চতুর্থ খণ্ড
ভক্তের ঠাকুর
জয়
জয় রামকৃষ্ণ বিশ্বগুরু যিনি।
জয় মাতা শ্যামাসুতা জগৎ জননী ॥
জয় জয় যাবতীয় ভক্ত দোঁহাকার ।
এ অধ্ম পদরজ মাগে সবাকার ॥
সুমধুর লীলাকথা অতি সুললিত ।
অক্ষরে অক্ষরে তাহে বরষে অমৃত ॥ ১ ॥
নিশ্চিত শীতল প্রাণ শ্রবণ কীর্তনে ।
প্রেমভক্তি পায় স্ফুর্তি ভারতীর গুণে ॥ ২ ॥
আজ্ঞামত শ্রীপ্রভুর দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
যাইতে দক্ষিণেশ্বরে কৈলা আয়োজন ॥ ৩ ॥
সঙ্গে ল'য়ে ভক্তিমতী সরলা গৃহিণী ।
আর তাঁর পক্ককেশা বৃদ্ধক জননী ॥ ৪ ॥
বিহারী মুখুজ্যে এক আপনার জন ।
কৌল শাক্ত প্রভুপদে ভক্তি বিলক্ষণ ॥ ৫ ॥
যার প্রতি দেবেন্দ্রের পড়ে কৃপা-কণা ।
সেখানে নিশ্চয় হয় প্রভুর করুণা ॥ ৬ ॥
স্বচক্ষে লীলার হাটে কৈনু দরশন ।
প্রভু রাজি রাজি যেথা দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ॥ ৭ ॥
বিহারী গরীব বড় বাহারিতে ঘর ।
অর্থ-উপার্জনে আসে শহর-ভিতর ॥ ৮ ॥
দৈবযোগে দেবেন্দ্রের সঙ্গে পরিচয় ।
সন্তানের সম গণি দিলেন আশ্রয় ॥ ৯ ॥
পাত্র দেখি পুত্রাপেক্ষা করেন যতন ।
চাকরি করিয়া দিলা মনের মতন ॥ ১০ ॥
অর্থ-পরমার্থে দু'য়ে পূর্ণ অভিলাষ ।
জনশ্রুতি কহে সৎসঙ্গে কাশীবাস ॥ ১১ ॥
দেবেন্দ্রের কৃপায় তাহারে কৃপাবান ।
ভক্তাধীন ভক্ত-প্রিয় প্রভু ভগবান ॥ ১২ ॥
প্রভুদেব একদিন দেবেন্দ্রকে কন ।
বিহারী প্রকৃত সিদ্ধ কৌল একজন ॥ ১৩ ॥
শুন দিনেকের কথা কহি তোরে মন ।
সরস্বতী পূজা করে বিহারী ব্রাহ্মণ ॥ ১৪ ॥
প্রত্যক্ষ দর্শন মূর্তি মাটি দিয়া গড়া ।
হেলে দুলে খেলে যেন জীবন্তের পারা ॥ ১৫ ॥
বিহারীর পূজা এত ভক্তি সহকারে ।
চিন্ময়ীর আবির্ভাব মৃন্ময়-আধারে ॥ ১৬ ॥
সেই সে বিহারী আজি মহাভাগ্যবান ।
দেবেন্দ্রের সঙ্গে প্রভু-দরশনে যান ॥ ১৭ ॥
বহু অগ্রে শুনেছেন দেবেন্দ্রের মাতা ।
পুরীর মধ্যে তো আছে অনেক দেবতা ॥ ১৮ ॥
সেহেতু দেবতাদের পূজার কারণে ।
গুড়ের বাতাসা কিছু আনাইলা কিনে ॥ ১৯ ॥
সেগুলি পুঁটুলিমধ্যে করিল বন্ধন ।
এ বিষয়ে স্ত্রীজাতির ব্যবস্থা যেমন ॥ ২০ ॥
ব্যাপার গোপনে রহে কেহ নাহি জানে ।
দেবেন্দ্র মিষ্টান্ন লন প্রভুর কারণে ॥ ২১ ॥
তরী-আরোহণে হয় গমন তথায় ।
যেখানে বিরাজমান রামকৃষ্ণরায় ॥ ২২ ॥
নিদাঘের কাল ইহা অতি ভয়ঙ্কর ।
প্রচণ্ড মার্তণ্ড জ্বলে মাথার উপর ॥ ২৩ ॥
আড়াই প্রহর বেলা গগনে এখন ।
ছোট খাটে উপবিষ্ট প্রভু নারায়ণ ॥ ২৪ ॥
একে একে প্রণাম করিলা সবে তাঁয় ।
বুড়ী খালি শ্রীপ্রভুর মুখপানে চায় ॥ ২৫ ॥
বাৎসল্য উদয় হৈল প্রভুর উপরে ।
অকল্যাণ হবে তাই প্রণমিতে নারে ॥ ২৬ ॥
অন্তর বুঝিয়া তবে উঠিয়া ত্বরিতে ।
বালকের মত প্রভু ধরিলেন হাতে ॥ ২৭ ॥
মাতৃবৎ সম্ভাষণ করিয়া তাঁহায় ।
বুড়ীরে বসান প্রভু নিজের খট্টায় ॥ ২৮ ॥
শিশুসম এক পাশে আপনি বসিয়ে ।
কথোপকথন কত যেন মায়ে পোয়ে ॥ ২৯ ॥
বুড়ীর আনন্দ এত নাহি লেখাজোখা ।
বাতাসার পুঁটুলি বগলে রাখে ঢাকা ॥ ৩০ ॥
বগলে পুঁটুলি আছে মোটে নাই মনে ।
ঘন ঘন চান খালি শ্রীমুখের পানে ॥ ৩১ ॥
শিশুসম ভায়ে প্রভু কহেন তখন ।
বাতাসা খাইতে মোর হয় বড় মন ॥ ৩২ ॥
নানা দ্রব্য মন্দিরেতে সাধ নহে তায় ।
বাসনা হইল মাত্র গুড়ে বাতাসায় ॥ ৩৩ ॥
দেবেন্দ্র দিলেন মূল্য বিহারীর হাতে ।
আলমবাজারে গিয়া বাতাসা আনিতে ॥ ৩৪ ॥
সন্নিকটে দোকান নাহিক তথাকার ।
সিকিক্রোশ দূর এই আলমবাজার ॥ ৩৫ ॥
উর্ধ্বশ্বাসে দ্রুতপদে চলিল বিহারী ।
বাতাসার জন্য প্রভু ব্যাকুলিত ভারি ॥ ৩৬ ॥
বাতাসা বাতাসা প্রভু ক্ষণে ক্ষণে কন ।
অবিকল অল্পবয়ঃ শিশুর মতন ॥ ৩৭ ॥
মায়ের নিকটে যেন অতি শিশু ছেলে ।
দ্রব্যের কারণে টানে ধরিয়া আঁচলে ॥ ৩৮ ॥
ঠিক তেন প্রভুদেব করি আলিগুলি ।
বাহির করিলা ঢাকা বুড়ীর পুঁটুলি ॥ ৩৯ ॥
তাড়াতাড়ি খুলিয়া দেখেন প্রভুরায় ।
যা খুঁজেন সেই দ্রব্য বাঁধা আছে তায় ॥ ৪০ ॥
আনন্দের সীমা নাই দেন শ্রীবদনে ।
দেবেন্দ্র কহেন তুমি বলিলে না কেনে ॥ ৪১ ॥
সুন্দর বাতাসা হেথা তোমাদের কাছে ।
বিহারীকে অত দূর পাঠাইলে মিছে ॥ ৪২ ॥
কৃপা করি কহ প্রভু তত্ত্ব সুবিশেষে ।
গুড়ের বাতাসা এত মিঠে হৈল কিসে ॥ ৪৩ ॥
শ্রীমন্দিরে নানা দ্রব্য পাত্রে পাত্রে ভরা ।
টাকা-সের সন্দেশ পাওয়া ছানাবড়া ॥ ৪৪ ॥
চন্দ্রপুলি ক্ষীরপুলি মনোহরা গজা ।
বর্ধমেনে সীতাভোগ মতিচুর তাজা ॥ ৪৫ ॥
রকমারি ফল-মূল সহজে না মিলে ।
গুড়ের বাতাসা মিষ্ট এ সকল ফেলে ॥ ৪৬ ॥
কি দ্রব্য মিশান ছিল বাতাসা-ভিতর ।
অণুকণা দেহ তার দয়ার সাগর ॥ ৪৭ ॥
বড়ই দারুণ দুঃখ রৈল মনে মনে ।
মম স্পর্শ ভোজ্য নাহি উঠিল বদনে ॥ ৪৮ ॥
অন্য কোন বস্তু প্রভু নাহি প্রয়োজন ।
বিনা তব সেবা-ভক্তি সেবার কারণ ॥ ৪৯ ॥
দেহ যার লাগিল তোমার সেবনে ।
মিছার জনম তার কি ছার জীবনে ॥ ৫০ ॥
মহা ভাগ্যবান এই দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
প্রভুর কৃপায় কত দিব্য দরশন ॥ ৫১ ॥
ভাবানন্দে মগ্ন মন রহে নিরন্তর ।
সংসারে থাকিতে লাগে গায়ে যেন জ্বর ॥ ৫২ ॥
পরিহরি গৃহবাস সন্ন্যাস-কামনা ।
তাহায় শ্রীরায় দেন বারংবার হানা ॥ ৫৩ ॥
দিনেকে দারুণ খেদ মর্ম দুঃখযুত ।
দণ্ডবৎ লম্বমান শ্রীপদে পতিত ॥ ৫৪ ॥
করদ্বয়ে পদদ্বয় করিয়া ধারণ ।
আর্তনাদে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদেন ব্রাহ্মণ ॥ ৫৫ ॥
ভক্তের অন্তর বুঝি প্রভু ভগবান ।
আপনার ভাবে তবে ধরিলেন গান ॥ ৫৬ ॥
ভাবে রসে গীতখানি সুন্দর কেমন ।
যেমন অবস্থাগত তাহার মতন ॥ ৫৭ ॥
গীত
কেন নদে ছেড়ে সোনার গোউর দণ্ডধারী হবি ।
ও তোর ঘরে বহু বিষ্ণুপ্রিয়া তার দশায় কি করবি ॥
একে বিশ্বরূপের শোকে শক্তিশেল রয়েছে বুকে ।
তুইও কি অভাগী মাকে অকূলে ডুবাবি ॥
উঠাইয়া শ্রীদেবেন্দ্রে বিশ্বশুরু
কন ।
শ্রীবাসাদি গৌরাঙ্গের যত ভক্তগণ ॥ ৫৮ ॥
কোন অংশে নহে কম সন্ন্যাসীর চেয়ে ।
বলিতেছি রহ ঘরে কি কাজ ছাড়িয়ে ॥ ৫৯ ॥
মহামন্ত্ররূপবাক্য সান্তনা প্রভুর ।
শুনিয়া সুস্থিরচিত্ত দেবেন্দ্র ঠাকুর ॥ ৬০ ॥
এহেন ভক্তের পদে মম নিবেদন ।
কৃপা কর ছুটে যেন সংসার-বন্ধন ॥ ৬১ ॥
কি সুন্দর ভক্ত সব এবার লীলায় ।
চরিত-শ্রবণে ভক্তি হয় প্রভুরায় ॥ ৬২ ॥
শুন কই আর এক ভক্তের কাহিনী ।
শ্রীমনোমোহন মিত্র তাঁহার জননী ॥ ৬৩ ॥
এখন বিধবাবস্থা পতি দেহছাড়া ।
পতিপ্রাণা সতীদেবী পাগলের পারা ॥ ৬৪ ॥
রুক্ষ কেশ রুক্ষ বেশ দেহে অযতন ।
জীর্ণ শীর্ণ কলেবরে কেবল জীবন ॥ ৬৫ ॥
আহারে আচারে ঠিক ঠিক সন্ন্যাসিনী ।
এহেন অবস্থাপ্রাপ্ত স্বভাবতঃ তিনি ॥ ৬৬ ॥
লৌকিক শাস্ত্রিক বিধি করিতে পালন ।
বাধ্য যেন হয় অন্যে কিন্তু নাহি মন ॥ ৬৭ ॥
এখানে তেমন নয় গুন সমাচার ।
ভক্তের করমকাণ্ড শাস্ত্রবিধিপার ॥ ৬৮ ॥
স্বভাবতঃ হয় কর্ম স্বভাবের বশে ।
বুঝিতে না পারে ভাব অভাগা মানুষে ॥ ৬৯ ॥
পতিভক্তি-অলঙ্কার বিভূষিত গায় ।
কঠোর আচার মহাত্যাগিনীর ন্যায় ॥ ৭০ ॥
কিন্তু না তিয়াগ কৈলা দিনেকের তরে ।
সুবর্ণ-বলয় আর শাড়ি লালপেড়ে ॥ ৭১ ॥
বিপরীত রীতি ইহা হিন্দু বিধবার ।
বিধবা হইলে পরা শাড়ি অলঙ্কার ॥ ৭২ ॥
তাই প্রতিবাসিনীরা করে কানাকানি ।
কি ধারা ধরিল দেহে মিত্রের জননী ॥ ৭৩ ॥
প্রবল নিজের ভাব অন্তরেতে বয় ।
কখন কাহারো বাক্যে কর্ণপাত নয় ॥ ৭৪ ॥
একদিন শ্রীমন্দিরে প্রভুদরশনে ।
সমাগতা মিত্র মাতা কন্যাগণ সনে ॥ ৭৫ ॥
সেই সঙ্গে আসিয়াছে প্রতিবাসিনীরা ।
তাঁহার আচারে করে দোষারোপ যারা ॥ ৭৬ ॥
কথার প্রসঙ্গে কথা কন গুণমণি ।
স্ত্রীজাতির ধর্ম কিবা তাহার কাহিনী ॥ ৭৭ ॥
প্রাণপণে পতিসেবা ধর্ম স্ত্রীজাতির ।
আজীবন পতি-পদে মতি রবে স্থির ॥ ৭৮ ॥
এ নহে আমার কথা শাস্ত্রের বাখান ।
সতীর পতিতে পঞ্চভাব বিদ্যমান ॥ ৭৯ ॥
সধবা বিধবা এই দুই অবস্থায় ।
সমভাবে রবে সতী পতির চিন্তায় ॥ ৮০ ॥
পতির দেহান্তে সতী বুঝে স্থিরতর ।
আছিল নশ্বর পতি এখন অমর ॥ ৮১ ॥
এত বলি বিশেষিয়া কন ভগবান ।
কোন এক রাজরানী তাঁহার আখ্যান ॥ ৮২ ॥
যতদিন সশরীরে ছিলেন রাজন ।
পরিত না অঙ্গে রানী কোন আভরণ ॥ ৮৩ ॥
সধবা লক্ষণ-রক্ষা পতির মঙ্গল ।
সেহেতু দু-খানি রুলি দু-হাতে কেবল ॥ ৮৪ ॥
বিধবা হইলে পরে শুন পরিচয় ।
তিয়াগিয়া রুলি পরে সুবর্ণ-বলয় ॥ ৮৫ ॥
কারণ জিজ্ঞাসা তাঁরে করে কোন জন ।
বৈধব্য দশায় কেন স্বর্ণ আভরণ ॥ ৮৫ ॥
উত্তর করিল তারে রানী ভক্তিমতী ।
সশরীরে নশ্বর ছিলেন মম পতি ॥ ৮৬ ॥
এখন ত্যজিয়া ভূতময় কলেবর ।
নিজরূপে অবস্থিত অজর অমর ॥ ৮৭ ॥
এত কহি অঙ্গুলিনির্দেশে গুণমণি ।
দেখাইয়া দিলা যেথা মিত্রের জননী ॥ ৮৮ ॥
অতিশয় উচ্চভাব সুন্দর কেমন ।
রানীর অন্তরে যেন ইহারও তেমন ॥ ৮৯ ॥
যেমন শ্রীপ্রভু সঙ্গে তেন ভক্তমালা ।
মনোহর শুন মন রামকৃষ্ণলীলা ॥ ৯০ ॥
আর দিনেকের কথা শুন বিবরণ ।
মিত্র জননীকে প্রভু কৈলা নিমন্ত্রণ ॥ ৯১ ॥
প্রসাদ পাইতে হেথা প্রভুর মন্দিরে ।
নন্দন নন্দিনী যত সব সমিভ্যারে ॥ ৯২ ॥
মিত্রের জননী মহা সৌভাগ্য গণিয়ে ।
যথাদিনে উপনীত পুত্রকন্যা ল'য়ে ॥ ৯৩ ॥
আনন্দের সীমা নাই প্রভুর অন্তরে ।
নেহারিয়া একত্তর ভক্ত-পরিবারে ॥ ৯৪ ॥
এক সঙ্গে বসাইয়া ভোজনকালীনে ।
খাওয়াইতে দিয়া ভার যথাযোগ্য জনে ॥ ৯৫ ॥
নিজের ভোজন-ঠাই কিঞ্চিৎ অন্তর ।
দেওয়ালের ব্যবধান মন্দির-ভিতর ॥ ৯৬ ॥
প্রভুর কি হৈল ভাব ভোজনের কালে ।
থালায় মাছের মুড়া লইলেন তুলে ॥ ৯৭ ॥
সত্ত্বর ফেলিয়া তাহা দিলা গুণমণি ।
যে পাতে ভোজন করে মিত্রের জননী ॥ ৯৮ ॥
মহাভাগ্যবতী তবে অসঙ্কোচ মন ।
গোটা মুড়া সেইক্ষণে করিলা ভোজন ॥ ৯৯ ॥
নন্দন পালটি পরে আসিলে ভবনে ।
মায়ে জিজ্ঞাসিল মুড়া খাইলে কেমনে ॥ ১০০ ॥
শুনিয়া জননী সবে করিল উত্তর ।
প্রসাদ না হয় কভু দ্রব্যের ভিতর ॥ ১০১ ॥
প্রসাদ প্রসাদ মাত্র প্রসাদ জিনিস ।
ফল নয় মিষ্টি নয় না অন্ন আমিষ ॥ ১০২ ॥
প্রসাদের ব্যাখ্যা কিবা গুন গুন মন ।
বুঝ যে করিলা ব্যাখ্যা সে জন কে জন ॥ ১০৩ ॥
বেদবাক্যাধিক গুরু ভক্তে যাহা কয় ।
প্রভুর বিরাজ-স্থান যাঁদের হৃদয় ॥ ১০৪ ॥
শ্রীপ্রভুর ভক্ত-পদে রাখি রতি মতি ।
শুন ভাগবত রামকৃষ্ণ-লীলাগীতি ॥ ১০৫ ॥
ভক্তের যাতনা দুঃখ লাগে ভগবানে ।
বাহ্যিকে বাহ্যিকে নয় পরানে পরানে ॥ ১০৬ ॥
প্রত্যক্ষ প্রমাণে লীলা শুন অতঃপর ।
ভক্ত-ভগবানে নাই তিলেক অন্তর ॥ ১০৭ ॥
গলায় বেদনা এই প্রথম প্রথম ।
কোনদিন বাড়ে আর কোনদিন কম ॥ ১০৮ ॥
একদিন বলিল গোলাপ ঠাকুরানী ।
জনেক ডাক্তার আছে আমি তারে জানি ॥ ১০৯ ॥
অতি বিচক্ষণ তেহ সর্বজনে রটে ।
যেখানে জামাই বাড়ি তাহার নিকটে ॥ ১১০ ॥
সরল প্রভুর ধারা বালকের ন্যায় ।
বলিলেন ভাল কালি যাইব তথায় ॥ ১১১ ॥
পরদিন প্রত্যুষে উঠিয়া গুণমণি ।
সঙ্গে লাটু কালী ও গোলাপ ঠাকুরানী ॥ ১১৪ ॥
চলিলেন শহরেতে তরী-আরোহণে ।
গঙ্গার উপরে নানা কথোপকথনে ॥ ১১৫ ॥
এই কালী কালীচন্দ্র বালক বয়েস ।
মা-বাপ ছাড়িয়া রহে যেথা পরমেশ ॥ ১১৬ ॥
প্রভুর সেবায় রত দিবস-যামিনী ।
মার কাছে যেমন গোলাপ ঠাকুরানী ॥ ১১৭ ॥
মহাভক্তিমতী এই ব্রাহ্মণের মেয়ে ।
পুঁথিতে রহিল নাম 'ভক্ত-মা' বলিয়ে ॥ ১১৮ ॥
ভক্তিতে অকুতোবল লজ্জা ঘৃণা নাই ।
ঘর যেথা মাতা আর জগৎ-গোসাঁই ॥ ১১৯ ॥
প্রভুর কৃপায় ভক্তি বিশ্বাসের জোরে ।
আকারে প্রকৃতি কিন্তু পুরুষ আচারে ॥ ১২০ ॥
প্রথমে সংসারী যবে আছিলা নন্দিনী ।
এখন স্বভাব ধারা যেন উদাসিনী ॥ ১২১ ॥
মায়ায় বিমুক্ত মন প্রভুপদে নাচে ।
নির্ভয়ে গমন সঙ্গে ডাক্তারের কাছে ॥ ১২২ ॥
কুমারটুলির ঘাটে উতরিল তরী ।
নামিলেন এইখানে করিবারে গাড়ি ॥ ১২৩ ॥
লাটু, ডাকিলেন গাড়ি শ্রীপ্রভুর লেগে ।
বসিলেন ভক্ত-মা ঠাকুর একদিকে ॥ ১২৪ ॥
অন্যদিকে লাটু, কালীকুমার দুজন ।
এইখানে বুদ্ধিহারা এইবারে মন ॥ ১২৫ ॥
কি ভাবের কোন্ ভক্ত কেবা কোন্ জনা ।
ব্যাভার আচার দৃষ্টে আভাসেতে চেনা ॥ ১২৬ ॥
পরম তিয়াগী প্রভু এবার লীলায় ।
স্ত্রীজাতির গাত্রগন্ধ অসহ্য নাসায় ॥ ১২৭ ॥
পরশে শ্রীঅঙ্গখানি যায় এঁকে যেঁকে ।
কাঞ্চনে যেমন ধারা তেমন স্ত্রীলোকে ॥ ১২৮ ॥
আজি ভক্ত-মার সঙ্গে একাসনে যান ।
বুঝিবারে শুদ্ধ বুদ্ধি দেহ ভগবান ॥ ১২৯ ॥
লীলা দেখিবার তরে কর যুক্ত আঁখি ।
জীবনে কামনা এবে একমাত্র রাখি ॥ ১৩০ ॥
পূর্ণ কর কৃপাসিন্ধু বাঞ্ছাকল্পতরু ।
তমো-বিনাশন বিভু জগতের গুরু ॥ ১৩১ ॥
বিষম সমস্যা তত্ত্ব শুন শুন মন ।
আকারে দর্শন নহে বস্তুর দর্শন ॥ ১৩২ ॥
আকারে বস্তুতে দোঁহে বিভিন্ন প্রকার ।
আকার কেবল মাত্র বস্তুর আধার ॥ ১৩৩ ॥
যেন তেন চক্ষে বস্তু দেখিবার নয় ।
বস্তু যাঁর তাঁর কাছে জানা পরিচয় ॥ ১৩৪ ॥
বস্তুগত বস্তুমধ্যে সবে এক আতি ।
আকারে পুরুষ কেহ কেহ বা প্রকৃতি ॥ ১৩৫ ॥
বস্তু নিরখিয়ে প্রভু করেন নির্ণয় ।
কেবা কিবা কার সঙ্গে সম্বন্ধ কি হয় ॥ ১৩৬ ॥
সম্বন্ধ ধরিয়া হয় আচার ব্যাভার ।
শুন তবে কহি তার কিছু সমাচার ॥ ১৩৭ ॥
একদিন ঘোড়াগাড়ি করি আরোহণ ।
নরেন্দ্র প্রভৃতি সঙ্গে শহরে গমন ॥ ১৩৮ ॥
দিনকর খরতর কররাজি ঢালে ।
শশীর সঙ্গেতে পথে দেখা হেনকালে ॥ ১৩৯ ॥
তাড়াতাড়ি ছুটে গাড়ি নাহিক বিরাম ।
সেবকাগ্রগণ্য শশী পাছু পাছু ধান ॥ ১৪০ ॥
গাড়ির মধ্যেতে স্থান আছে বসিবার ।
নরেন্দ্র তাঁহারে ডাকে করিয়া চীৎকার ॥ ১৪১ ॥
প্রভুদেব বারবার মানা তাহে করে ।
শশীর নাহিক ঠাঁই গাড়ির ভিতরে ॥ ১৪২ ॥
নরেন্দ্র শ্রীপ্রভুদেবে কৈল প্রত্যুত্তর ।
ক্ষতি কি যদ্যপি বসে ছাদের উপর ॥ ১৪৩ ॥
তাহাতেও নারাজ হইয়া প্রভু কন ।
হাঁটিয়া হাঁটিয়া শশী আসিবে এখন ॥ ১৪৪ ॥
শুন মন কার সঙ্গে বহে কিবা ভাব ।
লীলাদৃষ্টি নহে ভাবে থাকিলে অভাব ॥ ১৪৫ ॥
অকলঙ্ক-কলেবর ব্রাহ্মণ-নন্দন ।
স্বভাবতঃ মায়া-মুক্ত প্রভুপদে মন ॥ ১৪৬ ॥
তারে পরশিতে গাড়ি না দিলা গোসাঁই ।
এখানে ভক্ত-মা পায় একাসনে ঠাঁই ॥ ১৪৭ ॥
প্রত্যেক ভক্তের সঙ্গে ভাব স্বতন্তর ।
শুন লীলাকথা পরে বুঝিবে রগড় ॥ ১৪৮ ॥
হেথা উপনীত গাড়ি ডাক্তারখানায় ।
তিনজনে লয়ে সঙ্গে নামিলেন রায় ॥ ১৪৯ ॥
ডাক্তারের যশোরাশি জানা সবাকার ।
সুবিখ্যাত নাম দুর্গাচরণ ডাক্তার ॥ ১৫০ ॥
দরশন দিয়া তাঁয় কহেন তখন ।
পীড়ার প্রকৃতি-আদি যত বিবরণ ॥ ১৫১ ॥
বিচক্ষণ চিকিৎসক মনে বিচারিয়ে ।
ঔষধ প্রদান কৈল এক টাকা লয়ে ॥ ১৫২ ॥
পাল্টিয়া প্রভুদেব ভক্তদের সনে ।
পথে পথে উপনীত বিডনবাগানে ॥ ১৫৩ ॥
শহরের মধ্যে ইহা সুন্দর বাগান ।
সেখানেতে ভক্ত-মায়ে তিলক দেখান ॥ ১৫৪ ॥
রকমারি বৃক্ষ লতা ইহার ভিতরে ।
সিমেন্টে তিলক-চিত্র আঁকা চারিধারে ॥ ১৫৫ ॥
একে একে নিরখিতে তিলকের মালা ।
ক্রমশঃ গগনে হৈল অতিশয় বেলা ॥ ১৫৬ ॥
ধীরে ধীরে গঙ্গাতীরে যবে অগ্রসর ।
তখন অতীত প্রায় আড়াই প্রহর ॥ ১৫৭ ॥
জলস্পর্শ নাই করে সব অনাহারে ।
তরী আরোহণ কৈলা ফিরিতে মন্দিরে ॥ ১৫৮ ॥
কিছুদুর অগ্রসর আসিলে তরণী ।
ক্ষুধায় আকুল হৈল সকলের প্রাণী ॥ ১৫৯ ॥
পেট যেন তপ্ত খোলা নাড়ী জলে চুঁয়ে ।
উপবাসী যেন কত মাসাদি ধরিয়ে ॥ ১৬০ ॥
কিছু কেহ মুখে কিন্তু বলিতে না পারে ।
জঠরের জ্বালা খালি জঠরে সম্বরে ॥ ১৬১ ॥
ভক্তদের পানে চেয়ে কন প্রভুরায় ।
বড়ই পেয়েছে ক্ষুধা পেট জ্বলে যায় ॥ ১৬২ ॥
সহিতে না পারি আর ভকত-বৎসল ।
জিজ্ঞাসিলা কার কাছে কি আছে সম্বল ॥ ১৬৩ ॥
লাটু কালী শূন্য-থলি এক বস্ত্র সার ।
প্রভুর নিকটে থাকে সেবা করে তাঁর ॥ ১৬৪ ॥
ভক্ত-মা বিশুষ্ককণ্ঠ বাক্য নাহি ফুটে ।
বলিলেন এক আনা পুঁজি আছে গেঁঠে ॥ ১৬৫ ॥
বরানগরের ঘাটে বাঁধিয়া তরণী ।
গ্রামের ভিতরে কালী চলিল অমনি ॥ ১৬৬ ॥
ক্ষুধায় না চলে পদ লাগে পায় পায় ।
কিছু পরে রসমণ্ডি আনিল ঠোঙ্গায় ॥ ১৬৭ ॥
গুন্তিতে অনেকগুলি প্রায় চারিগণ্ডা ।
দেখিয়াই সবাকার প্রাণ হৈল ঠাণ্ডা ॥ ১৬৮ ॥
প্রসাদ পাবার আশা সকলের মনে ।
মিষ্টিমুখে উদর পুরাবে জলপানে ॥ ১৬৯ ॥
সে গুড়ে পড়িল কিন্তু বালি সবাকার ।
ভক্তের সঙ্গেতে খেলা মধুর ব্যাপার ॥ ১৭০ ॥
শ্রীকরে ধরিয়া ঠোঙ্গা মুদিয়া নয়ন ।
একে একে সব প্রভু করিলা ভোজন ॥ ১৭১ ॥
পশ্চাতে চাটিয়া পাতা দিলা ভক্ত মায় ।
নিজে হাতে পাতাখানি ফেলিতে গঙ্গায় ॥ ১৭২ ॥
ভক্ত-মা সঙ্কেত মত পাতা দিয়া ফেলে ।
প্রভুকে খাওয়ান জল অঞ্জলিতে তুলে ॥ ১৭৩ ॥
নিত্যাপেক্ষা নরলীলা দুর্বোধ্যাতিশয় ।
সামান্য জীবের শিরে ধারণা হয় ॥ ১৭৪ ॥
নিরাকারে যেমন দুর্বোধ্য ভগবান ।
সাকারে সেইমত অন্ধে দেখে আন ॥ ১৭৫ ॥
আঁকিতে ক্ষমতা নাই রৈল মনে মনে ।
কারে বা দেখাব চিত্র কে বুঝিবে প্রাণে ॥ ১৭৬ ॥
ভাগ্যবান যেবা কৃপাপ্রাপ্ত ঈশ্বরের ।
বুঝিতে তাঁহার পক্ষে যা কহিনু ঢের ॥ ১৭৭ ॥
শ্রীপ্রভুর শ্রীবচনে শুন শুন মন ।
পিত্রাজ্ঞায় রঘুমণি যবে যান বন ॥ ১৭৮ ॥
সাত জন ঋষি মাত্র চিনেছিল তাঁরে ।
সেই পূর্ণব্রহ্ম রাম নর-কলেবরে ॥ ১৭৯ ॥
সাধিতে লীলার কার্য অরণ্যে গমন ।
অপরে দেখিল রামে নৃপতি-নন্দন ॥ ১৮০ ॥
সেই কথা এইখানে নহে ধারণার ।
দীন-দুঃখী-বেশে রামকৃষ্ণ অবতার ॥ ১৮১ ॥
জগৎ পালনে যিনি পরম ঈশ্বর ।
গলায় বেদনা আজি ক্ষুধায় কাতর ॥ ১৮২ ॥
শ্রীঅঙ্গেতে নাহি তাঁর এক তিল বল ।
শ্রীকরে তুলিয়া খেতে জাহ্নবীর জল ॥ ১৮৩ ॥
সঙ্গে যাঁরা তেন তাঁরা এক বস্ত্র পুঁজি ।
কখন বা পান অন্ন কখনও বা কাঁজি ॥ ১৮৪ ॥
কেমনে বুঝিবে নরে এই সেই জন ।
সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের নিদান কারণ ॥ ১৮৫ ॥
লীলায় অগাধ গণ্ড কেবা পায় তল ।
শ্রীপ্রভু হইলা বাঁকা হইয়া সরল ॥ ১৮৬ ॥
আজিকার লীলাকথা শুন অতঃপর ।
জলপানে শ্রীপ্রভুর ভরিল উদর ॥ ১৮৭ ॥
প্রভুর তৃপ্তিতে পূর্ণ তৃপ্ত ভক্তগণে ।
দেখিয়া রঙ্গের কাণ্ড হাসে তিন জনে ॥ ১৮৮ ॥
পরস্পর মুখপানে চায় বারে বারে ।
আনন্দ উথলে পড়ে হৃদয় আধারে ॥ ১৮৯ ॥
প্রভুও তাঁদের সঙ্গে হাসি মিশাইয়া ।
উত্তাল তরঙ্গ আরো দিলা উথলিয়া ॥ ১৯০ ॥
কেবা চিত্রকর হেন সৃষ্টির ভিতরে ।
এ বিচিত্র রঙ্গ-চিত্রে বর্ণ দিতে পারে ॥ ১৯১ ॥
লীলাকরে আছে বর্ণ প্রতিবিম্ব তার ।
পড়ে মাত্র ভক্ত-চিত্ত মুকুরমাকার ॥ ১৯২ ॥
কিছুক্ষণ করি খেলা চিত্তের প্রাঙ্গণে ।
পুনঃ গিয়া মিশে যায় জনমের স্থানে ॥ ১৯৩ ॥
সূর্যের বরন যেন তার সঙ্গে রয় ।
অস্তে অস্ত পুনরায় উদয়ে উদয় ॥ ১৯৪ ॥
এ চিত্রের একমাত্র লীলাকরে থানা ।
বোবা বলে কালা শুনে চক্ষে দেখে কানা ॥ ১৯৫ ॥
দর্শন শ্রবণ আর বাগিন্দ্রিয় যায় ।
শ্রীপ্রভুর দীপ্তিমান বর্ণের প্রভায় ॥ ১৯৬ ॥
অমৃত-ভাণ্ডার রামকৃষ্ণলীলাগীতি ।
ধীরে ধীরে শুন এই রামকৃষ্ণ-পুঁথি ॥ ১৯৭ ॥
পুত্র-পৌত্রে ভক্তিলাভ শ্রবণ-কীর্তনে ।
বড়ই দয়াল প্রভু সংসারীর গণে ॥ ১৯৮ ॥