পঞ্চম খণ্ড
সুরেন্দ্রের গৃহে অম্বিকাপূজা, প্রভুর অলক্ষ্যে আবির্ভাব এবং ডাক্তারের সঙ্গে বিবিধ তত্ত্বালাপ
বন্দ
রামকৃষ্ণরায় বিশ্বস্বামী যিনি ।
বন্দ মাতা শ্যামা-সুতা জগৎ-জননী ॥
গৃহস্থ সন্ন্যাসী ভক্ত বন্দ দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
আশ্বিনে অম্বিকাপুজা উৎসব প্রধান ।
বঙ্গবাসী জনে জনে সুখে ভাসমান ॥ ১ ॥
কিবা যুবা কি যুবতী বৃদ্ধ কিবা মাগী ।
ধনী কি নির্ধন কিবা শোকী তাপী রোগী ॥ ২ ॥
বিশেষতঃ কলিকাতা প্রধান নগরী ।
ধনরত্বে পরিপূর্ণ অট্টালিকা বাড়ি ॥ ৩ ॥
সর্ব অঙ্গে সুচিকন কিবা শোভা পায় ।
ঘরে ঘরে অম্বিকার প্রতিমা সাজায় ॥ ৪ ॥
চেনা নাহি যায় কেবা জড় কি চেতন ।
আগোটা প্রকৃতি দেবী সহাস্যবদন ॥ ৫ ॥
হেথা বিপরীত ধারা প্রভুর সংসারে ।
ম্রিয়মাণ ক্ষুণ্ণমন ভকতনিকরে ॥ ৬ ॥
জবাব দিয়াছে চিকিৎসকের নিচয় ।
প্রভুর অসাধ্য ব্যাধি আরোগ্যের নয় ॥ ৭ ॥
মায়া লয়ে লীলাখেলা মায়ার ভিতর ।
হাসি কান্না সুখ দুঃখ সঙ্গে নিরন্তর ॥ ৮ ॥
এইখানে এক কথা কর অবহিত ।
প্রভুর নিকটে ভক্ত নহে বিষাদিত ॥ ৯ ॥
হাজার পীড়িত তাঁরে নয়নে দেখিছে ।
তবু নাই কোন দুঃখ যতক্ষণ কাছে ॥ ১০ ॥
বরঞ্চ আনন্দে হৃদি পড়ে উথলিয়া ।
যে কোন অবস্থাপন্ন প্রভুরে দেখিয়া ॥ ১১ ॥
পরিহরি অগোচর আসিলে বাহিরে ।
দুঃখতাপ বিষণ্ণতা আক্রমণ করে ॥ ১২ ॥
কি হেতু এমন হয় হেতু শুন তার ।
শ্রীপ্রভু আনন্দময় কারণ ইহার ॥ ১৩ ॥
যেখানে শ্রীপ্রভুদেব আনন্দ সেখানে ।
কোথায় আঁধার রহে চাঁদ বিদ্যমানে ॥ ১৪ ॥
অহঙ্কার তাপ শোক সব রহে দূর ।
বিরাজিত যেইখানে লীলার ঠাকুর ॥ ১৫ ॥
প্রভুর লীলায় শত সহস্র প্রমাণ ।
তর্ক বুদ্ধি বিজ্ঞামদ তাঁর সন্নিধান ॥ ১৬ ॥
দূরীভূত একেবারে মুক্ত মহাফাদে ।
শেষে ধরি শ্রীচরণ প্রেমানন্দে কাঁদে ॥ ১৭ ॥
এইমত কত শত পণ্ডিত ধীমান ।
অপ্রভুর প্রসাদেতে পাইলেন ত্রাণ ॥ ১৮ ॥
হরষ বিষাদ দিয়া লীলার ঠাকুর ।
লীলা-অবসানকাল নাহি বেশী দূর ॥ ১৯ ॥
সম্মিলিত করিছেন অন্তরঙ্গগণে ।
ভবিষ্য প্রচারকার্যে লীলার প্রাঙ্গণে ॥ ২০ ॥
প্রভুকে পীড়িত দেখি পীড়িত সবাই ।
পীড়ায় প্রভুর কিন্তু কোন গ্রাহ্য নাই ॥ ২১ ॥
সদানন্দময় তাঁর পীড়া নাই মনে ।
সর্বদা খেলায় রত ভক্তদের সনে ॥ ২২ ॥
কখন কাহার বক্ষে হস্ত পরশিয়া ।
মুচকি হাসেন তায় ধ্যানস্থ করিয়া ॥ ২৩ ॥
কভু বিদেশস্থ যেবা বহু দূরান্তরে ।
এখানে থাকিয়া সেথা দেখা দেন তাঁরে ॥ ২৪ ॥
কভু দাঁড়াইয়া মধ্যে ভক্তদের কন ।
হরিবোল দিয়া নাচ করিয়া বেষ্টন ॥ ২৫ ॥
কভু গিয়া গৃহান্তরে ভকতের দলে ।
করিয়া দেখিয়া রঙ্গ প্রহরেক চলে ॥ ২৬ ॥
সুরেন্দ্রের ঘরে হেথা সপ্তমী পূজায় ।
শুন কি করিলা রঙ্গ প্রভুদেবরায় ॥ ২৭ ॥
প্রতিবর্ষ দুর্গোৎসবে সুরেন্দ্রের ঘরে ।
সভক্তে শ্রীপ্রভুদেবে নিমন্ত্রণ করে ॥ ২৮ ॥
ভক্তগণে সঙ্গে লয়ে ভক্তপ্রিয় রায় ।
যাইতেন তাঁর ঘরে অম্বিকা পূজায় ॥ ২৯ ॥
শয্যায় পীড়িত এবে প্রভু গুণমণি ।
নিরানন্দ ভক্তবৃন্দ আকুল পরানী ॥ ৩০ ॥
পূর্ব আনন্দের মেলা করিয়া স্মরণ ।
বীরভক্ত শ্রীপ্রভুর সুরেন্দ্র এখন ॥ ৩১ ॥
দাঁড়াইয়া প্রতিমার সম্মুখ প্রদেশে ।
দুনয়নে অশ্রুধার গণ্ড যায় ভেসে ॥ ৩২ ॥
এবে প্রায় ন্যূনাধিক ছয় দণ্ড রাতি ।
নিকেতনে চারিদিকে জ্বলিতেছে বাতি ॥ ৩৩ ॥
রাতি নাহি জানা যায় বাতির আলোকে ।
নিমন্ত্রণরক্ষাহেতু আসে যায় লোকে ॥ ৩৪ ॥
সুরেন্দ্র সমান ভাবে আছে দাঁড়াইয়া ।
প্রভুর মোহন মূর্তি মনে ধিয়াইয়া ॥ ৩৫ ॥
এমন সময় তেহ দেখিবারে পান ।
প্রতিমার মধ্যে প্রভু নিজে অধিষ্ঠান ॥ ৩৬ ॥
এখানেতে প্রভুদেব ভক্তদের কন ।
সুরেন্দ্রের বাড়ীতে যাইতে হৈল মন ॥ ৩৭ ॥
বাসনা-উদয় যেন অন্তর মাঝারে ।
দেখিতে পাইনু আমি তিলের ভিতরে ॥ ৩৮ ॥
জ্যোতির্ময় পথ এক অতি পরিসর ।
এখান হইতে যেথা সুরেন্দ্রের ঘর ॥ ৩৯ ॥
তার মধ্যে প্রবেশিয়া দেখিনু সেখানে ।
আবির্ভাব অম্বিকার পূজার দালানে ॥ ৪০ ॥
কি সুন্দর প্রতিমার ভাতি উঠে গায় ।
ক্ষীণপ্রভা দীপমালা তাহার প্রভায় ॥ ৪১ ॥
তোমরা সকলে যাও মিলে একত্তরে ।
প্রতিমার দরশনে সুরেন্দ্রের ঘরে ॥ ৪২ ॥
এইরূপ নানা খেলা ভক্ত-সহকারে ।
বিশেষিয়া বিবরণ নহে বলিবারে ॥ ৪৩ ॥
শ্রীবদন বিগলিত তত্ত্বসুধাপানে ।
ডাক্তার উন্মত্তবৎ রহে রেতে দিনে ॥ ৪৪ ॥
প্রতিদিন উপনীত প্রভুর সদন ।
শুনিবারে সুধামাখা প্রভুর বচন ॥ ৪৫ ॥
আগত রজনী আজি গত দিনমান ।
ঘর পরিপূর্ণ লোকে নাহি পায় স্থান ॥ ৪৬ ॥
ভক্তি-মুখ প্রভুদেব ভক্তি-আচরণ ।
ভক্তি-পথে জীব-শিক্ষা তাহার কারণ ॥ ৪৭ ॥
প্রভুর নিকটে নাই জাতির বিচার ।
যেখানে দেখেন ভক্তি সেই আপনার ॥ ৪৮ ॥
প্রাণ-তুল্য-প্রাণাধিক প্রাণাপেক্ষা প্রিয় ।
আত্মীয় হইতে তিনি পরম আত্মীয় ॥ ৪৯ ॥
ধর্মী কর্মী মহাদানী মুখুয্যে ঈশান ।
সম্মুখে দেখিয়া তাঁরে কন ভগবান ॥ ৫০ ॥
ঈশ্বরের পদাম্বুজে রাখিল ভকতি ।
যে জন সংসারাশ্রমে রহে স্থিরমতি ॥ ৫১ ॥
সেই জন সেই বীর বলিহারি তায় ।
কেমন সে জন পরে কন উপমায় ॥ ৫২ ॥
শিরে দু-মণের ভার-বোঝারী যেমন ।
পথিমধ্যে আড়ে আড়ে করে নিরীক্ষণ ॥ ৫৩ ॥
যায় বর সজ্জীভূত বিবাহের তরে ।
সমারোহে বাদ্যভাণ্ডঘটা সহকারে ॥ ৫৪ ॥
বিশেষ বীরত্ব শক্তি না থাকিলে গায় ।
কেহ না করিতে পারে দু-কূল বজায় ॥ ৫৫ ॥
এহেন সংসারী জনে অনাসক্ত রীত ।
পাঁকাল মাছের মত বুঝিবা নিশ্চিত ॥ ৫৬ ॥
অবিরত রহে মাছ পুকুরের পাঁকে ।
গায়ে নাহি লাগে পাঁক পরিষ্কার থাকে ॥ ৫৭ ॥
অনাসক্ত হইবার যাহার বাসনা ।
তাহাতে উপায় বিধি সাধন ভজনা ॥ ৫৮ ॥
সাধনার স্থান বিধি অতি নিরজনে ।
জন-মানবেতে যেন কেহ নাহি জানে ॥ ৫৯ ॥
নির্জনে আকুল প্রাণে করিবে প্রার্থনা ।
পাইলে ভকতি তবে পুরিবে কামনা ॥ ৬০ ॥
জ্ঞানভক্তি-লাভ, অগ্রে পশ্চাৎ সংসার ।
যাহাতে আটক রাখে বন্ধন মায়ার ॥ ৬১ ॥
যে জ্ঞানে জীবনমুক্ত আছিলা জনক ।
কঠোর সাধনা সেই জ্ঞানের জনক ॥ ৬২ ॥
সাধকে দুঃসাধ্য এবে কঠোর সাধনা ।
ক্ষীণ মন বিঘ্ন বাধা পথে দেয় হানা ॥ ৬৩ ॥
সেহেতু ভক্তির পথ সুপ্রশস্ততর ।
যে পথে সহজে লভ্য পরম ঈশ্বর ॥ ৬৪ ॥
বহু পূর্বেকার প্রশ্ন উঠিল আবার ।
ঈশ্বর সাকার কিবা তিনি নিরাকার ॥ ৬৫ ॥
প্রভুর উত্তর তিনি দুই অবস্থায় ।
বিষম সমস্যা ইহা বুঝা মহাদায় ॥ ৬৬ ॥
কাঁচা মনে এই তত্বে প্রবেশিতে নারে ।
যে করে
ঈশ্বর চিন্তা সে বুঝিতে পারে ॥ ৬৭ ॥
ধনবিদ্যাহেতু হৃদে অহঙ্কার যার ।
ঈশ্বরদর্শন তার নহে হইবার ॥ ৬৮ ॥
রাবণের রজোগুণ কুম্ভকর্ণ তমে ।
বিভীষণ সত্ত্বগুণী লিখিত পুরাণে ॥ ৬৯ ॥
এইবারে বলিলেন মহেন্দ্র ডাক্তার ।
ইন্দ্রিয়সংযম করা কঠিন ব্যাপার ॥ ৭০ ॥
তাহার উত্তরে কন বিশ্বগুরু রায় ।
যদি কেহ ঈশ্বরের কৃপাকণা পায় ॥ ৭১ ॥
কিংবা যদি পায় কেহ দরশন তাঁর ।
অথবা সাক্ষাৎকার যদ্যপি আত্মার ॥ ৭২ ॥
তখন এ ষড়রিপু মৃতের মতন ।
বিষহীন বীর্যহীন যেন ভুজঙ্গম ॥ ৭৩ ॥
বুদ্ধিহারা বৈজ্ঞানিক ডাক্তার এখানে ।
শ্রীপ্রভুদেবের ভক্তিতত্ত্বের বাখানে ॥ ৭৪ ॥
ডাক্তারের জ্ঞান অগ্রে ইন্দ্রিয়-সংযম ।
পশ্চাতে সাধনে হয় ঈশ্বর-দর্শন ॥ ৭৫ ॥
সেইহেতু বলিলেন প্রভু পরমেশে ।
ঈশ্বর কি লভ্য হন বিনা রিপুবশে ॥ ৭৬ ॥
তবে বুঝাইতে প্রভু বৈজ্ঞানিকে কন ।
তুমি যাহা করিতেছ স্বতন্ত্র রকম ॥ ৭৭ ॥
ইহাকে বিচার-পথ জ্ঞান-পথ বলে ।
জ্ঞানমার্গী যারা তারা এই মতে চলে ॥ ৭৮ ॥
তার কহে চিত্তশুদ্ধি অগ্রে দরকার ।
পশ্চাতে সাধনে হয় জ্ঞানের সঞ্চার ॥ ৭৯ ॥
এ দিকে সহজে পুনঃ সেই বস্তু মিলে ।
ভক্তি যদি হয় তাঁর চরণ-কমলে ॥ ৮০ ॥
ঈশ্বরের গুণগানে চিত্তে যদি রস ।
আপনি ইন্দ্রিয় মরে রিপু হয় বশ ॥ ৮১ ॥
যেমন বাছলে পোকা আলো-দরশনে ।
থাকিতে না পারে আর অন্ধকার স্থানে ॥ ৮২ ॥
ভক্ত তেন রিপুবর্গ ইন্দ্রিয় সহিত ।
ঝাঁপ দেয় রূপে তাঁর হইয়া মোহিত ॥ ৮৩ ॥
বৈজ্ঞানিক এইখানে কন আর বার ।
যদ্যপি পুড়িয়া মনে তাহাও স্বীকার ॥ ৮৪ ॥
বিধিমতে বুঝাইতে প্রভুর বচন ।
ভক্তে নাহি হয় দগ্ধ পোকার মতন ॥ ৮৫ ॥
যে আলোতে পোকা পড়ে দাহ্য গুণ ভায় ।
কাজেই পড়িলে পোকা জীবন হারায় ॥ ৮৬ ॥
ভক্তগণ যাহে পড়ে সে আলো মণির ।
আগুনের সঙ্গে ইহা ভিন্ন প্রকৃতির ॥ ৮৭ ॥
ঈশ্বরে মণির রূপ সমুজ্জ্বলতর ।
তখালীহ সুশীতল সুখশান্তিকর ॥ ৮৮ ॥
জ্ঞানমার্গাশ্রয়ে কিংবা বিচারের বলে ।
সত্য ঈশ্বরের লাভ দরশন মিলে ॥ ৮৯ ॥
কিন্তু এই কলিকালে সে পথাতিক্রম ।
দুর্বল জীবের পক্ষে বড়ই বিষম ॥ ৯০ ॥
মন নহি বুদ্ধি নহি নহি দেহখানি ।
ইন্দ্রিয় রিপুর নহি বশীভূত আমি ॥ ৯১ ॥
রোগ শোক সুখ দুঃখ অতীত সবার ।
আমি সে সচ্চিদানন্দ সকলের পার ॥ ৯২ ॥
বড়ই সহজে বলা মুখের কথায় ।
ধারণা বড়ই শক্ত করা মহাদায় ॥ ৯৩ ॥
কাঁটায় কাটিছে হাত রক্তধারা বয় ।
অথচ বলিছে মুখে কৈ কিছু নয় ॥ ৯৪ ॥
মরে তবু মুখে বলে বেশ আছি হেথা ।
সাজে কি যদ্যপি কেহ কহে হেন কথা ॥ ৯৫ ॥
অনেকে করেন মনে বিনা অধ্যয়ন ।
জ্ঞান কিংবা বিদ্যা নাহি হয় উপার্জন ॥ ৯৬ ॥
কিন্তু অধ্যয়নাপেক্ষা শুনা শ্রেয়স্কর ।
দর্শন শ্রবণাপেক্ষা হয় শ্রেষ্ঠতর ॥ ৯৭ ॥
সংসারী মলিন-বুদ্ধি আসক্ত বিষয়ে ।
ত্যাগীরা নির্মল-আঁখি সংসারীর চেয়ে ॥ ৯৮ ॥
চক্ষুষ্মান বুদ্ধিমান বহু পরিমাণে ।
একমাত্র নিরাসক্ত শকতির গুণে ॥ ৯৯ ॥
সংসারী সংসারে খেলে উন্মত্তের প্রায় ।
আপনার ঠিক চাল দেখিতে না পায় ॥ ১০০ ॥
ত্যাগীজন মুক্ত-আঁখি বাহিরে থাকিয়ে ।
সুন্দর দেখিতে পায় সংসারীর চেয়ে ॥ ১০১ ॥
সতরঞ্চ দাবাবোড়ে খেলায় যেমন ।
সে খেলে না তত ভাল খেলুড়ে যে জন ॥ ১০২ ॥
সুন্দর তাহার চাল বুঝ বিধিমতে ।
যে বলে উপর-চাল থাকিয়া তফাতে ॥ ১০৩ ॥
নীতিগর্ভ তত্ত্বসার চিত্ত-আকর্ষণী ।
অমৃত-পুরিত যত শ্রীমুখের বাণী ॥ ১০৪ ॥
গুনিয়া
ডাক্তার এবে বিমোহিত প্রাণে ।
কহিলেন সন্তাষিয়া সমাসীনগণে ॥ ১০৫ ॥
পুস্তকাধ্যয়ন-বিদ্যা হইলে প্রভুর ।
হইত না অধিকার জ্ঞান এত দূর ॥ ১০৬ ॥
ডাক্তারে পুনশ্চ তবে প্রভুদেব কন ।
পঞ্চবটমূলে যবে সাধন-ভজন ॥ ১০৭ ॥
নিপতিত মৃত্তিকায় বলিতাম মাকে ।
এই তিন বস্তু মাগো দেখাও আমাকে ॥ ১০৮ ॥
কর্মবলে কর্মী যাহা কৈল উপার্জন ।
যোগবলে যোগীর যতেক দরশন ॥ ১০৯ ॥
জ্ঞানপথে জ্ঞানমার্গী করিয়া বিচার ।
অবগত হইলেন যাহা তত্ত্বসার ॥ ১১০ ॥
কতই দেখিনু আমি মায়ের কৃপায় ।
ঘুমে পাড়াইলে ঘুম ঘুম যায় যায় ॥ ১১১ ॥
এত বলি অবস্থার আভাষ সহিত ।
বীণা-বিনিন্দিত কণ্ঠে ধরিলেন গীত ॥ ১১২ ॥
"ঘুম ভেঙ্গেছে আর কি ঘুমাই
যোগে যাগে
জেগে আছি ।
এখন যোগনিদ্রা তোরে পেয়ে মা
ঘুমেরে
ঘুম পাড়ায়েছি ।"
গীত সমাপনে কন শ্রীপ্রভু আমার ।
অধ্যয়ন নাই করি খালি নাম মার ॥ ১১৩ ॥
দানী শম্ভু আমাকে বলিয়াছিল তাই ।
শান্তিরাম সিংহ ঢাল তরবারি নাই ॥ ১১৪ ॥
ঈশানে কহেন প্রভু লীলার ঈশ্বর ।
অবতার অস্বীকার করেন ডাক্তার ॥ ১১৫ ॥
প্রভুর আজ্ঞানুসারে কহেন ঈশান ।
ডাক্তারে করিয়া লক্ষ্য অবতারাখ্যান ॥ ১১৬ ॥
আমাদের হৃদয়ে বিশ্বাস বড় কম ।
অহঙ্কার একমাত্র তাহার কারণ ॥ ১১৭ ॥
কাকভূষণ্ডীর কথা অতি চমৎকার ।
সেইকালে সূর্যবংশে রাম অবতার ॥ ১১৮ ॥
পূর্ণব্রহ্ম সেই রাম কৌশল্যা নন্দনে ।
স্বীকার করে না কাক প্রথমে প্রথমে ॥ ১১৯ ॥
পরে যবে নানালোক করিয়া ভ্রবণ ।
সর্ব ঠাঁই সেই রাম কৈল দরশন ॥ ১২০ ॥
তখন চৈতন্যোদয় চূর্ণ অহঙ্কার ।
বুঝিতে পারিল রামে রাম অবতার ॥ ১২১ ॥
দেখিতে কেবলমাত্র নর-কলেবর ।
কিন্তু গোটা সৃষ্টি তাঁর উদর-ভিতর ॥ ১২২ ॥
ডাক্তারের প্রতি প্রভু এইখানে কন ।
স্বরাট-বিরাটরূপে সেই এক জন ॥ ১২৩ ॥
নিত্য যাঁর লীলা তাঁর একের খেলায় ।
বিষম সমস্যা ইহা বুঝা মহাদায় ॥ ১২৪ ॥
সৃষ্টির ঈশ্বর মায়াধীশ ভগবান ।
সকল সম্ভবে তাঁয় সর্বশক্তিমান ॥ ১২৫ ॥
ক্ষুদ্র-বুদ্ধি মোরা সবে বলিতে কি পারি ।
আসিতে নারেন হরি নররূপ ধরি ॥ ১২৬ ॥
ঈশ্বরের কার্যাবলী বুদ্ধ্যাদির পার ।
ধারণা না হয় শিরে নহে বুঝিবার ॥ ১২৭ ॥
সেহেতু ঈশ্বরলাভে উপায় সম্বল ।
সাধু মহাত্মার বাক্যে বিশ্বাস কেবল ॥ ১২৮ ॥
সরলতা বিনা তাঁরে বিশ্বাস না হয় ।
বিষয়-বুদ্ধিতে বহু সন্দেহ উদয় ॥ ১২৯ ॥
সাধুসঙ্গ সর্বদাই অতি প্রয়োজন ।
বৈদ্যের প্রকৃতি ধরে সাধু মহাজন ॥ ১৩০ ॥
ভবরোগ-বিনাশনে জানে মহৌষধি ।
সমারোগ্য করিবারে বিষয়ীর ব্যাধি ॥ ১৩১ ॥
মহেন্দ্র মাস্টার নামে প্রভুভক্ত যিনি ।
যতখানি জমি তাঁর বুদ্ধি ততখানি ॥ ১৩২ ॥
আট চাল ভাবিয়া চালেন এক চাল ।
মানুষে সহজে তাঁর না পায় নাগাল ॥ ১৩৩ ॥
জন্ম গুঁয়াইলে কাছে নাহি যায় চেনা ।
লীলা-দরশনে শক্তিযুক্ত এক জনা ॥ ১৩৪ ॥
বিজ্ঞতম বৈজ্ঞানিকে মাস্টার হেথায় ।
নিরখিয়া বিমোহিত প্রভুর কথায় ॥ ১৩৫ ॥
তাই মৃদুস্বরে তাঁরে কহেন তখন ।
এখানে প্রহরাতীত হইল এখন ॥ ১৩৬ ॥
আরো বহু আছে রোগী আপনার হাতে ।
কখন যাবেন তবে তা সবে দেখিতে ॥ ১৩৭ ॥
আনন্দে মগন মন ডাক্তার কহিল ।
পাইয়া পরমহংস সব মাটি হ'ল ॥ ১৩৮ ॥
হাসিতে লাগিল সবে শুনিয়া বচন ।
সুমধুর লীলা-গীতি শুন তুমি মন ॥ ১৩৯ ॥
তদুত্তরে ডাক্তারের প্রতি কন রায় ।
আছে এক নদী কর্মনাশা বলে তায় ॥ ১৪০ ॥
তার জলে ডুব দিলে যাবতীয় কর্ম ।
সকল বিনষ্ট হয় হেন তার ধর্ম ॥ ১৪১ ॥
প্রভুর বচন যেন সুধার আচার ।
শুনি ভক্তগণে তবে কহেন ডাক্তার ॥ ১৪২ ॥
অন্তরে অতুলানন্দ নাহি যার টের ।
মোরে ভাবিও না পর আমি তোমাদের ॥ ১৪৩ ॥
পরিশেষে বৈজ্ঞানিকে কন পরমেশ ।
অমৃত তোমার ছেলে ছেলেটিও বেশ ॥ ১৪৪ ॥
অবতারবাদে কিন্তু বিপরীত কয় ।
তাহে কোন ক্ষতি কিংবা হানি নাহি হয় ॥ ১৪৫ ॥
সাকার কি নিরাকারে যার যাহে মন ।
বিশ্বাস শরণাগত এই প্রয়োজন ॥ ১৪৬ ॥
পুত্রের খিয়াতি শুনি ডাক্তার কহিলা ।
অমৃত আমার পুত্র তোমারি তো চেলা ॥ ১৪৭ ॥
তদুত্তরে বলিলেন জগৎ-গোসাঁই ।
জগতে আমার চেলা কোন শালা নাই ॥ ১৪৮ ॥
আমি চেলা সকলের তলে সবাকার ।
সকলে তাঁহার দাস আমিও তাঁহার ॥ ১৪৯ ॥
সবে ঈশ্বরের ছেলে মুই একজন ।
গুরু মাত্র ভগবান অন্য কেহ নন ॥ ১৫০ ॥
অভিমানশূন্য প্রভু জীবের শিক্ষায় ।
শুন মহালীলা গাই মায়ের আজ্ঞায় ॥ ১৫১ ॥
তাহার সঙ্গেতে ভক্তদের আশীর্বাদ ।
প্রত্যেকের পদ-রেণু পরম প্রসাদ ॥ ১৫২ ॥