পঞ্চম খণ্ড
ডাক্তারকে ভাবের বাজার প্রদর্শন ও শ্রীপ্রভুর কালীপূজা
বন্দ
মন বিশ্বগুরু রামকৃষ্ণরায় ।
প্রেমানন্দে বন্দ গুরুদারা জগন্মায় ॥
অবনী লুটায়ে বন্দ ভক্ত দোঁহাকার ।
যাঁদের হৃদয়মধ্যে যুগল বিহার ॥
বড়ই সুমিষ্ট রামকৃষ্ণ-লীলা-গীত ।
ইন্দ্রিয়াদি সহ মন শুনিলে মোহিত ॥ ১ ॥
বিমল পবিত্র চিত চৈতন্য-সঞ্চার ।
লীলা-দরশন যদি ভাগ্যে ঘটে কার ॥ ২ ॥
কেমন ঠাকুর কিবা সহচরগণ ।
অপরূপ প্রকৃতির বিচিত্র ধরন ॥ ৩ ॥
সহজেই বুঝা যায় দেখিলে চরিত ।
সর্ব-অংশে মানুষের ঠিক বিপরীত ॥ ৪ ॥
অনায়াসে প্রণিধানে হইবে সক্ষম ।
একমনে মহালীলা করিলে শ্রবণ ॥ ৫ ॥
বিজয় গোস্বামী যিনি ব্রাহ্মদের দলে ।
জনম গৌরাঙ্গভক্ত অদ্বৈতের কুলে ॥ ৬ ॥
মিলন প্রভুর সঙ্গে বহুকালাবধি ।
এখন নাহিক আর নিরাকারবাদী ॥ ৭ ॥
কেশবের মত এবে পিরীতি সাকারে ।
কালী-কৃষ্ণ-রাম নামে দু'নয়ন ঝরে ॥ ৮ ॥
কোথায় বিজয় ছিল এখন কোথায় ।
একমাত্র বিশ্বগুরু প্রভুর কৃপায় ॥ ৯ ॥
কার কোন্ পথ কিসে কাহার আরাম ।
সব জ্ঞাত প্রভু তাই বিশ্বগুরু নাম ॥ ১০ ॥
প্রভুর মতন নেতা ঈশ্বরের পথে ।
জানি নাই শুনি নাই কোথা কে জগতে ॥ ১১ ॥
ব্রাহ্মধর্ম-প্রচারক বিজয় এখন ।
নানা দেশ নানা তীর্থ করিয়া ভ্রমণ ॥ ১২ ॥
উপনীত এবে তেঁহ শহর ভিতরে ।
আজি হেথা শ্রীপ্রভুর দরশন তরে ॥ ১৩ ॥
প্রভুর সাজান ঘর অপূর্ব ভাণ্ডার ।
অমূল্য মাণিক এক এক ভক্ত তাঁর ॥ ১৪ ॥
জ্বলিতেছে সারি সারি বিজলিয়া ঠাঁই ।
তার মধ্যে জগচ্চন্দ্র জগৎ-গোসাঁই ॥ ১৫ ॥
বিজয়ে বেজায় কৃপা প্রভুর আমার ।
সেহেতু ঈশ্বর-পথে উচ্চাবস্থা তাঁর ॥ ১৬ ॥
প্রভুর শ্রীপদমূলে বিজয় আসিয়া ।
চরণবন্দনা কৈল ভূমিষ্ঠ হইয়া ॥ ১৭ ॥
বিজয়ে দেখিয়া চিত্তে হয়ে মহাপ্রীতি ।
সম্ভাষিয়ে বলিলেন অন্যান্যের প্রতি ॥ ১৮ ॥
সুন্দর-অবস্থাগত বিজয় এখন ।
দেখিলে সহজে যায় বুঝা বিলক্ষণ ॥ ১৯ ॥
ঘাড় ও কপাল দৃষ্টে বেশ যায় জানা ।
অবস্থা পরমহংসের হইয়াছে কিনা ॥ ২০ ॥
পরে প্রভু বলিলেন ঈশ্বরের ঘর ।
বিজয়ের হইয়াছে নয়নগোচর ॥ ২১ ॥
কাশ্মীরাধিপতির যেমন নিকেতন ।
পর্বতান্তরালে দূরে হয় দরশন ॥ ২২ ॥
শ্রীমহিম চক্রবর্তী কহিলা বিজয়ে ।
আসিলেন নানাবিধ তীর্থ পর্যটিয়ে ॥ ২৩ ॥
কোথায় কি দরশন হৈল আপনার ।
শুনিব বলুন যাবতীয় সমাচার ॥ ২৪ ॥
মহিমে উত্তর দিলা বিজয় গোসাঁই ।
এখানে প্রভুতে যাহা দেখিবারে পাই ॥ ২৫ ॥
পরিপূর্ণ পূর্ণভাবে যোল-আনা ধারা ।
এমন কোথাও নাই মিছামিছি ঘোরা ॥ ২৬ ॥
মহিমও বারেক গি'ছিল পর্যটনে ।
ফিরিয়া ঘুরিয়া পুনঃ হাজির এখানে ॥ ২৭ ॥
করজোড়ে প্রভুদেবে শ্রীবিজয় কন ।
বুঝেছি না দিলে ধরা ধরে কোন্ জন ॥ ২৮ ॥
একদিন নিরজনে ঢাকায় যখন ।
আপনারে সশরীরে কৈনু দরশন ॥ ২৯ ॥
এত বলি চক্ষে বারি প্রেমে গদ হয়ে ।
অভয়-চরণ-মূলে পড়িলা লুটিয়ে ॥ ৩০ ॥
নিরখিয়া তাহা প্রভু হইয়া কেমন ।
বিজয়ের বক্ষে দিলা দক্ষিণ চরণ ॥ ৩১ ॥
এখন ঈশ্বরাবেশে বাহ আর নাই ।
পুত্তলিকাবৎ জড় জগৎ-গোসাঁই ॥ ৩২ ॥
মরি কি মোহন মূর্তি এখন প্রভুর ।
শ্রীমুখমণ্ডলে যেন ঝলসে চিকুর ॥ ৩৩ ॥
প্রেমের ঠাকুর প্রেমে ঢলা গলা কায় ।
উপমায় দেখাইতে কি আছে ধরায় ॥ ৩৪ ॥
ভক্তগণ উপস্থিত ছিল যাঁরা ঘরে ।
কেহ কাঁদে কেহ কেহ স্তবস্তুতি করে ॥ ৩৫ ॥
যাহার যেমন ভাব সে দেখে তেমন ।
কেহ বা পরম ভক্ত কেহ সাধু জন ॥ ৩৬ ॥
কেহ কেহ বুদ্ধিহারা হয়ে একেবারে ।
যা দেখে তা দেখে কিছু বুঝিতে না পারে ॥ ৩৭ ॥
কেহ বা দেখিতে পায় মুক্ত আঁখি যাঁর ।
সাক্ষাতে শ্রীদেহধারী ঈশ্বরাবতার ॥ ৩৮ ॥
মহিম সজল-আঁখি কহে উচ্চৈঃস্বরে ।
দেখ কি প্রেমের ছবি অবনী-ভিতরে ॥ ৩৯ ॥
অনুমান হয় তাঁর শুনিয়া বচন ।
যেন তেঁহ করিছেন বিচিত্র দর্শন ॥ ৪০ ॥
ভবনে কি ভাব হৈল কহা নাহি যায় ।
একে একে নানা জনে নানা গীত গায় ॥ ৪১ ॥
যে যেমন দেখে তাঁর গীতে ছবি তার ।
তিলেকে হইল যাহা নহে বর্ণিবার ॥ ৪২ ॥
শুন তুই এক গীত কহি এইখানে ।
জ্ঞান-ভক্তি মিলে লীলা-শ্রবণ-কীর্তনে ॥ ৪৩ ॥
গীত
চিদানন্দ-সিন্ধুনীরে
প্রেমানন্দ-লহরী ।
মহাভাব রাসলীলা কি মাধুরী মরি মরি,
বিবিধ বিলাস রঙ্গ-প্রসঙ্গ কত অভিনব ভাবতরঙ্গ,
উঠিছে পড়িছে করিতে রঙ্গ নবীন
রূপ ধরি ।
মহাযোগে সমুদায় একাকার হইল,
দেশ-কাল-ব্যবধান ভেদাভেদ ঘুচিল ।
আশা পুরিল রে আমার সকল সাধ মিটে গেল,
এখন আনন্দে মাতিয়া দুবাহু তুলিয়া
বলরে মন হরি হরি ।
টুটল ভরম ভীতি,
ধরম করম নীতি,
দূর ভেল
জাতি-কুলমান ।
কাঁহা হায় কাঁহা হরি,
প্রাণমন
চুরি করি,
বঁধুয়া
করিলা পয়ান ।
ভাবেতে হওল ভোর,
অবহি
হৃদয়মোয়,
নাহি যাত আপনা পসান ।
প্রেমদাস কহে হাসি,
শুন সাধু
জগবাসী,
অ্যায়সা-হী নূতন বিধান ॥
ধরিয়া বৈকুণ্ঠমেলা ভবের ভিতরে ।
প্রকৃতিস্থ প্রভুদেব বহুক্ষণ পরে ॥ ৪৪ ॥
শ্রীপ্রভু কহেন পেয়ে বাহ্যিক গিয়ান ।
শাস্ত্র বেদ তন্ত্রাদির পার ব্রহ্মজ্ঞান ॥ ৪৫ ॥
যতক্ষণ একখানা হাতে থাকে বই ।
হইলেও জ্ঞানী তাঁরে রাজ-ঋষি কই ॥ ৪৬ ॥
আমার গিয়ানে বলি ব্রহ্মর্ষি তাঁহাকে ।
অঙ্গেতে যাঁহার কোন চিহ্ন নাই থাকে ॥ ৪৭ ॥
এই উপমায় প্রভু করিলা বিচার ।
ব্রহ্মজ্ঞান বেদ তন্ত্র শাস্ত্রাদির পার ॥ ৪৮ ॥
পরে অবতারবাদ কন ধীরে ধীরে ।
ঈশ্বরের আবির্ভাব মানব-আধারে ॥ ৪৯ ॥
নরদেহে না আসিলে পরম-ঈশ্বর ।
কেমনে পাইবে জীবে তাঁহার খবর ॥ ৫০ ॥
বাসনা অপূর্ণ রহে অবতার বিনে ।
সেহেতু আসেন তিনি শরীরধারণে ॥ ৫১ ॥
এত বলি উপমায় দেন বুঝাইয়া ।
অবতার প্রয়োজন কিসের লাগিয়া ॥ ৫২ ॥
নিরাকার সাকার সম্বন্ধে বারবার ।
এত যে কহিলা প্রভু হেতু শুন তার ॥ ৫৩ ॥
হালের উন্নতিশীল নব্য সভ্যগণে ।
সাকারের প্রতিবাদী সাকার না মানে ॥ ৫৪ ॥
ইংরাজী শিক্ষার গুণে প্রায় এই ফল ।
তদুপরি ব্রাহ্মধর্ম দেশেতে প্রবল ॥ ৫৫ ॥
তন্ত্রগীতাপুরাণাদি গেছে রসাতলে ।
ইংরাজি বিজ্ঞানশাস্ত্র তাদের বদলে ॥ ৫৬ ॥
এহেন মার্জিতবুদ্ধি উদ্ধারের তরে ।
শ্রীপ্রভুর আবির্ভাব লীলার আসরে ॥ ৫৭ ॥
পাণ্ডিত্যের অভিমান চূর্ণ কৈলা ভেজে ।
নিরক্ষর দীন-দুঃখী দুর্বলের সাজে ॥ ৫৮ ॥
নয়নরঞ্জন মুর্তি মহেন্দ্র ডাক্তার ।
প্রফুল্লিত চিত্তে দেখা দিল এইবার ॥ ৫৯ ॥
আসন গ্রহণ করি প্রভুদেবে কন ।
অবিরত হয় চিন্তা তোমার কারণ ॥ ৬০ ॥
গত রেতে রাত্রি যবে তৃতীয় প্রহর ।
ঘুম নাই এই চিন্তা খালি নিরন্তর ॥ ৬১ ॥
দেখ মন শ্রীপ্রভুর কেমন কৌশল ।
চিন্তাই ধিয়ান মাত্র পরম মঙ্গল ॥ ৬২ ॥
সাকারের প্রতিবাদী ডাক্তার এখানে ।
আকার-ধিয়ান-কথা শুনিবে না কানে ॥ ৬৩ ॥
শ্রীঅঙ্গে বিয়াধি ধরি মঙ্গলনিদান ।
কৌশলে করান তাঁরে তাঁহার ধিয়ান ॥ ৬৪ ॥
স্মরণ-মনন ধ্যান লীলার প্রসঙ্গ ।
কীর্তন-শ্রবণ-আদি সাধনার অঙ্গ ॥ ৬৫ ॥
এই সব কর্মে হয় পথে আওয়ান ।
তাহাই ডাক্তারে প্রভু কৌশলে করান ॥ ৬৬ ॥
জান্তে কি অজান্তে এই কর্ম আচরণ ।
সমভাবে এক ফল প্রভুর বচন ॥ ৬৭ ॥
ডাক্তার হৃদয়বান দয়া স্বতঃ ঘটে ।
প্রভুর কৃপায়
এবে ভক্তি গেছে জুটে ॥ ৬৮ ॥
ঈশ্বরীয় তত্ত্বালাপ-শ্রবণ কীর্তনে ।
প্রভুর সভায় তাঁর
ভক্তদের সনে ॥ ৬৯ ॥
এখন বড়ই মুগ্ধ মজিয়াছে মন ।
ডাক্তার ডাক্তার নাই পূর্বের মতন ॥ ৭০ ॥
বৈজ্ঞানিক গম্ভীরাত্মা প্রশস্ত আধার ।
সহজে না মিলে টের মনোভাব তাঁর ॥ ৭১ ॥
প্রমাণে প্রত্যক্ষ বস্তু যতক্ষণ নয় ।
ডাক্তার কখন তাহা করে না প্রত্যয় ॥ ৭২ ॥
প্রত্যয় যা হয় তাও চেপে রাখে তেজে ।
জানিতে না দেন ভাব অপরে সহজে ॥ ৭৩ ॥
এখানেতে বিশ্বগুরু সর্বশক্তিধর ।
পরম কৌশলী চক্রী লীলার ঈশ্বর ॥ ৭৪ ॥
এড়ান নাহিক তার ধরেন যাহাকে ।
বিষম ভীষণ কুঁদে বাঁক নাহি থাকে ॥ ৭৫ ॥
অবতারে লীলাখেলা অতীব রঙ্গের ।
যে বুঝে সে বুঝে যে না বুঝে তার ফের ॥ ৭৬ ॥
পুরাণ বেদান্ত বেদ তন্ত্রের নিকর ।
সাধন-ভজন সব লীলার ভিতর ॥ ৭৭ ॥
লীলা-দরশনে হয় সব দরশন ।
লীলাদৃষ্টি শক্তি যাঁর বিমল নয়ন ॥ ৭৮ ॥
লীলারূপে ভগবান লীলার ভিতর ।
লীলা-দরশনে মিলে সকল খবর ॥ ৭৯ ॥
যত মত যত পথ যত ভবে আছে ।
যাবতীয় যায় দেখা লগ্ন লীলা-গাছে ॥ ৮০ ॥
লীলায় ঈশ্বরে নাই তিল ভিন্ন ভেদ ।
স্বভাবে উভয় এক নাহি অবিচ্ছেদ ॥ ৮১ ॥
কথায় না বুঝা যায় যদিও সরল ।
বোধ উপলব্ধি বস্তু-প্রত্যক্ষে কেবল ॥ ৮২ ॥
শ্রবণ-কীর্তনে লীলা ক্রমে দেখা যায় ।
যদ্যপি করেন কৃপা প্রভুদেবরায় ॥ ৮৩ ॥
পাইবে বিমল আঁখি বুঝিবে নিশ্চিত ।
ভক্তিভরে শুনে চল মহালীলাগীত ॥ ৮৪ ॥
বিজ্ঞানশাস্ত্রের পাঠে বুঝেন ডাক্তার ।
সমাধি কি মহাভাব মাথার বিকার ॥ ৮৫ ॥
এই ভ্রম-বিনাশনে কি করিলা রায় ।
শুন সুমধুর লীলা অকিঞ্চন গায় ॥ ৮৬ ॥
সঙ্গীত শ্রবণপ্রিয় ডাক্তার এখন ।
বিণা-বিনিন্দিত-কণ্ঠ শ্রীনরেন্দ্রে কন ॥ ৮৭ ॥
কখন শুনাবে গীত গাও এইবারে ।
শুনিতে তোমার গান ইচ্ছা বড় করে ॥ ৮৮ ॥
বিশাল নয়নে ভাতিযুক্ত ভক্তবর ।
পরম সুঠাম মূতি সর্বাঙ্গ সুন্দর ॥ ৮৯ ॥
শ্রীপ্রভুর প্রাণাধিক নরেন্দ্র তখন ।
কাছে ছিল তানপুরা করিলা ধারণ ॥ ৯০ ॥
করে ধরা তানপুরা দৃশ্য মনোহর ।
পরম সন্ন্যাসী যেন বাল মহেশ্বর ॥ ৯১ ॥
তেজঃপুজকলেবর ভাব উদাসীন ।
ঈশ্বরের পাদপদ্মে প্রাণমন লীন ॥ ৯২ ॥
ঝঙ্কারিলা চারি তার একতানে তেজে ।
মৃদঙ্গ তাহার সঙ্গে ঘন ঘন বাজে ॥ ৯৩ ॥
উঠিলা বিচিত্র ধারা ভবনে এখন ।
স্তব্ধীভূত একত্রিত দর্শকের গণ ॥ ৯৪ ॥
উদিল বিচিত্র ভাব চিত্তে সবাকার ।
প্রাণ-মন-ইন্দ্রিয়াদি সবে একাকার ॥ ৯৫ ॥
সংসার সবার ভুল কিছুই নাই মনে ।
খালি লুব্ধ শ্রুতিযুদ্ধ সঙ্গীত-শ্রবণে ॥ ৯৬ ॥
গীত-আরম্ভের পূর্বে সকলে মোহিত ।
পশ্চাতে মধুর কণ্ঠে ধরিলেন গীত ॥ ৯৭ ॥
গীত
সুন্দর
তোমার নাম দীনশরণ হে,
বরিষে অদ্ভুতবারা, জুড়ায় শ্রবণ হে ।
এক তব নামখন অদ্ভুত-ভবন হে,
অমর হয় সেই জন যে করে কীর্তন হে ।
গভীর বিষাদরাশি নিমিষে বিনাশে,
যখান তব নাম সুখা শ্রবণে পরশে ।
হৃদয় মধুময় তব নামগানে,
হয় যে হৃদয়নাথ চিদানন্দঘন হে ।
সঙ্গীত শুনার আগে যার যাহা ছিল ।
এখন শুনিয়া গীত তাও তার গেল ॥ ৯৮ ॥
শ্রোতাদের ভাব দেখি নরেন্দ্র আবার ।
ধরিলেন অল্প গীত সুধার আধার ॥ ৯৯ ॥
গীত
আমায়
দেমা পাগল ক'রে
আর কাজ নাই জ্ঞান বিচারে ।
তোমায় ও প্রেমের সুরা, পানে
কর নাতোয়ারা
ও মা ভক্তচিত্তহরা, ডুবাও প্রেমসাগরে ।
তোমার এ পাগলা-গারদে,
কেহ হাসে কেহ কাঁদে
কেহ নাচে আনন্দের ভবে
ঈশা মুশা শ্রীচৈতন্য তাঁরা প্রেমের ঘোরে অচৈতন্য
কবে আমি হব মা ধন্য মিশে তার ভিতরে ॥
গীতের ভিতরে প্রভু কি করিলা কল ।
গুনিয়া উন্মত্ত সবে যেমন পাগল ॥ ১০০ ॥
পাণ্ডিত্যাভিমানী যিনি পাণ্ডিত্যাহংকার ।
একদিকে তিয়াগিয়ে করেন চীৎকার ॥ ১০১ ॥
দিগাদিগজ্ঞানশূন্য আকুল হইয়া ।
"বিচারে কি কাজ দে মা পাগল করিয়া" ॥ ১০২ ॥
বিজয় দণ্ডায়মান সকলের আগে ।
প্রভুর কৃপায় প্রাপ্ত ভাবের আবেগে ॥ ১০৩ ॥
পরে প্রভু দাঁড়াইলা ভাবের গোসাঁই ।
কঠিন বিয়াধি অঙ্গে কিছু মনে নাই ॥ ১০৪ ॥
আপনে আপন ভাবে মহা নিমগন ।
ডাক্তারেরা হুঁশ নাই প্রভুর যেমন ॥ ১০৫ ॥
এদিকে দক্ষিণ কক্ষে বুকে হাত দিয়া ।
ভাবে সমাধিস্থ লাটু আছে দাঁড়াইয়া ॥ ১০৬ ॥
তার পাশে মণিগুপ্ত বালক বয়েস ।
গৌরবর্ণ লম্বা লম্বা সুচিকন কেশ ॥ ১০৭ ॥
হাতে ধরা জপমালা বামে হেলা শির ।
পুত্তলিকা মত অঙ্গ ভাব সুগভীর ॥ ১০৮ ॥
ডাক্তারের সন্নিকটে পুরব অঞ্চলে ।
ভক্ত ছোট-নরেন্দ্র গিয়াছে বাহ্য ভুলে ॥ ১০৯ ॥
মুদিত নয়ন স্থটি জড়বৎ অঙ্গ ।
ক্ষণেকের মধ্যে প্রভু কি করিলা রঙ্গ ॥ ১১০ ॥
বিজ্ঞতম বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত প্রধান ।
ভাবের বাজারে আর কূল নাহি পান ॥ ১১১ ॥
দেখেন অবাক হয়ে ভাবগ্রস্ত জনে ।
কাহারো নাহিক বাহ্য সবে স্পন্দহীনে ॥ ১১২ ॥
ভাব-উপশমে কারো কান্না কারো হাসা ।
লাটুর না ছুটে ভাব-সমাধির নেশা ॥ ১১৩ ॥
তখন শ্রীপ্রভুদেব ভাবের সাগর ।
বসাইয়া দিলা তাঁর স্কন্ধে দিয়া ভর ॥ ১১৪ ॥
ভূমিতলে উপবিষ্ট শ্রীলাট্টু যখন ।
প্রভু করিলেন তাঁর স্কন্ধে আরোহণ ॥ ১১৫ ॥
দলিতে লাগিলা বক্ষঃ বামপদভরে ।
লাটুর আইল বাহ্যচেঁঠা কিছু পরে ॥ ১১৬ ॥
রঙ্গ-সমাপনে পরে রঙ্গের ঈশ্বর ।
বসিলেন আপনার শয্যার উপর ॥ ১১৭ ॥
ডাক্তারের প্রতি তবে প্রভুদেব কন ।
কেমন সমাধিভাব দেখিলে এখন ॥ ১১৮ ॥
অপরের চক্ষে নয় স্বচক্ষে দেখিলে ।
তোমার বিজ্ঞানশাস্ত্রে ইহাকে কি বলে ॥ ১১৯ ॥
সায়েন্সেতে সমাধিকে কিবা নামে কয় ।
ঢং কি যথার্থই ইহা প্রতীতি কি হয় ॥ ১২০ ॥
ডাক্তার উত্তরে কন প্রভু ভগবানে ।
অনেকের হতেছে ঢং বলিব কেমনে ॥ ১২১ ॥
চূর্ণ আজি ডাক্তারের পাণ্ডিত্যাহংকার ।
যথার্থ সমাধিভাব করিল স্বীকার ॥ ১২২ ॥
ডাক্তারের সঙ্গে রঙ্গ হইল বিস্তর ।
দিন দিন অভিনব তত্ত্বের সমর ॥ ১২৩ ॥
মহাভাগ্যবান তেঁহ জন্ম ধরাতলে ।
তাঁহার চরণরেণু মহাভাগ্যে মিলে ॥ ১২৪ ॥
যেমন ডাক্তার তাঁর তেমতি নন্দন ।
অমৃত তাঁহার নাম প্রিয়দরশন ॥ ১২৫ ॥
প্রভুর অপার কৃপা অমৃতের প্রতি ।
কৃপার সম্বন্ধে আছে অপূর্ব ভারতী ॥ ১২৬ ॥
শ্রীগোচরে ভক্ত মেলা রহে রেতেদিনে ।
ভক্তিমতী পুরনারী প্রভু-দরশনে ॥ ১২৭ ॥
আসিতে না পায় তাই রহে ক্ষুণ্ণমনা ।
এক দিন উপনীত এক বারাঙ্গনা ॥ ১২৮ ॥
গিরিশের রঙ্গমঞ্চে অভিনেত্রী যত ।
সকলেই প্রভুদেবে ভকতি করিত ॥ ১২৯ ॥
তাহাদের মধ্যে যেবা বিনোদিনী নামে ।
বিশেষ তাহার ভক্তি প্রভুর চরণে ॥ ১৩০ ॥
কি হবে হইলে বেশ্যা ভক্তি আছে যার ।
যে হোক সে হোক তেঁহ নমস্য আমার ॥ ১৩১ ॥
প্রভুর কঠিন পীড়া লোকমুখে শুনি ।
অন্তরে দুঃখিতা বড় বেশ্যা বিনোদিনী ॥ ১৩২ ॥
পরমা
যুবতী তেঁহ রূপবতী তায় ।
শ্রীপ্রভুর দরশনে আসিতে না পায় ॥ ১৩৩ ॥
প্রবল বাসনা সাধ হৃদয়-মাঝারে ।
তিলেকের জন্য তাঁয় দরশন করে ॥ ১৩৪ ॥
নিরুপায়ে উপায় ভাবিয়া কৈলা মনে ।
ধরিয়া পুরুষ-বেশ যাব দরশনে ॥ ১৩৫ ॥
এক দিন সন্ধ্যার অব্যবহিত পরে ।
চারি পাঁচ দণ্ড রাতি ইহার ভিতরে ॥ ১৩৬ ॥
যুবকের পরিচ্ছদে হাজির হেথায় ।
বিরাজে যেখানে বাঞ্ছাকল্পতরু রায় ॥ ১৩৭ ॥
অনেকের সঙ্গে দেখা পথের মাঝারে ।
কেহই চিনিতে নাহি পারিল তাহারে ॥ ১৩৮ ॥
কিন্তু শ্রীগোচরে যেই মুহূর্তেকে আসা ।
চিনিয়া শ্রীপ্রভু তারে করিলা জিজ্ঞাসা ॥ ১৩৯ ॥
কি রে তুই হেথা হেন বেশে কি কারণ ।
উত্তরে কহিল প্রভু মাত্র দরশন ॥ ১৪০ ॥
বিশেষ আশিস কৃপা করিয়া তাহায় ।
অনতিবিলম্বে দিলা তখনি বিদায় ॥ ১৪১ ॥
রঙ্গমঞ্চে বীরভক্ত রাখিয়া গিরিশে ।
বেশ্যার উদ্ধার এত স্তম্ভিতে না আসে ॥ ১৪২ ॥
তার সঙ্গে অভিনেতা লম্পটের দল ।
পরশিল শ্রীপ্রভুর চরণ-কমল ॥ ১৪৩ ॥
স্বভাব ছাড়িতে নারে গাঁজা মদ খায় ।
গুরুর মতন কিন্তু ভক্তি করে রায় ॥ ১৪৪ ॥
অদ্যাবধি সেই ধারা দিনে দিনে বাড়ে ।
প্রভুর মূরতি রাখে মঞ্চের ভিতরে ॥ ১৪৫ ॥
বিশেষতঃ সাজঘরে সাজে যেইখানে ।
সাজঘর অতিশয় গোপনীয় স্থানে ॥ ১৪৬ ॥
রঙ্গদিনে পরিপাটি ফুলের মালায় ।
শ্রীপ্রভুর প্রতিমূর্তি সুন্দর সাজায় ॥ ১৪৭ ॥
যতবার রঙ্গস্থানে করে আগমন ।
বাহির না হয় বিনা চরণবন্দন ॥ ১৪৮ ॥
শুনি এবে অভিনেত্রী অনেকের ঘরে ।
প্রভুর মূরতি আছে পূজা সেবা করে ॥ ১৪৯ ॥
গিরিশে রাখিয়া মঞ্চে প্রভুর মহিমা ।
বেশ্যা লম্পটের মধ্যে ভক্তির সূচনা ॥ ১৫০ ॥
শ্রীগিরিশে গুরুতুল্য সকলেই মানে ।
রঙ্গমঞ্চমধ্যে যেবা যে আছে যেখানে ॥ ১৫১ ॥
বারে বারে গিরিশ বলিল শ্রীচরণে ।
কত দিন রব বেশ্যা-লম্পটের সনে ॥ ১৫২ ॥
ভগবান রাখ মোরে সেবায় এবারে ।
না হয় অধিক দিন বৎসরের তরে ॥ ১৫৩ ॥
উত্তরে কহিলা তাঁরে অখিলের রাজ ।
থাক তুমি রঙ্গালয়ে বহু হবে কাজ ॥ ১৫৪ ॥
বেশ্যা কি লম্পট প্রভুপদে ভক্তি যার ।
তে সবায় করি কোটি কোটি নমস্কার ॥ ১৫৫ ॥
বিষয়ীরে ঘৃণা নাই তিলেকের তরে ।
দরশন দিলা প্রভু গিয়া ঘরে ঘরে ॥ ১৫৬ ॥
করুণাবতার প্রভু সকলে করুণা ।
বিষয়ী লম্পট বেশ্যা কারে নাই ঘৃণা ॥ ১৫৭ ॥
সরল অন্তরে যেবা চায় ভগবানে ।
সেই সেই আসিয়া জুটে প্রভুর সদনে ॥ ১৫৮ ॥
শুন এক শ্রীপ্রভুর মহিমা বাখান ।
এক দিন তৃতীয় প্রহর দিনমান ॥ ১৫৯ ॥
আসিয়া জুটিল এক ত্যাগী যোগিবর ।
শ্যামল বরন চক্ষু ডাগর ডাগর ॥ ১৬০ ॥
কোট পেণ্টুলন পরা টুপি আছে শিরে ।
চাপ দাড়ি হাতে ছড়ি সুহাসি অধরে ॥ ১৬১ ॥
ভিতরে কৌপীন তাঁর বাসে আচ্ছাদন ।
বাহ্যিক দেখিতে এক বাবুর মতন ॥ ১৬২ ॥
স্বভাবে চরিতে কিন্তু যোগীর আচার ।
উপাধিতে মিশ্র তিনি প্রভু নাম তাঁর ॥ ১৬৩ ॥
পিতামহ খ্রীষ্টিয়ান জন্ম সেই কুলে ।
মূলে কিন্তু কনোজিয়া ব্রাহ্মণের ছেলে ॥ ১৬৪ ॥
মিশ্রের আচারে এক অপরূপ রীত ।
না হিন্দু না খ্রীষ্টিয়ান অপূর্ব চরিত ॥ ১৬৫ ॥
জীবে দয়া জিতেন্দ্রিয় নাহি হিংসা দ্বেষ ।
মারিলে চাপড় গালে হেসে করে শেষ ॥ ১৬৬ ॥
জান্তব আহার নাই হিংসা হয় জীবে ।
প্রাণিমাত্রে পীড়া দিতে মৃত্যুতুল্য ভাবে ॥ ১৬৭ ॥
যদ্যপি অপরে তাঁরে খেতে দেয় বিষ ।
রাজায় কি ভগবানে করে না নালিশ ॥ ১৬৮ ॥
জাতির বিচার নাই যার তার খায় ।
পরমা সুন্দরী দ্বারা নিরাশক্ত তায় ॥ ১৬৯ ॥
যাহা না হইলে নয় তাহার কারণ ।
দিলে কেহ টাকাকড়ি করেন গ্রহণ ॥ ১৭০ ॥
অধিক পাইলে পরে কিনিয়া ঔষধি ।
সযতনে দুঃখীদের দূর করে ব্যাধি ॥ ১৭১ ॥
সাধন-ভজন-প্রিয় যোগপরায়ণ ।
ভালবাসে গিরিগুহা বিজন কানন ॥ ১৭২ ॥
ঈশ্বরের জ্যোতির্ময় মূর্তি দরশনে ।
এই আশে যোগাশ্রয় উদ্দেশ্য জীবনে ॥ ১৭৩ ॥
একবার গিরিগুহে ধিয়ানে মগন্ ।
দেখিতে পাইল কিবা শুন বিবরণ ॥ ১৭৪ ॥
অপরূপ কলনাদী তটিনীর কূলে ।
সুন্দর বাগান এক পরিপূর্ণ ফুলে ॥ ১৭৫ ॥
তার পাশে সমাধিস্থ সুন্দর চেহারা ।
জ্যোতির্ময় মূর্তি নয় পঞ্চভূতে গড়া ॥ ১৭৫ ॥
হৃদয়-অঙ্কিত ছবি সদা জাগে মনে ।
আর না দেখিতে পায় বসিলে ধিয়ানে ॥ ১৭৬ ॥
সময়ানুক্রমে একে আসিয়া শহরে ।
শুনিল প্রভুর নাম লোক পরস্পরে ॥ ১৭৭ ॥
দরশন-পিয়াসে আজি হাজির হেথায় ।
এখানে করিলা কিবা শুন প্রভুরায় ॥ ১৭৮ ॥
আগন্তুক অগোচরে আসিবার আগে ।
প্রভু বলিলেন আমি যাব মলত্যাগে ॥ ১৭৯ ॥
এত বলি প্রবেশিলা পাইখানা ঘর ।
ভাবে দেখিলেন এক আসে যোগিবর ॥ ১৮০ ॥
মহাবীর বলবান বলিষ্ঠ আকার ।
কোমরেতে বাঁধা আছে পাঁচ হেতিয়ার ॥ ১৮১ ॥
আগাগোড়া হৈল জ্ঞাত যত বিবরণ ।
নব অভ্যাগত কেবা অনুরাগী জন ॥ ১৮২ ॥
দ্বিতলে এখানে যেথা প্রভুর আসন ।
উপনীত হয়ে মিশ্র দিল দরশন ॥ ১৮৩ ॥
ভক্তগণ দিলা তাঁরে বসিবারে ঠাঁই ।
ফিরিলেন হেনকালে জগত-গোসাঁই ॥ ১৮৪ ॥
যোগিবরে প্রভুরায় করি নিরীক্ষণ ।
দাঁড়াইয়া সমাধিতে হইলা মগন ॥ ১৮৫ ॥
অনিমষ-আঁখি মিশ্র দেখিবারে পায় ।
ধ্যানে দেখা সেই স্মৃতি এই প্রভুরায় ॥ ১৮৫ ॥
আরে অবিশ্বাসী মন কি কব তোমাকে ।
চিরকাল মগ্ন তুমি সন্দেহের পাঁকে ॥ ১৮৬ ॥
না হয় বিশ্বাস তোর মোর কিবা ক্ষতি ।
মুই জানি প্রভু মোর অখিলের পতি ॥ ১৮৭ ॥
ত্রাতা পাতা নেতা পথে হৃদয়বিহারী ।
সংসার-জলধি-জলে পারের কাণ্ডারী ॥ ১৮৮ ॥
রতন মাণিক মম প্রাণ বুদ্ধি বল ।
সম্পদ-বিপদ-সখা সহায় সম্বল ॥ ১৮৯ ॥
ঐশ্বর্য দেখিয়া তত্ত্ব করিতে নির্ণয় ।
তোর মত সন্দ যেন মোর নাই হয় ॥ ১৯০ ॥
হউন শ্রীপ্রভুদেব পূজারী-ব্রাহ্মণ ।
পরগৃহে বাস কিংবা পরান্নে পালন ॥ ১৯১ ॥
না হয় হউন তিনি নিরক্ষর-বেশ ।
অরূপ অগুণ কিংবা উন্মত্ত অশেষ ॥ ১৯২ ॥
না হয় হউন পঞ্চভূতদেহধারী ।
দীনহীন দুঃখাতুর অতি কদাচারী ॥ ১৯৩ ॥
ভূষণবসনহীন বালকের ন্যায় ।
জীর্ণ শীর্ণ কলেবর বেদনা গলায় ॥ ১৯৪ ॥
যত কিছু থাক তাঁয় না করি বিচার ।
ভজিব পূজিব প্রভু ঠাকুর আমার ॥ ১৯৫ ॥
চাহ তুমি বেশ ভূষা ঐশ্বর্য দর্শন ।
অঙ্গে কান্তি নবপূর্বাদলের বরন ॥ ১৯৬ ॥
রতন
কুণ্ডল কানে লম্ববান বেণী ।
বিজড়িত মুকুটেতে নানা রত্নমণি ॥ ১৯৭ ॥
পদে পদে অশ্ব গজ রথ ধাবমান ।
পৃষ্ঠদেশে তৃণ হাতে ধরা ধনুর্বাণ ॥ ১৯৯ ॥
কনক-বরনা বামে সীতাঠাকুরানী ।
হরধনুভঙ্গলব্ধ জনক-নন্দিনী ॥ ২০০ ॥
আরে মন নিরৈশ্বর্য্য দেখে পেলি ধোঁকা ।
সেই রাম এই রামকৃষ্ণরূপে ঢাকা ॥ ২০১ ॥
চাহ তুমি দেখিবারে শিরে শিখিপাখা ।
শোভিত সুন্দর ভালে অলকা তিলকা ॥ ২০২ ॥
দুলু দুলু গজমতি অতুল নাসায় ।
চন্দ্রিমা-কিরণ-জিনি কৌস্তুভ গলায় ॥ ২০৩ ॥
নয়ন দুখানি বাঁকা আকর্ণ পূরিত ।
নীল কলেবরখানি চন্দনে চর্চিত ॥ ২০৪ ॥
মনোহর পীতবাস জড়িত তড়িতে ।
ভুবনমোহন বেণু ঠামে ধরা হাতে ॥ ২০৫ ॥
শ্রীরাধার প্রেমে বাঁকা ত্রিভঙ্গিম ঠাম ।
জগমনবিরঞ্জন নটবর শ্যাম ॥ ২০৬ ॥
ছলে গলে বনমালা আপাদলম্বিত ।
পীতধড়া গুঞ্জবেড়া অঙ্গে সুশোভিত ॥ ২০৭ ॥
কনক নূপুর পায় রুনু ঝুনু রব ।
রকতকমল জিনি চরণ-সৌষ্ঠব ॥ ২০৮ ॥
পায়ে পায়ে প্রস্ফুটিত কমল-আবলী ।
মকরন্দগন্ধে ছুটে ঝাঁকে ঝাঁকে অলি ॥ ২০৯ ॥
আরে মন নিরৈশ্বর্য দেখে পেলি ধোঁকা ।
সেই কৃষ্ণ এই রামকৃষ্ণরূপে ঢাকা ॥ ২১০ ॥
সেই রাম সেই কৃষ্ণ রামকৃষ্ণ-সাজে ।
লীলান্তরে রূপান্তর আপনার কাজে ॥ ২১১ ॥
রূপান্তর মাত্র কিন্তু গুণান্তর নয় ।
রামকৃষ্ণ মহালীলা তার পরিচয় ॥ ২১২ ॥
যখন যেরূপ সজ্জা হয় দরকার ।
সেরূপে যে সাজে আবির্ভাব অবতার ॥ ২১৩ ॥
সমভাবে সেই শক্তি বিরাজিত কার্যে ।
ঐশ্বর্যবানেতে যেন তেন নিরৈশ্বর্যে ॥ ২১৪ ॥
এবারে স্বরূপ কিবা প্রভুর আমার ।
আরো কিছু পরে তুমি পাবে সমাচার ॥ ২১৫ ॥
দৃষ্টি-শক্তিহীন তোর বল অবিশ্বাস ।
কামিনী-কাঞ্চন-মুগ্ধ অবিদ্যার দাস ॥ ২১৬ ॥
কুঞ্চিত মলিন বুদ্ধি হেয় পথে মতি ।
ভাল ছেড়ে মন্দ ধরা স্বভাব প্রকৃতি ॥ ২১৭ ॥
না শুনিব তোর কথা স্থিরমতি রব ।
প্রভু রামকৃষ্ণ মুই ভজিব পূজিব ॥ ২১৮ ॥
এখানেতে প্রভুদেব মিশ্রে তুষ্ট হয়ে ।
বেদানার ফল দিলা প্রসাদ করিয়ে ॥ ২১৯ ॥
ভক্তবর্গে কিছু কিছু করিয়া বণ্টন ।
প্রসাদ পাইলা মিশ্র আনন্দিত মন ॥ ২২০ ॥
প্রভুর পীড়ায় হেথা যত যায় দিন ।
ততই শ্রীঅঙ্গখানি ক্রমে হয় ক্ষীণ ॥ ২২১ ॥
রীতিমত পরিচর্যা কিছু নাহি ত্রুটি ।
ঔষধসেবন কালে পথ্য পরিপাটি ॥ ২২২ ॥
বয়োধিক যোগ্য যাঁরা নেন সমাচার ।
ত্রুটি কিসে কিংবা করে কিবা দরকার ॥ ২২৩ ॥
একদিন কন প্রভু গোপনে গোপনে ।
অপর কাহাকে নয় খালিমাত্র রামে ॥ ২২৪ ॥
উচ্ছিষ্ট স্থানেতে হয় ভোজনের ঠাঁই ।
সেহেতু ভোজন পক্ষে কষ্ট বড় পাই ॥ ২২৫ ॥
সেবায় শুনিয়া ত্রুটি রাম ক্রোধান্বিত ।
বাহিরে চলিলা তার করিতে বিহিত ॥ ২২৬ ॥
অপরাধী জনে করে অতি তিরস্কার ।
বারেক রাগিলে রাম রক্ষা নাই আর ॥ ২২৭ ॥
ভবিষ্যতে হেন ত্রুটি যাহাতে না হয় ।
উপায়-বিধানে তবে বুঝিল নিশ্চয় ॥ ২২৮ ॥
গুরুদারা জগন্মাতা তাঁহে আনিবারে ।
এখন আছেন তিনি দক্ষিণশহরে ॥ ২২৯ ॥
তত্ত্বাবধারণে তথ্য আছে রামলাল ।
আর এক গৃহী ভক্ত মুরুব্বী গোপাল ॥ ২৩০ ॥
মনোগত ভাব রাম প্রভুদেবে কয় ।
প্রভুর সম্মতি তাহে আদতে না হয় ॥ ২৩১ ॥
বুঝাইতে প্রভুদেব কন ভক্ত রামে ।
হংস হংসী এক ঠাঁই কবে লোকজনে ॥ ২৩২ ॥
প্রবোধ না মানে রাম তবু জেদ করে ।
অনুমতি হেতু হেথা মায়ে আনিবারে ॥ ২৩৩ ॥
ভক্তের নিকটে তাঁর কথা থাকে কোথা ।
অগত্যা সম্মতি মায়ে আনাইলা হেথা ॥ ২৩৪ ॥
মাতার নাহিক ঘুম অশন শয়ন ।
দিবারাত্র শ্রীপ্রভুর সেবা-আয়োজন ॥ ২৩৫ ॥
অলস নাহিক তাঁর দিবা কি যামিনী ।
সহায়তা হেতু কাছে গোলাপ ব্রাহ্মণী ॥ ২৩৬ ॥
ভক্ত-মা যাঁহার নাম ভক্তিমতী মেয়ে ।
সর্বস্বত্যাগিনী যিনি প্রভুর লাগিয়ে ॥ ২৩৭ ॥
বড় আশ্চর্যের কথা একমাত্র বাড়ি ।
উপরে দ্বিতলে মাত্র পাঁচটি কুঠুরী ॥ ২৩৮ ॥
তার মধ্যে একখানি অতি অল্প স্থান ।
বৈঠক হইতে দরমায় ব্যবধান ॥ ২৩৯ ॥
সেবা
আয়োজনে তথা আছেন জননী ।
পাক-ক্রিয়া নিজে হাতে করেন আপনি ॥ ২৪০ ॥
দরমার অন্তরালে প্রভুদেবরায় ।
জনসমাগম এত নহে গণনায় ॥ ২৪১ ॥
অবিরত নহে ক্ষান্ত আসে দরশনে ।
আছে মাতা হেথা বার্তা কেহ নাহি জানে ॥ ২৪২ ॥
বার্তা পাওয়া থাক দূরে অদ্ভুত ঘটন ।
দরমা ওপারে নাই বসতি-লক্ষণ ॥ ২৪৩ ॥
বিন্দু-নিবাসিনী মাতা শুনা ছিলা কানে ।
কৃপায় তাঁহার এবে দেখিনু নয়নে ॥ ২৪৪ ॥
চিকিৎসকে দেয় যেন সেবার বিধান ।
সেই মত কালে কালে হয় সরঞ্জাম ॥ ২৪৫ ॥
বিক্রম করিতে কিন্তু নাহি ছাড়ে ব্যাধি ।
পরাভব হৈল সব পথ্যাদি ঔষধি ॥ ২৪৬ ॥
ঔষধে আরোগ্য করা দেখিয়া বিফল ।
ভক্তগণে অন্বেষণ করে দৈববল ॥ ২৪৭ ॥
কভু সংযমেতে থাকে দিনের বেলায় ।
মঙ্গলের হেতু ধ্যানে রজনী কাটায় ॥ ২৪৮ ॥
একদিন প্রভুদেব কহে সকলেতে ।
আপুনি তো কথা কন মা-কালীর সাথে ॥ ২৪৯ ॥
আপনারে জিজ্ঞাসিতে হইবে তাঁহারে ।
অন্নাদি ভোজন যাহে প্রবেশে উদরে ॥ ২৫০ ॥
তদুত্তরে কহিলেন সর্বেশ্বর রায় ।
আঁট নাহি হবে মোটে আমার কথায় ॥ ২৫১ ॥
তথাপিহ মহা জেদ করে ভক্তগণে ।
শ্রীপ্রভুর প্রতিবাদ না শুনিব কানে ॥ ২৫২ ॥
কিছুক্ষণ পরে তবে বলিলেন রায় ।
আমি বলিলাম মাকে তোদের কথায় ॥ ২৫৩ ॥
উত্তরে মা-কালী তবে কহিলা আমাকে ।
আমার ভোজন হয় লক্ষ লক্ষ মুখে ॥ ২৫৪ ॥
এক মুখে যদি আমি না করি ভোজন ।
তাহে কিবা আছে ক্ষতি জেদ কি কারণ ॥ ২৫৫ ॥
উত্তর শুনিয়া হেন সরমে পড়িনু ।
আর তাঁরে কোন কথা বলিতে নারিনু ॥ ২৫৬ ॥
ভক্তবর্গে দেখিলেই বিষণ্ণ আতুর ।
মায়ায় ভুলায়ে দেন লীলার ঠাকুর ॥ ২৫৭ ॥
করেন আপন মনে কর্ম পরমেশ ।
এবে প্রায় কার্তিকের আধা আধি শেষ ॥ ২৫৮ ॥
কেবা কালী কেবা প্রভু না পারি বুঝিতে ।
কালীতে কেবল তিনি মা-কালী তাঁহাতে ॥ ২৫৯ ॥
পরিচয়ে লীলাকথা শুন এক মনে ।
সংসার-জলধিপার শ্রবণকীর্তনে ॥ ২৬০ ॥
কালীপূজা কাছে কাছে আসিয়াছে প্রায় ।
ডাকাইয়া মাস্টারেরে কহিলেন রায় ॥ ২৬১ ॥
অমাবস্যা-যোগে কালীপূজা প্রয়োজন ।
যুক্তিযুক্ত লয় মনে কর আয়োজন ॥ ২৬২ ॥
মাস্টার মহেন্দ্রনাথ পরম উল্লাসে ।
সেই কথা বলিলেন কালীপদ ঘোষে ॥ ২৬৩ ॥
তত্ত্ববধায়ক কালী এখানে বাসায় ।
প্রয়োজন যাহা হয় অনিয়া যোগায় ॥ ২৬৪ ॥
প্রভুদেব আখ্যা তাঁর দিলা ম্যানেজার ।
নরেন্দ্র দিলেন পরে দানা নাম তাঁর ॥ ২৬৫ ॥
জনে জনে আখ্যা দিলা নরেন্দ্র এখানে ।
সৌভাগ্য বিদিত হৈনু শাঁকচুন্নী নামে ॥ ২৬৬ ॥
আনন্দেতে কালীপদ আটখানা হয়ে ।
পূজার জোগাড় করে দিন পানে চেয়ে ॥ ২৬৭ ॥
যথা নির্ধারিত দিনে সন্ধ্যার বেলায় ।
আলোকিত কৈলা বাড়ি দীপের মালায় ॥ ২৬৮ ॥
হেথা ভক্তিমতী ঘরে গৃহিণী তাঁহার ।
ভোজ্যাদি নিজের হাতে করেন তৈয়ার ॥ ২৬৯ ॥
ফুলকা ফুলকা লুচি সুজির পায়েস ।
নূতন খেজুর গুড়ে গোল্লা সন্দেশ ॥ ২৭০ ॥
সাদা সন্দেশাদি আর মিষ্টান্ন বহুল ।
বিল্বপত্র গঙ্গাজল ধূপ দীপ ফুল ॥ ২৭১ ॥
যাবতীয় দ্রব্যাদি জোগাড় করি ঘরে ।
শুভক্ষণে দিলা আনি প্রভুর গোচরে ॥ ২৭২ ॥
অপর দ্রব্যাদি কালী আনিলা আপনি ।
সুজির পায়েস আনে তাঁহার গৃহিণী ॥ ২৭৩ ॥
কোচলা গামছা এক করি পরিধান ।
গৃহিণীর ভক্তি এত না যায় বাখান ॥ ২৭৪ ॥
দুইটি মোমের বাতি দিলা দুই পাশে ।
আসনে শ্রীপ্রভুদেব বসিলেন শেষে ॥ ২৭৫ ॥
পরিপূর্ণ গোটা ঘর অন্তরঙ্গগণে ।
অনিমিখে চেয়ে সবে শ্রীপ্রভুর পানে ॥ ২৭৬ ॥
এইখানে এক কথা শুন তুমি মন ।
এতগুলি মহাভক্ত বুদ্ধি বিলক্ষণ ॥ ২৭৭ ॥
কাহারো আদতে এটি আসিল না মনে ।
ঘট কিংবা পট কি প্রতিমা আনয়নে ॥ ২৭৮ ॥
অথচ সকলে জানে প্রভু গুণমণি ।
কালীপুজা করিবেন আপনিই তিনি ॥ ২৭৯ ॥
মহারঙ্গ ঠাকুরের গুন মন দিয়ে ।
আসনে বসিয়ে প্রভু স্থির ভাব হয়ে ॥ ২৮০ ॥
ভাবে মগ্ন নন বাহ্য চেঠা আছে গায় ।
এইরূপে বহুক্ষণ গত হয়ে যায় ॥ ২৮১ ॥
তখন গিরিশে কন রাম পেয়ে টের ।
প্রভুর এ পূজা নয় পুজা আমাদের ॥ ২৮২ ॥
আমাদের পূজা প্রভু লইবার তরে ।
অপেক্ষায় উপবিষ্ট আসন উপরে ॥ ২৮৩ ॥
'বল কি' বলিলা শ্রীগিরিশ মহাবলী ।
জয় মা বলিয়া দিলা পায়ে পুষ্পাঞ্জলি ॥ ২৮৪ ॥
কালীর আবেশে মগ্ন তখনি গোসাঁই ।
বরাভয় করদ্বয় অঙ্গে বাহু নাই ॥ ২৮৫ ॥
ক্রমে পরে যাবতীয় মহাভাগ্যবান ।
পুষ্পাঞ্জলি শ্রীচরণে করিল প্রদান ॥ ২৮৬ ॥
কেহ হাসে কেহ নাচে উন্মত্ত হইয়া ।
বীরদম্ভে লক্ষে কেহ ছাদ কাঁপাইয়া ॥ ২৮৭ ॥
আনন্দময়ীর ভাবে প্রভুদেবরায় ।
মহা আনন্দের শ্রোত ঘরে বয়ে যায় ॥ ২৮৮ ॥
কিছুক্ষণ পর হৈল ভাব অবসান ।
দশ-বার আনা প্রায় অঙ্গে বাহ্যজ্ঞান ॥ ২৮৯ ॥
কোন ভক্ত দেখি তাঁর উন্মীলিত নেত্র ।
শ্রীমুখে ধরিল তুলে পায়সের পাত্র ॥ ২৯০ ॥
পাত্রেতে আধেয় ছিল ছয় সের প্রায় ।
আবেশে ভক্ষণ সব করিলেন রায় ॥ ২৯১ ॥
সন্দেশ খাইয়া পরে বহুল বহুল ।
সর্বশেষে মুঠাভরা সুমিষ্ট তাম্বুল ॥ ২৯২ ॥
ভক্তেরা করিলা মনে ব্যথা গেছে সেরে ।
আজি অঙ্গে মা কালীর আবেশের ভরে ॥ ২৯৩ ॥
আনন্দের স্রোতেতে আনন্দ বাড়াবাড়ি ।
সকলে প্রসাদ লয়ে করে কাড়াকাড়ি ॥ ২৯৪ ॥
শ্রীপদে অঞ্জলি দেয়া কুসুমের হার ।
কেহ উঠাইয়া গলে পরে আপনার ॥ ২৯৫ ॥
কেহ বা সঞ্চয় হেতু বাঁধিল বসনে ।
কেহ বা গরবভরে পরে তুই কানে ॥ ২৯৬ ॥
কেহ বা চলিয়া পড়ে অপরের গায় ।
হৃদয়ে আনন্দ এত ধরে না তাহায় ॥ ২৯৭ ॥
কি রঙ্গ হইল দৃশ্য কার সাধ্য কয় ।
চক্ষে দেখা তবু তিল বর্ণিবার নয় ॥ ২৯৮ ॥
মধুর কখন রামকৃষ্ণ-লীলা গীতি ।
রামকৃষ্ণভক্তবৃন্দ পদে মাগি মতি ॥ ২৯৯ ॥
রামকৃষ্ণপুঁথি মহাশান্তির ভাণ্ডার ।
শ্রবণকীর্তনে ভব-জলধিতে পার ॥ ৩০০ ॥