋণ করি ঘৃত খাই, রহস্য করি গোসাঁই,
সায় দিলা উৎসবায়োজনে ॥ ১৮ ॥
আনন্দে উথলাচিত, দিন করি নির্ধারিত,
প্রত্যাগত আবাসে ব্রাহ্মণ ।
দ্রব্যজাত ধারে ঋণে, সাধ্যমত নিলা কিনে,
ভক্তগণে কৈলা নিমন্ত্রণ ॥ ১৯ ॥
রামকৃষ্ণোৎসবানন্দ, চাঁই ভক্ত রামচন্দ্র,
উৎসবের খবর পাইয়া ।
উল্লাসে উথলাচিত্ত, ধিয়া ধিয়া করে নৃত্য,
উর্ধ্ব দেশে দু-বাহু তুলিয়া ॥ ২০ ॥
উৎসবপিয়ারা হেন, ভক্তোত্তম রাম যেন,
এমন কেহই নহে আর ।
নিকেতনে দেবেন্দ্রের, যথা দিনে উৎসবের,
সকলের অগ্রে আগুসার ॥ ২১ ॥
ক্রমশঃ অপরে সবে, যোগ দিতে মহোৎসবে,
জুটিয়া পড়িল যথা ঠাঁই ।
সন্দেশ এমন কালে, উপনীত ভক্তদলে,
প্রায়াগত প্রেমের গোসাঁই ॥ ২২ ॥
মহানন্দময় ঠাম, যেই স্থলে
মূর্তিমান,
মহানন্দে ভাসে সেই স্থল ।
যেখানে ছিলেন যিনি, সবে দিয়া জয়-ধ্বনি,
হইলেন হরষে চঞ্চল ॥ ২৩ ॥
যেন নিধুকুঞ্জবনে, শাখিচুড়ে
বিহঙ্গমে,
উল্লাসে কুজন গীত গায় ।
দেখিয়া পুরবে শোভা, প্রত্যুষে অরুণ-আভা,
বিরঞ্জিত সুন্দর ছটায় ॥ ২৪ ॥
কেহ যান অগ্রে ছুটি, পরিহরি গৃহ বাটী,
তুষিবারে সতৃষ্ণ নয়নে ।
কাছে প্রতিবাসী যত, আড়ি পেতে অবস্থিত,
নেহারিতে অতুল চরণে ॥ ২৫ ॥
কিবা সবে ভাগ্যবান, হেলায় দেখিতে পান,
ভগবান নরদেহধারী ।
সৃষ্টিস্থিতিলয় যাঁর,
কটাক্ষেতে একবার,
বিধি বিষ্ণু শিব আজ্ঞাকারী ॥ ২৬ ॥
কেহ না চিনিল বটে, কাল-দড়ি গেল কেটে,
এড়াইল জঠর-জনমে ।
বিশ্বাসে পুরাণ কয়, পুনর্জন্ম
নাহি হয়,
বারেক শ্রীমুখ-দরশনে ॥ ২৭ ॥
দরশনে কিবা ফল,
নষ্ট ধর্মকর্মফল,
জন্ম জন্ম জন্মে পায় ত্রাণ ।
করুণার সঙ্গে সিন্ধু, উপমায় এক বিন্দু,
দীনবন্ধু অতি সত্য নাম ॥ ২৮ ॥
মুক্তি ত্রাণ বলে কারে, ব্যাপার ধরে না শিরে,
শুন অর্থ মধ্যে কত দূর ।
তুলনায় বুঝ কাণ্ড,
জন্ম জন্ম কারাদণ্ড,
হেলায় খালাস বেকসুর ॥ ২৯ ॥
দ্রবিয়া করুণ রসে, দীন সাজ ছদ্মবেশে,
আপনি আগত ভগবান ।
ন্যায়ের নিয়ম ছেড়ে, পাপী তাপী যাবে ভারে,
অকাতরে দিতে মুক্তিদান ॥ ৩০ ॥
হেথা উৎসবের স্থলে, প্রভুদেব প্রবেশিলে,
ভক্তবর্গ চরণে লুটান ।
প্রভুর অপার সুখ,
উল্লাসে প্রফুল্লমুখ,
জনে জনে কুশল শুধান ॥ ৩১ ॥
নিজাসনে উপবিষ্ট, ভক্ত-প্রাণ
রামকৃষ্ণ,
পশ্চিমাস্যে ঘরের ভিতর ।
নিদাঘ আগতপ্রায়, ব্যজন করিয়া
গায়,
সেবা করে ভকতনিকর ॥ ৩২ ॥
ভক্তসহ ভগবান, যেইখানে বিদ্যমান,
মহিমা-মাহাত্ম্য তথাকার ।
কন শুক বেদব্যাস, বর্ণনে বিফল আশ,
তাহে কি কহিব মুই ছার ॥ ৩৩ ॥
বিদ্যায় বর্ণের ফলা, কামিনীকাঞ্চন মালা,
পেটের জ্বালায়
দাস্যগিরি ।
অর্থ চিন্তা অনুক্ষণ, অবিদ্যা-মোহিত মন,
এ অধম দারুণ সংসারী ॥ ৩৪ ॥
হৃদয়ে মলার ভার, অভিমান অহঙ্কার,
রাগ-লোভ-রিপুর অধীন ।
আত্ম-সুখহেতু ঘুরি, দিবা কিবা বিভাবরী,
তম-অন্ধে অন্তর মলিন ॥ ৩৫ ॥
দেহি প্রভু দীননাথ, বিশ্বগুরু ভক্তসাথ,
দৃষ্টিপাত করি এ অধমে ।
শুদ্ধভক্তি শুদ্ধমতি, যাহে পাব আঁখি-ভাতি,
মাহাত্ম্য মহিমা দরশনে ॥ ৩৬ ॥
শ্রীপদে বিশ্বাস সহ, শুদ্ধ বুদ্ধি মন দেহ,
যাহার গোচর তুমি রায় ।
অনুরাগে গাব নাম, বাহ্যহীনে অবিরাম,
লুটাইয়া চরণ-তলায় ॥ ৩৭ ॥
দেবেন্দ্র-মন্দিরে আজ, জগতের মহারাজ,
বিরাজে গোপনে ভক্তসনে ।
কিবা বিষ্ণু কিবা ধাতা, কিবা শিব মুক্তিদাতা,
বারতা কেহই নাহি জানে ॥ ৩৮ ॥
কিবা বস্তু প্রভু-ভক্ত,
মহিমা স্বরূপ-তত্ত্ব,
কারা এঁরা কোথাকার জন ।
এত দিন পাছু পাছু, তিল না বুঝিনু কিছু,
তোমারে কহিব কিবা মন ॥ ৩৯ ॥
শুনিয়াছি শ্রীবদনে,
এই ভক্তগণ বিনে,
দিনে প্রভু দেখেন আঁধার ।
পরিচয়ে গুণ মন,
কি অধিক বিবরণ,
শ্রবণ করিবে তুমি আর ॥ ৪০ ॥
আজিকার লীলাগীত, সুমধুর
সুললিত,
শুদ্ধচিত নিশ্চিত শ্রবণে ।
তিল ক্রান্তি নাহি সন্দ, অন্তরে অপারানন্দ,
রতিমতি ভক্তের চরণে ॥ ৪১ ॥
উৎসবে কীর্তন-গীতি, ইহাই আছিল রীতি,
সম্প্রতি গায়ক একজন ।
দোঁহার নাহিক তার, এক খুলি বাজন্দার,
দোঁহে মিলি ধরিল কীর্তন ॥ ৪২ ॥
দলে নৈলে আট দশ, কীর্তনে না হয় রস,
দুই জনে কি করিবে গান ।
সেহেতু দোঁহার হয়ে, স্বরে স্বর মিলাইয়ে,
ভক্ত রাম কৈলা যোগদান ॥ ৪৩ ॥
ঠিক যেন পাঠশালে, যাবতীয় ছাত্র মিলে,
ষট্কে কড়া ঘোষে সমস্বরে ।
বুদ্ধিমান ঠিক কয়, বোকা যারা অতিশয়,
খালি তারা গণ্ডা-কড়া করে ॥ ৪৪ ॥
হেথা কিন্তু পরমেশ, তাহাতেই ভাবাবেশ,
হরিনাম শ্রবণে শুনিয়া ।
হেনকালে মহাতেজা, গিরিশ বিশ্বাসে রাজা,
উপনীত দিক্ বিজলিয়া ॥ ৪৫ ॥
নেহারিয়া ভক্তবরে, আনন্দ উঠিল
বেড়ে,
মোহন মুরতিাখনি তার ।
অল্প স্থান ছিল ঘরে, তাড়াতাড়ি সবে সরে,
দিলা তাঁরে ঠাঁই বসিবার ॥ ৪৬ ॥
আলো করি গোটা ঘর, উপবিষ্ট
ভক্তবর,
ভক্তিবলে অটল বিশ্বাসে ।
হেমকালে শুন রঙ্গ,
কীর্তন হইল ভঙ্গ,
প্রভু কিন্তু আছেন আবেশে ॥ ৪৭ ॥
গিরিশ করেন মনে, কল্পতরু
বিদ্যমানে,
হেন আর রব কত কাল ।
ভৈরবের আবস্থায়, ভূত প্রেত
কহে যায়,
এ তো বড় বিষম জঞ্জাল ॥ ৪৮ ॥
আবেশে হৃদয়চারী,
ভক্তপ্রাণ নরহরি,
উত্তর করিলা তাঁর প্রতি ।
আশ্চর্য হইবে লোকে, সময়ে তোমায় দেখে,
এত হবে তোমার উন্নতি ॥ ৪৯ ॥
যেন প্রভু ভাবাবেশে, প্রাণসম শ্রীগিরিশে,
দেখিতেছিলেন এতক্ষণ ।
নয়নে পলক আছে, সাধে বাজ পড়ে আছে,
সেই হেতু মুদিয়া নয়ন ॥ ৫০ ॥
পরম প্রসাদ-বাণী,
শুনি ভক্তচূড়ামণি,
অমনি প্রসারি দুই হাত ।
অতুল আনন্দভরে, অতি প্রীতি-সহকারে,
শ্রীচরণে কৈলা প্রণিপাত ॥ ৫১ ॥
কাটিছে আবেশ-নেশা, গায়ে বাহ্য ভাসা ভাসা,
অর্ধ-জাগা অর্থ-নিমগন ।
হেনকালে উপনীত,
অঙ্গে চিহ্ন চিত্রাঙ্কিত,
কর জনা গোসাঁই-ব্রাহ্মণ ॥ ৫২ ॥
মন্ত্র-ব্যবসায়ী তাঁরা, কটা
কটা আঁখি-তারা,
ছিটাফোঁটা অঙ্গে ভারি ভারি ।
শ্রীপ্রভুর ভক্তগণ,
দিয়া যোগ্য সম্ভাষণ,
বসাইলা নমস্কার করি ॥ ৫৩ ॥
কি ছিল তাদের মনে,
সুগোচর ভগবানে,
অনুমানে কি কহিব মন ।
এখানে প্রভুর দশা, শ্রীঅঙ্গে
আবেশ-নেশা,
ভক্তজনমন বিমোহন ॥ ৫৪ ॥
কহিলেন শ্রীগোসাঁই, আর লুচি
খাব নাই,
মধ্যে কিবা গূঢ়ার্থ ইহার ।
এত ভক্ত মহারাধ্য,
তখন বুঝিতে সাধ্য,
বুদ্ধিতে না আসিল কাহার ॥ ৫৫ ॥
গিরিশের বুদ্ধি মেলা, তেঁহ না পাইব তলা,
শুন কাই তাহার কারণ ।
এখন বুঝায়ে দিলে, ভেঙ্গে যায় গোটা লীলে,
সেই হেতু যতনে গোপন ॥ ৫৬ ॥
স্বভাব-সুলভ ধারা,
ভক্তমন চুরি করা,
মোহনিয়া মূরতি মধুর ।
করিলেই দরশন,
ঘরে না থাকিত মন,
আকর্ষণ শ্রীঅঙ্গে প্রভুর ॥ ৫৭ ॥
কিবা অর্থ শ্রীবাক্যের, তখন কে করে টের,
কান্তি-রূপে মন গেছে গাড়া ।
অপার-জলধি-নীরে,
মগন হইলে পরে,
দূরে রহে তরঙ্গের সাড়া ॥ ৫৮ ॥
সাঙ্গোপাঙ্গগণ যাঁরা, শ্রীবাক্যে কি ভাব
ভরা,
বুঝিতে অক্ষম সেইকালে ।
বাক্যের গুরুত্ব-গুণে, সতেজে প্রবেশি
কানে,
রহে গিয়া অন্তরের তলে ॥ ৫৯ ॥
শ্রীবাক্যে শ্রীপ্রভুদেবে, আভাস দিলেন এবে,
ভবিষ্যৎ লীলার ঘটনা ।
লীলা-নিধি যেবা মথে, সে দেখিবে বিধিমতে,
রতন মানিক মণি নানা ॥ ৬০ ॥
গোসাঁই-ব্রাহ্মণ হেথা,
শ্রীমুখে লুচির কথা,
বারবার করিয়া শ্রবণ ।
উঠিয়া চলিল ঘরে,
এই মনে মনে করে,
ভাল সাধু প্রভু নারায়ণ ॥ ৬১ ॥
কিছুক্ষণ পরে দেখি, উন্মীলিত
দুটি আঁখি,
প্রফুল্লিত কমল-বয়ান ।
নাহি আর ভাবাবেশ, সহজের মত
বেশ,
পূর্ণভাবে বাহ্যিক গিয়ান ॥ ৬২ ॥
দেবেন্দ্রের নিকেতনে, আজি উৎসবের দিনে,
লোকসংখ্যা অতিশয় কম ।
সেগুলি কেবল খালি, চিরসঙ্গ
যারে বলি,
উপ-অঙ্গ পাঁচ ছয় জন ॥ ৬৩ ॥
বিকালে পড়িল বেলা, যায় প্রায় রৌদ্র-জ্বালা,
তাপে তনু ঘর্মাক্ত সবার ।
হেনকালে ভগবানে, কুলপি দিলেন
এনে,
আস্বাদনে অতীব সুতার ॥ ৬৪ ॥
দ্রব্যটি প্রস্তুত কিসে,
মালাই নেবুর রসে,
মিশ্রিত তাহার মধ্যে চিনি ।
বরফে জমাট করা, টিনের
পাত্রেতে ভরা,
পরশিলে সুশীতল প্রাণী ॥ ৬৫ ॥
স্নিগ্ধকর দ্রব্য ঢের,
আছে বহু নিদাঘের,
ইহার মতন কেহ নয় ।
যতনে যোগাড় করি, করপদ্মে
দিয়া ধরি,
দিলা ভক্ত নিজ পরিচয় ॥ ৬৬ ॥
একেতো সুমিষ্ট দ্রব্য,
রসনার সুখসেব্য,
যেন প্রভু যোগ্য তাঁর মত ।
তাহে ভক্তিরসে মাখা, যেমন শ্রীচক্ষে
দেখা,
গুণমণি পুলকে পুর্ণিত ॥ ৬৭ ॥
উদর পুরিল দেখে, কিঞ্চিত
চাখিয়া মুখে,
ভক্তমধ্যে আজ্ঞা বিতরণ ।
দেবেন্দ্র লইয়া হাতে,
শ্রীপ্রভুর আজ্ঞামতে,
কৈলা মহাপ্রসাদ বণ্টন ॥ ৬৮ ॥
অতি অন্তরঙ্গ গণি,
মহেন্দ্র মাস্টার যিনি,
প্রভুপদপঙ্কজে ভ্রমরা ।
উলট পালট কোষে, মধু পিয়ে
শুষে শুষে,
মুখে নাই গুন্ গুন্ সাড়া ॥ ৬৯ ॥
কুলপি-প্রসাদে আজি,
সুমধুর কণ্ঠরাজি,
'এঙ্কোর' 'এঙ্কোর' রব করে ।
এঙ্কোরার্থ এই বটে,
প্রসাদ বড়ই মিঠে,
পুনরায় দাও কিছু মোরে ॥ ৭০ ॥
দেবেন্দ্র এমন কালে, হাসিয়া হাসিয়া বলে,
শ্রীগোচরে প্রভুর আমার ।
বেলা আর বড় নাই,
প্রস্তুত ভোজন ঠাঁই,
গাত্রোত্থান করুন এবার ॥ ৭১ ॥
শুনিয়া ভক্তের বাণী,
উঠিলেন গুণমণি,
চিন্তামণি ভক্তের ঠাকুর ।
ধীরে ধীরে গতিপথে, দেবেন্দ্র আছেন সাথে,
যেথায় দ্বিতলে অন্তঃপুর ॥ ৭২ ॥
প্রতিবাসী ললনারা, তৃষিত
চাতকী পারা,
বাড়ি ভরা আছেন তথায় ।
প্রভুদেবে নিরখিয়ে, একে একে যত মেয়ে,
প্রণাম করিলা রাঙ্গা পায় ॥ ৭৩ ॥
দেবেন্দ্র-ঘরণী যিনি, পতি
সেবাপরায়ণী,
পবিত্রচরিতা পতিব্রতা ।
পতিভক্তি চিতে পূর্ণ,
ইহসুখ-আশাশূন্য,
মহাপুণ্য শুনিলে বারতা ॥ ৭৪ ॥
ধ্যান পতি জ্ঞান পতি, ইষ্টভাব
পতি প্রতি,
দিবারাতি পতির সেবন ।
পতি বিনা নাহি জানা, দেবদেবী-আরাধনা,
কিংবা কোন ধরম করম ॥ ৭৫ ॥
বস্ত্রাবৃতা গোটা পায়,
প্রণমিলে রাঙা পায়,
তখন জানিলা অন্তর্যামী ।
স্বরূপ মূরতি তাঁর,
চিরদাসী আপনার,
লীলাপুরে দেবেন্দ্র-ঘরণী ॥ ৭৬ ॥
ভক্তিভরে দ্বিজকন্যে, করেছে প্রভুর
জন্যে,
নানাবিধ দ্রব্য ভোজনের ।
যাহে দিলা পরিচয়, এ কন্যা সামান্যা নয়,
এ সময় ঘরে মানুষের ॥ ৭৭ ॥
খাইতে খাইতে ভোজ্য, বিধিবিষ্ণু শিবপূজ্য,
ষড়ৈশ্বর্যবান গুণমণি ।
দেবেন্দ্রে ডাকিয়া কন, এ যে বাউলে ধরন,
ভক্তিমতী তোমার ঘরণী ॥ ৭৮ ॥
আহা কি সরলান্তরা, হৃদয় খোলার পারা,
ভোগ-আশা নাহি হৃদিপুরে ।
দিনেক সঙ্গেতে করি, লয়ে যেও কালীপুরী,
শ্রীমন্দিরে দক্ষিণশহরে ॥ ৭৯ ॥
ভক্তিপ্রিয় ভক্তবশ,
কহিতে ভক্তের যশ,
পুরিল উদর ভক্তিরসে ।
ভোজ্যমাত্র পাত্রে দেওয়া, হইল না আর খাওয়া,
গাত্রোত্থান হরিষে হরিষে ॥ ৮০ ॥
এখানে ব্যাকুল হয়ে, পথপানে আছে চেয়ে,
চিরভক্ত সাঙ্গোপাঙ্গগণ ।
আসি পুনঃ কতক্ষণে,
কথামৃত বরিষণে,
করিবেন তৃপ্ত প্রাণমন ॥ ৮১ ॥
শ্রীবাক্য এতই মিঠে, শুনিয়া আশা না মিটে,
যত শুনে তত বাড়ে তৃষা ।
কর্মফলে বাড়ে কর্ম,
তেমতি কথার ধর্ম,
শুনিলে শ্রুতির বৃদ্ধি আশা ॥ ৮২ ॥
শুন কি হইল পরে, ভক্তদের সেবা
তরে,
ভোজন-আসন পাতা করি ।
দেবেন্দ্র সহাস্যানন, সবে কৈলা আবাহন,
অন্তরে আনন্দ বাড়াবাড়ি ॥ ৮৩ ॥
হেথা প্রভু বাঁকা-আঁখি, বালিশে আলিস রাখি,
পূর্বদিকে করিয়া শিয়র ।
বিশ্রামের তরে মাত্র,
উন্মীলিত দুটি নেত্র,
এক প্রান্তে গৃহের ভিতর ॥ ৮৪ ॥
সকলে যাইলে পরে, শ্রীঅঙ্গে কে সেবা করে,
সেইহেতু দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
করুণার নাহি ওর, চির
ইষ্টাকাঙ্ক্ষী মোর,
আমারে করিলা আবাহন ॥ ৮৫ ॥
বাহিরে আছিনু দূরে, হাতে পাখা দিয়া জোরে,
লইয়া চলিলা প্রভু-পাশ ।
প্রণিপাত দ্বিজোত্তমে, কত কৃপা এ অধমে,
শ্রীঅঙ্গেতে করিতে বাতাস ॥ ৮৬ ॥
ভক্তবর্গ কুতূহলে, অন্তঃপুরে
প্রবেশিলে,
পদ-প্রান্তে দুই শ্রীপ্রভুর ।
আর এক ভাগ্যবান, ছিল তথা বিদ্যমান,
নাম তাঁর উপেন্দ্র ঠাকুর ॥ ৮৭ ॥
ভয়ে মুই ভেবাচেকা, ডানি হাতে করি পাখা,
ধীর ধীর সুমন্দ চালনে ।
পাছে বায়ু বেশী বয়, শ্রীঅঙ্গে নাহিক
সয়,
কোমল এতই পরিমাণে ॥ ৮৮ ॥
ভক্তের করুণা-বলে, যা না মিলে তাই মিলে,
আজি মুই বসিয়া কোথায় ।
শ্রীচরণতলে তাঁর,
বিধি পঞ্চানন যাঁর,
যোগাসনে মূরতি ধিয়ায় ॥ ৮৯ ॥
শুনা ছিল গ্রন্থে গায়,
ভক্তের ঠাকুর রায়,
প্রত্যক্ষ করিহ বিলোকন ।
কৃপা যদি ভক্ত করে,
দুর্লভ পরমেশ্বরে,
মিলে বিনা সাধনভজন ॥ ৯০ ॥
কল্পতরু প্রভু কিসে, শুন কহি সবিশেষে,
পদ-প্রান্তে পাখা করি তাঁয় ।
বাসনা হইল মনে, সেবিবারে
শ্রীচরণে,
স্বেচ্ছায় যদ্যপি দেন রায় ॥ ৯১ ॥
তখনি দক্ষিণেতর,
শ্রীপদ শ্রীগুণধর,
প্রসারণ কৈলা মম কোলে ।
কমলার সেব্য পাদ, সেবিয়া মিটান্ন সাধ,
জনম সফল ধরাতলে ॥ ৯২ ॥
করি শ্রীচরণসেবা, দেখিনু
পাইনু কিবা,
তোমারে কি দিব পরিচয় ।
প্রত্যক্ষে হইল ঐক্য, পুরাণাদি ঋষি-বাক্য,
তন্ত্রগ্রন্থ বেদান্তনিচয় ॥ ৯৩ ॥
সেবা করি সমাপন, নিম্নতলে
ভক্তগণ,
দরশন দিলা দলে দলে ।
দিবা প্রায় অবসান, পাটে দিনকর
যান,
রক্তিম তিলক নভোভালে ॥ ৯৪ ॥
আনন্দ সুখের ক্ষণ, দ্রুত করে
পলায়ন,
সন্ধ্যার হইল আগমন ।
তিমিরে ঢাকিতে দিশি, দিন না আলোকরাশি,
বিকাশিয়া উজ্জ্বল কিরণ ॥ ৯৫ ॥
শোভে শূন্যে তারকারা, উজ্জ্বল হীরার পারা,
কিবা কান্তি না যায় বাখানি ।
আলোক বসন পরা,
মাটির বনান ধরা,
মনোহরা ধরিল সাজনি ॥ ৯৬ ॥
সুশীতল সমীরণ, ধীর মন্দ সঞ্চালন,
অনুক্ষণ সুখকর বয় ।
আগোটা প্রকৃতিদেবী, মরি কি সুরম্য
ছবি,
যেন নব পূর্বেকার নয় ॥ ৯৭ ॥
লীলাপ্রিয় নরহরি, উৎসব সমাধা করি,
প্রভুদেব লীলার ঈশ্বর
।
ঘোড়াগাড়ি আরোহণে, সেবাপর ভক্ত সনে,
চলিলেন দক্ষিণশহর ॥ ৯৮ ॥
পশ্চাতে নিজের কথা, হৃদয়ে রহিল গাঁথা,
তোমাকেও কহিবার নয় ।
রামকৃষ্ণ-লীলামৃত,
পান
কর অবিরত,
ক্রমে পরে পাবে পরিচয় ॥ ৯৯ ॥