পঞ্চম খণ্ড
প্রভুর চিকিৎসার্থ কলিকাতায় আগমন ও বাস
বন্দ
মন বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণরায় ।
প্রেমানন্দে বন্দ গুরুদারা জগন্মায় ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ ভক্ত দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
প্রথম খণ্ডেতে বাল্য-লীলা সুমধুর ।
শ্রবণ-কীর্তনে স্বচ্ছ হৃদয় মুকুর ॥ ১ ॥
সমুজ্জ্বল প্রতিভাত তাহার উপর ।
শ্রীপ্রভুর অপরূপ রূপ মনোহর ॥ ২ ॥
দ্বিতীয় খণ্ডের লীলা সাধন-ভজন ।
বিশ্বাসের সহ যেবা করে আন্দোলন ॥ ৩ ॥
নিশ্চয় বিমুক্ত তার লোচন-আঁধার ।
পশিতে রতনাগারে চৈতন্যের দ্বার ॥ ৪ ॥
তৃতীয় চতুর্থ খণ্ডে ভক্ত-সংজোটন ।
মহিমা-প্রচার ধর্ম-দ্বন্দ্ব-বিভঞ্জন ॥ ৫ ॥
স্বরূপত্ব-প্রদর্শন দীনহীনসাজে ।
শ্রবণ কীর্তনে মন মজে পদাম্বুজে ॥ ৬ ॥
পঞ্চম শেষের খণ্ড পুঁথি যাহে সায় ।
একমনে যদি কেহ শুনে কিংবা গায় ॥ ৭ ॥
বড়ই মধুর ফল হাতে হাতে ফলে ।
প্রেমাভক্তি পরাধন চরণকমলে ॥ ৮ ॥
ব্যাধির বিক্রম ভারি বৃদ্ধি এইবার ।
প্রদাহ যন্ত্রণা কত কষ্ট অনিবার ॥ ৯ ॥
মধ্যে মধ্যে রক্তস্রাবে দেহ শীর্ণ-প্রায় ।
এই মতে শ্রাবণের আধাআধি যায় ॥ ১০ ॥
ক্ষুণ্ণমন ভক্তগণ বুঝিতে না পারে ।
প্রভুর আরোগ্য-হেতু কি উপায় করে ॥ ১১ ॥
একদিন রাম আর দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ।
কালীপদ গিরিশ প্রভৃতি কয়জন ॥ ১২ ॥
একত্র বসিয়া যুক্তি কৈল স্থিরতর ।
প্রতিকারে উপযুক্ত ইংরাজ ডাক্তার ॥ ১৩ ॥
পরদিন প্রাতঃকালে ভক্ত চারিজন ।
অনুমতি-হেতু চলে প্রভুর সদন ॥ ১৪ ॥
বিশুষ্ক-বদন প্রভু দেখিলেন গিয়া ।
উঠিবার শক্তি নাই আছেন শুইয়া ॥ ১৫ ॥
হেন বিমরয ভাব কখন না শুনি ।
রসনা রহিত রস নাহি ফুটে বাণী ॥ ১৬ ॥
সদানন্দময়ে হেন নিরানন্দ ধারা ।
দেখি ভক্তচতুষ্টয়ে প্রায় প্রাণহারা ॥ ১৭ ॥
মুখে নাহি সরে কথা প্রভুর যেমন ।
জিজ্ঞাসা করিতে তাঁরে আছেন কেমন ॥ ১৮ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে সম্বরি আপনে ।
বলিলেন বড় কষ্ট গেছে গত দিনে ॥ ১৯ ॥
এক পুয়া রক্তস্রাব যন্ত্রণা সহিত ।
গলনালিমধ্যে দাহ বিয়াধির রীত ॥ ২০ ॥
ঘোর বরিষার কাল শ্রাবণের শেষ ।
গেরুয়া-বসনা গঙ্গা বিরাগিনী বেশ ॥ ২১ ॥
নীল-কলেবর সিন্ধু-সঙ্গম-আশায় ।
কূল দিয়া ভাসাইয়া তীব্র বেগে ধায় ॥ ২২ ॥
পুরীমধ্যে পুষ্পোদ্যান জাহ্নবীর কূলে ।
শ্রীপ্রভুর মন্দিরের পশ্চিম অঞ্চলে ॥ ২৩ ॥
ছয় হস্ত পরিমিত দূরত্ব কেবল ।
মাটি নাহি যায় দেখা তদুপরি জল ॥ ২৪ ॥
সেই হেতু শ্রীপ্রভুর মন্দিরাভ্যন্তর ।
অতিশয় জলে সিক্ত রহে নিরন্তর ॥ ২৫ ॥
এদিকে বিশালাকাশে জলদেব দল ।
ঝুরু ঝুরু ফেলিতেছে বৃষ্টি অবিরল ॥ ২৬ ॥
জলকণা মাখি অঙ্গে বায়ু বহমান ।
আর্দ্র করে অবিরত আশ্রয়ের স্থান ॥ ২৭ ॥
হেন ঠাঁই শ্রীগোসাঁই করিলে বসতি ।
স্বাস্থ্যের সম্বন্ধে তাঁর হবে বহু ক্ষতি ॥ ২৮ ॥
এত ভাবি ভক্তগণে কৈলা নিবেদন ।
শহরে বসতি করা এবে প্রয়োজন ॥ ২৯ ॥
উপযুক্ত বাসস্থান অনুমতি দিলে ।
নির্ধারিত করি গিয়া শহর অঞ্চলে ॥ ৩০ ॥
অবিকল শিশুছেলে বালক যেমন ।
ভালবাসা মাখা ভাষা করিয়া শ্রবণ ॥ ৩১ ॥
সহাস্ত-আননে কন বাড়ি দেখ তবে ।
বাগবাজারের কাছে গঙ্গাতীর হবে ॥ ৩২ ॥
ভ্রাতৃপুত্র রামলালে বলেন ডাকিয়া ।
যাত্রাদিন কর স্থির পঞ্জিকা দেখিয়া ॥ ৩৩ ॥
সুন্দর যাত্রিক দিন পর শনিবারে ।
আজি বৃহস্পতি আর একদিন পরে ॥ ৩৪ ॥
সানন্দে ভকতবর্গ উঠিল সত্বর ।
অন্বেষণ করিবারে আজ্ঞামত ঘর ॥ ৩৫ ॥
আনন্দ কি হেতু যদি জিজ্ঞাসিলে মন ।
তদুত্তরে কহি শুন তাহার কারণ ॥ ৩৬ ॥
প্রভু-দরশন-প্রিয় ভকতনিকর ।
ক্রোশত্রয় দূরে এই দক্ষিণশহর ॥ ৩৭ ॥
সহজে এখানে আসা ঘটে না কাহার ।
সপ্তাহে বারেক কেহ পক্ষে একবার ॥ ৩৮ ॥
কিন্তু এবে কৈলে প্রভু শহরে বসতি ।
দরশন শুভযোগে হবে দিবা রাতি ॥ ৩৯ ॥
মনে মনে সকলের স্থিরতর জানা ।
দু-দিনের চিকিৎসায় সারিবে বেদনা ॥ ৪০ ॥
সেইহেতু ভক্তবর্গ হরষিত মন ।
কে জানে ঘটিবে পরে বিপদ ভীষণ ॥ ৪১ ॥
বাগবাজারের কাছে গঙ্গা সন্নিহিত ।
নুতন আবাস বাটী করি নির্ধারিত ॥ ৪২ ॥
সমাচার পাঠাইলা প্রভুর সাক্ষাতে ।
উপনীত প্রভুদেব শনিবার প্রাতে ॥ ৪৩ ॥
নিরখিয়া বাসাবাটী জানি না কারণ ।
বসতি করিতে তথা হইল না মন ॥ ৪৪ ॥
পরিহরি সেই বাটী ত্বরিত-গমনে ।
উপনীত হইলেন বসুর ভবনে ॥ ৪৫ ॥
বসুর ভাগ্যের কথা নাহি হয় ইতি ।
যাঁহার ভবনে এত প্রভুর পিরীতি ॥ ৪৬ ॥
শ্রী প্রভুর আগমন বসুর ভবনে ।
সাধারণে রাষ্ট্র কথা হৈল কানে কানে ॥ ৪৭ ॥
লোকারণ্য হৈল লোকে ভবন-ভিতরে ।
অগণন সাধ্য কার সংখ্যা ভার করে ॥ ৪৮ ॥
মঙ্গল-উৎসব-ধ্বনি উঠে দিবারাত্র ।
বসুর ভবন ঠিক জগন্নাথ-ক্ষেত্র ॥ ৪৯ ॥
প্রভু যে পীড়িত এত কেহ নাহি ভাবে ।
দরশনে সবে মহানন্দ-নীরে ডুবে ॥ ৫০ ॥
পূর্ববৎ সমভাবে ব্যাধির বিক্রম ।
কখন কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি কভু কিছু কম ॥ ৫১ ॥
ইংরাজ ডাক্তারে দিতে চিকিৎসার ভার ।
ঠাকুর তাহাতে নাহি করিলা স্বীকার ॥ ৫২ ॥
চিকিৎসার ভার তবে হইল পশ্চাতে ।
প্রতাপ মজুমদার ডাক্তারের হাতে ॥ ৫৩ ॥
শহরের একজন সুবিজ্ঞ ডাক্তার ।
হোমিওপ্যাথিক মতে চিকিৎসা তাঁহার ॥ ৫৪ ॥
যথাসাধ্য বিয়াধির নিরূপণ করি ।
খাইতে দিলেন ছোট ছোট সাদা বড়ি ॥ ৫৫ ॥
প্রভুর বালকাপেক্ষা শরীর দুর্বল ।
ঔষধসেবনে ঘটে বিপরীত ফল ॥ ৫৬ ॥
প্রতাপ প্রতাপান্বিত যশ দেশ জুড়ে ।
এখানের প্রতিকারে বুদ্ধি যায় মুড়ে ॥ ৫৭ ॥
কিছুতেই কোনমতে কিছু নহে ফল ।
প্রতিকারে রোগ করে দুনো গুণে বল ॥ ৫৮ ॥
ইহাতেও তিল নাই প্রভুর বিশ্রাম ।
তত্ত্বকথা নৃত্য গীত চলে অবিরাম ॥ ৫৯ ॥
দরশনে আসে যেবা যে কোন আশায় ।
আশার অতীত কভু অনায়াসে পায় ॥ ৬০ ॥
একদিন শুন এক শ্রীপ্রভুর খেলা ।
গগনে কেবল বাকি প্রহরেক বেলা ॥ ৬১ ॥
গৌরাঙ্গ-ভকত এক ব্রাহ্মণ-নন্দন ।
নামাবলী ছিটাফোঁটা অঙ্গে সুশোভন ॥ ৬২ ॥
প্রভুর মহিমা-কথা লোকমুখে শুনে ।
আসিতেন পথে পথে কভু দরশনে ॥ ৬৩ ॥
আসিতে আসিতে করে মনে আন্দোলন ।
প্রভুর মহিমা-কথা-শ্রবণ যেমন ॥ ৬৪ ॥
সরল বিশ্বাসে তেঁহ পাইল দেখিতে ।
গৌরাঙ্গ-চরিতখানি প্রভুর চরিতে ॥ ৬৫ ॥
বিস্ময় সহিত নানাবিধ চিন্তা মনে ।
অবশেষে উপনীত বসুর ভবনে ॥ ৬৬ ॥
বাঞ্ছাকল্পতরু প্রভু অখিলের রাজ ।
সদর মেলার মধ্যে করেন বিরাজ ॥ ৬৭ ॥
বৈষ্ণবের বেশভূষা অঙ্গে দেখি তার ।
শ্রীপ্রভুর রীতি যেন অগ্রে নমস্কার ॥ ৬৮ ॥
ব্রাহ্মণ-নন্দন করি প্রণিপাত পরে ।
ভক্তিরীতে বসিলেন প্রভুর গোচরে ॥ ৬৯ ॥
একরে ধরিয়া এক বিউনি তখন ।
আপনে আপনি প্রভু করেন ব্যজন ॥ ৭০ ॥
ব্রাহ্মণের মনে মনে উপজিল আশ ।
পাইলে বিউনি করে শ্রীঅঙ্গে বাতাস ॥ ৭১ ॥
হৃদয় নিবাস প্রভু বুঝিয়া অন্তরে ।
সমর্পণ কৈলা পাখা ব্রাহ্মণের করে ॥ ৭২ ॥
মিটাইয়া মনসাধ ব্রাহ্মণ তখন ।
পরম আহ্লাদে করে শ্রীঅঙ্গে ব্যজন ॥ ৭৩ ॥
কলা-পরবশ প্রভু স্বভাবের গুণে ।
সেবায় হইয়া তুষ্ট ব্রাহ্মণনন্দনে ॥ ৭৪ ॥
কমলার সেব্য সেই অমূল্য চরণ ।
ভাবাবেশে বক্ষে তাঁর করিলা অর্পণ ॥ ৭৫ ॥
পুলকে পুণিত হিয়া দ্বিজ ভাগ্যবান ।
পথে যা ভাবিলা তাই দেখে বিদ্যমান ॥ ৭৬ ॥
প্রবল প্রাণান্ত পীড়াভোগ অবিরাম ।
তথাপি তিলেক নাই খেলায় বিশ্রাম ॥ ৭৭ ॥
তৃণতুল্য জ্ঞান দেহে খেলা নিরবধি ।
যত দিন যায় তত বৃদ্ধি পায় ব্যাধি ॥ ৭৮ ॥
পরাভূত কবিরাজ ডাক্তারের গণে ।
এক পক্ষ হৈল গত বসুর ভবনে ॥ ৭৯ ॥
এখানে অধিক দিন স্থিতি নহে যোগ্য ।
স্বতন্তর স্থান চেষ্টা করে ভক্তবর্গ ॥ ৮০ ॥
শ্যামপুকুরের মধ্যে বাড়ী হৈল স্থির ।
যাহার পশ্চিমে এক শিবের মন্দির ॥ ৮১ ॥
দ্বিতল মহল বাড়ি মাস ভাড়া ধার্য ।
গৃহস্বামী নামজাদা শিবু ভট্টাচার্য ॥ ৮২ ॥
শ্রীপ্রভুর মহাভক্ত কালীপদ ঘোষ ।
নিকটে তাঁহার বাড়ি বড়ই সন্তোষ ॥ ৮৩ ॥
যে বাড়িতে শ্রীপ্রভুর হবে আগুসার ।
অগ্রণী হইয়া কর্মে কৈলা পরিষ্কার ॥ ৮৪ ॥
দেবদেবীমূর্তি-আঁকা পট ক্রয় করি ।
চৌদিকে দেয়ালে আঁটাইল সারি সারি ॥ ৮৬ ॥
জালা হাঁড়ি খুন্তি বেড়ি মাদুর আসন ।
চাল ডাল দ্রব্যাদি যতেক প্রয়োজন ॥ ৮৭ ॥
এইসব আয়োজন করিবার তরে ।
লইল সকল ভার নিজের উপরে ॥ ৮৮ ॥
ব্যয় তার যত হয় সকলে যোগান ।
গিরিশ সুরেন্দ্র মিত্র বসু বলরাম ॥ ৮৯ ॥
হরিশ মুস্তফী নবগোপাল কেদার ।
চাঁই ভক্ত রাম দত্ত মহেন্দ্র মাস্টার ॥ ৯০ ॥
কালীপদ দেবেন্দ্র ব্রাহ্মণ ভক্তগণ ।
এবে যাঁরা সন্ন্যাসীরা বালক তখন ॥ ৯১ ॥
যোগাইতে টাকাকড়ি পাইবে কোথায় ।
যাহা ছিল দেহপ্রাণ সঁপিল সেবায় ॥ ৯২ ॥
রাখাল যোগীন লাটু নিত্যনিরঞ্জন ।
বাবুরাম কালী শশী এই কয়জন ॥ ৯৩ ॥
সেবাপর অবিরত রহে রেতে দিনে ।
'ভক্ত-মা' গোলাপ-মাতা একাকী রন্ধনে ॥ ৯৪ ॥
এখন নরেন্দ্রনাথ প্রভুতে পিরীত ।
দু-গণ্ডা প্রহর গোটা প্রায় উপস্থিত ॥ ৯৫ ॥
কোথাও ক্ষণেক জন্য হইলে বাহির ।
ঘুরিয়া ঘুরিয়া পুনঃ স্বস্থানে হাজির ॥ ৯৬ ॥
এইবার আগেকার কথা স্বর মনে ।
কতই ঘুরিলা প্রভু নরেন্দ্রান্বেষণে ॥ ৯৭ ॥
কোথা তাঁর খেলাস্থান কোথা তাঁর ঘর ।
সমাজ-মন্দির কোথা দক্ষিণশহর ॥ ৯৮ ॥
ঋতুর তাড়না গ্রাহ্য তিলাদপি নাই ।
নরেন্দ্রের জল্প যেন পাগল গোসাঁই ॥ ৯৯ ॥
সহিলা কহিলা কত তাঁহার বিচ্ছেদে ।
এখন নরেন্দ্রনাথ শ্রীপ্রভুর ফাঁদে ॥ ১০০ ॥
শরীরে ধরিয়া পীড়া এখন গোসাঁই ।
করিছেন অন্তরঙ্গগণের বাছাই ॥ ১০১ ॥
ভক্তি-প্রাণ-ভালবাসা প্রাণাধিক টান ।
এই কয় গুণে অন্তরঙ্গের প্রমাণ ॥ ১০২ ॥
পীড়ার প্রাবল্য যত হয় দিন দিন ।
কান্তিময় তনুখানি জীর্ণ শীর্ণ ক্ষীণ ॥ ১০৩ ॥
তত অন্তরঙ্গদের বাড়য়ে আসক্তি ।
প্রাণের অধিক টান ভালবাসা ভক্তি ॥ ১০৪ ॥
যেন দেহ-বিনিময়ে দেহে লয়ে রোগ ।
করিছেন ভক্তদের ভক্তির সম্ভোগ ॥ ১০৫ ॥
একদিন ভক্তবর্গে হয়ে একতর ।
ভাবিয়া চিন্তিয়া যুক্তি কৈলা স্থিরতর ॥ ১০৬ ॥
শহরের মধ্যে যে উৎকৃষ্ট চিকিৎসক ।
হউক যতই ব্যয় তারে আবশ্যক ॥ ১০৭ ॥
ডাক্তার মহেন্দ্রনাথ সরকারোপাধি ।
হোমিওপ্যাথিক মতে চিকিৎসার বিধি ॥ ১০৮ ॥
প্রতিকারে নির্বাচিত হইলেন তিনি ।
ষোল টাকা প্রতিবারে বেতন দর্শনী ॥ ১০৯ ॥
রাজভাষা-বিশারদ পাঠপ্রিয় ধারা ।
যতগুলি আছে পাশ সবগুলি করা ॥ ১১০ ॥
অগণ্য করিয়া পাশ বন্ধ মহাপাশে ।
বিশেষিয়া পরিচয় পাবে পরিশেষে ॥ ১১১ ॥
সরল অন্তরাধারে দয়া বলবান ।
রসনা কর্কশ বড় বাক্য যেন বাণ ॥ ১১২ ॥
যে কার্য করিলা তেহ প্রভুর লীলায় ।
বহি যদি শিরে জুতা শোধ নাহি যায় ॥ ১১৩ ॥
রামকৃষ্ণপন্থী মাত্র তাঁর কাছে ঋণী ।
বারে বারে বন্দি তাঁর চরণ দুখানি ॥ ১১৪ ॥
পুজনীয় প্রভুভক্ত মহেন্দ্র মাস্টার ।
ডাক্তার আনিতে কর্মে লইলেন ভার ॥ ১১৫ ॥
ইহার কিঞ্চিৎ পূর্বে ডাক্তার-ভবনে ।
শ্রীপ্রভুর আগমন ব্যাধি নিরূপণে ॥ ১১৬ ॥
জানা-শুনা ইহার অধিক পূর্বে আর ।
মথুরে চিকিৎসা করেন যখন ডাক্তার ॥ ১১৭ ॥
মথুরের মনমত ইহার চিকিৎসা ।
সেহেতু দক্ষিণেশ্বরে ছিল যাওয়া আসা ॥ ১১৮ ॥
সে জানা কেমন জানা শুন পরিচয় ।
মথুর-পোষ্য লোকে পরমহংস কয় ॥ ১১৯ ॥
যেন অতিশয় মূর্খ ব্রাহ্মণের ছেলে ।
পূজাকার্যে ব্রতী তাই ভট্টাচার্য বলে ॥ ১২০ ॥
সেইমতে ডাক্তারের প্রভুদেবে জানা ।
সে ঠকে অধিক নিজে যে বুঝে সিয়ানা ॥ ১২১ ॥
হেথা পথপানে চেয়ে আছে ভক্তবৃন্দ ।
কখন মহেন্দ্রে ল'য়ে আসেন মহেন্দ্র ॥ ১২২ ॥
হেনকালে ডাক্তার হইল উপনীত ।
ভকতনিকরে প্রভুদেব সুবেষ্টিত ॥ ১২৩ ॥
প্রভুদেবে দেখিয়াই সবিস্ময় মনে ।
ডাক্তার প্রভুকে কন তুমি যে এখানে ॥ ১২৪ ॥
দেখাইয়া সম্মুখীন ভকতনিকরে ।
উত্তর—এনেছে এরা চিকিৎসার তরে ॥ ১২৫ ॥
শ্রীপ্রভুর বিছানার উপর বসিয়া ।
রোগ পরীক্ষিয়া দিল ঔষধ কহিয়া ॥ ১২৬ ॥
নূতন দেখিনু আমি এতদিন পরে ।
প্রভু ভিন্ন অন্যে তাঁর শয্যার উপরে ॥ ১২৭ ॥
অতি অল্পক্ষণ মধ্যে উঠিল ডাক্তার ।
উপনীত নীচে যেথা বাহির দুয়ার ॥ ১২৮ ॥
ডাক্তারের কাছে গিয়া মাস্টার অগ্রণী ।
সচেষ্ট তাঁহারে দিতে বেতন দর্শনী ॥ ১২৯ ॥
হাতে না লইয়া টাকা পুছিল ডাক্তার ।
যে বাড়িতে আসিয়াছি এ বাড়ি কাহার ॥ ১৩০ ॥
গুনিয়া ডাক্তারে কৈলা মাস্টার উত্তর ।
শ্রীপ্রভুর ভক্তদের ভাড়া লওয়া ঘর ॥ ১৩১ ॥
ইহার চিকিৎসা মাত্র উদ্দেশ্য ইহাতে ।
দক্ষিণশহর দূর শহর হইতে ॥ ১৩২ ॥
উহার আবার ভক্ত ভক্ত কি রকম ।
অধিক বিশ্বয়াপন্ন হইয়া তখন ॥ ১৩৩ ॥
জিজ্ঞাসা করিল তবে জানিতে আখ্যান ।
ভক্ত সব কারা তাঁরা কি তাঁদের নাম ॥ ১৩৪ ॥
ভক্তদের নাম শুনি অবাক ডাক্তার ।
দর্শন-গ্রহণে তবে কৈলা অস্বীকার ॥ ১৩৫ ॥
ডাক্তার হৃদয়বান ধীমান পণ্ডিত ।
ধর্ম তাঁর একমাত্র সাধারণহিত ॥ ১৩৬ ॥
প্রভুদেব হিতাকাঙ্ক্ষী সাধারণ জনে ।
বিশেষ ধারণা দৃঢ় হৈল মনে মনে ॥ ১৩৭ ॥
মনোভাব বাক্যেতে প্রকাশ করি তিনি ।
অস্বীকার করিলেন লইতে দর্শনী ॥ ১৩৮ ॥
মহেন্দ্র মাস্টার পুনঃ বুঝাইয়া কন ।
যদিও ভক্তেরা নহে ধনাঢ্য এমন ॥ ১৩৯ ॥
তথাপি অক্ষম নহে দর্শনী-প্রদানে ।
গ্রহণ করুন এথে অস্বীকার কেনে ॥ ১৪০ ॥
মুখমন ডাক্তার কহেন তদুত্তরে ।
আমাকেও কর গণ্য পাঁচের ভিতরে ॥ ১৪১ ॥
পরম যতন সহ উহারে দেখিব ।
যতবার আবশ্যক আপনি আসিব ॥ ১৪২ ॥
সুহৃদের মত তেঁহ বলিলেন পিছে ।
ইহাতে নিজের মোর বহু স্বার্থ আছে ॥ ১৪৩ ॥
শ্রীপ্রভুর চিকিৎসায় স্বার্থ আছে তাঁর ।
সুগভীর অর্থ দেখি ভিতরে ইহার ॥ ১৪৪ ॥
গূঢ় কথা বড় হেথা কহিলা ডাক্তার ।
লক্ষ কোটি নমস্কার চরণে তাঁহার ॥ ১৪৫ ॥
বহুদূরদর্শিতার ভাব এ কথায় ।
ডাক্তার—ডাক্তার নহে জনৈক লীলায় ॥ ১৪৬ ॥
অতিশয় প্রিয়তম শ্রীপ্রভুর জন ।
প্রভুর ইচ্ছায় এবে অবস্থা এমন ॥ ১৪৭ ॥
শ্রীপ্রভুর রঙ্গ যত ডাক্তারের সনে ।
আলোচনা করিলে বুঝিবে অন্ধ জনে ॥ ১৪৮ ॥
শহরেতে শ্রীপ্রভুর কেন আগমন ।
উদ্দেশ্য তাহার সঙ্গে সপ্রেম মিলন ॥ ১৪৯ ॥
বহুদূরদর্শিতার শকতির গুণে ।
ডাক্তার বিশেষরূপে বুঝিলা আপনে ॥ ১৫০ ॥
আপনার অবস্থা দেখিয়া পান টের ।
প্রভুর চিকিৎসা নয় চিকিৎসা নিজের ॥ ১৫১ ॥
ডাক্তার বড়ই চাপা অন্তঃশীলা বয় ।
দেড়গণ্ডা তালা আঁটা হৃদয়-নিলয় ॥ ১৫২ ॥
মনোগত ভাব কভু প্রকাশ না করে ।
স্বেচ্ছায় এ নয় তাঁর স্বভাবানুসারে ॥ ১৫৩ ॥
মানুষের সঙ্গে কি খেলেন ভগবান ।
মানুষে না দেন তিনি জানিতে সন্ধান ॥ ১৫৪ ॥
মায়ায় মোহিতচিত অবিরত রয় ।
অহঙ্কারে আমি করি এই মত কয় ॥ ১৫৫ ॥
জাগাইয়া রায় সঙ্গে খেলেন ঈশ্বর ।
সে খেলার অন্য ধারা বর্ণ স্বতন্তর ॥ ১৫৬ ॥
সেখানে মায়ার তালা খোলা একেবারে ।
আমিতে অকর্তা-বোধ তুমি তুমি করে ॥ ১৫৭ ॥
ডাক্তারের ধর্ম-রোগ শুনহ এখন ।
পরম পণ্ডিত বৈজ্ঞানিক এক জন ॥ ১৫৮ ॥
তর্ক-বিদ্যাবলে পক্ষ সমর্থন করে ।
প্রাণান্তে স্বীকার নয় সাকার ঈশ্বরে ॥ ১৫৯ ॥
এ রোগ ইহার নহে একাকী কেবল ।
রোগগ্রস্ত এবে প্রায় সব নব্যদল ॥ ১৬০ ॥
সাকারের প্রতিবাদী সংখ্যা কেবা করে ।
ম্যালেরিয়া রোগী যেন প্রতি ঘরে ঘরে ॥ ১৬১ ॥
সকলে বিদিত হেতু বলাই বাহুল্য ।
ব্রাহ্মধর্ম প্রাবল্যেতে রোগের প্রাবল্য ॥ ১৬২ ॥
বিজ্ঞানের দেশে দেশে উন্নতি সাধন ।
বুদ্ধিবল কলবল দ্বিতীয় কারণ ॥ ১৬৩ ॥
সাকার না লাগে ভাল দোষ নাহি তায় ।
দোষমাত্র প্রতিবাদে সাকার কথায় ॥ ১৬৪ ॥
সর্বশক্তিমানত্বের ভাব ভগবানে ।
আকার ধরিতে তবে শক্তি নাই কেনে ॥ ১৬৫ ॥
সর্বশক্তিমানত্ব প্রত্যক্ষ দেখা যাঁর ।
সে বুঝে সাকার যিনি তিনি নিরাকার ॥ ১৬৬ ॥
যত দূর ধারণা করিতে পারে জীবে ।
অসম্ভব কিবা তায় সকলি সম্ভবে ॥ ১৬৭ ॥
বার বার বলিলেন প্রভু ভক্তপতি ।
ঈশ্বরীয় অবস্থার নাহি হয় ইতি ॥ ১৬৮ ॥
ভক্তপতি শ্রীপ্রভুর নাম এইখানে ।
নূতন কহিনু শুন কিবা তার মানে ॥ ১৬৯ ॥
ভক্ত সাধারণী নাম ভক্ত কয় তাঁরে ।
ভক্তিভরে ঈশ্বরের ভজনা যে করে ॥ ১৭০ ॥
শাক্ত শৈব গাণপত্য রামাইৎ বৈষ্ণব ।
বাউল নানকপন্থী কর্তাভজা সব ॥ ১৭১ ॥
নবরসিকের দল জানা সর্বজনে ।
নিরাকার-উপাসক সগুণ নির্গুণে ॥ ১৭২ ॥
অঘোরপন্থী কি বৌদ্ধ কিবা পঞ্চনামী ।
দরবেশ আল্লাভজা কিবা খ্রীষ্টিয়ানি ॥ ১৭৩ ॥
যে মতে যে পথে যেবা ভজে ভগবানে ।
ভক্ত অর্থে এক করি সাধারণী মানে ॥ ১৭৪ ॥
এই সব পন্থীদের প্রভু অধিপতি ।
বারে বারে বলিয়াছি ইহার ভারতী ॥ ১৭৫ ॥
যে মত পথের ভক্ত প্রভু বিদ্যমান ।
সবে পায় আপনার পথের সন্ধান ॥ ১৭৬ ॥
যাবতীয় মতে পথে করিয়া সাধনা ।
পথঘাট শ্রীপ্রভুর সব ভাল জানা ॥ ১৭৭ ॥
উপায়ের হেতু কাছে আসিলে সাধক ।
ঘুচিয়া দিতেন তার যেখানে আটক ॥ ১৭৮ ॥
উপদেশ তার মত তাহার ভাষায় ।
সে কথা অন্যের পক্ষে বুঝা মহাদায় ॥ ১৭৯ ॥
ভক্তমাত্রে হয়ে মুগ্ধ চরিতে প্রভুর ।
সকলে বুঝিত তিনি তাঁদের ঠাকুর ॥ ১৮০ ॥
ইহার বিশেষ মর্ম বিশেষিয়া জানে ।
ইদানীং সমুন্নত ব্রাহ্মভক্তগণে ॥ ১৮১ ॥
সকলের উপদেষ্টা প্রভু ভগবান ।
পুঁথি তাই জানে তাঁর ভক্তপতি নাম ॥ ১৮২ ॥
ডাক্তার বোঝেন সেই পরম-ঈশ্বর ।
অরূপ আকারহীন বুদ্ধির উপর ॥ ১৮৩ ॥
মানুষ কখনও গুরু হইতে না পারে ।
মানুষ মানুষ মাত্র কিবা শক্তি ধরে ॥ ১৮৪ ॥
মানুষের পদধূলি গ্রহণীয় নয় ।
ঈশ্বর মহান কিবা মনুষ্য নিচয় ॥ ১৮৫ ॥
অসীম অখণ্ডেশ্বর মনুষ্য-আধারে ।
হইবার নহে কভু হইতে না পারে ॥ ১৮৬ ॥
কেমনে হইবে যাহা নহে হইবার ।
ভাব কি সমাধি ইহার মাথার বিকার ॥ ১৮৭ ॥
দুধ খেয়ে মলত্যাগ যেই জন করে ।
কেমনে ঈশ্বরারোপ করিব তাঁহারে ॥ ১৮৮ ॥
বিজ্ঞতর বৈজ্ঞানিক মার্জিতাগ্রগণ্য ।
ধনে গুণে যশে কাজে সাধারণে মান্য ॥ ১৮৯ ॥
এহেন উন্নতশীল মানুষ যে জন ।
ঈশ্বর সমাধি ব্যাখ্যা করিল কেমন ॥ ১৯০ ॥
যাহে বেদ তন্ত্র গীতা পুরাণনিচয় ।
সাধন-ভজনকর্ম সব হয় লয় ॥ ১৯১ ॥
বিশেষিয়া এইখানে বুঝ তুমি মন ।
হালের মার্জিতবুদ্ধি লোকের লক্ষণ ॥ ১৯২ ॥
হায়! আমি কি কহিব অতি অর্বাচীন ।
পাড়াগেঁয়ে মেঠো লোক বিদ্যাবুদ্ধিহীন ॥ ১৯৩ ॥
চেহারায় মূর্ছা যায় গেছো ভূত দেখে ।
বরনে লজ্জায় কালি দোয়াতেতে ঢুকে ॥ ১৯৪ ॥
পেটভরা ভাত মুড়ি কোথা দু-বেলায় ।
হীন দাস্যবৃত্তি কাজে আয়ু কেটে যায় ॥ ১৯৫ ॥
এঁরা
সব বড়লোক চড়ে গাড়ি ঘোড়া ।
সুগঠন সুবসন বেশ জামাজোড়া ॥ ১৯৬ ॥
লুচি চিনি দুধ মিষ্টি ইচ্ছামত খায় ।
দ্বিতলে ত্রিতলে নিদ্রা কোমল শয্যায় ॥ ১৯৭ ॥
দাস দাসী খানসামা চাকর বেহারা ।
ভোজপুরী বংশধারী দরজাতে খাড়া ॥ ১৯৮ ॥
বড় বড় সাহেবেরা মহামান্য করে ।
হকুমেতে মানুষের মাথা যায় উড়ে ॥ ১৯৯ ॥
এহেন অবস্থাপন্ন লোকের তুলনে ।
আমি ক্ষুদ্র পিপীলিকা ডোবে এক কোণে ॥ ২০০ ॥
কিন্তু রামকৃষ্ণজীর কৃপাদৃষ্টিবলে ।
বড় লোকে দেখি যেন দুগ্ধপোষ্য ছেলে ॥ ২০১ ॥
বলিল কেমনে কথা ফুটিল বদনে ।
এত সব মহা মহা ভক্তদের স্থানে ॥ ২০২ ॥
ভাব কি সমাধি ইহা মাথার বিকার ।
শক্তিহীন ভগবান ধরিতে আকার ॥ ২০৩ ॥
তবে দূরদর্শিতার ভাব তাহে কিসে ।
কেবল চাঁদের আলো প্রভুর পরশে ॥ ২০৪ ॥
রক্ষা কর রামকৃষ্ণ নরতনু-বেশ ।
পূর্ণব্রহ্ম সনাতন বিচ্ছু পরমেশ ॥ ২০৫ ॥
অনাদি অখণ্ড সীমাহীন বিশ্বস্বামী ।
নিরাকার সাকার উভয় রূপে তুমি ॥ ২০৬ ॥
তোমার কৃপায় প্রভু দূরীভূত ধাঁধা ।
প্রার্থনা চরণে যেন মন রহে বাঁধা ॥ ২০৭ ॥
নিঃস্বার্থে প্রভুতে শ্রদ্ধা রাখি যেইজন ।
রোগ-প্রতিকারে করে বিশেষ যতন ॥ ২০৮ ॥
যে কেহ হউন তিনি আরাধ্য আমার ।
যুগল চরণ তাঁর বন্দি বার বার ॥ ২০৯ ॥
ডাক্তার নিঃস্বার্থপর কি হেতু এখানে ।
শুনিতে বাসনা যদি শুন এক মনে ॥ ২১০ ॥
দেখিতে পাইলা তেঁহ প্রভুর ইচ্ছায় ।
মোহনীয়া শক্তি এক শ্রীপ্রভুর গায় ॥ ২১১ ॥
যাহার প্রভাবে বহু কদাচারী জন ।
কুতূহলে করিতেছে সুপথে গমন ॥ ২১২ ॥
সেইহেতু স্বার্থহীন পর-উপকারে ।
আরোগ্য বিবিধোপায় যত্নসহকারে ॥ ২১৩ ॥
ক্রমে ক্রমে যাবতীয় পাবে সমাচার ।
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি সুধার পাথার ॥ ২১৪ ॥
ডাক্তারের সদাচার শ্রীপ্রভুর সদনে ।
চিকিৎসা করিবে তেঁহ কড়িপাতি বিনে ॥ ২১৫ ॥
ভক্তের মণ্ডলী মধ্যে রাষ্ট্র হইল কথা ।
ধন্য ধন্য সবে করে নুয়াইয়া মাথা ॥ ২১৬ ॥
পরদিনে বহু ভক্ত একত্র হেথায় ।
আগোটা গৃহেতে আর ঠাঁই না কুলায় ॥ ২১৭ ॥
প্রভুর সভায় আজি শোভা কি সুন্দর ।
ছদ্মবেশে পরমেশ রাজরাজেশ্বর ॥ ২১৮ ॥
ঐশ্বর্যাদি কান্তিভাব ভিতরে গোপনে ।
পূর্ণিমার কররাজি ঘন আবরণে ॥ ২১৯ ॥
সঙ্গে অন্তরঙ্গগুলি গড়া সেই ছাঁচে ।
কাদামাখা মণিমালা সাধ্য কার বাছে ॥ ২২০ ॥
আজিকার নবধারা অপূর্ব ধরন ।
ফিকে ফিকে লঘু বর্ণ ঘন-আবরণ ॥ ২২১ ॥
মনোহর কান্তি-কর ফুটে শ্রীবদনে ।
দীপ্তিমান মণিরাজি যাহার কিরণে ॥ ২২২ ॥
গোপনে মোহন মেলা নয়নানন্দকর ।
রঙ্গরসে লীলাতত্ত্বকথা পরস্পর ॥ ২২৩ ॥
ডাক্তার এমন কালে হইল হাজির ।
শ্রীবয়ানাকাশে পুনঃ উদিল তিমির ॥ ২২৪ ॥
ভক্তবর্গ নমস্কার কৈলা জনে জনে ।
বসিল ডাক্তার গিয়া প্রভুর আসনে ॥ ২২৫ ॥
পরীক্ষিয়া ব্যথা-স্থান ঔষধ-বিধান ।
অতি অল্পক্ষণ মধ্যে কৈলা সমাধান ॥ ২২৬ ॥
নেহারিয়া চারিদিক দেখেন ডাক্তার ।
আজি দিনে বহু ভক্ত পরিপূর্ণ ঘর ॥ ২২৭ ॥
সুবেশ সুন্দরমূর্তি যুবকের দল ।
ভক্তির ছটায় করে মুখ ঝলমল ॥ ২২৮ ॥
চমকিত আনন্দিত হৃদয়-নিলয় ।
গিরিশের সঙ্গে আজি শুভ পরিচয় ॥ ২২৯ ॥
ঈশ্বরীয় কথা পরে কথায় কথায় ।
বাদপ্রতিবাদে তিন ঘণ্টা কেটে যায় ॥ ২৩০ ॥
বাক্বিতণ্ডায় তেহ বুঝিল নিশ্চিত ।
সভাস্থ ভকতবর্গ পরম পণ্ডিত ॥ ২৩১ ॥
অত্যুচ্চ বর্ণের সব নহে মালা জেলে ।
অধিকাংশ ব্রাহ্মণ ও কায়স্থের ছেলে ॥ ২৩২ ॥
মিষ্টভাষী সদালাপী বিনীত-আচার ।
অঙ্গে শোভে নানাবিধ গুণ-অলঙ্কার ॥ ২৩৩ ॥
দেখিয়া শুনিয়া সভা আনন্দ-অন্তর ।
অধিক বাড়িল শ্রদ্ধা প্রভুর উপর ॥ ২৩৪ ॥
শিলা দেখি শৈলের বারতা কিছু পেয়ে ।
বিদায় লইয়া গেলা সে দিন চলিয়ে ॥ ২৩৫ ॥