চতুর্থ খণ্ড

সভক্তে প্রভুর পানিহাটী মহোৎসবে গমন


জয় জয় রামকৃষ্ণ অখিলের স্বামী ।
জয় জয় গুরুমাতা জগৎ-জননী ॥
জয় জয় দোঁহাকার যত ভক্তগণ ।
সবার চরণরেণু মাগে এ অধম ॥


বন্দ দুঁহু শুরু ইষ্ট,        বিশ্বপতি রামকৃষ্ণ,
          পুরুষের শ্রেষ্ঠ প্রভুরায় ।
বন্দ জগত-জননী,     এবে গুরুদারা যিনি,
          আদ্যাশক্তি আগত লীলায় ॥ ১ ॥

অবনী লুটায়ে বন্দ,     দোঁহাকার ভক্তবৃন্দ,
          সাঙ্গোপাঙ্গ লীলার সহায় ।
বন্দ সেই গঙ্গাতট,     যেথা রাজে পঞ্চবট,
          তপ-জপ যাহার তলায় ॥ ২ ॥

বন্দ সেই বিরতলা,   যেখানে সাধন-লীলা,
          দ্বাদশ বৎসর নিরন্তর ।
হইয়া সর্বস্বত্যাগী,    জীবের কল্যাণ লাগি,
          করিলেন দয়ার সাগর ॥ ৩ ॥

বন্দ সেই কালীবাটী,    পাবন চেতন মাটি,
          কোটি কোটি বন্ধ লোকজন ।
বারেক নমিয়া মাথা,    মুকুতি পাইল যেথা,
          পরশিয়া প্রভুর চরণ ॥ ৪ ॥

বন্দ সে মন্দির মেলা, লয়ে যেথা ভক্তমালা,
          খেলা কৈলা লীলার ঈশ্বর ।
বন্দ সে যুগল পাট,     ছোট বড় দু'টি খাট,
          শয্যারাম যাহার উপর ॥ ৫ ॥

মহালীলা শ্রীপ্রভুর,       গাইলে গুনিলে দূর,
          পাপ তাপ মন-মলিনতা ।
খুঁটিনাটি তিয়াগিয়া,       কায়মনপ্রাণ দিয়া,
          শুন মন রামকৃষ্ণ-কথা ॥ ৬ ॥

গলায় বেদনা প্রায়,      দিন দিন বৃদ্ধি পায়,
          আরোগ্যের উপায়বিধানে ।
অন্তরঙ্গ ভক্তগণ,         একসঙ্গে সংজোটন,
          প্রভুর মন্দিরে এক দিনে ॥ ৭ ॥

গিরিশ দেবেন্দ্র রাম,       ভক্ত বসু বলরাম,
          কুমার নরেন্দ্রনাথ আর ।
চক্ষুতে চশমাযুক্ত,        সুন্দর সুরেন্দ্র মিত্র,
          মহাভক্ত মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ৮ ॥

আর কত ঘরভরা,     মনে নাই কারা তাঁরা,
          মিশামিশি চেনা-অচেনায় ।
ভক্তের মেলানি দেখি,  মহাতুষ্ট বাঁকা-আখি,
          পূর্ব আস্যে বসিয়া খট্টায় ॥ ৯ ॥

ভক্তাধীন ভগবান,        ভক্তপ্রিয় ভক্তপ্রাণ,
          পাইয়া সম্মুখে ভক্তপাতি ।
বেদনার কষ্ট যত,       যাবতীয় তিরোহিত,
          প্রভু যেন সহজপ্রকৃতি ॥ ১০ ॥

ভক্তি-প্রিয় রামকৃষ্ণ,    ভক্তিতে অতুল তুষ্ট,
          তাই তুলি ভক্তির তরঙ্গ ।
ভক্তগণ সঙ্গে হেথা,      রঙ্গরসে কম কথা,
          ভক্তিমাখা গোউর প্রসঙ্গ ॥ ১১ ॥

জ্ঞান ভক্তি দুই মত,    শেষোক্ত প্রশস্ত পথ,
          এই শিক্ষা দিতে জীবগণে ।
জ্ঞানেতে অন্তর পূর্ণ,    কর্মেতে ভক্তির চিহ্ন,
          আচরিলা শ্রী্রভু আপনে ॥ ১২ ॥

ভক্তি-শিক্ষা আচরণ,     গুণ-গান-সংকীর্তন,
          জপ পূজা নামের মহিমা ।
ভোগরাগ বেশ ভূষা,    সেবা অনুরাগ নেশা,
          রূপ ধরি ধ্যানের গরিমা ॥ ১৩ ॥

অর্চনাদি দেবাদির,     ষষ্ঠী মাকালাদি পীর,
          মতি স্থির সকলেতে তিনি ।
সর্বত্রে তাঁহার সত্তা,     তিনি জগতের কর্তা,
          দেহে তাঁর গোটা সৃষ্টিখানি ॥ ১৪ ॥

প্রার্থনা গোচরে তাঁর,      দাসবৎ রাখিবার,
          আজ্ঞাধীন চাকর যেমন ।
আমি কি আমার শব্দ, একেবারে যেথা স্তব্ধ,
          অগ্নি-দগ্ধ রজ্জুর মতন ॥ ১৫ ॥

বেদান্তের ভাষ্যকার,      শঙ্কর শিবাবতার,
          ভাষ্যে যিনি করিলা বাখান ।
এক ব্রহ্ম সার সত্তা,   জীব ও জগৎ মিথ্যা,
          মায়া ছায়া অলীক সমান ॥ ১৬ ॥

ইহাতে কেবল সায়,       কই দিলা প্রভুরায়,
          বলিলেন উত্তর বচনে ।
জীব ও জগৎ ছেড়ে,  ব্রহ্ম থেকে দিলে পরে,
          ব্রহ্মের ওজন যায় কমে ॥ ১৭ ॥

জীব ও জগৎ নামে,   ত্রিভুবনে যারে জানে,
          ব্রহ্মের সে শক্তির বিকাশ ।
শক্তি সৃষ্টিস্বরূপিণী,    যাহে ধরি ব্রহ্মে জানি,
          শক্তি-বলে ব্রহ্মের প্রকাশ ॥ ১৮ ॥

ধানের তণ্ডুল সার,        মানি কথা বারবার,
          ত্যাগ করি তুষ আবরণ ।
ক্ষেতে যদি যায় পোঁতা, জনমে আঁকুর কোথা,
          শক্তিহীন ব্রহ্মও তেমন ॥ ১৯ ॥

শক্তিতে জনমে সৃষ্টি,    খাই মাখি পাই পুষ্টি,
          হাসি কাঁদি অবস্থার গুণে ।
দেখি শুনি দিবানিশি,     ভুগি সুখ-দুঃখরাশি,
          মিথ্যা তাহে বলিব কেমনে ॥ ২০ ॥

যাঁর নিত্য তাঁর লীলা,  উভয়েই একের খেলা,
          নিত্যবৎ সত্য লীলাখানি ।
দোঁহাধরি দোঁহা পাই,  উনো দুনো কেহ নাই,
          তাও বটে তাও বটে মানি ॥ ২১ ॥

বাক্যমন-অগোচর,         বটেন অখিলেশ্বর,
          ক্রিয়াকাণ্ড তপাদির পার ।
পুনঃ শুদ্ধ বুদ্ধিবলে,    প্রত্যক্ষ তাঁহারে মিলে,
          লীলা তাঁর বিচিত্র প্রকার ॥ ২২ ॥

অসম্ভব কিছু নাই,    বারে বারে শ্রীগোসাঁই,
          বলিলেন বিশেষ প্রকারে ।
শুন মন সাবধানে,    এখে নাই অন্য মানে,
          ভক্তিকে প্রশস্ত রাখিবারে ॥ ২৩ ॥

প্রভু অবতারে মত,         প্রশস্ত ভক্তির পথ,
          দুর্বল কালের জীবপক্ষে ।
আগাগোড়া সমভাবে, চাক্ষুষ দেখিতে পাবে,
          ভক্তিপথে শ্রীপ্রভুর শিক্ষে ॥ ২৪ ॥

গোউর-লীলার কথা,   বলিতে বলিতে হেথা,
          বিভোরাঙ্গ হইয়া আপনে ।
প্রভুপদে মজা প্রাণ,      ভক্তিপথে আগুয়ান,
          জিজ্ঞাসিলা দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণে ॥ ২৫ ॥

গঙ্গাতটে বিদ্যমান,    পানিহাটি নামে গ্রাম,
          মনোহর স্থান অতিশয় ।
সুবিদিত লোকে সব,  চিঁড়াভোগ মহোৎসব,
          বৎসর বৎসর তথা হয় ॥ ২৬ ॥

জুটে কত লোকজন,     সংখ্যা নাই অগণন,
          সংকীর্তন করে দলে দলে ।
মরি কি মাধুরী আহা, তুমি কি দেখেছ তাহা,
          চল যাই একসঙ্গে মিলে ॥ ২৭ ॥

বলিলে করিব কাজ,   আর নাহি সহে ব্যাজ,
          একতানে কায়বাক্যমন ।
এত বলি ভক্তরামে,  আজ্ঞা হৈল সেই ক্ষণে,
          করিতে তরীর আয়োজন ॥ ২৮ ॥

আজ্ঞা শুনি ভক্তবর,        প্রসারিয়া যুক্তকর,
          হাসিমুখে করেন উত্তর ।
পেনেটির মহোৎসবে, কেমনে গমন হবে,
          গলায় বেদনা তাই ডর ॥ ২৯ ॥

নিষেধে বদনে হাসি,      এদিকে অন্তরে খুশী,
          কারণ করহ অবধান ।
প্রভুদেবে ল'য়ে সাথে,  ইচ্ছা বুলে মেতে পথে,
          হুজুগ-পিয়ারা ভক্ত রাম ॥ ৩০ ॥

বালক স্বভাব রায়,       প্রত্যুত্তরে কৈলা তাঁয়,
          গলায় ব্যথায় নাহি হানি ।
পেনেটির মহোৎসবে,    যেমতে যাইতে হবে,
          যাব বলে বলিয়াছি আমি ॥ ৩১ ॥

সত্যপ্রিয় সত্যপ্রাণ,        সত্যরূপে ভগবান,
          গিয়ান প্রভুর আজীবন ।
সত্য স্থিতি সত্য মতি,   সত্যে চিরকাল গতি,
          প্রাণপণে সত্যের পালন ॥ ৩২ ॥

ভালমন্দ মানামান,      পাপপুণ্য জ্ঞানাজ্ঞান,
          শুচি ও অশুচি বলি দিয়া ।
রাখিয়া সযত্নে কাছে,    দুটি বস্তু বেছে বেছে,
          শুদ্ধভক্তি সত্যেরে ধরিয়া ॥ ৩৩ ॥

প্রকৃতি বুঝিয়া রাম,        তখন অমনি যান,
          জলযানে মাঝিরা যেখানে ।
ভাড়া করি চারি তরী,   তখনি আইলা ফিরি,
          গোচর করিলা শ্রীচরণে ॥ ৩৪ ॥

পানসীর মাঝে দাঁড়,   শ্রীপদে ভকতি ভারি,
          চৌধারে যতেক গঙ্গাতটে ।
উৎসবের ধার্যদিনে,   সকালে বাঁধিল এনে,
          চারি তরী পুরীর নিকটে ॥ ৩৫ ॥

হেথা বহু ভক্তগণ,    ক্রমে ক্রমে সংযোটন,
          হইতে লাগিল শ্রীমন্দিরে ।
আনন্দের ঠিক চিত্র,     আঁকিবার তিলমাত্র,
          শক্তি নাহি আমার ভিতরে ॥ ৩৬ ॥

আনন্দের সিন্ধু রায়,     দুলিয়া লীলার বায়,
          কানায় কানায় সমুখিত ।
নানাবিধ রঙ্গে ভঙ্গে,      তরঙ্গ তুলিয়া সঙ্গে,
          আপনে আপনি আন্দোলিত ॥ ৩৭ ॥

ভক্তযূথ তাহে গিয়া, পড়ে অঙ্গ ভাসাইয়া,
          লহরে লহরে করে খেলা ।
সরসীর স্বচ্ছ জলে, নানাভাবে হেলে ছলে,
          যেইরূপ রাজহংসমালা ॥ ৩৮ ॥

জলময় কলেবর,        সেইরূপ সরোবর,
          শ্রীপ্রভু-সাগরে এইখানে ।
আহা মরি কি মাধুরী,  আনন্দ-কারণ-বারি,
          সুধা তিক্ত যাহার তুলনে ॥ ৩৯ ॥

স্বর্গবাসী দেবতারা,      অজর অমর যাঁরা,
          সূক্ষ্মদেহে বিমানে বেড়ান ।
অতুল শকতিযুত,       তাঁহারাও অবিদিত,
          প্রভু-সিন্ধু-বারির সন্ধান ॥ ৪০ ॥

নারদাদি ঋষিবর,        শুকদের তপঃপর,
          কেবল করিল পরশন ।
গণ্ডুষেক পিয়ে পানি,      শববৎ শূলপানি,
          অবাক কাহিনী শুন মন ॥ ৪১ ॥

হেথা প্রভু-ভক্তগণ,         উঠু-চুবু-সন্তরণ,
          অনুক্ষণ সেই জলে করে ।
সমস্যা বিষম শক্ত,     বুঝিবারে প্রভুভক্ত,
          কেবা তাঁরা নরকলেবরে ॥ ৪২ ॥

বুঝিতে নাহিক শক্তি,  ভক্তপদে মাগি ভক্তি,
          যোজন অন্তরে মুক্তি রাখি ।
একমাত্র অভিলাষ,         হইয়া দাসানুদাস,
          চরণসেবায় যেন থাকি ॥ ৪৩ ॥

এই সব ভক্তপাতি,     সঙ্গে লয়ে বিশ্বপতি,
          প্রভুদেব লীলার ঈশ্বরে ।
আনন্দে মগন মন,       করিলেন আরোহণ,
          ঘাটে বাঁধা তরীর উপরে ॥ ৪৪ ॥

কাছে কাছে চারি তরী,   চালাইল ধীরি ধীরি,
          ব্রহ্ম বারি-বাহিনী গঙ্গায় ।
ইষ্টমন ভক্তগণে,         মধ্যে লয়ে ভগবানে,
          আনন্দে আনন্দ-গীত গায় ॥ ৪৫ ॥

                        গীত

        প্রেমের বাজারে আনন্দের মেলা ।
        হরি ভক্তসঙ্গে রসরজে আনন্দে করে খেলা ।
                                            ইত্যাদি ।


এখানে শুনিয়া গান,     বাহ্যহারা ভগবান,
          শুন তাহে কি হইল ফল ।
সেই সিন্ধু আনন্দের,   বাড়িয়া উঠিল ঢের,
          আধার উথলে পড়ে জল ॥ ৪৬ ॥

ছদ্মবেশে শ্রীগোসাঁই, চিনে অন্যে সাধ্য নাই,
          চিনে মাত্র সহচরগণে ।
ভক্তিতে অভূলতেজা,    তাঁহারা লুটিল মজা,
          এই মহালীলার প্রাঙ্গণে ॥ ৪৭ ॥

নরচক্ষে দিয়া ধূলা,      এবারে প্রভুর খেলা,
          অপরে না পাইল সন্ধান ।
নিত্যধাম পরিহরি,       ব্রহ্মাণ্ডের অধিকারী,
          সকায় ধরায় মূর্তিমান ॥ ৪৮ ॥

ভাগ্যে যদি কেহ শুনে, তত্ত্ব নাহি পশে প্রাণে,
          বরঞ্চ উত্তরে তর্কে কয় ।
করিয়া ভীষণ কোপ,     মনুষ্যে ঈশ্বরারোপ,
          অসম্ভব কে করে প্রত্যয় ॥ ৪৯ ॥

পণ্ডিতে অধিক ধোঁকা, কথা কয় চোখাচোখা,
          বিপরীত তর্ক-সহকারে ।
প্রমাণে সাকার নাই,    বিশ্বাস-প্রত্যয়ে পাই,
          বোধ উপলব্ধির দুয়ারে ॥ ৫০ ॥

স্বরাটে বিরাট যিনি,      মায়াময় মায়াস্বামী,
          সর্বাহপ্রবিষ্ট বিশ্বকায় ।
সর্বজ্ঞ সর্বগশক্তি,       সদা যাঁর আজ্ঞাবর্তী,
          যুক্তিতে কি বুঝিবে তাঁহায় ॥ ৫১ ॥

বিন্দুতে যে সিন্ধুময়,    অণুতে যে হিমালয়,
          ব্যয়ে যাঁর ক্ষয় মোটে নাই ।
অঙ্কপাতে দিয়া ঠিক,   কি তাঁয় করিবে ঠিক,
          অঙ্ক যাঁর নাহি পায় খেই ॥ ৫২ ॥

সাকারে ও নিরাকারে, সমভাবে খেলা করে,
          সমকালে অবিচ্ছিন্নভাবে ।
নাহি যেথা কথারব,     কিংবা কিছু অসম্ভব,
          কথায় কি তাঁহারে বুঝিবে ॥ ৫৩ ॥

মানুষের মাথাগুলি,       যেমন শামুক খুলি,
          বিন্দু বুদ্ধি আধারের স্থল ।
আছে যদি একফোঁটা, তাঁহাতে অনেক লেঠা,
          ঠিক যেন কাদা-ঘাঁটা জল ॥ ৫৪ ॥

জলে নাহি জলাকার,   তাহে নহে ভাতিবার,
          চন্দ্রমার প্রতিবিম্বখানি ।
দর্পণ ধূলায় মাখা,      নাহি যায় মুখ দেখা,
          মলিনতা-আবরণে হানি ॥ ৫৫ ॥

পরাবিদ্যা বলি তাকে,  কায়মনোবাক্যে একে,
          গুরুবাক্যে কেবল প্রত্যয় ।
তাহে যার স্থিতি গতি,         গিরিবৎ স্থিরমতি,
          সুপণ্ডিত সেই জনে কয় ॥ ৫৬ ॥

হৃদয়ে বিশ্বাস-খুঁটি, ভক্তি-ডোরে বাঁধ আঁটি,
          পদ দুটি প্রভুর আমার ।
চল যাই দুই জনে, লীলা-গীতি আন্দোলনে,
          কুলহীন ভবসিন্ধুপার ॥ ৫৭ ॥

এখানে দেখহ রঙ্গ,         ভগবান ভক্তসঙ্গ,
          আনন্দের তুলিয়া তুফান ।
ধূলা জগতের চক্ষে,    পুততোয়া গঙ্গাবক্ষে,
          সগণে আপনে ভাসমান ॥ ৫৮ ॥

ভাবভঙ্গে প্রভুরায়,      বাহ্যচেঁঠা এলে গায়,
          আঁখি হাসি দুয়ের দুয়ারে ।
এত কথা ইশারায়,     ভাষা নাহি কূল পায়,
          ভেসে যায় অকূল-পাথারে ॥ ৫৯ ॥

উল্লাসে হৃদয় নাচে,    পানিহাটি যত কাছে,
          দূরে থেকে পশিল শ্রবণে ।
উচ্চ আনন্দের রোল,  বাজে শত শত খোল,
          করতাল রণশিক্ষা সনে ॥ ৬০ ॥

দ্রুতগতি তরী চলে,    আসিয়া লাগিল কূলে,
          মহোৎসব হয় যেইখানে ।
প্রভুপদে মন আঁটা,      নবাই চৈতন্য জেঠা,
          আগত উৎসব-দরশনে ॥ ৬১ ॥

তরীতে দেখিয়া রায়,    আছাড় কাছাড় খায়,
          লুটাপুটি যায় ধরাতলে ।
কভু ধরিবারে তরী,     বীরডম্ফে লম্ফ মারি,
          ঝাঁপ দিতে যান গঙ্গাজলে ॥ ৬২ ॥

শ্রীচরণ-দরশনে,        দিগ্বিদিক্ নাহি মানে,
          ঠিক যেন উন্মাদের প্রায় ।
সত্বর ডাঙ্গায় গিয়া,      অঙ্গে হাত বুলাইয়া,
          শান্ত তাঁরে করিলেন রায় ॥ ৬৩ ॥

পরে প্রভু ভক্তাধীন,         বটবৃক্ষ প্রদক্ষিণ,
          কৈলা যত লয়ে ভক্তগণ ।
যেই বটবৃক্ষমূলে,      গৌরাঙ্গের মূল লীলে,
          মহোৎসব যাহার কারণ ॥ ৬৪ ॥

গৌরভক্ত এক জন,       বন্দি তাঁর শ্রীচরণ,
          নিতাই মল্লিক নামে তিনি ।
শুভ সমাচার পেয়ে,      সত্বর আইল ধেয়ে,
          যেখা প্রভু অখিলের স্বামী ॥ ৬৫ ॥

প্রভুপদে ভক্তিমতি,      যুক্ত এই মহামতি,
          ভক্তিমাখা বিনয় বচনে ।
প্রভুকে প্রার্থনা করে,    সভক্তে গমন তরে,
          সন্নিকটে তাঁর নিকেতনে ॥ ৬৬ ॥

গোউর-নিতাই ঘরে,  ভক্তিভরে সেবা করে,
          ভক্তি বড় গৌরাঙ্গের পায় ।
ভক্তগণ সহ লয়ে,      প্রেমে পুলকিত হয়ে,
          বসাইলা বৈঠকখানায় ॥ ৬৭ ॥

মন্দিরের পাছুবর্তী,   গোরা-নিতায়ের মৃতি,
          বিজ্ঞমান আছয়ে যেখানে ।
কীর্তনীয়া দলে দলে,   নাচে গায় কুতুহলে,
          এই মহা উৎসবের দিনে ॥ ৬৮ ॥

কিছুক্ষণ হৈলে গত,      মল্লিক দু-করযুক্ত,
          নিবেদন কৈলা শ্রীগোচরে ।
ভিতরে প্রবেশ করি,    যেখানে ঠাকুরবাড়ি,
          বিগ্রহের দরশন তরে ॥ ৬৯ ॥

স্থানে গমনের আগে, শ্রীঅঙ্গে আবেশ লাগে,
          পথিমধ্যে ক্ষণের ভিতরে ।
প্রভুর প্রকৃতি জ্ঞাত,        ভক্তগণ সচকিত,
          আছে অঙ্গ রক্ষা করিবারে ॥ ৭০ ॥

ঘোরে আবেশের নেশা, ভিতরে যখন আসা,
          দালানের প্রাঙ্গণ উপর ।
কীর্তনীয়া দলে দলে,   বেড়িল সকলে মিলে,
          ভাবে ভরা মূর্তি মনোহর ॥ ৭১ ॥

পুলকে আকুল গাত্র,   কেশরি-বিক্রমে নৃত্য,
          দেখি নেত্রে লাগে চমৎকার ।
স্থান হৈল পরিপূর্ণ,     চারিদিকে লোকারণ্য,
          দেখিবারে নৃত্যের বাহার ॥ ৭২ ॥

নেহারিতে শ্রীগোসাঁই, নীচে যে না পায় ঠাঁই,
          দরশন-পিয়াসের চোটে ।
ছাদের উপরে ধায়,       কেহ উচ্চস্থানে যায়,
          কেহ কেহ গাছে গিয়ে উঠে ॥ ৭৩ ॥

কীর্তনে প্রভুর নৃত্য,     কি শক্তি আঁকিব চিত্র,
          নৃত্যে মোর শ্রীপ্রভুর কর ।
আকর্ণ পুরিত টানে,          যেইরূপ ধনুগুণে,
          ধানুকী ছাড়িতে যায় শর ॥ ৭৪ ॥

বাম হস্ত প্রসারিত,           সরল সরের মত,
          দক্ষিণ বুকের দিকে মোড়া ।
ঠিক যেন আধাআধি,    গলা কিংবা কণ্ঠাবধি,
          বক্ষে লগ্ন অঙ্গুলির গোড়া ॥ ৭৫ ॥

ধরে অঙ্গে মহাবল,         পদচাপে ধরাতল,
          অবিকল হেলাহেলি করে ।
কভু অঙ্গ এত ঢলে,      পড়ে যেন ভূমিতলে,
          পড়ি পড়ি কিন্তু নাহি পড়ে ॥ ৭৬ ॥

ভক্তগণে পায় ডর,        এ যে নৃত্য ভয়ঙ্কর,
          পাছে বাড়ে বেদনা গলায় ।
শান্ত করিবার তরে,      বিধিমতে চেষ্টা করে,
          কিন্তু হয় বিফল উপায় ॥ ৭৭ ॥

ভিতিভাব ভক্তদের,       অন্তরে পাইয়া টের,
          হইলা আপনি শাস্ত নিজে ।
তখন লইয়া তাঁয়,       ভক্তেরা বাহিরে যায়,
          অঙ্গবাস ঘামে গেছে ভিজে ॥ ৭৮ ॥

মল্লিক সোনার বেনে, সত্য সত্য সোনা চিনে,
          কাতরে দাঁড়ায়ে একধারে ।
যোগাইছে যাহা লাগে,   প্রভুর সেবায় লেগে,
          অতি ভক্তি যত্ন সহকারে ॥ ৭৯ ॥

প্রভু যবে প্রকৃতিস্থ,         হয়ে তেঁহ শশব্যস্ত,
          যুক্তকরে করিয়া কাকুতি ।
প্রভু ভক্তগণে কন,       জলযোগ আয়োজন,
          আগমন করুন সম্প্রতি ॥ ৮০ ॥

রাঘবের ঘাট হেথা,     মূল মহোৎসব যেথা,
          তথাকার গোস্বামী ব্রাহ্মণ ।
প্রভুর বারতা পেয়ে,   গোচরে আসিয়া ধেয়ে,
          আগমনে কৈলা নিবেদন ॥ ৮১ ॥

তথায় যুগল-ঠাম,         মনোহর রাধাশ্যাম,
          রাঘব সেবক ছিল যার ।
রাঘব পণ্ডিত যিনি,       গৌরাঙ্গের গণ তিনি,
          জন্ম যবে গৌরাঙ্গাবতার ॥ ৮২ ॥

গোস্বামীরে শ্রীগোসাঁই,   কহেন কেমনে যাই,
          গলায় বেদনা অতিশয় ।
শ্রীবাক্য না শুনে কানে,     শ্রীহস্তধরিয়া টানে,
          সহ স্মৃতি মিনতি বিনয় ॥ ৮৩ ॥

ভক্তিপ্রিয় ভগবান,       ভক্তিতে দিয়াছে টান,
          ভক্তিমান গোস্বামী ব্রাহ্মণ ।
থাকিতে না পারি আর,      হইলেন আগুসার,
          ছায়াবৎ পাছু ভক্তগণ ॥ ৮৪ ॥

ভাবে ভরা অনিবার,      কি ভাব কখন তাঁর,
          ধারাবৎ নিরন্তর কয় ।
সঙ্গে যাঁরা অহরহ,      তাঁরাও বুঝে না কেহ,
          একবাক্যে সকলেই কয় ॥ ৮৫ ॥

অবোধ্য যাঁহার নাম,       বিশ্বনাথ বিশ্বধাম,
          অবোধ্য সকল অবস্থায় ।
সাকারেও বোধাতীত,   নিরাকারে যেই মত,
          সীমাবদ্ধ কেবা বলে তাঁয় ॥ ৮৬ ॥

থাকিয়া দেহের ঘরে,  যে প্রভু জানিতে পারে,
          ব্রাহ্মাণ্ডের যাবৎ বারতা ।
হয়েছে কি হবে পরে,     কার্যাবলী স্তরে স্তরে,
          সীমাবদ্ধ তিনি কিবা কথা ॥ ৮৭ ॥

হেথা একে অন্যে পিটে,   দাগ শ্রীপ্রভুর পিঠে,
          সহ গাত্রে প্রহার-যাতনা ।
কাছে কিবা লোকান্তরে,  তিনি পান দেখিবারে,
          কোথা কিবা কি হয় ঘটনা ॥ ৮৮ ॥

একদিন গঙ্গাকূলে,          ঠিক পঞ্চবট মূলে,
          বসিয়া আছেন প্রভুরায় ।
গভীর ভাবেতে মগ্ন,      অঙ্গে বাহ্যচেঁঠাশূন্য,
          জড়বৎ পুত্তলিকা প্রায় ॥ ৮৯ ॥

অঙ্গবাস আলখাল,       সঙ্গে আছে রামলাল,
          ভ্রাতৃ-পুত্র নিজের প্রভুর ।
অকস্মাৎ হেনকালে,      হাঁ হাঁ হাঁ হাঁ হাঁ হাঁ বলে,
          হাত তুলে উঠিলা ঠাকুর ॥ ৯০ ॥

রামলাল কিছু পরে,     জিজ্ঞাসা করিল তাঁরে,
          কহিবারে কিবা বিবরণ ।
তবে কন গোসাঁই,      প্রত্যক্ষ দেখিতে পাই,
          দেশে এক পুজারী ব্রাহ্মণ ॥ ৯১ ॥

ঢুকিল ঠাকুরঘরে,          সেবিবারে রঘুবীরে,
          ঘটিতে খাঁ পুকুরের জল ।
জলমধ্যে মাটি মলা,    ঘোলের মতন ঘোলা,
          জল-পোকা তাহাতে কেবল ॥ ৯২ ॥

সেই জল পাত্রে ধরে,    নাওয়াইতে রঘুবীরে,
          পূজারীর উত্তম বাসনা ।
তে কারণে ব্রাহ্মণেরে,   বলিয়া দিলাম তারে,
          ব্যবহারে হেন জল মানা ॥ ৯৩ ॥

হেথা জাহ্নবীর তীর,    কোথা দেশে রঘুবীর,
          দূর স্থান দু-দিনের পথ ।
কি কব অধিক আর,        কর রামকৃষ্ণ যার,
          ত্বরায় পুরিবে মনোরথ ॥ ৯৪ ॥

গোটা বিশ্বরাজ্য ব্যাপে,  দেব কি দানবরূপে,
          যেরূপ যেখানে আছে যিনি ।
শ্রীপ্রভুর করগত,            প্রকৃত কলের মত,
          শুন এক মহিমা-কাহিনী ॥ ৯৫ ॥

পূর্বাস্যে পুরীর বামে,   ইংরাজের মেগাজিনে,
          গোলাগুলি-বারুদের ঘর ।
ইচ্ছামত কোম্পানির,      বারেক করিল স্থির,
          দক্ষিণে করিতে পরিসর ॥ ৯৬ ॥

প্রবেশিয়া কালী বাটী,        যতদূর পঞ্চবটি,
          ইংরাজ মাপিয়া কয় পরে ।
ল'য়ে উপযুক্ত পণ,          স্থান কর সমর্পণ,
          নচেৎ লইব কিন্তু জোরে ॥ ৯৭ ॥

পুরীতে পাইয়া ভয়,     আসিয়া প্রভুকে কয়,
          কি উপায় হয় এই স্কুলে ।
মহান্ বিপদ শুনি,          নিজমনে গুণমণি,
          চলিলেন পঞ্চবটী তলে ॥ ৯৮ ॥

কহেন আসিয়া ফিরে,    পঞ্চবটী রক্ষা করে,
          মহান্ পুরুষ একজন ।
আমি কহিয়াছি তাঁয়,    পেঁচ যাহে ঘুরে যায়,
          নাহি আর ভয়ের কারণ ॥ ৯৯ ॥

যে প্রভুর এই সাধ্য, কিসে তাঁরে কবে বোধ্য,
          বটে চৌদ্দপুয়ার আধারে ।
নিত্যতেও যে প্রকার,      কিমভূত কিমাকার,
          লীলার ওপার নিরাকারে ॥ ১০০ ॥

কত আর কব মন,      নিজ মনে আন্দোলন,
          কর রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি ।
কহি যদি পুনর্বার,        বলা কথা পূর্বেকার,
          অনর্থক বেড়ে যায় পুঁথি ॥ ১০১ ॥

হেথা রাঘবের পাটে,  পথে যেতে ভাব উঠে,
          হেন ভাব কখন না শুনি ।
তাকায়ে আকাশপানে,  দক্ষিণ-পূরব কোণে,
          বাহ্যজ্ঞানহীন গুণমণি ॥ ১০২ ॥

কোথায় ধাইব চেঁঠা,    স্পন্দহীন অঙ্গগোটা,
          জড়বৎ অচল শরীর ।
এই ছিলা এই নাই,  কোথা গেলা শ্রীগোসাঁই,
          সাধ্য কার কে করিবে স্থির ॥ ১০৩ ॥

বদনমণ্ডলে ফুটে,     চন্দ্রিমার জ্যোতিঃ মিঠে,
          ঝলমল শ্রীবয়ানখানি ।
তাহাতে নীলিমা-রেখা, মাঝেমাঝে দেয় দেখা,
          অপরূপ প্রভুর কাহিনী ॥ ১০৪ ॥

এরূপে সমাধি ঘোর,      গত প্রায় ঘণ্টাভোর,
          নিম্নে মন আসিতে না চায় ।
সেই হেতু ভক্তগণে,      শ্রীপ্রভুর কানে কানে,
          বীজ-বাক্য প্রণব শুনায় ॥ ১০৫ ॥

বীজমন্ত্র শ্রুতিমূলে,       সমাধি সময়ে দিলে,
          হয় মহাভাব-অবসান ।
হেথা রাঘবের পাটে,    সে বিধান নাহি খাটে,
          ভক্তবর্গে সভীত পরাণ ॥ ১০৬ ॥

ভক্তের যে ভগবান,          শুনহ তার প্রমাণ,
          ভক্তগণে ভয়ার্ত দেখিয়া ।
সপ্তম হইতে নীচে,    ক্রমে ক্রমে পিছে পিছে,
          আসিলেন আপনি নামিয়া ॥ ১০৭ ॥

আবেশের ঘোরে তাঁয়,     উঠায়ে লইলা নায়,
          ধরাধরি করি পরস্পর ।
মাঝিগণে অনুমতি,       পাড়ি দেহ দ্রুতগতি,
          একবারে দক্ষিণশহর ॥ ১০৮ ॥

রামকৃষ্ণায়ন কথা,         শ্রুতি-সুমধুর গাথা,
          শ্রবণ করিলে একমনে ।
ভবভয় করি নষ্ট,            বিশ্বরাজ রামকৃষ্ণ,
          স্থান দেন অভয় চরণে ॥ ১০৯ ॥