পঞ্চম খণ্ড
পাষণ্ডীর প্রতি প্রভুর করুণা
দরশনে শ্রীপ্রভুর,
নির্মল
চিত-মুকুর,
বিকশিত হৃদয়কমল ।
জীবত্বে দেবত্ব উঠে, লোচন-আঁধার ছুটে,
কঠিন পাষাণে করে জল ॥ ১ ॥
শুষ্ক কাঠ মঞ্জরিত,
মুকুল পল্লবযুত,
সহ ফুল্ল কুসুমনিচয় ।
কথা নয় কাল্পনিক, চক্ষে দেখা বাস্তবিক,
শুন কহি তার পরিচয় ॥ ২ ॥
শহরেতে একজন, প্রভুদ্বেষী আজীবন,
পুরজন পাষণ্ডী প্রধান ।
স্বতঃ রীতি স্বতন্তর, নরাকৃতি
বিষধর,
বাক্য যেন বিষ মাখা বাণ ॥ ৩ ॥
বুঝিতে নারিনু মন, সে মন কেমন মন,
রসনা-চালনে যার সাধ ।
প্রভু অকলঙ্ক শশী, গুণযুত রাশি রাশি,
তাহার করিতে নিন্দাবাদ ॥ ৪ ॥
একে তো সুন্দর কায়, মাধুর্য লাবণ্য তায়,
হেরিলে হরষে প্রাণমন ।
বাকি যাহা রহে ঘরে, তাও যায় ক্রমে পরে,
মিঠা বাণী করিলে শ্রবণ ॥ ৫ ॥
বালকের ভাব গায়, মরি কিবা শোভা পায়,
রত্ন মণি মরকত জিনি ।
স্বতঃ সরলাতিশয়,
সতত আনন্দময়,
ভাবে ভোর দিবস রজনী ॥ ৬ ॥
তাহে বিনয়াবনত, কোমল
প্রকৃতিযুত,
যারে তারে অগ্রে নমস্কার ।
জীবের কল্যাণ লাগি, স্বার্থশূন্য সর্বত্যাগী,
নেত্রে ধারা ঝরে অনিবার ॥ ৭ ॥
জন্মাবধি আজীবন, তত্ত্বালাপে
মত্ত মন,
সাধনভজন তার সনে ।
আনাসক্ত যোল-আনা, কামিনী-কাঞ্চনে ঘৃণা,
দেহ ধরা জীবের কল্যাণে ॥ ৮ ॥
শিবসিদ্ধিময় নাম, ধর্ম অর্থ মোক্ষ কাম,
উচ্চারণে পরিণাম ফল ।
ত্রিতাপ-সন্তাপ হরে, ভব-জলধির নীরে,
পারাপারে দুর্বলের বল ॥ ৯ ॥
নিবিড় সংসারারণ্যে, পথভ্রান্তদের জন্মে,
স্বার্থশূন্যে সম্বল সহায় ।
অজ্ঞান-তিমির-হর, যিনি তেজে দিনকর,
চক্ষুহীন জনের উপায় ॥ ১০ ॥
নামে যদি এত বল, নিন্দুকের কিবা ফল,
সেও তো লইল রসনায় ।
শুন মন তদুত্তরে, সেও যাবে ভবপারে,
করুণ নামের মহিমায় ॥ ১১ ॥
আগুনে অজ্ঞানে হাত, যদি পড়ে আচম্বিত,
সেও পোড়াতে নাহি ছাড়ে ।
আগুনের ধর্ম ধারা, পরশিলে দগ্ধ করা,
ভালমন্দ না যায় বিচারে ॥ ১২ ॥
বহ্নি না বিচারে যায়, যারে পায় তারে খায়,
তাই তার নাম সর্বভুক ।
সেইমত এইখানে,
প্রভুর নামে গুণে,
পরিত্রাণ পাইবে নিন্দুক ॥ ১৩ ॥
ফুলে ফুল-কীট যেন, নিন্দুক লীলায় তেন,
অবতারে লক্ষ অনুক্ষণ ।
নিন্দার বন্দনা গায়, যাহে তেঁহ সুখ পায়,
শ্রীপ্রভুর সৃজন যেমন ॥ ১৪ ॥
সম-দরশন রায়, স্তুতি-নিন্দা
সম তাঁয়,
সৃষ্টীশ্বর কল্যাণনিদানে ।
নিন্দুকের কথা শুন, নিন্দা করে পুনঃপুনঃ,
অকলঙ্কী প্রভু ভগবানে ॥ ১৫ ॥
সময়ানুক্রমে তার, প্রিয়
পুত্র সুকুমার,
শয্যাগত হইল পীড়ায় ।
কবিরাজ ডাক্তারাদি, আনাইয়া নিরবধি,
প্রাণাধিক নন্দনে দেখায় ॥ ১৬ ॥
নাহি হয় উপশম, পীড়া ক্রমে করে ক্রম,
দিনে দিনে দেহ জেরবার ।
ব্যাধির জ্বলন গায়, গড়াগড়ি বিছানায়,
যাতনায় করয়ে চীৎকার ॥ ১৭ ॥
প্রাণের নাহিক আশ, পরিবারবর্গে ত্রাস,
অনিবার ভাসে আঁখিনীরে ।
হাহাকার গোটা বাড়ি, আদতে নাচড়ে হাঁড়ি,
মগ্ন সবে অকূল পাথারে ॥ ১৮ ॥
নিন্দুকের আশা মনে, মহেন্দ্রডাক্তার আনে,
নন্দনের চিকিৎসা কারণ ।
এখন ডাক্তার হেথা, প্রভুর সুতায় গাঁথা,
ব্যবসায় মোটে নাই মন ॥ ১৯ ॥
অন্য রোগী দেখিবার, প্রয়াস না হয় আর,
কত লোক যায় ফিরে ফিরে ।
যদি কেহ দেখা পায়, দুনো দাম দিতে চায়,
তথাপিহ স্বীকার না করে ॥ ২০ ॥
শ্রীপ্রভুর চিকিৎসায়, দিবসযামিনী যায়,
এখানে আসিলে মাতামাতি ।
রাত্রিকালে নিকেতনে, চিন্তা করে মন প্রাণে,
শ্রীপ্রভুর পীড়ার প্রকৃতি ॥ ২১ ॥
কখনো বা মগ্ন মন, ব্যাধিশাস্ত্র অধ্যয়ন,
উপায়-বিধান-অন্বেষণে ।
পাঁচশ টাকার বহি, ক্রয়ে কৈল জলসহি,
একমাত্র প্রভুর কারণে ॥ ২২ ॥
নিন্দুক কাতর স্বরে, ডাক্তারে কাকুতি করে,
যাইবারে তাহার ভবনে ।
ডাক্তার না শুনি তায়, চড়ি গাড়ি উভরায়,
উপনীত প্রভুর সদনে ॥ ২৩ ॥
নিন্দুকের প্রাণফাটে, গাড়ির পশ্চাতে ছুটে,
উর্ধ্ব শ্বাসে আকুল পরাণ ।
অবশেষে উপনীত, ভক্তবর্গে সুবেষ্টিত,
বিরাজেন যেথা ভগবান ॥ ২৪ ॥
লজ্জা ভয় মনে হেথা, সাধ্য নাই কয় কথা,
একধারে দাঁড়াইয়া রয় ।
শ্রীপ্রভুর ব্যথার ব্যথী, সম্পদ-বিপদ-সাথী,
হৃদয়-নিবাস দয়াময় ॥ ২৫ ॥
অন্তরে পাইয়া টের, হৃদি-ব্যথা নিন্দুকের,
জিজ্ঞাসা করিলা বিবরণ ।
কাকুতি কাতর স্বরে, নিবেদিল শ্রীগোচরে,
মৃত্যতুল্য শয্যায় নন্দন ॥ ২৬ ॥
নিন্দুকের কথা শুনি, আকুল প্রভুর প্রাণী,
ধারা জিনি ঝরে দু'নয়ন ।
কহেন সজল চোখে, আমি এত বয়োধিকে,
গলদেশে সামান্য বেদন ॥ ২৭ ॥
যাতনা অনুপমেয়, সে যে শিশু অল্পবয়ঃ,
নাহি জানি কত কষ্ট পায় ।
এত বলি ডাক্তারেরে, বলিলেন যাইবারে,
পীড়িত শিশুর চিকিৎসায় ॥ ২৮ ॥
প্রভুর দেখিয়া দয়া, নিন্দুকের শক্ত হিয়া,
দ্রবিয়া তখন হৈল হুঁশ ।
ভাবে আরে নিন্দা কার, করিয়াছি বারবার,
এ যে মহা প্রেমিক পুরুষ ॥ ২৯ ॥
স্তুতি করে মনে মনে, বারি ধারা দু'নয়নে,
ধিক্কার সহিত আপনারে ।
প্রার্থনা তাহার সনে, সরল আকুল প্রাণে,
অপরাধ ক্ষমিবার তরে ॥ ৩০ ॥
চক্ষে দেখা অবিকল, পাষাণে করিল জল,
নিরমল হৃদয়-মুকুর ।
চির অন্ধকারালয়, পলকে আলোকময়,
মহতী মহিমা শ্রীপ্রভুর ॥ ৩১ ॥
রামকৃষ্ণ-লীলা-গীতি, কীর্তনে বাসনা অতি,
বলিতে নারিনু কিন্তু সে কি ।
শতদল কণিকার, সাধ্য নাই বর্ণিবার,
অবাক্ হইয়া বসে দেখি ॥ ৩২ ॥
কিসে কব লীলা আর, বাকশক্তি রসনার,
নয়ন হরিল একেবারে ।
রূপেতে নয়ন টেনে, বিমোহিত করি প্রাণে,
ডুবাইল অকূল পাথারে ॥ ৩৩ ॥